হলিডে [২য় অংশ]

লেখাঃ তৃধা আনিকা

প্রাইম মিনিস্টার নাজমুল ইসলামের মাথায় অাগুন জ্বলছে। তিনি তিনঘন্টায় এই নিয়ে দুটো প্রেশারের ঔষধ খেয়েছেন।কিছুতেই প্রেশার নামছে না। তাঁর ইচ্ছে করছে সামনে যেসব জিনিসপত্র অাছে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতে, সব অাগুন লাগিয়ে জালিয়ে দিতে!

দু-একটা লিংক বলছে তাঁর মেয়ে একজন এডির সাথে প্রেম করে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। এর মানে কি??মি.তামিম সিকিউরিটি উইংএ অাছে বলে তাঁকে এপয়েন্ট করা হয়েছে। ছেলেটা ভালো বলেই বারবার ডাকা। তাঁর মানে কি এই যে, তাঁর মেয়েটা প্রেমে পড়ে যাবে??? এটা হতে পারেনা।

তিনি অাবারও ঘড়ি দেখলেন, পনেরো মিনিট পেরিয়ে গেছে। নাফিসা এখনো অাসেনি। পাশের ঘর থেকে এ ঘরে অাসতে নিশ্চয় পনেরো মিনিট লাগে না। তাঁর মানে কি?? নিজের মেয়ে তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, এত দুঃসাহস?? প্রাইম মিনিস্টার তিনি, অথচ তাঁর নিজের মেয়েই তাঁকে ভয় পায় না.. এটা কোনো কথা হলো??
তিনি কি অাবার ডেকে পাঠাবেন?? 
নাফিসা দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে হাসিমুখে বলল, 
——মে অাই কাম ইন পাপা?? 
প্রাইম মিনিস্টার নাজমুল সাহেব মেয়ের দিকে তাঁকালেন, এবং সাথে সাথে তাঁর মন ভালো হয়ে গেলো, রাগ পড়ে গেলো। নাফিসা একটা সুন্দর নীল শাড়ি পড়েছে। সাথে মিলিয়ে সাঁজগোজ! বাহ্ কি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। নাফিসা জন্মাবার পর নাজমুল সাহেবের বেশ মনোকষ্ট ছিলো। মেয়ের গায়ের রং খানিকটা চাপা। নাকটাও ছিলো বসানো টাইপ। কিন্তু মেয়েটা যত বড় হতে থাকলো, নাজমুল সাহেবের ততই মনে হতে থাকলো, গায়ের রংটা চাঁপা বলেই মেয়েটাকে এত মিষ্টি দেখতে। এরকম গায়ের রং না হলে বোধহয় অত কোমল দেখাতো না।বসানো নাকটা মুখটাতে কেমন মানিয়ে গেছে। একদম রূপকথার পরীদের মত মিষ্টি….লাগছে। 
——কি হলো পাপা??? অাসবো না??? 
নাজমুল সাহেব চমকে উঠে নিজেকে সামলালেন, মনে মনে বললেন, মাশাঅাল্লাহ!! অাল্লাহপাক অামার মেয়েটাকে তুমি শতবর্ষ অায়ু দেও! 
——অাসো মা, ভেতরে অাসো। 
নাফিসা দরজায় দাড়িয়ে ইশারায় মাথা নাড়লো। 
নাজমুল সাহেব এর মানে বুঝলেন। চিফ সিকিউরিটি অফিসার হানিফ সাহেবকে তিনি ইশারায় বেরিয়ে যেতে বললেন। 
——অার ইউ ওকে পাপা??? 
——-ইয়েস ইয়েস….কমপ্লিটলি ওকে।
——তুমি অামায় বকবে বলে ডেকেছো তাইনা, পাপা??

নাজমুল সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন।সিরিয়াস সিচুয়েশানে মেয়েটা অাগেভাগেই অনেক কিছুই বলে ফেলে।পরিস্থিতি তখন সম্পূর্ণ হাতের বাইরে চলে যায়। 
নাফিসা বাবার পাশে অায়েশি ভঙ্গিতে বসলো।
——বকো তো বাবা বাকো…. মি. তামিম ব্যাপারে তো??? ওকে বকো…
দুদিন বাদেই তো অামি চলে যাবো। তোমার কাছ থেকে নেওয়ার তো কিছু নেই, বকা নিয়ে যাই বরং।

নাজমুল সাহেব দ্রুত চিন্তা করতে লাগলেন। নাফিসাকে কথাগুলো তিনি খুব টেকনিক্যালি বলবেন।মেয়েটাকে কষ্ট দেয়া যাবে না।
——-মা, মণি তুমি জানো, তোমার বাবার পেশাটা সবার থেকে অালাদা। তাই সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। একটা নিউজপেপার হঠাৎ কিছু লিখে টিখে দিলে?? সারাক্ষণ টেনশানে থাকি, নিজের জীবন বলে তো কিছু নেই অামার। তোমাকেই জীবন ভাবি অামার।

—–মেইক ইট স্ট্রেইট ফর মি!! পাপা, এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার দরকার নেই। কাম টু দ্যা পয়েন্ট! 
——-দেখো মা-মণি তামিম ছেলেটা যাস্ট অল্পসময়ে এই পেশায়। তারপরও তুমি কমফোর্ট ফিল করো বলে তোমার সিকিউরিটিতে তাঁকে রাখা হচ্ছে। তাঁর মানে তো এই নয় যে, সে তোমাকে পারসোনালি মিট করবার জন্য ডাকলেই তুমি চলে যাবে…. লাইব্রেরী ঘুরে ঘুরে বই কিনবে।
——-পাপা, তোমার কি মনে হয় না তুমি সবধরনের সম্পর্কগুলোকে রাজনৈতিক এঙ্গেল থেকে বিচার করো?? 
——-সেরকম কিছু নয় মা-মণি। অামি শুধু ক্লিয়ার করতে চাচ্ছি, তোমাকে কেউ ডেকে পাঠাবে এরকম ক্ষমতা কি সহজ করেই কাউকে দেয়া ঠিক??ইউ অার এ প্রিন্সেস। এনজয় ইওর পাওয়ার!
——-পাপা, মি. তামিমকে অামিই বলেছি উনি যাতে অামাকে বন্ধু ভাবেন। এবং অামার সাথে বন্ধুত্ব করবার জন্য জোড় করেছি, বলতে পারো।
উনি একটা ছোট্ট ফেবার চেয়েছেন, উনার খুব কাছের একটা মানুষ পড়াশোনা করতে চাচ্ছেন না। তাঁকে ইন্সপায়ার করে, সে যাতে পড়াশোনাটা শুরু করে সেজন্য একটা ফোন করতে বলেছেন।। অামি করে দিয়েছি। অার বইতো?? ওকে ফাইন,
কারো সাথে গিয়ে যদি দুটো বই কেনা অপরাধের পর্যায়ে পরে সেটার জন্য শাস্তি পেতে অামি রাজি। 
——-সেরকম যদি কোনো ফেবার হয়, তাতে অামার কোনো অাপত্তি নেই, মা। তুমি প্রাইম মিনিস্টারের একমাত্র মেয়ে, তুমি লোকজনকে ফেবার দেবে না তো কে দেবে??? কাউকে পড়াশোনায় উৎসাহ দেওয়ার মত ভালো কাজ তো তোমার অবশ্যই করা উচিত।অবশ্যই…

নাফিসা বাবার দিকে তাঁকিয়ে হাসলো।
——এবার বলোতো, অামায় কেমন লাগছে পাপা????

নাজমুল সাহেব মেয়ের কথার জবাব দিলেন না। 
—–উফ পাপা, এই প্রশ্নটা অামি যাকেই করি সেই উত্তর দেয় না। তাঁর মানে অামি পঁচা দেখতে…?? 
নাজমুল সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। 
——-সত্যিই তুমি তাঁকে ফেবার করার মত শুধু বন্ধুই ভাবো তো????

——-ডোন্ট ওরি পাপা। অামি তোমাকে ছোট করবার মত কিছুই করছি না। মি. তামিমকে অামি পছন্দ করি। তিনি ভালো লোক। নিঁখুত ভালো লোক। অামার উনার পাশাপাশি থাকলে নিজের কথাগুলো বলতে ভালো লাগে। হি ইজ এ নাইস গাই, টোটালি ডিফারেন্ট এন্ড অফ ট্র্যাক গাই। দ্যাটস অল। অাই মিন ইন এ নাইস ওয়ে পাপা… 
সো দ্যাট অাই অলওয়েজ ট্রাই টু মেইক হিম, এজ এ ফ্রেন্ড অফ মাইন।
নাজমুল সাহেব মেয়ের পিঠ চাপড়ে দিলেন। 
——অাই নো দ্যাট, ইউ অার মাই সুইট এন্ড লাভলি ডটার।অাই বিলিভ,
ইউ উইল মেইক মি প্রাউড।
——পাপা, একটা মজার বিষয় কি জানো???তুমি যেমন ভাবছো, মি.তামিমও বোধহয় সেরকম ভাবে। অামি যখন উনার সাথে গল্প করি, উনি ভয়ে ভয়ে তাঁকিয়ে থাকেন। উনি বিশাল অাতঙ্কে থাকেন, অামার খুব মজা লাগে। উনার সবসময় দুশ্চিন্তায় কপাল কুঁচকে থাকে। এই বুঝি, অামি তাঁর প্রেমে পড়ে গেলাম, এই বুঝি…. বেচারা…. 
নাফিসা খিলখিল করে হেসে উঠলো।

——-তাঁর মানে শাড়ি পড়ে তুমি তাঁকেও জিজ্ঞেস করেছো যে তোমায় দেখতে কেমন লাগছে ??? তাইনা??
——এক্সাক্টলি পাপা। বেচারা ভয়ে মরে যায় অবস্থা। ফ্যাকাসে করে নিশ্চুপ হেসেছিলেন। মাথা চুলকাতে চুলকাতে মাঝে মাঝে বিড়বিড় করেন।
অামার কি যে ভালো লাগলো, পাপা। অামি সারাজীবন, অামার চারপাশে মেয়েলোভী ছেলেদের দেখেছি পাপা, ইভেন অনেক সিনিয়র অাংকেল যাদের নোংরা দৃষ্টি অামায়, দেখতে হয়েছে।মাতৃহীনা একটা মেয়ের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ঘরোয়া পরিবেশে বড় হওয়ার কার্স বলতে পারো।
তাই,
হঠাৎ করে একজন ভালো মানুষ দেখে চমকে গেছি যাস্ট!!এইজন্যই উনাকে ভালো লাগে….. পাপা।অার কিছু নয়। 
তোমার মেয়ে কিন্তু অতটাও বোকা নয় যে, ফট করেই প্রেমে পড়ে যাবে?? ডোন্ট থিংক মি সো সিলি.

নাজমুল সাহেব নিজে উঠে গিয়ে কফিমেকারের কাছে দাঁড়ালেন।
নাফিসাও উঠে দাঁড়ালো।
——এখন কফি খাবো না পাপা। ভালো লাগছে না। সারাদিন ঘুরে ঘুরে টায়ার্ড। ডিনার করেই ঘুমোবো!!

——–তোমার সাথে এক কাপ কফি খাওয়ার সুযোগও পাবো না অামি??? 
——ওকে দাও পাপা! একটা সুগার কিউব দিও কিন্তু! অাই এম ইন ডায়েট!
নাজমুল সাহেব হাসলেন, 
এক কাপ কফিতে তিনটে সুগার কিউব নেয়া মেয়ে তাঁর এখন একটা নিচ্ছে।কত পরিবর্তন! তিনি বিড়বিড় করে বললেন, পাগলী!

কফি মগটা হাতে নিয়ে নাফিসা জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। 
——–পাপা, তুমি কিন্তু প্রমিস করেছিলে, অামায় নিয়ে কখনো দুঃশ্চিন্তা করবে না। তারপরও কিন্তু করেছো..
——তুমি বাবা হলে বুঝতে মা। মেয়ের জন্য কত ভাবতে হয়…

——-তাও পাপা, অাই কনফার্মড ইউ মোর এন্ড মোর টাইমস বিফোর, যে অামার যখন কাউকে ভালবাসতে মন চাইবে, অামি তোমার পারমিশান নিয়ে ভালোবাসবো। এবং তুমি জানো অামি অামার কথা রাখি। তারপরও তুমি কিভাবে ভেবে নিলে???
——-হাজার ধরনের ঝামেলায় থাকি মা-মণি। এর মধ্য দু-একটা পত্রিকা থেকে ফোন করে… লোকজন থাকেই তো…

.——-যত যাই বলো, তুমি তোমার মেয়েকে অবিশ্বাস করেছো.. . ইট’স এ পানিশেবল ক্রাইম। বলো, কি শাস্তি নেবে??? 
নাজমুল সাহেব হাসলেন। 
——-তোমার থেকে দূরে থাকছি, এটাই কি বড় শাস্তি নয়?? 
নাফিসা মনখারাপ করা চোখ নিয়ে বাবার দিকে তাঁকালো। তাঁর এই প্রাইম মিনিস্টার বাবা তাঁর কাছে একদম অপরাধী মুখ করে অাছে। 
——-পাপা, অামার জবাবদিহিতা কি শেষ হয়েছে?? তাহলে অামি ঘুমোতে যাই…… 
নাফিসা একমুহূর্ত ভেবে নিল….
—— না ঘরে যাবো না, অাজ বরং তোমার ঘরেই ঘুমোবো… তুমি একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও তো।

নাফিসা সত্যি সত্যি বিছানায় এসে সটান শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। নাজমুল সাহেব ব্যতিব্যস্ত হয়ে মেয়ের পায়ের জুতোটা খুলতে লাগলেন। নাফিসা চট করেই তড়াক করে অাবার উঠে বসলো এবং বাবার গাল টিপে ধরে বলল, 
——পাপা, অামি যাকে ভালোবাসবো সে হবে দুনিয়ার সবথেকে স্পেশাল গাই। যে তোমার থেকেও অামাকে বেশি ভালোবাসবে। অার সে যখন রাতে ঘুমোতে যাবে, অামি এভাবে তাঁর জুতোটা খুলে রাখবো। লাভ ইউ পাপা।

???

রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে শফিক মৃদুস্বরে বলল, 
——রনি এসেছে ভাবী। অামি এখন ও’র সাথে কথা বলতে পারবোনা। অামি বিজি! 
লাবণী চা বানাচ্ছিলো, না তাঁকিয়েই বলল,
——বিজি মানে?? কি করছো?? 
——পড়ছি। মেডিকেলের পড়া।
——বলো কি??
——হু, ভাবী;
অামি ঠিক করেছি,
সেকেন্ড প্রফটা দিয়েই ফেলবো….. এত করে যখন উনি রিকোয়েস্ট করে বলেছেন…
——-কে রিকোয়েস্ট করেছেন? 
——-নাফিসা ম্যাম।
লাবণী চা বানানো ফেলে এসে শফিকের মুখোমুখি দাঁড়ালো।
——-তুমি পড়ছো মানে???সত্যিই বুঝতে পারছিনা।

——বললাম তো, সেকেন্ড প্রফের জন্য প্রিপারেশন করছি ভাবী। 
——শফিক, তুমি ঠাট্টা করছো না তো???
শফিক রাগী রাগী মুখ করে সিরিয়াস চোখে তাঁকালো।
——অবিশ্বাস করছো অামায়??? লিসেন ভাবী, লেট মি গেট দিস ইন ডিটেল,
এই প্রফেশনাল এক্সামের জন্য
প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি,
ফার্মাকোলোজি, ফরেনসিক মেডিসিন
এবং কমিউনিটি মেডিসিন পড়তে হয়।অামি ঠিক করেছি এই সাবজেক্টস গুলো, অামি ছয় মাসে পড়ে ফেলবো। ফর ইচ সাবজেক্ট, ওয়ান মান্থ।পাঁচ মাস পড়া, বাকী এক মাস রিভিশান।অামি দেখতে চাই এই কোর্সটা পাঁচ মাসে পড়া সম্ভব কিনা…. যে সে পড়া না; একদম ডিটেলে পড়বো।

লাবণীর মুখ হাঁ হয়ে অাছে। শফিকের কথাগুলো তাঁর মাথায় ভনভন করছে।তবে শফিক যে সত্যিকথা বলছে বুঝা যাচ্ছে।

——বই কালেক্ট করলে কিভাবে, শফিক???? 
——- নাফিসা ম্যাম পাঠিয়েছেন।এবং তিনি অামায় রিকোয়েস্ট করেছেন পড়াশোনা করার জন্য। অামিও বলে দিয়েছি, কোর্স কমপ্লিট করেই তাঁকে মিট করবো। 
——-নাফিসা ম্যামটা কে?? তোমার টিচার??
শফিক মাথা নাড়লো,
—— প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ে! দারুণ ভালো মানুষ, বুঝলে। কি সুন্দর বুঝিয়ে বলল!
শত হোক প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ের অনুরোধ, অামি তো ফেলতে পারি না।

লাবণী মোটামোটি ধরনের একটা শক খেয়ে গেলো।
শফিক এরকম করে হঠাৎ কথা বলছে কেনো??? 
তাঁর মাথা ঘুরতে লাগলো। শরীরও টলছে। সে একহাতে দরজা ধরে নিজেকে সামলে নিলো।শফিকের প্রেম হয়েছিলো জেলা প্রশাসকের মেয়ের সাথে, মেয়ের নামটা যেনো কি??
লাবণী মনে করার চেষ্টা করলো। মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কিছুই মনে পড়ছে না।এই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যে শফিকের মাথায় প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ে পর্যন্ত চলে এসেছে।ডিসির মেয়ে থেকে প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ে…
লাবণী মুখ হাঁ করে কিছুক্ষণ তাঁকিয়েই রইলো।
বসার ঘরের দিকে যেতে যেতে লাবণীর মনে হলো শফিকের ঔষধ রিএকশান শুরু করেছে। নাহলে এমন হবে কেনো?? 
লাবণী পেছন ফিরে শফিকের দিকে ভালো করে তাঁকালো। 
শফিকের একহাতে পেন্সিল, অন্য হাতে বই। সে সমানে পেন্সিল দিয়ে মাথার চুল খোঁচাচ্ছে।বিড়বিড় করে পড়া অাওড়াচ্ছে।লাবণীর ইচ্ছে করলো শফিকের মাথার উশকোখুশকো চুলগুলো হাত বুলিয়ে গুছিয়ে দেয়…

——কি হলো, তুমি দাঁড়িয়ে পড়লে যে??ভাবী, প্লিজ তুমি গিয়ে ও’কে একটু কম্পেনি দাও। বেচারা বসে অাছে। পড়তে হয় ফুল ফ্লোতে, একবার পড়া থেকে উঠলে মহাঝামেলা। এই যে এখন একটু কথা বললাম, কনসেন্ট্রেশন লিক করে গেছে। 
লাবণী কোনোরকম অস্ফুট স্বরে বলল, 
——-শফিক, তুমি তোমার ঔষধগুলো ঠিকঠাক খাচ্ছো তো??
——-না ভাবী। মেডিসিন বন্ধ করে দিয়েছি।ঘুম জ্বালাতন করে বেশি।
অার শোনো, পড়াশোনার ব্যাপারে রনিকে বলার দরকার নেই। অামার কথা জিজ্ঞেস করলে বলবে, ঘুমোচ্ছি।

লাবণী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। শফিকের মাথাটা এবার কি শেষ পর্যায়ে চলে গেছে???
অার কি কোনো অাশাই নেই। লাবণীর বুক কেঁপে উঠলো। দুনিয়া ভেঙ্গে কান্না পাচ্ছে তাঁর। এত ভালো দেওর। সে কিনা একটা মেয়েকে ভালোবেসে অাজ???লাবণী ডুকরে কেঁদে উঠলো।

——ভাবী…(শফিক পিছু ডাকলো) রনিকে চা দিলে, অামার ঘরেও দিও। একটু পড়লেই গলা শুকিয়ে অাসে,.. এক জগ পানিও দিও।
লাবণী নিজেকে অার সামলাতে পারলো না। ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লো। চোখে ঝাপসা দেখছে সে….

???
তামিম টেবিলে রাখা পত্রিকাটায় অাবার চোখ বুলালো।নকশার ফ্রন্টেপেজের পুরোটা জুড়েই নীরার ছবি। 
ছবিতে
নীরা বসেছে একটা পুকুর পাড়ে।পুকুর ঘাটের সবথেকে নিচের সিঁড়িতে, দু-পা পানিতে ভিজিয়ে। তাঁর শাড়ির অাঁচল ভেসে অাছে পুকুরের পানিতে। শাড়িটা বেশ খানিকটা তুলে দেওয়া, ভেঁজানো পায়ের নুপুর পানির মধ্যে দিয়ে ছবিটাতে অন্যরকম একটা অাভা এনে দিয়েছে।নীরা একহাতে সবগুলো চুল মুঠো করে ধরা, যেনো ছেড়ে দিলেই সব চুল পানিতে পড়ে ভিজে যাবে।তবে সে একদৃষ্টিতে তাঁকিয়ে অাছে, পুকুরে ভেসে থাকা তাঁর শাড়ির অাচঁলের দিকে।

তামিম পেজ উল্টালো, তাতেও নীরার ছবি। এখানেও বেশ কয়েকটা ছোট ছোট ফটোর কোলাজ।তামিম এবার ফিচারের মুল পেজটা খুললো!এই পেজের ছবিটাতে নীরাকে অন্যরকম লাগছে।সে পড়েছে জিন্সের সাথে স্লিভলেস ফতুয়া। তবে চুলটা এবার সুন্দর করে পনিটেল বাঁধা।সে দু-হাত জিন্সের পকেটে ঢুকিয়ে অারামসে দাঁড়িয়ে অাছে।
তামিমের হঠাৎ করেই মনে হলো ছবির নীরা মেয়েটার উপর তাঁর রাগ হচ্ছে, ভীষণ রাগ হচ্ছে। 
——-হারুন সাহেব.. হারুন… 
হারুন প্রায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। 
——এই ছবি গুলো দেখেছেন??? 
——জি স্যার।
——- ছবি দেখে অাপনার কি মনে হয়েছে?? কেমন লেগেছে?? 
—–জি মানে মানে, স্যার। ভালো হয়েছে, বেশ ভালো হয়েছে।
——-টুবি অনেস্ট, একদম একচুয়েল অাপনার মনে যা অাসছে বলুন,

হারুন কিছু না বলে মাথা চুলকালতে লাগলেন…। 
——অানসার,মি. হারুন সাহেব! 
——-স্যার, উনার ছবি দেখে মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই উনি কোনো মুভির হিরোইন হয়ে যাবেন। ছবিগুলো বারবার দেখারর মত…..

তামিম পেপারে দুম করে একটা কিল মেরে পেপারটা হারুনের দিকে ছুঁড়ে ফেললো।
——-গান লোড করো হারুন।অামি কিছুক্ষণ শুটিং প্রাকটিস করবো। অার হ্যাঁ টার্গেট বোর্ডে তোমার নীরা ম্যাডামের ছবিটা এডযাস্ট করে দাও। অামিও তাঁকে কিছু শুট করি!! তিনি করবেন ফটোশূটিং, অামি করবো পিস্তল শুটিং! 
হারুনের মুখ লম্বা হয়ে গেলো বিস্ময়ে।
স্যার এমন পাগল পাগল কেনো করছেন??? কি হয়েছে??

নীরা ঘর অন্ধকার করে বসে অাছে। তাও এই সন্ধেবেলায়?? লাবণী বাতিটা জ্বালিয়ে নীরার পাশে এসে বসলো। 
——একটু নিচে অাসবে নীরা??বাবা- মা চলে যাবার অাগে কিছু বলতে চান। 
নীরা জবাব দিলো না। বসা থেকেই একটা অাড়মোড়ার মত করলো। 
——তোমার কি শরীর খারাপ নীরা?/ জ্বর??
লাবণী হাত বাড়িয়ে নীরার কপাল ছুঁয়ে দেখলো। 
——-জ্বর তো নয়, তাহলে?? 
——বাবা-মা, কি রেডী হয়ে গেছেন ভাবী?? 
—–হুঁ। অাধঘন্টার মধ্যে বেরুবেন। 
নীরা উঠে দাঁড়ালো। অালনা থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল, 
——চলো। 
লাবণী তাও বসে রইলো!
——কি হলো?? চলো…. ভাবী…
——-কিছু হয়েছে নীরা?? মুখটা মলিন লাগছে, কোনো ঝামেলা??? বলো অামাকে..
নীরা হাসবার চেষ্টা করলো।
——-তুমি যে এই এত ঝামেলার সংসারে থাকছো, তোমার কি তাঁতে মন ভরছে না?? তাও তোমার অারো ঝামেলার কথা শুনতে মন চায়??? 
——হ্যাঁ চায়… বলো কি হয়েছে??? তুমি কি কোনো বিপদে পড়েছো???

নীরা লাবণীর মুখোমুখি এসে বসলো। 
——-যেই লোক গুলো অামাদের ভ্যান জ্বালিয়েছিলো, সেই দলেরই কিছু লোক অামায় থ্রেট করছে। তাঁদের ধারণা তাঁদের লোক যখন কাউকে মার্ডার করতে চেয়েছিলো, অার অামি তাঁদের লোকেদের দেখেছি। দু-জনকে নাকি এরেস্ট ও করা হয়েছে! অামাকে কন্টিনিউয়াস থ্রেট করছে অামি যাতে গিয়ে সাসপেক্টদের শনাক্ত করে না দিই! 
——–কাকে মার্ডার করার চেষ্টা করছিলো??? 
——-মি.তামিম। তিনি একজন এনএসঅাই র অফিসার।তিনি নাকি তাঁদের অনেক খবর জানেন!!

——-ওহো, অামাদের বাসায় যিনি এসেছিলেন তোমায় খুঁজতে, তিনি?? 
——হুঁ। তিনি হয়তো কিছু অান্দাজ করে এসেছিলেন। 
——–তুমি কি সত্যিই কাউকে দেখেছো?? 
——মোটেও না। অামি যখন মি. তামিমকে দেখি, তখন তিনি একা এবং অাহত। সেরকম দেখেই অামি তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।অামার মনে হয় কি জানো, সেদিন যে মি. তামিম একা ছিলেন সেটা জেনেই ওরা এটাকটা করেছিলো। অামি তাৎক্ষণিক যাওয়ায় সুবিধা করতে পারেনি।
——-ব্যাপারটা মি. তামিমকে বলেছো??? 
——উনার সাথে যোগাযোগ করা কি ঠিক হবে?? যদি ভাবে শেল্টার চাচ্ছি??! সাহায্য চাওয়ার মত তো কিছু নেইও, তাই বলিনি।
——-তাহলে এখন কি করবে?? 
—— ঠিক করেছি, ওই শয়তানদের সাথে সরাসরি দেখা করবো। বলবো যে, অামি কাউকে দেখিনি এবং কিচ্ছু বলবোনা। এবং মোস্ট ইম্পর্টেন্ট থিং, মি. তামিমকে অামি চিনিই না ভালো করে..
——-তোমার যদি কোনো বিপদ হয়?? 
——হলে হবে, বিপদের মাঝেই তো বসবাস।বিপদই তো মোর জনম সঙ্গী।

লাবণী নীরার কাঁধে হাত রেখে শক্ত করে ধরে পাশে দাঁড়ালো। 
——তুমি একা যাবে না নীরা, একদম একা যাবে না। অামিও যাবো তোমার সঙ্গে।

নীরা হাসলো। যে হাসির মানে হলো কঠিন “না”! লাবণী নীরার ঘরের বিছানার চাদরটা টেনে ঠিক করতে করতে বলল,
——এ বাড়িতে যখন বিয়ে হয়ে এলাম। বাড়িতে এসে শুনলাম এ বাড়ির একমাত্র ছোটো মেয়েটি ভাইয়ের বিয়েতে বরযাত্রী যেতে পারেনি, কারণ তাঁর জ্বর! নতুন ভাবী অামি কি করলাম, অামার সেই জ্বর গায়ে ননদকে দেখতে তাঁর ঘরে গেলাম। তাঁর বিছানার ধারে, এই এখানটায় বসে…. তাই না নীরা?? 
——-উফ্ চুপ করো ভাবী! ইমোশোনাল ব্লাকমেইলিং। বারবার এক গল্প….
——-চুপ করার তো কিছু নেই নীরা, এটা অামার জীবনের চমৎকার ঘটনা। এটা অামার বারবার বলতে ভালো লাগে। 
তারপর অামি যখন অামার সেই ননদের মুখটার দিকে তাঁকালাম, অামার মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো।(লাবণী নীরার কাছাকাছি এসে তাঁর দু-গালে হাত দুটো দিয়ে মুখটা তুলে ধরলো) কি সুন্দর বড় বড় চোখ, বা চোখের পাশে এই এত্তবড় তিল। এই থুতুনিটা এমন মাঝখানে খাঁঝ হয়ে দেবে অাছে। কি সুন্দর সরু ঠোট।খাড়া নাকের এই উপরটায় একটা কাটা মিষ্টি দাগ… 
অামার চোখ জুড়িয়ে গেলো। মন ভরে গেলো ভালোলাগায়!
অামি অামার সেই ননদকে দেখে তাঁর কানে কানে ফিসফিসিয়ে কি বলেছিলাম মনে অাছে??, বলেছিলাম, ভালোই হয়েছে, বিয়েতে তুমি যাওনি। তুমি বিয়েতে গেলে সবাই তোমাকেই হাঁ করে দেখতো, অামায় কেউ দেখতো না। অার বিয়ের অনুষ্ঠানে বিয়ের কনেকে না দেখলে কত কষ্টই না হতো…. 
নীরা লাবণীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। 
——অার তোমার সেই বোকা ননদ গাঁধার মত তোমায় কি বলেছিলো,
” অামি নায়িকা হবো তো ভাবী, তাই অামি এত সুন্দর!!!এই দেখো অামার কত লম্বা চুল!! “

লাবণী সশব্দে হেসে ফেললো। কিন্তু তাঁর দু-চোখ ভর্তি জল।
লাবণী কিছুক্ষণ নীরাকে শক্ত করে ধরেই থাকলো, 
——অামার সেইদিনই মনে হয়েছিলো নীরা, তোমার সাথে অামার অন্য কোন টান অাছে, যেটা অাগে থেকেই বাঁধানো।
নীরা মাথা নাড়লো, 
——অার সেই রাতে তুমি বর ফেলে অামার সাথে থাকতে চলে এসেছিলে। ভাইয়ার কি রাগ তখন….

লাবণী চোখটা মুছে এসে বিছানায় বসলো।
——-সেই রাতে পুরো রাত অামরা দুজনে ঘুমালাম না। গল্পও কিন্তু করিনি। দু-জনে দুদিক ফিরে নিশ্চুপ জেগে ছিলাম।কি যে জড়তা… নতুন ভাবীর পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়েছিলে তুমি।
সেই জেগে থাকায় কি মমতা, কি মায়া যে লুকিয়ে ছিলো, বুঝতেই পারিনি।
তোমার ভাইয়া চলে গেলো, অামার সন্তান চলে গেলো, শফিকটা অামাদের সবার মাঝে থেকেও নেই, অামার এই বাড়িতে তো শুধু তুমি অাছো, অামি কি কোনো বিপদে তোমায় একা ছাড়তে পারি???

নীরা কাঁদছে। 
——-অামি তোমার জন্য কিচ্ছু করতে পারছি না ভাবী, কিচ্ছু না। একটার পর একটা ঝামেলাই বয়ে অানছি।

লাবণী নীরাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো।
——-কিচ্ছু করার দরকারও নেই, চেয়েছি কিছু??/ তুমি বলেছিলে নায়িকা হবে সেটা হও…

নীরা অাবার মেঝেতে বসে পড়লো। 
——-এ বাড়িতে মা এসেও অভাবই টানলো। তাও মায়ের অাশা ছিলো, বড় ভাইয়া, অার শফিক ভাইয়া মিলে একদিন সব ঠিক করে দিবে, হলো না।তুমিও টানছো অভাব…
অভাব বুঝলে ভাবী, খুব খারাপ জিনিস। সব প্রতিভা নষ্ট করে দেয়। ভালো করে কথা বলার অাগ্রহ পর্যন্ত শেষ করে দেয়।

লাবণী হাসলো। 
——এরপর থেকে দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।বাবা- মা তো যাচ্ছেনই.. দেশের বাড়ির ভিটেটা বিক্রি করতে।ও’টা বেঁচে দিলে দেখবে, টাকা চলে এসেছে। সব শুরু করা যাবে!
অামরা অাবার ভালো থাকবার স্বপ্ন দেখবো।

নীরার মোবাইল ফোন বাজছে, তাঁকে থ্রেট করা, জসিম বলে লোকটা অাবার ফোন করেছে। 
নীরা ইশারায় মাথা নেড়ে লাবণীকে সেটা বুঝালো।
লাবণী কড়া গলায় বলল, 
——ফোনটা ধরো নীরা। শক্ত হয়ে কথা বলো। একদম ভয় পাবে না।বি ব্রেভ!! শয়তানদের একদম ভয় পেতে নেই নীরা, এদের মনের জোড় বলতে কিছু নেই। ভয় পেতে হয় ভালো মানুষকে। বুঝলে??

নীরা ফোন রিসিভ করলো…..

???

হারুন প্রায় হন্তদন্ত হয়ে মিটিং রুমে ঢুকে পড়লো।
——স্যার, একটা ইমার্জেন্সি… ওয়ান মিনিট স্যার।

তামিম এক্সকিউজ মি বলে বেরিয়ে এলো। 
——স্যার, ওয়াচম্যান বলছে, মিস নীরা ও মিসেস লাবণী একসাথে কোথাও বেরুচ্ছেন। তাঁদের পোশাক দেখে ওয়াচম্যান জানালো, ব্যাপারটা সন্দেহজনক।

——বোরকা পরে বেরিয়েছে??
—— ইয়েস স্যার। 
——-চারজনের একটা টিম রেডী করুন। দুটো গাড়ি নিয়ে ফলো করতে হবে।মি. জাকিরকে সাথে নিন। 
হারি অাপ হারুন….. 
অামি বেরুচ্ছি যাস্ট!অার একটা কথা,,অামি বলা না পর্যন্ত কেউ শ্যূট করবেন না।বি কেয়ারফুল….

তামিম বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে, রিতু ফোন করেছে। 
——-হ্যালো, রিতু.. 
——-ভাইয়া, অামি রিতু না। ইতু.. 
——-ওহ্।রিতুর ফোন থেকে যে?? তোরা এসেছিস নাকি?? 
——হুঁ। 
——-ফোন করেছিস কেনো?? 
——অামি তোর উপর রাগ করেছি, এটা জানানোর জন্য। 
——-অাচ্ছা জানলাম, এখন ফোন রাখ। 
——কেন রাগ করেছি, অাগে সেটা জানতে চা। 
——বল, কেনো রাগ করেছিস??? 
——তুই প্রেম করছিস, সেটা তুই সবার অাগে রিতুকে বলেছিস, অামাকে কিন্তু বলিসনি। অামি কি তোর সৎ বোন??

তামিম নিজেকে সামলালো.. রিতু এমনটা কেনো বলেছে??? 
——শোন ইতু, অামি কোনো প্রেম করছিনা। 
——তাহলে রিতু যে বলল, তোর প্রেমটা নাকি পুরো মাখোমাখো পর্যায়ে চলে গেছে। পায়জামা পর্যন্ত খুলে নিয়েছিস… 
তামিম থতমত খেয়ে গেলো। 
রিতুটা অার ইতুটা একই বয়সের অথচ রিতুটা কি বুদ্ধি করে কথা বলে,; অার ইতু? গাধীটা, কোথায় কি বলতে হবে.. কিচ্ছু সেন্স নেই। 
—— কি হলো, ভাইয়া, কথা বলছিস না কেনো?? তুই এতদূর অবধি চলে গেলি তাও অামায় জানালি না।

——ইতু, অামি একটা জরুরি কাজে বেরুচ্ছি। বাসায় এসে কথা বলছি তো।

——-তোর তো সারাক্ষণই জরুরি কাজ। সোজা করে বলে দে না অামার সঙ্গে কথা বলার তোর টাইম নেই। 
——সেরকম কিছু নয় ইতু। অামার প্রেম হয়নি বলে তোকে বলা হয়নি। প্রেম হলে অামি ঠিক বলতাম। 
——-শোন ভাইয়া, না বলে ভালোই করেছিস। অামার সিক্রেটস গুলোও তোকে অার বলবো না, কিচ্ছু বলবো না… অামিও একা একা চলতে পারি বুঝলি??

তামিম ফোন কেটে দিলো। ইতুর ফ্যাঁচফ্যাঁচানি শোনার সময় এখন তাঁর হাতে নেই। বেরুতে হবে…..

???
লাবণী শক্ত করে নীরার হাত চেপে ধরে অাছে।নীরা বিরক্ত গলায় বলল, 
——সাহস দেবার জন্য এসে তো তুমি বরং অামার ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছো। এমন ঠকঠক করে কাঁপছো কেনো?? 
লাবণী দাঁত কামড়ে বলল, 
——-কাঁপাকাঁপির তো এখনো কিছুই দেখোনি নীরা। যখন কথা বলতে শুরু করবে তখন দেখবে, অামি তোমাকে শুদ্ধু নিয়ে কাঁপছি। 
পুরো রেস্টুরেন্টাই ফাঁকা। এরা যদি মেরে টেরে দেয়?? 
——-মরার এত ভয় তো এসেছো কেনো??
লাবণী বিড়বিড় করে বলল, 
——ইয়া মাবুদ বাঁচাও….

নীরা গটগট করে টেবিলটার কাছে হেটে গেলো। দু-জন স্বাস্থ্যবান লোক বসে। একজন সাদা অন্যজন কালো শার্ট পড়া।
নীরা অাশপাশটায় অাবার চোখ বুলালো। না অার লোক নেই, দু-জনই মাত্র।

——অামি মিস নীরা। 
লোকগুলোর কেউই তাতে কোনো জবাব দিলো না। 
এদের মধ্যে একজন একটি
চিরকুট বাড়িয়ে দিলো। তাতে লিখা
——-“যা বলার এর উল্টোপিঠে লিখে দিন। মুখে কিছু নয়। “

অন্যজন নীরাকে বসতে বলল ইশারায়। একটা কলম বাড়িয়ে দিলো। লাবণী একটু দূরে দু টেবিল পরে দাঁড়িয়ে। 
নীরা চট করে লিখে ফেললো, 
” 
অামি কোনো বয়ান দিবো না। মি. তামিম বলে লোকটা সম্পূর্ণ অামার অপরিচিত।অাপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারুন। তবে অামার দোকানের ক্ষতিপূরণ না পেলে কথার খেলাপও করতে পারি।

মি. জাকির বলল, 
”স্যার টার্গেট পজিশনে অাছে। শ্যূট করবো??? 
তামিম কঠিন গলায় বলল, 
—–নো, কোয়াইট নট! লেডী দুজনে অাগে সেইফলি বেরিয়ে যাক।লেট দেম গো সেইফলি ফ্রম দ্য সাইট।দেন…….

নীরা কাগজটা বাড়িয়ে দিলো।সাদা শার্ট পড়া লোকটা হাত বাড়িয়ে কাগজ নিলো। 
অন্য লোকটা, অারেকটা চিরকুট এবং ছোট্ট নীল একটা প্যকেট বাড়িয়ে দিলো নীরার দিকে।

চিরকুটে লিখা, 
“পঞ্চাশ হাজার অাছে এতে। ভবিষ্যতে কথার হেরফের হলে মানুষও থাকবে না।” 
নীরা প্যাকেটটা নিয়ে এসে লাবণীর হাত ধরলো।লাবণী কোনোরকম তোতলাতে তোতলাতে বলল, 
——হাটতে পারছি না নীরা। পা টলছে, ঝিনঝিন করছে।
নীরা বিরক্ত গলায়, 
ধমকের স্বরে বলল, 
—–বেকুবি করবে না ভাবী। এরা খুব ডেঞ্জারাস লোক। 
চলো।

নীরা লাবণীর হাতটা নিজের কাঁধে নিয়ে বলল, 
——-অামাকে ধরে ধরে হাটো.. হু.. এইভাবে। 
খুব তো বড়বড় কথা বলেছিলে, এখন তো ঘেটে ডাল হয়ে গেছো…..

নীরা রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে এসে হাঁফ ছাড়লো। এখন সোজা লিফটের দিকে, 
——ও মাই গড! গুলির অাওয়াজ। গুলির অাওয়াজ কোথা থেকে… 
নীরা পিছন ফিরে তাঁকালো। রেস্টুরেন্টে বসা লোকদুটোর দুজনই ফ্লোরে পরে গোঙ্গাচ্ছেন। গুলি করলো কে???
লাবণী চিৎকার দিয়ে বলল, 
——-নীরা ধরো অামাকে, ধরো অামাকে.. দৌড়াও নীরা…..

নীরা লাবণীকে টেনে লিফট অবধি যেতে পারলো না। লাবণী বেহুশ হয়ে গেছে।
নীরা লাবণীকে ফ্লোরে শুইয়ে দিলো। 
হেল্প হেল্প বলে চিল্লানোর মানে হয়না।চোখেমুখে পানিরছিটা দিতে হবে। 
নীরা ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করলো।

——হেই মিস নীরা ঠিক অাছেন তো???উনার কি হয়েছে??

নীরা তাঁকালো, মি. তামিম কথা বলছেন। তাঁর হাতে পিস্তল। 
নীরা তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো। 
——-ভা…. বী.. ভাবী মানে বেহুঁশ হয়ে গেছেন। 
তামিম পিস্তলটা ক্যারিয়ারে ঢুকিয়ে নিতে নিতে বলল, 
——ওকে অামি দেখছি। 
নীরা অবাক চোখে দেখলো, গুলিবিদ্ধ লোক দুজনকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে। 
নীরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 
——-লোকগুলো কি মরে গেছে??? 
তামিম হাসতে হাসতে বলল, 
——-মরা কি এত সোজা???দুজনকেই পায়ে গুলি করা হয়েছে।

—-হ্যালো মিসেস লাবণী চোখ খুলুন। 
হ্যালো। 
তামিম অাবার কিছু পানি ছিটিয়ে, দিলো। লাবণী এবার চোখ মেললো। নীরা স্টাক হয়ে দাঁড়িয়ে অাছে। 
লাবণী বিড়বিড় করে বলল, 
——-অামি কি মারা গেছি???? 
তামিম অাশ্বস্ত করা গলায় বলল, 
——-অাপনি সম্পূর্ণ ঠিক অাছেন মিসেস লাবণী। ইউ অার কমপ্লিটললি এলাইভ।

লাবণী তামিমকে দেখলো এবং সাথে সাথেই উঠে বসলো। 
——অাপনি?? অাপনি কি করে??? 
নীরা হতাশ গলায় বলল, 
——-ইনিই গুলি করেছেন ভাবী।
——-অাপনার, অাপনার কাছে বন্দুক অাছে???অাপনি গুলি চালাতে জানেন???
তামিম জবাব না দিয়ে পকেট থেকে টিস্যু বের করে দিতে দিতে বলল, 
——নিন মুখটা মুছুন। অাপনি বরং, এই স্কার্ফটা খুলে নিন। এতে সাফোকেটিং ভাবটা কমবে। নীরা ভয়ার্ত গলায় বলল, 
——অামরা কিছু টাকা নিয়েছি ওদের কাছ থেকে। এই নিন। 
তামিম বুড়ো অাঙুল দেখিয়ে বলল,
——দ্যাটস ভেরি গুড। অামাকে দিতে হবেনা। অাপনি তো পুলিশের কাছ থেকেই টাকা নেন, গুন্ডা তো গুন্ডাই…

নীরা শুকনো একটা ঢোঁক গিললো। মাত্র তো ৮৫০টাকা ঠকিয়েছে। এটাও মনে রেখেছে?? 
লাবণী অনুরোধ ভরা কণ্ঠে বলল, 
——-অামাদের একটু বাসায় পৌঁছে দিন না তামিম সাহেব। অামার মাথা ঘুড়ছে।

হারুন দৌড়ে এসে বলল, 
—-সব ওকে স্যার। অামরা কি চলে যাবো???

——অাপনারা অফিসে যান। অামার একটু কাজ অাছে। ড্রাইভারকেও নিয়ে যান।গাড়ির চাবিটা দিয়ে যেতে বলুন…. 
—–ওকে স্যার! 
নীরা বিস্মিত হয়ে তাঁকিয়ে অাছে। 
—–ওকে চলুন মিস নীরা…. 
যাওয়া যাক। 
লাবণী ব্যাগটা নিয়ে সামনে হাটতে থাকলো। নীরা ফিসফিসিয়ে বলল, 
——-এই ব্যাটা অাপনার লোক??? একে অাপনিই পাঠিয়েছিলেন?? 
কি ভয়ানক, কি ভয়ানক! 
——-মিস নীরা, অাপনার মুখটা একটু এদিকে অানুন তো, রক্ত লেগে অাছে নাকি?? 
নীরা মুখ বাড়িয়ে দিলো। 
——-কোথায়?? কোথায়??? 
——এই যে ডান গালে…(বলে) 
তামিম চট করে একটা চুমু খেয়ে নিলো।

নীরা অাকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। 
লাবণী পেছন ফিরে তাঁকালো। 
——-দাঁড়িয়ে অাছো কেনো নীরা??? 
তামিম দ্রুত এগিয়ে এসে বলল, 
——হ্যাঁ হ্যাঁ.. চলুন চলুন। অারে মিস নীরা, অাপনি অত বড় হাঁ করেছেন কেনো?? ব্রিদিং প্রবলেম হচ্ছে?? দেখবো অামি????

নীরা কিছু না বলে, রোবটের মত হেটে এগিয়ে এলো।

হারুন অাবার এসেছে। 
——স্যার, গাড়ির চাবিটা। 
——গুড। মি. জাকিরকে বলুন, অামি অাসার অাগ পর্যন্ত কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ নয়।

লাবণী গাড়িতে বসেই বোরকাটা খুলে নিয়ে বলল, 
——-অাপনি অত বড় অফিসার বুঝতেই পারিনি। গুলি… বন্দুক… 
অাচ্ছা, অামরা যে এখানে এসেছি খবরটা কি করে পেলেন বলুন তো?? 
——–অামাদের দু-জন ওয়াচম্যান মিস নীরাকে ফলো করছেন কদিন যাবৎ!! ডাউটিং কিছু বুঝতে পেরেছিলো বলে, অামি অবশ্য অাগেই অান্দাজ করেছিলাম, এমন কিছু ঘটতেই পারে! এটা অনেক কমপ্লিকেটেড একটা কেইস।সব ইনফরমেশন অাগে পেয়ে যাই তারপর বলবো।

নীরা চোখ বন্ধ করে বসে অাছে। 
লাবণী নীরার হাতটা ধরে ঝাঁকি দিলো। 
——এমন দুম মেরে অাছো কেনো??? কি হয়েছে??? শকড??? 
নীরা জবাব দিলো না। তাঁর কথা বলতে ভালো লাগছে না। 
তামিম হাসলো…..

গাড়ি থেকে নেমে নীরা একমুহূর্তও দাঁড়ালো না। খুব দ্রুত ভেতরে চলে গেলো। লাবণী সৌজন্য হেসে বলল, 
——অাপনি চলুন না ভেতরে। এক কাপ চা খেয়ে যাবেন।

——-মি. শফিক কি বাড়িতে অাছেন?? উনি থাকলে কথা বলে অাসতাম।

লাবণী মুখ গোমড়া করে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। এ তো দেখি মহাঝামেলায় পড়া গেলো বাবা। শফিকের কাছে যাওয়া প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ের গল্প শোনা। 
——-কোনো সমস্যা??
——- না না শফিক বাড়িতেই অাছে, অাসুন না; অাসুন। 
অাসলে, অামার দেওর খুবই ভালো ছেলে, মাঝে মাঝে একটু কথাবার্তায়…. 
——-অাপনি এত কেনো হেজিটেট করছেন?? 
——-অাসলে ও’র উপর দিয়ে একটা চরম ধরনের মানসিক ঝর গেছে। একটু নরমাল ট্র্যাক থেকে ওর মেন্টাল স্টেবিলিটিটা সরে গেছে… 
শফিক খুব ভালো ছাত্র ছিলো। 
এটুকু বলতেই যেনো লাবণীর গলা ধরে এলো…. সে একটু থামলো। গলা ঝেড়ে নিলো।
——একটা মানুষকে ও ভালোবেসে হাত ধরেছিলো, সেই মানুষটা মাঝপথে ও’র হাত ছেড়ে দিয়েছে, শুধু হাত ছাড়লেই কথা ছিলো না, প্রচন্ড অপমানের সাথে ছু্ড়ে ফেলে দিয়েছে, এজন্য শফিকের কিচ্ছু ঠিক নেই, এলোমেলো সব……
——-উনি একসময় সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে যাবেন, এত ঠিক হবেন যে অাশেপাশের সবাই চমকে যাবে।ডোন্ট ওরি..

লাবণী অাশান্বিত চোখে তামিমের দিকে তাঁকালো। তাঁর চোখ বলছে, 
“অামরা অনেক দিন যাবৎ ভালো নেই”।

——-ইনশাঅাল্লাহ, সব ঠিক হয়ে যাবে!

লাবণী হাসার চেষ্টা করলো।

তামিমকে ভেতরে অাসতে দেখেই নীরা চাপা স্বরে লাবণীকে ইশারায় বলল, এনেছো কেনো বাড়িতে?? যত্তসব….

বসার ঘরের তুলকালাম অবস্থা। শফিকের বই চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।সকালের নাশতার প্লেটটা পর্যন্ত 
সরানো হয়নি।
এর মাঝে শফিক ফ্লোরে শুয়ে, পড়ছে।

তামিমকে দেখে শফিক হাত নেড়ে শুধু হাই বলল, কিন্তু শোয়া থেকে উঠলো না। 
——কি ব্যাপার?? ভালো অাছেন?? খুব জমিয়ে পড়াশোনা হচ্ছে???

——হুঁ। কিন্তু এখন তো কথা বলতে পারবো না। পড়ছি।

——না না! ইটস ও’কে.. অামি চা খেতে এসেছি। 
নীরা উপরের ঘরের দিকেই যাচ্ছিলো। 
তামিম পিছু ডাঁকলো।

——মিস নীরা, অামাকে কি দয়া করে অন্য কোন জায়গায় বসতে দেবেন, এখন এখানে বসলে উনার পড়াশোনার ডিস্টার্ব হবে। 
শফিক সুর মেলালো তামিমের সাথে, 
——-উপরের বারান্দায় নিয়ে যা….না নীরা। ক্রাউড হলে অামার এটেনশান ক্রাশ করে যায়… প্লিজজজ…

নীরা কড়া একটা কথা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলালো। 
প্রচন্ড অনিচ্ছায় নীরা একপেশে সুরে বলল
——চলুন, 
——অাপনি এর মধ্যে চেঞ্জও করে নিয়েছেন?? বাহ্ দুমিনিটেই। 
নীরা জবাব না দিয়ে মনে মনে একটা ভয়াবহ গালি দিলো তামিমকে!
——অাপনাদের বাড়িটা তো বেশ গুছানো?? কে গুছায়?? 
নীরা মনে মনে বলল, 
——“তোর ****গুছায়রে শালা”

সি্ড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে তামিমের মনে হলো, এই বাড়িটা অন্যরকম শান্তিময়।
তামিম নীরার পেছন পেছন প্রায় কাঁধ ঘে্ষে হাটছিলো….. কি মিষ্টি ঘ্রাণ। সে বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিলো।
——অাপনাদের বাড়িতে অার কেউ নেই, ?? দেখছি না তো… 
——উহুঁ. বাবা মা গ্রামে গেছেন.( নীরা পেছনে তাঁকালো) এইঁ দূরে…. দূরে…সড়ে হাটুন। সরে…. এরকম পাশে কেনো?? অারো দূরে…

তামিম দূরে যাবার ভঙ্গি করলো, এবং যথারীতি নীরার পাশেই হাটতে থাকলো…
——নিন এখানে বসুন।চা অাসছে…. 
——অামি কি একা বসে থাঁকবো??? 
অাপনিও বসুন। 
——-অামি বসবো না। 
চা এলে, খেয়ে বিদেয় হোন। 
——-অাপনি এত রেগে অাছেন কেনো??? এরকম অাচরণ কেনো করছেন?
নীরা জবাব দিলো না। চেয়ারটা টেনে এগিয়ে দিলো।
——একা বসে থাকার জন্য এসেছি অামি?? এমন করার মানে কি???
——কেনো করছি, বুঝতে পারছেন না?? ওখানে অাপনি কাজটা কি করলেন?? হুঁ… কি করলেন???? এত সাহস কোথায় পেলেন?? এটা কোনো ভদ্র মানুষ করতে পারে??? 
——অামি অাবার কি করলাম??? 
—–কি করলাম?? সারা দুনিয়াকে দেখিয়ে চুমু খাওয়া হয়েছে. এখন বলছেন কি করেছেন??। পুরো জায়গাটা সিসিটিভি মনিটর করা। সব হয়তো রেকর্ড হয়ে অাছে।
দুদিন পর অামি যখন নায়িকা হবো, এরকম সিন টিন কিছু লিক হয়ে গেলে…. ক্যারিয়ার শেষ!

নীরা একটু এগিয়ে গিয়ে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ালো।তাঁর রাগী কণ্ঠে যেনো খাপছাড়া ভাব।

——তাঁর মানে অাপনি বলতে চাইছেন, যে জায়গায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা নেই, সেখানে কাজটা করার দরকার ছিলো, এরকম জায়গায়। রেকর্ড হওয়ার কোনো ঝামেলাই থাকতো না।

তামিম এগিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে নীরার পেছনে দাঁড়ালো। নীরা সেটা টের পেলোনা।

——-মোটেও না। অামাকে চুমু খাবার দরকারটা কি অাপনার??? এত চুমু খাওয়ার শখ কেনো?? লজ্জাশরম বলে তো….

এবং নীরা পেছনে ফিরবার অাগেই তামিম তাঁকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নীরার ঘাড়ের কাছে গালের পাশটায় লম্বা একটা চুমু খেয়ে নিলো।

নীরা “ও মাগো” বলে সজোরে চিৎকার দিলো। ততক্ষণে
তামিম খুব স্বাভাবিক ভাবেই দ্রুত চেয়ারে বসে পরেছে।

্চিৎকার শুনে লাবণী ছুটে এসেছে, 
——-কি হয়েছে নীরা??? কি???

——অামিও তো কিছু বুঝতে পারছি না, উনি অামার সাথে কথা বলছিলেন, হঠাৎ করেই চিৎকার দিয়ে উঠলেন.. মিস নীরা কি হয়েছে বলুন তো?? 
লাবনী নীরার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। নীরা দু-গালে দু-হাত চেঁপে মুখ হা্ করে চোখ বড় বড় করে তাঁকিয়ে অাছে…. তাঁর চোখের মণিগুলো যেনো এখনি খুলে বেরিয়ে অাসবে।
——কি হয়েছে বলো??? নীরা কথা বলো…. 
লাবণী নীরার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিলো। 
তামিম চিন্তিতভঙ্গিতে বলল, 
——অাসলে একটু অাগের ঘটনাটার সারপ্রাইজটা এখনো রয়ে গেছে, বুঝলেন মিসেস লাবণী।

লাবণী পানির গ্লাসটা নীরার দিকে এগিয়ে দিলো। 
——পানি খাও নীরা। এত ভয় পেলে হয়?? বসো, এখানে এসে বসো…..গুন্ডাদের তো উনি ধরেই ফেলেছেন। এখন ভয় কিসের??? তুমি না সাহসী মেয়ে। তাছাড়া তামিম সাহেব তো অামাদের পাশে অাছেনই, তাই না ভাই??? 
তামিম মাথা নেড়ে কাঁচুমাঁচু ভাবে সায় দিলো। 
—–জি. জি….
——পানিটা খাও নীরা। এমন দু-গাল চেপে ধরে অাছো কেনো?? গালে কি??? দাঁতব্যাথা তোমার?

শফিক এসে অত্যন্ত বিরক্ত গলায় বলল, 
——চিৎকার কে করেছে?? নীরা?? 
লাবণী মাথা নাড়লো। 
——উফ্ ভাবী, বুঝাও ওকে, এভাবে যাতে চিৎকার না দেয়। ডিস্টার্ব হয় অামার!
এ বাড়িতে শান্তিতে পড়াশোনারও জোঁ নেই।

শফিক চলে গেলো।
নীরা দু-হাতে দু-গাল শক্ত করে চেপে অাছে।তাঁর সমস্ত শরীর কাঁপছে।

——তোমার কি দাঁতব্যাথা নীরা?? গরম পানি দিয়ে কুলকুচি করবে?? কি হলো?? 
নীরা কিছু না বলে লাবণীর দিকে রক্তচক্ষু করে তাঁকালো। 
—–অামার কি দাঁতে পোকা যে ব্যাথা করবে??? 
——এত রাগ করছো কেনো?? তোমার হাবভাব দেখে বললাম।

তামিম হেসে বলল,
——অাপনি বরং চা নিয়ে অাসুন ভাবী।মিস নীরা, একটু নিজেকে সামলে নিক। সাডেন হিট ত..
লাবণী ব্যস্ত গলায় বলল, 
——-চা নয়, ভাই। অাপনি লাঞ্চ করে যাবেন। অামি ভাত দিচ্ছি টেবিলে। 
দরজা অবধি গিয়ে লাবণী ফিরে তাঁকালো, 
——তামিম ভাই, ধন্যবাদ, ভাবী বলার জন্য! 
——ইটস মাই প্লেজার ভাবী। 
লাবণী চলে যেতেই নীরা উঠে দাঁড়ালো। 
এবং সামনের টেবিলটায় পা দিয়ে একটা লাথি মারলো। 
——অাপনি চলে যাচ্ছেন?? অামি কি একা বসবো নাকি??? বাড়িতে গেস্ট এলে এমন করেন বুঝি অাপনারা?? 
নীরা শক্ত গলায় বলল, 
——অামি অাপনাকে দেখে নিবো।ছাড়বো না।
অাপনার সব কিছু অামি পাব্লিককে জানিয়ে দিবো।কেইস করবো অাপনার উপর…অাপনাকে জেল খাটিয়ে ছাড়বো….. অাপনি তো চেনেন না অামাকে…

তামিম উঠে দাঁড়ালো, নীরার মুখোমুখি এসে বলল, 
——-মিস নীরা, অাপনি এভাবে দু-গালে হাত চেঁপে না রেখে বরং, একটা হ্যালমেট পড়ে অাসুন। তাহলে অামার চুমুর হাত থেকে বেঁচে যাবেন। কেইস ও করতে হবে না।স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবেন।

নীরা অার একমুহূর্তও দাঁড়ালো না, যাবার সময় প্রথমে সামনে রাখা টেবিলে বারি খেলো, পরে গিয়ে দরজার ফ্রেমে বারি খেলো, এবং সবশেষে ঘরের ভেতরে কিছু একটায় হোচট খেয়ে দড়াম করে পড়ে গেলো। 
তামিম অার ওদিকে গেলোনা। বারান্দার রেলিং এ ধরে অাকাশের দিকে তাঁকালো। কি ঝকঝকে রোদ উঠেছে!! এত সুন্দর অাকাশ কেনো অাজ??

???
রাতে ডিনারের সময় তামিম এনাউন্সের মত করে বলল, 
——মা, অাজ অামরা তিন ভাই-বোন একসাথে ডিনারে বসবো। তুমি অার বাবা অালাদা! 
সেলিনা বিস্মিত চোখে ছেলের দিকে তাঁকালেন।
——কেনো বলতো?? 
——অামাদের কথা অাছে। তুমি বরং বাবাকে নিয়ে টাইম স্পেন্ড করো।

তামিমের বাবা মেজবাউর রহমান ছেলের দিকে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন, 
——মাই ডিয়ার সান, তোমার মা নামক বস্তুটার সাথে অামি একসাথে খেতে পারবো না।অাই কুইট দ্যা ডিনার!

——কেনো খেতে পারবেনা বাবা?? এতদিন পর তোমরা একসাথে ডিনারে, তোমাদের তো সেলিব্রেট করবার কথা!!? 
——সেটা তোমার মাকে বলো, অামি এসে অবধি তোমার মায়ের কাছ থেকে এক কাপ চা পাইনি। 
সেলিনা চমকে যাওয়ার মত মুখভঙ্গি করে বললেন, 
——চা পাওনি মানে?? দু-বার চা দিয়েছি। কি মিথ্যুক তুমি! 
——যেটা পাঠিয়েছো, সেটা র-চা। অামি যে র-চা খাইনা এটা কি তোমায় দলিল করে লিখে দিতে হবে?? ডু ইউ নিড এনি রাইটিং ডকুমেন্ট?? বলো, অামি লিখে দিচ্ছি। গিভ মি দ্যা পেপার। 
——দুধ চা তো অামি তোমায় দিবো না। একদম না, তুই তো জানিস না তামিম, দুধ চা খেলে, তোর বাবার পেটে গ্যাস হয়। সারারাত সে গ্যাস নির্গত করে।”পেটের গ্যাস” কোম্পানি লিমিটেড। তোরা তো অার তোদের বাবার সাথে ঘুমোস না! অামাকে ঘুমোতে হয়,, অামি বুঝি। সেই গ্যাস নিঃসরণও নিশব্দে নয়, ককটেল বিস্ফোরণের মত অাওয়াজ করে, অামি যে কতবার ভয়ে চমকে উঠি জানিস?? 
ইতু হেসে ফেললো। 
মেজবাউর সাহেব কর্কশ গলায় বললেন, 
——-শাট ইওর মাউথ! ল্যাংগুয়েজ…সেলু… 
রিতু পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বলল, 
——-বাবা তোমার কাছে থেকে ক’দিন দূরে থেকে কেমন শুকিয়ে গেছে দেখেছো মা??
সেলিনা জবাব দিলেন না। 
মেজবাউর সাহেব গলা খাঁকড়ি দিয়ে বললেন,

——অামার খাবারটা রুমে পাঠিয়ে দেয়া হোক। অামার সাথে কাউকে খেতে হবেনা।

সেলিনা এরচেয়ে দ্বিগুণ রাগান্বিত হয়ে বললেন,
——অামি কখন বললাম যে, অামি তোমার সাথে খাবো?? তোমার ওই বিচ্ছিরি অাঙুল চোষা দেখলে অামার পেট গোলায়। ছিঃ….

——ইউ স্টপ, দুষ্টু মহিলা। তুমি যে সব তরকারি একত্রে মাখিয়ে একটা কি পদার্থ তৈরি করে খাও না, সেই পদার্থটা দেখতে কিরকম হয় জানো??? সেটা দেখতে হয়, একদম… 
রিতু বাবার মুখের কথাটা কেড়ে নিলো, 
——সেটা দেখতে একদম অানারসের ভর্তার মত হয়… তাই না বাবা??

মেজবাউর সাহেব নিজের রাগ সামলালেন। 
——বাবা, অামরা দুই বোনে অার ভাইয়া মিলে একটু অালোচনা করবো, সিক্রেট টাইপ। এজন্য অামরা অালাদা বসতে চাচ্ছি। 
সেলিনা চট করে স্বামীর পক্ষে চলে গেলেন, 
——দেখেছো, এই হলো অামাদের ছেলেমেয়ে ; অালোচনাতেই অামাদের রাখতে চায় না। অার বুড়ো বয়সে এরা ভাত দেবে বলছো??? 
মেজবাউর সাহেব বিরস মুখে বললেন,
——সেলিনা, চলো অামরা দুজনে বরং অাজ ছা্দে ডিনার করি! খাবার রেডী করো। 
সেলিনা স্বামীর অাবদারে মহাউৎসাহ পেলেন।তিনি অত্যন্ত ব্যস্তভঙ্গিতে ছাঁদের দিকে রওনা হলেন। টেবিল পাতা অাছে কিনা কে জানে???

???
অামরা অাজ ইতুর রাগ ভাঙানো দিয়ে শুরু করি, কি বলিস????
—–এই যে মহামান্য তাসনিম রহমান ইতু, এটা অাপনার জন্য। তামিমের হাতে সুন্দর একসেট চুড়ি। 
ইতু মহানন্দে কিছুক্ষণ তাঁকিয়েই রইলো। 
——তুই কিভাবে জানলি?? এটা যে চাই অামি… 
——রিতু বলেছে…

ইতু তামিমকে জড়িয়ে ধরতে চাইলো, 
তামিম কড়া গলায় বলল, 
——নো, নো, তোর মেকঅাপে অামার টি-শার্ট মেখে যাবে। 
ইতু তাও ধরলো। 
——থ্যাংক ইউ ভাইয়া।
রিতুই ডিনার সার্ভ করলো। 
——-এবার বল ভাইয়া, তোর প্রেমের খবর কি?? 
——বিশেষ কোনো খবর নেই, চেষ্টাচরিত চলছে দেখা যাক! মেয়েটার মেজাজটা না ফ্লাকচুয়েটিং মুডে থাকে… সো ট্রায়িং।
ইতু হাত তুলে বলল, 
——-অামার কিন্তু হয়ে গেছে ভাইয়া। ও’ ফিল্ম এন্ড টেলিভিশনে পড়ছে ; জগন্নাথে! 
বলেই লজ্জা লজ্জা মুখ করে তাঁকালো। 
তামিম ও রিতু কারোরই তাঁতে কোনো এক্সট্রা এক্সপ্রেশন পাওয়া গেলো না। 
ইতু অাবারও বলল, 
——-অনেক হ্যান্ডসাম। ডাকনাম ‘জিজ’! কুল না ভাইয়া??/ 
রিতু হাসলো। 
——-এবার তোরটা বল রিতু। 
রিতু উদাস গলায় বলল, 
—–ওসব অামার -লাস্টিং করে না।মেক্সিমাম, এক সপ্তাহেই ব্রেকঅাপ হয়ে যায়!

ইতু অবাক হয়ে বলল, 
——বলিস কি??কেনো, কেনো??

——এই যে একটু পরপর পিক দাও, পিক দাও, বলে ঘ্যাঁনঘ্যানঁ করে না, অসহ্য! রাত দুটায় উঠে মেসেজ করবে, একটু কল দাও সোনা; ন্যাঁকার হাড্ডি সবগুলা।সোনা,তুমি কি একটা নীল জামা পরে অাসবা..?? কেনোরে তোর বাপের জন্মে দেখিস নাই নীল জামা!!ডিসগাস্টিং

—–এটা তো ফিলিংস। ভালোবাসা। বুঝলি না। 
——-ফিলিংস বলে ঘুম ভাঙিয়ে কথা বলতে হবে?? ভালোবাসায় কি নীল জামা কোনো কিছু মেটার করে??
অার মোস্ট ইম্পর্টেন্ট থিং, রোমান্টিক কথা বললে অামার পেট ব্যাথা করে।

তামিম সশব্দে হেসে উঠলো। 
——হাসার মত তো কিছু বলিনি ভাইয়া। ডোন্ট লাফ। ইট ইজ দ্য মেটার। 
তবে হ্যাঁ যখন হৃদয়কাঁপানো রিয়েল প্রেম হবে অামার, তখন অামি শিওর এমন হবে না। এখন যেগুলা হচ্ছে, ওগুলা প্যাঁকপ্যাঁক টাইপ…..

তামিম উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
——-কি করে বুঝবি যে তোর হৃদয়কাঁপানো প্রেম হয়েছে???

রিতু খাওয়া বন্ধ করে একটু অাগ্রহী হয়ে বসলো, 
——সাচ এস, তোর যখন প্রেমটা হবে, তোর মনে হবে অামি তাঁকে সারাক্ষণ খুশি রাখতে চাই। সে যদি মন খারাপ করে থাকে, একশ মাইল দূরে থাকলেও; তোরও মন খারাপ হয়ে থাকবে। তাঁর দিকে তাঁকানো মাত্র তোর কান গরম হয়ে যাবে, হাত পা শিরশির করবে। ইচ্ছে করবে তাঁকে কা্ধে করে অাকাশে উড়ে যেতে। 
সে তোকে বকা দিলেও ভালো লাগবে।ইচ্ছে করবে তাঁকে নিয়ে এভারেস্টে বসে চা খেতে। সে ব্যাথা পেলে, তোর কষ্ট….
ঘন শীতের রাতে তাঁকে কফি করে দিতে তোর একটুও অলস লাগবে না তখন….

তামিম ভাতের পাতে পানি ঢেলে উঠে দাঁড়ালো। অার খাওয়া যাবে না। বুকে ভাত অাটকে অাসছে। নীরার কথা মনে পড়ছে।
নীরা বকার সময় তাঁর খুব ভালো লেগেছে! নীরাকে দেখলে তামিমের কান, না না, পুরো শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তবে কি তা্র হৃদয়কাঁপানো প্রেমটা হয়ে গেছে?? তামিম বিড়বিড় করে বলল,
“”অাই এম ফিনিশড”

রিতু পিছু ডাকছে, 
——কি হলো?? খাবি না ভাইয়া??? কি হলো??? চলে যাচ্ছিস কেনো???
তামিম সেটা শুনতে পেলো না…..

রাতে খাবার পর মেজবাউর সাহেব মদ্যপান করার সব ব্যবস্থা করে নিয়ে ছেলেকে ডেকে পাঠালেন। অাজ তাঁর মনটা বেশ ফুরফুরে। অনেকদিন পর পরিবারের সাথে একটা গেট টুগেদার হলো। মেজবাউর সাহেব ছেলের জন্য অপেক্ষা করে নিজেই দুটো গ্লাসে পেগ রেডী করলেন।

অাজ ছেলেকে তিনি একটা ধন্যবাদ দিবেন। ছেলেটা এত চ্যালেঞ্জিং একটা পেশায় জব করছে। সবমহল থেকে তিনি প্রশংসা পাচ্ছেন।
ছেলের জন্য তিনি একটা গিফট ও রেখেছেন।তামিমের একটা বড় ছবি তিনি বাঁধিয়ে এনেছেন। ছবিতে অাট বছর বয়সের তামিম 
একটি কবুতর হাতে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। কান্নার কারণ, কবুতরটির একটি ডানা ভেঙ্গে গেছে। ছবিটার দিকে তাকালেই মন কেমন হাঁ হুতাশ করতে শুরু করে। শ্রাবণের সন্ধ্যাগুলোতে কালো মেঘের অাকাশের দিকে তাঁকালে যেমন বুকের ভিতর শাঁ শাঁ করে; তেমন একটা অনুভূতি হয়।

ছবির
ফ্রেমটা করেছেন তিনি পুরোটাই প্লাটিনামে। মাঝে মাঝে হীরে বসিয়ে ডেকোরেট করা হয়েছে।
ছবির উপরে যে কাচটা ব্যবহার করেছেন তারও একটা বিশেষ গুণ অাছে, একেক ধরনের অালোতে ছবিটা একেক রকম দেখায়।

ছোটবেলায় তামিমের মন ছিলো ভীষণ নরম। সে যে গুলি চালানোর মত কাজ করতে পারবে এটা ধারণার বাইরে ছিলো।অথচ বড় হয়ে সে জয়েন করলো এনএস অাইতে। তাও ইন্টারনাল সিকিউরিটি উইংয়ে।
এই অল্প বয়সে ছেলেটা কত সাহসী ভূমিকা পালন করছে ভাবা যায়?? অথচ এই চাকরি নিয়ে প্রথমে তিনি ছেলের উপর নারাজ ছিলেন। তামিম ঘরে এসে নিঃশব্দে চেয়ার টেনে বসলো।তাঁর হাতে একটা সবুজ ফাইল। 
মেজবাউর সাহেব হেসে বললেন, 
——-হ্যালো ডিয়ার সান, টেইক ইট।ইট’স এ নিউ কালেকশন.. অাই ওপেনড ইট যাস্ট নাউ।
তামিম খুবই অাগ্রহের সাথে হাত বাড়িয়ে ড্রিংকের গ্লাসটা নিলো। 
মেজবাউর সাহেব জানেন, তামিম তা থেকে এক চুমুকও নিবে না। প্রতিবারই তামিমকে যখনই তিনি কথা বলতে ডাঁকেন, তিনি এরকম একটা ড্রিংক অফার করেন। তামিম অালোচনার শুরু থেকে শেষ অবধি সেই ড্রিংকের গ্লাস হাতে নিয়ে বসে থাকে। অালোচনার শেষে চলে যাবার সময় হাসিমুখে বলে, 
——বাবা, এটা তোমার জন্য! 
মেজবাউর সাহেবের মন তখন বিশাল অানন্দে ভরে যায়।

তামিম গ্লাসটা হাতে নিয়ে নাকে শুঁকলো।
——স্মেলস কোয়াইট ডিফারেন্ট। এটার নাম কি বাবা?? 
—— ম্যাকালান সিঙ্গল মল্ট! হুইস্কি…
এটার অাসল বিশেষত্ব কিন্তু এর বোতল। লুক এট,
বোতলের ঢাকনাটি পিওর ক্রিস্টালে তৈরি।বটম ফ্রেমটা পিওর গোল্ড।
সিক্সটি ইয়ারস ওল্ড! 
অার এর টেস্ট নিয়ে তো কথাই নেই। বলা হয় যে, এর স্বাদ এমন , এক চুমুকেই তুমি এটিকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে।

——একটা চুমুক দিয়েই ফেলি তাহলে… .. কি বলো??
——ওহ! শিওর.. শিওর…মাই সান।
তামিম গ্লাসে চুমুক দিলোনা।শুধু ডানহাত বদলে বা-হাতে গ্লাসটা নিলো।
——–এটা কি?? 
——ইট ইজ এ গিফট ফর ইউ। উহু.. এখন খুলবেনা। ওয়েট…..

তামিম মিষ্টি করে বাচ্চাদের মত হাসলো। মেজবাউর সাহেব ছেলের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাঁকালেন, হাসলে তামিমকে দেখতে অপূর্ব লাগে, উপরের ঠোটের বা-দিকটা একটু করে অাপনাঅাপনি উপরে উঠে যায়! মুখটা তখন দেখায় একটু করে পাপড়ি খুলে যাওয়া হেলেন ফ্লাওয়ারের মত। কিন্তু ছেলেটা একেবারেই কম হাসে। মেজবাউর সাহেব মনে মনে বললেন, “গড ব্লেস মাই সান”। 
——পেপারে দেখলাম ছবি এসেছে তোমার! তাও অাবার প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ের সাথে, কফি খাচ্ছো। গসিপ অাকারে লিখা। 
তামিম এই কথারও জবাব না দিয়ে হাসলো। 
মেজবাউর সাহেবের গ্লাস খালি হয়ে গেছে। তিনি বোতল থেকে অারেকটু মদ ঢেলে নিলেন। 
——গসিপ হলেও লেখাটা ভালো লেগেছে অামার। কোয়াইট নাইস কাপল ইউ অার। 
——সেরকম কিছু একদমই নয় বাবা।এক্সেজারেট নিউজ!
——কেনো নয়??? তুমি কি হেজিটেশনে অাছো??? তোমার বাবার যতটুকু অাছে। তা দিয়ে….এরকম একটা মেয়েকে বিয়ে করাটা….. 
——বাবা টাকাপয়সার ব্যাপার কিন্তু নয়। অামি এরকম ভাবতেই পারি না। ইট ইজ অাউট অফ মাই থিংকি।
——-তোমার পেশাটা কিন্তু ভালো। সব বড় বড় মানুষের সাথে কাজ করছো, এভরিডে, ইউ গেট এ নিউ স্টার্ট।পকেটে বন্দুক, অাবার প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ের সাথে সময় কাটাচ্ছো… কোনোদিন হয়তো…. 
—–বাবা, নিউ স্টার্ট পাচ্ছি সেটা ঠিক অাছে।কিন্তু অার কিছু নয়…….
——-না হলেই ভালো।মাই ডিয়ার চাইল্ড, বিয়ে করে একটা মেয়েকে জীবনে জড়ানো মানে জীবনটাকে একটা জ্বলন্ত চুলার সংস্পর্শে নিয়ে অাসা। যেটার তাপে তুমি সারাজীবন কষ্ট পাবে, কিন্তু একেবারে পুড়বে না।লাইক তোমার মা, সে যখন অামার লাইফে এলো তখন থেকেই অামার জীবনে নতুন কিছু অভ্যাস তৈরি হতে লাগলো যার কারণে অামার প্রতিভা গুলো কমতে থাকলো।

——-হঠাৎ বিয়ে নিয়ে কেনো কথা বাবা?? 
——তোমার মা হয়তো মেয়ে টেয়ে দেখছেন তোমার জন্য। তাই, বাট মাই সাজেশন ইজ “ডোন্ট মেরি “। বিয়ে হল,অাইনত, ধর্মমত, এবং সমাজ মত একটা পানিশমেন্টের পার্মানেন্ট ব্যবস্থা! সো স্কিপ দিস প্রোগ্রাম।

——-বাবা, তুমি বোধহয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছো। ভুলভাল বলছো।

—–মোটেও ভুলভাল বলছি না। তাহলে একটা ঘটনা শোন, তখন অামাদের নতুন বিয়ে হয়েছে, বিয়ের দু-মাস পর অামাদের প্রথম ঈদ। তোমার নানাজানের শরীর খারাপ। তোমার মা গিয়েছেন অসুস্থ বাবাকে সেবা করতে। পুরো ঈদ থেকে গোটা
দুইদিন, তুমি বুঝতে পারছো টোটাল টু ডেইজে সে অামাকে একটা ফোনও করেনি। অান্ডারস্ট্যান্ড?? হাউ ক্রয়েল হার্টেড সি ওয়াজ। অাই কুডন্ট ইভেন থিংক, একটা মানুষ সেটা কিভাবে পারলো?? অাই হেইট ইওর মাদার। 
——স্টপ বাবা। স্টপ। তোমার গলার স্বর কাঁপছে। অার খেয়ো না। প্লিজজজজজজ..

মেজবাউর সাহেব, হাসলেন। 
——কথাগুলো তোমার মাকে নিয়ে বলে তোমার এমন মনে হচ্ছে। অাই এম ওকে। কমপ্লিটলি ওকে।
বাট দ্য রিয়েলিটি ইজ, অল উইমেন অফ দিস ওয়ার্ল্ড অার সেইম।বি কেয়ারফুল মাই ডিয়ার সান। বি কেয়ারফুল… 
——-বাবা, তুমি মাকে পছন্দ করো না, সেটা কিন্তু ঠিক নয়। অাই হ্যাভ এ পার্সোনাল এক্সপ্লেনেশন! তোমার যখন মায়ের সাথে ঝগরা হয়, তুমি যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যাও তখন তুমি কিন্তু ইতুকে সাথে নিয়ে যাও;
রিতুকে নাও না। এর কারণটা হলো, ইতুর স্বভাব একদম মায়ের মত। হার এটিচিউড ইজ কোয়াইট সেইম লাইক মা। তুমি মা’কে মিস করবে বলেই ইতুকে সাথে নিয়ে যাও, তাইনা??

মেজবাউর সাহেব ছেলের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাঁকালেন।
—–মানে?? 
——ইয়েস বাবা, তুমি মায়ের স্বভাব গুলোকে ভালোবাসো।মা এরকম বোকা বোকা বলেই তুমি মুগ্ধ। 
মায়ের সব ইলোজিক্যাল জিনিসগুলোই তোমাকে ভালোবাসায় বেঁধে ফেলেছে। ইতুর মাঝে তুমি সেটা দেখতে পাও।সেই ছায়াটা তোমাকে টানে……

মেজবাউর সাহেব হাসলেন এবার।
——ইওর স্পিচ ইজ নাইস! 
——- অামার জীবনে কে অাসবে, এখনো অামি শিওর না বাবা। বাট অামি চাই, মনেপ্রাণে চাই অামি যাতে তাঁকে তোমার মত করে ভালোবাসতে পারি। দিনশেষে সেই যাতে হয় অামার অানন্দ!

তামিম উঠে দাঁড়ালো। হারুন ফোন করেছে। বাবার সামনে কথা বলা যাবেনা। 
——অারও কিছুক্ষণ বসো, তোমার এক্সপ্লেনেশন শুনতে ভালো লাগছে। সাউন্ডস ইন্টারেস্টিং!

তামিম সবুজ ফাইলটা বাবার দিকে বাড়িয়ে দিলো। 
——-এখানে তোমার অার মায়ের জন্য ইউরোপ ট্যূরের একটা এনিটাইম প্যাকেজ প্লান অাছে, যদি তুমি এটা নাও, অামি খুব খুশি হবো বাবা।

মেজবাউর সাহেব ছেলের হাত থেকে ফাইলটা নিলেন। 
——সারাজীবন তুমিই দিয়েছো বাবা। জবটা হবার পরও অামার পকেট মানি তুমিই দাও।অামার সেলারি থেকে তোমাদের কিছু দেওয়া হয়নি। অামি কি এখন অামার উপহারটা নিতে পারি?? 
মেজবাউর সাহেব ছেলের দিকে র্যাপিং পেপারে মোড়ানো ছবির ফ্রেমটা এগিয়ে দিলেন।এবং মনে মনে প্রার্থনা করলেন, হে করুণাময় অামার ছেলের যেনো অানন্দময় চমৎকার একটি জীবন হয়!!
তামিম ছবির প্যাকেটটা খুলে কিছুক্ষণ তাঁকিয়েই রইলো। 
অস্পষ্ট গলায় বলল, 
——এটা অামার খুব প্রিয় ছবি। অামার ড্রিংকটা তোমার জন্য! ধন্যবাদ বাবা।

তামিম দরজার কাছে গিয়ে দুষ্টুমিরকম হেসে বলল, 
——-প্যাকেজ প্লানটাতে ছোট্ট অারেকটু কথা অাছে বাবা, ইতু রিতুকেও এড করে দিয়েছি। নিয়ে যেও ওদের।

???

তামিমের ঘুম ভাঙলো ফোনের অাওয়াজে, তামিম ঘড়ি দেখলো। তিনটা একুশ। এতরাতে কে ফোন করতে পারে??? অপরিচিত নাম্বার। 
——-হ্যালো, 
——হ্যালো, মি. তামিম অামি নাফিসা বলছি। শুনতে পাচ্ছেন??? হ্যালো। 
——জি জি, শুনতে পাচ্ছি। বলুন, ম্যাম। 
এত রাতে?? এনি ইমার্জেন্সি?? 
——অামি অাপনার সেই রিলেটিভের সাথে মিট করতে চাই। এখনি….
—–এখনই??? 
——–ইয়েস মি. তামিম! অামাকে হুট করে চলে যেতে হচ্ছে।
সকাল সাড়ে অাটটায় অামার ফ্লাইট। 
তামিম থতমত খেয়ে গেলো… 
—–অাপনি হঠাৎ দেখা করবেন??? 
——অাপনার রিলেটিভ মি. শফিক সাহেব কিছুক্ষণ অাগে অামায় একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। সেটি পড়েই দেখা করতে ইচ্ছে করলো। অাপনি কি বার্তাটি শুনতে চান?? 
——জি না, মানে জি হ্যাঁ..
——-তিনি লিখেছেন, 
“সম্মানিত মহোদয়া, অামি অনেকদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলাম।অাপনি অামাকে পড়াশোনার ব্যাপারে সাহায্য করেছেন, অামার কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে সকল ধরনের ঝামেলা মিটিয়ে অামার পড়াশোনার পথকে সুগম করে দিয়েছেন। পড়াশোনা অামার জীবনে সহজভাবে ফিরে এসেছে বলে অামি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। অামার বিচ্ছিন্ন এলোমেলো জীবন, সুস্থ প্রবাহে এনে দেওয়ার জন্য অামি অাপনাকে একদিন ধন্যবাদ দিতে অাসবো!তবে সেদিন অামার সাথে অন্য কেউও অাসবে।অার অামি জানি তাঁকে দেখলে অাপনি ভীষণ খুশি হবেন!”

——হ্যালো, বুঝতে পেরেছেন তো মি. তামিম??? অামি কেনো দেখা করতে চাচ্ছি!
——-জি ম্যাডাম। বুঝতে পেরেছি। 
——-অাপনি কি একটু এরেঞ্জ করতে পারবেন?? অামি অাসলে একা যেতে চাই সেখানে, সিকিউরিটি টিম নিয়ে অাপনি বাইরে থাকবেন। 
——-ওকে ম্যাম, অামি এক্ষুণি অাসছি। 
—–অাচ্ছা, একটা ব্যুকে পাওয়া যাবে?? রজণীগন্ধা অার হলুদ গোলাপের ব্লেন্ড হলে ভালো হয়।
——অামি ম্যানেজ করছি ম্যাম।

——–থ্যাংকস ;রাখছি অামি। 
—–ইয়েস ম্যাম।

ফোন রেখেই তামিমের মনে হলো, নাফিসা ম্যামকে জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি এত তাড়াতাড়ি কেনো চলে যাচ্ছেন??উনার তো ডিসেম্বরে যাওয়ার কথা।

নাফিসা ফ্লাওয়ার ব্যুকেটা হাতে করে গাড়ি থেকে খুব সাবধানে নামলো। 
—–ম্যাম, অামি কি যাস্ট অাগে গিয়ে একটু ডেকে দিবো?? এত রাতে অাপনি নক করে যদি… 
——মি. তামিম, অাপনাকে অামি বলেছিলাম না, অামি অনেক ব্যাপারেই অাগে থেকে বলতে পারি, অাজও অামি অাগে থেকেই একটা জিনিস গেস করে এসেছি, অামার কেনো জানি মনে হচ্ছে, দরজা খুলবেন মি. শফিক। 
অাপনি কিন্তু অামার অনুমান পরীক্ষা করে নিতে পারেন……

নাফিসা সোজা গিয়ে দরজায় নক করলো।বেশিক্ষণ নক করতে হলোনা।নাফিসার অনুমান মিলে গেছে, 
দরজা খুলেছে শফিক, তাঁর একহাতে বই, অন্যহাতে চায়ের মগ! সে খালি গায়ে এবং একটি শর্টস পড়ে অাছে।
নাফিসা হাসিমুখে বলল, 
——হ্যালো, মি. শফিক! অামি নাফিসা….অাপনার সম্মানিত মহোদয়া! এটা অাপনার জন্য বলেই ব্যুকেটা এগিয়ে ধরলো!

শফিক অত্যন্ত বিব্রত হয়ে তাঁর পড়নের শর্টসের দিকে তাঁকালো, এবং হাতের চায়ের মগ ফেলে দিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে দৌড় দিলো… 
তামিম দরজার এপাশটা থেকে সরে এলো। গাড়িতে বসে থাকাই ভালো, হালকা শীত করছে বাইরে…….
অাচ্ছা, নীরা কি ঘুমোচ্ছে এখন?? তাঁরও কি এমন শীত শীত করছে???

জুস কর্নারের অাইডিয়াটা নীরার বেশ পছন্দ হয়েছে।অাজকাল এটা চলছেও খুব। কিছু উৎপটাং কাপল দুটো জুসের গ্লাস নিয়ে মুখোমুখি বসে মোবাইলে ফেসবুকিং করে।এই মোবাইল কাপলরা অাবার খুব হেলথ কনশাস হয়।কিছুক্ষণ গল্প করে
তারপর অাবার তারা জুস অর্ডার করে।
এটা যে, ভালোই চলবে সেটা নীরা শিওর।
শুধু বাজেটটা নিয়ে একটু খটকা অাছে।

——দেখো নীরা, এটা যদি একবার ক্লিক করে যায়, পেছন ফিরে অার তাঁকাতে হবে না।অামরা মোটামোটি সব ধরনের ফলের জুস রাখবো।অাপেল, কমলা, অানারস, ডালিম… 
লাবণী ধমক দিয়ে রনিকে থামালো। 
——ডাক্তারি পড়ে পড়ে এখন জুস বিশেষজ্ঞ হয়েছো??এতগুলো ফ্রুট জুস প্রিপারেশান এনেছো কোন অাক্কেলে??
ফল তো অার বললেই অাকাশ থেকে পরবেনা। তাজা ফল কিনতে হবে, স্টোর করে রাখতে ফ্রিজ লাগবে, এছারা ডেকোরেশন ছাড়া অাজকাল কিচ্ছু চলেনা। 
—–তো অামরা ডেকোরেশন করে নিবো। একটু রং চং, লাইটিং, অার দামী গ্লাসের সেট। দেখো লাবণী ভাবী, জায়গাটা অামরা বিনা সিকিউরিটিতে পাচ্ছি। ঢাকা শহরে বিগ এমাউন্টের সিকউরিটি ছাড়া কেউ একচুল জায়গা ও দেয় না লাবনী ভাবী।

——-রনি, তোমাকে কতবার বলেছি, হয় অামাকে ভাবী বলবে, নয় লাবণী বলবে। একইসাথে দুটো ডাকবেনা। 
রনি জিভ কাটলো। 
নীরা পুরো টাকাটা একবার মনে মনে অাবার হিসেব করলো।যা অাছে তাতে কি সম্ভব???

——কি হলো নীরা?? তোমার ভাবাভাবি কি শেষ হয়নি?? কিছু তো বলবে!!!

——তোমরা দুজনে বরং একটা কাজ করো ভাবী, কোন ফলের জুসে অামরা কত করে রেট নিতে পারি, একটা মেন্যূ করে ফেলো।অামার মিনিমাম রেটে নিবো।
——অামরা করবো মানে?? তুমি???
——অামি বেরোবো একটু, কয়েকজন ডিরেক্টর ডেকে পাঠিয়েছেন……. 
দেখা করে অাসি।কিছু হয় টয় কিনা….

নীরা উঠে দাঁড়ালো। জুস কর্নারটা হয়ে গেলে সে বাবাকে তাতে বসিয়ে দেবে। কর্মচারী ও রাখবে।শুধু ভালোয় ভালোয় কাজটা হয়ে গেলে হয়। 
সিড়ির কাছে গিয়ে নীরা দাঁড়ালো,
——-রনি ভাইয়া, অাপনি কি একটু এখানে অাসবেন, একটা বিশেষ কথা অাছে। 
রনি এগিয়ে গেলো। নীরা গলার স্বর নামিয়ে নিলো, 
——-এটা অাপনার জন্য একটা বিশেষ সুযোগ রনি ভাই, অাপনাকে এর মধ্যেই ভাবীকে মুগ্ধ করে ফেলতে হবে।অাপনার কাজের মধ্য দিয়ে জুনিয়র ভাবটা কাটিয়ে উঠার সুযোগ। (লাবণী সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে অাছে) নীরা গলার অাওয়াজ বাড়ালো এবার, 
——অামি অাপাতত অাপনাকে পঞ্চাশ হাজার দিচ্ছি রনি ভাই, এর মধ্যে অাপনি যা কিনতে পারেন; ভাবীকে সাথে নিয়ে কিনে ফেলুন। বাবা অাসলেই বাকি টাকাটা পাবেন।

???
ব্রেকফাস্ট টেবিলে ইতু গম্ভীর মুখে বলল,
——ভাইয়া, অামরা কয়েক বন্ধু মিলে একটা ক্যাম্পেইন ট্রিপের অায়োজন করেছি। স্কুলের পরে সবাই যাচ্ছি। অামি যদি অাজ একটু রাত করে ফিরি…. মানে ধর অাটটা-নটার মধ্যেই! তুই একটু মাকে বলনা। 
——কোথায় যাচ্ছিস??? 
——ঢাকার ভেতরেই। প্লিজ ভাইয়া! প্লিজ……
——-অাচ্ছা ঠিক অাছে। ডান।

ইতু মহানন্দে নাশতা অর্ধেক ফেলেই উঠে গেলো। 
রিতু বিরক্ত কণ্ঠে বলল, 
—— তোকে বলল, অার তুই অমনি পারমিশন দিয়ে দিলি ভাইয়া!?? এটা কিছু হলো?? 
ও কত বোকা জানিস! 
——ক্যাম্পেইন ট্রিপে যাচ্ছে , একা তো অার না।
——–তারপরও, ও’র কোনো ব্যালেন্স নেই।ইদানীং ও কি হারে টাকা খরচ করছে। তুই ও দিচ্ছিস, বাবাও.. 
——এই বয়সে একটু খরচ করেই। সেটা সমস্যা না।
অাচ্ছা এখন দেখতো, রিতু অামায় কেমন দেখাচ্ছে??? 
রিতু কৌতূহলী চোখে বলল, 
——মিট করতে যাচ্ছিস নাকি?? 
——হুঁ। 
——-তোর ডিউটি নেই?? 
——-অাছে, প্রাইম মিনিস্টারের সাথে বিকেলে শরীয়তপুর যাবো, অারও ট্যূর অাছে।দুদিন পর ঢাকায় ফিরবো। ভাবলাম প্রেয়সীর মুখদর্শন করে যাই…. 
রিতু হাসলো। 
——খুবই সাধারন মেয়ে জানিস, কিন্তু সবার মাঝ থেকে না ফট করে অালাদা করে ফেলা যায়! কি রকম অালাদা একটা কাঠিন্য মুখে তাও কোমল দেখায়. অামি তো যখনই দেখি তখনই…
——সে তো তোঁকেও হ্যান্ডসাম দেখতে, এই যেমন তুই যখন গগল পড়ে ছবি টবি অাপ্লোড করিস, অামার কিছু বান্ধবী তো মরে যাই মরে যাই করে! এই যেমন ধর এখন, তোঁকে গ্রীক পুরানের রাজপুত্রের মত লাগছে। 
——-তারপরও, ও অামার থেকেও বিশেষ। ন্যাচরাল।তাঁকালেই অামি না কিরকম একটা ঘোরে চলে যাই, পৃথিবীর বাইরে।

——-বিয়ে করে নিয়ে অায় না, অামরাও দেখি! অাচ্ছা, কি করে বলতো?? 
——-মডেলিং! টুকটাক.. স্ট্রাগলিং করে যাচ্ছে। তুই দেখেছিস তাঁকে!

——-সত্যি?? 
——-হুঁ! কিছুদিন অাগেই ছবি এসেছিলো পেপারে।

——অার পড়াশোনা?? 
——-পড়ে না। ইন্টারমিডিয়েটেই থেমে অাছে.. .. 
——-বলিস কিরে??তোর মত বিদ্যাসাগরের হবুপত্নী বিদ্যা অর্জনে বিমুখ! 
তামিম হাসলো।
——-অনেক ঝর ঝাপটার মাঝে বেঁচে থাকা সুন্দর একটা পাখি।নিজের সব ধরনের ভঙ্গুর,অবস্থানেও মাথা উঁচু করে কথা বলে।নিজের ঝামেলা ভর্তি জীবন নিয়েও সন্তুষ্ট! ব্রেভ গার্ল!

——- অামাদের কথা বলে দিস নিতো ভাইয়া?? অামরা কিন্তু দু-বোনে প্রথম দেখায় মজা করবো অনেক।কে রিতু অার কে ইতু চিনবেই না।
——ও’কে নিয়ে মজা হবে না, দেখা যাবে অাগে থেকেই জেনে বসে অাছে যে, তোরা টুইন।ওকে তো হাসতে অামি দেখিইনি। ফান টান বুঝে কিনা সন্দেহ অাছে।

রিতু গোমরামুখো হয়ে তাঁকালো।
তামিম শার্টের হাতা ফোল্ড করে নিচ্ছে। 
——তোঁকে দারুণ লাগছে, ভাইয়া। হঠাৎ এমন রেড পড়লি, তাই গার্নিশড লাগছে। বেস্ট অফ লাক….

তামিম গ্লাসে পানি ঢেলে মুখের কাছে নিয়ে একমুহূর্ত থামলো, 
——–ও’র কি অামাকে কখনো পছন্দ হবে?? একদমই বিরক্ত অামার উপর..
রিতু তামিমের দিকে হাসি হাসি মুখে তাঁকিয়ে রইলো। তাঁর ইন্টিলিজেন্ট হ্যান্ডসাম ভাইটি অসহায় ফিল করছে খুব।তাঁর চোখ মুখ বোকার মত ঝুলে অাছে। 
——তোর কাছে পিস্তল অাছে না, ও’র হার্ট বরাবর ধরবি, বলবি পছন্দ না করলে মেরে দিবো একদম…ঠাস… ঠাস…. ঠাস!
——-এরকম করা যায়?? 
রিতু উঠে এসে তামিমের মাথার চুল টেনে ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলল, 
——একশবার করা যায়। এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার!
তামিম বিড়বিড় করে বলল, 
——-তাহলে অবশ্যই গুলি করবো….. অবশ্যই….

রিতু ডান হাতের বুড়ো অাঙুল তুলে ধরলো। 
——-সে অাসলেই খুব লাকি ভাইয়া। তুই ভালোবাসছিস…..

——-নীরা, নীরা নাম ও’র…..

রিতু চলে যেতে গিয়ে ফিরে তাঁকালো, তামিম কাঁদছে, কান্না লুকাতে একটু পরপর শার্টের হাতায় চোখ মুছছে….

——-ভাইয়া, তাঁরও হয়তো তোঁকে পছন্দ, কিন্তু পরিস্থিতির জন্য বুঝাতে পারছে না। তুই এমন ভেঙ্গে যাচ্ছিস কেনো???কিপ ওয়েটিং এন্ড কিপ পেশেন্স….

তামিম ঝট করে বেসিনের দিকে চলে গেলো। মুখ ধোঁওয়া দরকার!

???

নীরা বের হতে গিয়ে যেটা দেখলো, সেটার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। ভাবী এবং রনি ভাই’র সাথে জুস কর্নার প্রজেক্ট অালোচনায় এখন অারো একজন যোগ হয়েছে, মি. তামিম। নীরা দেখেই থমকে দাঁড়ালো। এই লোক চায় কি?? এর মতলব কি?? সেদিনের টাকার ভাগ নয়তো?? এই বাড়ির সাথে যোগ হতে চাইছে কেনো???

নীরা খুবই নিঃশব্দে সিড়ি ভেঙ্গে নিচে নামলো।কেউ টের পাবার অাগেই বেরিয়ে যেতে হবে….এই লোক দুষ্টের অবশেষ!
নীরা নিচের সিড়ি পর্যন্ত অাসতেই তামিম উৎফুল্ল গলায় ডাকলো, —–অারে মিস নীরা না?? অাপনাকে তো চেনাই যাচ্ছে না।অাসলে মি. শফিকের নাকি ক্লাস এটেন্ড করার পারমিশন হয়ে গেছে, সেটা শুনেই দেখা করতে এলাম।এত সুন্দর একটা নিউজ; তিনি অাবার নরমালি ট্র্যাকে ফিরছেন। সব তো…

তামিমের কথা শেষ হলো না,
লাবণী অবাক হয়ে বলল, 
——অমন মুখটুখ ঢেকে বেঁধে অাছো কেনো নীরা?? শ্বাস বন্ধ হয়ে তো মারা যাবে। এভাবেই মুখ বেঁধে বেরোচ্ছো নাকি?? 
নীরা মনে মনে বলল, এই লোকটার একদম বিশ্বাস নেই ভাবী, কথা বলতে বলতে অাবার কোন ফাঁকে হয়তো কাজটা করে বসবে। 
——অাসলেই তো মিস নীরা, অাপনি এমন করে মুখ বে্ধেছেন কেনো?? 
নীরা জবাব দিলো না।রাগে তাঁর গায়ের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে।
——কি হয়েছে বলবে তো, পুরো মুখটাই ঢেকে নিলে। মেক-অাপ করেছো নাকি??
—–ঠান্ডায় কান ব্যাথা করছে হালকা, মাফলারের মত করে নিলাম অার কি…ভাবী অামার ফিরতে দেড়ি হবে, অাই মিন রাতও হতে পারে। গেলাম……

নীরা সোজা বেরিয়ে গেলো। 
বাইরে বেরিয়ে সে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললো। তামিম নামক চুমু গুন্ডা থেকে বাঁচা গেছে।যাক্…..
ওড়নাটা খুলতেই তামিম পাশ থেকে বলল, 
——- অাপনি কোথায় যাচ্ছেন বলুনতো??? অামি নামিয়ে দিচ্ছি চলুন।
নীরা বেশ বড় একটা শক খেলো। লোকটা পেছন পেছন চলে এসেছে। পেছনে কিছু করে নিতো?? নীরা একটু সেইফ দুরত্বে গিয়ে দাঁড়ালো। পিঠের উপর থেকে লম্বা ঘোমটা টেনে ওড়নাটা মুখে চেপে ধরে বলল, 
——-অাপনি যেটা চাচ্ছেন, সেটা অাপনি পেয়ে যাবেন। শুধু অামাকে দু-দিন সময় দিন।বাবা ফিরলেই সব হবে…. 
——-দু-দিন সময় না হয় দিলাম, কিন্তু শিওর দিবেন কিনা কনফার্ম করুন! 
তামিম এগিয়ে গেলো একটু ;নীরা অাবার সরে দাঁড়ালো। তামিম অারেকটু এগিয়ে গেলো.. নীরা অারেকটু সরলো…..

——কাছে অাসবেন না। একদম না। অামি বলে দিচ্ছি কিন্তু, অামি অত সোজা মেয়ে না…. সরুন… অাপনার ধান্ধা অামার জানা অাছে।

——-অাচ্ছা ঠিক অাছে। অামরা বরং দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলি। তাহলে অাপনিও ভয় পাবেন না, অামিও যা চাই তা বলতে পারবো। 
নীরা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। 
তামিম সামনে দাঁড়িয়েই নীরাকে ফোন করলো। 
——হ্যালো, মিস নীরা, অাপনি কি অামার কথা শুনতে পাচ্ছেন?? হ্যালো, হ্যালো…
——ঢং না করে কাজের কথা বলুন। অাপনার মতলব কি?? কি চান??কত পার্সেন্ট চান???
——অামার মতলব অাপনার পড়াশোনা।অার সেটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট চাই। পরিস্থিতির দোহাই দেয়া ঠিক নয়, নীরা। ইচ্ছে থাকলে সব সম্ভব। অাপনি পড়াশোনাটা করছেন না কেনো??
—–অামার পড়াশোনা করতে ভালো লাগেনা।
——পড়াশোনা কারোরই ভালো লাগে না। এটা ভালো লাগলে তো সবাই পড়াশোনা করতো। কিন্তু এই ভালো না লাগার কাজটি যারা করতে পারে তাঁদের জীবনে অার কোনোরকম দুর্ভোগ থাকেনা। তারা হয় প্রকৃত মানুষ।

——-অাপনিও তো যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন! প্রকৃত মানুষ কি হতে পেরেছেন?? রাস্তাঘাটে মেয়ে ধরে ধরে চুমু খাচ্ছেন।ছিঃ.

তামিম মাথা চুলকালো, প্রকৃত মানুষ হওয়ার সাথে চুমুর সম্পর্কটা কি??
——অাপনার মতলব অামি জানি, অাপনি যেটা চান; সেটা অামি দিয়ে দিবো।তবে পড়াশোনা করবো না।
এখন রাখছি।
——-কথা শেষ হয়নি অামার, অামি দুদিনের জন্য ঢাকার বাইরে যাচ্ছি।বৃহস্পতিবার ফিরবো, তাও সন্ধ্যা হবে। 
——-সেটা অামাকে বলছেন কেনো??? 
অাশ্চর্য..
নীরা ফোন রেখে দিলো।

এবং খুব সাবলীলভাবেই একটা রিকশা ডেকে নিয়ে চলে গেলো।

তামিম কিছুক্ষণ গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েই রইলো। মানুষের হৃদয়ের অনুভূতির উপর কিছু বই কিনে পড়তে হবে। অাচ্ছা মানুষের মন বদলে দেবার কি কোনো ম্যাজিক অাছে????থাকলে সেটা জানা দরকার।

হারুন ফোন করেছে, 
——-হ্যালো স্যার, হ্যালো…

——–বলুন হারুন সাহেব, 
——–স্যর, বর্ষা ম্যামের সব ডিটেল খবর নেওয়া হয়ে গেছে। একটা বেড নিউজ অাছে। 
——-এখন কোনো বেড নিউজ শুনবো না হারুন সাহেব। 
তামিম ফোন রেখে দিলো। তাঁর শরীয়তপুর যেতে ইচ্ছে করছে না। 
বিরক্ত লাগছে……

নীরা অারেকবার পুরো পেপারটা পড়ে নিলো। এটা স্বপ্ন নয়তো???এক্ষুণি হয়তো দেখবে ঘুম ভেঙে গেছে। একবার কি হাটাহাটি করে দেখবে?? পাশের কোথাও টিভিতে নিউজ চলছে, প্রধানমন্ত্রী অাজ শরীয়তপুরের সমাবেশে জনগণের উদ্দেশ্য ভাষণ দিবেন বিকেল ৫টায়। শরীয়তপুর কথাটা তাঁকে কে যেনো বলেছিল? মি. তামিম। অাজ বেরোবার সময় তাঁর সাথে দেখা হয়েছে।কি রকম শার্ট যেনো পড়েছিলো?? কিরকম যেনো দেখতে লাগছিলো??
নীরা মনে করতে পারলোনা ।

শরীফ সাহেব বলে যিনি পেপারটা দিয়েছেন, তিনি অাবার এসেছেন। 
——অাপনি কি কিছু খাবেন??চা, স্ন্যাকস?? 
——জি না। 
লোকটা চলে গেলো। কিন্তু ঠিকই চা নাশতা পাঠিয়ে দিলেন।
নীরা অাবার শুরু থেকে এগ্রিমেন্ট পেপারটা পড়তে শুরু করলো।

মোট তিনটা টিভিসির জন্য অফার করা হচ্ছে।সবগুলোতেই সিংগেল পারফরমেন্স। তাও একদম মনমত। বিউটি প্রডাক্ট….. দেশের প্রথম সারির একটি কোম্পানি।শূটিংস্পটের পর্যন্ত স্পষ্ট ঠিকানা ও বিবরণ, কাজের সময় সব বিস্তারিত বলা অাছে।
এই কোম্পানির অাগের সব টিভিসিতে ছোটপর্দা ও বড়পর্দার নামীদামী হিরোইনরা কাজ করেছেন।এখানে তাঁর মত নিউ কামার???
নীরা পেপারটা উল্টে পাল্টে অাবার দেখলো। কোনো দুইনম্বরি হয়তো লুকিয়ে অাছে ভেতরে?? ছোট করে কোথাও কি শর্ত টর্ত দেওয়া অাছে?? নীরা পেপারটা একদম চোখের কাছে এনে ধরলো।

অারিফুর রহমানের মত এত নাম করা একজন টিভি কমার্শিয়ালের ডিরেক্টর ; নীরাকে সরাসরি না দেখেই অফিসে ডাকলো।এখন অাবার পি এস দিয়ে এগ্রিমেন্ট সাইন করিয়ে নিচ্ছে। লোকটা পাগল নয়তো??

কোনো স্ক্রিনটেস্ট নেই, অডিশন নেই! এরকম কি হয়??? মিডিয়া কি একদম কাস্টিং কাউচ ফ্রি হয়ে গেলো??? মি. তামিম সাহেবের মত গোয়েন্দা পুলিশের দরকার ছিলো এখন।

শরীফ নামের লোকটি অাবার এসেছে।নীরা থতমত খেয়ে দা্ড়িয়ে গেলো। 
——-অাপনি তো দেখি চা নেননি। নীরা নিচ্ছি নিচ্ছি বলে হাত বাড়িয়ে চা নিতে গিয়ে পুরো চা-টা জামায় ফেলে দিলো।সাদা জামা চায়ে মাখামাখি। 
শরীফ সাহেব টিস্যু বক্সটা বাড়িয়ে দিলেন।
——-অাপনার কি কোনো প্রশ্ন অাছে ম্যাডাম, কন্ট্রাক্ট ব্যাপারে?? এমাউন্ট নিয়ে??? 
——না মানে উনি অামাকে না দেখেই, একদম। অামি কিন্তু অনেক কিছুই জানি না। অনেক কিছুই, এই কাজ করতে পারবো বলে মনে হচ্ছে না। 
——-স্যার, অাপনাকে নিয়ে অনেক ভেবেই ডিসিশান নিয়েছেন।
তিনি, 
অাসছেন। ব্যস্ত মানুষ… অাপনি রাজি হলে এগ্রিমেন্ট সাইন করে ফেলুন, তাড়াতাড়ি। এডভান্স কত চাই, বলুন। তবে অর্ধেকের বেশি অামরা পে করি না।নতুনদের জন্য টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট!

নীরার সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে, এত সহজ কেনো?? এটা কি অাসলেই??? 
ঠিকঠাক জায়গা তো এটা??

নীরার ভাবনায় ছেদ পড়লো। ডিরেক্টর অারিফুর সাহেব এসেছেন। ভদ্রলোক বেশ বয়স্ক। কিন্তু তাঁর পোশাক অাশাক বাচ্চা ছেলেদের মত, কটকটে লাল হাফপ্যান্টের সাথে টম এন্ড জেরীর ছবিসহ ডার্ক ইয়েলো টিশার্ট। তার উপর মাথায় একটি কাউবয় হ্যাট। নীরা হেসে ফেলতে গিয়ে নিজেকে সামলালো।
নীরার এতক্ষণে মনে পড়লো মি. তামিম সকালে একটি লাল শার্ট পড়ে এসেছিলো।

ডিরেক্টর সাহেব বসতে বসতে পকেট থেকে মোট চারটে ফোন বের করে টেবিলে রাখলেন। এতগুলো মোবাইল ফোন, তিনি কিভাবে ম্যানেজ করেন কে জানে???
——শরীফ, দুটো কফি বলো। অামি পাঁচমিনিট একা কথা বলবো নীরার সাথে। 
ভদ্রলোক ঘড়ি দেখে বললেন, 
—–কফি নিয়ে ঠিক পাঁচমিনিট পর অাসবে.. ওকে?? অার হ্যাঁ, অাধঘন্টা সময় নিয়ে ও’র হোমওয়ার্কগুলো বুঝিয়ে দেবে।

শরীফ সাহেব মাথা নেড়ে বেড়িয়ে গেলেন। 
——তা কি খবর তোমার নীরা?? গ্রামের বাড়ি কোথায়???

নীরা হকচকিয়ে গেলো। ইনি গ্রামের বাড়ি নিয়ে প্রশ্ন করছেন! মডেলিং এ এসব দরকার??? গ্রামের বাড়ি, যেটা ছিলো সেটাও বিক্রি হয়ে গেছে অাপাতত।নীরা কি বলবে, অামরা ভাসমান জনগোষ্ঠী স্যার, গ্রামের বাড়ি, শহরের বাড়ি এসব কিছু নেই।

——-জি, কুমিল্লায় ছিলো বাড়ি, সেটা বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। 
——-অামার ওয়াইফের ও ওখানে।ঢাকায় কোথায় থাকা হয়?? 
——–জি, মোহাম্মদপুরে,।অামার এক ফুফুর বাসায়। 
———ওহ, বেশ! তা বলোতো, এগ্রিমেন্ট তোমার কি পছন্দ হয়েছে??ফোর মান্থসের মিনি ডিল। শুধু এই সময়টা তুমি অন্য কোথাও কাজ করবে না। এই টিভিসিগুলো অন এয়ারে যাবার পর, তুমি অন্য কাজ হাতে নিতে পারবে। অর্থাৎ টিভিতে তোমাকে অামরাই ফার্স্ট লঞ্চ করবো।
হাইট কত তোমার?? ফাইভ ফাইভ..?? ঠিক অাছে, এখানে কস্টিউম ডিজাইনারের সাথে কথা বলে যাবে।মাপ দিয়ে যাবে।
লিসেন, অামরা কাজ শুরু করবো অাগামী চারদিন পর! এর মাঝে, তুমি কতগুলো ছোট্ট প্রিপারেশন করে নিবে।শরীফ নোট দিয়ে দিবে তোমাকে।চারদিনের চাররকম ডেইলি ওয়ার্কের একটা শিডিউল করা অাছে। তোমার কাজ হলো, ডেইলিরটা ডেইলি হচ্ছে কিনা, প্রতিদিন বিকেলে জানাবে।এখন থেকে কাজ শুরুর অাগের চারদিন, কিপ মি অাপডেটেড। 
টাকা নিয়ে ভেবো না, অামি শিওর অামি তোমাকে নিয়ে অাগামীতে অনেক কাজ করবো। বাড়িয়ে নিও তখন! ইট ইজ যাস্ট দ্য বিগিনিং। 
চলবে তো??

নীরা কোনোরকম অস্ফুট গলায় বলল, 
——জি অাচ্ছা। 
——-শূটিং স্পটে ডট ইন দ্য টাইম অাসবে, কাজের সময়, নো ফোনকলস, নো পাবলিক মিটিং, নো প্রেশার। খাওয়া দাওয়া করবে মন খুলে। ভালো খাওয়া মানে ভালো মুডে থাকা।
এন্ড ইয়েস, মোস্ট ইম্পর্টেন্ট থিং, অাই টু অাই কন্টাক্ট রেখে কথা বলতে শেখা।এরকম মাথা নিচু করে বসে থাকলে চলবে না। লোক এট মি, ওকে। নাউ দিস ইজ গুড।

নীরা খুবই অাড়স্ট ভাবে বলল, 
——অামার পরিবার থেকে একটা জুস কর্নার করতে যাচ্ছি, ঢাকা ভার্সিটির ওখানে। অাসলে অামাদের অায় রোজগারের উৎস অাপাতত বন্ধ। অামি কি এই চারদিনে সেই কাজটা করে নিতে পারি???

——-অফকোর্স… সব কাজ করো.. কোনো প্রবলেম নেই। নাউ স্ট্যান্ড অাপ, এন্ড ওয়াক। 
নীরা উঠে দাঁড়ালো। 
——ওয়াক… 
——-ইয়েস.. ইয়েস… কিপ ওয়াকিং। 
ওকে, লিসেন, হাটার সময় মাথায় রাখবে, স্টমাক ইন, চেষ্ট অাইট, এন্ড ওয়াক ইন এ স্ট্রেইট লাইন। 
ভিশন থাকবে প্যারালাল। ইয়েস গুড…..ইয়েস….
ভদ্রলোক অাবার ঘড়ি দেখলেন,
——নাউ সিট ডাউন, নীরা, এখানে তোমার এডভান্সটা অাছে। বেড়িয়ে গিয়ে প্রথমে তোমার স্যান্ডেলটা চেইঞ্জ করবে।মডেলিং এ জুতো এবং হেয়ার স্টাইল; এই দুটো কি নোট।এ ব্যাপারে সবথেকে বেশি কেয়ারফুল থাকবে।

নীরা নিজের জুতোটার দিকে তাঁকিয়ে, লজ্জা পেলো। 
——-গার্ল, বি কনফিডেন্ট, ইউ হ্যাভ দ্য ফায়ার, এন্ড বি রেডী টু শো ইওর ফায়ার। অামি তোমাকে দু-সপ্তাহ অবজার্ভেশনে রেখেছি, তারপর ডিসাইড করেছি যে, তোমাকে নিয়ে কাজ করবো। মিডিয়ায় শুধু গ্ল্যামার দিয়ে টিকে থাকা ইম্পসিবল, এখানে টিকে থাকতে হয় কাজ দিয়ে, ইওর ওয়ার্ক উইল মেইক দ্য ডিসিশান, ইউ স্টে অর গো। 
মডেলিং মানে টু মেইক ইউরসেল্ফ পাবলিক ডিলিং। তোমাকে হ্যাপেনিং হতে হবে, যখন তোমার ছবির দিকে মানুষ বারবার তাঁকালেও বিরক্ত হবে না, তখন তুমি হবে মডেল। ক্লিয়ার???
দ্যাট ইজ অল ফর টুডে……

ভদ্রলোক হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন, ওয়েলকাম টু দ্য জার্নি উইথ মি….. নীরা!
নীরা হাত বাঁড়ালো না, সে দু-হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললো।এত অানন্দ সে কোথায় রাখবে??কোথায়??

অারিফুর রহমান সাহেব বেরিয়ে গেলেন……
শরীফ কফি হাতে দাঁড়িয়ে অাছে, নীরা কেঁদেই যাচ্ছে…….. 
তাঁর কাছে বিষয়টা খুবই অবাক লাগছে।
একটা নতুন মেয়ে এত সুন্দর কাজের অফার পেয়ে কাঁদছে। কারণ কি???

???

রাস্তায় বেরিয়ে নীরার এই ভালো খবরটা কাউকে দিতে ইচ্ছে করলো। কাকে দেয়া যায়?? অাচ্ছা ভালো খবর বা গুড নিউজ এদের কি প্রাণ অাছে?? এরা কি জীবন্ত? এরা একজন মানুষের কাছে অাসামাত্র অতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মানুষটাকে তাড়া দিতে থাকে, অামি গুড নিউজ বলছি, অামাকে শেয়ার করো। অার খারাপ খবরগুলো হয় মৃত। এগুলো কাউকে বলতে ইচ্ছে করে না। কেউ জানতে চাইলে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাঁকাতে হয়।

অন্য অারও তিনটে এড এজেন্সিতে নীরাকে যেতে হবে। কথা বলে অাসা দরকার। অাগামী চার মাসে সে কোনো কাজ করবে না। যত ভালো অফারই হোক, কাজ নেবে না। সে এগ্রিমেন্ট সাইন করে এসেছে। নীরা ঘড়ি দেখলো, তিনটে বাজে। একটা শপিং মল যাওয়া দরকার, জুতো কিনতে হবে।

শপিং মলে গিয়ে নীরার জুতো কেনা হলো না। শফিক ভাইয়ার জন্য কিছু ভালো কাপড় কেনা দরকার। বেচারা অনেকদিন পর ক্যাম্পাস জয়েন করবে। এতদিনের ঝুট ঝামেলায় কাপড়চোপড় কিছু কেনাই হয়নি।এমনিতেও বেচারার জীবন থেকে ভালো নামক জিনিসটাই হারিয়ে গেছে। একগাদা কাপড় কিনে, নীরা দোকানে রেখেই, বেরিয়ে এলো। অাগে ডিরেক্টরদের সাথে কথা বলার কাজগুলো সেড়ে অাসা যাক্। অাজ বাড়ি ফিরতে ঠিক রাত হবে।

???

তামিমের কেনো জানি নাফিসাকে খবরটি ফোনে বলতে ইচ্ছে করছিলো না।ফোন করে এরকম খবর কাউকে বলতে ভালো লাগার কথাও নয়।

তামিম মেসেজ পাঠালো,

” শ্রদ্ধেয় নাফিসা ম্যাডাম, প্রথমে অামি অাপনাকে একটি সুখবর দিচ্ছি, তা হলো
অাপনার অনুমানই সঠিক। শফিক সাহেবের একটি কন্যাসন্তান অাছে।
তিনি হয়তো নিজের মেয়েকে নিয়েই অাপনাকে ধন্যবাদ দিতে অাসবেন।এটা সত্যিই অানন্দের!
এখন অামি অাপনাকে দুটি দুঃসংবাদ দিচ্ছি, 
প্রথম দুঃসংবাদ, 
শফিক সাহেবের প্রাক্তন স্ত্রী, মানে বর্ষা চৌধুরী অাবার বিয়ে করেছেন।চারমাস হলো।
দ্বিতীয় দুঃসংবাদ হলো, শফিক সাহেবের কন্যাসন্তানটি অসুস্থ।গর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর মা হাই ডোজ এবরশান পিল গ্রহণ করেন, যার ফলাফলে শিশুটি বিভিন্ন জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। শিশুটির নাম, মুকুল।মুকুলের বয়স দেড়মাস।”

তামিম অার কিছু লিখলো না। নাফিসার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। অাচ্ছা, নীরা কি মুকুলের কথা জানে?? তাঁদের বাড়ির কেউ কি জানে??? শফিক সাহেব কি ব্যাপারটা প্রথম থেকেই জানতো?? না জানলে পরে কিভাবে জানলো??? 
মুকুল যে অসুস্থ, এটা কি শফিক সাহেব জানেন?? বর্ষা মেয়েটি কি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে??একটা সাত-অাটমাসের প্র্যাগন্যান্ট মহিলা কি স্বেচ্ছায় বিয়ে করার মানসিকতা রাখেন??
নাকি তাঁকে জোড় করা হয়েছে??? তাঁর স্বামী কি করে?? সেই স্বামীই বা কিরকম?? এবরশান পিল সে কি করে নিতে পারলো?? একটা মা কি কখনোই এরকম ভয়ানক কুৎসিত কাজ করতে পারেন??? নাকি সে কারো ষড়যন্ত্রেরর শিকার??
——স্যার,অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার স্যার এখন একটু বেরোবেন।অাপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তামিম ঘড়ি দেখলো, রাত ন’টা বাজে। এরকম সময় তো উনার বেরোবার কোনো শিডিউল ছিলোনা। তাহলে???? তামিম উঠে দাঁড়ালো।
——-স্যার কিছু বলেছেন?? 
——-ফুল্লি অার্মড হয়ে বেরোতে বললেন, অপজিশানের সাথে একটা মিটিং অাছে, সিক্রেট। গাড়িতেই কথা বলবেন…

তামিম দুটো বন্দুকই সাথে নিলো, অাজ গুলির ব্যবহার লাগবেই মনে হচ্ছে।

???
সেলিনা মেয়ের চিন্তায় অস্থির হয়ে অাছেন।তিনি অারেকটি এন্টি এক্সাইটি পিল নিলেন। গা গুলাচ্ছে, অাবার বমি হবে। প্রেশার কি নেমে গেছে বেশি?? ইতু তো কখনোই এত দেড়ি করে না। রাত ন’টা দশ! মোবাইল ফোন ও বন্ধ বলছে। তামিমকেও ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না, নিশ্চয় ডিউটিতে অাছে। ছেলেকে এই পেশায় দিয়ে তো মহাভুল হয়েছে।তামিমের কোনো অফিস কলিগকে কি ফোন করবেন?? তা বোধহয় ঠিক হবে না। মেয়ে এতরাত পর্যন্ত ফেরেনি, এটা নিশ্চয় ভালো খবর নয়! অারেকটু অপেক্ষা করা যাক?! 
রিতু, ইতুর সব বান্ধবীদের বাসায় ফোন করছে, কারও কাছেই কোনো খবর মিলছে না। 
রিতু, একটু পর পর মায়ের কাছে ছুটে ছুটে অাসছে, ভাইয়া থাকলে এমন হতো না মা। কখনোই এমন হতোনা।বাড়িতে তিন তিনটে গাড়ি, ও একটা গাড়িও নিলো না।এমনকি ড্রাইভারকেও মানা করেছে সাথে যেতে..
ইতু নিশ্চয় বিপদে পড়েছে মা।ও’কে কেউ প্লান করে বিপদে ফেলেছে….

সেলিনা রিতুর কথা বিশ্বাস করতে চাইছেন না। ইতুর বাবাও হুট করে অাজ বিকেলেই ইন্ডিয়া গেছেন; ফিরবেন অাগামী পরশু। এরকমটা কেনো হলো??? বাবা-ছেলে দুজনের কেউই এই মুহূর্তে ঢাকায় নেই! তাহলে সত্যিই কি কোনো বড় বিপদ অাসছে?? গতরাতে তিনি একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। সেটাই কি সত্যি হতে চলেছে??? 
সেলিনা অাবার মাথায় অাইস ব্যাগ চেপেঁ ধরলেন।

রিতু অাবার ছুটে অাসলো, 
——মা ভাইয়ার অফিসের হারুন সাহেবকে ফোন করি??? তিনি হয়তো কোনো কিছু করতে পারবেন?? 
হারুন ফোন রিসিভ করে এক সেনটেন্সেই বলল, 
——তামিম স্যার প্রাইম মিনিস্টার স্যারের গাড়িতে অাছেন। অন ডিউটি। এখন তাঁকে পাওয়া যাবে না। 
——শুনুন, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে, অামার বোন ইতু, ক্যাম্পেইন ট্রিপে গেছে, অাজ বিকেলে। ও’র বাকি সব বন্ধুরা বাসায় ফিরেছে, শুধু ও’ই এখনো এসে পৌঁছায়নি।মা কাঁদছেন খুব!
কিছু একটা করুন। 
খবরটাতে,
হারুন থতমত খেয়ে গেলো, 
——ট্রিপটা কোন জায়গায় ছিলো??
——সে জায়গার নাম বলে নি, তবে ঢাকার ভেতরে। ও’র মোবাইল ফোনও বন্ধ বলছে।
——লাস্ট কটায় ও’র সাথে কথা হয়েছে। 
——-বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ।
——ক’টায় ফিরবে এমন কিছু কি বলেছে??? বাকি বন্ধুরা কি বলছে?? 
——ও’র সব বন্ধু বলছে, ওদের ক্যাম্পেইনটা সাতটার মাঝেই শেষ হয়ে গেছে।তবে ইতু ও’র এক ছেলেবন্ধুকে সাথে করে ফিরছিলো…অামি জানি, ও নিশ্চিত বিপদে পড়েছে। 
——রিতু, অামি গুলশান থানার অসি সাহেবকে খবরটা দিচ্ছি, তিনি বাসায় অাসলে যা যা ইনফরমেশন দরকার বলো। অামি অাশে পাশের থানাও জানিয়ে দিচ্ছি।ইতুর একটা ছবি অামায় হোয়াটস এপে পাঠাও, এক্ষুণি।
——ওকে, বলে রিতু কেঁদে ফেললো।
——ইতু খুবই সহজ সরল। ও”কে কেউ বিপদে ফেললে, ও ফেইস করতে পারবে না।
হারুন নিজের কণ্ঠ দৃঢ় করে বলল,
——ইতু ফিরবে, অবশ্যই ফিরবে। ডোন্ট ওরি রিতু……

হারুন ফোন রেখে, অসি সাহেবকে ফোন করলো।

তামিম স্যার মোটামোটি তিনটে গাড়ি সামনে। খবরটা কিভাবে দেওয়া??প্রাইম মিনিস্টার স্যার তো সাথেই..তামিম স্যারের ফোন বন্ধ। মেসেজ করে দেওয়া যাক।ফোন অন করলেই দেখতে পাবে!
হারুন বিড়বিড় করে বলল, 
হে পরম দয়ালু মেয়েটার যেনো কোনো বিপদ না হয়???

???

নীরা বিল্ডিংটার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলো। ঢাকার মত শহরে এরকম প্যাঁচ লাগানো গলিতে এত ভগ্নদশা বিল্ডিং এখনো অাছে?? নীরা ব্যাগ থেকে এড্রেস বের করে মিলিয়ে নিলো। হ্যাঁ ঠিক অাছে, এর তিনতলাতেই অফিস। অাশপাশটা এরকম নীরব কেনো?? লোকজন অাছে তবে একেবারেই কম! এরকম জায়গায় এরা এড এজেন্সি খুলেছে কেনো?? নীরা ঘড়ি দেখলো, ন’টা পয়ঁত্রিশ।এত রাতে এখানে যাওয়া কি ঠিক হবে??? 
নীরা একমুহূর্ত ভাবলো।এত দূর এসে যখন কষ্ট করে অফিস খুঁজে বের করেছে, ফিরে যাওয়া কি ঠিক হবে??

না যাওয়া যাক, মিডিয়ায় কাজ করতে হলে এসব দিন রাতের সময় ধরে চলা যাবে না। এই প্রফেশনটাই তো চ্যালেঞ্জিং। ভয়, জড়তা সব বাদ দিয়ে শুধু কাজে ফোকাস করতে হবে।এটা তাঁর শুরুর সময়, এভাবেই তাঁকে কাজ খুঁজে নিতে হবে।এভাবেই বিভিন্ন জায়গায় নক করে করে।

অাচ্ছা, এটা যদি অাবার কোনো দুষ্টু লোকের অাস্তানা হয়??
নীরা ব্যাগের ভেতরটা ভালো করে দেখে নিলো। এসিডের বোতল, ছুড়ি, ব্লেড, মরিচের গুঁড়ো, ব্লিচিং পাউডার সব অাছে। 
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে গিয়ে নীরার মনে হলো, একটা বন্দুক সাথে থাকলে ভালো হত। সে যখন অনেক বড় মডেল হয়ে যাবে, অনেক টাকা যখন তাঁর হবে, সে নিশ্চয় একটা দামী বন্দুক কিনে লাইসেন্স করে নিবে। বন্দুক চালানো সে শিখবে তামিম নামক চুমুগুন্ডার কাছ থেকে। অাচ্ছা, এই মুহূর্তে কেনো লোকটার কথা মনে হলো?? সকালেও তাঁর এগ্রিমেন্ট পেপারটা হাতে পেয়ে লোকটার কথা মনে হয়েছিলো। মানে কি?? হোয়াট ইজ হার্ট রেট?? যখনি তাঁর হার্টবিট বেশি হচ্ছে লোকটার কথা মনে পড়ছে। সকালে অানন্দে হার্টবিট বেড়েছিলো, তখন মনে পড়েছে অার এখন ভয়ে মনে পড়েছে।

নীরা দোতলার সিঁড়ি পেরোতেই দেখলো তিন তলার সিঁড়িতে বাতি জ্বলছে না, গা ছমছম করছে তাঁর। লোকজন নেই নাকি?? কোনো সাড়াশব্দ নেই কেনো???? 
তাঁর কি ফিরে যাওয়া উচিত?? এত ভয় করছে কেনো হঠাৎ???? ধুত! অাসাই উচিত হয়নি এখানে….

নীরা তিনতলায় উঠে পুরো ভ্যাঁবাচেকা খেয়ে গেলো। যেখানে অফিস হওয়ার কথা, সেখানে 
একটি সিডির দোকান। নাম “রফিক সাউন্ড সিস্টেম”! হালকা পাতলা একটি ছেলে বসে অাছে।মনে হচ্ছে, এই দোকান নিয়ে সে মহা বিরক্ত। 
নীরা এগিয়ে গেলো, 
——-অালাউদ্দিন বলে একজন অামায় এখানে দেখা করতে বলেছিলেন। তিনি কি অাছেন?? 
ছেলেটা নীরার কথার জবাব দিলোনা। 
——-অামার এখানে একটা কাজে অাসার কথা ছিলো। মিউজিক ভিডিওর জন্য। অামার নাম নীরা। 
ছেলেটা কিছু না বলে, দোকানের ভেতরে সাইড দিয়ে একটা চিকন রাস্তা দেখিয়ে বলল, 
——-এদিক দিয়া ভেতরে যান।বস, ভেতরে অাছেন! অাপনে সামনের ওয়েটিং রুমে বসবেন।কাজ চলতাছে একজনের।

——-ভেতরে যাবো না অামি।এখানেই অপেক্ষা করবো। অাপনার বসকে ডাকুন।

ছেলেটা এবার একটু গুরুত্ব দিলো নীরাকে। 
——-ভিতরের জিনিস দেখানোর কাজ করতে পারবেন, অার দোকানের ভিতরে যাইতে পারবেন না। এটা কি কথা!?? কাজ করলে ভেতরে যান, নাইলে ফুটেন। এরকম ফালতু কাজ করতে পারেন, অাবার দেমাগ। হুহ.. ছেলেটা মুখ থেকে একগাদা থুথু ফেললো নীরার সামনে।বিরক্তি ছেলেটার চোখ মুখ অারো কুঁচকে এলো।

নীরা ছেলেটার কথা বুঝার চেষ্টা করলো, চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছেলে।কিন্তু চেহারাটা একদম মেয়েলি ধরনের।চোখে মুখে যেনো জীবনের প্রতি প্রচন্ড রাগ। এই পরিস্থিতির সবটার জন্য যেনো সে দায়ী!
সে কি বুঝাতে চাইছে??? নীরার চলে যাওয়া উচিত?? ছেলেটি কি কোনোভাবে প্রচ্ছন্ন নিষেধ বুঝাচ্ছে??

——-এখানে কি হয়?? 
——-জেনে অাসেন নাই?
——-জি না। 
——-ঘন্টা রেটে নীল ফিলিম। অাপনের মুখ দেখানো হবে না। শুধু বডি। এর উপরও রেইট অাছে। যে যতদূর দেখায়। কিলিয়ার??

নীরার গা শিউড়ে উঠলো।ছিঃ…. 
——-এখন কি হচ্ছে??? 
——-একটা স্কুল অাইটেম অানা হইছে; তাঁর শূটিং চলতাছে। 
মেয়েটারে এরা মাইরা শেষ.. 
বালের দুনিয়া।এই দুনিয়ায় পেডের জ্বালায় কত কি যে দেখন লাগতাছে।

নীরার গলায় দম অাটকে এলো। 
——অামায় এক গ্লাস পানি দিবেন??
ছেলেটা পানি দিলো না।পানির বোতলটা বরং একটু সরিয়ে রাখলো।
——-এরকম করে মেয়েদের ক্ষতি করা কি ঠিক?? এসব কাজে পুলিশ বাঁধা দেয় না..??

——- পুলিশের অত টাইম নাই।
——এই বিল্ডিংটার পুরোটাতেই বোধহয় এরকম কাজ হয়, তাইনা?? কেউ কি অভিযোগ করে না??
——-শূটিং এ বেশির ভাগেরই মুখ দেখানো হয় না। ঝামেলা কিসের??? এর মাঝে সবাইই নিজের মতে কাজ করে। মুখ না দেখাইলে মাবুদের সিষ্টি সব একরকম।সব কামই একজাত।
অাপনে কাজ করলে বসেন, নাইলে ভাগেন।সামনে দাঁড়াইয়া ভ্যাঁন ভ্যাঁন কইরেন না। পাবলিক টের পাইলে ঝামেলা।

নীরার প্রচন্ড রাগ হলো। রাগে গা রিঁ রিঁ করতে লাগলো। এরকম একটা কুৎসিত কাজে এরা মেয়েদের ডাঁকে কিভাবে?? কি করে এত সাহস হয় এদের?? প্রকাশ্যে এমন নোংরামো। এদের নীরা কিছুতেই ছাড়বে না। নীরাকে ডেকে অানার একটা মিনিমাম শাস্তি এদের পাওয়া উচিত।মিনিমাম শাস্তি। নীরা অত সোজা মেয়ে না। অত সহজে তো সে ছাড়বে না।
——-ভেতরে কয়জন অাছে?? মানে বেশি লোকজন কিনা…..???
——দুইজন, মাইয়াসহ তিনজন।কামের সময়, মানুষ কম! বেশি মানুষ, বেশি দিগদারী।
মানুষই সব সমস্যার মূল।

ছেলেটি দরকারের চেয়ে বেশি কথা বলছে। কমন সাইকোলজি বলে, দরকারের চেয়ে বেশি কথা বলা মানুষগুলো অতটাও বিপজ্জনক নয়। এদের কনভিন্স করা সহজ…
নীরা ছেলেটিকে এবার তুমি করে বলল,
——-তোমার নাম কি??? 
ছেলেটি জবাব দিলো না। 
——–তোমার নাম রফিক তাই না?? এই দোকনটা তোমার নামে….
——-অামার নাম বেলাল। রফিক, অামার বসের নাম।

——বেলাল, একটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনো, অামি তোমাকে এখন একটা কঠিন কথা বলবো, মাথা ঠান্ডা রেখে শুনো……
নীরা শক্ত করে ছেলেটার হাত চেঁপে ধরলো হঠাৎ। 
——-অামার কাছে পঁচিশ হাজার টাকা অাছে বেলাল, অামি তোমাকে টাকাটা দেবো। এক্ষুণি দেবো। এই দেখো। 
নীরা ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দেখালো।
——-তুমি অামায় একটু সাহায্য করো। অামি পুলিশের লোক। গোপন সংবাদে এখানে এসেছি…. 
অামার টিম নিচে ওয়েট করছে।

ছেলেটার চোখ চকচক করছে, যেনো এই কথাটা শোনার জন্য সে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে।
বেলাল নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো।
——-অামারে টাকা দেখাইবেন না। টাকার লোভ এই বেলালের নাই। 
——-অাচ্ছা, টাকা নিও না। সাহায্য করো..
——-এদের কাছে কিন্তু চাক্কু অাছে, ম্যাডাম।

নীরা ব্যাগ থেকে ব্লিচিং পাউডারের প্যাকেট বের করলো। 
——অামার কাছে ও অস্ত্র অাছে।এতে হিরোইন অাছে, এক মুঠো হাতে নিয়ে…. 
হাতে নিয়ে শুধু একজনের নাকমুখে চেপে ধরবে। পারবে না??

বেলাল এক খাবলায় নীরার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে নিলো,
——অারেক জনরে কি করা?? 
——সেটা অামি দেখবো। 
শুধু তুমি এটুকু সাহায্য করবে।পারবেনা??রেডী তো?? 
——ম্যাডাম,অাপনে কি দারোগা না অসি??
—-অামি এনএসঅাই র, মানে গোয়েন্দা বিভাগের একজন অফিসার । 
বেলাল মহাউৎসাহে বলল, 
——-চলেন…ফাইট শুরু।

নীরা ওড়ানাটা পুরো মুখে বেঁধে নিলো। এসিডের ব্যবহার করতে হবে, মুখে পড়লেই সর্বনাশ।
এই প্রথম নীরার খুব অানন্দ হচ্ছে, সে নিজের অভিনয় দক্ষতা দেখানোর মত একটা কাজ পেয়েছে।

নীরা খুব সাবধানে এগিয়ে গেলো। গ্লাস টেনে খুলতেই দেখলো, প্রায় অর্ধমৃত একটা মেয়েকে নগ্ন করে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে বিছানায়। পাশেই পড়ে অাছে তাঁর স্কুলের ইউনিফর্ম,স্কুলের ব্যাগ, অাইডি কার্ড। চেংরা টাইপের লম্বা অার ভদ্র পোশাক পরিহিত একটি ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় শ্যূট করছে। অন্য অারেকটি লোক, মাঝারি বয়সের। লোকটির হাতে ভেজা তোয়ালে, সে মেয়েটির পায়ের তলার ময়লা মুছে দিচ্ছে। 
নীরা বিড়বিড় করে বলল, তোদের অামি ছাড়বো না।

বেলাল বিরক্তি ভরা গলায় ডাকলো, 
——বস, এই বেডী খুব জালাইতাছে, বলতাছে এর শূটিং অাগে করতে। জোড় কইরা ভেতরে অাসতে চাইলো। 
নীরা মাতাল ভঙ্গিতে বলল, 
——অামার অাগে, অন্যসব বাদ। তাড়াতাড়ি কর শালারা….. 
রফিক বলে লোকটি ধমকের গলায় বলল, 
——সিরিয়ালে বসতে বল শালীরে। নেশা কইরা এর হুঁশ নাই মনে হচ্ছে। 
পানি দে চোখে মুখে…. মুখ ঢাকা ক্যাঁন?? মুখ খুইল্লা দেখ, নতুন না পুরাণ অাইটেম।

বেলাল এক মুহূর্তেই ঝাপিয়ে পড়লো, রফিক বলে লোকটার উপর….. 
নীরা ও দেড়ী করলো না।অাজ সে সত্যিকারের কাজ করার মত একটা জায়গা পেয়েছে। অাজ সে মনেপ্রাণে কাজ করবে, অভিনয়ের কাজ, তাঁর সাধারণ জীবনের বাইরের কাজ…… 
কোথাও ঘড়িতে ঢং ঢং শব্দ করছে। দশটা বেজে গেছে…… 
অনেক রাত…..
অাজ বাড়ি ফিরতে নীরার সত্যিই অনেক দেড়ী হবে!

???

তামিম এই নিয়ে মোট পাঁচটা থানার লোককে কাজে লাগিয়েছে। কোনো খবরই মিলছে না ইতুর। ঝিগাতলার কাছাকাছি ওর ফোন নাম্বারটা ট্রেস করা গেছে, সন্ধ্যা ছটার দিকে। এরপর থেকে মোবাইল সুইচ অফ! তামিম ঘামতে লাগলো। একছুটে এখন ঢাকা চলে যাওয়া দরকার ছিলো।
ইতুর না ফেরার খবরটা পেয়েছে সে রাত এগারোটায়। এখন রাত সাড়ে বারোটা। মোবাইল স্ক্রিনে
ইতুর ছবিটার দিকে তাঁকিয়ে তামিম একটা শুকনো ঢোঁক গিললো। মাঝে মাঝে জীবন এত অর্থহীন কেনো মনে হয়??বেঁচে থাকাকে কেনো এত বোঝা মনে হয়???

এই মুহূর্তে তাঁর মনে হচ্ছে, চাকরিটা ছেড়ে দেওয়া উচিত। এই চাকরির কোনো মানে নেই। কান্না দলা পাকিয়ে এসে গলায় অাটকে অাছে।গলার কাছাকাছি বুকে ব্যাথা করছে। সুঁচালো তীব্র ব্যাথা।
ইতুর বয়ফ্রেন্ড জিজকেও পাওয়া যাচ্ছে না। সেই ইতুকে নিয়ে যায় নি তো???শ্বাস নিতে এত কষ্ট হচ্ছে কেনো??বাতাসে অক্সিজেন কি ফুরিয়ে গেছে??

রিতু অাবার ফোন করেছে, 
তামিম নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলো।
——–হ্যালো, রিতু। অামি কন্ট্রোল রুমে রিপোর্ট করে দিয়েছি, দশজনের একটা টিম বের হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।অার কোনো চিন্তা নেই… এরা খুঁজে বের করবেই!
——–ভাইয়া, ইতুকে পাওয়া গেছে। ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি অাছে।রনি নামের একজন, তিনি নাকি ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট। ফোন করে অামাদের জানালেন। অামরা সেখানেই যাচ্ছি। 
——-তাঁর পুরো নাম কি, জিজ্ঞেস করেছিস??? 
——না। অামরা গাড়িতে অাছি ভাইয়া। যাচ্ছি সেখানে। ইতু নাকি এক্সিডেন্ট করেছে। 
তুই অাসছিস তো ভাইয়া?? 
——অামি কাল বারোটার অাগে লিভ পাবো না রিতু। কোনোভাবেই না। বি স্ট্রং মাই ব্রেইভ সিস্টার। তোঁকেই সব সামলাতে হবে। অামি কাল দুপুরেই অাসছি। 
হারুন, গোমড়া মুখে পাশে দাঁড়িয়ে অাছে। 
——-স্যার, প্রাইম মিনিস্টার স্যারকে একটা ডিরেক্ট এপ্লিকেশন দিয়ে দেখবেন?? 
——-না, হারুন সাহেব।অাপনি বরং এক কাজ করেন। অাপনি চলে যান। এখনি রওনা হোন।ড্রাইভারকেও নিয়ে যান। একা এত পথ ড্রাইভ করা ঠিক হবে না।

তামিম উঠে দাঁড়ালো।গলা শুকিঁয়ে অাছে, পানি খাওয়া দরকার। নীরাকে একটা ফোন করতে ইচ্ছে করছে, তাঁকে জানালে কি সে ইতুকে একটু দেখতে যাবে??? একটু কি গিয়ে ইতুর পাশে বসবে??? 
এক্সিডেন্টে কি ইতুর বেশি লেগেছে??? 
তামিম নীরার ফোনে কল করলো। এতরাতে নীরা ফোন ধরবে তো??

???

বেলাল শুকনো চোখমুখ করে হসপিটাল প্যাসেজে বসে অাছে। তাঁর খুব ক্ষুধা পেয়েছে। কেউ তাঁর খেয়ালে নেই। মেয়েটার পরিবার বোধহয় বেশ বড়লোক। এরা এসেই পুরো হাসপাতালের সব ডাক্তার ডেকে জমিয়ে নিয়েছে।
বেলাল বিড়বিড় করে বলল,
—-যত্তসব অাহলাদের ঢং। এত্তারা মাইয়া হারাই যাইবার সময় খেল নাই, অহন অাদর *দায়…..

নীরা নিশ্চিত হবার জন্য অাবার জিজ্ঞেস করলো। 
——–অাপনি কনফার্ম তো রনি ভাই?? 
——-হান্ড্রেড পার্সেন্ট কনফার্ম। মেয়েটির রেপ হয়নি। এরা ইনজেকশান দিয়ে ড্রাগ দিয়েছে শরীরে। মারধর করেছে, অথবা প্রচুর ধ্বস্তাধস্তি হয়েছে।
রিপোর্ট এসে গেছে।শফিক নিজে কথা বলেছে অামাদের স্যারের সাথে।

নীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
——-মেয়েটার পরিবারকে কিছু বলা হয়েছে?? 
——-যতটুকু অামরা করেছি ততটুকুনই।বাকিটা মেয়েটার সেন্স ফিরলেই জানবে। এদের বোধহয় অনেক উপরে হাত অাছে, বুঝলে নীরা?? সব ডক্টর এরা এক করে ফেলেছে।মেডিকেল বোর্ড বসাচ্ছে।
——-হতেও পারে রনি ভাই, অাচ্ছা, ওই মেয়েটার ডুপ্লিকেট অারেকটা মেয়ে দেখলাম। 
——-ও হ্যাঁ.. ওটা ইনজুরড মেয়েটার বোন। টুইন.. একদম কার্বন কপি। মেয়েটা খুব কাঁদছে।

নীরা ঘড়ি দেখলো। একটা বাজে। বাড়ি ফেরা দরকার।মেয়েটার গার্জিয়ান যখন এসেছে এরাই সব সামলাক। নীরার বড্ড ক্লান্ত লাগছে।

বেলালকে টাকাটা দিয়ে বিদায় করা দরকার। 
বেলাল চেয়ারে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছে। 
নীরা ডাকলো, 
——-বেলাল, উঠো। এই নাও তোমার টাকা। মেয়েটার মা চলে এসেছেন, এখন অার চিন্তা নেই। 
বেলাল বিরস মুখে বলল, 
——-ক্ষুধা লাগছে অামার। কিছু খাওয়ান। 
——-এখানে তো কিছু পাবে না এতরাতে। বাইরে গিয়ে খেয়ে নিও। 
বেলাল হাত উ্চু করে অাড়মোড়া ভাংলো। 
——–একইরকম অারেকটা মেয়ে দেখলাম। 
——-হুঁ।জমজ বোন মেয়েটার। 
বেলাল উঠে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে নীরার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে গুণে দেখলো।
সেখান থেকে দশ হাজার টাকা রেখে বাকিটা নীরাকে ফেরত দিয়ে বলল, 
——-অাল্লাহর কি অাচানক সিষ্টি। দুই মাইয়া একরকম। একটার ভিডিও ফাঁস হইলে দুইডারই লাইফ শেষ ছিলো। পাবলিক বুঝতোও না কার ভিডিও ফাঁস হইছে??

নীরা বিস্মিত চোখে বেলালের দিকে তাঁকালো।অাসলেই তো. এরকম তো সে ভাবেনি।. দুই বোনেরই ক্ষতি হতো। কি ভয়ানক ব্যাপার! 
——-সবকিছু জ্বলবে তো?? অাগুনটা ভালো করে দিয়েছিলে তো, বেলাল?? 
——-সব পুইরা শ্যাষ ম্যাডাম। পুরা দোকান বিনাশ।কেরোসিনের অাগুন ম্যাডাম, এতক্ষণে পুরা বিল্ডিং ই শেষ মনে হয়। 
বেলাল হাসলো। 
নীরা অারেকবার লম্বা করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

অনেক হালকা লাগছে নিজেকে তাঁর।নীরার মোবাইল বাজঁছে। কে ফোন করেছে?? এতরাতে??? 
নীরা মোবাইল স্ক্রিনে তাঁকালো। ফোন করেছে তামিম। এই লোকটা তো দেখি পুরাই মাথানষ্ট! নীরা ফোন কেটে দিলো। অাহত মেয়েটির মা অার বোন এগিয়ে অাসছে। নীরা বেলালকে চোখ ইশারায় দ্রুত বেরিয়ে যেতে বলল। 
রনি ভাইও সাথে অাসছেন। 
নীরার ফোন অনবরত বাঁজছে।

ভদ্রমহিলা নীরার সামনে এসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন। 
রনি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে বলল, 
——–ইনি ইতুর মা। ওই যে ইতু, বুঝলে নীরা। 
নীরা সালাম দিলো। জবাবে ভদ্রমহিলা মাথা নাড়লেন শুধু। 
পাশের মেয়েটি দেখতে অাবিকল ইতুর মত।তবে একটু ব্যতিক্রম অাছে, তাঁর উপরের ঠোটের মাঝখান বরবার উপরে নাকের নিচে তিল অাছে।কাঁদতে কা্দঁতে তাঁর চোখমুখ ফুলে অাছে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

——নীরা অাপু, অাপনার মোবাইল ফোন বাঁজছে। 
নীরা একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে ছিলো বোধহয়। চমকে উঠে অাবার ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলো। তামিম শয়তান ব্যাটা ফোন করছে অনবরত। 
নীরা এবার ফোন রিসিভ করলো, 
——–হ্যালো, শুনুন, এখন কথা বলতে পারবো না। ব্যস্ত অামি। মিটিং এ অাছি। নীরা ফোন রেখে সুইচ অফ করে দিলো।

ভদ্রমহিলা এবার কথা বললেন, 
——–নীরা, অামি তোমাকে সংক্ষিপ্ত করে কিছু কথা বলবো। বেশি কথা বলার মানসিকতায় যে অামি নেই। তা তুমি জানো। 
নীরা হেসে বলল, 
——-অামরা বরং পরে কথা বলতে পারি ম্যাডাম। অাপনি এখন মেয়ের কাছে…. 
ভদ্রমহিলা হাত দিয়ে নীরাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 
——–তুমি অামাদের যে সাহায্য করেছো, তাঁর বিনিময়ে অামরা তোমাকে এর সমান কিছুই দিতে পারিনা। এর সমতুল্য কিছু নেইও অামাদের কাছে। তবে হ্যাঁ একটা জিনিস অামরা তোমার জন্য করতেই পারি। তা হলো, তোমার এমন কোনো দরকার বা প্রয়োজন যেটা তোমার চাই, কিন্তু নিজের সাধ্যতে সেটা করতে পারছো না। এরকম কিছু যদি তোমার চাইবার থাকে বলো, মনে করো এই মুহুর্তে এই জিনিসটা অামি তোমার কাছে চাইছি। 
নীরা ঠান্ডা গলায় বলল, 
——অামার কিছু চাই না ম্যাডাম। অাপনি অাপনার মেয়ের কাছে যান। জ্ঞান ফিরলে সে হয়তো অনেক কিছু বলবে।

ভদ্রমহিলার গালে বেয়ে এবার চোখের পানি, কিন্তু কণ্ঠ একদম দৃঢ়, 
——-অামি যদি তোমার জন্য সেরকম কিছু না করি, অামার মেয়েটা রাগ করবে। জ্ঞান ফিরলে সে যাতে জানতে পারে, তোমায় ধন্যবাদ দেওয়ার মত অামরা কিছু একটা করেছি। ভদ্রমহিলা ব্যাগ থেকে চেকবই বের করলেন। 
নীরা হাই তুলতে তুলতে বলল,
——- অামার কিছু চাই না ম্যাডাম। তবে এই যে, মাহবুব রনি। ইনিও অাপনার মেয়ের জন্য যথেষ্ট করেছেন। রনি ভাই’র একটা ছোট্ট সমস্যা অাছে, ইনি একজনকে ভালোবাসেন, বিয়ে করতে চান। থাকার জায়গা নেই, মা -বাবাও নেই। বেচারা নিজের ভালোবাসার কথা বলতেও পারছেন না। কিছু করতেও পারছেন না। অাপনি যদি অাসলেই কিছু করতে চান, অাপনার যদি সেই সামর্থ্য থাকে, এই বেচারার জন্য করুন। বেচারার ভালোবাসার জন্য করুন।

রনি স্তব্ধ ভঙ্গিতে মুখ হাঁ করে নীরার দিকে তাঁকিয়ে রইলো।
নীরা বলতেই থাকলো।
——-তিনি অামার বিধবা ভাবীকে ভালোবাসেন।অামার বাবার ভয়ে বলতে পারছেন না। অামি জানি ইনি ভাবীকে অনেক ভালো রাখবেন।

সেলিনা কঠিন গলায় বললেন, 
——–অামি ব্যবস্থা করছি, এক্ষুণি সব ব্যবস্থা করছি।
রনি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে পড়লো পাশের চেয়ারে।তাঁর চোখের পাতা ঘনঘন পড়ছে।

নীরা অার সেখানে দাঁড়ালোনা।

হাসপাতালে সিঁড়ি বেয়ে নিচে অাসতেই দেখলো শফিক দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে বই, সে পড়ছে।এত মনোযোগী হয়ে। নীরার মনে হলো, এটা তাঁর অাগের শফিক ভাইয়া। একদম প্রথমের, যার জীবনে কোনো দুর্ঘটনা নেই।

নীরা মৃদু স্বরে ডাকলো, ——-তুমি হোস্টেল যাবে না ভাইয়া?? 
শফিক বই বন্ধ করে তাঁকালো। 
——বেলালকে এগিয়ে দিয়ে দা্ড়ালাম।ভাবলাম,
তুই এতরাতে একা বাড়ি ফিরবি, তোঁকে সাথে নিয়ে যাবো বলে অপেক্ষা করছি। 
——-একা অামি একদম ভয় পাই না। তুমি জানো ভাইয়া।

শফিক হাসলো। 
——-একাই যাবি??
——-হুঁ।তোমার জন্য অাজ এতগুলো, শপিং করেছি ভাইয়া। কাল পেয়ে যাবে।

শফিক হাত বাঁড়িয়ে বলল, 
——-নীরা, একটু কাছে অাসবি। তোঁকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিই না কতদিন হলো। 
নীরা ভাইয়ার কাছে এগিয়ে গেলো না। 
শফিক এগিয়ে এসে নীরার মাথায় হাত রাখলো। নীরা ঢোঁক গিলে নিয়ে কান্না অাটকালো। 
শফিকের চোখ ছলছল করছে, তবে তাঁর মুখে হাসি। ইতু যে মি. তামিমের বোন এই চমৎকার তথ্যটি নীরাকে সে এখনি বলবে না। 
এটা নিয়ে একসময় সে নীরাকে ক্ষেপাবে। 
নীরা বিরক্তি দেখিয়ে বলল, 
——–তোমার স্নেহ
মমতা কি শেষ হয়েছে ভাইয়া??? অামি বাড়ি যাবো…..

শফিক নীরার মাথা থেকে হাত সরিয়ে বলল, 
——-মি. তামিম তোঁকে এত ফোন করছেন, ধরছিস না কেনো??.
নীরা অবাক চোখে ভাইয়ের দিকে তাঁকালো। 
কিরকম অসভ্য লোকরে বাবা!! ভাইয়াকে পর্যন্ত খবর দিয়ে দিয়েছে.. 
এই লোককে নীরা একদম ছাড়বে না। এর মাথার বিষ নীরা নামিয়েই ছাড়বে। হু্হ…..

তামিম খুবই বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে ইতুকে দেখছে। একদিনের ব্যবধানে তাঁর ছোট্ট বোনটি যেনো অাকাশ পাতাল বদলে গেছে। 
ইতু গুঁটিসুঁটি মেরে জানালার ধারে বসে অাছে। তাঁর হাতে কফিমগ, কিন্তু সে কফিতে চুমুক দিচ্ছে না।

তামিম এগিয়ে গিয়ে ইতুর হাত থেকে কফিমগটা নিয়ে নিলো। 
——তুই না খেলে, অামিই খাই বরং! শুধু শুধু ঠান্ডা করছিস.. 
ইতু কফিমগটা ছাড়লো না।

তামিম ইতুর পাশাপাশি বসলো। 
—–একটা ছেলে, সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা একাউন্ট খুলে নিলো। অার তাতে তোঁকে বন্ধু বানিয়ে বলল, 
অামি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফিল্ম ও টেলিভিশনে পড়ছি। অার তুই অমনি তাঁর বন্ধু হয়ে যাবি??

——অামি কেনোই বা ভেবে নিবো সে মিথ্যা বলছে??
——-সত্য ধরে নিলি কোন লজিকে?? 
——-সে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য দশজনের সামনে নিজের মিথ্যে পরিচয় দিবে কেনো?? এটা তো লজ্জার। 
——-ইতু, সোশ্যাল মিডিয়া হলো এমন একটা জায়গা যেখানে অামরা মিথ্যেগুলো সহজে বলতে পারি।
এখানে লজ্জা পাওয়ার কোনো চান্সই নেই।
ইতু মলিন চেহারা করে হাসলো। 
——কোথাও বেড়াতে যাবি ইতু?? চল, ঘুড়ে অাসি। 
——-না, ভাইয়া। অামি অার কোথাও বেড়াতে যাবো না।

তামিম ঘর ছেড়ে বাইরে এলো। ইতুর একা থাকা একদম ঠিক না এখন। রিতুকে স্কুল থেকে ক’দিন লিভ করিয়ে নিতে হবে।

হারুন ফোন করেছে, তামিম ফোন ধরলো না। 
কথা বলতে ইচ্ছে করছে না একদম।

হারুন মেসেজ করেছে। “নীরা ম্যাডাম একটা বিউটি পার্লারে অাছেন। তিনঘণ্টা ধরে ওয়াচম্যান অপেক্ষা করছে। এখনো বের হননি।

তামিমের রাগ লাগলো। প্রচন্ড রাগ। 
একটা মানুষ কন্টিনিউয়াস ফোন করে যাচ্ছে, অার তিনি কিনা মোবাইল অফ করে দিব্যি পার্লার ঘুড়ে বেরাচ্ছেন!এই মেয়েকে তামিম পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেবে।

তামিম হারুন সাহেবকে ফোন ব্যাক করলো, 
——হ্যালো হারুন সাহেব, অাপনি বিউটি পার্লারের এড্রেসটা মেসেজ করুন তো। 
—–জি স্যার এখনি করছি।স্যার, অারেকটা কথা ছিলো। 
——-বলুন। 
——-স্যার নীরা ম্যাডামের কলেজের টিচার ডাঁক পাঠিয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু তিনি নাকি ফোন করে সাফ বলে দিয়েছেন। তিনি অার পড়াশোনা কন্টিনিউ করবেন না। 
——-ওহ.. ওকে অাই সি.. পড়াশোনা সে কিভাবে না করে দেখছি অামি…..
——-স্যার, অামি বলছিলাম কি অার পড়াশোনা না করাই ভালো। কম পড়াশোনা করা মেয়েগুলো বউ হিসেবে অাদর্শ হয়। 
——-নীরা ম্যাডাম, অাদর্শ বউ হলে অামার লাভটা কি?? 
——-জি, না মানে, জি স্যার… জি জি….
তামিমের এমন কথায় হারুন হতভম্ব হয়ে গেলো। 
স্যারের লাভটা কি মানে??? স্যার কি বলতে চাইছেন???? নীরা ম্যামকে কি তিনি পছন্দ করেন না???ও মাই গড! স্যারের মতলব তাহলে কি??

???

বিউটি স্যালন থেকে বেড়িয়ে নীরার লজ্জা করতে লাগলো। অাশেপাশের লোকজন কি তাঁকিয়ে দেখছে তাঁকে?? নীরা দ্রুত হেঁটে সোজা লিফটের দিকে এগিয়ে এলো। ডিরেক্টর সাহেবকে ফোন করে নিতে হবে একটা।অাজকের কাজের অাপডেট……

লিফটে ঢুকেই, নীরা একটা বড়সড় শক খেলো।পেছনে মি. তামিম দাঁড়িয়ে। 
তিনি নিশ্চয় একটা চুমু খাবেন এখন। নীরা কি ব্যাগ থেকে ছুড়ি বের করবে?? কতবড় শয়তান!! একদম তক্কে তক্কে লিফটে বসে অাছে।

নীরা খুব সাবধানে ব্যাগের চেইনটা খুলে নিলো।ছুড়িটা হাতে নিতেই নীরা কেঁপে উঠলো…
তামিম ততক্ষণে পিস্তল ঠেকিয়ে ধরেছে নীরার কোমড়ে। 
——–মিস নীরা, ডোন্ট মুভ…
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগের চেইনটা বন্ধ করে হাত দুটো উপরে তুলে নিলো, শুকনো গলায় বলল, 
——- একটা চুমু খাবেন প্লিজ। এর বেশি না। 
তামিম পেছন থেকে টেনে ধরলো নীরাকে।নীরার যে কি ভয়ানক সুড়সুড়ি তামিমকে কি বলবে??
নীরা কাঁপা কাঁপা গলায় অাধো স্বরে বলল, 
———এখানে ওখানে হাত দিবেন না।অামার সুঁড়সু্ড়ি অাছে। প্লিজজজজ……

তামিম পেছন থেকে অারো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নীরাকে।
——-অনুরোধ যখন করছেন। তাহলে একটা চুমু খেয়েই ফেলি।

তামিম একটা চুমুতেই থামলো না। সে বরং জামার পেছনের জিপটা খুলে নিচ্ছে……
নীরা নড়ে উঠলো একটু, 
——–নড়াচড়া মানা করেছি না।উফ্…. একটা গুলি করবো যে কেউ অাওয়াজও পাবে না।

নীরা চোখ বন্ধ করে মনে মনে একটা অকথ্য গালি দিলো তামিমকে। লিফটের দরজাটা একবার খুলে যাক, সে চামড়া শুদ্ধু তুলে নেবে এর….বদমায়েশ। উফ্ শেভ করেনি নাকি?? গলার কাছে দাঁড়ি খোঁচাচ্ছে। তামিম গাঢ় করে গাল ঘষলো নীরার গালে। 
নীরা বিড়বিড় করে বলল, 
——-দাঁড়ির খোঁচায় দাগ হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। অাস্তে ভাই….গালে দাগ হলে ঝামেলা অাছে।

তামিম বা-হাত বাড়িয়ে লিফটের সুইচটা অাবার টিপে দিলো। লিফট অাবার উপরে উঠছে। 
নীরা দাঁতে দাঁত চেপে পাথর হয়ে অাছে। 
——-গাল মিষ্টি মিষ্টি লাগছে কেনো??? 
কিরকম একটা মিষ্টি গন্ধও… … সো সুইট….
——-গাল মিষ্টি না। ফেশিয়াল করিয়েছি মাত্র। ফেশিয়ালের পর এরা একটা ক্যাপসুল মাখিয়ে দিয়েছে। এটা অাধঘন্টা রেখে মুখ ধুয়ে নিতে হবে পরে।এজন্য মিষ্টি মিষ্টি লাগছে… 
——-অাগে বলেননি কেনো?? অামি সেটা খেয়ে ফেললাম। পেট খারাপ করে যদি?? 
তামিম পিস্তলটা অারেকটু দাবিয়ে চেঁপে ধরলো, 
——-এন্টিকিসিং মেডিসিন মেখে ঘুরে বেরানো হচ্ছে এখন, তাই না?? থু….. 
অামার কি পছন্দ না বলতে তো পারেন….

নীরা জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকলো।
——-পিঠের চেইনটা বন্ধ করুন।পায়ে ধরি অাপনার।

চেইন বন্ধ করতে হলো না,
ইয়েস! তিনতলায় এসে লিফটের দরজা খুলে গেছে। 
নীরা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়ে এলো। তামিম পাশে পাশে অাসছে, 
——-অাপনি এমন কেনো করছেন অামার সাথে?? এত অসভ্যতা! ছিঃ…
——-অামার ফোন ধরছেন না কেনো।ফোন কেটে দিয়ে মোবাইল অফ।অামার রাগ লাগছে তাঁতে…

——-অামার ফোন, অামার ইচ্ছা। শুনুন অাপনি যেটা ভাবছেন, অামি কিন্তু সেটা নই। দরিদ্র, ভঙ্গুর পরিবারের মেয়ে, ভেবেছেন ধরে ধরে চুমু খেয়ে নিলে অামি ভয়ে কাউকে কিছু বলবো না। এরকম কিন্তু নয়, অামি পুলিশে কমপ্লেইন করবো। অামি প্রতিবাদ করতে জানি।
——-সেটা করছেন না কেনো?? 
তামিম হাত বাড়িয়ে নীরার হাতটা টেনে ধরলো। 
——মিস নীরা, অামরা পুলিশ কমপ্লেইনের ব্যাপারে বসে কথা বলতে পারি তো… নীরা হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো না, একমুহূর্ত ভাবলো বরং। এই লোককে ভয় দেখিয়ে পিছু ছাড়ানো যাবে না। কাবু করতে হবে অন্যভাবে।অন্য প্যাঁচে ফেলতে হবে। ইমোশনাল ব্লাকমেইল।

——-চলুন বসেই কথা বলি বরং।
তামিম পিস্তলটা ক্যারিয়ারে রাখতে রাখতে বলল, 
——অামার এখন ডিউটি টাইম। অথচ কাজ ফেলে অামি অাপনার কাছে বসে অাছি। 
——-কেনো বসে অাছেন?? 
——-অাপনি ফোন ধরেননি বলে।ফোন বন্ধ করে সুখী হয়ে হাটছেন বলে….

নীরা নিজেকে ঠান্ডা রাখার জন্য লম্বা করে শ্বাস নিলো। সে দুদিন পর একটা নামীদামী কোম্পানীর হয়ে কাজ করবে। পাবলিক প্লেসে নো ঝামেলা।
দুটো কোল্ড কফি বলা দরকার। নীরার বলতে হলো না; তামিমই অর্ডার দিলো।

——-অাপনি অামার কাছে যেটা চান সেটা অামি দিতে পারবোনা। 
——–কেনো??
——–অামাদের দু’জনের ক্লাস অালাদা। 
তামিম হাসলো। 
——-যত্তসব বোকা বোকা কথা! 
——–মোটেও বোকা বোকা কথা না।অাপনি কি জানেন মি. তামিম?? অামরা ঢাকায় যে বাড়িটিতে থাকি, সেটি অামাদের না। অামাদের গ্রামেও কোনো বাড়ি নেই এখন। সোঁজা কথায়, অামরা ভাসমান জনগোষ্ঠী। 
——–তাতে সমস্যা কি??? 
——-অারো শুনুন, শরবত বিক্রির অাগে অামার বাবা কারওয়ান বাজারে সব্জি বিক্রি করতেন।অামার বড় দুই ভাই বাবার দোকানে ছিলেন সাহায্যকারী। অাধাপঁচা সব্জিগুলো অামরা কখনোই বিক্রি করতাম না, এগুলো অামরা বেছে বাড়ি নিয়ে অাসতাম, নিজেরা খেতাম। 
বুঝতে পারছেন?? বস্তি ক্যাটাগরির জীবনযাত্রা ছিলো। এসব দেখে অামাদের ফুফু মাসে মাসে কিছু টাকা দিতে থাকলেন।

——–অামাকে এসব কেনো বলা হচ্ছে??? অামি এসব বাংলাপিডিয়া শুনতে চাই না। 
——-শুনতে হবে, এই যে অাপনার অামাকে চুমু খাবার এত সাঁধ.. সে জন্য শুনতে হবে।
অামাদের এত অভাবেও দুটো ভালো জিনিস অামাদের ছিলো। তা হলো, অামার দুই ভাইয়ের ব্রেইন। তাঁরা দুজনেই পড়াশোনায় এত ভালো ছিলেন যে, বলার বাইরে। খাতা কলম নেই, বই -টেবিল নেই। তাও বছরশেষে সেরা রেজাল্ট।

বড় ভাই’র যখন চাকরি হলো, অামরা ভাবলাম, অামাদের স্ট্যাটাস বুঝি বদলে গেলো, কিন্তু মোটেও কিন্তু তা নয়। ভাইয়া মারা গেলেন রহস্যময় রোড এক্সিডেন্টে। 
অামাদের জাত অাবার নেমে গেলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অামরা শরবত বিক্রি করতে শুরু করলাম। 
সেই শরবতের ব্যবসাও এখন শেষ।

——-অাপনি এসব তথ্য অামাকে শোনাচ্ছেন কেনো???
——কারণ অাপনি যেটা চান, সেটা কখনোই সম্ভব নয়! 
——–অবশ্যই সম্ভব। অামি জানি মিস নীরা, অাপনি একদিন অনেক নামীদামী মডেল হবেন। অনেক টাকা হবে অাপনার। 
দামী গাড়িতে…চড়বেন। 
——–ওওওওওও.. তাঁর মানে অামার টাকা হবে দেখেই পিছু নিয়েছেন। এজন্যই টার্গেট ধরেছেন। ওহো….. 
কি সাংঘাতিক ধান্ধাবাজ অাপনি। অামি যদি মডেল হয়ে বড়লোক হই, তাহলে অামায় বিয়ে করবেন। অার এখন অামি অাপনার প্রডাক্ট ;তাই না??

——-উফ্। সেরকম কিন্তু নয়!বেশি কথা বলেন অাপনি। অামি সবসময় অাপনাকে মিস করি…. সবসময় অাপনার কাছে এলে অামার হার্টবিট….

নীরা উঠে দাঁড়ালো। 
——–টাকার লোভে এত প্রেম তাই না?? হবো না অামি মডেল। রাস্তায় ভিক্ষে করবো এখন থেকে, দেখি বিয়ে করে দেখান অামাকে। চুমু খান অামাকে….. 
তখন অামায় অাদর করতে কেমন মন চায় দেখি….

——–অাপনি যেরকম, সেরকম না হলে অামি হয়তো অাপনাকে; অামার জীবনে অামি কোনো কিছুতে প্রথম পছন্দ ছাড়া. দ্বিতীয় ………

নীরা তামিমের পুরো কথাটা শুনলো না।
সে পাশের টেবিলে গিয়ে সত্যি সত্যি একটা লোকের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, 
——-কাকাগো, অাল্লাহর নামে দুইটা টাকা দেন। ভদ্রলোক অবাক চোখে নীরার দিকে তাঁকিয়ে অাছেন। 
নীরা অাবার কাকুতির স্বরে বলল, 
——-চাচাগো, দুইডা ভিক্ষা দেন। ভাত খাবো। 
ভদ্রলোক ভয়ার্ত গলায় বললেন, 
——-সত্যিই টাকা দিবো??? 
নীরা ধমক দিলো, 
——-অামি কি অাপনার শালী; যে ঢং করবো??? ভিক্ষা চাই, ভিক্ষা দেন।নাকি ভিক্ষা নাই??না থাকলে, বলেন মাফ কইরা দিবো।

ভদ্রলোক একশটাকার একটা নোট বের করে ভয়ে ভয়ে নীরার হাতে দিলেন।

নীরার অাকস্মিক অাচরণে তামিম হতভম্ব। 
নীরা একশটাকার নোটটি নিয়ে তামিমের কাছে এগিয়ে এলো, 
——-এটা অামার জীবনের প্রথম ভিক্ষার টাকা।
এই এখন থেকে, অামি ভিখিরী নীরা।
অামি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করবো। দেখি, বিয়ে করুন অামায়, তারপর চুমু খেতে মন চাইলে হাজারটা চুমু খাবেন তখন।

তামিম কোনো কথা না বলে, হাঁ করে তাঁকিয়ে অাছে। 
——-অাপনার অাসলে অামাকে সারাজীবনের বউ হিসেবে পছন্দ না, চুমু খাবার জন্য রাস্তার সস্তা মেয়ে ভাবেন অামায়।বিয়ে করে সাথে নিয়ে চলার মত ভাবেন না।
অামি কিন্তু মোটেও তা নই।
অামি অামার মতো মি.তামিম। অামার শ্রেণীর কাউকেই অামি বিয়ে করবো। 
তাঁর সাথে সম্পর্কে অামার কোনো দ্বিধা থাকবে না। তাঁর ও থাকবে না।
মি.তামিম,
সমান্তরালে তাঁকাতে কোনো কষ্ট নেই। উপরে-নিচে তাঁকাতে গেলে চোখে ব্যাথা করে। শফিক ভাইয়ের অবস্থা বুঝুন। বে্চারা উপরে তাঁকাতে গিয়ে দৃষ্টি পু্ড়ে গেছে। নিজের সন্তানের মুখ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছেনা।

তামিম মুখ হাঁ করে তখনো দাঁড়িয়ে।

নীরা একটা তৃপ্তির হাসি হাসলো। যাক্… পাগলটাকে থামানো গেছে এবার।
নীরা গটগট করে হে্টে চলে এলো। এবার অার অন্তত ব্যাটা ঝামেলা করবেনা। যাক্ বাবা.. বাঁচা গেলো….

???

তামিম চট করে রিতুকে একটা ফোন করলো, 
——-হ্যালো রিতু, মাকে একটু জিজ্ঞেস করতো, অামি যদি এক্ষুণি বিয়ে করে ফেলি, মা কি বেশি রাগ করবে?? 
——-এক্ষুণি বিয়ে করবি?? 
——-হুঁ। তুই মাকে একটু ডেকে জিজ্ঞেস করতো। 
——-মা, ছাদে ভাইয়া। অামি যেতে পারবো না এখন, পড়ছি অামি। তুই বাবাকে বল না, বলে বিয়ে করে ফেল।

——-উফ্, বাবাকে ফোনে পাচ্ছি না। তুই মাকে বল… যা.. দৌড়ে যা রিতু। পাত্রী চলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি কর… প্লিজ….. তোঁকে অামি দশ হাজার টাকা দিবো… যা…
——-অাচ্ছা, যাচ্ছি। তুই বরং পাত্রীকে ধরে অাটকা……

রিতু হাসছে। শব্দ করে হাসছে।

তামিমের মাথা ভনভন করছে, সাক্ষী লাগবে, হারুনকে বলতে হবে… 
——–রিতু একটু কুইকলি যা…. প্লিজ. বোন……

চলবে…………………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*