হলিডে…. [প্রথম অংশ]

লেখাঃ তৃধা আনিকা

নীরা প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়ালো।
পার্কিং লটের এই নিরিবিলি জায়গাটা নিশ্চয় পায়জামা ঠিক করার জন্য উপযুক্ত। তাড়াহুড়ো করে বেরুতে গিয়ে সে উল্টো পায়জামা পড়ে চলে এসেছে! এখন একটানে পায়জামা খুলবে, দ্বিতীয় টানে পায়জামা পড়ে ফেলবে ব্যস… কাজ ফুরুৎ… 
অাশেপাশের কোথাও থেকে একটা অাওয়াজ অাসছে।কেউ একজন কি ব্যাথা ট্যাথা পেয়েছে?? 
নীরা সামনে এগিয়ে গেলো। একজন স্যুট টাই পরিহিত ভদ্রলোক উহ্ অাহ্ করছেন! তাঁর হাত কেঁটে গেছে। গলগল করে রক্ত পড়ছে।রক্তে নীল স্যূটের বেশিরভাগই মাখামাখি।মেঝেতে পরে অাছে কিছু এলোমেলো কাগজপত্র। বেশিরভাগেই রক্ত!
কিন্তু লোকটা কাটা হাত নিয়ে অাহাম্মকের মত ফাইল ঘেটে কিছু একটা গাড়ির অাশেপাশে খুঁজছেন! নীরা বিব্রত এবং বিরক্ত হয়ে এগিয়ে গেলো! 
লোকটা কাতর ভঙ্গিতে ছুটে এলো, 
—–অামি ল্যাফ্টহ্যান্ডার। ডানহাতে কিছুই পারিনা।অাপনি কি অামার হাতটা বাঁধতে সাহায্য করবেন?? তাঁর ডানহাতে সাদা কাপড়ের ছোট্ট টুকরা! 
নীরা মনে মনে লোকটাকে অকথ্য একটা গালি দিলো।হাত কেটেছে অনেকখানি, এই ছোট্ট কাপড়ে কিচ্ছু হবেনা।
নীরা ভদ্রলোকের টাইটা একটানে খুলে নিয়ে কাঁটা হাতটায় চেঁপে ধরে বাঁধলো।রক্তের তোড়ে নীরার হলুদ জামাও মেখে গেছে।ভদ্রলোক ও মাই গড, ও মাই গড বলে গোঙানোর মত অাওয়াজ করছেন।হাতটা বেঁধে দিয়ে নীরা ভদ্রলোকের মেঝেতে পড়ে থাকা ফাইল গুলো কুড়িয়ে গাড়িতে তুলে রাখলো..! লোকটা খুঁড়িয়ে হাটতে হাটতে কাউকে ফোন করে নিলো একটা।

—–অনেকটা গভীর কেটেছে, অাপনার হাত! স্টিচ লাগবে! হাসপাতালে যান।
—–অামি একা যেতে পারবোনা।অাপনি কি অামায় সাথে করে নিয়ে যাবেন?? অাপনি কি ড্রাইভিং জানেন ম্যাডাম?? 
বলতে বলতে ভদ্রলোক নীরার হাত চে্পে ধরলেন।নীরার দুহাত রক্তে মাখামাখি।
ভদ্রলোকের টাই গলে কাটা হাত দিয়ে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে।অার কিছুক্ষণ থাকলে এই ব্যাটা নির্ঘাত রক্ত শূন্য হয়ে মারা যাবে।এতবড় একটা লোক এমন করে হাত কাটলো কিভাবে??অাশেপাশে তো ছুড়ি কাঁচি কিছুই নেই!
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো! 
—–অামি ড্রাইভিং জানি না।অাসুন অাপনাকে রিক্সা করে নিয়ে যাই…. নীরা ভদ্রলোকের হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো। এ’কি ভদ্রলোকের বুকের ভেতর শার্টেও রক্ত, অারও কেটেছে নাকি?? 
নীরা ভয়ার্ত চোখে তাঁকালো।ভদ্রলোক ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন,
—–ম্যাডাম, অামার শরীরের অারও বিভিন্ন জায়গায় কেটে অাছে। অাপনি দয়া করে অামায় অাশেপাশের একটা হাসপাতালে নিয়ে চলুন।

বলেই লোকটা বা হাতে নীরার কাঁধ চেপে ভর করে হাটতে চাইলো। 
একরাশ বিরক্তি অার উৎকণ্ঠা নিয়ে নীরা লোকটাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হলো।

হাসপাতালে এসে অবধি দু-ঘন্টা নীরা বসে অাছে।এরা যেতে দিচ্ছে না। বলছে, রোগীর ডিটেল বলে ফরম ফিলাপ করে কিছু এডভান্স করতে। নীরার সাথে এগারোশো পঞ্চাশ টাকা ছিলো, ড্রেসিং মেডিসিনে পুরো টাকাটাই সে দিয়ে দিয়েছে।সাথে টাকা নেই।নীরা অপেক্ষা করছে নিয়ে অাসা লোকটা হয়তো, টাকার ব্যাপারে কিছু বলে তাঁকে বিদায় দিবে। কিন্তু সেই লোক অজ্ঞান! কেবিনে দুতিনবার উঁকি মেরে দেখেছে সে। 
নীরা মনে মনে লোকটাকে অারেকটা ভীষণ ভয়াবহ গালি দিলো। লোকটার জন্য অাজ তাঁর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।
দুপুর ১২টা থেকে তাঁর শরবত ভ্যানে বসার কথা। এখন বাজছে দেড়টা। তাঁরমানে বেঁচাকেনার পুরোটাই মাটি। দুপুর রোদে শরবত যতটা চলে, পরে অার ততটা নয়। অাজ বাবা নিশ্চয় তাঁর থেকে ডাবল বেঁচবে।নীরাদের শরবতের ভ্যান মোট তিনটা।বাকি দুটোই তাঁর বাবার তত্বাবধানে অাছে।
তবে
নীরা বসে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভূগোলও পরিবেশ বিদ্যা ভবন বরাবর গেটের সামনে। সবসময়ই বাবার দুটো ভ্যান থেকে তাঁর ব্যবসা ভালো হয়।
এখন অাবার এডমিশন টেস্ট চলছে।১২টা থেকে দুটোর মধ্যেই প্রায় তিনহাজার টাকার বেচাকেনা করতে পারতো সে…..
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। 
—–অাপনার রোগীর জ্ঞান ফিরেছে.. ৪০৬ না??? 
অাপনার রোগী যণ্ত্রনা করছে।একে নিয়ে বিদেয় হোন এখনি।

বয়স্ক একজন নার্স এসে প্রায় নাক কুঁচকে কথাটা বলল।
নীরা উঠে দাঁড়ালো।লোকটা অাবার কি ঝামেলা বাঁধিয়েছে???

নীরার যেতে হলো না, হাতে গলায় বেন্ডেজ নিয়ে ভদ্রলোক চেঁচাতে চেঁচাতে এগিয়ে অাসছেন। 
——এটা কোনো পরিবেশ হলো?? এরকম করে এরা রোগীদের রাখে!! ভালো মানুষই অসুস্থ হয়ে পড়বে!! 
অাপনি দেখে দেখে এই হাসপাতালেই অানলেন?? 
নীরা ভদ্রলোকের হাত চেঁপে ধরে টেনে নিয়ে বাইরে এলো। 
——অামার দু-হাজার টাকা খরচ হয়েছে।টাকাটা দিন , অামি চলে যাবো অাপনার জন্য অামার যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে।
——এরকম একটা বাজে হাসপাতালে এনে দু-হাজার টাকা?? বলতে বলতে ভদ্রলোক নীরার হাতে দু-হাজার টাকার দুটো নোট গুঁজে দিলো। 
নীরা ঠান্ডা গলায় বলল,
—–অাপনার সাথে তাড়াহুড়ো করে অাসতে গিয়ে, পার্কিং সাইটে অামার পায়জামা ফেলে এসেছি।অাপনি গাড়ি অানতে গেলে, সেটা খুঁজে নিয়ে এসে ফেরত দিবেন। 
অামি এতক্ষণ অধর্নগ্ন হয়ে শুধু জামা পড়ে অাপনার চিকিৎসা করেছি।একটা ধন্যবাদ দিন অামায়! 
ভদ্রলোক ধন্যবাদ দিলেন না। নীরা হাসপাতাল ছেড়ে বাইরে এলো।অাজ অার শরবতের ভ্যানে যাবেনা সে! সোজা বাসায়…..রক্তারক্তি জামা পাল্টাতে হবে!

নীরাকে দেখামাত্রই লাবণী প্রায় চিৎকার দিয়ে বলল, 
——-এক্সিডেন্ট করেছিস….?? কখন?? 
ও মাই গড.. তুই তো হাটু পর্যন্ত উদাম করে অাছিস.. সিরিয়াস কিছু?? ওহো নীরা, অামি ভাবলাম তুই ফিরে রান্না করবি।.. তুই তো এক্সিডেন্ট করে সারা গা রক্ত মাখিয়ে এসেছিস…
দেখি কোথায় কেটেছে…?? 
লাবণী উৎসুক হয়ে নীরার পায়ের দিকে তাঁকালো।
——-অামিই রান্না করবো ভাবী। তুমি বরং ফ্রিজ থেকে একটু মুরগীর মাংস নামিয়ে রাখো! 
—–তাঁর মানে তুই বেশি একটা অাহত হসনি??

নীরা বিরক্ত হয়ে লাবণীর দিকে তাঁকালো।
—–অামি অাহত না হওয়ায় তুমি কি খুব দুঃখ পেয়েছো,ভাবী???
লাবণী মৃদু হাসলো।
—–এত রক্ত কেনো?? 
——-একটা মানুষ কাটতে ইচ্ছে হলো; কেটে এলাম! প্রতিদিন শরবতের লেবু কাটি, অাজ মানুষ কাটতে ইচ্ছে হলো… মনের ইচ্ছা বলে কথা…
লাবণী হেসে ফেললো।
——মায়ের কি অবস্থা??
——ঘুমুচ্ছেন এখন। ডক্টর বলেছেন, প্রেশার ঠিকই অাছে, তবু কেনো তিনি এত দুর্বল বুঝতে পারছেন না। কিছু টেস্ট দিয়েছেন!

——অার ছোটভাইয়া???
লাবণী জবাব না দিয়ে, নীরার সামনে থেকে সরে গেলো!!

লাবণী নীরার বড় ভাবী। নীরার বড় ভাই মারা গিয়েছেন তিনবছর হতে চলল।কিন্তু লাবণীকে দেখলে এখনো নতুন বৌ বৌ লাগে! স্বামীমৃত্যু জনিত গভীর কষ্টের কোনো ছাপই যেনো তাঁর চেহারা স্পর্শ করতে পারেনি!

নীরা নিজের ঘরের দিকে যাবার অাগে ছোটভাইয়ার ঘরে উঁকি দিলো।শফিক কাঁদছে।মেয়েদের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! নীরা এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসলো, 
——কিরে ভাইয়া, ভাবী অাজও অাসলো না!??
——না, বলে দিলো ফের যদি অামি তাঁকে অানতে যাই, অামি নাকি তাঁর মরা মুখ দেখবো। 
শফিকের কান্না এবার বিলাপে পরিণত হলো! ——ভাবী বলেছে তো কি হয়েছে?? তুমি অাবার যাবে, গিয়ে তাঁর পা ধরে বসে থাকবে! অামার মনে হয় প্রতিদিন বিকেলে গিয়ে একঘন্টা করে তাঁর পা ধরে বসে থাকলে একমাসের মধ্যেই ভাবী ফিরে অাসতে রাজি হবে।
শফিক চোখ মুছে কৌতুহলী কণ্ঠে বলল,——-সত্যি বলছিস?? পা ধরে বসে থাকবো??
——হুঁ! বড়লোকের মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কাবু করে বিয়ে করেছো, কষ্ট তো করতেই হবে একটু!!
——তোর ভাবী যদি অাবার পুলিশে দেয় অামায়…?? 
——দিলে দিবে।একবার তো তোমার জেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অাছেই।অত কষ্ট অার হবে না।

শফিকের চোখ চকচক করে উঠলো! 
——তুই সাথে যাবি একবার! তুই চেষ্টা করলে হয়তো অারও ভালো হবে। 
দাঁড়া, অামি তোর ভাবীকে এক্ষুণি ফোন করে জানাচ্ছি! শফিক টেবিলের উপর রাখা খেলনা মোবাইলটা কানে দিয়ে ব্যাকুল সুরে ডাকতে লাগলো, 
—-বর্ষা, শুনছো.. হ্যালো শুনছো বর্ষা….নীরা বলল, অামি যাতে প্রতিদিন গিয়ে তোমার পা ধরে বসে থাকি.. হ্যালো

নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো! 
নীরার এই ছোটভাইয়া যে কিনা ঢাকা মেডিকেলের সেরা ছাত্র ছিলো, তাঁর অাজ এ অবস্থা!

নীরা দরজার কাছে যেতেই শফিক পিছু ডেকে বলল, 
——তুই এমন নি-লেংথ ফ্রক পড়ে হাটছিস যে/? তোঁকে দেখে অামার খুব লজ্জা লাগছে।
—-এটা এখনকার ফ্যাশন ভাইয়া! কেনো ভালো লাগছে না??
শফিক হাসলো! 
——তুই এত সুন্দর কেনো হয়েছিস বলতো নীরা? মাঝে মাঝে তোকে অবিকল মায়ের মত লাগে..

নীরা জবাব দিলো না। তাঁর কথা বলতে ভালো লাগছে না!

রান্নাঘরে ঢুকেই নীরা দেখলো, পেঁপে কাটা হচ্ছে! পেঁপে নীরার সবথেকে অপছন্দের সব্জি।

——পেঁপে কেনো কাটছো ভাবী??? মুরগী রান্না করবো বললাম না। 
—–ঘরে মুরগী নেই।
——নেই মানে??পরশুদিনই তো অানা হলো/ 
—–বাবা বললেন, তাই গতকাল সকালে রান্না করে খাওয়া হয়ে গেছে। তুই ছিলি না তাই তো…
এখন পেঁপে ভাজা করে ফেলনা! 
একটা প্লেট ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে
নীরা কঠিন গলায় বলল, 
——কিচ্ছু রান্না হবে না অাজ এ বাড়িতে!


নীরা রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এলো। 
লাবণী চেঁচামেচি শুরু করেছে, মুরগীর মাংস কি অামি একা খেয়েছি?? এতগুলো পেট বাড়িতে। শুধু যেনো অামারই মুখ! স্বামী নেই বলে অাজ খাবার দাবারের হিসেব ও হচ্ছে!
যা খাচ্ছি খেটেখুটে খাচ্ছি! এমনি তো না….

ঘরে এসে নীরা তাঁর সবথেকে প্রিয় সবুজ শাড়িটা বের করলো।সে এখন সাজঁগোজ করবে, তারপর বাড়ির সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে যাবে।

শাড়ি পড়ে নিচে নামতেই নীরা দেখলো বাবা ফিরেছেন।তবে তাঁর মুখের সামনে বালতি ধরা! তিনি অবিরত বমি করে যাচ্ছেন।তাঁর মানে তিনি অাজও মদ খেয়েছেন! 
নীরা নিচে এসে বাবার কাঁধে হাত রাখলো। নীরার বাবা সোবহান অাহমেদ, 
অার দেড়ি করলেন না।নীরার দিকে ফিরে তাঁকালেন এবং, গলগল করে বমি করে নীরার শাড়ি ভাসিয়ে দিলেন। নীরা দুঃখিত চোখে বাবার দিকে তাঁকালো। ——ঘরের ভিতর এত ভালো শাড়ি কেনো পড়েছিস মা?? তাও শাড়ি গায়ে ধরতে এলি অামায়! অামি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছি…
—–বাইরে যাবো ভাবছিলাম বাবা।তোমাদের সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে যাবো।
বাইরে খাবার কথা শুনে লাবণী বেশ বিরক্ত হলো।
——ঘরে মুরগীর মাংস না থাকলেই বাইরে খেতে হবে?? এটা কোন ধরনের ঢং নীরা? তোরা গেলে যা; অামি যাবো না।

বমি মাখা শাড়ি নিয়ে নীরা কলতলার দিকে রওনা হলো।
অাজ তাঁর হয়েছেটা কি?সকাল থেকেই দিন শুরু হয়েছে খারাপভাবে।প্রথমে রক্ত, তাঁরপর বমি! খারাপ জিনিসটা কি চেইন রিএকশানের মত?? একটার পর একটা। অাজ তাঁর জন্য একটা বিশেষ দিন।অথচ এ বাড়িতে সবাই তা ভুলে গেছে।সকালে সে একটা নতুন হলুদ জামা পড়ে সেজেগুঁজে বের হলো।কেউ একটু তাকাঁলোও না।
নীরা একমনে গায়ে পানি ঢালতে লাগলো।

রাতে খেতে বসেই নীরার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।পেঁপে ভাজার বদলে ঝোল করা হয়েছে, একগাদা পানির মধ্যে ফ্যাকাশে পেঁপের টুকরো ভাসছে।
এই তরকারিই সবাই বেশ মজা করে খাচ্ছে!
নীরা ওয়াক বলে একটা বিশ্রী শব্দ করে উঠে দাঁড়ালো।শফিক হেসে ফেললো। 
——কিরে বমি পাচ্ছে নীরা?? বাবার মত??এই নে বাটি, করে ফেল বমি।সামটাইমস ভমিটিং ইজ ভেরি হেল্পফুল ফর স্টমাক।দ্যাখ হিউম্যান বডিতে সবচাইতে ব্যস্ত অার হার্ডওয়ার্কিং পার্ট হচ্ছে…… 
নীরা শক্ত চোখে তাঁকিয়ে বলল, 
——নো ডাক্তারি ভাইয়া! অাই হেইট পেঁপে। 
——ডাক্তারি অার কিইবা করতে পারলামরে নীরা। তোর ভাবী সব ভেস্তে দিয়ে দিলো।ফার্স্ট ইয়ারে অামার রেজাল্টের পর বারী স্যর তো অামায় ডেকে নিয়ে…. 
শফিকের গলা ধরে এসেছে। 
নীরা মমতায় অার্দ্র হওয়া গলায় বলল,
——ভাত খাও ভাইয়া! একদম কাঁদবে না। ভাত ঠিকমত না খেলে তো চেহারা শুকিয়ে যাবে। ভাবী রাগ করবে তো! 
শফিক সাথে সাথে হাসলো, এবং খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।

লাবণী কোলের মধ্যে গম ভাজা ভর্তি বাটি নিয় বেশ অায়েশ করে টিভি দেখছে।ফাঁকে ফাঁকে একটা দুটো করে গম মুখে পুড়ছে।নীরার ইচ্ছে করলো, সে লাবণীর সাথে বসে একটু গল্প করে।

——মায়ের ঘরে খাবার দিয়েছো ভাবী??? 
——খাবার দিতে হয়নি। তিনি এসে সবার অাগে ডিম ভাজি করে খেয়ে নিয়েছেন। 
——খেয়ে নিয়েছেন?? 
—–হুঁ
——ওহ.. অামি শুতে গেলাম। কাল সকাল অাটটার অাগে কিন্তু ডাকবে না অামায়!
লাবণী নীরার কথা শুনলো না; সে গভীর মনোযোগে সিরিয়ালের হিরোর মায়ের চেঁচামেচি শুনতে ব্যস্ত।
নীরা অাবার ডাকলো, 
—–শুতে গেলাম ভাবী!

নীরার দিকে না তাঁকিয়েই লাবণী বলল,
——নীরা অামার ঘরের অালমারীটা খুলছে না। লকটা জ্যাম হয়ে গেছে একটু দেখবি…..

বিরক্তিতে নীরার গলায় একগাদা থুথু পাকিয়ে এলো। 
মনে মনে লাবণীকে একটা কঠিন গালি দিতে গিয়েও নিজেকে সামলালো!

লাবণীর ঘরে অালমারী খুলে নীরা ছোটখাটো একটা শক খেলো…
সামনের তাঁকে সুন্দর একটা হাতের কাজ করা জামা ঝুলানো।বেগুনী কাপড়ে লাল সাদা শেড শুতোয় লতানো ফুলের কাজ।নীরা বিড়বিড় করে বলল, “ওয়াও”…
জামায় পিন করে
উপরে বেশ বড় কাগজে লিখা, 
“শুভ জন্মদিন নীরা
অাঠারো হলো তো.. 
এবার তো বিয়ে দিতে হয় নাকি???”

???
তামিম প্রায় হুংকারের মত করে বলল, 
——এখনো ডিটেক্ট করা যায় নি মানে কি?? ওয়ান এন্ড হাফ এন অাওয়ার হেজ পাসড….খুঁজে পাওয়ার ক্লু হলো।মেয়েটার ডানপায়ে হাটুর কাছাকাছি একটা ব্লাক স্পট অাছে।হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজ জুম করুন। যাস্ট জুম ইট!
——স্যার, অার দু-ঘন্টা দিন স্যার।….. অামি এক্ষুণি…
——প্লিজ সেন্ড মি দ্যা ভিডিও! 
——কিছু ফর্মালিটিস করতে হচ্ছে! 
——তো করুন না।হারি অাপ! অাই নিড এভরি সিংগেল ডিটেল এবাউট হার। রাত দশটার মধ্যে সব কালেক্ট করে তাঁর প্রোফাইল রেডী করুন।
ইট’স এন ইমার্জেন্সি। বুঝতে পারছেন না এরা কোনোরকম কিছু ঘটালে পুরো ইনসপেকশানটাই মাটি হয়ে যাবে। 
তামিম ফোনটা কেটে বিছানায় ছুঁড়ে ফেললো! 
রাগে তাঁর সমস্ত গাঁ কাঁপছে.. এই কোন হাদারাম অফিসারদের নিয়ে কাজ করে সে? একটা মেয়ের ডিটেল খুঁজতে এদের দিন পেরিয়ে যায়!! শিট শিট শিট…

ডিনারে বসে তামিম বিরক্ত মুখে বলল, 
—–অামি শুধু স্যূপ বলেছি মা, তাও তুমি এতকিছু করলে? ডিসগাস্টিং… 
সেলিনা ছেলের কথার জবাব দিলেন না।
——অপচয়ের একটা লিমিট থাকা দরকার! 
টুয়েন্টি অাইটেমস না হলে তোমার… 
সেলিনা
ছেলেকে চোখ ইশারায় থামতে বললেন।
—-বাড়ি ভর্তি চাকর বাকর, একদম বকবি না অামায়। চুপ….. 
——চাকর বাকর কথাটা বলতে তোমায় অন্তত অামি হাজারবার নিষেধ করেছি মা.. তুমি কেনো যে??

সেলিনা ছেলের ধমকাধমকিতে একটু ও রাগলেন না!
তাঁর মন অাজ অনেক ভালো। এই বাড়ির সবথেকে বড় অাপদ বিদেয় হয়েছে। 
ছেলেকে যে তিনি কিভাবে অানন্দের খবরটা দিবেন বুঝতে পারছেন না। 
তামিম একমনে মোবাইল স্ক্রল করে যাচ্ছে।
স্যূপ মুখে দিয়েই তামিম থু করে ফেলে দিলো! 
——-চিনি দিয়েছো কেনো মা?? 
——কেনো ভালো হয়নি?? লাস্ট টাইম যখন সিংগাপুরে গেলি; তখন তো এই স্যূপ খেয়েই ওয়াও ওয়াও করলি। এখন নাক ছিটকাচ্ছিস কেনো?? 
তামিম জানে মা ইচ্ছে করেই স্যূপে চিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন।এর কারণ তামিম যাতে স্যূপ ফেলে ভাত খায়! তাঁর মায়ের বদ্ধমুল ধারণা ভাতের বিকল্প বলে কিছু নেই।
তামিম বিরস মুখ করে বলল,
——দেখি ভাত দাও! করলা জাতীয় তেতো কিছু কি অাছে?? 
——করল্লা খাবি কেনো??তোর কি মন খারাপ?? 
——; মন খারাপ। মেজাজও খারাপ…
সেলিনা ছেলের পাতে করল্লা ভাজি দিতে দিতে বললেন, 
——এক্ষুণি তোকে একটা মজার খবর দিবো, সাথে সাথে তোর মন ভালো হয়ে যাবে। 
তামিম ফোন রেখে খাওয়ায় মনোযোগী হলো। 
——-কবুতরের ঝোল দিই একটু!!?? কত রক্ত খুঁইয়ে এসেছিস!! বা-হাতটা নাড়ছিস কেনো?? দেখি, প্লেট এদিকে দে, অামি খাইয়ে দিচ্ছি। 
বিরক্তিতে তামিমের দম বেড়িয়ে যাচ্ছে, মা সবসময়ই বেশি বেশি। তামিম তাও হাসিমুখে হাঁ করলো। 
——দাঁড়া, একটা ছবি তুলে রাখি; রাতে অাপ্লোড করে দিবো। তোর বাবা দেখে হিংসেয় মরে যাবে।

——ওহ মা।অামার অফিসের কেউ যাতে না দেখে। বি কেয়ারফুল।
সেলিনা হাসিমুখে ছেলেকে ভাত খাওয়ানোর ছবি তুললেন।
তারপর একটু গলা নামিয়ে বললেন,
——-তোর বাবা চলে গেছেন। ইতুও চলে গেছে।
বাপ-বেটিতে মিলে বুঝুক এবার সংসার কাকে বলে?? 
অামার সাথে ঘাটাকুচা চলবে না।এ বাড়িতে বাস করতে হলে, নো ঘাটাকুচা।সবসময় তোঁর জব নিয়ে কথা… হোয়াই??

তামিমের গলায় ভাত অাটকে বিষম খেয়ে গেলো সে.. 
—–এই নে…. পানি খা! 
অামিও বলে দিয়েছি দেশের সবচাইতে বড় উইং এ অামার ছেলে চাকরি করে, তোমার মত কাপড় ব্যবসায়ী হবে নাকি? দেশের জন্য রক্ত দিবে, ফাইট করে, গুলি করে….. 
তামিম মাকে থামিয়ে দিলো,
——অার রিতু?? রিতু কোথায়??? 
——রিতু যায়নি। সে পড়ছে।কাল তাঁর বায়োলজি এক্সাম! মুখ হাঁ করে থাকবি না। ভাত খা।তোর ঔষধ অামার ঘরে রেখে দিয়েছি।
তুই অাজ অামার সাথে ঘুমোবি।
রাতে তোকেঁ নিয়ে একটা মুভি দেখবো, সিলসিলা! অমিতাভের হিট! বুঝলি তামিম, তখন অামি তোঁর বাবার প্রেমে হাবুডুব খাচ্ছি, এরমাঝে মুভিটা রিলিজ করলো! অামি করলাম কি দুটো টিকিট কাটিয়ে…
——সরি মা! অাজ মুভি দেখা হবেনা। অামার কাজ অাছে! পরশু জাপানের একটা টিম অাসছে, ফুল সিকিউরিটি প্ল্যানে এখনো কিছু এডিটিং বাকী।
——-অত কাজ দেখাবি না। এন এস অাই’র তুই একলা অফিসার না।শোন্ না, টিকিট দুটো অামি করলাম কি তোর বাবার অান্ডারওয়ারের সাথে স্টেপলার দিয়ে অাটকে দিলাম। তোর বাবা তো সকালে অফিস যাবে বলে অান্ডারওয়ার হাতে নিয়েই দিলো চিৎকার
… চাচীমা মানে তোর দাদী সাথে সাথেই বললেন, এটা নির্ঘাত ভুতের কাজ…. 
এটুকু বলে সেলিনা খিলখিল করে হাসতে লাগলেন।

মায়ের এই অদ্ভূত ব্যাপারটা তামিম একদমই বুঝতে পারেনা।যতক্ষণ কথা বলেন সব বাবাকে নিয়ে, অথচ বাবার সাথেই তাঁর দুনিয়ার ঝগরা! এর নাম দাম্পত্যজীবন!?? হুহ..

তামিম দ্রুত খাওয়া শেষ করলো। রিতুর সাথে কথা বলা দরকার। এ বাড়িতে রিতু হলো মন খারাপের একমাত্র ঔষধ,।

রিতুর ঘরের
দরজায় উঁকি দিয়ে তামিম হালকা কাঁশলো, 
——রিতু…..অাসবো?? 
রিতু পেন্সিলে কিছু একটা অাঁকছে! না তাঁকিয়েই বলল, 
——নো ভাইয়া।নো…
—–তাহলে দরজায় দাঁড়িয়ে একটা কথা বলি? 
—–ওয়েট যাস্ট টু মিনিটস! দ্যান ইউ উইল স্টার্ট…
তামিম হাসলো। রিতু হচ্ছে এমন একটা মেয়ে, যে সবকিছু রুটিনের মধ্যে থেকে করে।কোনো বিষয়েই তাঁর কোনো ধরনের অাদিখ্যেতা নেই; সব ধরনের খুঁতখুঁতে ব্যাপারে তাঁর রেসপন্স থাকে স্বাভাবিক ।এবং যেকোন কথার শুরু সে খুব পজিটিভ ভাবে করে।
——ভাইয়া, তুই এই অরেঞ্জ কালারটা কেনো পড়েছিস অাবার?? তোকে দেখেই অামার বৈরাগীর মত লাগছে। মন খারাপ হয়ে গেছে অামার! ধুততত..
তামিম হাসলো, কারণ সে জানে, রিতুর নিজের কখনোই মন খারাপ হয়না;, একটুও না।কথাটা সে বলেছে, কারণ হলো, সে বুঝে গেছে তামিমের মন খারাপ।

রিতু ড্রয়িং ছেড়ে চশমা খুলে টেবিলে রাখলো। 
——ঘরে অায়, ভাইয়া। তোঁকে পাঁচমিনিট দেয়া হলো এর মধ্যে কথা বলে বিদায় হবি। 
তামিম ঘরে ঢুকলো না। দরজায় দাঁড়িয়েই বলল, 
——তোর কি মনে হয়, অামার বুদ্ধির লেভেল কেমন???? মানে মানুষকে বুঝার ক্ষমতা কি অাছে??? থাকলে সেটা কত পার্সেন্ট?? 
একটু ভেবে বল। তোকে দুমিনিট সময় দিলাম, ভেবে বল। 
রিতু অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, 
——হাতে কয়টা স্টিচ লাগলোরে ভাইয়া??
——-সাতটা। সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সব মিলিয়ে তেইশটা!
—–মাই গড! তাও দিব্যি সুস্থ হাটছিস!! গুড…গুড……. রিয়েল হিরো!
তুই জব জয়েন করে দুবছরে এই নিয়ে চারবার এটাকে পড়লি। কোনদিন যে কে মেরে টেরে দেয়….ওরা ক’জন ছিলোরে?? পিস্তল ছিলো না সাথে তোঁর??তুই কেনো এটা সবসময় ক্যারি করিসনা??
——অামার কথার জবাব দে রিতু.. প্রসঙ্গ পাল্টাবি না। 
রিতু চুলের ক্লিপটা খুলে চুলটা ঘেটে নিতে নিতে বলল, 
——এনএসঅাইতে তুই যখন ট্রেনিং শেষ করিস, প্রাইম মিনিস্টার নিজে তোর পিঠ চাপড়ে কি বলছিলেন?? দ্যা মোস্ট ইন্টিলিজেন্ট বয়! এখন অাবার নিজের বুদ্ধির লেভেল নিয়ে ঘ্যাঁনঘ্যান করছিস কেনো?বুদ্ধির লেভেলেই তুই একজন এ.ডি। তোর বুদ্ধি অনেক ভালো, অাগামী বছরই তুই একটা প্রমোশন পাবি অামি নিশ্চিত! 
তামিম মাথা চুলকালো দরজা থেকে একটু সরে এসে ঘরের ভেতরে দাঁড়ালো! 
——না মানে ধর, সাধারন দৈনন্দিন জীবনে অামি কেমন?? অামার প্রফেশন বাদ দিয়ে জাজ কর।
রিতু তামিমের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো।
——ঘটনা কি বলতো ভাইয়া??
এন এস অাই’র এক তুখোড় ইয়ং অফিসার তুই; যে কিনা দুদিন পরপর বিভিন্ন সাকসেসফুল মিশন করছে, সে অাজ এত নার্ভাস কেনো??

——- না মানে, একটা মেয়ে ধর, তোর মত, পুঁচকে মেয়ে।এই এতটুকু ছোট…
সে অাজ অামায় ৮৫০টাকা ঠকিয়েছে।হাউ কুড সি মেইক মি এ…. তারপর অাবার বলল, অামি যাতে তাঁর পায়জামাটা খুঁজে দিই.. এর মানে কি???
রিতু ভ্রু কুঁচকে তামিমের দিকে তাঁকালো, চশমাটা চোখে পড়তে পড়তে বলল,
——পায়জামাটা মানে?? তুই কি তাঁর পায়জামা লুকিয়েছিস নাকি? বল রাধা বল টাইপ কিছু??
তামিম জিভ কাঁটলো। রিতুকে পায়জামার ব্যাপারটা বলা বোকামী হয়েছে। ব্যাপারটা অশ্লীলতার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। 
——মানে, মানে হয়েছে কি?? যখন ওরা অামাকে এটাকটা করলো, তখন মেয়েটা কোথা থেকে জানি উদয় হলো, অামি তো সকালে ক্যাজুয়াল বেড়িয়েছিলাম… উইথাউট গান….

——-পায়জামা যখন লুকিয়েছিস, ভদ্রভাবে গিয়ে ফেরত দিয়ে অাসবি।অার শোন, মেয়ে বিষয়ক সব কথাতে কখনোই সিরিয়াস হয়ে পড়বি না। এরা পায়জামা দিয়ে শুরু করে রবীন্দ্রনাথে চলে যেতে পারে! বি কেয়ারফুল ভাইয়া।তো্কে দেয়া
পাঁচমিনিট শেষ, ! বিদেয় হ।অামি ভীষণ কঠিন একটা চিত্র অাঁকছি। লেভেলিংটা বাঁকি। প্লিজ..ভাইয়া. 
——অামার ধারণা কি জানিস রিতু??? মেয়েটা কোনো গ্রুপ ট্রুপে অাছে, খুব সাহসী বুঝলি। মিথ্যা বলার সময় মুখটা সিরিয়াস ছিলো।
রিতু দু-হাতে তামিমকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, 
——মেয়েদের বুদ্ধির সাথে কখনো ছেলেদের তুলনা করবি না। কক্ষোনো না। 
মেয়েটা তাঁর একটা পায়জামা খুঁজে দিতে বলেছে, তাঁর মানে এই নয় যে, অপমানে তোঁকে মরে যেতে হবে। পায়জামা ব্যাপারটা অতটাও মিন নয়!

বাই দ্য ওয়ে ভাইয়া, বাবাকে গিয়ে তোর এই ব্যান্ডেজ ফ্যান্ডেজ দেখিয়ে অায়। তোঁর উপর এটাকের কথা শুনে টেনশানে পাগল হয়ে অাছে। অামায় এই নিয়ে ২০বার কল করেছে। 
অামার ডিস্টার্ব হচ্ছে!
তামিম হাসলো, 
ক্লাস টেনে পড়া একটা মেয়ে এই অল্পবয়সে কত ম্যাচিউর! সি হ্যাজ দ্যা ফায়ার! 
রিতু একদিন অনেক দূরে যাবে, অাকাঁশ ছোঁয়া বড় হবে সে!
——তোর হেয়ার স্টাইলটার নাম কিরে রিতু, দারুণ লাগছে দেখতে তোকে। 
—–ডোন্ট মেইক মি ক্রেজি! গো ভাইয়া….

রিতুর ঘরে থেকে বেড়িয়ে তামিম নিচে এলো। বাবার কাছে একবার যাওয়া দরকার।
ইতুটা রান্না টান্না করতে গিয়ে হাত টাত অাবার পুড়িয়ে ফেলেনি তো???? খাবার পার্সেল করে নিয়ে যেতে হবে…..বাবা কোন বাড়িতে গিয়েছে জানা দরকার। বনানীতে নাকি বসুন্ধরায়??? মা’কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে….

???
হারুন কা্চুমাচু গলায় বলল,
—–স্যার, প্রোফাইল রেডী, অামি কি শুরু করবো?? 
হারুন তামিমের ব্যাক্তিগত সহকারী। তাঁর স্বভাব হলো, কথা বলার সময় ভয়ার্তভাবে কাচুমাচু ভঙ্গি করা।অথচ তামিম জানে, হারুন ভীষণ ব্রেভ একটা ছেলে। এই কাঁচুমাচু ভঙ্গিটা করে সে এক্সট্রা কনসার্ন পাবার জন্য।
—–ইয়েস… 
নাউ স্টার্ট….

জায়ান্ট স্ক্রিনে প্রথম ছবিটা দেখে তামিম মোটামোটি একটা হাই ভোল্টেজ শক খেলো। শরবত ভ্যানের উপর পা তুলে মাঝিদের মত মাথায় গামছা বেঁধে সেই মেয়েটা বসে অাছে….. চোখে অাবার সানগ্লাসও। পড়নে কটকটে লাল ফুল হাতা শার্ট, হাতা ভাঁজ করে কনুই পর্যন্ত তোলা, এবং পড়নের লুঙ্গি ভাঙ্গা দিয়ে ভাঁজ করে হাটু অবধি তোলা। পায়ে লাল কেড্স! ডান হাতে বিশাল ডায়ালের ঘড়ি।কড়া মেরুন লিপস্টিক ঠোঁটে একহাতে সনগ্লাস একটু তুলে ধরে বা-চোখটা বন্ধ করে অাছে। 
সবই অাছে শুধু ডান হাতে সিগারেটটা বাকি। এর মাঝে শার্টের বুকের বোতামটা খুলে কলার পেছনে খাড়া করে টানা।এক পায়ের উপর অারেক পা তুলে দেওয়ায়,
লুঙ্গির নিচে দিয়ে ডান পায়ের গ্রিন শর্টস বেড়িয়ে অাছে।

হারুন এই ছবি কোথায় পেলো, কে জানে?? 
তামিম খুক খুক করে কে্শে উঠলো।
হারুন বলতে শুরু করলো. ওকে স্যার নাউ অাই এম ডেসক্রাইভিং…
—-ইনি নীরা অাহমেদ।
বয়স ১৮
পড়াশোনা ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষ! অাপাতত বন্ধ।বর্তমানে একটি শরবতের ভ্যানের মালিক।নিজেই শরবত বিক্রি করেন। ব্যবসার বয়স ৯মাস।
মডেলিং এর শখ, বিভিন্ন ধরনের ফটোশ্যূট করে রেখেছেন।ভালো নাচ জানেন।
স্কুলের বিভিন্ন কনটেস্টে নাচের পুরষ্কারও অাছে।
তামিমের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো, ছবিটা স্ক্রিন থেকে সরানো দরকার।বুকের ভেতর কিছু একটা বিঁধে গিয়ে গা কাঁপুনি দিচ্ছে! 
——নেক্সট,…. 
——ইনি সোবহান অাহমেদ। নীরার বাবা। ইনিও শরবত ব্যবসায়ী। তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা যাবার সাত বছর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ইনি সপ্তাহে দুদিন ভীষণ মদ্যপান করেন।মানুষ হিসেবে সহজ সরল।
——নেক্সট…
——ইনি, পারভীন অারা। সোবহান অাহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী।
শারীরিক ভাবে অসুস্থ… এবং এই পরিবারই তাঁর একমাত্র অাশ্রয়স্থল।
—–নেক্সট…
——এরা দুজন মিস নীরার দুই ভাই।
ইনি
বড় ভাই শাহীন অাহমেদ ;মারা গেছেন তিনবছর হলো।মৃত্যুর কারণ রোড এক্সিডেন্ট।মূলত ইনি মারা যাবার পরই পরিবারটিকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার সম্মুখীন হতে হয়।

ছোটভাই শফিক অাহমেদ, এমবিবিএসের স্টুডেন্ট ছিলেন, ২য় বর্ষে পড়া অবস্থায় এক জেলা প্রশাসকের মেয়ের সাথে প্রণয় ও বিয়ে হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসক বাবা তা মেনে নেন নি, মামলা করেন। শফিকের জেল হয় এবং জেল বেরিয়ে এখন মি.শফিক মানসিক ভারসাম্যহীন। মি. শফিকের অসুস্থতাই মিস নীরার পড়াশুনা বন্ধের কারণ।অসুস্থ ভাইকে দেখাশোনা করতে গিয়ে তিনি পড়াশোনা ড্রপ করেন।
মিস নীরার ইনকামের বেশিরভাগটাই মি.শফিকের অসুস্থতাজনিত কারণে খরচ করা হয়। 
ইনি লাবণী অাহমেদ। নীরার বড় ভাবী
.. এ বাড়িতেই অাছেন। পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাইভেটে।
পড়াশোনার খরচও যোগান দেন মিস নীরা।
—–নেক্সট…
রাজিয়া বানু।মিস নীরাদের বাসার একজন কাজে সাহায্যকারী।সকালে একবেলা কাজ করে যান। বেতন দু-হাজার টাকা। 
এন্ড দ্যা লাস্ট,
ইনি মাহবুব রনি।মি.শফিকের ক্লাসমেট।এ বাড়িতে যাতায়াত অাছে।প্রায়ই মিস নীরা ও লাবণীর সাথে গভীর রাত পর্যন্ত গল্প করেন।পারিবারিক বিভিন্ন কাজেও সাহায্য করেন।

এই টোটাল ফ্যামিলি যে বিশাল দোতলা বাড়িটিতে থাকেন, সেটা তাদের নিজেদের নয়। মিসেস শরীফা নামের সোবহান সাহেবের এক দু-সম্পর্কের বোনের।তিনি বাইরে থাকেন, বাড়ির দখল বজায় রাখতে পরিবারটিকে অাশ্রয় দিয়ে রেখেছেন।
এই
পরিবারটির অায়েরউৎস তিনটি শরবত ভ্যান, মিসেস শরীফার পাঠানো টাকা, যা তিনি প্রতি মাসেই পাঠান এবং বাড়ির পেছনের বিরাট পুকুরের মাছ! এই মাছের ব্যাপারটা দেখাশোনা করতে ফিরোজ বলে একজন বয়স্ক লোক অাছেন। তিনি মিস নীরার দূরসম্পর্কের চাচা। 
দিস ইস অল দ্য ডিটেল ফর নাউ স্যার! 
—–মি. হারুন। অাপনি দুজন ওয়াচম্যান কনফার্ম করুন, মিস নীরার ভ্যানের অাশেপাশে যাতে থাকে।
অাগামী পরশুর পর তাঁর সাথে অামাকে মিট করানোর একটা ব্যবস্থা করুন। 
অার একটা ছোট্ট কাজ করুন, মিস নীরার ফটোটা অামার মোবাইলে সেন্ড করুন। 
হারুন মৃদু হাসলো। 
—–ইয়েস স্যার।

এই তামিম স্যারের হারুন অন্ধ ভক্ত! ডিপার্টমেন্টের সবচাইতে সাহসী অফিসার তিনি। বিদেশে এ যাবত করা প্রতিটা ট্রেনিং ব্যাচে তিনি ফার্স্ট হয়েছেন। বিদেশী ভি-অাই-পি ছাড়াও ইদানীং মিনিস্টার, প্রাইম মিনিস্টারের বিভিন্ন মিটিংয়ের সিকিউরিটি প্রোগ্রাম গুলোতে স্যারের ভূমিকা বেড়ে গেছে।সেই স্যার কিনা, এক শরবতওয়ালীর সিকিউরিটি নিয়ে চিন্তিত! হারুনের কপাল ঘামছে, অন্য ব্যাপার নয়তো??

নীরার একদমই ভালো লাগছে না। লোকগুলো প্রায়ঘন্টাখানেক ধরে বসে অাছে।এর অাগেও তো এমন অনেক লোক তাঁকে বিরক্ত করেছে, এতক্ষণ তো বসে থাকেনি, কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করে, বিদেয় হয়েছে।
তিনমাস অাগের কথা, এই তো সন্ধ্যার দিকে নীরা ভ্যান গুছাবে গুছাবে ঠিক করছিলো, কালো গাড়িতে এসে একটা অাধবয়সী লোক বলল,
—-যাবি?? পুরো রাতে দশহাজার পাবি!
নীরা প্রথমে খুবই ভদ্রভাবে বলল, 
—–বিদেয় হোন। 
কিন্তু লোকটা গেলো না।ঘন্টাখানেক অাশেপাশে ঘুরঘুর করলো। ভয়ে নীরার অাত্মা শুকিয়ে অাসছিলো।নীরা সেটা চেঁপে দাঁত কামড়ে ছিলো।শেষমেশ কাস্টমার কমে একটু ফাঁকা হাতেই নীরা দাঁ হাতে দৌড়ানি দিলো, অাশেপাশের লোকজন মিলে লোকটার গাড়ি ভাংচুড় করে একাকার করে দিলো। এদেরকে কি সেভাবে একটা দৌড়ানী দিবে?? নীরা ভালো করে লক্ষ্য করলো।মোট তিনজন লোক, সাথে গাড়ি অাছে।ওয়ারলেসে কথা বলছে! পুলিশের লোক?? হোক গিয়ে…..
এর মাঝে হলুদ শার্ট পড়া লোকটি নীরাকে বেশি জালাচ্ছে।বারবার বলছে তাঁদের বস নীরাকে ডেকেছে। বসটা কে?? এমপি, মন্ত্রী টাইপ?? হলে হবে, যত বড় বসই ডাকুক,
নীরা একদম ঘাবড়াবেনা। 
হলুদ শার্ট পড়া ভদ্রলোকটি অাবার এগিয়ে অাসছে। নীরা ফিল্টারে ক্রাশ করা অাইস দিতে মনোযোগী হলো।
—–ম্যাম, অাপনি অাজ যেতে না পারলে কোনো সমস্যা নেই।একটা টাইম দিন। অামাদের স্যার জরুরি কিছু কথা বলবেন বলেই ডেকেছেন।অাপনার ভয়ের কিচ্ছু নেই। অামরা গ্যারান্টি দিচ্ছি কিচ্ছু লিক হবেনা।

নীরা লোকটিকে মনে মনে ভয়াবহ একটি গালি দিলো। 
——অামরা অনেকক্ষণ ধরে অাছি।অাপনি কোনো কিছুই ক্লিয়ার বলছেন না। একটা জরুরি ব্যাপার বলেই….স্যার নিজেই অাসতেন, কিন্তু স্যারের সাথে অাপনার কানেকশনের কথাটা পাব্লিক হলে বরং অাপনার বিপদ!

নীরা মনে মনে বলল, শালা, অামার বিপদ??; তোর বড় স্যারের এমন জায়গায় অামি এসিড ঢালবো যে তোর বড় স্যারের সব পাব্লিক হয়ে যাবে। 
বিপদ কার তখন টের পাবি।

কিন্তু মুখে বলল, 
——তোদের স্যারকে গিয়ে বল, জরুরি কথা এখানে এসে বলতে। এইসব জরুরি কথার মেয়ে অামি না। ক্লিয়ার?? 
এখন বিদেয় হ… 
বলে নীরা মোটামোটি না দেখার ভান করে লোকটার উপর একজগ শরবত ঢেলে দিলো।
——তোকে কি বললাম, বিদেয় হতে বললাম না?? উফ্ অামার কত শরবত লোকসান করলি.. দেখি সর সর….


হারুন মোটামোটি নার্ভাস ফিল করতে লাগলো। মিস নীরা তুই-তুকারি শুরু করেছেন। লক্ষণ ভালো না। এর মধ্যে হারুনের শার্ট প্যান্ট শরবতে একাকার। এরকম শরবত গায়ে বসে থাকার মানে হয়। 
কনস্টেবল হারিছ মিটিমিটি হাসছে।হারুন যে কেনো এই দুটো গাঁধাকে সাথে অানতে গেলো। কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না। শরবত শুকিয়ে অাঠা ধরে যাচ্ছে। 
স্যারকে জানানো দরকার!

হারুন অাবার জায়গায় গিয়ে বসলো। 
—–হ্যালো স্যার.. 
তিনি কিছুতেই দেখা করতে রাজি হচ্ছেন না। 
——ভেরি স্ট্রেঞ্জ হারুন। একটা কাজ যদি তুমি প্রপার করতে পারো, একটা মানুষকে কনভিন্স করতে…. দরকার হলে টাকা অফার করো। বলো যে, যে সময়টা উনার বেঁচাকেনার ক্ষতি হবে সেই টাকাটা তুমি পে করবে! গো এন্ড স্পিক…
——ওকে স্যার অামি দেখছি।

নীরা মনে মনে হালকা অানন্দ অনুভব করলো। লোকটার ভেতর ভয় ঢুকিয়ে দেয়া গেছে, এখন শুধু সেটা বাড়িয়ে দিতে হবে। এইসব লোককে ফেইস করার প্রধান ও প্রথম অস্ত্র হলো সাহস….

হারুন অাবার এগিয়ে এলো, 
——ম্যাম অামাদের সাথে গাড়ি অাছে, অাপনি সাথে গেলে অামরাই অাবার ড্রপ করে দেবো! দেখুন, অামরা কিন্তু টাকা দিয়ে সবটা ক্ষতিপূরণ দিতে এগ্রি করছি।

এবার নীরার মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের হালকা একটা শীতল স্রোত বেয়ে গেলো। এরা টাকা পর্যন্ত চলে এসেছে। সর্বনাশ! ভদ্রবেশি শয়তানের দল। পুলিশ হয়েও মেয়ে তুলতে চলে এসেছে।অাবার বলছে ক্ষতিপূরণ?? 
এই ব্যবসা করতে এসে যে নীরাকে কতকিছু জানতে হচ্ছে, শিখতে হচ্ছে, মানুষের কত রূপ যে দেখতে হচ্ছে।।।হুহ….

হারুন কাকুতির সুরে বলল, 
——প্লিজ ম্যাম, একটা অপিনিয়ন তো দিন। অামরা এগারলি ওয়েট করছি। স্যারের সাথে অাপনার মিটিং টা খুব জরুরি।অাদারওয়াইজ অাপনার কিন্তু বিপদ হতে পারে….
নীরা একটু ভাবলো, একশানে কি যাবে??? 
সেই দুষ্টু লোকটাকে যেভাবে শায়েস্তা করেছিলো, এভাবে করবে নাকি?? নীরা অাশপাশটা ভালো করে দেখে নিলো, লোকজন ভালোই অাছে।নীরা বিসমিল্লাহ বলে বড় ছুড়িটা বের করলো। বড় একটা চিৎকার দিয়ে দৌড়ানী দিতে হবে।অাশেপাশের লোকদের মনোযোগ দরকার…….

???
হারুন ফিরলো, রাত অাটটার পরে।বা-হাতে ব্যান্ডেজ।কপালে ব্যান্ডেজ! 
তামিমের মাথায় রক্ত চড়ে অাছে। কি ঘটেছে না ঘটেছে কিছুই তো ক্লিয়ার না।
তামিম কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তাঁর অাগেই হারুন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 
——অামি স্যার দাঁড়িয়ে কথা বলায় ছিলাম। কথা বলার সময় হুট করে নীরা ম্যাডাম ছুড়ি বের করলেন। তারপর দেখি পাব্লিক দৌড়াচ্ছে অামাদের।শুরু হলো এলোপাথাড়ি মার।
স্যার, ঘটনা এখনো অামি কিছুই বুঝতে পারছিনা। হঠাৎ কি হলো, একটা গ্যাঞ্জাম তৈরি হয়ে গেলো! ইউনিভার্সিটির পোলাপান স্যার, ধোলাই তো বুঝেনই! কনস্টেবল অাতিক, দৌড়ে গিয়ে ড্রেনে পড়ে যায়! বেচারার হাত ভেঙ্গে গেছে স্যার!! 
হারুন চিন্তিত মুখে পকেট থেকে টিস্যূ বের করে কপাল মুছলো।সে ঘটনার অাকস্মিকতায় বিস্মিত!

—–অফিসের গাড়ি কোথায়?/
——অবস্থা বেগতিক দেখে ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি নিয়ে সটকে চল এসেছে স্যার। এদেশের লোকের স্যার অন্যতম হবি গাড়ি ভাঙা।অল্পের জন্য বেঁচে গেছে স্যার। পাব্লিক যে হারে জমায়েত হয়েছিলো, সব গুঁড়া করে দিতো!

তামিম বিস্মিত চোখে তাঁকিয়ে। একটা মেয়ে যে কিনা তামিমের জন্য কোনো একটা ব্যাড এটাকে পড়তে পারে বলে তামিম ভয় পেয়েছিলো, সে কিনা এই অবস্থা তৈরি করে….
তামিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, 
——বাসায় যাও হারুন । রেস্ট নেও।অাই উইল হ্যান্ডেল দ্যা ম্যাটার! 
—–নীরা ম্যাডাম, হুট করে কেনো এমনটা করলেন, ব্যাপারটা যদি একটু ইন্টারোগেশন করে.. অামরা কি উনার বাড়িতে একটা মিটিং ফিক্স করতে পারি?? 
তামিম কঠিন সুরে বলল, 
—–নো!

???
নীরা বাড়ি ফিরেই দেখলো, রনি ভাই এসেছেন। রনি ভাই অাসা মাত্রই বাড়িতে উৎসব উৎসব ব্যাপার চলে অাসে।
লাবণী ছুটে এসে বলল, 
—–দেখে যা নীরা, রনি এত বড় একটা মাছ নিয়ে এসেছে!!অামি তো ভয়ে অস্থির, এই মাছ কাটবো কিভাবে??রনি বলল, নীরা ফিরুক, ও অাগে মাছটা দেখুক তারপর কাটা হবে।
—-মাছ দেখবো না, ভাবী। তুমি বরং রনি ভাইকে মাছটা তাড়াতাড়ি কেটে ফেলতে বলো, তাড়াতাড়ি রান্না; তাড়াতাড়ি খাওয়া। অতঃপর অাড্ডা।

——মানুষটা এত শখ করে মাছটা নিয়ে এলো, দেখবি না??তোরা কেউ বেচারার মন বুঝিস না।

নীরা লাবণীর দিকে তাঁকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো।

——ভাবী, একটু পোলাও ও রান্না করে ফেলোনা। বড় মাছের পেটির ঝোল দিয়ে পোলাও কিন্তু দারুণ হবে!

লাবণী রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, 
——–নীরা, তুই কি কোনোকালে অামার ‘মন’ ছিলি??? মনের কথা সব বুঝে যাস….

নীরা জবাব দিলোনা। দৌড়াতে গিয়ে সে ব্যাথা পেয়েছে! ডানপায়ের পাতায় বেশ খানিকটা কেটে গেছে। বদের হাড্ডিদের সে পাক অারেকবার.. সব শোধ নেবে।

নীরার পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে শফিক বিমর্ষ গলায় বলল, 
—–মানুষের সেবা করার মত মহান পেশা বোধহয় অামার হবার কথা ছিলো না। পাপী অামি বুঝলি, কোথাও হয়তো এমন পাপ করেছি যে ডাক্তারি পড়াটাই চলে গেলো। কত ভালো লাগতো পড়াটা….. 
——তুমি কি অাবার শুরু করবে পড়াশোনা???
——নারে, অামি পাগল মানুষ, কিইবা অার ডাক্তারি করবো?? মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানিস, বর্ষাই অামার জীবনে অভিশাপ হয়ে এসেছিল! কত ভরসা করে ভালোবেসেছিলাম…..
শফিক হু হু করে কেঁদে উঠলো। 
——-রনি ভাইয়া বিশাল মাছ এনেছে, চল নিচে যাবে, খাওয়া দাওয়া হবে, অাড্ডা হবে।
——না। রনিকে দেখলে কলেজের কথা বেশি মনে পড়ে। বুক ব্যাথা করে, চোখ ব্যাথা করে…. সহ্য করতে পারিনা! 
এইড বক্সটা গুছিয়ো রাখতে রাখতে শফিক শার্টের হাতায় চোখ মোছে বিছানায় বসলো। 
অসহায় চোখে তাঁকিয়ে বলল, 
——–তোর পড়াশুনা করতে ইচ্ছে করে না নীরা??? 
নীরা শক্ত গলায় বলল, ——না..
——নাচ করতে???
——একদম না। 
——-অামি খুব অাশা করে অাছি নীরা, কোনো একটা মীরাকেল হবে, অামাদের সব ঠিক হয়ে যাবে, বর্ষা ফিরে অাসবে, তুই পড়বি, নাচবি, লাবণী ভাবিকে… 
নীরা উঠে দাঁড়ালো, 
——যাই,অামি খাবার নিয়ে অাসি তোমার জন্য.. এঘরে…. অাজ গোসল করেছো তো??

শফিক হ্যাঁ সুচক মাথা নেড়ে অাবার কাঁদতে লাগলো। কষ্ট অার কষ্ট!

নীরার ইচ্ছে করলো ভাইয়ের মাথায় সে একটু হাত বুলিয়ে বলে, ভাইয়া তুমি ঘুমের মাঝে একটা ভীষণ দুঃস্বপ্ন দেখেছো, এই দেখো, চোখ মেলে দেখো সকাল হয়ে গেছে….দুঃস্বপ্ন শেষ!

নীরা বসে অাছে ঢাকার নামীদামী এক শপিংমলের কফিহাউসে। সাততলার এই কফি হাউসটা দারুণ সুন্দর। জানালার কাঁচ গলে ঢাকার রাতের রাস্তা দেখতে বেশ চমৎকার লাগছে।গাড়ির বাতিগুলো কেমন লাইন ধরে নিয়ম মেনে যেনো জ্বলছে।
গাঢ় সন্ধ্যার এমন সময়টা এখানে বসে বাইরে তাঁকালে মন একদম ভালো হয়ে যায়। 
অথচ নীরার সামনে বসা মানুষটা….?? 
নীরা এক দৃষ্টিতে বাইরে তাঁকিয়ে অাছে। 
গা গুলানো ভাব হচ্ছে তাঁর.. 
——দেখো, বেশি কিছু তো অার তোমার কাছে চাওয়া হচ্ছে না। শুধু সূটিং টাইমটার ফাঁকে ফাঁকে উনার সাথে একটু মিষ্টি করে কথা বলা। ফরেন ট্যূরগুলোতেও কিন্তু তোমাকে পে করা হবে।
তোমার ছবিগুলো দেখেই কিন্তু প্রডিউসার সাহেব এক বাক্য সব বাজেটে রেডী। বুঝতে পারছো তো, তোমায় কত পছন্দ হয়েছে।
অার,
ডি, এস প্রডাকশনের একটা ছবি মানে ব্লকবাস্টার। 
অামরা পথ থেকে তুলে এনে নায়িকা দাঁড় করাই, এর অাগে দেখো…. সামীরা মেয়েটা কোথায় ছিলো?? খেতে পেতো না, থাকার জায়গা ছিলোনা।অার এখন?? শুধু তাঁর 
হ্যান্ড পার্সটার দামই সাত লাখ টাকা।

নীরা কি বলবে বুঝতে পারছে না!! একটা মোটামোটি নামীদামী লোক এমন ভালো একটা জায়গায় নিয়ে এসে এত কুৎসিত একটা প্রস্তাব দেবে ভাবা যায়??মডেল, হিরোইন এই শব্দগুলোকে এই কিছু মানুষগুলো নষ্টামির চূড়ায় নিয়ে গেছে। 
নীরা কফিতে একটা চুমুক দিয়েই মুখ কুঁচকালো। ইস্ কি তেতো!! পেটের ভেতর কলিজা পর্যন্ত মোচড় দিচ্ছে।
——দেখুন, অামি অামার সবটুকু শ্রম দিয়ে খাটবো।মন দিয়ে কাজ করবার মত একটা স্কোপ দরকার অামার! দিনকে রাত করে খাটা, রিহার্সাল করা এসব অামি যেরকম……অামি অাসলে মুভির জন্য এখনই রেডী না।অামি টুকটাক টিভিসি করতে চাই, অথবা র্যাম্প ওয়াক।
যদি সেরকমভাবে তৈরি হতে পারি… 
——দেখো, নীরা তোমাকে কিন্তু অামরা খোঁজ লাগিয়ে বের করেছি। শুধু যদি একটা হ্যাঁ বলো, তুলে দিবো যাস্ট…..তোমার অসুস্থ ভাই; চিকিৎসার খরচ!! এত ভাবাভাবির কি অাছে, প্রডিউসার সাহেব বয়স্ক এক জন লোক ; কিইবা অার তোমাকে জ্বালাবে বলো, বুড়ো বয়সের একটু উশখুশ….. 
তুমিও উপর উপর অাঁচ কাটিয়ে এলে…

নীরা বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে এবার রেস্টুরেন্টের ভেতরে তাঁকালো, … 
সামনের লোকটার দিকে তাঁকাতে পর্যন্ত ঘেন্না হচ্ছে।
একি??
দু টেবিল সামনেই সেই হলুদ শার্টের লোকটা। ওয়েটারের সাথে কথা বলছে। ও মাই গড! নীরাকে দেখে ফেলেনি তো? সেই দৌড়ানীর কথা যদি…???? 
ওহ্ ওহ্ এক্ষুণি এখান থেকে বেরোনো উচিত।

—–দেখুন সালাম ভাই, অামি অাপনাকে পরে ফোনে ডিসিশান জানিয়ে দিবো। অামাকে যেতে হচ্ছে, জরুরি একটা কাজ অাসলে…..

তড়িঘড়ি করে নীরা একছুটে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। 
পিছনে কি একবার দেখবে??? ওহো….. সেই লোক তো পিছন পিছনই অাসছে, তবে কি ফলো করছে নীরাকে?
করুক…..নীরা সোজা সামনে হেঁটে যাবে অার তাঁকাবে না। 
নীর দ্রুত পা চালাতে লাগলো, একটা পরিচিত মুখ যদি অাশেপাশে পাওয়া যেতো.. উফ্
সামনে এটা কে?? এদিকেই তো অাসছে। সেই হাতকাটা লোকটা!
ইয়েস।
নীরাকে কি চিনতে পারবে??? 
নীরা দ্রুত পা চালালো!”! 
এক ঝটকায় তামিমের হাতটা টেনে ধরে উল্টো পথে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ———শশশশশশশসসসস.. একদম পেছনে তাঁকাবেন না! অামাকে এই মল থেকে একটু এক্সিট করিয়ে দিন। প্লিজ, প্লিজ… প্লিজ… পায়ে ধরি!!
অামাকে চিনতে পেরেছেন তো??? 
অামি সেই মেয়েটা, ওই যে যার পায়জামা ছিলো না….. হাসপাতালে
নীরা সর্বশক্তি দিয়ে তামিমকে টেনে ধরে ছুটতে লাগলো!
তামিম পেছনে তাঁকিয়ে হাত ইশারায় হারুনকে থামতে বলল! 
——ও ইয়েস ইয়েস.. অাপনিই তো… এখন কি হলো?? অাবার পায়জামা হারিয়েছে????

—–ধুরররর….
পেছনে একটা লোক অাছে, মেরুন শার্ট ব্লাক স্টেপ , খুব টেকনিক্যালি তাঁকাবেন। 
তামিম পেছন ঘুরে তাঁকালো। মেরুনে ব্লাক স্টেপ শার্ট পড়নে হারুন হতভম্ব মুখে হাঁ করে তাঁকিয়ে অাছে। তাঁর মুখের হাঁ বলছে এই শপিংমলের সব সে গিলে নেবে।
—–উফ্ এতক্ষণ তাঁকাবেন না।
দেখতে পেয়েছেন?? 
—–হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই যে সাথে সাদা প্যান্ট! 
—–হ্যাঁ ওটাই। হাদার মত মুখ। এই লোকটা একটা ডেঞ্জারাস চিজ, বুঝলেন???

—–তাই নাকি??? বলেন কি?? 
তামিম হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলো। 
——-অারে হাত টানাটানি করবেন না।অাপনার হাত তো অামি খেয়ে ফেলবো না।স্বর্ণের হাত নাকি যে নিয়ে পালিয়ে যাবো??
অারেকবার তাঁকিয়ে দেখুন তো, লোকটা কি অাসছে?? 
তামিম তাঁকালো, অসহায় চোখে তাঁকিয়ে হারুন স্থির দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। তামিম মৃদু হাসলো… 
তারপর টেনশান ভরা গলায় বলল,
—-ও হ্যাঁ লোকটা তো এদিকেই অাসছে….কারণ কি বলুন তো?? অাপনার জন্যই??? 
নীরা অারো শক্ত করে চেপে ধরলো তামিমের হাতটা, 
——অারে ওই লোকটা একটা বাংলা খবিশ! মেয়েদের দালাল; অামায় তো ওর বসের জন্য ভাড়া করতে এসেছিল। অামি একটা ছোট্টখাট্টো পাব্লিক ধোলাই দিয়ে বিদেয় করেছি!
বলতে বলতে লিফটের ভেতরে এসে নীরা একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লো! 
—–অাপনাকে ভাড়া করতে?? বলেন কি?? 
—–অার বলবেন না ভাই, এই, দুনিয়ার সব ব্যাটাই বুঝলেন, একেকটা দালাল। অামি ফিল্মের একজনের সাথে এখানে কথা বলতে এলাম, 
সেও দালাল।তারপর দেখি এই দালালটাও অামাকে ফলো করে করে চলে এসেছে।এই হাঁদামুখো লোকটা তো সেদিন তিন ঘন্টা ধরে বসে থেকেছে ও’র বসের জন্য! কেমন ধারার বস বুঝেন, তিন তিনটে ধেঁড়ে লোক পাঠিয়ে দিলো, একটা মেয়ে তুলে অানতে??
অারে বাবা, মেয়ে কি অত সোজা জিনিস নাকি?? যে দেখবি, পছন্দ করবি, অার তুলে নিবি!!?? 
মেয়ে মোটেও অত সোজা ব্যাপার নয়! 
——তাহলে মেয়ে কিরকম ব্যাপার?? 
——অনেক জটিল ব্যাপার। এই যেমন অামিই ধরুন, এই দেখুন.. বলে নীরা ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করলো, 
এটা এসিড।সালফিউরিক। অামি সবসময় সাথে রাখি।ধরুন, কখনো যদি কোনো শালা তুলেও নিয়ে যায়, ধস্তা ধস্তিতে যদি একান্তই না পেরে উঠি, তাহলে মূল পর্বে গিয়ে অাস্তে করে এসিড ঢেলে দিবো। জায়গা মত.. ব্যস.. খাল্লাস!! নীরা হাত দিয়ে কোপানোর ভঙ্গি করলো। 
——-এটা কোথায় ঢালবেন?? 
——অারে বুঝলেন না?? নীরা ডান চোখটা টিপলো!” 
—–রাস্তাঘাটে ব্যবসা করি, বুঝলেন ভাই। এইসব জিনিস রাখতে হয় সাথে! অাজকাল মানুষের চেহারা দেখেও তো বুঝা যায় না, ভালো না মন্দ! দেখবেন সাদা শার্ট কালো প্যান্টের ভদ্রলোক।অাপনি দেখে ভাবলেন, ফ্রেশ ম্যান, হয়তোবা শিক্ষক মানুষ ।পরে দেখা যাবে ফিসফিসিয়ে বলছে, কত রেট?? ছিঃ! 
মল থেকে বেরিয়ে নীরা রিকোয়েস্টের মত করে বলল, 
—– অাপনার কাছ থেকে একটা উপকার পেলাম, চলুন এক কাপ চা অন্তত খাবেন, চলুন। 
——অামি চা খাই না।
——চা না খেলে সিঙ্গারা খাবেন। চলুন। 
এই মুহূর্তে তামিমের চা খাওয়া সম্ভব না। সে এসেছে প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ের সাথে।পুরো ছয়জনের একটা টিমের সিকিউরিটি নিয়ে।

প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ে শপিং শেষ করে কফি খাবে, তারপর অাবার অন্য একটা মলে যাবে, শপিং শেষে সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখবে। হারুন কফিশপে টেবিল বুক করেছে কিনা কে জানে?? 
একটা ফোন করে দেখা দরকার। নীরা মেয়েটা রাস্তার ওপাশে গিয়েছে সিঙ্গারা কিনতে, সাদা লিকুইড টাইপ কিছু দেখিয়ে হাত ইশারায় ডেকে কিছু জিজ্ঞেস করছে। তামিম সেটা শুনতে পেলো না। হারুন অাসছে, তামিম হাত ইশারায় অাবার থামতে বলল। নীরা মেয়েটা দেখলে সর্বনাশের অার শেষ থাকবে না।সালফিউরিক এসিডের সবটুকু ব্যবহার করে ছাড়বে।
তামিম মোবাইল ডায়াল করলো। 
——-হ্যালো হারুন, ম্যাডাম কোথায়?? 
——স্যার ম্যাডাম কফি শপে, অাপনাকে ডাকছেন। 
——বলো যে অামি ওয়াশরুমে অাছি।তুমি ম্যাডামকে ছেড়ে এলে কেনো?? বাকিরা সব পজিশন মত অাছে তো?? 
——জি স্যার! ম্যাডামের কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তিনি অপেক্ষা করছেন অাপনার জন্য। অামাকে পাঠালেন। উনি অাপনাকে ছাড়া কফি খাবেন না বলছেন।

সিঙ্গারা হাতে নীরা অাসছে। 
——হারুন, প্লিজ হারি এন্ড গো। তুমি ম্যাডামের অাশেপাশে থাকো। অাসছি অামি।গো… অামি অাসছি। 
তামিম দ্রুত ফোন কেটে দিলো।

দূরে দাঁড়িয়ে হারুন স্পষ্ট দেখলো, তাঁর অতি প্রিয় তামিম স্যার নীরা নামক অগ্নিগুলি মেয়েটার সাথে হাসিমুখে সিঙ্গারা খাচ্ছেন।এই মেয়েটা সেদিন হারুনকে কি মারটাই না দিয়েছিলো??
স্যার এটা করতে পারছেন?? কষ্টে হারুনের চোখে পানি এসে গেলো। পৃথিবীটা এত নিষ্ঠুর কেনো??

???
প্রাইম মিনিস্টারের মেয়ের নাম নাফিসা নূর। পড়াশোনা করছে ইউএসএ তে। বছরে দুবার স্টাডি লিভে দেশে অাসে। তামিম এই জব জয়েন করার পর, নাফিসা দেশে অাসলেই তামিমের ডিউটি শুরু হয়ে যায়।তামিমের ক্ষীণ সন্দেহ নাফিসা দেশে এলেই ইচ্ছে করেই তামিমকে ডিউটিতে ডাঁকে।
এই নাফিসা মেয়েটার হাঁবভাব তামিমের কাছে মোটেও ভালো লাগছে না। 
অাজ নাফিসা ডার্ক গ্রিন শাড়ীর সাথে একটা স্লিভলেস ব্লাউজ পড়েছে।এই পর্যন্ত অন্তত তিনবার তামিমকে জিজ্ঞেস করেছে, 
—–মি. তামিম অামায় কেমন লাগছে?
জবাবে তামিম হ্যাঁ না কিছুই বলেনি শুধু ভদ্রতার হাসি হেসেছে।
এই মুহূর্তে নাফিসা কফিতে চুমুক দিতে দিতে নাক চুলকাচ্ছে। তামিমের বিরক্তিতে গাঁ জ্বলে যাচ্ছে, নীরার দেওয়া মাঠা জিনিসটা সে খেতে পারছে না।পকেট থেকে মাঠার বোতল বের করলেই হয়তো নাফিসা চোখ কপালে তুলে বলবে, এটা কি?? অামায় দিন তো.. অাই ওয়ান্ট টু টেস্ট ইট… 
——মি.তামিম অাপনার হাইট যেনো কত?? 
তামিম অাচমকা প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলো। 
——-জি, জি, সিক্স থ্রি!! 
——এই মাপের শার্ট প্যান্ট মার্কেটে এভেইলএবল তো?? 
——ইয়ে মানে, একটু খোঁজাখুঁজি করতে হয় অার কি! 
—— অাপনার কি রং পছন্দ বলুন তো?? 
এরকম প্রশ্নে তামিম হঠাৎ বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলো। অাসলেই তো তামিমের কি রং পছন্দ? / কোনোদিন সে ভেবে দেখেনি!! তামিম অাপন মনে বিড়বিড় করতে লাগলো… কি রং?? কি রং??
——হ্যালো, অানসার মি। প্রশ্নটা বুঝেন নি? মানে পোশাকে অাপনার কি রং পছন্দ?? 
——ম্যাম অামার মাঠার রং পছন্দ.. 
কথাটা বলেই তামিম জিভ কাটলো। বিরাট বোকামি হয়েছে। 
——-হোয়াট ইজ মাঠা??? 
তামিম পকেট থেকে মাঠার বোতল বের করে নাফিসার সামনে ধরলো। 
——-ওহ্… হোয়াট ইজ দিস?? ইজ ইট এ ড্রিংক?? অাই ওয়ান্না টেস্ট ইট… প্লিজ গিভ মি….. 
তামিম বিরস মুখে নাফিসার হাতে মাঠার বোতলটা এগিয়ে দিলো। 
নাফিসা এক চুমুক খেয়েই বলল, 
—–ওয়াও ইটস সুপারভ….এটা কোথায় পেলেন?? 
তামিম জবাব দিলো না। 
নাফিসা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, 
——-চলুন মি. তামিম!! অাপনার জন্য মাঠার রংয়ের কিছু পোশাক কেনা যাক!

তামিমের ফোনে মেসেজ এসেছে, ম্যাসেজ পাঠিয়েছে নাফিসা! অাশ্চর্য মেয়ে সামনে বসেই, এসএমএস দিচ্ছে!
Mr. Tamim, I am feeling, i’am getting lost. Why??
মেসেজটা পড়েই,
তামিম সাথে সাথেই উঠে দাঁড়ালো। এসির মধ্যেও তামিমের শরীর ঘামছে। অাজ কি গরম বেশি নাকি????

নীরাকে দেখেই সোবহান সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, 
—তোর ফিরতে এত দেড়ী হলো যে?/ রনি সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে, একসাথে খাবে বলে। 
নীরা জবাব না দিয়ে হাসলো। সিঙ্গারা খেয়ে তাঁর পেট মোচড় দিচ্ছে। বাসি ছিলো নাকি কে জানে?? 
—–ছেলেটা প্রায়ই এটা সেটা নিয়ে অাসে, তোর জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে। তোঁকে কত পছন্দ করে বুঝতে পারছিস?? শফিকের ঝামেলা শুরুর দিন থেকেই কিন্তু ও’র সব বন্ধুরা ও’কে ছেড়ে গেছে। একমাত্র রনিই সেই প্রথম দিনের মত করে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অামার কি মনে হয় জানিস, ও’ র এ বাড়িতে অাসার একমাত্র কারণ তুই!বেচারা মুখ ফুটে বলতে পারছেনা।অাজ দেখ সেই কখন থেকে বসে অাছে…..
——উনি মোটেও অামার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে না বাবা, উনার এই বাড়িতে অাসলে বসে থাকতে ভালো লাগে। অাসলে এই বাড়িটাকে উনি ভীষণ পছন্দ করেন! 
——তুই বলতে চাচ্ছিস একটা ডাক্তারি পড়া ছেলে এই বাড়িতে শুধু শুধু এসে বসে থাকে?? 
——অামি কিছুই বলতে চাচ্ছি না বাবা।
তারচেয়ে বরং রনি ভাইকে ডাকো, উনাকেই জিজ্ঞেস করে ফেলি, উনি কেনো এ বাড়িতে অাসেন??এই বাড়িতে কোন সাত রাজার ধন অাছে যে, দুদিন পরপর এতগুলো বাজার নিয়ে অাসতে হবে?? 
সোজা যদি জবাব না দেয়ে, নাক বরাবর দুই ঘুষি দিয়ে জিজ্ঞেস করবো। অামি যদি হাতদুটো পেছনে নিয়ে শক্ত করে ধরি, তুমি ঘুষিটা মারতে পারবে না বাবা??

সোবহান সাহেব খুকখুক করে কাশলেন। মেয়েটার মুখে কিচ্ছু অাটকায় না। শফিকের মত মাথাটা না অাবার যায়?? 
সোবহান সাহেব হাসিহাসি মুখ করে বললেন
——-তুই ফ্রেশ হয়ে অায়।সবাই একসাথে খাবো।
—–অামার কিন্তু অাঁধঘন্টা সময় লাগবে….
——যা…

সোবহান সাহেব মেয়ের দিকে তাঁকিয়ে মমতাসুলভ হাসি হাসলেন। তাঁর মন অাজ অনেক ভালো। রনি অাজ সবার জন্য শপিং করে এনেছে। তাঁর জন্য এনেছে পাঞ্জাবী পায়জামা, নীরার মায়ের জন্য শাড়ি, নীরার জন্য জামা, লাবণীর জন্য শাড়ি, অার শফিকের জন্য টি-শার্ট! ছেলেটা টিউশন পড়িয়ে এ মাসে যা পেয়েছে সব খরচ। ছেলেটার মন অাছে বলতে হবে। একটা জিনিসও কমদামী নয়।স্বামী হিসেবে খরুচে ছেলেরা বেশ ভালো হয়। এরা বৌকেও সবসময় খুশিমতো খরচ করতে দেয়।যার খরচ করার হাত থাকে, তাঁর কামাই করারও চেষ্টা থাকে।
এরকম ছেলের ঘরে নীরা সুখেই থাকবে।সোবহান সাহেব নিশ্চিন্ত হয়ে লম্বা একটা শ্বাস ফেললেন।মেয়েটার ভাগ্য অাছে বলতে হবে। ডাক্তার ছেলে, তাঁর উপর মনটা দেখো কত নরম। যাবার সময় যতবার সোবহান সাহেবের সাথে দেখা হয়, ততবার কদমবুসি করে। একদম যেনো নিজের ছেলে। সোবহান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। তাঁর নিজের তেমন জমানো টাকা পয়সা নেই, তবু এখন থেকে তিনি কিছুটা জমাবেন। নীরার বিয়ের সময় ছেলেটাকে একটা দামী কিছু উপহার দিবেন। যতই হোক, ডাক্তার পাত্র; পাঁচজনে দেখবার মত তো কিছু দেওয়া দরকার!

???
তামিম অনুরোধের গলায় বলল, 
——ম্যাম, অাপনি বরং কাল নোন শো তে মুভিটা দেখুন। রাতের শো শেষ করে ফিরতে ফিরতে বেশি দেড়ী হয়ে যাবে। তাছাড়া শপিং টপিং করে অাপনি অাজ টায়ার্ড ও বরং।শো এনজয় করতে পারবেন না…. 
——মি. তামিম, অাপনি কি অামার টায়ার্ডনেস নিয়ে বেশি চিন্তিত নাকি নিজের বাড়ি ফেরা নিয়ে? অামার কেনো জানি মনে হচ্ছে, ইউ অার নট ইনজয়িং মাই কম্পেনি। এম অাই রাইট??? 
তামিম জবাব দিলো না। এই মেয়ে মুভি দেখা মিস করবে না। শো শুরু হতে এখনো বিশ মিনিট বাকী। এই বিশমিনিটে অারাম করে দুটো সিগারেট খাওয়া যাবে। পেটটাও পাঁক দিচ্ছে। ওয়াশরুম যাওয়া দরকার। হারুনকে সাথে নিয়ে একটু ঘুরে অাসা দরকার, মেয়েটার সাথে বেকার ঘুরে ঘুরে মাথা জ্যাম হয়ে গেছে।

তামিম হাত ইশারায় হারুনকে ডাকলো, হারুন সেটা দেখেও না দেখার ভান করলো। নীরা চলে যাবার পর থেকেই তামিম একটা অদ্ভূত ব্যাপার লক্ষ্য করছে, তা হলো হারুন বিশেষ কোনো কথা বলছে না। তামিম কিছু জিজ্ঞেস করলে হ্যাঁ/না জবাব দিচ্ছে।মোবাইলে কল করলে রিসিভ না করে, দৌড়ে এসে সামনে হাজির হচ্ছে। হারুনের হয়েছেটা কি??? 
——ম্যাডাম, অামি একটু অাসছি। হারুন অাছে.. কিছু লাগে যদি….
——-মি.তামিম, এক্ষুণি অাপনি কোথাও যেতে পারবেন না। অাপনাকে সাথে নিয়ে অামি মুভিটা দেখবো।মুভিটা দেখার অাগে, এই মুভি বিষয়ে অামি অনুমান করে কিছু সিন বলবো অাপনাকে, অাপনি মিলিয়ে দেখবেন ঠিক হয় কিনা।
অামি কিন্তু মুভিটা দেখিনি, বুঝলেন। 
তামিম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। 
——অনুমান করে অাগে থেকেই কিছু বলার ক্ষমতাটা অামার কেমন ইমপ্রুভ করছে দেখি…..
অাগেরবারও তো, অামি অাপনাকে দুটো জিনিস অাগে থেকেই বলে দিয়েছিলাম, মনে অাছে??


এবারও তামিম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। অাগেরবারে কোন ঘটনা বলেছিলো তামিমের মনে নেই। এখন নাফিসা জিজ্ঞেস করলে বিপদ! তামিম মনে করার চেষ্টা করলো। 
সিঙ্গারার ঝাঝে বাঁজে রকম ঢেকুর অাসছে পেট থেকে। তামিম অনেক কষ্টে সেটা চেপে রাখছে। একটা সফট ড্রিংক খাওয়া দরকার।
নাফিসা সিন বলে বলে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। সিঙ্গারার সাথে পেঁয়াজ খাওয়া একদম ঠিক হয়নি, মুখে পেঁয়াজ পেঁয়াজ স্মেল এসে গেছে। নাফিসা মেয়েটা কথা বলার সময় মাঝে মাঝে একদম ঝুঁকে কাছে চলে অাসছে। পেঁয়াজের গন্ধ যদি টের পায়..?? 
তামিম চিন্তিত ভঙ্গিতে মুখে হাত রেখে মুখটা ঢাকলো।

???

রাতের খাবারের পর নীরা বেশ ঘটা করে সবার সামনেই বলল, 
—–ভাবী, তুমি কি দু-কাপ চা পাঠাবে অামার ঘরে; অামি রনি ভাই’র সাথে গল্প করবো। ভালো করে অনেকদিন অামাদের কথা হয়না। 
সোবহান সাহেব মনে মনে বেশ অানন্দে পেলেন।যাক্… মেয়েটা এতক্ষণে ছেলেটার মন বুঝলো। 
লাবণী বিরক্তিভরা গলায় বলল, 
——গল্প করো তো এখানে; নিচের ঘরেই করো না, অাবার উপরে চা কেনো?? উপরের ঘরে চা নিয়ে যাওয়া অারেক ঝামেলা।
——-অাচ্ছা থাক, চা লাগবেনা। 
সোবহান সাহেব ব্যস্ত হয়ে বললেন, 
——তোরা ঘরে যা নীরা, অামি তোর মা’কে বলছি চা দিয়ে অাসবে!! 
লাবণী উৎসুক গলায় বলল, 
——তোদের গল্পে
অামি কি জয়েন করতে পরি??
নীরা শক্ত কণ্ঠে বলল, 
——না।এটা অামার অার রনি ভাইয়ের প্রাইভেট কথা।
রনি ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, 
—-অনেক লেট হয়ে গেছে নীরা, গেট বন্ধ করে দেবে। অাজ যাই বরং; 
——দিলে দিবে রনি ভাই। গিয়ে যদি দেখেন গেট বন্ধ অাপনি স্ট্রেইট বেক করে অামাদের বাড়ি চলে অাসবেন। 
চলুন…..

নীরা ঘরে এসেই রনির অানা জামার প্যাকেটটা খুললো। 
——বাহ্ চমৎকার তো! ধন্যবাদ অাপনাকে। অাপনি পছন্দ করে কিনলেন?? 
——হুঁ ঔই অার কি?? ছেলে মানুষ মেয়েদের পোশাক এত বেছে নিতে পারে না সহজে। এক ফ্রেন্ড ছিলো , সেই চুজ করেছে সব।

—–অাপনি দাঁড়িয়ে কেনো?? রনি ভাই, বসুন না।

রনি বসলো, গুটিসুটি মেরে। নীরা কি সিরিয়াস টাইপ কিছু বলবে?? 
কোনো জটিল অালোচনা নয়তো??

——নিন চা নিন। 
রনি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিলো। তাঁর বুক ধরফর করছে। 
চায়ে চুমুক দিতে দিতে নীরা হাসিমুখে বলল,
—–মাত্র একজন বিশেষ মানুষকে উপহার দিতে গিয়ে অাপনার সবার জন্য উপহার কিনতে হলো। এই যে, মাসের শুরুতেই সব খরচ হয়ে গেলো, বাকি মাস চলবেন কিভাবে?? 
——অারে ধুর! তেমন একটা খরচ হয়নি। তোমাদের পছন্দ হয়েছে এই বেশ। বিশেষ করে শফিক তো দেখলাম টি-শার্ট পড়ে বসেই টিভি দেখছে…
—–হুঁ।অাচ্ছা রনি ভাই, বলুন তো মেয়ে হিসেবে অামি কেমন?? বোকা নাকি চালাক?? নাকি মাঝামাঝি?? দেখুন, অাপনি একজন হবু ডাক্তার; ভুল উত্তর দিলে কিন্তু চলবে না।

রনি বিভ্রান্তিতে পরে গেলো।নীরা অাসলে কি বলতে চাইছে?? প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে?? 
——কি হলো, বলুন?? 
——অামি অাসলে সেরকম সিরিয়াসলি চিন্তা করে দেখিনি।তবে বোকা যে নও সেটা বোধহয়… 
——অারেকটু সোজা করে দিই, একটা গল্প বলি, অামাদের পরিবারের; তাহলে বোধহয় অাপনার অানসার দিতে সহজ হবে। 
যেমন ধরুন, অামার লাবণী ভাবীর যেদিন বিয়ে হলো, সেদিন তাঁর জন্মদিন ছিলো।অর্থাৎ ভাবীর মেরেজ ডে, অার বার্থ ডে একই দিনে।এই খবরটা ভাবী কাউকে বলেননি।শুধু ভাইয়া ব্যাপারটা জানতেন।
ভাইয়া মারা যাবার পর হলো কি, সবাই ভাইয়ার মেরেজ ডে ভুলে গেলো।শুধু মনে রাখা হলো ভাইয়ার মৃত্যর দিন।
সাথে সাথে ভুলা হয়ে গেলো ভাবীর জন্মদিন ও। মৃত স্বামীর শোক নিয়ে যেমন বিবাহবার্ষিকী পালন করা যায় না, তেমনি মনের অানন্দে জন্মদিনও করা যায়না।বিধবা ছেলের বৌ জন্মদিন পালন করবে কোনো শশুড়বাড়িই তা এলাউ করবেনা। অথচ ভাইয়া বেঁচে থাকলে এই দিনটাই হতো ভাবীর জন্য দ্বিগুণ অানন্দের।ঠিক কি না?? 
রনি ঘামছে, তাঁর হাতের চায়ের কাপ কা্ঁপছে। থরথর করে কাঁপছে। নীরা রনির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে রাখলো। 
——-পানি খাবেন রনি ভাই। 
রনি জোড়ে জোড়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। 
নীরা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, 
——অামার যদি ভুল না হয়, 
অাজ ভাবীর জন্মদিন, এবং বিবাহের ও দিন!! তাই না রনি ভাই?? ভাবীকে একটা উপহার দিতে গিয়েই অাপনি…..
রনি এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের পুরোটা পানি শেষ করে নিলো। 
——-অাজ ভাবীর জন্য একটা বিশেষ দিন। অথচ এই দিনেও সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। অাপনি সেটা মনে রেখেছেন… 
——-দেখো নীরা, অামি অাসলে, তেমন কোনো ইনটেন্স থেকে…. 
——-রনি ভাই, একটা মজার কথা কি জানেন, ভাইয়া মারা যাবার পর, ভাবী কিন্তু চাইলেই বাপের বাড়ি গিয়ে থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনি গেলেন না।অামরা কিন্তু কেউ জোড় করিনি একবারও, থাকার জন্য। তবুও ভাবী রয়ে গেলেন। তাঁর মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিলো, তিনি চলে গেলে, এ সংসার জলে ভেসে যাবে।বিশেষ করে শফিক ভাইয়া অার অামি। অামাদের তো সৎমা, যদি কষ্ট দেয়। এই টানাপোড়নের সংসারে দাঁত চেপে রয়ে গেলেন। অামার এই চমৎকার ভাবীটির জীবনে অানন্দের সময় খুব কম.. অাজ অাপনি তাঁকে অানন্দ দিয়েছেন; এজন্য ধন্যবাদ।

রনি কাঁদছে। একটু পরপর তাঁর হেচকির মত উঠছে।

——-বাবা যেদিন প্রথম ভাবীকে দেখতে যান, ভাবীকে দেখে তাঁর এতই পছন্দ হলো যে তিনি ভাবীকে হাত জোড় করে বলেছিলেন, মাগো, তুমি কথা দাও অামার ছেলেকেই বিয়ে করবে….

রনি নিজেকে সামলালো,

——নীরা, তিনি এখনো সেরকমভাবেই কিন্তু ভালোবাসেন, তোমার ভাবীকে। এখনো উনার সেইরকম পছন্দ…..

——হুঁ।ভাইয়া মারা যাবার তিনমাস পর, 
স্বামী মৃত্যু শোকে না খেয়ে দুর্বলতায়, প্রচন্ড অসুস্থতায় অার টেনশানে ভাবীর বাচ্চাটা এবোর্ট করে গেলো। একদিকে স্বামী শোক, একদিকে সন্তান হারাবার শোক। শফিক ভাইয়ারও ঝামেলা চলছে তখন।বাবা দুদিক সামলাতে গিয়ে ভিখিরি অবস্থা। 
পুরো পরিবারের এমন কঠিন সময়ে অামি কিছুই করতে পারতাম না।মামলায় জর্জরিত ভাই,
হাসপাতালে অসুস্থ ভাবী, টাকা নেই; কি যে ভয়ানক অবস্থা! 
জানেন, তখন অামি কি করতাম??ভাবী ঘুমিয়ে পড়লে প্রতিরাতে হাসপাতাল প্যাসেজে অামি অারাম করে পা ছড়িয়ে বসতাম। হাউমাউ করে কাঁদতাম। মনে হত, কাঁদলে হয়তো, ভাইয়া ফেরত অাসবে, ভাবীকে সামলাবে, হয়তোবা…… হয়তোবা…… টাকা খসে পড়বে অাকাশ থেকে, শফিক ভাইয়ার মামলা শেষ হবে ।
——নীরা, বাজে সময়গুলো মনে করছো কেনো??।এগুলো ভুলে যেতে হয়! এখন দেখো, সব ভালোর দিকেই যাচ্ছে। লাবণী নিজেকে সামলে উঠেছে, তোমার বাবাও তাঁর পুত্রবধুকে ভালোবাসছেন… 
শুধু শফিককে নিয়ে…

——-অামার কি মনে হয় জানেন?? অামার সেই কান্না বৃথা যায়নি, 
ভাইয়ার বদলে ভাবীর জীবনে অাপনি এসেছেন।কিন্তু কি জানেন, রনি ভাই,
যে বাড়ির দুটি ছেলের একটি ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছে, অন্য ছেলেটি মানসিক ভারসাম্যহীন, সেই বাড়ির পক্ষে মৃত ছেলের শোক সামাল দিয়ে ছেলের বৌয়ের বিয়ে দেয়া এত সহজ ব্যাপার নয় নিশ্চয়! বাবার মনের জোড় কিন্তু অতটা প্রবল নয়।
তবে, অামি অাপ্রান চেষ্টা করবো… 
——লাবণীকে অামার চাই না নীরা, ও তোমাদের ভাবী হয়েই থাকুক, এখানেই বাস করুক, অামি কিছু চাই না। অামি কিছু চাই না, শুধু ও ভালো থাকুক।

——রনি ভাই, অামার যদি ক্ষমতা থাকতো, অামি এক্ষুণি ভাবীকে অাপনার হাতে তুলে দিতাম, বলতাম, নিয়ে যান। নৌকায় বসে বাদাম খাবার খুব শখ অামার ভাবীর, অাপনি এই শখটা পূরণ করুন তো! 
কিন্তু, অামার ক্ষমতা খুব সামান্য। কিন্তু অাপনার ভালোবাসা অসামান্য। কাঁদবেন না রনি ভাই, অামার বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা অাপনার এই অসামান্য ভালোবাসাকে ছোট হতে দেবেন না। 
রনি শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে বলল, 
——নীরা, অামাকে ভুল বুঝ……
——-ভুল বুঝার তো কিছু নেই রনি ভাই, ভালোবাসার মত চমৎকার একটি ব্যাপারে ভুল বুঝাটা অন্যায়। অাপনার চোখে অামি ভাবীর জন্য সেই স্নিগ্ধ ভালোবাসাটুকু দেখতে পাই, যেটা অামি ভাইয়ার চোখে দেখেছি।
এখন অাপনি যান তো রনি ভাই, অারেকটু বসে থাকলে অামি এবার সত্যি সত্যি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলবো, ভাইয়ার কথা মনে পড়ছে খুব।

নীরা ঠোট কামড়ে ধরলো। 
সিড়ি বেয়ে 
নিচে নামতে নামতে রনির মনে হলো, নীরার মত ভালো মেয়ে পৃথিবীতে অার একটাও নেই, একটাও নেই……

দরজায় দাঁড়িয়ে নীরা হাসিমুখে বলল, 
——রেডী হয়েছো ভাইয়া?? 
শফিক মাথা নাড়লো।
——এদিকে অাসো ভাইয়া, জুতোর বেল্টটা অামি অাটকে দিচ্ছি। শফিক বিছানায় বসে পা বাড়িয়ে দিলো। 
——-এইসব ডাক্তার ফাক্তার দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না, বুঝলি নীরা??অামার অসুখটা এভাবে সারবে না। মাঝখান থেকে কতগুলো টাকা নষ্ট… 
—– তাহলে কিভাবে সারবে??
——পড়াশোনাটা শুরু করতে পারলেই দেখবি….

নীরা নিশ্চুপ থাকলো। 
——ডাক্তার দেখাবো না নীরা!! 
—–ডাক্তার দেখাতে ইচ্ছে না করলে দেখাবেনা। তবে রেডী হয়েছো যখন, চলো ঘুরে অাসি। তোমার মেডিকেল কলেজ ঘুরে অাসি! 
শফিকের চোখ অানন্দে চকচক করে উঠলো। সে ড্রয়ার খুলে এপ্রোনটা হাতে নিতে নিতে বলল, 
——চল, তোর সাথে টাকা অাছে তো?? বন্ধুদের সাথে দেখা হলে খাওয়াতে হবে…. 
নীরা শফিকের দিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাঁকালো। তাঁর চোখ ভিজে এসেছে….শফিক অসুস্থ হবার পর থেকে ও’র সব বন্ধুরা ও’কে এভয়েড করেছে। এমন অনেক বার ঘটেছে, শফিক তাঁর কোনো কোনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে দেখা না করেই ফিরে এসেছে। জেলে থাকা অবস্থায় একটা কেউ দেখা করতে যায়নি, একমাত্র রনি ভাই ছাড়া! 
অাচ্ছা, সবার রেপুটেশন হারাবার এত ভয় কেনো?? এই পৃথিবীতে কি রেপুটেশনের দাম সম্পর্কের চেয়ে বেশি?? নীরার কাছে যদি পৃথিবীর সিস্টেম বদলাবার কোনো যন্ত্র থাকতো, তাহলে প্রথম যে সিস্টেমটা সে বদলাতো, তা হলো মানুষের এই স্বার্থপরতার সিস্টেম। সেলফিশনেস জিনিসটা সে লক করে দিতো…..
——-কিরে, কথা বলছিস না যে???টাকা নেই???
——যথেষ্ট টাকা অাছে ভাইয়া।শরবতের ব্যবসা। পানি বেঁচে টাকা। তাও ফ্রি পানি। ঢাকা ইউনিভার্সিটির পানি……

শফিক নীরার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। নীরার মুখটা দু-হাতে তুলে ধরে বলল, 
——অামি যদি পড়াশুনায় থাকতাম, এই কাজটা তুই কখনোই করতে পারতিনা। 
নীরা হাসার চেষ্টা করলো।

——-এই কাজটাতে কিন্তু একটুও কষ্ট নেই ; তুমি যতটা ইনসাল্টিং ভাবছো ততটা কিন্তু নয় ভাইয়া। অামি বেশ ভালো অাছি, ইনজয় করছি কাজটা! 
——-অামাকে বুঝাতে অাসবি না নীরা, অাই হ্যাভ এ স্ট্রং সেন্স, একচুয়েলি বেটার সেন্স দেন ইউ! ডোন্ট ফরগেট, অাই অলওয়েজ ক্যারি দ্যা নরমাল ইমোশান, বাট নট মেন্টালি ফিট….
কাজটা যে তুই মোটেও ভালোবেসে করছিস না, অাই ক্যান সেন্স ইট, অাই ক্যান ফিল ইট..

শফিকের গলার স্বরে প্রচন্ড রাগ ঝরে পড়ছে।
নীরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রসঙ্গ ঘুরানোর চেষ্টা করলো, 
——-মেঘ করেছে, ছাতা নেবো ভাইয়া??? 
শফিক মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
——মেঘ করেছে নাকি??বৃষ্টি এলে অামরা বরং ভিজে বাড়ি ফিরবো।ছাতা নেবার কোনো দরকার নেই!

বাইরে বেড়িয়ে নীরা যে খবরটা প্রথম পেলো, তা নীরার জন্য বিরাট দুঃসংবাদ! 
শফিক উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
——কে ফোন করলোরে?? 
——র….র….নি ভাই…. 
——-রনি কি বলল?? অামরা ওখানেই অাসছি, বললি নাযে??। বর্ষা হলে অাছে তো?? 
নীরা রাস্তায় মাটিতে বসে পড়লো। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
——কারা যেনো অামাদের ভ্যানগুলো অাগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে ভাইয়া! রনি ভাই গিয়ে দেখে, সব জ্বলছে।
এখন কি হবে??? 
শফিক কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে নীরার দিকে তাঁকিয়ে রইলো। নীরা কাঁদছে, ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে।
ইশ্!!গাল দুটো কেমন লাল হয়ে গেছে।
! কাঁদলে নীরাকে একদম মায়ের মত দেখায় কেনো???

???
তামিম অনেকক্ষণ ধরে ঘুমোবার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ জোড় করে চোখ বুঁজে থাকলে তন্দ্রামত অাসছে, তারপর অাবার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম ছেড়ে যাচ্ছে। সাথে যোগ হয়েছে প্রচন্ড বুক ধড়ফড়। এর কারণ কি??
তামিম বিছানা ছেড়ে নামলো। ছাঁদে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে দেখা যেতে পারে।লম্বা শ্বাস নিয়ে খোলা অাকাশের নিচে টেন মিনিটস এর একটু মেডিটেশন করা দরকার ।মাথা একদম জ্যাম হয়ে অাছে। 
তামিম ছাঁদে এসে দেখলো রিতু দাঁড়িয়ে অাছে।
——-ঘুমোস নি??? 
রিতু চমকে উঠে ঘুরে তাঁকালো। 
——-এত বড় চাঁদ ফেলে ঘুমানো যায়?? তুই—ও তো ঘুমোস নি???
——তুই কি ফোনে কথা বলছিলি, রিতু?? 
রিতু জবাব না দিয়ে মৃদু হাসলো। 
——-একদম খালি গা হয়ে চলে এসেছিস?? সিজন চেঞ্জ করছে ভাইয়া, ফট করে ঠান্ডা লেগে যাবে তোর অাবার।
——ধুর, এই বয়সে ঠান্ডা! তুই তো দেখি একদম ফ্লাস্ক ট্লাস্ক নিয়ে, কী ব্যাপার বলতো, সারারাত ছাঁদে থাকবি নাকি??
——-সারারাত ছাঁদে না থাকলেও লং টাইম থাকবো! এজন্য কফি করে নিয়ে এসেছি।
কফি খাবি ভাইয়া?? 
ছাঁদের রেলিং উঠে বসতে বসতে তামিম বলল,
—–দে… ঘুমটা ছাড়া ছাড়া হচ্ছে।ডিসগাস্টিং… হার্টের রোগীর মত বুক দপদপ করছে….
রিতু কফিমগটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
——ভাইয়া, তোর পায়জামাওয়ালীর কি খবর??? 
তামিম হতচকিত হয়ে তাঁকালো। 
——-অামাকে দেখেই তোঁর পায়জামা ওয়ালীর কথা মনে হলো/??মানে কি???
——তোর যা অবস্থা!! সব তো অাটকে গেছে ওখানেই….. 
——-মানে????
তামিম খুব সাবধানে কফিমগটা রেলিং এর উপর রেখে নেমে দাঁড়ালো।
রিতু হাত দিয়ে ক্রস দেখিয়ে বলল, 
——মানে হলো, এসব ব্যাপার অামি খুব ভালো বুঝতে পারি। এই যে, যেমন ধর… এখন তোঁর ঘুম পাচ্ছে না, হঠাৎ হঠাৎ মেমোরি লস করে যাচ্ছে, ছঠফট করছিস, মনোযোগ হারাচ্ছিস, ছোট ছোট ভুল করছিস…. এর মানে হলো…. 
——-অা… মি! অামি মনোযোগ হারাচ্ছি??? 
——হুঁ।হারাচ্ছিস…. এই যেমন দ্যাখঁ, এখন তুই এক পায়ে স্যান্ডেল পরে অাছিস। মোবাইল ফোন ভেবে যেটা হাতে করে নিয়ে এসেছিস সেটা হচ্ছে তোঁর এসির রিমোট…. 
তামিম অসহায় ভাবে হাতের দিকে তাঁকালো।ডিসপ্লেতে ১৬ডিগ্রী লেখা এসির রিমোট হাতে সে ছাঁদে দাঁড়িয়ে অাছে।
——তুই বলছিস, এসব পায়জামাওয়ালীর জন্য হচ্ছে??. 
——হুঁ ভাইয়া। ইট’স এ ভেরি ইজি ক্যালকুলেশান।কিন্তু এইসব সিচুয়েশানে একটা ছোট্ট সমস্যা অাছে, তা হলো অতি বুদ্ধিমান মানুষ ব্যাপারটা ধরতে পারেনা। অাবার ধর, তুই যদি একটা নিরেট বোকা হতি, এই জিনিসটা সহজেই বুঝতে পারতি।বুঝতে পারতি তোর ব্রেনের কিছু পার্টস কাজ করছে না, এবং কেনো করছে না…….. 
রিমোটটা তামিম ছাঁদের এক কোণে ছুঁড়ে ফেললো! 
—–দ্যাঁখ রিতু, এরকম ভুল অামার প্রায়শই হয়!! নাথিং লাইক সিরিয়াস! 
তামিম নার্ভাস ভঙ্গিতে সিগারেট ঠোঁটে গুজলো। 
রিতু এগিয়ে এসে তামিমের ঠোঁট থেকে সিগারেটটা হাতে নিয়ে বলল, 
——এবং সর্বশেষ তুই সিগারেটটা উল্টো করে মুখে নিয়েছিলি! 
তামিম হাঁ করে রিতুর দিকে তাঁকিয়ে রইলো। 
—– দেখা হয়েছিলো অাবার?? তাই না?? 
—–হুঁ। কিন্তু কি জানিস?? একবারও জানতে চাইলো না, অামার কাটাছড়ার কি অবস্থা?? রিকভার করেছি কি-না??জোড় করে দুটো সিঙ্গারা খাইয়ে দিলো, দুদিন ধরে পেট খারাপ।

রিতু খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
——তুই ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন তোর একটাও প্রেম হয়নি; কত সুন্দরী মেয়ে তোর পিছু ঘুরলো, অার শীলা অাপু! শীলা অাপুর কথা তোঁর মনে অাছে ভাইয়া?? হাত পা কেটে তোঁর নাম লিখে হুলুস্থুল অবস্থা .অার তুই ফিলিংলেস! এসব দেখে, বাবা কি বলেছিলো তোঁকে মনে অাছে??
তামিম হেসে ফেললো।
——-স্টপ ইট রিতু! ইট হার্টস! ডোন্ট রিমাইন্ড মি।
——-ভাইয়া, এই জিনিসটা কিন্তু মজার! খুব লাকিলি এসব ঘটে। এসব হওয়া মানে দেখবি, অনেক অদ্ভূত অদ্ভূত কাজ তোর ভালো লাগবে, নিজেকে ফুরফুরে লাগবে। অাশেপাশের পৃথিবীটাকে তুচ্ছ মনে হবে। তোর মনে হবে, তোর ভিতরে একজন বাস করে, যাকে তুই কখনোই হারাস না। 
সবকিছু তোর কাছে, বিউটিফুল মনে হবে।

তামিমের গলা শুকিয়ে অাসছে, একটা সুইট ফ্রাগরেন্স নাকে এসে লাগছে.. কেমন যেনো মাথা ঝিমঝিম করা গন্ধটা…. .. মিস নীরার নয়তো??

তামিম বসে অাছে প্রায় অাধঘন্টা ধরে। এ বাড়িতে লোকজন অাছে বলে মনে হচ্ছেনা।নিস্তব্ধ নিশ্চুপ বাড়ি।

লাবণী বলে যিনি অাছেন, তিনি এসে একবার এক কাপ চা রেখে গেছেন। এবং অতি বিরক্তিকর কণ্ঠে বলে গিয়েছেন, 
——অাগামী সাত তারিখ পর্যন্ত মাছের কোনো অর্ডার রাখা যাবে না। এরপরে হলে বসুন। ফিরোজ চাচা ঘুমোচ্ছেন;ন’টার অাগে পাবেন না।

জবাবে তামিম কিছু বলেনি।সকাল এগারোটায় তাঁর ফুড মিনিস্টারের সাথে চাঁদপুর যাবার কথা। দশটার মধ্যে গিয়ে রিপোর্ট করতে হবে। মিনিস্টারকে নিয়ে এমনিতেই অনেক রিস্ক অাছে। দুদিন অাগেও তিনি একটা ভুল বিবৃতি দিয়েছেন। এর মধ্যে যদি অাজকের প্রোগ্রামে কোনো……

তামিম অাবার ঘড়ি দেখলো।অাটটা বেজে পঁচিশ মিনিট। 
কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই। রান্নাঘর থেকে শুধু অাওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বাকিরা কি ঘুমে?? নীরাও কি ঘুমোচ্ছে?? 
দুদিন অাগেই
যে বাড়ির তিন তিনটে জুস ভ্যান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, সে বাড়ির পরিবেশ এত স্বাভাবিক কি করে??
তামিম কি এবার কাউকে ডাকবে??? 
মিসেস লাবণী অাবার এসেছেন, এবার ট্রে ভর্তি নাশতা।রুটি, ডিমভাজি, অালুভাজি! 
লাবণী টি টেবিলে নাশতা রাখতে রাখতে বলল, 
——অাপনি নাশতা করে নিন। অামি বরং অাপনার অর্ডার লিখে নিচ্ছি।বলুন ডেট বলুন… 
লাবণী কোলের মধ্যে নোটপ্যাড নিয়ে পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় বসলো। তামিম খুকখুক করে কেশে নিলো একটু।তামিম নিজের দিকে অারেকবার চোখ বুলালো।সে পড়ে এসেছে একটা ব্লাক শার্ট, ব্লাক প্যান্ট।সাথে অফ ইয়েলো অার মেরুন স্টেপের টাই।বাই এনি চান্স, তাঁকে কি মাছের পাইকারের মত লাগছে??
——কি হলো বলুন??? তামিম ইতস্তত গলায় বলল,
——অামি মিস নীরার সাথে মিট করতে এসেছি। তাঁকে কি একটু ডেকে দেওয়া যাবে??? 
লাবণী হেসে ফেললো,
——অাগে বলবেন তো… নীরা তো একটা ফটোশ্যূটে গেছে।সেই ভোরে উঠে। অাপনি তাঁকে ফোন করে অাসেননি কেনো?? 
তামিম ভ্রু কু্ঁচকালো। মিস নীরার সাথে দেখা করতে হলে, ফোন করে অাসতে হবে??? এত ব্যস্ততা নীরার?? 
——অাপনার কি নীরার সাথে জরুরি কোনো দরকার??? 
—–জি মানে?? মানে তিনি কখন ফিরবেন বলে গেছেন?? 
——বলল তো, অাটটার অাগেই ফিরবে, এসে অালুভাজা দিয়ে রুটি খাবে বলে গেলো।
——-ও.. অাচ্ছা।তাহলে অামি অারেকটু বসি। অপেক্ষা করি! 
——অাচ্ছা বসুন, একা একা বসতে খারাপ লাগবে না তো? অামায় রান্না করতে হবে, বুয়া দশটার মাঝেই চলে যায়, বুঝলেন। এর জন্যই সব কাজ গুছিয়ে নিতে হয়!!
——না না, একা বসতে অামার কোনো সমস্যা নেই। 
তামিম ভদ্রতার হাসি হাসবার চেষ্টা করলো।
——টিভি দেখবেন?? 
——জি না। 
——অাচ্ছা, অামি বরং শফিককে পাঠিয়ে দিচ্ছি!!

তামিম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। লাবণী সেটা বুঝলো না বোধহয়…
——শফিক অামার দেওর।মেডিকেলে পড়ছে…. গল্প করার লোক হিসেবে সে খুব ভালো।

তামিম অাবার ঘড়ি দেখলো। এভাবে বসে থাকার মানে হয়না। যেতে দেড়ি হয়ে গেলে সমস্যা।ফুড মিনিস্টারের মেজাজ এমনিতেই সবসময় হাই থাকে। হয়তো সবার সামনেই একটা কঠিন কথা বলে বসবেন।মিস নীরার সাথে ফোনে কথা বলে অাসতে হবে।
তামিম উঠে দাঁড়ালো এবং সাথে সাথেই বসে পড়লো। শফিক এসেছে।কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, শফিকের চেহারা মোটেও ছবির মত নয়। এর থেকে সম্পূর্ণ অালাদা। মেয়েদের ক্ষেত্রে অতি সুন্দরীদের কি বলা হয়, স্বর্গপরী।অার ছেলেদের ক্ষেত্রে সেরকম হলে, তামিম ভাবতে লাগলো। শুভ্র চেহারা…
না,
না স্বর্গীয় চেহারা! একজন মানুষের মুখ দেখতে এত মায়াময় হয় কি করে??
——হ্যালো…….

তামিম বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ তাঁকিয়েই রইলো। 
——-হ্যালো…এক্সকিউজ মি….. অামি শফিক। নীরার ভাইয়া.. 
——ওহ, ইয়েস ইয়েস.. অামি তামিম…

——-নীরা একটা ফটোশ্যূটে গিয়েছে, প্রথম অালোর নক্শার জন্য।ট্যাবলয়েডে ফ্রন্ট পেজে অাসবে নাকি..
ক্যাপশন হলো “শীতের শুরুতে ত্বকের যত্ন”! ভোরের সূর্যের রেডিশ লাইটেই ফটোশ্যূটটা হবে।হুট করেই ও’ অফারটা পেয়ে গেলো বুঝলেন। 
শফিক অারাম করে সোফায় বসলো, ট্রে থেকে নাশতার বাটিগুলো নামিয়ে তামিমের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, 
——অাপনি নাশতা খেয়ে নিন। রুটি ঠান্ডা হয়ে গেলে খেতে বিরক্ত লাগে।

তামিম একটা রুটি নিয়ে ছিড়তে ছিড়তে বলল, 
——অাপনি ও নিন…. 
——অামার খাওয়া হয়ে গেছে।অামাকে সাতটার মাঝে নাশতা খেতে হয়।তারপর ঔষধ..সবকিছু টাইম টু টাইম না হলে নীরা খুব রাগ করে। অাপনি খবরের কাগজ পড়বেন?? 
তামিম না সূচক মাথা নাড়লো। 
——ব্রেকফাস্ট করতে করতে অনেকে অাবার খবরের কাগজ পড়ে তো তাই বললাম।

শফিক উঠে গিয়ে টিভি ছাড়লো। কিন্তু সে টিভির দিকে তাঁকালো না।তাঁর মনোযোগ বইয়ে।
বইয়ের নাম ক্লিনিক্যাল নিওরোলোজি। 
তামিমের হঠাৎ মনে হলো, এই শফিক ছেলেটার ডাক্তার হওয়া খুবই প্রয়োজন।ভীষণ প্রয়োজন!

শফিক বই থেকে চোখ সরিয়ে তামিমের দিকে তাঁকিয়ে মৃদু হাঁসলো। 
——অাপনি কি অামায় কিছু বলতে চান মি. তামিম?? 
তামিম এক মুহূর্ত ভাবলো। 
——-মি. শফিক অাপনি কি জানেন এই পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়জন ভালো চিকিৎসকের নাম অামরা জানি, তাঁদের বেশিরভাগেরই ছাত্রজীবন মসৃণ ছিলো না। কেউ কেউ তো বদ্ধপাগল ছিলেন বলে ধারণা! অাবার অামরা এমন একজনকে জানি যিনি কথাই বলতে পারতেন না। 
তাই না?? 
শফিক জবাব না দিয়ে হাসলো। তাঁর চোখে হতবিহ্বল ভাব।

তামিমের বুকে ধাক্কার মত লাগলো। এরকম একজন কারো শিশুদের ডাক্তার হওয়া দরকার।যে অসুস্থ শিশুর দিকে তাঁকিয়ে এমন ভালোবাসাময় পবিত্র হাসি হাসবে।

——-মি.শফিক, কিন্তু এরকম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁরা ভালো চিকিৎসক হয়েছেন।নানা রকম ঔষধপাতি অাবিষ্কার করে গিয়েছেন।
এবং অামার মনে হয় কি জানেন?? এইসব প্রতিবন্ধকতা গুলো ছিলো বলেই, তাঁরা জীবনে এত ভালো কিছু করতে পেরেছেন! মি. শফিক, অাপনি যে পৃথিবীটাতে অাটকে অাছেন, তাঁর বাইরেও একটা চমৎকার পৃথিবী অাছে।
কিন্তু
অাপনার ছোটবোন মানে মিস নীরা, উনার জন্য এই চমৎকার পৃথিবীটা ভয়ংকর স্ট্রাগলের! অার সেটা শুধু অাপনার জন্যই…..

শফিক ঘামতে লাগলো। কপাল বেয়ে তাঁর দরদর করে ঘাম পড়ছে।সে দিশেহারা গলায় বলল,
——কিন্তু অামি তো অসুস্থ! অনেক সময় অামি রিয়েলিটি অার কল্পনার ফারাক ধরতে পারিনা। সামটাইমস ইট সিমস টু মি, অাই এম নট হিউম্যান কাইন্ড; অাই এম নাথিং…. , 
অামার কোনো অনুভূতিই কাজ করে না। অামি পার্থক্য করতে পারি না কোনো কিছুই…

তামিম গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল, 
—–অাপনি মোটেও অসুস্থ নন মি.শফিক। অাপনি সুস্থ এবং বেশ চমৎকার সুস্থ। শুধু প্রবলেমটা হচ্ছে, অাপনি অাপনার নিজের অনুভূতি, দুঃখ কষ্টের ঘোরটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।অাপনার এই ভ্রমটাকে অাপনি এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, অাপনার মেন্টাল স্টেবিলিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।অাপনি বাস করছেন শুধু অাপনার ভাবনা চিন্তা দিয়ে তৈরি করা পৃথিবীতে।ইলিউশান…. অথবা ভ্রম।
এর থেকে বের হবার উপায়ও কিন্তু অাপনার কাছেই অাছে। অাপনাকেই সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
——-অামি অসুস্থ নই?? 
——ইয়েস, অসুস্থ নন। শুধু মাঝে মাঝে অাপনার অাশপাশটা গুলিয়ে যায়।রিয়েলিটি ছাপিয়ে অাপনার ইমাজিনেশন প্রবল হয়ে উঠে, অার তখনি অাপনার অাশেপাশের সব জড় বস্তু অাপনার কাছে জীবন্ত মনে হয়।

শফিক শার্টের হাতায় চোখ মুছলো।
ন’টা দশ বাজে। এবার তামিমের উঠা উচিত। এখন না বেরোলে পৌছুতে সত্যিই দেড়ি হয়ে যাবে।
——-অাপনি এতসব কথা কিভাবে জানেন?? অাপনি কি মনোরোগ… 
——-না, না সেরকম কিছুই না। একটা কোরিয়ান মুভি দেখেছিলাম, যেখানে এরকম কিছু ডায়ালগ ছিলো। 
মুভির নামটা অাপাতত মনে অাসছে না, মনে পড়লে অাপনায় বলবো।দেখে নিবেন, চমৎকার মোটিভেশনাল মুভি। প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারানো এক মেধাবী যুবকের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের ছবি।

অাজ, চলি মি. শফিক।অামার একটু তাড়া অাছে।

শফিক কাতর গলায় বলল,
——অাপনার সাথে অামার অাবার দেখা হবে তো??? 
তামিম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো, 
——তবে সেদিন, যেদিন অাপনার মনে হবে অাপনি মুভিটা দেখতে চান অামার সাথে বসে।

——-কোনো মুভি কি কারো জীবন পাল্টে দিতে পারে মি. তামিম?? 
——কারো জীবন পাল্টে দিতে পারে কিনা জানিনা, তবে জীবন পাল্টানোর মত ঘটনা দেখাতে পারে… 
দেখুন অাপনি অাপনার জীবনটাকে পাল্টাবেন কিনা, ইট’স কমপ্লিটলি অাপ টু ইউ 
ভালো থাকবেন, অাসি। 
——-নীরা এলে কি কিছু বলতে হবে??? 
——না। নীরা এলে কিছুই বলতে হবে না।
বাই… তবে অাপনার ভাবী, মানে মিসেস লাবণীকে বলবেন, এই চমৎকার নাশতার জন্য ধন্যবাদ।

তামিম বেড়িয়ে এলো।তাঁর মনটা হঠাৎ করেই বেশ হালকা লাগছে। নীরার সাথে দেখা না হয়ে ভালোই হলো।
তামিম গাড়িতে বসে স্টার্ট করতেই সাইড মিররে দেখলো পেছনে নীরা রিকশা থেকে নামছে।
সাদা পাড়ের হালকা নীল অার গোলাপী শেডের শাড়ি পড়নে। একহাতভর্তি চুড়ি। অারেকহাত খালি। অাধখোলা চুলটা এলোমেলো হয়ে অাছে! একটু গুছিয়ে নিয়ে বেণী করলে কি হয়???
ভাড়া মিটিয়ে গেটে ঢুকতে ঢুকতে পিছন ফিরে একবার দেখলোও না, অাশ্চর্য মেয়ে!! 
নীরা হেটে যাচ্ছে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে… 
তাঁর মানে সে গুণগুণ করে গান গাইছে। কি গান?? তামিমের ভীষণ শুনতে ইচ্ছে করলো। 
তামিম কি গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে একবার কথা বলবে??? নাকি গাড়িতে বসেই পিছু ডাকবে??
না থাক্….কি দরকার!! 
তামিম একদৃষ্টিতে নীরার যাবার দিকে তাঁকিয়েই রইলো। শাড়ির পাড় অনেকটা নেমে গিয়ে কোমড় অার ব্লাউজের মাঝামাঝি 
ফর্সা পিঠ বেড়িয়ে অাছে। ইশ্….. মেয়েটা এত দুষ্টু করে শাড়ি পড়েছে কেনো??? এরকম শাড়ি পড়ার অপরাধে মেয়েটার যাবজ্জীবন হওয়া উচিত…..

এবার তামিম গুণগুণ করে গান ধরলো,


“এ পৃথিবী ছেড়ে চলো যাইইইই…….স্বপ্নের সিড়ি বেয়ে সীমাহীন…….

চলবে…………….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*