মৃন্ময়ী [ষষ্ঠ অংশ]

লেখক Niloy Rasul

ঘরের ভিতর থেকে লোকটা টার্গেট প্লেসের দিকে এগিয়ে আসতেই মৃন্ময়ী সংকেত হিসাবে বাম পাশে থুতু ফেলল আস্তে করে একবার।

এবার একশনের পালা। শুভ্রর ওপর সব নির্ভর করছে। ওরা বেঁচে ফিরতে পারবে অপারেশন থেকে নাকি এখানেই পঁচে মরবে। নিহারিকা সংকেত পাওয়ার পর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ক্যারাতি স্টাইলে শুভ্রর পিছন থেকে দু ধাপ পিছনে গেল। যেন শুভ্র বিপদে পড়লে অতর্কিত হামলা করতে পারে লোকটার ওপর।

শুভ্র ডান হাতের আঙুল গুলো ধীরে ধীরে ঝাঁকাচ্ছে। ও কি একশনে নামবে নাকি থেমে যাবে বুঝতে পারছে না। বাই চান্স যদি শুভ্রকে অকেজ করে ফেলে তবে মৃন্ময়ী আর নিহারিকা ওদের হাতে বন্দী।

আর ওদের শাস্তি হিসাবে ওদের সাথে কী কী করা হতে পারে তা ভাবতেই গায়ের কাটা শিউরে উঠছে শুভ্রর।

শুভ্র এবার মারাত্মক ভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। ও শেষ হয়ে গেলে দু’জন নারীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে!

তাহলে ১৩৫ ওন তরুণী যে আটকা পড়ে আছে তার বেলায়! শুভ্র নিজের সাথে তর্ক শুরু করে দিয়েছে।

আজ পর্যন্ত এত অপারেশন করেছে কখনো তো এরকম চিন্তা মাথায় আসেনি। নিহারিকাও তো কতবার ওর সাথে অপারেশনে এসেছে তখন তো এসব একবারও মনে হয়নি! তাহলে কী এসব চিন্তা শুভ্রর মাথায় আসছে মৃন্ময়ীর জন্য!

শুভ্রর মাথা যন্ত্রনা করছে। ওর মনে হচ্ছে ও নিজের সাথে বেইমানী করছে, বেইমানী করছে নিজের করা শপথবাক্যের সাথে। ব্যক্তিগত লাইফ আর একশন লাইফ কখনো এক করা যাবে না এটাই তো ছিল শপথ বাক্যে। তাহলে আজ কেন ও মৃন্ময়ী থাকার জন্য বার বার এত ভাবছে।

ও যদি ধরাশায়ী হয় তাহলে মৃন্ময়ী আর নিহারিকা দু’জনের অপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন হবে সেটা শুভ্রকে ভাবাচ্ছে অথচ ১৩৫ জন তরুণীও যে মারত্মক বিপদের মুখে আছে শুভ্র যদি শেষ হয় তাহলে তাদেরও যে পড়তে হবে নষ্ট জগতে তার বেলায়!

শুভ্রর কাছে হঠাৎ নিহারিকা আর মৃন্ময়ীর সম্মানের কাছে ১৩৫ জন তরুণী মুল্যহীন হয়ে গেল।

শুভ্রর মাথার ভিতরে চক্কর দিয়ে উঠল,কী হচ্ছে এসব তার সাথে।

লোকটা টার্গেট প্লেসে পা দিয়েছে। লাস্ট সংকেত হিসাবে মৃন্ময়ী ডান কাঁধ বরাবর মাথা একবার নামাল।

এবার সময়ের খেলা। শুভ্রর মাথায় ঘুরছে এখন। শুধু ১৩৫ জন তরুণী নয় আরও দুজন এখন যোগ হয়েছে, মোট ১৩৭ জনের ভাগ্যে নেমে আসবে নিকষ কালো অন্ধকার নাকি আলোর ছোঁয়া তা শুধু নির্ভর করছে ওর করা একশনের ওপর।

একটু খামখেয়ালি হলে সব শেষ…!

পঞ্চাশ.

চোখ খুলে পিটপিট করে তাকাচ্ছে অন্তরা।
তাকিয়ে দেখছে শুভ্রার বোন আর ওর মা অন্তরার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে এক জন ডাক্তার বসে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পাড়ার হাতুড়ে ডাক্তার। তবে অন্তরা মনে মনে শান্তি পেল এটা ভেবে যে ওকে হাসপাতালে নেয়নি।

অন্তরা বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইলে শুভ্রার মা বলে উঠল,

– আরে আরে উঠছ কেন মা। তোমার শরীর খারাপ এখন। শুয়ে থাকো একটু। আমি তোমার জন্য দুধ চুলায় দিয়েছি।

ডাক্তার সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

-চাচি মা আমি তাহলে এখন উঠি। উনার জন্য যে ঔষধগুলো লেখে দিলাম সেগুলো নিয়ম মতো খাওয়াবেন। তবে আমার মনে হয় একটা ভালো ডাক্তার দেখিয়ে নিলে ভালো হতো।

আমি যে ঔষধ দিয়েছি তাতে কিছুক্ষণ স্বস্তিতে থাকবে বাট আবার অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই একটা ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

আচ্ছা ঠিক আছে চাচি মা চলি এখন।

শুভ্রর মা বলল

-শুভ্র এসে তোমার যা খরচ হলো মিটিয়ে দেবেনি।

-আরে এভাবে বলছেন কেন। আপনারা তো আমার আপন লোকের মতো। আপনাদের সাথে কি আমার টাকার সম্পর্ক!

ডাক্তার সাহেব বেরিয়ে চলে গেল। শুভ্রা বাইরের গেট বন্ধ করতে গেল।

শুভ্রার মা অন্তরার দিকে তাকিয়ে বলল,

-তুমি শুয়ে থাকো মা। দুধ বোধহয় গরম হয়ে গেছে। আমি আনছি এখনই।

শুভ্রার মা রান্নাঘরে এসে একটা কাঁচের গ্লাসে দুধ ঢেলে ট্রে তে একটা পিরিচ নিয়ে তাতে কিছু বিস্কুট রাখল।

“মা..ও মা . মা…!”

এরমধ্যে শুভ্রা ছাঁদ থেকে ডাক দিলো উনাকে। উনি সেখানে পৌঁছে দেখেন টবে ফুল গাছে নতুন ফুল ফুটেছে সেটা দেখার জন্য ডেকেছে।

শুভ্রার মা রেগে গিয়ে বকা দিলেন ওকে। উনি কাজ করছে আর এর মধ্যে এমন করে ডেকেছে শুভ্রা যেন কী না কী ক্ষতি হয়ে গেছে।

রান্নাঘরে এসে ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখেন সেখানে অন্তরা নেই।

বিছানার ওপর একটা চিরকুট রাখা।

একান্ন.

মোনালিসার বিস্ময় এখনো কাটেনি। কতকিছু প্রতিনিয়ত ও দেখছে তার ইয়াত্তা নেই।

কিন্তু ওর দেখা সবকিছু শেষ দেখা নয়। পিছনে লুকিয়ে আছে আরো ভয়ানক কাহিনী তা আজ মোনালিসা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারছে।

 

-“বিশ্বাস করো মোনালিসা মৃন্ময়ী আমাদের পালিত সন্তান না। ওকে আমি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম। এবং এখনো ভালোবাসি অনেক।”

মৃন্ময়ীর বাবা থামলেন। চোখ থেকে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে ওনার।

মোনালিসা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ পর বলল,

-তাহলে মৃন্ময়ীর মা মানে আমার বোন মারা গেল কী করে মি.চৌধুরী?

-নিজে নিজেই…!

-স্যরি বুঝি নাই আপনার কথাটা! নিজে নিজে বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ?

-ওটাই যেটা তুমি মনে মনে ভাবছ!

-সুইসাইড!

-হ্যাঁ.!

-কী…

মৃন্ময়ীর বাবা কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল,

-মৃন্ময়ীর মাকে কেউ মেরে ফেলেনি। আবার মেরে ফেলেছে। পদার্থ বিজ্ঞানে বলের যে শ্রেণি বিভাগ আছে তার ভিতরে স্পর্শ বল আর অস্পর্শ বল বলে দুটো বলের নাম আছে। তুমি তো সাইন্সের ছাত্রী ছিলে। ইউ মাস্ট নো বেটার…

-হুঁ! তো..? আমি আমার বোনকে কীভাবে মারা হয়েছে সেটা জানতে চেয়েছি পদার্থ বিজ্ঞানের ক্লাস করতে আসিনি।

-অস্পর্শ বলের সংজ্ঞাটা মনে আছে তোমার..!

মোনালিসা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

-হেয়ালি না করে আসল কথায় আসো…

মৃন্ময়ীর বাবা আবার বলতে লাগল,

-অস্পর্শ বল কাজ করে কিন্তু কখনো বস্তুকে স্পর্শ করে না। আর স্পর্শ বল কাজ করে স্পর্শ করে।

মোনালিসা অন্যদিকে তাকিয়ে দাতে দাত চেপে চোখ বন্ধ করে চুপ করে আছে।

– মনে আছে এগুলো তোমার.?

মোনালিসা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। তার মনে আছে।এখন এটা ছাড়া সত্যি জানার কোনো পথ নেই।

মৃন্ময়ীর বাবা আবার বলতে লাগলেন,

– আমরা সবাই স্পর্শ বলকে বেশি গুরুত্ব দিই। তাইতো কেউ কাউকে নিজের হাতে খুন করলল তবেই আমরা মেনে নিই যে সে খুন করেছে বা খুনের সাথে জড়িত।

মোনালিসা সিধে হয়ে বসল। আঁড়চোখে মৃন্ময়ীর বাবার দিকে তাকাল ও।

মৃন্ময়ীর বাবা বলতে লাগলেন,

– কিন্তু অধিকাংশ খুনের পিছনে কিন্তু একটা অস্পর্শ বলও থাকে তা কিন্তু পৃথিবীর কোনো আদালত দেখে না।

মোনালিসা কিছুটা চমকে উঠে মৃন্ময়ীর বাবার দিকে তাকাল। মৃন্ময়ীর বাবা বলতে লাগলেন,

– সেদিন আমি মারিনি তোমার বোনকে। ও আত্মহত্যা করেছিল। করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

-ম..মানে..

-মৃন্ময়ীর শত মা তোমার বোনকে গিয়ে বলে আমার সাথে তার নাকি শারীরিক সম্পর্কে আছে। আমার সন্তান তার গর্ভে।

-কিহ্.!

– তোমার বোন এতটা নিতে পারেনি। মানসিক ভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে গিয়েছিল। আমদের তো ভালোবেসে বিশে করা কিনা। তাই ওর কাছে ওর সাথে এতবড় বিশ্বাস ঘাতকতা ও মেনে নিতে পারছিল না।

-মেনে নিতে না পারা আর সুইসাইড করার মাঝে ব্যপক তফাৎ আছে জামাই বাবু। বিস্তারিত বলো।

-হুঁ! জানি ব্যপক তফাৎ। মৃন্ময়ীর শত মা আমার অনুপস্থিতিতে বারবার আসত এই বাড়িতে। আর ভয় দেখাত ওকে। যেন আমাকে ছেড়ে চলে যায়। ও নাকি পুলিশে কেস করেছে। আর আদালতে সব বলে দিবে। এতে আমার ফাঁসি হবে।

মেনে নিতে পারুক বা না পারুক সে তো আমাকে অনেক ভালেবাসত। তাই এতবড় ক্ষতি হবে সেটা শুনে, ও নিজেকে স্থির রাখতো পারেনি।

-তারপর!

-তোমার বোন তো পালিয়ে এসেছিল তোমাদের বাড়ি থেকে। আর তারপর আমরা বিয়ে করে ফেলি। আর এটা জানার পর যে তোমার বাবা তোমার বোনকে ত্যাজ্য কণ্যা করে দিয়েছিলেন সেটা তোমার নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়..?

মোনালিসা মাথা নিচু দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুবার মাথা নাড়ল।

মৃন্ময়ীর বাবা আবার বলতে লাগল,

– আমি ছাড়া ওর আর যাওয়ার কোথাও ছিল না। আর এদিকে মৃন্ময়ী তখন খুব ছোটো! ওকে নিয়ে কী করবে কোথায় যাবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না। আর এদিকে তখন ও মানসিক ভাবে ডিপ্রেসড আর চুড়ান্ত হতাশায় পড়েছে তারওপর ক্রমাগত ওকে ভয় দেখানো…

মৃন্ময়ীর বাবা ডুকরে কেঁদে উঠল।
মেনালিসার চোখও ছল ছল করছে। কী বলবে বুঝতে পারছে না।

মৃন্ময়ীর বাবা বা হাত দিয়ে নিজের চোখের কোণের জল মুছতে মুছতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

– রান্নাঘর থেকে কেরাসিন গায়ে ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় নিজের গায়ে।

মৃন্ময়ীর বাবা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মেঝের ওপর হাত দিয়ে বাড়ি মারতে মারতে বলেন,

-ঠিক এই জায়গায় ও আর্তনাদ করতে করতে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায়। ঠিক এই জায়গায়..!

মৃন্ময়ীর বাবা কাঁপা হাতে দূরে একটা জায়গা নির্দেশ করে বলে,

-আর ওই জায়গায় আমার মেয়েটা ওর মাকে জ্বলে পুড়ে মরতে দেখেছিল। চিৎকার করে কেঁদেছিল। মরে যাওয়া কী জিনিস সেটা ও বুঝতে পারেনি কিন্তু ও এটুকু বুঝতে পেরেছিল ওর মা কষ্ট পাচ্ছে

সেদিন কেউ এগিয়ে আসেনি। কেউ একবারও বাঁচানোর চেষ্টাও করেনি। অথচ পরে সবার কী দরদ!

জানো মোনালিসা আমি যে লোকের বাড়িতে দারোয়ানের কাজ করতাম উনি বড় উকিল ছিলেন। সব শোনার পর বলেছিলেন এসব ভিত্তিহীন কেস তিনি একদিনেই সলভ্ করে দিবেন। আমাকে বলেছিলেন আমার কাছ থেকে কোনো টাকা নিবেন না তিনি।

আমি খুশির খবরটা নিয়েই বাসায় আসছিলাম। এসে দেখি আমার মেয়েটা ওর মায়ের পোড়া দেহের সামনে কাঁদছে। বারবার ওর মায়ের গায়ে হাত দিয়ে “মা.. মা.. মা..” বলে ডাকছে। ওর মায়ের মাথায় হাত দিয়ে ডাকছে।

পোড়া দেহ থেকে দূর্গন্ধ বের হচ্ছিল খুব। কেউ দাঁড়াতে পারছিল না। শুধু মৃন্ময়ীই ওর মায়ের পোড়া দেহের সাথে নিজেকে লেলিয়ে দিয়ে পড়েছিল। মা সন্তানের সম্পর্ক হয়তো এমন-ই!

তখন আমার অবুঝ মেয়ে মৃন্ময়ীর খুব খিদা লেগেছিল, ওর মাকে বারবার ডাকছিল।

কিন্তু ও তখন বুঝতে পারেনি ওর মা দূর পরলোকে বেড়াতে গিয়েছে। আর কখনোই ফিরে আসবে না।

মোনালিসা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ থেকে অনবরত জল পড়ছে।

মৃন্ময়ীর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন,

– মানুষ কতটা নিষ্ঠুর জানো মোনালিসা! এ ঘটনার পরও শান্তি হলো না! পুলিশ আমাকে এ্যরেস্ট করল। আমি নাকি আমার ভালোবাসকে নির্যাতন করে গায়ে আগুন ধরিয়ে মেরে ফেলি!

তারপর মৃন্ময়ীর শত মা আমাকে শর্ত দেয় তাকে বিয়ে করতে হবে নয়তো আমার তো শাস্তি হবেই সাথে আমার মৃন্ময়ীকে বেঁচে দিবে কোনো শিশু পাচার চক্রের কাছে। আমার তো আর কিছু করার ছিল না! অন্তত আমার মেয়ের কথা ভেবে রাজি হয়েছিলাম।

-কিন্তু উনি এরকম করলেন কেন!

-কারণ ও তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা!

মোনালিসা চমকে উঠে দেয়ালে হেলান দেওয়া থেকে উঠে বসে বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে আছে মৃন্ময়ীর বাবার দিকে। অস্ফুট স্বরে বলল,

-মানেহ্… অন্তঃসত্ত্বা মানে টা কী!!!!

মৃন্ময়ীর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মোনালিসা হাত পা কাঁপছে…

বায়ান্ন.

“আন্টি পরজন্ম বলে কি কিছু আছে? আর যদি থেকে থাকে তবে কি এই জন্মের পাপ ওই জন্মে মাফ হয়…
উত্তরটা আমার আর জানা হলো না। ভালো থাকবেন। শুভ্রকে দেখে রাখবেন। 
-অন্তরা। “

বিছানার ওপর অন্তরার রেখে যাওয়া চিঠি পড়ে শুভ্রর মা হতভম্ব হয়ে বসে আছে।

তিপ্পান্ন.

-“জানো মোনালিসা সুইসাইডে কখনো কোনো গল্পের পরিণতি আনন্দঘন করে না।
দিতে পারে না কোনো ভালো সমাপ্তি! আর এটা কোনো সমাধানও নয়!

তোমার বোন যদি সেদিন আর একটু অপেক্ষা করত তাহলে আজকে আমাদের জীবন এরকম ছন্নছাড়া হতো না।

আমার প্রাণ ভোমরা আমার মেয়েকে আমি হারিয়ে ফেললাম। আমার আর তার ওপর অধিকার নাই। কোথায় থাকে, কী করে সারাদিন! কী খায় কিছুই আমি আর জানি না।

একটা বাবার জন্য এটা যে কতটা যন্ত্রণার তা তুমি বুঝবে না মোনালিসা! তোমরা ভাবো শুধু তোমরা মেয়েরাই তোমাদের সন্তানের জন্য চিন্তা করে মরো। সারাদিন তাদের চলাচল নিয়ে চিন্তা করো। ভাবো যে আমরা বাবারা বড্ড উদাসীন! আমাদের কোনো চিন্তা ভাবনা নেই। আমরা টাকা রোজগার করে তোমাদের দিই আর তোমরা সংসার চালাতে চালাতে মাথা খারাপ করো আর আমরা বাজারে বসে চায়ের দোকানে আড্ডা মারি! তাই না?

উঁহু তোমরা ভুল মোনালিসা। চিন্তা আমরাও করি। তোমরা সন্তানের বর্তমান নিয়ে সারাদিন চিন্তা করে মরো আর আমরা আদরের সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে চিন্তা করি। কী করবে সে, কীভাবে জীবন যাপন করবে ও!

সামনের পথে এগোতে গিয়ে কী করবে সে সেটা ভাবি আমরা। আমরা ভাবি আজ থেকে কয়েক বছর পর সে কী করবে!

সন্তানকে নিয়ে আমরাও চিন্তা করি। পার্থক্যটা কী জানো? তোমরা সেটা প্রকাশ করো। সন্তানের সফলতায় উচ্ছ্বসিত হও। সন্তানের ব্যর্থতায় তোমরা কেঁদে বাড়ি মাথায় তোলো।

আমরাও কাঁদি। ভিতর ভিতরে গুমড়ে মরি আমরা। কষ্ট আমরাও পায়। কিন্তু তা প্রকাশ করি না। আমাদের যে কাঁদতে নেই। পথ চলতে হয় আমাদের অনেকে কিছু সামাল দিয়ে.!!

মেনালিসা কোনো কথা বলেছে না। চোখ থেকে এখনো ওর পানি পড়ছে।

কিছুক্ষণ পর মেনালিসার দিকে তাকিয়ে মৃন্ময়ীর বাবা বলে উঠলেন,

তুমি কি কাজটা ঠিক করলে মোনালিসা? কোনোকিছু না জেনেই মৃন্ময়ীকে বললে সব। জানো আমি শুধু মৃন্ময়ীর কাছে বাবা নয় একজন বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম। ওর বাবা ওর মায়ের ভুমিকা পালন করেছি। ওর শত মা কখনোই ওর সাথে ক্লোজ ছিল না। আমি আমার মেয়েকে মানুষ করেছি। রহিমার মা শুধু একটা মেয়েকে বড় করতে কিছু বিষয়ের দরকার সেসব ব্যপারে সাহায্য করেছে আর কিছুই না!

মোনালিসা…

মেনালিসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-হুঁ…

– তুমি কি এ জীবনে পারবে আমার আর আমার প্রাণ আমার মেয়ের সম্পর্ক আগের মতো করতে?

– সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করব

– একটা বিষয় জানো কাঁচের গ্লাস মেঝেতে পড়ে গেলে তা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়। তারপর তুমি অনেক চেষ্টা করে হয়তো পারবে ওটা জোড়া লাগতে কিন্তু তারপর? পারবে দাগ গুলো মুছে দিতে?

মোনালিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার আর কিছুই বলার নেই। নিজেকে অপরাধী লাগছে । মনে হচ্ছে মাটিতে ঢুকে যেতে পারলে ভালো হতো অনেক।

মোনালিসা কিছুক্ষণ পর বলল,

-আচ্ছা জামাই বাবু তুমি যে বললে ওই মহিলা মানে মৃন্ময়ীর শত মা বোন মারা যাওয়ার সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিল! সন্তানটা কার?

মৃন্ময়ীর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।

চুয়ান্ন.

মৃন্ময়ীর সংকেত পেয়ে কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে শুভ্র নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। পূর্বর প্ল্যান অনুযায়ী টার্গেট প্লেসের ভিতরে টার্গেট প্রবেশ করার পর মাত্র দুই থেকে তিন সেকেন্ড সময় পাবে শুভ্র।

সেই সময়রা ফুরিয়ে এসেছে। লোকটা এখন শুভ্রর সামনে।

শুভ্র কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের ভিতরে লোকটার কাছে যেতেই লোকটা অনুভব করতে পেরেছে তার সন্নিকটে কেউ আছে। মাজার কাছ থেকে ছুরিটা বের করে পিছন ঘোরার আগেই শুভ্র লোকটার কাছে এসে সজোরে ডান পা তুলে হাটুর ওপর একটা লাথি দিল৷ হাড় ভাঙার শব্দ হলো। লোকটা চোখমুখ জড়ো করে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে নিলে শুভ্র বাম হাত দিয়ে লোকটার সামনের চুলগুলো মুঠো করে ধরে পিছন দিকে চাপ দিয়ে মুখ চেপে ধরল।

লোকটার গোঙানির আওয়াজ আসছে শুধু। চোখ থেকে গরম পানি গড়িয়ে পড়তে লেগেছে।

লোকটা উন্মাদের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গোঙাচ্ছে। বারবার বোয়াল মাছের মতো লাফিয়ে উঠার চেষ্টা করছে।

শুভ্র লোকটার মাথার চুল গুলো আরো শক্ত করে এমন ভাবে পিছনে টান দিল যেন লোকটার মাথার পিছন আর লোকটার মেরুদণ্ড পরস্পর প্রায় ৯০° কোণে অবস্থান করছে। লোকটার গলার কাছে রগ গুলো ফুলে উঠেছে।

শুভ্রর খুব ইচ্ছে করছে লোকটার হাত থেকে পড়ে যাওয়া ছুরিটা তুলে গলার ওপর একটা টান দিতে। এতে গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হবে আর শুভ্র এক পৈশাচিক শান্তি পাবে।

শুভ্র অবাক হয়ে যাচ্ছে তার ভিতরে এক পৈশাচিক শক্তি ভর করেছে।

লোকটা আর বোয়াল মাছের মতো লাফাচ্ছে না। কিন্তু গোঙানির শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আর চোখ থেকে গরম পানি গাল বেয়ে নেমে যাওয়ার সময় শুভ্রর হাতের ওপর ছুঁয়ে যাচ্ছে।

শুভ্র শান্তি পাচ্ছে খুব। লোকটার চোখে এখন আর লড়াই নয় বাঁচার আকুতি দেখা যাচ্ছে। চোখমুখে অজানা ভয় ভর করে বসেছে লোকটার ওপর।

শুভ্র নিজের মুখ লোকটার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল,

-মনে করে দেখ শুয়োর ঠিক এরকমই করেই একটা মেয়ে তার নিজের পবিত্র সম্পদকে বাঁচাতে আকুতি মিনুতি করে।

এভাবেই আর্তনাদ করে। এভাবেই তারাও ভিতরে ভিতরে গুঙিয়ে মরে৷ তুই তো দশ বারো সেকেন্ডেই অর্ধেক চুপসে গেছিস আর ওই নিরীহ নিষ্পাপ মেয়েগুলোকে প্রতিনিয়ত, প্রতিমুহূর্তে, প্রতিসেকেন্ডে একবার করে মারা যায়৷

আর তোর মতো জানোয়ার ওদের খুবলে খাস। তোদের মতো নেড়িকুত্তার বাঁচার কোনো অধিকার নাই পবিত্র পৃথিবীতে।

লোকটাকে মাটিতে ঠেসে ধরল শুভ্র। লোকটা মাটিতে পরে থাকা ছুরি তুলে এলোপাথাড়ি চালাতে গিয়ে শুভ্রর বুকের চামড়া চিড়ে গেল।

শুভ্র চোখ বড় বড় করে ডান হাত ছেড়ে বা হাত দিয়ে লোকটার চুলগুলো চেপে ধরে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সজোরে লোকটার চোখ থেকে এক সেন্টিমিটার দূরে ঘুষি দিতেই লোকটার চোখ থেকে রক্ত কণিকা বের হতে শুরু করেছে।

লোকটার মুখে রুমাল গুজে দিয়েই শুভ্র পা বাড়াল যে ঘরে মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে সে ঘরের দিকে।

পিছন ঘুরে নিহারিকাকে সংকেত দিতেই ও পুলিশে ফোন করল। আর শুভ্র এগিয়ে যেতে লাগল বদ্ধ ঘরের দিকে যেখানে ১৩৫ জন তরুণী আটকা পড়ে আছে।

হাতে সময় খুব কম!

শুভ্র তিন চার কদম সামনে এগোতেই বন্দুক থেকে গুলির আওয়াজের সাথে সাথেই একটা চাপা আর্তনাদের শব্দ হলো

পঞ্চান্ন.

গোসল করে নিজেকে অনেকটা ফ্রেশ লাগছে শুভ্রর।

মনে হচ্ছে যেন শরীরের ওপর কেউ হাজার টনের ভারী বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল।

সেটা নেমে গেল। তোয়ালা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে শুভ্র ওয়াশরুম থেকে ঘরে প্রবেশ করল। দেখল টেবিলের ওপর কফির মগ।

সারাদিন এত পরিশ্রম আর মানসিক চাপের পর ধোঁয়া ওঠা কফির মগ দেখে নিমিষেই শুভ্রর মন ভালো হয়ে গেল।

একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে শুভ্র নিহারিকা আর মৃন্ময়ীর রুমের সামনে এসে দেখল কেউ নেই এখানে।

শুভ্র ছাঁদের উদ্দেশ্য রওনা দিল।

অপারেশন শেষ করে শুভ্ররা ঢাকা থেকে সোজা বরিশালে এসে অবস্থান করছে। ঢাকায় থাকাটা খুব একটা সেভ না।

বরিশাল লঞ্চ ঘাট থেকে কিছু দূরে ওরা একটা হোটেলের দু’টো রুম ভাড়া করেছে। একটা শুভ্রর জন্য আরেকটা মৃন্ময়ী ও নিহারিকার জন্য।

শুভ্র হোটেলের ছাঁদে আসতেই মনটা অনেকটা পাতলা হয়ে গেল।

ফেব্রুয়ারি মাসে বিকাল পাঁচটার দিকে মনে হয় প্রকৃতির জন্য মনে হয় যেন একটা ম্যাজিক মোমেন্ট।

এইসময় তাপহীন রোদ্দুর উপভোগ্য। যে কারও মনে কাউকে একটা পাশে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। বেপরোয়া মন চায় কারও সান্নিধ্যে লাভের।

শুভ্রর হেঁটে আসার আওয়াজ হতেই মৃন্ময়ী পিছনে তাকিয়ে দেখে শুভ্র হেঁটে আসছে।

মৃন্ময়ী অবাক চোখে দেখছে,ওকে। গোসল করার পর ট্রাউজার পরে গেঞ্জি গায়ে শুভ্রকে দেখতে অনেক ভালো লাগছে।

ওর মনে হচ্ছে এভাবেই ও হাঁটতে থাকুক আর মৃন্ময়ী অবাক চোখে তাকিয়ে থাকুক। শুভ্র ওদের নিকটে আসতেই মৃন্ময়ী বলে উঠল,

– তোকে অনেক স্নিগ্ধ লাগছে দেখতে।

শুভ্র হালকা হেসে বলল,

-তো স্নিগ্ধ নামেই ডাক না..!

মৃন্ময়ী দুষ্ট ভরা হাসি দিয়ে বলল,

-যাহ্! খালি মাথায় দুষ্টু বুদ্ধিতে ভরা। তোকে স্নিগ্ধ নামে কেন ডাকতে যাবো শুনি? শুভ্র নামটাই তো অনেক সুন্দর!

-না ওই যে তুই বললি স্নিগ্ধের মতো লাগছে কি না আমাকে! তাই বলছি আমরা তো স্নিগ্ধকে কখনো দেখিনি তাই চাইলে তুই আমাকে স্নিগ্ধ নামে ডাকতে পারিস..!

মৃন্ময়ী ডানে বামা দুবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

-আরে না। তা বলেছি কখন? আমি তো বলছিলাম তোকে দে..খ..তে স্নি..গ্ধ লা..গ..
মৃন্ময়ী কথা বলতে বলতে শুভ্র আর নিহারিকার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে থেমে গেল।

তারপর রাগান্বিত স্বরে বলল,

-ওরে! তোমরা আমার সাথে মজা করছিলে এতক্ষণ!

শুভ্র আর নিহারিকা হো হো করে হেসে উঠল।

শুভ্র কফি হাতে ছাঁদের রেলিঙের ধারে চলে গেল। ওখানে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দূরান্তে প্রকৃতির আপন ভুবনে আপন নিয়মে গড়ে তোলা লীলা খেলা দেখতে লাগল।

নিহারিকা বলল ওর একটা জরুরী ফোন করার আছে তাই নিচে যাবে একটু টেলিফোন করতে। ফোন কাছে থাকলেও ফোন করা সম্ভব না। কারণ ওই চক্রের সাথে বড় বড় এজেন্সির যোগাযোগ আছে। ওরা ঠিকই ফোন অন করলে এদের ট্র্যাক করে খেলবে। আর এত ভয়ও থাকত না যদি না শেষ মুহূর্তের ওই অঘটনটা না ঘটত।

শুভ্র কফির মগে চুমুক দিচ্ছে আর মৃন্ময়ীর কথা ভাবছে!

এই বোকা সহজ সরল মেয়েটা তখন যদি ওই রকম দুঃসাহসিক কাজটা না করত তবে শুভ্রর দেহ এতক্ষণে পোকায় খাওয়া শুরু করত।

ওই লোকটাকে তখন শুভ্র মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। শুভ্র কল্পনাও করতে পারেনি ওই লোকটাকে ওভাবে মারার পর লোকটা আবার রিকভার করবে।

শুভ্র যখন হেঁটে যাচ্ছিল যে ঘরে ১৩৫ জন তরুণীকে আটকে রাখা হয়েছে সে ঘরের দিকে তখন ওই লোকটা বা পাশে কোমরে গুজে রাখা রিভলবার বের করে শুভ্রর দিকে তাক করে ফেলেছে।

ট্রিগারে চাপ দেওয়ার ঠিক দুসেকেন্ড আগেই মৃন্ময়ী মাটিতে ঝুঁকে পড়ে ছুরি তুলে লোকটার ঘাড় বরাবর চালিয়ে দিয়েছে আর তখনই লোকটা ট্রিগারে চাপ দেয়। কিন্তু মৃন্ময়ীর আক্রমনের কারণে বুলেট লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায়।

আর তখনই গুলির আওয়াজ হয়। লোকটার মুখে রুমাল থাকায় লোকটা আর্তনাদ করে উঠেছিল কিন্তু সেটা শুভ্রর কাছে না পৌঁছালেও তার চাপা আর্তনাদের শব্দ ঠিকই পোঁছে গেছিল।

শুভ্র দৌড়ে চলে এল। এসেই দেখল মৃন্ময়ীর হাত পা কাঁপছে। আর ও হাঁপাচ্ছে আর বিড়বিড় করে বলছে, “আমার শুভ্র…আমার শুভ্র…! “

পরে পুলিশ এসে তরুণীদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তের একটা অঘটন সবাইকে বিপদে ফেলে দেয়…

অঘটনের জন্য কাউকে দোষারোপ করা যায় না। কারণ ভুল ইনফরমেশন থাকলে কেউই সতর্ক থাকে না।

ছাপান্ন.

-“জামাই বাবু, বললে না তো মৃন্ময়ীর শত মায়ের গর্ভে কার সন্তান ছিল..!”

মেনালিসা উত্তরের অপেক্ষায় মৃন্ময়ীর বাবার দিকে চেয়ে আছে।

মৃন্ময়ীর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

– ওর তখনকার বয়ফ্রেন্ডের। তার সন্তানই ওর গর্ভে ছিল..!

– আর সে দোষ তোমার ওপর চাপাতে চাইছিল উনি!

-হুঁ!

-কিন্তু কেন!

-কারণ তার বয় ফ্রেন্ড যখম জানতে পারে সে প্রেগন্যান্ট তখন ওকে ছেড়ে চলে যায়। আর আমি আগে ওদের বাড়িতে কাজ করতাম। তো আমাকে ডাকল, বলল যে আমার নাকি হেল্প লাগবে একটু।

যতই হোক তাদের বাড়িতে কাজ করেছি তাই মুখ এড়াতে পারিনি।

-তারপর..!

-চাকরকে দিয়ে বলে পাঠাল ওর রুমে পাঠিয়ে দিতে। তো আমিও ভেবেছিলাম হয়তো জরুরী কিছু তাই ঘরে ডেকেছে। আমি গিয়েছিলাম। আমাকে নাস্তা করতে দিলো। আমি করতে চাচ্ছিলাম না। তাও আমাকে জোর করে নাস্তা করিয়েছিল

-কেন!

-নাস্ত করতে করতে আমার আর কিছু মনে ছিল না। আমি চেতনাহীন হয়ে গেছিলাম। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল তখন..!

-তখন কী জামাই বাবু?

– আমি বিছানায় শোয়া অবস্থায় আছি। আর ও অর্ধ নগ্ন হয়ে আমার ওপর পড়ে রয়েছে…

-কিহ্!

-হ্যাঁ। আমাকে তখন ও ছবি দেখায়। ছবিগুলো এমনভাবে তোলা যা দু’জন মানুষের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ইঙ্গিত করে…! তারপরের ঘটনা তো তোমাকে বললাম এতক্ষণ.!

মোনালিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-খাবারে অজ্ঞানের ঔষধ মেশানো ছিল।

-হুঁ..!

– তাহলে তখন মানে যখন মানে যখন আমাকে আটকে রেখেছিলেন তখন এগুলো বললেন না কেন!

-মোনালিসা তুমি অনেক বোকা..!

-মানে..!

মোনালিসা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে!

সাতান্ন.

নিহারিকা ছাঁদে ফিরে আসতেই শুভ্র নিহারিকার দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল,

-কী! কার সাথে কথা বলেছিলেন শুনি! স্পেশাল কেউ?

-হা হা হা। আমার পিচ্চিটার সাথে..!

নিহারিকার কথা শুনে শুভ্র আর মৃন্ময়ী একসাথে তাকাল ওর দিকে।

মৃন্ময়ী বলল,

-আপনি ম্যারিড!

নিহারিকা না সূচক মাথা নাড়তেই শুভ্র আর মৃন্ময়ীর বিস্ময়ের সীমা রইল না

আটান্ন.

“নিহারিকা আপনি ম্যারিড তা তো আগে বলেননি! “

মৃন্ময়ী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিহারিকার দিকে।

নিহারিকা হেসে ফেলল। স্মিত হেসে বলল,

-ম্যারিড না হলে ম্যারিড বলব কেন!

-তাহলে ওই পিচ্চি আসল কী করে?

-কেন? ম্যারিড না হলে পিচ্চি আসতে পারে না বুঝি!

-মানে..!!

-হা হা হা। কিছু না।

-ধুর আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আচ্ছা বাদ দেন। পিচ্চির নাম কী? সেটাতল বলবেন নাকি!

নিহারিকা একটু হেসে বলল,

-সামির…!

বলেই ছাঁদের রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশ দেখতে লাগল।

শুভ্র মৃন্ময়ের দিকে আর মৃন্ময়ী শুভ্রর দিকে তাকাল। দু’জনের কাছে কেমন যেন লাগছে। “সামির” নামের অস্তিত্ব ভুলেই গেছিল দু’জন। হঠাৎ নিহারিকার কথা শুনে মনে পড়ল।

শুভ্র নিহারিকার কাছে চলে গেল।
বলল,

-আপনি সামিরকে চেনেন!

-আমার পিচ্চিকে আমি না চিনলে কে চিনবে!

-ম..মানে.!

শুভ্র মৃন্ময়ী দু’জনে নিহারিকার কাছে এসে দাঁড়াল। শুভ্র কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

-আ..আপনি সামিরকে চে..চেনন!

-হুঁ তো। চিনব না কেন!

মৃন্ময়ী কিছু বলতে যাবে তখনই হোটেলের বয় এসে বলল,

-স্যার আপনাদের বিকালের নাস্তা রেডি।

নিহারিকা বলল,

-হুঁ, আসছি আমরা.. চলেন শুভ্র। মৃন্ময়ী চলেন…

শুভ্র বা মৃন্ময়ী কিছু বলার আগেই নিহারিকা নেমে চলে গেল। শুভ্রর কাছে সব ধোঁয়াশা মনে হচ্ছে!

ঊনষাট.


মোনালিসা মৃন্ময়ীর বাবার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল,

-কোথায় যাচ্ছ জামাই বাবু। সব সত্যি তো বললে। এইটাও বলে যাও… মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের গর্ভে কার সন্তান ছিল?

মৃন্ময়ীর বাবা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

-কেন? শুনে কী করবে তুমি!

-প্লিজ…!

-সবই তো ধ্বংস করে দিলে আমার। আমার মেয়েটাকে কেড়ে নিলে আমার কাছ থেকে। আমার প্রাণ ছিল ও।অ মোনালিসা তুমি বুঝতে পারছ না ও ঠিক কী ছিল আমার কাছে।

মৃন্ময়ীর বাবা বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে বলল,

-আমার প্রাণ ছিল আমার মেয়েটা। তোমার বোন মারা যাওয়ার পর এই অভাগা তার মেয়েকে আকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নিজের সর্বস্ব দিয়ে আগলে রাখবে তার মেয়েটাকে।

তুমি তো সব নষ্ট করে দিলে! তোমার কোন পাকা ধানে মই দিয়লছিলাম আমি মোনালিসা যে এমনটা করলে!

আমাকে নিঃস্ব করে না দিলে কি হচ্ছিল না তোমার!

মোনালিসা চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে আটকে থাকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

– আমি বুঝতে পারিনি জামাই বাবু। স্যরি..!

মৃন্ময়ীর বাবা চোখের পানি আটকে রেখে বলল,

– তোমার বুঝতে পারা না পারা তোমার ব্যর্থতা৷ তোমার ব্যর্থতার ফল আমি কেন ভোগ করব বলতে পারো?

আর রইলো তোমার স্যরি! তোমার স্যরিতে কি সত্যি কিছু এসে যায়? তোমার ওই কয়েকটা বর্ণের একটা শব্দ স্যরিতে কি আমার আমার মেয়েকে ফিরে পাবো? ফিরে পাবো আমার প্রাণটাকে?

মৃন্ময়ীর বাবা চিৎকার করে বলে উঠল,

-কি,হলো বলো! ফিরে পাবো আমি ওকে! যেদিন ফিরিয়ে দিতে পারবে সেদিন স্যরি বলো৷ আর না পারলে ভদ্রলোকি এ নাটকীয় শব্দটা আর বলবা না কাউকে বিশেষত আমার সামনে না।

অবশ্য যদি কখনো দেখা হয় তো..!

মোনালিসা চমকে উঠে চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়া জল মুছে বলল,

-মানে! কোথায় যাবে তুমি?

-অজানায়…

-মানে..!

-সব মানের উত্তর হয় না মোনালিসা। কিছু মানের উত্তর নিজে খুঁজে নিতে হয়৷ আর খুঁজে না পেলে তাকে আঁধারেই রেখো। 
আলোতে আনতে যেয়ো না কখনো। সব কিছু আলোতে আসা ঠিক না। এতে তোমার ক্ষতি যাকে আনবে তার ক্ষতি..

ভালো থেকো৷

মৃন্ময়ীর বাবা দরজা দিয়ে বের হতে গেলে মোনালিসা মৃন্ময়ীর বাবার সামনে এসে হাটু গেঁড়ে বসে হাত জোর করে বলল,

-প্লিজ বলে যাও জামাই বাবু। মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের গর্ভে কার সন্তান.! নয়তো এ জীবনে কখনো শান্তি পাবো না আমি।

মৃন্ময়ীর বাবা তাচ্ছিল্যের সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-আমার জীবন নরক বানিয়ে দিলে তুমি। তোমার জীবনে শান্তি দেওয়াটা খুব প্রয়োজনীয় আমার জন্য.!

-আমাকে ক্ষমা করে দাও জামাই বাবু। আমি না বুঝে করে ফেলেছি ওটা। আমি আগে জানলে কখনো মৃন্ময়ীকে ওসব বলতাম না। প্লিজ রাগ করো না…!প্লিজ.!

মৃন্ময়ীর বাবা একটু ঠোঁট বাঁকা করে হেসে বলল,

-রাগ করিনি আমি। তুমি তোমার বোন দু’জনেই একই রকম..! বড্ড অস্থির! একজন তো আমাকে এই একলা পৃথিবীর রহস্যময় জালের ভিতর সব রহস্যের সমাধান একা একা করার জন্য রেখে গেছে আর তুমি আমার এই ছোট্ট পৃথিবীর প্রাণটাকেও কেড়ে নিলে..!

রাগ করব কেন! রাগ করিনি তো…

মোনালিসা চোখের জল মুছে বলল,

-জামাই বাবু দোহাই লাগে তোমার। আর এভাবে বলো না। বড্ড কষ্ট হচ্ছে।

মৃন্ময়ী আমার বোনের শেষ স্মৃতি। বোনের একটা ছবি পর্যন্ত নেই আমার কাছে। ও দেখতে একদম বোনের মতো ছিল!

ওকে হারিয়ে যে আমি খুব শান্তিতে আছি তাও কিন্তু নয়।

-তুমি শান্তিতে আছো কি না আছো তাতে তো আমার কোনো যায় আসে না। তুমি তোমার মতো আমি আমার মতো।

তোমার চিন্তাধারার ওপর তোমার নিয়ন্ত্রণ আছে, আমার না…

তুমি কি ভাববে সেটা তোমার ব্যক্তিগত বিষয়, আমার না!

তুমি কাকে চরিত্রহীন ভাববে, কাকে খুনি ভাববে সেটাও তোমার ব্যপার আমার না..!

মৃন্ময়ীর বাবা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। মোনালিসা চোখ বন্ধ করে দু-হাত দুই কানে দিয়ে চিৎকার করে বলল,

-প্লিজ জামাই বাবু..! দোহাই তোমার। এবার থামো..প্লিজ থামো.! আমি আর নিতে পারছি না। এত কঠোর হয়ো না তুমি।

– যার যায় তার কাছে কঠোর নমনীয় বলে কোনো শব্দ থাকে না। সে শুধু এটুকু বোঝে সে হারিয়েছে! আর যা হারিয়েছে তা আর কখনো ফিরে পাবে না। আর পেলেও সম্পুর্ন পাবে না। কোথাও না কোথাও ঘাটতি থেকেই যাবে!

তাই দয়া করে আমার পথ আটকিয়ো না। যেতে দাও আমাকে। আমাকে এখন অনেক দূর যেতে হবে ঠিক যেখানে পর মা আছে ..!

মোনালিসা দাঁড়িয়ে মৃন্ময়ীর বাবার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,

– পাগল হয়েছ তুমি! এখন আমাদের অনেক কাজ৷ মৃন্ময়ীকে খুঁজে বের করতে হবে আমাদের এখন। এরকম পাগলামি করো না প্লিজ!

মৃন্ময়ীর বাবা হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,

– অনেক করেছ তুমি। দয়া করে আর কিছু করো না।

-জামাই বাবু, এ’কদিনে তুমি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছ.! আগে কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলতে না…আর আজ!

-পরিবর্তনটা তোমরা করেছ মোনালিসা। একজন জ্যন্ত মানুষকে জ্বালিয়ে দিয়েছ তোমরা।

আমি আসি। ভালো থেকো..!

মৃন্ময়ীর বাবা বেরিয়ে আসল বেড়িবাঁধের বাড়ি থেকে। পিছন থেকে মোনালিসা চিৎকার করে ডাকছে। মৃন্ময়ীর বাবা আর ফিরে তাকাচ্ছে না।

রাস্তায় হাঁটছে আর মনে মনে বলছে, “মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের গর্ভে আমার না ওর এক্স বয়ফ্রেন্ডের সন্তান ছিল। আমাকে বিয়ে করার পর ও সন্তান এবরশোন করতে গিয়ে সারাজীবনের মতো মাতৃত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এসব জেনে কী করবে তোমরা! থাকো না তোমরা নিজেদের মতো। আমি আমার মতো।

আমার যে এখনো অনেক কাজ করতে হবে৷ অনেক হিসাব মেলাতে হবে।

অনেক দূর যেতে হবে আমাকে এখনো। অনেক দূর…!”

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*