মৃন্ময়ী [তৃতীয় অংশ]

লেখক Niloy Rasul

মৃন্ময়ী খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। আর শুভ্র মৃন্ময়ীকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে।
আহসান বলল,”কিরে বলেছিলাম না! বিশ্বাস হলো তো…!” আরিফ আহাসনের কলার চেপে ধরে ওকে মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে শুভ্রর দিকে এগিয়ে গেল।
মৃন্ময়ী এখনো বুঝতে পারছে না সে শুভ্রর ওপর রাগ করতে পারছে না কেন! শুভ্র ওকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে অথচ মৃন্ময়ীর স্বভাব অনুযায়ী এতক্ষণে শুভ্রকে চড় মারার কথা। চড়ের কথা মনে হতেই মৃন্ময়ীর হাসপাতালে চড় মারার কথা মনে হয়ে গেল। সাথে সাথে এক ধরনের অনুশোচনা বোধ কাজ করতে লাগল মৃন্ময়ীর ভিতরে। নিজের ওপরে আবার ভীষণ রাগ হলো ওর। শুভ্রকে আজ অনেক ধকল সহ্য করতে হয়েছে শুধু আমার জন্য সে তো ইচ্ছে করলে এত ঝামেলায় না জড়ালেও পারত। তাহলে দরকার কী ছিল এত ঝামেলা পোহানোর। আবার আলেয়ার বলা কথা অনুসারে পুলিশ সত্যিই ভেবেছিল ও আমার হাজবেন্ড আর আমি সুইসাইড করার চেষ্টা করেছি। তাই ওকে ধরে নিয়ে গেছিল এটা ভেবে যে ও আমার ওপর অত্যাচার করেছে মানে নারী নির্যাতন কেসে! ধুর্ কী একটা বিচ্ছিরি ব্যপার ঘটে গেল তখন! ভাগ্যিস ও কোন পুলিশ অফিসারের ছেলেকে পড়াতো তাই ওনার সহায়তায় বেঁচে গেছে।

আর সবশেষে আমি না বুঝেই ওকে কিনা শেষে চড় মারলাম! ধুরু আমিও না মাঝে মাঝে এমন এমন কাজ করি না! ধ্যাৎ…
আচ্ছা ওকে কি একবার স্যরি বলবো… নাহ্ থাক। কিছু কিছু অনুভূতি তুলে রাখাই ভালো। আচ্ছা শুভ্র তো সত্যিই খুব ভালো! তাহলে ও প্রতি বৃহস্পতিবার কোথায় যায়? ও কি সত্যিই ভালো নাকি…!

পলাশ দ্রুত শুভ্রর কাছে গিয়ে বলল,”কিরে মৃন্ময়ীকে নিয়ে চলে আসলি যে। ওর তো এখন হাসপাতালে থাকবার কথা না?”

শুভ্র মুচকি হেসে বলল,
– হ্যাঁ, ছিল। কিন্তু সেটা আগামীকাল সকাল পর্যন্ত। 
– তো এখন নিয়ে চলে আসলি কেন ওকে!
– কী করব! ও জোর করছিল আর বলল এই তো শেষ সবাই একসাথে থাকার। তাই জোর করছিল। ডাক্তাররাও বলল, একটু সাবধানে হাত নাড়াতে যেন আঘাত না পায়।
-ওহ্…!

সবাই আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে শুভ্র আর মৃন্ময়ীকে। কেউ কেউ কানাঘুষো করতে লেগেছে এটা বলে যে “কি রে শুভ্র আবার মৃন্ময়ীর মায়াজালে ফাঁসলো নাকি!” শুভ্র বুঝতে পারছে মৃন্ময়ীকে সাহায্য করাটা কেউ ভালো চোখে দেখছে না। কিন্তু শুভ্রর কাছে যদি মনে হয় কোনো বিষয়ে ও ঠিক তাহলে পৃথিবীর কেউই ওকে ওর পথ থেকে সরাতে পারবে না। রাত বারোটা বাজতে আর আধা ঘন্টা বাকি। একটু পরেই শুরু হবে নতুন বছর, নতুন দিন। অনেকের জীবন হয়তো পাল্টে যাবে, জীবনের গতি মোড় নিবে শুরু হবে নতুন জীবন।

তেইশ.

শুভ্রা মন খারাপ করে বসে আছে শুভ্রর ঘরে। সে আশা করেছিল শুভ্র বোধয় আসবে। জীবনে এই প্রথম কোনো উৎসব বিষয়ক কিছুতে শুভ্র নেই৷ ভীষণ কান্না পাচ্ছে ওর। মনে মনে কল্পনা করছে কার্টুনের মতো শুভ্র এখন এসে হাজির হবে। কিন্তু সময় পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ শুভ্র আসছে না। রাত বারোটা বাজতে আর কিছুক্ষণ।

শুভ্রর মাকে ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে হয়তো কোনো কাজে সে আটকে গেছে বা আসা সম্ভব না তাই আসছে না। কিন্তু শুভ্রা কোনো কথাই শুনছে না। তাই শুভ্রার মা নিজের ঘরে বসে আছেন। কিছুক্ষণ আগেই অজু করে এসেছেন। নতুন বছরটা তিনি নামাজ পড়ে শুরু করতে চান।

শেষে কিছু না পেয়ে শুভ্রা ওর ভাইয়ের মানে শুভ্রর স্টাডি টেবিলে বসে ওর গল্পের বই গুলো পড়তে লাগলো। নতুন কোনো গল্পের বই ওর ভাই ওর জন্য এনে রেখেছে কিনা খুঁজতে লাগলো টেবিলে। শুভ্রর মোটা মোটা বই সরাতে গিয়ে একটা বইয়ের তল থেকে হঠাৎ করে কিছু ছবি নিচে মেঝের ওপর পড়ল। শুভ্রা গল্পের বই খোঁজা বাদ দিয়ে ছবি গুলোর পিছনে লাগলো।

ছবিগুলো সে মেঝে থেকে কুড়িয়ে এনে বিছানার ওপরে রাখল। দেখল প্রায় চার পাঁচটা ছবি। সবগুলোই একটা মেয়ের। বিভিন্ন পোজের ছবি। একটা চুল ছেড়ে ঘাড় সামন্য কাত করে মুখে রহস্যময় হাসি লাগিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। আরেকটা ছবিতে মেয়েটি কিছু রাস্তার ছোটো ছোটো বাচ্চাদের জামা কাপড় দিচ্ছে তার ছবি। শুভ্রার এই ছবিটা খুব ভালো লাগলো।

আরেকটি ছবিতে মেয়েটি রাস্তায় আলপনা আঁকছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে রাস্তায় আলপনা অঙ্কন করার ছবি।

চতুর্থ ছবিটাতে মেয়েটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিছু বাচ্চাদের রাস্তার পাশে দেয়ালে টাঙানো বোর্ডে “অ” “আ” “ক” “খ” শেখাচ্ছে। শুভ্রার এই ছবিটাও বেশ ভালো লাগলো। বেশ কয়েকবার ছবিটা দেখল ও। ছবির ওপর যত্নের সাথে হাত বোলালো।

কিন্তু শেষ ছবিটা দেখে শুভ্রার চোখ কপালে উঠল। বিস্ফোরিত নয়নে সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। 
ছবিতে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছে। মেয়েটা ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটা পিছন থেকে তোলা তাই কারোরই মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে শুভ্রার বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না যে ওই ছেলেটা আর কেউ নয়, শুভ্রার ভাই শুভ্র!

শুভ্রা বেশ কয়েকবার ছবিটা কাছ থেকে দেখল। তার কোনো ভুল হচ্ছে না ওটা শুভ্রই। তাহলে মেয়েটা কে? শুভ্রা ভ্রু কুঁচকে দেখছে ছবিটা। ওর মাথায় কাজ করছে না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত বারোটা দশ বাজে। কখন যে রাত বারোটা বেজেছে তা ওর মনে নেই৷ ছবি দেখাতে এতই নিমগ্ন ছিল যে রাত বারোটার দিকে যে অনেকে বাজি ফুটিয়ে সেলিব্রেট করেছে তা ওর কানেই আসেনি। অবশ্য এবার তেমন বাজি ফোটায়নি কেউ, পুলিশের কড়া নিষেধ ছিল। 
তাই ছবি গুলো নিয়ে শুভ্রা ওর মায়ের ঘরের দিকে রওনা দিলো।

চব্বিশ.

শুভ্র সিদ্ধান্তেহীনতায় ভুগছে। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। একবার ভাবছে জিজ্ঞেস করবে মৃন্ময়ীকে, তার এভাবে হঠাৎ চুপ করে যাওয়ার কারণ কী? ক্যাম্পাসের সবাই যা বলছে তা কী সত্যি! 
আবার শুভ্র নিজেই নিজেকে গালি দিচ্ছে এটা ভেবে যে সবার মতো সেও ভাবতে শুরু করল যে মৃন্ময়ী খারাপ কিছু করেছে! আসলে মানুষের মন নোংরা জিনিস নিয়ে আলোচনা করতে বেশি পছন্দ করে। এবং একটা তৃপ্তি খুঁজে পায় এটা থেকে তারা। তাই না চাইলেও প্রত্যেকের মনেই ক্ষণকালের জন্য হলেও একটা নোংরা ধারণা জন্ম নেবেই। আমরা আসলে আমাদের সভ্য সমাজে আমাদের তৈরি এক গাড় আবরণে ঢাকা মুখোশের আড়ালে বন্দী। একটা মেয়েকে যদি দেখে উদাসীন ভাবে রাস্তায় হাঁটছে তখন আমরা এটা বলতে দেরি করি না যে, কাহিনী কী রে মেয়েটার!

মেয়েটাকে যদি দেখি এলোমেলো খোলা চুলে ছাঁদে দাঁড়িয়ে করুণ চোখে আনমনে তাকিয়ে আছে দিক হীন ভাবে তখন আমরা দু সেকেন্ড না ভেবেই বলি, মামা কাহিনী মনে হয় হয়ে গেছে ফুল।
কেউ কেউ বলে, ওরকম মাগীকে তো কতো দেখালাম। ওসব দেখার সময় নাই। আজ এর ঘর থেকে বের হয় তো কাল ওর ঘর থেকে বের হয়। এদের তো ঘাটে থাকার কথা এরা আমাদের এসব লোকালয়ে যে কী করে থাকে!

আবার কোনো মেয়েকে যদি আমাদের সভ্য সমাজের মানুষেরা দেখি হঠাৎ বিমর্ষ হয়ে যেতে তখনই মৃন্ময়ীকে যেভাবে সবাই নষ্ট মেয়ে, নোংরা মেয়ে বলছে ঠিক সেভাবেই বলে থাকি খারাপ মেয়ে। বাজারে মেয়ে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে আমরা টোন কাটতে ছাড়ি না।

আসলে যারা গলা ফাটিয়ে বাইরে বক্তৃতা দেই যে মেয়েদেরও অধিকার আছে সবকিছুতে। কিন্তু ওই তারাই নিজ বাড়িতে গিয়ে মেয়েদের বিছানার সামগ্রী ছাড়া কিছু ভাবে না। বাঙালি সমাজটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে সবাই সেলিব্রিটি হতে চায়। যখন যেটা পাবলিকের ভিতরে বেশি হিট করে সেটা নিয়েই মেতে উঠে অনেকে। মেয়েদের হ্যান ত্যান। সেই মর্যাদা দেওয়া উচিৎ। ভালোবাসা উচিৎ,সম্মান করা উচিৎ, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ ইত্যাদি বলে তারাই কিন্তু বাড়ি গিয়ে যখন দেখে ভাত রান্না হয়নি কিংবা টেবিল গোছানো হয়নি তখনই অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে একটা চড় মেরে ঘরে চলে যায়। বিছানায় যাওয়ার আগে একবারও কেউ এটা জিজ্ঞেস করে না সে কেমন আছে, তার মন ভালো কিনা, কোনো বিষয়ে চিন্তিত কিনা, কোথাও ঘুরতে যাবে কিনা বা কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা…নাথিং…!

আবার একটা মেয়ের স্বামী যখন বিদেশে কাজের উদ্দেশ্য যায় তখনই আমাদের সমাজের শিক্ষিত মুর্খ মানুষগুলোই সর্বপ্রথম ওই মেয়েদের দিকে বাঁকা নজরে তাকায়। শুরু হয় চরিত্র নিয়ে গবেষণা।

আসলে আমাদের সমাজটা এখন দৈহিক চাহিদা নির্ভর হয়ে উঠেছে। আমাদের মন মানসিকতার, কথা বলা, তাকানো সবকিছু ধীরে ধীরে ওই একটা নারীর শরীরকে ঘিরেই গড়ে উঠছে যা কখনোই কাম্য নয়। এটা তো গেল শহরের ওলি গোলিতে হওয়া সভ্য সমাজের কিছু নেতৃত্বকারীদের কৃতকর্ম। আর গ্রামে যে পলিটকস্ শুরু হয়েছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না পৃথিবী ধ্বংস হতে বেশি দেরি নেই।

মৃন্ময়ীও আজ এ জঘন্য মানসিকতার নোংরা দৃষ্টির স্বীকার। তার মন খারাপ সে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু কেন ভেঙে পড়েছে তা কেউ খুঁজে বের করার চেষ্টাও করছে না বরং নোংরা গল্পের সবাই মেতেছে। যৌন উত্তেজক গল্প করতে আমাদের সভ্য সমাজ এখন বেশি উৎসাহী!

সবাই খাওয়া দাওয়া করছে এখন। যেকোনো পিকনিকের এটাই মজা। খোলা আকাশের নিচে আহার শেষ করা। শুভ্র খেতে খেতে হঠাৎ তাকিয়ে দেখল মৃন্ময়ীর সামনে খাবার দেওয়া আছে কিন্তু সে খাচ্ছে না। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র গিয়ে মৃন্ময়ীর পাশের চেয়ারে বসল। গলা ঝেড়ে একটু কাশলো।

মৃন্ময়ী চমকে উঠে এদিকে তাকাতে দেখে শুভ্র বসে আছে। দ্রুত চোখের জল গুলো আড়াল করার চেষ্টা করল। 
শুভ্র দেখেছে মৃন্ময়ী কাঁদছে কিন্তু বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল ও। মানুষ নিশ্চয়ই অতি আনন্দে একরকম লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে না!
আর এরকম পরিস্থিতিতে জিজ্ঞেস করা মানে তাকে অস্বস্তিতে ফেলা।
শুভ্র বলল,
-কী রে খাবি না?
মৃন্ময়ী শুভ্রর দিকে তাকিয়ে তারপর ডান হাতের ব্যন্ডেজের দিকে একবার ইশারা করে মাথা নিচু করে আবার অন্যদিকে তাকাল।
– খেতে পারছিস না তো কাউকে ডাকতে পারছিস না…
মৃন্ময়ী জবাবে শুধু তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো। 
– নে এখন হা কর…
মৃন্ময়ী ভ্রু জরো করে বিস্ময়ের সাথে তাকল শুভ্রর দিকে। 
শুভ্র বলল,
– থাক… ঝগড়াটা পরে করা যাবে।

মৃন্ময়ীর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখে ফুটে উঠল।

-সবে ইংরেজি বছরের শুরু হলো। এখন খেয়ে নে। তারপর বাসায় যা। আগামীকাল ক্যাম্পাসে এসে ঝগড়া করে যাবে।

শুভ্রর শেষ কথাটা শুনে মৃন্ময়ীর সদ্য হাসি মাখা মুখটা মলিন হয়ে গেল। 
শুভ্র চামচে করে খাবার তুলে মৃন্ময়ীকে খাইয়ে দিচ্ছে। মুহূর্তেই মনে হচ্ছে কেমন একটা ভালো লাগার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর এমন কিছু ঘটনা শুনল যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি। 

পঁচিশ.

শুভ্রর মা বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। শুভ্রর মাও চিনতে পেরেছে শুভ্রকে ছবিতে। কিন্তু পিছন থেকে ছবিটা তোলা তাই ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না কারোরই মুখ। শুভ্রর মা মেয়েটির অন্য ছবি গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে।

ছবির ওপর হাত বোলাচ্ছেন আর মনে মনে বলছেন, ” কেন মা সেদিন ওরকম করলে তোমরা। তোমাদের কারও তো কোনো ক্ষতি হয়নি, আমার শুভ্রর ছাড়া। সেদিন তোমাদের করা একটা কাজ আমার পাগলা ছেলেটার সারাজীবনের হাসি কেড়ে নিলে।

জানো সেদিনের পর থেকে আমার শুভ্র হাসা কী জিনিস তা ভুলে গেছে। সেই হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল শুভ্র আর নেই। সেই শুভ্র মারা গেছে। জন্ম নিয়েছে নতুন এক অচেনা শুভ্রর!

আমি আর আমার ছেলের এ কষ্ট দেখতে পারি না। কিন্তু আমি কখনোই বিচার চাইব না এর। শুধু আল্লাহ’র কাছে মিনতি রইলো তিনি যেন এরকম মন্দ ভাগ্য কাউকে না দেন।”

শুভ্রর মায়ের চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। শুভ্রা সেদিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কিছু কিছু আন্দাজ করবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। বারবার সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর।

ওর ভাইয়ের টেবিলে এই মেয়েটার ছবি রয়েছে না জানি কতদিন ধরে অথচ শুভ্রা জানত না। বিষয়টা কেমন যেন ঘোলাটে আর কুয়াশাচ্ছন্ন নদীর পাড়ের মতো লাগছে। শুভ্রা শেষে অনেক ভেবে চিন্তা করে ঠিক করল আগামীকাল স্কুল গিয়ে আগে ওর প্রিয় নিহারিকা ম্যমকে প্রশ্নটা করবে।

ছাব্বিশ.

সবাই হা করে মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে আছে। সবার সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মৃন্ময়ীর মুখ থেকে আসল সত্যিটা জানতে পেরে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। যারা ওর বদনাম করেছিল তারাও আজ নিশ্চুপ। একটা মানুষের জীবনে এতটা ট্র্যজিডিও থাকতে পারে না মৃন্ময়ীকে না দেখলে কেউ হয়তো জানতেই পারত না।

আলেয়া মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলল,
-তাহলে তুই কী করবি এখন?

-মানে?

– তুই তো বলছিস যে আর ও বাড়িতে ফিরে যাবি না। কিন্তু থাকবি কোথায়?

মৃন্ময়ী চুপ করে গেল। সে নিজেও জানে না সে কোথায় থাকবে। মৃন্ময়ীর হঠাৎ মনে হলো এই পৃথিবীতে বোধয় ওর মতো আশ্রায়হীন একটাও নেই। সবকিছু ভুল ও বাড়িতে আবার যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃন্ময়ীর জন্য। সে বারবার চেষ্টা করছে নিজেকে বোঝাতে কিন্তু পারছে না। আজ ওর বন্ধু বান্ধবদের সবকিছু বলতে পেরে শান্তি লাগছে ওর খুব।

আলেয়া মৃন্ময়ীকে বলল,
-আচ্ছা, এক কাজ কর তুই..

-কী কাজ..

– তুই আজকের মতো তোর বাসায় চলে যা…আরে চোখ গরম করে তাকানোর কিছু নাই৷ লজিক দিয়ে বোঝ তুই। দুএকদিনের মধ্যে আমরা হোস্টেলে তোর জন্য একটা সিট নেওয়ার চেষ্টা করব। যে কদিন পরীক্ষা না শেষ হয় সে কদিন তো তুই থাকতে পারবি এখানে।

-ওকে

– আর তারপরের থাকার ব্যবস্থা কিন্তু তোকে করতে হবে।

-হুঁ, আচ্ছা।

পলাশ আলেয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
– আজ রাত কি তোদের হোস্টেলে থাকতে দেবে না?
– না রে..
– গেস্ট হিসাবেও না?
– সব ছিট বুক আছে রে। নয়তো এত রাতে ওকে আমি বাড়ি ফিরে যেতে বলতাম না।
-ওহ্
-হুঁ,
-তাহলে আমরা সবাই উঠি আজকে! রাত তো অনেক হলো…

সবাই উঠে পড়ল। বাড়ির দিকে সবাই পা বাড়াচ্ছিল। শুভ্র হতভম্ব হয়ে এখনো বসে আছে চেয়ারে। মৃন্ময়ী হঠাৎ বলে উঠল,
-আমি তো গাড়ি নিয়ে আসিনি। কীভাবে যাবো এখন!

শুভ্র ওর দিকে তাকাল। পলাশ শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল
– তোর বাড়ি তো ওর বাড়ির আগেই। ওকে তুই ওর বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে এসে তোর বাসায় ব্যাক করিস।

শুভ্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।

শুভ্র আর মৃন্ময়ী বাড়ির রাস্তায় পা বাড়াল।

ল্যামপোস্টে বাল্ব জ্বলছে। মনে হচ্ছে যেন রাত বাড়ার সাথে সাথে তারাও ঝিমাতে শুরু করেছে।

শুভ্র রাস্তায় এসে মৃন্ময়ীর দিকে না তাকিয়েই কথা বলতে লাগল। কেননা কেয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও সেও মৃন্ময়ী সম্পর্কে ওই ধারণা বিশ্বাস করেছিল। যদিও মুহূর্তেই তা অবিশ্বাস করেছিল।

শুভ্র বলল,

– কিসে যাবি রিকশা? নাকি সিএনজির জন্য অপেক্ষা করবো? যদিও সিএনজি পাওয়া টাফ হবে অনেক।

-তুই আমার দিকে না তাকিয়ে এভাবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিস কেন?

– কোথায়! না তো…

-আমি তোর পাশে দাঁড়িয়ে! রাস্তায় বসে না…

– হা হা হা…বললি না তো কিসে যাবি…

– তোর ঘাড়ে চড়ে যাবো।

শুভ্র তড়িৎ বেগে মৃন্ময়ীর দিকে তাকানোর পর দুজনের চোখাচোখি হতেই দুজনেই হেসে ফেলল। শুভ্রর মনে হলো কী যেন একটা গলা থেকে নেমে গেল। দুজনের মাঝে গুমোট আবহাওয়াটা অনেকটা কেটে গেছে এখন।

মৃন্ময়ী শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল

– চল হেঁটেই যায়। কাছেই তো…!

– কিন্তু এত রাতে!

-হুঁ! সেজন্যেই বলছি হেঁটে যায় চল। সারাদিনের সকল কৃত্তিমতা শেষে সকলে আপন বেশে ঘুমাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্ট আর আমরা দুজনে জেগে আছি। ভাবতো কতটা মজার বিষয়। কেউ আমাদের দেখতে পারছে না অথচ আমরা দু’জনে চেনা শহরের অচেনা রুপের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি সামনে! বেশ মজার না বিষয়টা!

শুভ্রর এই প্রথম মৃন্ময়ীকে ছোট মানুষের মতো মনে হলো। মৃন্ময়ীর সাথে আজ এই কিছুক্ষণ থাকার পর শুভ্রর মনে হয়েছে মেয়েটা সবসময় একটা মুখোশ দ্বারা সবসময় আড়াল করে রাখে। সবাই বাইরে ওর যে কঠিন রূপ দেখে তা আসলে পুরোটাই মরিচিকার মতো। মৃন্ময়ী আসলে ঠিক তার উল্টো। ঠিক যেরকম শুভ্র চায় সবা মানুষ গুলো হোক সেরকম। শুভ্র কল্পনায় যেরকম মানুষ দেখে ঠিক সেরকম ছাঁচে গড়া মৃন্ময়ী

আজকের অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে মৃন্ময়ীর ওপর শুভ্রর শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে শুভ্রর।

মৃন্ময়ী আর শুভ্র হেঁটে চলেছে সারাদিনের ক্লান্ত হয়ে থাকা বিশ্রামরত কালো পিচ ঢালা রাস্তার ওপর দিয়ে।

মৃন্ময়ী মনে মনে ভাবছে, শুভ্রকে একবার জিজ্ঞেস করবে কিনা ও প্রতি বৃহস্পতিবার ঠিক কোথায় যায়? তারপর হাজার চেষ্টার পর মনের ইচ্ছে টা দমিয়ে রাঝল মৃন্ময়ী।

শুভ্র দু হাত পকেটে দিয়ে হেলে দুলে হাঁটছে আর মৃন্ময়ী গায়ে ভালো করে চাদর মুড়িয়ে হাঁটছে। একটু একটু শীতল হাওয়া বইছে রাস্তায়। দু’জনে হেঁটে চলেছে অবিরাম। এক দারুণ সৌন্দর্যর সৃষ্টি হয়েছে যা শুধু দেখে অনুভব করা সম্ভব, লেখে নয়।

মৃন্ময়ী হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,
– সেই মেয়েটার কী খবর রে?

শুভ্র বুঝতে না পেরে বলল
-কোন মেয়েটার?

– সামিরা…

শুভ্র চুপ করে গেল। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল মৃন্ময়ী অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারল না কী বলছে।

-শুভ্র…

-হুঁ বল

– বললি না তো ওই মেয়েটার কী খবর…

– বাদ দে না..

-রাগ করলি আমার ওপর?

-আরে রাগ করব কেন!

– না মানে ওই মেয়েটার কথা হুট করে জিজ্ঞেস করলাম তো তাই…

-নারে! যারা জীবনে চলে যাওয়ার জন্যই শুধু আসে তার কখনোই আপন ছিল না..

– স্যরি…

– স্যরি হবার কিছু নেই..

– না মানে এতদিন পর ওর কথা তুললাম তো তাই। আসলে মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে তো তাই…

শেষ কথাটা বলে মৃন্ময়ী নিজেই লজ্জা পেল। চুপ করে গেল তারপর। সে কেন মাঝে মাঝে এসব ভাবে তার উত্তর নিজেকে প্রশ্ন করেও খুঁজে পেল না।

– আসলে সামিরাকে দোষ দিবো না কি নিজের ভাগ্যকে দোষ দিবো মাঝে মাঝে আমি নিজেই কনফিউজড হয়ে যায়..
.
-তারমানে তুই এখনো ওর কথা ভাবিস তাই না?

বলেই মৃন্ময়ীর মুখটা মলিন হয়ে গেল।

– অবচেতন মন অনেক কিছুই ভাবাই রে! সবকিছুর ওপর জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও অবচেতন মনের ওপর তো আর জোর চলে না। সে নিজের গতিতেই চলবে!

মৃন্ময়ীর মনে হলো শুভ্র ওর মনের কথাটাই বলেছে। মৃন্ময়ী এত চায় ওর জীবনে ঘটে যায় ঘটনা গুলো মন থেকে মুছে ফেলতে কিন্তু সে পারে না। ওরও অবচেতন মন ওর মনের বিপক্ষে গিয়ে কাজ করছে।

শুভ্র হঠাৎ বলে উঠল,

-মৃন্ময়ী চল একটা কাজ করি

-কী কাজ

মৃন্ময়ী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। এরকমই অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা শুধু শুভ্রর মাথা থেকেই আসা সম্ভব। মৃন্ময়ী তাই এখন কীভাবে হাসবে বুঝতে পারছে না। জোরে হাসবে না আস্তে হাসবে নাকি শেষ রাতের স্তব্ধতা ভেঙে চিৎকার করে হাসবে!

শুভ্রর বলা শেষ কথাগুলো এখনো ওর কানে ভাসছে। শুভ্র চলতে চলতে হঠাৎ মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

-চল একটা কাজ করি..

-কী কাজ!

-আচ্ছা তার আগে বল কয়টা বাজে এখন?

মৃন্ময়ী মোবাইল দেখে বলল
-তিনটা পয়তাল্লিশ। কিন্তু কেন?

– আমার একটা পরিচিত জায়গা আছে ওখানে যাবি? না মানে যদি বিশ্বাস করতে পারিস তো…

– বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন তুলছিস কেন এভাবে বল তো শুনি? এভাবে বলবি না আর…

-ওকে বাবা বলবো না…

-কিন্তু যাবিটা কোথায় আর এতো রাতে আই মিন শেষ রাতের দিকে…

-আমার পরিচিত একটা জায়গা আছে একটা জলাশয় আছে একটা ওখানে। পাশেই খেজুর গাছ। তো ভোরের আজানের পরপরই তো রসওয়ালা ঠুলি গাছ থেকে নামায়। তখন একবারে টাটকা রস খাওয়ার যে কী মজা…

-আমি না কখনো খেজুরের রস খায়নি।

মৃন্ময়ী ফেকাশে মুখে বলল।
শুভ্র একটু হেসে বলল,

– তো চল আজ খেয়ে, আয় দারুণ লাগবে। আর আসার পথে গরম গরম ধুপি পিঠা খাওয়া যাবে…

-ধুপি পিঠা কোথায় খাবি! খেজুরের রসের মতো কোনো জায়গায় নাকি..!

শুভ্র হো হো হো করে হেসে ফেলল। 
মৃন্ময়ী বলল,

-কী রে! হাসছিস ক্যান এভাবে!

– না কিছু না। আরে না ধুপি আমার বাড়িতে খাবো। মায়ের সাথে গতরাতেই কথা হয়েছে আজ সকালে ধুপি পিঠা বানাতে বলেছি। অনেকদিন খাওয়া হয়নি। খেজুরের গুড়ের ধুপি পিঠা! ওহ্…কী স্বাদ রে!

– তাই!

– হুঁ…! আগে চল টাটকা খেজুরের রস খেয়ে আসি…

কেউ আর কথা না বাড়িয়ে হেঁটে যেতে লাগলো। কয়েকঘন্টা দুজন দুজনের কাছে ছিলো অথচ কথার ভাবে কী গভীরতা। যেন মনে হচ্ছিল ওরা দু’জন দু’জনের সাথে সরাসরি কথা না বললেও মনে মনে হাজারোবার কথা বলেছে!

সাতাশ.

ভোরের আজন হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। পূব আকাশ কিছুটা হলদেটে হতে শুরু করেছে। সূর্য উঁকি দিচ্ছে আকাশে। 
মৃন্ময়ীর বাবা নামাজ পড়ে এসে মৃন্ময়ীর মাকে ডাকলো।

মৃন্ময়ীর মা ঘুম জোড়া চোখে বলল,

-কী হয়েছে ডাকছ কেন এভাবে?

-আজান হয়ে গেছে নামাজ পড়বা না! ওঠো…

-ঘুমাচ্ছিলাম তো..

-নামাজ পড়ে প্রয়োজনে আবার ঘুমাও। তবুও নামাজ পড়ে নেও। দিনের শুরুটা পবিত্র কাজের সাথে শুরু করলে কাজে বরকত আসে..

-হাহ্ আর বরকত!

-আল্লাহ্ এর ওপর সবসময় বিশ্বাস রাখবা। তিনি ছাড়া আমাদের মুক্তির পথ নেই । যাও ওঠো নামাজ পড়ে নেও।

মৃন্ময়ীরর বাবা আর অপেক্ষা না করে বারান্দায় চলে গেলেন। নিজের হাতে বানানো কফি খাচ্ছেন আর বাইরের প্রকৃতির রহস্যময় রূপ দেখছেন।

অথচ এত বিলাসবহুল জীবন যাপনের স্বপ্ন ভুলেও দেখতেন না মৃন্ময়ীর বাবা!

আর কফি তো দূরের কথা চিনি ছাড়া এক কাপ রং চা খাবার মতো টাকা জোগাড় করা ছিল তার জন্য দুঃসাধ্য। কতদিন যে পরিবার সহ না খেয়ে কাটিয়েছেন সে ইতিহাস অন্তপুরে থাকাই ভালো।

শুধু কয়েক সেকেন্ডের একটা কাজ ব্যাস মৃন্ময়ীর বাবার জীবন পরিবর্তন হয়ে গেল! দু’বেলা খেতে না পারা মৃন্ময়ীর বাবা এখন ভোরে বারান্দায় বসে কফিও খান!

মাঝে মাঝে ভীষণ অনুসূচনা হয় মৃন্ময়ীর বাবার সেদিনের সেই কাজটার জন্য। কিন্তু ললাটের রেখা কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। সে তার পথে চলবেই। উনার আর ফেরার পথ নেই। পাপ তো পাপই তাই না!

কিন্তু উনি এটা বুঝতে পারেন না মৃন্ময়ী কীভাবে জানলো সবকিছু! মৃন্ময়ীর বাবা বুঝে গেছেন মৃন্ময়ী এখন সবকিছু জানে। আর এ জীবনে মৃন্ময়ী মরে গেলেও যে ওর বাবাকে ক্ষমা করতে পারবে না তাও জানেন তিনি। কিন্তু মৃন্ময়ীর বাবা বুঝতে পারেন না কে এসব কথা মৃন্ময়ীকে বলেছে!

“মোনালিসা…!” হঠাৎ নামটা মৃন্ময়ীর বাবার মাথায় যেন ধাক্কা খেল! মুহূর্তেই পুরো শরীর হিম হয়ে গেল উনার। ধোঁয়াশাময় পথের কুয়াশা অনেকটা কেটে গেল। উনি এখন ধীরে হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন।

কারণ ওই সময় একজনই হুট করে চলে এসেছিল সে হলো তখনকার মৃন্ময়ীর বাবার প্রতিবেশী মোনালিসা!

মৃন্ময়ীর বাবা কফির মগে চুমুক দিয়ে ঠোঁটের কোনে প্রতিশোধের হাসি দিয়ে বললেন,” যদি সত্যিই মোনালিসা এটা করে থাকে তাহে ওকে শিঘ্রই অনেক কিছু ফেস করতে হবে…”

মৃন্ময়ীর বাবা পকেট থেকে মোবাইল বের করে ডায়াল প্যাডে নাম্বার টাইপ করছেন এমন সময় মৃন্ময়ীর বাবার কাঁধে কে যেন হাত দিলো। মৃন্ময়ীর বাবা চমকে পিছনে তাকালেন…

আটাশ.

শুভ্রর মা রান্নাঘরে কাজ করছেন আর শুভ্রা একবার এটা তুলছে তো আরেকবার ওটা তুলছে। কী করছে তার ঠিক নেই। গতকালের ছবির কথা ভুলে গেছে প্রায়। 
শুভ্রার মা বার বার ওকে বকা দিচ্ছে। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। শুভ্রার মা শুভ্রাকে বললেন কে এসেছে দেখতে।

শুভ্রা জানে ওর ভাইয়া শুভ্রই এসেছে কারণ ওভাবে কলিংবেল শুভ্র ছাড়া কেউ বাজায় না।

শুভ্র দৌড়াতে দৌড়াতে এসে দরজা খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। শুভ্রর পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তার ডান হাতে ব্যান্ডেজ।

শুভ্রা দ্রুত দরজা খুলে দিয়ে ঘরে ঢুকে ওর মাকে চিৎকার করে বলতে লাগলো,

-ও মা দেখে যাও, তোমার ছেলে রাস্তা থেকে কোন অসুস্থ মেয়েকে ধরে নিয়ে চলে এসেছে… দেখে যাও গো মা দেখে যাও… তোমার এত বড় ছেলের আজও বুদ্ধি হলো না গো। অপরিচিত মেয়ে মানুষকে বাড়িতে আনতে হয় না এভাবে ও সব ভুলে গেছে। মা গো মা দেখে যাও…!

মৃন্ময়ী হেসে ফেলেছে শুভ্রার কথা শোনার পর। শুভ্র দরজায় তালা লাগিয়ে এসে শুভ্রার কাছে দাঁড়াতেই শুভ্র বলে উঠলো,

– তোর কী বুদ্ধি শুদ্ধি এ জনমের হবে না ভাইয়া। এ কোন অসুস্থ মেয়েকে তুলে এনেছিস তুই।

শুভ্র শুভ্রার কান চেপে ধরে বলল

– ওটা অপরিচিত অসুস্থ মেয়ে মানুষ না। ও আমার ক্লাসমেট।

– ও! আমি জানতাম নাকি! দাড়া মাকে বলে আসি।

– থাক মহারাণী আপনাকে আর কষ্ট করে কাজ করতে হবে না। এমনিতে যথেষ্ট জোরে মাইক বাজিয়েছেন। আর আপনার কান কে ছাড়াই এবার আমি দেখছি…

শুভ্রা মুখ ভেঙচিয়ে বলল,

-আমিও দেখব এবার কে রোজ রাতে তোর বাড়ি আসার সময় দরজা খুলে দেয়! মা তো জীবনেও খুলবে না। হিহিহি

-ওরে বদ…

শুভ্রা হিহি করে হাসতে হাসতে ঘরের ভিতরে দৌড় দিলো।

মৃন্ময়ী হাসি থামিয়ে বলল,
-তোর বোনটা তো খুব কিউট!

-কিউট না ছাই! দু মিনিট বস বাড়িতে দেখ পুরো বাড়ি মাথায় করে একবার তুলবে আর একবার নামাবে। আর তোকে নাচিয়ে নিয়ে বেড়াবে
ওর কথা বেশি শুনতে যাসনে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে

মৃন্ময়ী আবার হাসতে শুরু করলো। মনে হলো যেন কতদিন পর প্রাণ খুলে হাসলো ও।

– চল ভিতরে চল…

মৃন্ময়ীকে নিয়ে শুভ্র ভিতরে ঢুকতেই শুভ্রর মা বললেন 
-কে এসেছে রে শুভ্র?

-আমার ক্লাসমেট মা…

শুভ্রর মা অবাক হয়ে মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে আছে। গতকালকে শুভ্রার শুভ্রর টেবিল থেকে যে ছবিটা বের করে এনেছে তার সাথে উনার সামনে যে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার কোনো মিল নেই!

শুভ্রর মা চুলার কাছ থেকে উঠে এসে শুভ্র আর মৃন্ময়ীর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

– মা তোমার নাম কি?

মৃন্ময়ী অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জীবনে এই প্রথম কেউ এত স্নেহের সাথে কথা বলল। ওকে ভালোবেসে “মা” সন্মধোন করে ডাকলো। মৃন্ময়ীর বুকের ভিতরে কেমন যেন একটা অনুভব করল। এখনো ও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শুভ্রর মায়ের দিকে। হঠাৎ অনুভব করল কে যেন ওর বা হাতের আঙুল ধরে ওর হাত নাড়াচ্ছে বারবার। মৃন্ময়ী তাকিয়ে দেখল শুভ্রা ওর হাত ধরে ওকে ডাকছে আর বলছে,

-মা তোমার নাম জানতে চাইছে গো মেয়ে। নাম বলো মাকে…নাম টাম নাই নাকি…

মৃন্ময়ী হেসে ফেলেছ শুভ্রার কথা বলার ধরণ দেখে। ওর সাথে কখনো কেউ এরকম করে কথা বলেনি। বেশ মজা লাগছে ওর।

শুভ্র ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

-মা তোমার মেয়ে কিন্তু দিনদিন ডাকাত তৈরি হচ্ছে একটা৷ না ডাকাত না, ডাকাতদের সর্দারনী।

শুভ্রর মা শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,

-সে তো তুই নিজেই ওকে এটা তৈরি করেছিস। আমাকে কী বলতে এসেছিস এখন। কখনো ওকে তো বকাও দিতে দিস না। এখন ডাকাত বললে হবে…!

শুভ্রা খিলখিল করে হেসে উঠলো। শুভ্র ওর দিকে তাকাতেই শুভ্রা জিহ্বা বের করে ওকে ভেঙচি কাটতে লাগলো। শুভ্র ওকে হাতের ইশারায় মার দেখালে ও মাথার দুপাশে দুই কানের ওপর হাত রেখে কাল্পনিক দৈত্যের মতো জিহ্বা বের করে চোখ বন্ধ করে ভেঙচি কাটতে লাগলো। তখন শুভ্রও ওকে ভেঙচি কেটে ওর মায়ের দিকে তাকালো।

মৃন্ময়ী পুরো অবাক। এই শুভ্রকে কখনো দেখেনি ও। ছোটদের সাথে তালে তাল দেওয়া এই শুভ্রকে ও সবসময় দেখে এসেছে কঠিন রূপে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যার হাত চলতে কখনও কোনো দ্বিধা করে না। ক্যাম্পাসে শুভ্রর সাথে সবসময় ইচ্ছে করেই ঝগড়ায় লেগে থাকলেও মৃন্ময়ী শুভ্রর এই প্রতিবাদী সত্ত্বাকে খুব পছন্দ করতো। আর মনে মনে বলত, “সব ছেলেরা যদি শুভ্রর মতো হতো তাহলে রোজ রোজ খবরের কাগজের শিরোনাম ‘ তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের স্বীকার’ এটা হতো না।”

-ওদের ভাইবোনের কাজাকাম দেখতে যেয়ো না মা। তাহলে তোমার নিজেরই মাথা খারাপ হয়ে যাবে।

জবাবে মৃন্ময়ী একটু হাসলো।

-তোমার নামটা তো বললে না মা!

-জি! মৃন্ময়ী… আমার নাম মৃন্ময়ী…

-মৃন্ময়ী! মাশাল্লাহ… নামটাতো সুন্দর…
বলেই শুভ্রর মা মৃন্ময়ীর চিবুকে হাত বুলিয়ে তারপর চুমু খেলেন।

-নামটা যেরকম মিষ্টি.. তুমি দেখতেও সেরকম মিষ্টি। এই তোমাকে তুমি করে বললাম কিন্তু! কিছু মনে কোরো না যেন…

– না না আন্টি কী মনে করব!

-ভিতরে এসে বসো মা…

মৃন্ময়ীকে ভিতরে এসে বসালেন শুভ্রর মা। তারপর বললেন

-আজকে ধুপি পিঠা করছি। খেয়ে যেয়ো। শুভ্র গতকাল ফোন করে হুট করে বলল যে ধুপি পিঠা খেতে নাকি তার খুব ইচ্ছে করছে! দেখো তো ছেলের কান্ড!

শুভ্রর মা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। শুভ্র মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলল,

-এখানেই বসবি? নাকি ঘরে গিয়ে বসবি…

-না না। এখানেই ঠিক আছি।

-আচ্ছা…

শুভ্র নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। 
নিদ্রাহীন রাত কাটানোর পর মৃন্ময়ীর মনে হচ্ছিল একটু ঘুমাতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এই ড্রেসে কীভাবে ঘুমাবে ও তা বুঝতে পারছে না। আর শুভ্রই বা কী ভাববে তাই ঘুমানোর ইচ্ছেটা জোর হস্তে দমন করল ও। তাছাড়া একটু ফ্রেশ হওয়াও দরকার। কিন্ত নতুন এভাবে এসে কথা বলাও ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না।

এর ভিতরেই রান্নাঘর থেকে শুভ্রর মা বলল,

– এই শুভ্রা মৃন্ময়ীকে একটু ওয়াশরুমেটা দেখিয়ে দে। সারারাত অনুষ্ঠান করে এসেছে। একটু ফ্রেশ হওয়াও দরকার ওর।

মৃন্ময়ী মনে হলো যেন হালে পানি পেল। কিন্তু শুভ্রর মা কীভাবে বুঝল যে ও মনে মনে এটাই চাইছিল!

মৃন্ময়ীর মুখের ভাব মুহূর্তেই পরিবর্তন হওয়া দেখে দরজার আড়াল থেকে শুভ্র মুচকি হেসে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

ঊনত্রিশ.

শুভ্রার স্কুলে নতুন শ্রেণীর বই দিয়ে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ও স্কুলের ভিতরে একটা বেঞ্চে ওর ম্যাম নিহারিকার জন্য ও অপেক্ষা করছে।

স্কুলে বই পাওয়ার পর বইগুলো ব্যাগের ভিতরে ঢোকানোর সময় ওর চোখ আটকে যায় গতরাতে ওই পাঁচটা ছবি ঢুকিয়ে রেখেছিল ও সেদিকে। তখনই মনে হয় ও গত রাতেই তো ছবি গুলো ঢুকিয়ে রেখেছিল ওর ম্যামকে জিজ্ঞেস করবে বলে।

নিহারিকা এসে শুভ্রার কাঁধে হাত রাখতেই শুভ্রা চমকে উঠলো। শুভ্রা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল নিহারিকা দাঁড়িয়ে আছে। 
নিহারিকা শুভ্রার পাশে বসে শুভ্রাকে পায়ের ওপর বসিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল

-কী হয়েছে আমার শুভ্রামনির। অফিসে শুনলাম তুমি নাকি অপেক্ষা করছ আমার জন্য! কী হয়েছে শুনি, যে আমার শুভ্রা মনি এত উদ্বিগ্ন!

শুভ্রা বুঝতে পারছে না কী বলবে! আগে ছবির কথা বলবে নাকি বাসায় ভাইয়ার যে ক্লাসমেট এসেছে তার কথা বলবে। পরে ভাবল শুভ্রর ক্লাসমেটের সাথে তো এখনো পরিচয়ই হয়নি আর নামটা পর্যন্ত এখনো জানে না। কাজেই ওর কথা বলা ঠিক হবে না। শুভ্রা সিদ্ধান্ত নিলো ছবির কথায় আগে বলবে।

-ম্যাম…

-হুঁ, বলো…

-আমি না গতকাল… না থাক কোথায় পেয়েছি বলব না। কিন্তু কিছু ছবি পেয়েছি একজায়গায়..

-তাই কিসের ছবি!

-একটা মেয়ের…

-একটা মেয়ের! হ্যাঁ, হতেই পারে কারও একটা ছবি কিন্তু তোমার চোখমুখে এত চিন্তার ছাপ কেন বুড়ি!

-দাঁড়ান। আপনাকে দেখায় ছবিগুলো তাহলেই বুঝতে পারবেন। ছবির মেয়েটাকে চিনি না আমি তাহলে ভাইয়ার টেবিলে…

শুভ্রা চুপ করে গেল।

-ভাইয়ার টেবিলে কী বুড়ি?

-কিছু না…

বলে শুভ্রা ব্যাগ থেকে ছবি গুলো বের করে নিহারিকার হাতে দিলো।
নিহারিকা হাসি মুখে ছবি গুলো নিতেই ওর মুখে আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘের ছাপ দেখা দিলো। বিস্ফলরিত নয়নে সেদিকে তাকিয়ে আছে নিহারিকা। হাত ক্রমাগত কাঁপতে লেগেছে ওর। কীভাবে এটা সম্ভব ও বুঝতে পারছে না।

কাঁপা কাঁপা গলায় নিহারিকা শুভ্রাকে জিজ্ঞেস করল,

-এ ছবি তুমি কোথায় পেলে?

-আমাদের বাড়িতে…

-বাড়ির কোথায়?

-আ.. পেয়েছি একজায়গায়! কিন্তু ম্যাম আপনি কি চেনেন উনাকে?

নিহারিকার বুকের ভিতরে কাঁপছে। হৃদকম্পন মনে হচ্ছে যেন হুট করে বেড়ে গেছে ওর। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আর মনে মনে ভাবছে এটা কী করে সম্ভব!

মনে মনে ও বিভিন্ন যুক্তি মেলানোর চেষ্টা করছে কিন্তু সবশেষে শুধু একটা “কিন্তু” থেকে যাচ্ছে…

ভাবনার জগতে ছেদ ঘটল নিহারিকার শুভ্রার ডাক শুনে।

-ম্যাম..ও ম্যাম..কোথায় হারিয়ে গেলেন.!

-আআ.

নিহারিকা চমকে উঠে শুভ্রার দিকে তাকাল,

-কী ভাবছেন ম্যাম..

– না মানে একটু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম এনাকে চিনি কিনা…

আর কোনো কথা না বলে নিহারিকা উঠে দাঁড়াল। তারপর শুভ্রার দিকে তাকিয়ে বলল,

-তুমি বাসায় চলে যাও।

বলেই ও নিজেই হাঁটা ধরল।

ত্রিশ.

“এই যে ওঠো..ওঠো…! এই যে..!”
শুভ্রা মৃন্ময়ীর হাত ধরে ঝাঁকি দিচ্ছে আর মৃন্ময়ীকে ডাকছে।

মৃন্ময়ী হাত মুখ ধুয়ে এসে শুভ্রার মায়ের হাতে বানানো পিঠা খেয়ে এ ঘরে এসে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। 
শুভ্রার ডাকে ওর ঘুম ভাঙল।

মৃন্ময়ী ক্লান্ত ঘুম জোড়া চোখ মেলে দেখল শুভ্রা ওর সামনে বিছানার ওপর বসে আছে।

মৃন্ময়ী উঠে বসল। তারপর বলল,

– ক্লান্ত ছিলাম তো তাই এ ঘরে এসে বসে থাকতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

-তাই বলে এই রুমে এসেছ! তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি যে এই রুমে এসেছ!

মৃন্ময়ী অবাক চোখে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল

-কেন কী আছে এই রুমে!

-এটা ভাইয়ার ঘর তো! ভাইয়ার ঘরে ঢুকলে খালি বকা দেয়। আর বিছানার চাদর জড়ো হয়ে থাকলে সোজা এসে আমার কান চেপে ধরে। হিহিহি…

-তাই…!
মৃন্ময়ী শুভ্রার কথা শুনে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। প্রথমে শুভ্রা এমন ভাবে বলেছিল মৃন্ময়ী ভয় পেয়ে গেছিল। তবে শুভ্রর ঘরে এসে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়াতে একটু লজ্জাও লাগছিল।

মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে শুভ্রা বলল,

-তোমাকে একটা কথা বলব,তুমি হাসবে না তো..

– হাসব না বলো..

-তোমার চোখ গুলো না খুব সুন্দর!

মৃন্ময়ী সত্যিই এবার হেসে ফেলল। জীবনে প্রথম বোধয় কেউ ওর প্রশংসা করল…!

দুপুরে সবাই এক সাথে খাওয়া দাওয়া করে মৃন্ময়ী সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলো। শুভ্র বলল যে, সে মৃন্ময়ীকে পৌঁছে দিবে বাড়ি পর্যন্ত। তাই সে ও বেরিয়ে পড়ল। পড়ন্ত বিকেলে কালো পিচ ঢালা রাস্তায় ও আর মৃন্ময়ী হেঁটে চলেছে অবিরাম। গলি ছেড়ে বড় রাস্তায় আসতেই
শুভ্র একটা রিকশাকে ডাকতে গেলে

মৃন্ময়ী বলে উঠল,

-রিকশা ডাকছিস কেন?

-ওমা তুই বাড়ি যাবে না?

-হ্যাঁ। তো…

-সেজন্যই তো রিকশা ডাকছি। আর আংকেল আন্টি তোর জন্য অপেক্ষা করছে গতকাল থেকে। তারাও তো কতো টেনশন করেছে তাই না! তাও ভালো তুই তাদের ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলি!

মৃন্ময়ী মনে মনে হেসে উঠল। আর ভাবল,মানুষকে বোকা বানানো কতো সহজ!

তখন শুভ্রর মা মৃন্ময়ীকে বলল যেন বাসায় ফোন করে বলে যে আসতে দেরী হবে আর তাঁরা যেন চিন্তা না করে। কিন্তু মৃন্ময়ী জানে তার জন্য বাড়িতে দরজার কাছে বসে পথ চেয়ে কেউই অপেক্ষা করছে না। আর শুভ্রর মাও জানে না এখনো কিছু। তাই বাধ্য হয়েই তখন মৃন্ময়ীকে ওর নিজের আরেকটা ফোনে কল করে কথা বলার অভিনয় করতে হয়েছিল। শুভ্রও ভেবেছে যে মৃন্ময়ী সত্যিই বোধহয় মৃন্ময়ীর মা বাবকে ফোন করেছিল।

মৃন্ময়ী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-আরে না সমস্যা নাই। চল না হেঁটেই যাই। ভালো লাগছে খুব।

-কিন্তু ফ্রেন্ডরা যদি শোনে আমি তোকে গতরাত থেকে শুধু হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি তাহলে কী বলবে বল তো ওরা!

মৃন্ময়ী শুভ্রর কথা শুনে হেসে ফেলল।

-কীরে হাসছিস কেন!

-তুই কি ওদের কাছে কথা শুনবি সেজন্য রিকশা ডাকতে চাইছিস নাকি আমার জন্য ডাকতে চাইছিস সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তাই হাসছি…

-দেখ মৃন্ময়ী কথা প্যাঁচাবি না।

-তুই বোধহয় ভুলে যাচ্ছিস যে আজকে তোর সাথে আমার প্রাণ খুলে ঝগড়া করার কথা ছিল..

শুভ্র আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল এমন সময় মৃন্ময়ীর সাথে চোখাচোখি হতেই দুজনে হেসে উঠল। মৃন্ময়ী হাসিমুখেই বলে উঠল

-গতকাল রাতেই আপনি এটা বলেছিলেন স্যার মনে নাই…!

গতরাতে শুভ্র এরকমই কিছু একটা বলেছিল ওটা মনে হতেই দু’জনে আবারো হেসে উঠল।

মৃন্ময়ী হাঁটছে আর গত ২৪ ঘন্টারও অধিক সময়ে তার জীবনে কতো পরিবর্তন আসল তা ভাববার চেষ্টা করছে। গতকালও এই সময় ও শুভ্রর সাথে এত ঘনিষ্ঠ ছিল না। মৃন্ময়ী মনে মনে ভাবছে, তীব্র ব্যথা থেকে যদি সুখ পাওয়া যায় তো ক্ষতি কী! তাও যদি আবার প্রিয় মানুষটার কাছে পৌঁছে দেয়!

মৃন্ময়ী মনে মনে কথা গুলো বলে নিজেই লজ্জা পেল ভীষণ। চোখ মুখ লাল হয়ে উঠল। আর ওদিকে শেষ বিকেলের লালচে আভা ওর চোখ মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃতি আরেক অপরূপ সৌন্দর্য্য ফুটে উঠেছে শেষ বিকেলের মেঘ হীন প্রকৃতিতে!

সকালে মৃন্ময়ীর ডান হাতে আবার যন্ত্রণা করছিল যেখানে কাঁচের আঘাতে হাত কেটে গেছিল। পরে শুভ্রর মা যত্নের সাথে ওর হাতে প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঔষধ লাগিয়ে দিয়েছে। হাতের যেসব জায়গায় ক্ষত রয়েছে সেখানে গাঁদা ফুল গাছের পাতার রস লাগিয়ে দিয়েছেন। আবার কাঁচা হলুদ একটু দাঁত দিয়ে চাবিয়ে সেটা ওখানে লাগিয়ে দিয়ে নতুন করে ব্যন্ডেজ করে দিয়েছেন।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে তারপর থেকে হাতের ব্যথা অনেক কমে গেছে। মৃন্ময়ী জীবনে আজ প্রথম অনুভব করল একটা সন্তানের কাছে মায়ের ভালোবাসা আসলে কী! তাদের স্নেহের পরশ সন্তানের ক্ষত বিক্ষত স্থানকেও মুহূর্তেই এক অফুরন্ত শান্তির পরশ এনে দেয়।

মৃন্ময়ীর নিজের বাবা মায়ের কথা মনে হতেই ঠোঁটের কোণ থেকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ফুটল।

মৃন্ময়ী বুঝতে পারছে না কিছু। সামিরার সাথে যদি শুভ্রর কোনো যোগাযোগ না ই থাকে তাহলে ওর টেবিলে কেন সামিরার ছবি গুলো ওর টেবিলে বইয়ের নিচে থাকবে! শুভ্রার কাছ থেকে মৃন্ময়ী সব শুনে এসেছে। কয়েক ঘন্টায় শুভ্রার সাথে মৃন্ময়ীর বেশ ভাব জমে উঠেছিল। ওর কাছ থেকেই মৃন্ময়ী জানতে পেরেছে শুভ্রর টেবিলে সামিরার ছবির কথা।

মৃন্ময়ী ভাবছে, শুভ্র তো আবার বৃহস্পতিবার করে কোথায় যেন যায় তারপর ফিরে আসে পরের দিন সকালে। শুভ্র কি তাহলে সামিরার কাছে যায় প্রতি সপ্তাহে এ দিন দেখা করতে!

মৃন্ময়ীর বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। শুধুই কি দেখা করতে যায় নাকি অন্য কোনো কারণে, জৈবিক চাহিদা…!

মৃন্ময়ী ক্রমাগত বিরক্ত হয়ে উঠেছে নিজের ওপরে৷ কোনো প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। যেটা মিলেছে সেটা হলো ওর বাবা মা সম্পর্কে তথ্য গুলো!

মৃন্ময়ী আবার ভাবলো, যদি তাই ই হয় শুধু জৈবিক টানে শুভ্র প্রতি সপ্তাহে সামিরার কাছে যায় তাহলে গত রাতে যখন ও আর শুভ্র রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিল তখন শুভ্র ইচ্ছা করলেই উল্টো পাল্টা কিছু করতে পারত! তাহলে করল না কেন! কারণ শুভ্রও ততক্ষণে বুঝে গেছে মৃন্ময়ী কতটা দূর্বল শুভ্রর ওপর। এতদিন শুধু ঝগড়া করে ওর দূর্বলতাটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করত!

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল যেন মৃন্ময়ী প্রাণে বাতাস পেল। কারন এটা ওর কাছে অনেকটাই ক্লিয়ার যে শুভ্র শুধু জৈবিক টানে ওখানে যায় না৷ সে এতটা বাজে ছেলেও নয়৷ আর সব থেকে বড়ো কথা মৃন্ময়ী এখনো এটাই শিউর না যে শুভ্র সামিরার কাছেই যায়! না জেনে কারো চরিত্র নিয়ে কথা বলা ঠিক না।

হঠাৎ শুভ্রর ডাকে মৃন্ময়ীর ধ্যান ভাঙল।

-কী রে কোন জগতে চলে গেছিলি। কতক্ষণ ধরে তোকে ডাকছি তোর কোনো হুশই নেই! কী ভাবছিস এত!

মৃন্ময়ী মনে মনে বলল, কী ভাবসে সেটা যদি জানতে…!

মৃন্ময়ীর মুখ রক্তিমাভ ধারণ করল। মনে মনে বলল শুভ্র যদি জানতে পারে যে, ও এতক্ষণ মনে মনে কী সব ভাবছিল তাহলে লজ্জার শেষ থাকবে না। কী এক বিচ্ছিরি অবস্থার সৃষ্টি হবে!

-কী রে! কী হলো তোর…বারবার কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিস! আ..নতুন কোনো ভাবনার জগৎ বুঝি…

বলেই শুভ্র হাসতে লাগল। মৃন্ময়ী বলল,

-ধ্যাৎ…

-তোর বাড়ির কাছে তো চলে এসেছি। তোকে কী গেট পর্যন্ত পোঁছে দিবো?

মৃন্ময়ী শুভ্রর প্রশ্নের মানে বুঝতে পেরে বলল,

-না থাক। গেটে দারোয়ান আছে। এমনিতেই তো গতরাতে বাড়ি ফিরিনি তারওপর যদি দারোয়ান তোকে আমার সাথে দেখে তাহলে সে খবর অন্দরমহলে পৌঁছাতে খুব একটা বেশি সময় লাগবে না। আর বাবা…

– কী করবে! বাংলা ছায়াছবির মতো আমাকে মারার জন্য লোক পাঠাবে ‘ওই টিগিস..টিগিস … ” করার জন্য!

বলেই শুভ্র হাসতে লাগল। হাসলে যে শুভ্রর মুখে একটা ভালোবাসার ছাপ দেখা যায় তা মৃন্ময়ী এই প্রথম খেয়াল করল।

মৃন্ময়ী বলল,

-সব কথায় ইয়ার্কি মারবি না তো…

-ঠিক আছে, মারব না!

-আচ্ছা বাড়িতে প্রায় চলে এসেছি। তোর আর যাওয়ার দরকার নেই৷ তুই চলে যা।

-তুই যতক্ষণ না গেটের ভিতর ঢুকছিস ততক্ষণে আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব।… না কোনো কথা না। তুই যা তারপরে আমি যাবো না।

মৃন্ময়ী জানে শুভ্রর সাথে আর তর্ক করে লাভ নেই। সে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। হাঁটতে শুরু করার পরই কেমন যেন ওর একা একা লাগতে শুরু করল। বাড়ি ফিরলে আবার সেই একাকীত্ব ওকে গ্রাস করবে আর চোখের সামনে ওই দুটো নারী আর পুরুষকে যতবার ও দেখবে ততবার ওর গায়ের ভিতর কেমন যেন করে উঠবে। আর বমি বমি লাগবে ভীষণ!

জীবনটা কেমন যেন! অজানা নদীর স্রোতের সাথে দিকহীন ভাবে ভেসে চলে।

জীবন আসলে এমন একটা নদী

যার কোনো তীর নেই,

নেই কোনো শেষ সীমানা

আছে শুধু চেনা মানুষের অচেনা রূপ

দেখা…!

একত্রিশ.

শুভ্র বাড়ি মাথায় তুলেছে। ওর টেবিলে সামিরার ছবি খুঁজে না পেয়ে ওর মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা!

শুভ্র যখন শুনল শুভ্রা গতকাল রাতে ওর ঘরে এসেছিল তখন ওর রাগের আর সীমা রইলো না। জীবনে এই প্রথম শুভ্র শুভ্রাকে কষে ধমক দিয়েছে…!

শুভ্রা ছাঁদে গিয়ে অনবরত কেঁদে চলেছে।

আর শুভ্র ঘরে বসে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*