মৃন্ময়ী [অন্তিম অংশ]

লেখক Niloy Rasul

মৃন্ময়ীর বাবা রাস্তায় হাঁটছে আর মোনালিসার কথা ভাবছে। মানুষ কতটা খারাপ হলে সত্যি কথাটা বলার পরও ফের সন্দেহ করতে পারে তা ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছেন মৃন্ময়ীর বাবা।

মোনালিসা যখন প্রথমবার জিজ্ঞেস করল মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের গর্ভে কার সন্তান ছিল তখন মৃন্ময়ীর বাবা সঠিক যেটা জানতেন সেটাই বলেছিলেন।

বলেছিলেন মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের এক্স বয়ফ্রেন্ডের সন্তান ছিল। অথচ কি অবলীলায় দ্বিধাহীনভাবে মোনালিসা মৃন্ময়ীর বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন,

– তা মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের এক্স বয়ফ্রেন্ড টা কি তুমি নিজেই জামাইবাবু?

মৃন্ময়ীর বাবা তখন যতটা না অবাক হয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছিলেন।

মানুষ কত সহজে আরেকটা মানুষকে নিয়ে মনের কোণে নোংরা কল্পনা করতে পারে তা ভেবে অবাক হয়েছেন।

উনি নিজের মেয়েকে হারিয়েছেন তা আবার মোনালিসার জন্যই তারপর তো আর মিথ্যা কথা বলার কোনো দরকার ছিল না। অথচ মোনালিসা ভাবছে বললে ভুল হবে বরং ধরেই নিয়েছিল যে মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের গর্ভে মৃন্ময়ীর বাবারই সন্তান!

মৃন্ময়ীর বাবার মনে হচ্ছিল তখন যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।

পরে যখন মোনালিসা আবার বলল,

-কি হলো জামাই বাবু বলছ না যে! মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের গর্ভে তার এক্সের সন্তান। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে কে ছিল সেই এক্স? কোনোভাবে তুমি নও তো?

– তোমার কি মনে হয়? কে হতে পারে?

-আমার মনে হচ্ছিল তুমিই হবে। নয়তো আপু কখনো এত সামান্য কারণে সুইসাইড করতে কেন যাবে!

তাই আমার কাছে মনে হচ্ছে মৃন্ময়ীর সৎ মায়ের এক্স বয়ফ্রেন্ডটা তুমি নিজেই আর এটা আপু জানতে পেরেছিল আর সেজন্য ই আপু সুইসাইড করেছিল! কী বোকা আপু!

কি ঠিক বললাম তো?

-যদি তোমার তাই মনে হয় তবে তাই-ই..

-ম্ম..মানে!

-যেটা তুমি বললে সেটাই…

– তারমানে সত্যি তুমিই…

মৃন্ময়ীর বাবা আর কোনো কথার জবাব দেননি তখন।

অনেক পথ হেঁটে চলে এসেছেন মৃন্ময়ীর বাবা তখনকার কথাগুলো ভাবতে ভাবতে। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। খিদেয় উনার পেট জ্বলে যাচ্ছে।

ষাট.

বাড়ি এসে অন্তরার চিঠি হাতে নিয়ে বসে আছে শুভ্র।

কী করবে আর কী বলবে কিছু ই বুঝতে পারছে না ও। কে এই অন্তরা। আর শুভ্র এই নামে কোনো মেয়ের সাথে কখনোই কথা বলেনি বলে মনে হলো।

শুভ্র ওর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বসার ঘরের দিকে গেল। ওখানে ওর মা আর শুভ্রা বসে আছে।

শুভ্র বসার ঘরে গিয়ে দেখল শুভ্রা সোফায় বসে ড্রয়িং করছে। শুভ্রকে আসতে দেখে ওর দিকে তাকিয়ে একবার ভেংচি কেটে আবার ড্রয়িং-এ মন দিল।

শুভ্র ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখল ওর মা ওখানেও নেই। জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে নিয়ে গ্লাস টেবিলে রাখল। বিস্কিটের কৌটা হাতে নিয়ে বিস্কিট নেওয়ার উদ্দেশ্য কৌটার ঢাকনা খুলল। খুলে দেখে ভিতরে কোনো বিস্কিট নেই।

বসার ঘর থেকে শুভ্রার গলার আওয়াজ ভেসে এলো,

– এবার আসার সময় আমার জন্য আইসক্রিম আনিসনি তাই সব বিস্কিট খেয়ে ফেলেছি রাগ করে।

শুভ্র বিস্কিটের কৌটা হাতে থেকে নামিয়ে রেখে বসার ঘরের দিকে মুখ করে বলল

-খুব ভালো কাজ করেছেন ম্যাম।

-ধন্যবাদ স্যার।

শুভ্র আর কোনো জবাব না দিয়ে এমনিই পানি খেয়ে বসার ঘরে এসে শুভ্রার পাশে দাঁড়াল। বলল,

-হ্যাঁ রে মা কোথায় ময়ূরাক্ষী?

-ছাঁদে। কেন?,

-তোর মাথা ফাটাবো। কিন্তু কী দিয়ে ফাটাবো সেটা বুঝতে পারছি না । ওটাই জিজ্ঞেস করব…!

-হুহ্…

ময়ূরাক্ষী ভেংচি কেটে মুখ বাঁকা করে বার আর্টে মনোযোগ দিলো।

শুভ্র সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদে চলে গেল। গিয়ে দেখল ওর মা বারান্দায় মেলে দেওয়া কাপঠ চোপড় তুলছে।

শুভ্র বলল,

-মা কিছু কথা ছিল?

– হ্যাঁ, তো বল না… শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ওর মা বলল কথাটা।

শুভ্র বলল,

-অন্তরা বলে যে মেয়েটা এসেছিল তার বিবরণ দিতে পারবে একটু! কেমন যেন খটকা লাগছে আমার কাছে।

শুভ্রর মা ছাঁদে টাঙানো তার থেকে কাপড় চোপড সব ঝুড়িতে রেখে শুভ্রর কাছে এসে বলল,

-বাবা সেরকম করে তো খেয়াল করিনি। তবে মেয়েটা কথা বলতে গিয়ে প্রথম থেকে হাঁপাচ্ছিল খুব। আর যখন উঠে চলে যাচ্ছিল তখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

পরে ডাক্তার ডাকালাম। ও হ্যাঁ পাড়ার ওই ডাক্তার ছেলেটাকে ডেকেছিলাম। ও কিছু ঔষধ দিয়ে গেছিল মেয়েটার জন্য। সব তো লাগেনি। তাই যে কয়টা বেঁচে আছে ওগুলো নিয়ে গিয়ে ফেরত দিস আর ওর আসার খরচটাসহ ঔষধের দাম দিয়ে আছিস।

-হুঁ। দিয়ে আসবনি… তারপর কী হলো মেয়েটার?

শুভ্র জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর মায়ের দিকে। শুভ্রর মা বলল,

-মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে আমি ওর জন্য দুধ গরম করতে এসেছিলাম। আর কী কাজে যেন একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারপর দুধ নিয়ে গিয়ে দেখি মেয়েটা ঘরে নেই! চলে গেছে একা একা। আর যাওয়ার আগে একটা চিরকুটে আমাকে বলে গেছে, পরজন্ম বলে কি কিছু আছে আদৌ? থাকলে সেখানে এজন্মের পাপ কি মুছবে?

শুভ্র কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নেমে চলে আসল ছাঁদ থেকে।

ঘরে ঢুকে আবার চিঠিটা পড়ল,

“শুভ্র, 
কেমন আছ? ভালো আছি জানি তারপরও চিঠির শুরুতে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে দেখি তাই তাদের দেখাদেখি আমিও জিজ্ঞেস করলাম। জানি তুমি হাসছ না এখন বরং মুখ গম্ভীর করে তাকিয়ে আছ লেখার দিকে। অবশ্য আগে হলে তুমি হাসতে…

আমি অনেক পাপ করেছি। করেছি বললে ভুল হবে। আমাকে করানো হয়েছিল। সব থেকে বড় ভুল অবশ্য আমি নিজেই করেছি, অন্যকে বিশ্বাস করে।

যায়হোক জীবন তো নাটক সিনেমা না তাই একবার ভুল করলে তার শাস্তি পেতেই হবে তাকে ঠিক যেমনটা আমি পাচ্ছি এখন!

তাই তোমার প্রতি আমার অনুরোধ শুভ্র, মৃন্ময়ীকে কখনো কাছ ছাড়া কোরো না। খুব ভালোবাসে মেয়েটা তোমায়।

নিজের দায়িত্ববোধ থেকে হলেও মৃন্ময়ীর পাশে থাকবে সবসময়। লাইফ ইজ আ্যা রেস। উই আর দ্যা হর্স ওফ দ্যা রেস এ্যাংড্..!

বুঝতে পারছ কী বলতে চাচ্ছি? হা হা হা। তোমারই বলা কথা এগুলো।

যায়হোক ভালো থেকো। ভালো রেখো সবাইকে, ভালো বেসো প্রিয়জনকে..!

ইতি

অন্তরা…”

শুভ্র চিঠিটা ছুঁড়ে ফেলল ঘরের কোণে। বিড়বিড় করে বলতে থাকল,

-মৃন্ময়ীকে দায়িত্ব বোধ থেকে নাকি ভালোবেসে কাছে রাখব সেটা কারও কাছ থেকে শেখা বা শোনা লাগবে না আমার।

 

একষট্টি.

শুভ্র আর মৃন্ময়ী অনেক্ষণ ধরে থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সামির দাঁড়িয়ে আছে।

সেই অপারেশন থেকে ফিরেছে অনেকদিন হলো। সামির বা সামিরা কারও কথাও আর ওদের মনে ছিল না। নিজেদের জন্য একটু একটু করে গুছিয়ে উঠছিল ওরা।

কিন্তু আজ শুভ্রাকে স্কুল থেকে নিতে এসে আবার দেখা হবে সামিরের সাথো তা ওদের কল্পনায় ছিল না।

শুভ্র সামিরের দিকে যেতে গেলে মৃন্ময়ী শুভ্রর হাত চেপে ধরে হতাশা যুক্ত চোখে ইশারায় শুভ্রকে যেতে নিষেধ করছিল।

মৃন্ময়ী চায় না পুরোনো ঝামেলা আবার ফিরে আসুক। কিন্তু ঝামেলা বড়োই বেহায়া। না ডাকলেও আপনাআপনি এসে উপস্থিত হয়।

শুভ্র মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বলল। সে যাবেই। মৃন্ময়ী যেন তাকে না আটকায়।

মৃন্ময়ী আজ আর কোনোরকম জোর করতে পারল না। সত্য সে যত বড়োই তিতা হোক না কে তা তো সবাইকে একদিন মেনে নিতেই গবে। কাজেই এভাবে নিজেকে আটকো রেখে সে কোনোদিনই কিছু ই করতে পারবে না।

শুভ্র সামিরের কাছে যাচ্ছে। 
মৃন্ময়ী শুভ্রকে অনুসরণ করে ওর পিছন পিছন যাচ্ছে।

সামির দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছিল। শুভ্রকে দেখে হাসিমুখে ওর দিকে তাকাল। শুভ্রকে কিছু বলবে তার আগেই মৃন্ময়ী এসে শুভ্রর পাশে দাঁড়াল। সামিরের চোখ মৃন্ময়ীর দিকে পড়তেই হেসে উঠে বলল,

-ওরে.. সেই বোকা মেয়েটা…

বলেই হাসতে হাসতে লাগল।

শুভ্র হাঁটু গেড়ে সামিরের সামনে বসে সামিরকে ধরে বলল,

-কেমন আছ?

-ভালো। আপনি?

-হুঁ ভালো। আজও তুমি একা নাকি! কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো!

-না তো। আমি তো আমার মামণির সাথে এসেছি!

মৃন্ময়ীর গলা শুকিয়ে গেল। সামির ওর মামণির সাথে এসেছে তারমানে সামির যদি সামিরার সাথে এসে থাকে তাহলে সামিরাও এসেছে। ওহ্ মাই গড..! মৃন্ময়ী বিড় বিড় করে বলল।

-ওহ্। তোমার মামণি কোথায়? শুভ্র সামিরকে জিজ্ঞেস করল।

-ওইত্তো স্কুলে ক্লাস নিচ্ছে।

-ক্লাস নিচ্ছে!

-হুঁ…

-তোমার মামণি এই স্কুলের টিচার?

-জি…

-ওহ্ ভালো। উনার নাম কী?

-আপনাকে বলব কেন..!

সামিরের চোখে বিস্ময়। আজ পর্যন্ত তার কাছে কেউ ওর মায়ের নাম জানতে চায়নি। আজ শুভ্র চাচ্ছে। আবার শুভ্রর ছবি ও বাড়িতে অ অনেকবার ওর মামণির কাছে দেখেছে। তাহলে কি ওর মামণি শুভ্রকে চেনে কিন্তু শুভ্র চেনে না! তা কী করে হয়! কেউ কাউকে না চিনলে ছবি পেল কীভাবে?

সামিরের বিস্ময় কাটছিল না কিছুতেই।

শুভ্র সামিরকে হালকা ঝাঁকিয়ে বলল,

-কী হলো, বললে না তো। তোমার মামণির নাম কী?

-আপনাকে কেন বলব?

শুভ্র কী বলবে বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

-না আসলে আমার বোনও এই স্কুলে পড়ে তো। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম আর কি! তাহলে তোমার মামণির সাথে আমার বোনের পরিচয় করিয়ে দিতাম। আমার বোন এবার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে…!

-ওওও। তাহলে অনেক মজা হবে। আমরা একসাথে খেলতে পারব। কিন্তু আপনার বোনের নাম কী?

-শুভ্রা..!

-এম্মা! শুভ্রা আন্টি আপনার বোন..!

শুভ্র আর মৃন্ময়ী দু’জনে মনে হলো একটা বড়সড় ধাক্কা খেল। শুভ্রাকে সামির চেনে!

সব হিসাব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে দুজনের। শুভ্র বিস্ময় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,

-তুমি শুভ্রাকে চেনো?

-হুঁ! চিনব না কেন! আমরা দু’জন একসাথে খেলি এখানে.!

শুভ্র আর মৃন্ময়ী দু’জনে বিস্ময়ের সাগরে ভাসছে। শুভ্র বলল,

-তোমার মায়ের নাম তো বললা না?

সামির কিছুক্ষণ শুভ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

– অন্তরা ইসলাম সামিরা…

শুভ্রর মনে হলো কেউ ওর কানের ভিতরে গরম সিসা ঢেলে দিলো।

শুভ্রর সবকিছু সামনে কেমন যেন আবছা হয়ে যাচ্ছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছো ওর। সামনের কোয়াশা যেন কাটতে চেয়েও কাটছে না বলেই বোধ হচ্ছিল শুভ্রর।

শুভ্র উঠে দাঁড়িয়েছে। সারা শরীর কাঁপছে ওর। ভয়ানক ভাবে কাঁপছে। রাগে নাকি আকস্মিক ভাবে সবকিছু এভাবে সামনে উন্মোচন হওয়ার জন্য তা বুঝতে পারছে না।

শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে স্কুল ছুটির অপেক্ষায়। আজ সব প্রশ্নের উত্তর ওর চায়। যে আগুন আজ কয়েকবছর ওর বুকের ভিতরে জ্বলছে তাকে থামাতে চায় ও আজ।

বাষট্টি.

ক্যাম্পাসে শুভ্র আর মৃন্ময়ী ব্যতিত সবাই জড়ো হয়েছে আজ।

-শুভ্র ওর বোনকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছে। ওকে বাসায় রেখে তারপর ক্যাপম্পাসে ও আর মৃন্ময়ী একসাথে আসবে।

পলাশ সবার উদ্দেশ্য বলে দিলো কথাটা।

-মৃন্ময়ীর সাথে শুভ্ররে আজকাল বেশিই দেখা যায়। কাহিকাহিনী কী রে! ইয়ে টিয়ে সব হয়ে গেছে নাকি..!

শুভ্রদের আ্যন্টি দলের এক ছেলে কথাটা বলতেই ওদের দলের বাকীরা সবাই হেসে উঠল।

-মুখ সামলে চল রে! নয়তো সেদিনের মতো আবার হাসপাতালে নিজের খরচে রেখে আসব..

-দিন সবার এক রকম চলে না হে… আজ বাড়াবাড়ি করলে তোদেরও এমন হাল করব না…

-কী করবি রে…. সাহস থাকলে সামনে আয়…

পলাশ কথা বলতে বলতে তীব্র বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল ওদের দিকে। 
সাথে সাথে আরেক বন্ধু শিহাব ওকে আটকাল। আর ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,

-ঝামেলা ছাড়া কি তোদের চলে না? এইতো শেষ আমাদের দেখা হওয়া। আর জীবনে কাওকে দেখতে পাবো কিনা তারও ঠিক নেই। সবাই নিজ নিজ লাইফ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। শেষবারের মতো সবাই একসাথে হবো বলেই সামনে ক্যাম্পাসের নবীন বরণ উৎসবের দিন আমারা এক হবো আবার৷

আর তোরা আছিস নিজেদের মধ্যে ঝগড়া নিয়ে…

সাথে ও পক্ষ থেকে একজন বলে উঠল,

-তোদের শুভ্রকে বল বেশি নাচানাচি না করতে…

ঠোঙার মতো চিকন পাতালা রোগা করে একটা ছেলে গলা উঁচিয়ে নায়কের মতো পোজ নিয়ে কথাটা বলা মাত্রই শিহাব ওকে বাহাত দিয়ে জোরে উল্টো চড় মেরে বলল,

-তোদের আমাদের কী রে? শুভ্র কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল নাকি যে তোর আমার প্রশ্ন আসছে?

শুধু বাংলাদেশেই দেখবি কিছু হলেই দুদল লুঙ্গির ধড়ি বেঁধে রাস্তায় নামে একে অপরকে দোষারোপ করতে। পৃথিবীর সফল দেশকে দেখিস পারলে, কিছু হলে সাথে সাথে তারা আলোচনা করে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়।

তাই যদি ফের কখনো দেখেছি আমাদের শুভ্র তোদের শুভ্র করতে তাহলে বাপের দেওয়া সম্পত্তি নিয়ে ঠিকঠাক বাড়ি ফিরতে পারবি না বলে দিলাম।

এতক্ষণ সবাই শিহাবের কথা চুপচাপ শুনছিল। সবাই সমর্থনের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ক্যাম্পাসে ত্রাস অবশ্য সে। ভালো হোক আর মন্দ হোক ভুল করলে তার আর রক্ষ্যে নেই। শুভ্র অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তাই ওকে খুব ভালো লাগে শিহাবের।

তেষট্টি.

শুভ্র আর মৃন্ময়ী অপেক্ষা করছে অপেক্ষার পালার শেষের অপেক্ষায়। সকল রহস্য সামনে আসার সময় হয়ে গেছে। আর কোনো লুকোচুরি নয়। হয় সামনে আসুক নয়তো তলানীতে তলিয়ে যাক। এত মানসিক চাপ আর সে নিতে পারছে না।

হঠাৎ শুভ্র খেয়াল করল সামির “মামণি” “মামণি” বলতে দৌড়ে যাচ্ছে।

পরের ঘটনা দেখার জন্য শুভ্র বা মৃন্ময়ী কেউ তৈরি ছিল না।

সামিরকে নিহারিকা হাঁটু গেড়ে বসে জড়িয়ে ধরে আছে।

মৃন্ময়ীর মনে হচ্ছে মাথা ঘুরছে…

-“সামির আপনার কে হয় নিহারিকা?”

বেশ ঝাঁঝাল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল শুভ্র।
নিহারিকা বিন্দুমাত্র অবাক না হয়ে বলল,

-কেন আমার পিচ্চি! যার কথায় সেদিন হোটেলের ছাঁদে দাঁড়িয়ে আপনাদের বলেছিলাম। এই হলো আমার সেই পিচ্চি…

মৃন্ময়ী আর শুভ্রর বিস্ময় যেন প্রতিমুহূর্তে বিস্ময়ের সীমা ছাড়াচ্ছে।

সবকিছু কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে ওদের কাছে। নিহারিকা, সামির, অন্তরা, সামিরা নামগুলো মাথার ভিতরে চক্কর দিচ্ছে বারংবার।

শুভ্র নিহারিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

– আপনার আসল নাম কী?

নিহারিকা ভুরু জড়ো করে বলল,

-নামের আবার আসল নাম, নকল নাম হয় নাকি কখনো!

-অবশ্যই হয়। আপনার আসল নাম বলেন?

-দেখুন শুভ্র আমি আপনার কোনো কথাই বুঝতে পারছি না। আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন বলুনতো?

নিহারিকা মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলল,

-আপনি কি কিছু জানেন?

মৃন্ময়ী আমতা আমতা করে বলল,

-না মানে ও জানতে চাইছে আপনার কি আর অন্য কোনো নাম আছে কিনা..!

নিহারিকা কিছুটা অবাক হয়ে বলল,

-না তো। কিন্তু আপনারা সামিরের নাম জানলেন কীভাবে?

শুভ্র শক্ত কণ্ঠে বলল,

-তারআগে বলুন সামিরাকে কীভাবে চেনেন আপনি? কে হয় ও আপনার?… কী হলো চুপ করে আছেন কেন? বলুন ওকে কীভাবে চেনেন আপনি?

নিহারিকা চুপ করে গেছে। পাথরের মতো নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে।

হঠাৎ মনে হচ্ছে চারিদিকে পরিবেশ থমথমে হয়ে গেছে।

-বলছেন না যে…!

শুভ্র কথা বলতেই নিহারিকা সামিরের দিকে তাকিয়ে সামিরের হাত ধরে বলল,

-চলো বাবা বাসায় যেতে হবে। তোমার ঔষধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে…

শুভ্র চমকে উঠে বলে উঠল,

-ঔষধ! কী হয়েছে ওর?

সামির বলল,

-এখন বাসায় চলে গেলে আজকে খেলব কী করে! আজকে কি খেলব না…!

নিহারিকা শুভ্রর কথার জবাব না দিয়ে সামিরের দিকে তাকিয়ে বলল,

-না বাবা। অন্যদিন খেলবে। আমরা দু’জনে একসাথে অনেকক্ষণ ধরে কানামাছি খেলব কেমন। এখন চলো।

নিহারিকা মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বলল,

-চলি…

শুভ্র কিছু বলার আগেই নিহারিকা সামিরকে নিয়ে পা বাড়াল বাসার পথে।

শুভ্রর কাছে সব উল্টো পাল্টা লাগছে। নিহারিকা আজ স্পষ্ট ভাবে ওকে ইগনোর করেছে। ওর কথার জবাব দেয়নি। নিহারিকা অনেক কিছু জানে এটা শুভ্র নিশ্চিত। এখন কীভাবে ওর কাছ থেকে কথা বের করবে সেটাই ভাবতে হবে ওকে।

জোর করে কোনো কিছু করা যায় না। আর নিহারিকা শুভ্রর কে যে ওকে জোর করবে সবটা বলার জন্য আর নিহারিকা কেনই বা হড়হড় করে সব কথা বলবে। জীবন নাটক সিনেমা না যে কাউকে চেপে ধরে দু’টো স্টাইল করে কথা বললেই সে ভয়ে সব বলে দিবে।

প্রত্যেকেরই কিছু দূর্বল পয়েন্ট থাকে সেটা ধরেই এখন এগোতে হবে। নয়তো আজীবন না জানা অপরাধের আগুনে দগ্ধ হয়ে মরতে হবে শুভ্রকে। নিহারিকার ভিতরে যে কতটা আত্মসম্মান বোধ আছে তা পূর্বে বিভিন্ন অপারেশন করতে গিয়ে শুভ্র অনুধাবন করেছে। কাজেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত বা কাজ সবকিছু মুহূর্তে নষ্ট করে দিবে।

শুভ্রর শার্টে হঠাৎ নিচের দিকে টান পড়তে খেয়াল করতে দেখে শুভ্রা দাঁড়িয়ে আছে।

শুভ্রা বলছে,

-কী রে তোর আবার কী হলো? মৃন্ময়ী আপু তো তোর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তুই আবার কার কথা আনমনে ভাবছিস! ছিঃ ছিঃ ছিঃ

মৃন্ময়ী শুভ্রার কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলল। হাসি আড়াল করতে অন্যদিকে তাকাল মৃন্ময়ী।

শুভ্র শুভ্রার কান চেপে ধরে বলল,

-ওরে বদ। ক্লাস সিক্সে উঠতেই খুব পেকে গেছিস না। তোর একদিন কি আমার একদিন আজ। দাঁড়া মাকে আজ সব বলব। তাঁর মেয়ে কতটা পেকে পেকে শালিক হয়েছে তা জানা দরকার তাঁর।

শুভ্রা মুখ ভেংচি কেটে বলল,

-আমিও মাকে বলে দিবো তুই মাঝে মাঝে সিগারেট খাস৷ তখন মজা বুঝবি…

-ওর বদ…

শুভ্র খেয়াল করল মৃন্ময়ী চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। ভাবখানা এমন যে শুভ্রা না থাকলে এখনই দু’টো চড় মারত মৃন্ময়ী শুভ্রকে। এটা ভাবতেই শুভ্রর শুভ্রার জন্য ভালোবাসা উতলে উঠল। মনে হচ্ছিল শুভ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলতে, “আমার ভালোবাসার বোনটা। উম্মাহ্…!”

আবার শার্টে টান পড়তে শুভ্র কল্পনার রাজ্যে বিচরণ বন্ধ করে বাস্তবে ফিরে আসল।

শুভ্র জিজ্ঞাসা চোখে শুভ্রার দিকে তাকাতেই শুভ্রা বলল,

-ওরে হাঁদারাম ভাবছিস কী! পালা নয়তো আপু তোর ঠ্যাং ভেঙে দিবে। শুভ্র মৃন্ময়ীর দিকে না তাকিয়ে শুভ্রাকে ধরে আইসক্রিমের দোকানের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল।

পিছন থেকে মৃন্ময়ীর গলার স্বর ভেসে আসতে লাগল। মৃন্ময়ী বলছে,

-গতবছর পলাশের ইয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে সে স্মোক শুরু করেছিল। শুভ্র তুই তখন ওকে বলে বলে বুঝিয়ে বুঝিয়ে স্মোক থেকে দূরে এনেছিলি। গতবছর রমযান মাসের পর থেকে পলাশ আর সিগারেট খায় না। আর তুই এখন ওর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিস!…

শুভ্র প্রাণপণে জোরে হেঁটে চলে যাচ্ছে দোকানের উদ্দেশ্য। আজ শুভ্রার সাথে সাথে মৃন্ময়ীকেও দু’টো আইসক্রিম কিনে দিতে হবে…

চৌষট্টি.

প্রস্তুতি পর্বের দিন শুভ্র আর ক্যাম্পাসে এল না। ওর শরীর খারাপ করছিল৷ তাই আর বাড়ি থেকে বের হয়নি। আগামীকাল ক্যাম্পাসে নবীন বরণ। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে একটা উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করছে।

মৃন্ময়ী মন খারাপ করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আজকে গানের রিহার্সাল করার কথা ছিল একসাথে।

অথচ শুভ্রর কোনো খোঁজ নেই। মৃন্ময়ীর একই সাথে রাগ আর ওকে মিস দু’টো একসাথে করছিল।

সবাই কাজ করছে দ্রুত। বেশি সময় নেই আর। মৃন্ময়ী সবাইকে আড়াল করে এ জায়গায় গিয়ে শুভ্রকে কল করল।

শুভ্র রিসিভ করে বলল,

-হুঁ

– হুঁ কী শুনি?,

-এইরে ম্যাডাম মনে হচ্ছে খুব তেতে আছে..!

-থাকাটা কি খুব অস্বাভাবিক?

-উঁ..! দুভাবে উত্তর হয় প্রশ্নটার। কোনটা আগে দিব…

-মজা করছ না আমার সাথে, তোমার বিরক্ত লাগছে না আমার সাথে কথা বলতে? আমি বুঝেছি। যাও ফোন রেখে দিচ্ছি…

-আরে এই না না। ত বললাম কখন! তোমায় ছাড়া কি আমার এক মুহূর্তও চলে নাকি!

-তাহলে আজ আসলে না যে? জানো কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য…

– না মানে আসলে একটু..

-এক মিনিট! তোমার গলার স্বর এরকম লাগছে কেন!

-কেমন লাগছে..

-কেমন কাঁপা কাঁপা..

-এতক্ষণে খেয়াল করলেন ম্যাডাম..

– না আসলে তখন রাগের মাথায়..বলো না কী হয়েছে

-হয়েছে তো অনেক কিছু কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব…

-কী হয়েছে তোমার…

মৃন্ময়ীর গলা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল এই বোধহয় কেঁদে দিবে। শুভ্র বুঝতে পেরে বলল,

-এই পাগলী কাঁদছ নাকি তুমি! আরে আমার জ্বর হয়েছে একটু। তাই যেতে পারিনি। ভয় পাচ্ছ কেন!

মৃন্ময়ী কথা বলছে না। ওপার থেকে শুভ্র শুধু মৃন্ময়ীর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ পাচ্ছে।

শুভ্র বিছানা থেকে উঠে বসে বলল,

-আরে এই পাগলী! কী হলো..!

মৃন্ময়ী ফোন রেখে দিলো। তার কেন জানে না বাট কান্না আসছিল খুব।

হয়তো সৃষ্টিকর্তা ওদের একে ওপরের জন্যই সৃষ্টি করেছিল। একজনের কষ্টে আরেকজন কষ্ট পায় খুব।

পয়ষট্টি.

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পুরো ক্যাম্পাসে একধরনের গুন গুন ভাব চলছে। এর ভিতরেই অনেকে জেনে গেছে মৃন্ময়ী আর শুভ্র একসাথে গান করবে।

মৃন্ময়ী সকাল সকাল গোসল সেরে অফ হোয়াইট কালার আর নীল পাড়ের শাড়ি পরেছে।

ক্যাম্পাসে শেষ বারের জন্য দেখছে সব ঠিক আছে কিনা।

মৃন্ময়ী মেইন গেইটের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল। দেখল নিহারিকা আসছে।

নিহারিকা একটু হেসে মৃন্ময়ীকে দেখে ডান হাত উঁচু করে হাত নাড়ল।

মৃন্ময়ীও জবাবে একটু হেসে হাত নাড়ল। আর দাঁড়াল না ও ওখানে। কেমন একটা অস্বস্তি বোধ ওকে যেন পাগল করে তুলছে।

এখানকার অনুষ্ঠানে নিহারিকা কী করছে!

নাহ্ কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না মৃন্ময়ীর। মনে হচ্ছে খুব দ্রুত পাগল হয়ে যাবে ও। এত এত চাপ নিতে নিতে কখন মাথার সব কানেকশন বন্ধ হয়ে যায় সেই ভয়ে মৃন্ময়ীর গলা শুকিয়ে আসল।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখে শুভ্রও এগিয়ে যাচ্ছে মঞ্চের দিকে৷ এতক্ষণ চাপা অস্বস্তি একটু হলেও কেটে গেল ওর। তারওপর পেল স্বস্তির নিঃশ্বাস। শুভ্র থাকা মানে এখন ওর কাছে, সকল বিপদ থেকে মুক্ত থাকা।

“এ্যাই শুভ্র…!” ডাকটা কানে পৌঁছাতেই শুভ্র মঞ্চের দিক যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গেল। মাথা ঘুরিয়ে ওর অনুসন্ধানী চোখ ডাকের উৎস খুঁজে পেতে মারিয়া হয়ে উঠেছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওর মাথা ঘুরিয়ে বারবার চারিদিকে তাকানো দেখে।

মৃন্ময়ীর মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। ও ভাবল যদি সোজা না গিয়ে পিছন থেকে গিয়ে ওকে চমকে দেওয়া যায় তাহলে বেশ মজা হবে।

অতএব মৃন্ময়ী খুব সাবধানতার সাথে শুভ্রর চোখের আড়াল হয়ে গেল। মঞ্চের পিছনের দিক দিয়ে ধীরে ধীরে শুভ্রর দিকে যাচ্ছিল।

“ইশ্ সুন্দরীটা আমার মনের কথা বুঝতে পারে না কেন রে…” “এদিকে কি খুঁজো!আমরাই বা কম কী! আসো না একদিন..!” “কি খাসা মাল রে বাপ!” “ফিগারটা দেখ…”

মঞ্চের পিছনে থাকা ছেলেগুলো মৃন্ময়ীর দিকে বাজে মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছিল। মৃন্ময়ীর মনে হচ্ছিল ওর কানে কেউ গরম শিশা ঢেলে দিচ্ছে। প্রত্যেকটা ছেলে মৃন্ময়ীর জুনিয়র। কেউ সেকন্ড ইয়ারে পড়ে কেউবা ফাস্ট ইয়ার! বর্তমানে সামাজিক অবক্ষয় নাকি বৈশ্বিক ধ্বংসের শুরু তা ঠাওর করা মুশকিল…

মৃন্ময়ীর মনে হলো ওর দাঁড়িয়ে পড়া উচিৎ এখন। নোংরা কথাগুলোর প্রতিবাদ করা উচিৎ। বাংলার মেয়েরা একটু বেশি আত্মসম্মান বোধের অধিকারী। তাই তাঁরা নিজেদের সম্মানের কথা ভেবে রাস্তায় পড়ে থাকা নর্দমার ময়লা যখন গায়ে ছিটকে পড়ে তখনও নির্বিকার থাকে পাছে নিজের সম্মানটা চলে যায়।

কিন্তু নিজেই নিজেকে সম্মান না দেওয়া যে কতটা অসম্মানের তা সম্পর্কে বোধ হয় এখনও কেউ অবগত হয়নি।

তাই গায়ে নোংরা পানি পড়ার ভয়ে নর্দমার কাঁদা গায়ে পড়াকে মেনে নিতে দ্বিধা বোধ করে না।

তাদের অনেকের ধারণা এই যে নোংরা পানি পড়লে তা থেকে গন্ধ বের হবে ক্রমাগত কিন্তু নর্দমার কাঁদা পড়লে তা তো টিস্যু পেপার বা ন্যাকড়া ( ঘর মোছা বা নোংরা টেবিল মোছার কাপড় বিশেষ। অঞ্চল ভেদে এর নাম ভিন্ন) দিয়ে মুছে ফেলা যাবে।

তবে কেউ যদি প্রতিবাদ করতে যায় তো সমগোত্রয় তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। কেউবা বলবে,

“দরকার কী বাপু ওদের সাথে লাগতে যাওয়া! ” কেউ বলবে,”পুরুষ মানুষের এট্টু আট্টু তেজ না থাকলে তার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে তাই ওরকম না করলেই হয়। দরকার কী সব কথায় কান দেওয়ার! ” তাই যদি হয় তাহলে যখন কেউ উনার সাজগোজ নিয়ে কটুক্তি করে তার সাথে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ঝগড়া করারও তো কোনো মানে হয় না। দরকার কী সব কথায় কান দেওয়ার।

মৃন্ময়ীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ও খুব ভালো করে জানে একটা কথা বললে তার পক্ষে এবং বিপক্ষে উভয়তেই যুক্তি উপস্থাপন করা যায় না গেলেও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এদেশের লোকদের সভাব। তখন কিছু ভন্ড ধর্মকে হাতিয়ার করে ইমোশনাল কথা বলা শুরু করবে কিন্তু তারা এটা জানে না ধর্মে কোথাও অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে বলা হয়নি। আর ভাবতে ভালো লাগছে না ওর।

এর ভিতরেই মৃন্ময়ী কেউ কাউকে কানে চড় মারার আওয়াজ আসল। মৃন্ময়ী শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব। শুভ্র ওদের কলার চেপে ধরে চড় মারছে।

হাওয়া একটু গরম হওয়ার পথে। ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান মানেই একটু ঝামেলা সাথে হাওয়া গরম হয়ে একটা কঠিন ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়।

মৃন্ময়ী বুঝতে পারছে না শুভ্র কোথা হতে এসে জুটল এখানে। হঠাৎ খেয়াল হলো ওর পাশে নিহারিকা ওকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

মৃন্ময়ী বুঝতে পারল নিহারিকা হয়ত আশেপাশে ছিল আর শুভ্রকে গিয়ে সব বলেছে। হঠাৎ নিহারিকার ওপর প্রচন্ডরকম রাগ হল মৃন্ময়ীর।

কেন নিহারিকা ওই সময় মৃন্ময়ীর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে কী এমন হতো!
হঠাৎ “প্রতিবাদ ” শব্দটা নিজেই মনে মনে উচ্চারণ করতে গিয়ে তার কাছে শব্দটার স্বাদ কেমন তেঁতো তেঁতো লাগল।

বর্তমান যুগে সত্যিই কি আর প্রতিবাদ করে সোজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে কোনো উত্তর খুঁজে পেল না ও।

পলাশ সহ অন্যান্যরা শুভ্রকে বোঝানোর চেষ্টা করছে অযথা ঝামেলা করার দরকার নাই অনুষ্ঠানের আগে। “অযথা ” শব্দটা শুনে শুভ্র ফুঁসে উঠছিল।

পরে ঠিক করা হল অনুষ্ঠান শেষে ক্যাম্পাসে সিনিয়রদের নিয়ে বসা হবে। জুনিয়ররা যেন তাদের সীমা লঙ্ঘন না করে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হবে। সভ্যতা বজায় রাখতে জুনিয়রদের শাসন করা হবে। যদি তারা ভাবে তাদের র্যাগিং করা হচ্ছে তাহলে তারা ভাবতে পারে। “র্যাগিং” আর “শাসন ” শব্দ দু’টোর মাঝে ব্যাপক ফারাক..!

মৃন্ময়ী এতক্ষণ অবাক চোখে সব দেখেছিল। এমন সময় কেউ একজন বার বার হাত ঝাঁকাচ্ছে এটা অনুভব করতেই বাস্তবে ফিরে এল।

-কী হলো কী! এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি যাবে সামনে…!

মৃন্ময়ীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুভ্র মৃন্ময়ীর হাত ধরে টানতে টানতে চলে গেল

ছেষট্টি.

-আরে বাবা আস্তে আস্তে.. লাগছে তো। এত জোরে কেউ টানে কাউকে…!

মৃন্ময়ী হাতের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল কথাগুলো।

– কেউ না টানুক অন্তত আমি টানি…

মৃন্ময়ী আর শুভ্র পুকুর পাড়ে বসে আছে। চারিদিকে ব্যস্ততা ছাপিয়ে ওরা নির্জনে বসে আছে।

মৃন্ময়ী আস্তে করে বলল,

-স্যার রাগী মুডে আছে বুঝি!

শুভ্র কোনো কথা না বলে আনমনে তাকিয়ে আছে পুকুরের অপর পাড়ে।

মৃন্ময়ী শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে একটু পর বলল,

-কী হলো তোমার। রাগ করেছ আমার ওপর….

শুভ্র ধীর কণ্ঠে বলল,

– তখন তুমি ওভাবে চুপ করে গেলে কেন! ওরা বাজে কথা বলছিল তুমি সেটার প্রতিবাদ না করে ওরকম নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে তুমি তোমার ট্রেনিংকে অসম্মান করেছ।

মৃন্ময়ী এতক্ষণে বুঝতে পারল শুভ্রর রাগের কারণ।

মৃন্ময়ীর আর ভালো লাগছিল না এ ব্যপারে কথা বলতে। ও বলল,

– নিহারিকাকে দেখলাম তখন..

-হুঁ। আমিই ইনভাইট করেছি ওকে।

-ওহ্…

– সেদিন ও শুভ্রার সাথে দেখা করতে এসেছিল। শুভ্রা জেদ ধরল জ আসবে অনুষ্ঠানে। সামনে নিহারিকাও বসে ছিল। তাই ভাবলাম ওউ আসুক। এতে ময়ূরাক্ষীও ওর সাথে থাকতে পারবে। এখানে এসে তো আমি বসে থাকব না। একটু পরেই কাজ শুরু হবে।

স্টেজ ঠিকমত তদারকি করা, আবার তোমার সাথে একসাথে গান করা, অনুষ্ঠান শেষে খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো সবার হচ্ছে কিনা তা দেখা। তাই ভাবলাম ও আসলে সুবিধেই হবে বরং।

মৃন্ময়ী মুখে কিছু বলল না কিন্তু মনে মনে বলল,”কেন শুভ্রাকে কি আমি দেখে রাখতে পারতাম না! দ্বৈত স্বরে গান গাওয়া ছাড়া তো আজ আমার আর কাজ নেই। আমিও তো পারতাম শুভ্রাকে দেখে রাখতে।

কে জানে হয়ত শুভ্রর মতে নিহারিকার কাছে শুভ্রা বেশি সেভ থাকবে।

মৃন্ময়ী আর কথা বাড়ল না।

কিছুক্ষণ পরে শুভ্র বলল,

-চলো উঠি। ওদিকে সবাই অপেক্ষা করছে।

মৃন্ময়ী উঠে দাঁড়িয়ে শুভ্রর ডান হাত নিজের অধিকারের মতো হাত দিয়ে আবদ্ধ করে হাঁটতে লাগল মেইন স্টেজের দিকে।

সাতষট্টি.

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে অনেক্ষণ হলো।

কিছুক্ষণ আগে শুভ্র আর মৃন্ময়ীর নাম এ্যনাউন্স করা হয়েছে দ্বৈত স্বরে রবীন্দ্র সংগীত করার জন্য।

শুভ্র মৃন্ময়ী এখন স্টেজে। মৃন্ময়ীর ভয় লাগছে মাত্র একবার রিহার্সাল তা আবার অনেক আগে করেছে। কে জানে কেমন হবে।

মৃন্ময়ী দর্শকদের তাকাতে দেখল নিহারিকার পায়ের ওপর শুভ্রা বসে আসে তার চোখে হাজারো বিস্ময়।

নিহারিকা বেশ উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওদের দিকে।

ধীরে ধীরে বাদ্যযন্ত্রের বাদকরা তাদের কারুকার্য শুরু করে দিয়েছে। সুরের সাথে সাথে স্টেজ সহ সামনে সামনে এলাকা বেশ একটা ঘোরের মাঝে চলে যাচ্ছে।

মৃন্ময়ী রবীন্দ্র সংগীত শুরু করল,

“একটুকু ছোঁয়া লাগে
একটুকু কথা শুনি
তাই দিয়ে মনে মনে
রচি মম ফাল্গুনি

একটুকু ছোঁয়া লাগে
একটুকু কথা শুনি
কিছু পলাশের নেশা
কিছু বা চাপায় মেশা
তাই দিয়ে সুরে সুরে
রঙে রঙে জাল বুনি…!”

প্রথম সংগীত শেষ হতেই সবাই অনুরোধ করতে লাগল আরেকটা গান গাওয়ার জন্য।

কোনো পথ না পেয়ে আরেকটা নুতন রবীন্দ্র সংগীত শুরু করতে হলো,

মৃন্ময়ী আর শুভ্র মিলে সিদ্ধান্ত নিলো এই রবীন্দ্র সংগীত গাওয়ার,

“দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে।

বাতাস বহে মরি মরি, আরে বেঁধে রেখো না তর…

এসো এসো পার হয়ে মোর হৃদয় মাঝারে।।

তোমার সাথে গানের খেলা, দূরের খেলা যে
বেদনাতে বাঁশি বাজায় 
সকল বেলা যে

কবে নিয়ে আমার বাঁশি 
বাজাবে গো আপনি আস…

আনন্দময় নীরব রাতের 
নিবিড় আঁধারে?।”

গান শেষ হতেই পুরো স্টেজ সহ সবাই যখন ওদের প্রশংসা করতে প্রস্তুত তখন শুভ্র হঠাৎ মাথায় হাত দিয়ে স্টেজের ওপর লুটিয়ে পড়ল…

 

শুভ্র এভাবে আকস্মিক ভাবে স্টেজে লুটিয়ে পড়ায় সবাই হতভম্ব। কে কী বলবে কিছু বুঝতে পারছে না।

গানের রেশ এখনো কাটেনি কারও তার ভিতরেই শুভ্র স্টেজের ওপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে।

মৃন্ময়ী স্টেজের ওপর বসে পড়ে শুভ্রর মাথা নিজের কোলের ওপর তুলে শুভ্রর গালে হাত দিয়ে ক্রমাগত ওকে ডাকছে।

শুভ্র কোনো সাড়া না দিয়ে পড়ে আছে নিস্তেজ হয়ে।

মৃন্ময়ী শুভ্রর গালে হাত দিয়ে ওকে ডাকার সময় অনঅনুভব করল শুভ্রর গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। এখন ওর কী করা উচিৎ কিছুই বুঝতে পারছে না।

সবার ঘোর তখনো কাটেনি তার আগেই নিহারিকা দৌড়ে এসে শুভ্রর কাছে বসে পড়েছে।

মৃন্ময়ীর সাথে সাথে নিহারিকাও ক্রমাগত ডাকছে শুভ্রকে।

মৃন্ময়ী কেঁদে ফেলেছে ইতিমধ্যে শুভ্র কারও ডাকে সাড়া না দেওয়ায়।

শুভ্রা এসে শুভ্রর মাথার কাছে বসে শুভ্রর চুল ধরে বলছে,

-এই ভাইয়া ওঠ। কী রে ওভাবে শুয়ে আছিস কেন? আম্মু দেখলে বকা দিবেনি দেখিস। জানিস না অসময়ে ঘুমালে আম্মু কী পরিমানে বকা দেয়। দেখিস তোকে কী বকা দেবে আজ৷ আমি কিন্তু বাবা বাঁচাতে পারব না তোকে আজ।

কী রে ভাইয়া ওঠ না। এভাবে শুয়ে পড়লি কেন হঠাৎ করে। তুই যে বললি গান গাওয়ার পর আমাকে আইসক্রিম কিনে দিবি!

ও আচ্ছা! ঠিকা আছে যা আজকে কিনে দিতে হবে না আইসক্রিম! আমি খাব না আজ৷ তুই শুধু উঠে বস একবার! এই ভাইয়া কী রে! ওঠ…ওঠ বলছি…

সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। নিহারিকা সবার দিকে তাকিয়ে বলল,

-কী হলো সবাই দাঁড়িয়ে আছেন কেন? তামাশা দেখছেন সবাই? ওঁকে হাসপাতালে নিতে হবে সে বোধ কি হারিয়ে গেছে সবার? কী আশ্চর্য! আরে গাড়ি জোগাড় করুন। ওঁকে হাসপাতালে নিতে হবে তো…!

নিহারিকার চেঁচামিচিতে কাজ হলো। পলাশ আর ওর বন্ধুরা দ্রুত গাড়ি জোগাড় করে আনল।

শুভ্রার কাছে এসে পলাশ বলল,

-শুভ্র মনি তুমি আমার সাথে তারাতারি তোমার বাসায় চলো।

-না আমি ভাইয়ার সাথে থাকব…

শুভ্রা জানিয়ে দিল সে শুভ্রকে ছাড়া নড়ছে না আপাতত।

পলাশ বলল,

– তোমার বাসায় গিয়ে তো আমরা বসে থাকব না। ওখানে গিয়ে তেমার মাকে খবর দিতে হবে। তারপর খালাম্মাকে সাথে নিয়ে আমরা আবার হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দিব।

পলাশ অনেক বুঝিয়ে শুভ্রাকে নিয়ে ওদের বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা হল।

আটষট্টি.

জ্বরের ওপর অধিক পরিশ্রম যার কারনে শুভ্র তখন স্টেজে সেন্সলেস হয়ে গেছিল। সবাই দেখা করে চলে গেছে। ডাক্তার বলেছে আগামীকাল বিকালের আগে ওকে ছাড়বে না।

সবাই একটু বাইরে যেতেই পলাশ শুভ্রর কাছে এসে বসল।

শুভ্র অজ্ঞান হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কে কী করেছে সব কিছু শুভ্রকে বলল ও।

শুভ্র সব শুনতে শুনতে হঠাৎ বলল,

-আরি শালা বুদ্ধি পেয়ে গেছি।

পলাশ অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তারপর বলল,

-কিসের বুদ্ধি!

-নিহারিকার ব্যপারে…

-মানেহ্.!

-তোর কথা অনুসারে নিহারিকা আমি অসুস্থ হওয়ার পর থেকে প্রায় পাগলের মতো সবকিছু আ্যরেঞ্জ করেছে তাই তো!

-হুঁ, তাই তো দেখলাম। মৃন্ময়ীও কম করেনি কিন্তু..

-সেটা বলতে হবে না আমি জানি। তোর কাজ শুধু লাইন বাদ দিয়ে বেলাইনে গিয়ে কথা বলা…

-আচ্ছা হলো হলো। কিন্তু তোর কিসের প্ল্যানের কথা বলছিলি সেটা বল।

-না এখন তোকে বলা যাবে না। তুই নিহারিকা আর মৃন্ময়ীকে পাঠিয়ে দে।

-দিচ্ছি! আমার কথা শুনে সব প্ল্যান অথচ প্ল্যানটা কী তাই আর বললি না! আজব..

-তোর আজব দিয়ে তুই পানি খা। ওদের পাঠিয়ে দে তারাতাড়ি

-দিচ্ছি…দিচ্ছি..

পলাশ ওদের ডাকতে যেতেই শুভ্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। জানে না কী হবে বাট ওর অসুস্থতাই যে ওকে সমাধানের পথ করে দেবে তা ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি ও।

নিহারিকা আর মৃন্ময়ী একসাথে ঘরে আসল।

মৃন্ময়ী বলল,

-ডেকেছো আমাদের?

-হুঁ…! শুভ্র জবাব দিয়ে নিহারিকার দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

-নিহারিকা আমি তো অসুস্থ। তো শুনেছি অসুস্থ মানুষ কিছু চাইলে তা দেওয়ার চেষ্টা করে অনেকে।

এটুকু বলেই শুভ্র থামল। নিহারিকা জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ও এখনো ঠাওর করতে পারছে না। কী বিষয়ে শুভ্র কথা বলতে চাইছে।

শুভ্র আবার বলল,

-নিহারিকা একটা সত্যি কথা বলবেন?

-কী কথা বলুন…

-আগে কথা দেন যে আমি যা জানতে চাই তা সঠিক করে বলবেন আমাকে…

-আমার যদি জানা থাকে তাহলে মিথ্যে বলার তো প্রয়োজন দেখি না…

-ওকে।

-হুঁ। বলুন এখন কী কথা…

-সামির আপনার কে হয়?

-আমার পিচ্চি…

নিহারিকা কোনোরকম বিচলিত না হয়ে বলল কথাটা।

শুভ্র বলল,

-সেটা আপনি আগেও বলেছেন আমিও শুনেছি। আমি জিজ্ঞেস করছি সামিরের সাথে আপনার সম্পর্ক কী? নিশ্চয় বলবেন না যে পিচ্চি। কারণ পিচ্চি কোনো সম্পর্কের নাম হতে পারে না।

-আপনি এসব জানতে চাইছেন কেন হঠাৎ?

-জানাটা দরকার তাই…

-আমি কি বলতে বাধ্য?

-যদি বলি হ্যাঁ!

-কীভাবে?

-কিছুক্ষণ আগে আপনি কথা দিয়েছেন আপনি যদি জানেন তাহলে আমাকে তা বলবেন।

নিহারিকা চুপ করে গেছে। ও কখনো ভুলেও ভাবেনি যে শুভ্র এভাবে হঠাৎ সামিরের কথা জানতে চাইবে!

শুভ্র ক্ষণকাল পরে বলল,

-আচ্ছা ওর কথা বাদ দিন। এবার অন্তত বলুন সামিরা মানে অন্তরাকে আপনি কীভাবে চেনেন?

এবার আর নিহারিকা চুপ থাকতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠল। পাশে থাকা একটা চেয়ারে নিয়ে গিয়ে নিহারিকাকে বসাল মৃন্ময়ী।

শুভ্র হতভম্ব হয়ে গেছে। সামিরার নাম শুনে এভাবে কাঁদতে লাগবে নিহারিকা তা ভুলেও কল্পনা করেনি ও।

শুভ্র বলল,

-আপনি কাঁদছেন কেন এভাবে? কী হয়েছে কে ও? বলুন প্লিজ..!

নিহারিকা ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলল,

-স্পেসিফিক কোনো সম্পর্ক নেই ওর সাথে আমার…

-মানেহ্…! মৃন্ময়ী অবাক হয়ে বেশ জোরেই কথাটা বলে ফেলল।

নিহারিকা খুব কষ্টে কান্না আটকে আবার বলতে লাগল কিন্তু ওর গলা কাঁপছিল ভিষণ আকারে।

– সোহেল আর ও পালিয়ে বিয়ে করে। কিন্তু ও যে চিট ছিল তা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি সামিরা…

শুভ্র জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে বলল,

-সোহেলটা আবার কে…?

-যাকে আমি একসময় প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতাম।

শুভ্র মৃন্ময়ী দু’জনে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

শুভ্র বলল,

-কিন্তু সামিরার সাথে আপনার পরিচয় কীভাবে!

– আমি সোহেলের বাড়ি চিনতাম্ একদিন দুপুরে ওর জন্য পায়েস রেঁধে ওর বাড়িতে গিয়ে কলিং বেল দিতেই দেখি সামিরা বের হয়ে আসে।

আমার প্রথমে কেমন যেন লাগছিল। যখন জিজ্ঞেস করলাম ও কে? তখন সামিরা বলল, ও সোহেলের ওয়াইফ। আমি মনে হচ্ছিল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সামিরা সেহেলের স্ত্রী! কথাটা বারবার আমার মাথায় চক্কর দিচ্ছিল।

আমি আর দাঁড়াতে না পেরে চলে আসি ওখান থেকে। পাশের মহল্লায় আমি থাকতাম।

মৃন্ময়ী হতবাক হয়ে গেছে। ও বলল,

-তারপর..!

-আমি সব ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলাম। সোহেলের প্রতি ভালোবাসার পরিবর্তে একরকম ঘৃণা বোধ জন্মায়। আমি সবসময় ওর ক্ষতি চাইতাম।

আমি তারপরই সব কষ্ট ভুলে থাকার জন্য প্রাইমারি লেভেলে এই স্কুলে ক্লাস নেওয়ার জন্য চাকরি নিই। কিন্তু…

নিহারিকার কান্না থেমে এসেছে এখন। কিন্তু গলা এখনো কাঁপছে,

-কিন্তু কী? মৃন্ময়ী জিজ্ঞেস করল। শুভ্রর গলা থেকে আর কথা বের হচ্ছে না। নিহারিকা বলল,

-কয়েক মাস পর সামিরার সাথে আমার দেখা হয় রাস্তায়। ও কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে।

শুধু এটুকু বলেছিল, সোহেল ওর সাথে চিট করেছে। সোহেল চিঠি লিখে পালিয়ে গেছে।

পরে জানতে পারি আমার ছবি ও ওই বাড়িতে পেয়েছিল একটা ড্রয়ারে। সোহেলকে বারবার চাপ দেওয়ায় সে বাধ্য হয়েছিল সব স্বীকার করতে।

-তারপর…!

– আমাদের তখন লক্ষ্য এক। সোহেলকে ওর প্রাপ্য শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সামির জন্ম নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ও এক্সিকিডেন্ট করে।

সেই থেকে ওর ব্রেনে সমস্যা দেখা দেয়। মেমরি লস হয়ে যায় মাঝে মাঝে…

-মাঝে মাঝে? মৃন্ময়ী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

-হ্যাঁ। মাঝে মাঝে। আর তখনই ও শুভ্রর জন্য হাওমাও করে কান্না করত। শুভ্রর কথা ও আমাকে বলেছিল।

-ও এসব ইচ্ছে করেই করেছিল, তাই না? আমাকে কষ্ট দিয়ে ঠিক কী আনন্দ পেল ও?

শুভ্র আনমনে জিজ্ঞেস করল কথাটা।

-জি না। আপনি ভুল বুঝছেন ওকে…

– মানেহ্!

-সামিরাকে ভুল বোঝানো হয়েছিল আপনার সম্পর্কে। সামিরার সাথে মেবি আপনার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। পালিয়ে…সকালে বের হওয়ার কথা থাকলেও ও রাতে বের হয়। তারপর ওর এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে ওঠে। সোহেল ওর ওই বান্ধবীর ই ভাই। সোহেল ওর বোন মানে সামিরার বান্ধবীকে রাজি করায়।

সামিরার বান্ধবী সারারাত আপনার নামে বাজে কথা বলে বিভিন্ন ভাবে ওর মত পাল্টাতে বাধ্য করে।

এদিকে ততক্ষণে অলরেডি জানাজানি হয়ে গেছে যে সামিরা বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে তাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো কোনো সুযোগ ছিল না আর ওর। আর তখনই সোহেলকে বিয়ে করে।

বলেই নিহারিকা থামল। ঘরে সবাই চুপ করে আছে। কীভাবে কী বলবে কেউ যেন গুছিয়ে উঠতে পারছিল না।

মনের অজান্তে শুভ্রর চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপ্রস্তুত গলায় শুভ্র বলল,

-আচ্ছা ও এখন কোথায়?

-জানি না। আমরা মিশন থেকে ফেরার পর দেখি সামিরা বাড়িতে নেই। একটা চিঠি লিখে আমার টেবিলের ওপর রেখে দেয়৷ আর সামিরকে পাশের বাসার এক আন্টির কাছে রেখে যায়।

মৃন্ময়ী হঠাৎ অনুভব করল ওর চোখ জ্বলছে। এতক্ষণ যে অবিরত ধারার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে তা খেয়াল করেনি। চোখ এখন জলের ধারা থামাতে চাইছে। তাই হয়ত চোখ জ্বলছে এত…

মৃন্ময়ী ডান হাত দিয়ে চোখের কোণার জল মুছে কিছুক্ষণ সময় নিলো স্বাভাবিক হওয়ার জন্য। তারপর বলল,

-সামির এসব জানে?

-হুঁ, কিছুটা জানে। ওর মা যে সামিরা তা জানে। খুব নিরীহ হয়েছে বাচ্চাটা। আমাকে ওর মায়ের মতোই ভালোবাসে

শুভ্র বলে উঠল,

-আচ্ছা একটা কথা সেদিন যখন আমরা ওকে জিজ্ঞেস করলাম তখন ও আপনার নাম না বলে অন্তরার কথা বলল কেন?

-কী জিজ্ঞেস করেছিলেন ওকে?

নিহারিকার প্রশ্নের জবাবে শুভ্র বলল,

-আমি বলেছিলাম, তোমার মায়ের নাম কী…

-ওহ্ সেজন্য। সামির আমাকে “মা” নয় “মামণি” বলে ডাকে। আর সামিরাকে “মা” বলে ডাকত…

আর কিছুক্ষণ কথা বলে নিহারিকা চলে গেল৷ মৃন্ময়ী আরও কিছুক্ষণ ছিল। তবে কোনো কথা বলেনি কেউ কারও সাথে৷

মৃন্ময়ী ইচ্ছে করেই বলেনি৷ যে ঝড় আজ কয়েকবছর ধরে ওর বুকের ভিতর চলছে তা আজ থেমেছে। যেসব প্রশ্ন জানার জন্য ও পাগল প্রায় হয়ে থাকত তা আজ জানতে পেরেছে। থাক না আজ একটু নিজের মতো করে।

ঊনসত্তর.

শুভ্র পরীক্ষায় ভালো মার্ক নিয়ে পাশ করেছে। মৃন্ময়ীও ভালো রেজাল্ট করেছে। অনেক সংগ্রাম করে নিজের শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে ওর। দু’জনে ভালো একটা জবের জন্য ট্রাই করছিল৷

শুভ্র ভালো একটা কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেছে। মৃন্ময়ীও চেষ্টা করছে খুব । এবং ও খুব আশাবাদী যে খুব দ্রুত ওউ একটা ভালো চাকরি পাবে।

শুভ্রর মাকে সবকিছু বলার পর ভদ্রমহিলা নিজেই বলেছে দ্রুত বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে।

একদিন শুভ্র অফিসে বসে কফি খাচ্ছিল আর ওইদিনের নিউজ পেপারের পড়ছিল। হঠাৎ নিচের দিকে ছোট্ট একটা খবরে ওর নিঃশ্বাস মনে হচ্ছিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

আর তখনই সেদিন নারী পাচারকারী চক্রের সাথে লাস্ট অপারেশনে করা শেষের দিকে দূর্ঘটনাবশতঃ একটা ভুলের কথাটা মনে হলো যেন শুভ্রর বুকের ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠল

 

পত্রিকার নিচের দিকে ছোট্ট কোণায় ওই নিউজ দেখার পর থেকে শুভ্রর হাত পা মনে হচ্ছে কাঁপছে।

আজ মৃন্ময়ীর একটা চাকরিতে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার কথা, এমনটাই বলছিল গতকাল রাতে মৃন্ময়ী ফোনে কথা বলার সময়।

শুভ্র দ্রুত হাত ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখে বেলা সাড়ে দশটা বাজে।

তারমানে এতক্ষণে মৃন্ময়ী বের হয়ে গেছে। দশটার দিকে ওর ইন্টারভিউ যদি হয় তাহলে তো ঘন্টাখানেক আগে বের হওয়ার কথা!

শুভ্রর ভিতর হঠাৎ অজানা আশঙ্কা বাড়ি দিতে লাগল ক্রমাগত।

শুভ্র আরেকবার পেপারের খবরটা দেখল। সত্যি কিনা। ইদানীং কাজের চাপে চোখে ভুলভাল দেখে ও। তাই আবার ভাবল পত্রিকাটা আরেকবার দেখা উচিৎ।

পত্রিকা হাতে নিয়ে শুভ্র আল্লাহকে ডাকছে শুধু যেন খবরটা ভুল হয়।

ভালো ভাবে পড়ে দেখল না ঠিকই আছে।

সেদিনের সেই অপারেশনে যখন মৃন্ময়ী শুভ্র আর নিহারিকা আসছিল তখন সব মেয়েকে মৃন্ময়ী আরেকবার জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল আর কোথাও কাউকে আটকে রাখা হয়েছে কিনা৷ যদি হয় তাহলে ওরা তখনই অপারেশন শুরু করবে।

তরুণীরা বলেছিল, আর কোথাও কেউ নেই। ওরা মৃন্ময়ীকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল। এদের এই উপকার তারা জীবনেও ভুলবে না।

এদিকে নিহারিকা আর শুভ্র বারবার মৃন্ময়ীকে সংকেত দিচ্ছিল চলে আসার জন্য।

সময় নেই হাতে বেশি। এর ভিতরেই যদি এলাকা না ছাড়া যায় তবে ঝামেলায় ফাঁসবে সবাই।

মৃন্ময়ী হেঁটে চলে আসছিল। এর ভিতরেই আচমকা মৃন্ময়ীকে পিছন থেকে পাচারকারী দলের একজন এ্যাটাক করে।

শুভ্রর সেই দৃশ্য দেখে শরীরের রক্ত হীম হয়ে যাচ্ছিল বারবার।

শুভ্র পৌঁছানোর আগেই মৃন্ময়ীর সাথে লোকটার ধ্বস্তাধস্তিতে মৃন্ময়ীর মুখে পরে থাকা মাস্ক খুলে যায়।

লোকটা তখনই মৃন্ময়ীর মুখ দেখে নিয়েছিল।

শুভ্র ভেবেছিল লোকটাকে সরিয়ে দিতে হবে নয়তো বিপদ সামনে কিন্তু তার আগেই পুলিশের গাড়ির সাইরেনের আওয়াজে ওরা সবাই বুঝতে পারে যে পুলিশ খুব নিকটে এসে গেছে।

সেদিন দ্রুত পালিয়ে আসে ওরা।

শুভ্রা মাথা ঝাড়া দিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। যা বুঝল তাতে এখনই মৃন্ময়ীর ইন্টারভিউ অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে ও বের হবার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করতে হবে।

শুভ্র দ্রুত বসের কাছে সাময়িক ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

সত্তর.

অনেক্ষণ হয়ে গেছে কিন্তু মৃন্ময়ীর কোনো খোঁজ নেই। ইন্টারভিউ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শুভ্রকে ভয় আর বিরক্ত একসাথে আক্রমন করছে।

শুভ্র অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখল মৃন্ময়ী আজ ইন্টারভিউ দিতেই আসেনি…!

কথাটা শোনার পর গায়ের কাটা মনে হচ্ছিল শিউরে উঠল শুভ্রর।

দ্রুত পুলিশ অফিসে মিসিং কমপ্লেন লিখিয়ে শুভ্র একসময় একটা ছাত্রকে পড়াতে যেত তার বাবা মইন আহমেদ একজন বড় পুলিশ অফিসার তাঁকে সব খুলে বলার পর উনি সকল পুলিশ স্টেশনকে এ্যালার্ট করে দেন।

পুলিশের একটা টিম অলরেডি মাঠে নেমে পড়েছে। আর ওদিকে গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা তাঁদের সকল সোর্সকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন।

মইন আহমেদ শুভ্রর কাছে সব ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন। সেদিন কতোগুলো তরুণীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু তরুণ তরুণী বাঁচায় এ তথ্য ছিল তাদের কাছে। সরকার থেকে অনেক পুরুস্কারও বরাদ্দ করা হয়েছিল তাঁদের জন্য কিন্তু পরে আর তাদের মানে শুভ্রদের খুঁজে না পাওয়ায় পুরস্কার পোঁছে দেওয়া হয়নি।

একদিন পেরিয়ে গেছে কিন্তু মৃন্ময়ীর কোনো খোঁজ নেই। শুভ্রর ভেতরটা মনে হচ্ছে হাহাকার করে উঠছে বারবার। প্রতিদিন তো সকালেই নিউজ পেপার পড়ে গতকাল কেন পড়ল না..!

প্রতিটা সেকেন্ড শুভ্রর কাছে ভারী হয়ে উঠছে।

মৃন্ময়ী নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পর সকালবেলা মইন আহমেদ শুভ্রকে ফোন দেয়৷ শুভ্র ফোন রিসিভ করতেই উনি বলেন যতদ্রুত সম্ভব ঢাকা মেডিকেলের আই সি ইউ বিভাগে চলে আসতে।

শুভ্র কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই উনি ফোন কেটে দেন। শুভ্রর মনে হচ্ছে হাত পা কাঁপছে। কীভাবে কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না।

শুভ্র ঢাকা মেডিকেলের সামনে পৌঁছাতেই দেখে সামনে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা রয়েছে। শুভ্রকে এক অফিসার চিনতে পেরে দ্রুত ওকে নিয়ে আই সি ইউ কেবিনের কাছে নিয়ে গেল।

সেখানেই মইন আহমেদ দাঁড়িয়ে আছেন।

শুভ্র পৌঁছাতেই উনি বলেন,

-আজ সকালে হাত মুখ বাঁধা অবস্থায় ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় মৃন্ময়ীকে একটা রাস্তার ধারে পুলিশ উদ্ধার করে।

শুভ্র মনে হচ্ছে যেন হাত পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলে নির্বাক হয়ে গেছে।

মইন আহমেদ শুভ্রকে একটা চেয়ারে বসিয়ে বলল,

-দেখো এখন সবটা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে। যেভাবে ওঁকে নির্যাতন করা হয়েছে…

শুভ্রর কাছে মনে হচ্ছিল সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। সব কথা গুলো ওর মাথার ওপর প্রচন্ডরকম জোরে আঘাত করছে।

শুভ্র কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

-ত্ত.তার মানে কি ওঁকে…

শুভ্র বাকী শব্দগুলো আর উচ্চারণ করতে পারছিল না।

মইন আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

-ওকে রেপ করা হয়েছে কিনা বুঝতে পারছি না। শরীরের ক্ষত দেখে একরকম মনে হচ্ছে আবার…

সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেছে। হঠাৎ যেন একটা নিরবতা সবাইকে গ্রাস করল।

ক্ষণকাল পরে শুভ্র ডুকরে কেঁদে উঠল।

মইন আহমেদও নিজেকে সামলাতে পারছেন না।

তিনি কখনো এভাবে কোনো ছেলেকে তার গার্লফ্রেন্ডের ক্ষতির জন্য কাঁদতে দেখেননি।

তিনিও বাক হীন হয়ে গেছেন। কী বলে শান্তনা দেবেন তিনি বুঝতে পারছেন না।

ক্ষণকাল পরে তিনি শুভ্রর কাঁধে চাপ্পড় দিয়ে বললেন,

-হেই ইয়াং ম্যান তুমি এভাবে কাঁদছ কেন।
মনে রাখবে পৃথিবী হলো একটা প্রতিযোগিতার ময়দান। আর এ ময়দানের আমরা সবাই একটা পাগলা ঘোড়া। আমাদের কাজ শুধু ছুটে চলা সকল বাঁধাকে পেরিয়ে অজানায়।

কখনো জকি অন্যের হাতে তুলে দিও না। যে ঘোড়ার জকি অন্যের হাতে থাকে সে আর স্বাধীন থাকে না। সে হয়ে যায় পরাধীন। পরাধীনতার শিকল তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে।

মনে রাখবে আমরা সবাই হলাম রেসের সেই ঘোড়া আর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া জকি ধরার অধিকার পৃথিবীতে কারও নেই। ভয় ওই একজনকেই করবে। আর কাউকে না। আর সবসময় মনে রাখবে তোমার কাজরে জবাব সৃষ্টিকর্তাকে দেবে তাঁর কোনো সৃষ্টির কাছে নয়…!

ওঠো জোয়ান। ঘুরে দাঁড়াও। মুচড়ে দাও কালো হাত। পরিস্কার করো তোমার সমাজ। তোমার সমাজ, তোমার দায়িত্ব।

আই সি ইউ কেবিন থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে বলল কন্ডিশন খুব একটা ভালো না।

মইন আহমেদ ডাক্তারকে বললেন সন্ধ্যার ভিতরে প্রাথমিক রিপোর্ট চায় তার।

মৃন্ময়ীর ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা ইতিমধ্যেই অনলাইন সহ সবজায়গায় ব্যপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্র সমাজ আবারও ফুঁসে উঠেছে। ছাত্ররা ছাত্রীরা ইতিমধ্যে ব্যানার তৈরি করে ভিড় জমাচ্ছে ক্যাম্পাসে। তাদের সবার ব্যানারের ডাইলোগ হয়েছে, ” নট ওমেন, সেইভ ইউর সিস্টার, সেইভ ইউর মাদার ওর ডটার…”

ধীরে ধীরে আন্দোলন বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। এদিকে রাস্তায় রাস্তায় সবাই তীব্র আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে।

সবার এক কথা এক দাবী, “মৃন্ময়ীর ওপর নির্যাতনের বিচার চাই “

দুপুরে সবাই মিটিং করে ঠিক করা হলো সন্ধ্যা সাতটায় সবাই মশাল জ্বালিয়ে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু হবে।

শাহাবাগের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত পুলিশ এরকম জটলা পাকালে লাঠি চার্জ করে কিন্তু আজ তারা আর এ সাহস দেখায়নি কারণ কারোরই অজানা নয় সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে অধিকাংশ আন্দলোনের সুত্রপাত ছাত্ররাই ঘটিয়েছে৷ এদের রক্তের তেজ ওই একটা লাঠি চার্জ করে দমিয়ে রাখা সম্ভব না। এদের নেই কোনো পিছুটান নেই কোনো বাঁধা দেশ মাতৃকার জন্য জীবন তুলে দিতেও এঁরা দ্বিধা বোধ করে না।

আর কোথাও না কোথাও সবার বাড়িতেই মা আছে, বোন আছে, মেয়ে আছে কেউ চায় না তার বাড়িতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক।

রাত নয়টার সময় শুভ্র পৌঁছাল হাসপাতালে।

মইন আহমেদও ছিলেন সেখানে। কিছুক্ষণ পর প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে আসল।

ডাক্তার বললেন, আমরা কয়েকবার বিভিন্ন টেস্ট করে যা বুঝেছে ওঁর ওপর সেক্সুয়ালি আ্যাটাক করা হয়েছিল।

শুভ্রর হঠাৎ নিজেকে ওজন হীন বলে বোধ হচ্ছিল।

কান মনে হচ্ছো গরম হয়ে উঠেছে।

ডাক্তার আবার বললেন,

– ওর সাথে কয়েকজন মিলে নির্যাতন করেছে তবে মেয়েটা মানে ভিকটিম শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন। নির্যাতনকারীরা যখন ভিকটিমের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বাঁধা পান বা বলতে পারেন অক্ষম হন তখন তারা ভিকটিমের ওপর হামলা চালায়।

ডাক্তার একটু থেমে বললেন,

-ব্লেড দিয়ে ওর শরীর ক্ষত বিক্ষত করে নির্যাতনকারীরা। ওঁর শরীরের চামড়া কেটে থান থান করে দিয়েছে… আর দুঃখের বিষয় এই যে পেশেন্ট খুব বাজে ভাবে কোমায় চলে গেছেন…

ডাক্তার আর কথা বলতে পারলেন না। শেষের কথা শুনে মনে হচ্ছিল ওনার গলা ধরে আসছে…

শুভ্র মেঝের ওপর বসে পড়েছে। নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না ও।

নার্সদের অনেক বলেও ওকে ঢুকতে দেয়নি ভিতরে।

আন্দোলন চলছে তীব্রভাবে। সেখানে বক্তব্যের মাঝে বারবার উল্লেখ করা হচ্ছে শেষ পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কী পরিমানে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন বা ধর্ষণ করা হয়েছে।

একজন তার বক্তব্যে উপস্থাপন করলেন তথ্য গুলো যে,

২০১৪ সালে ৬২৬ জনকে ধর্ষণ, ধর্ষণ ও হত্যা ৬৮ জনের তথ্য পাওয়া গেছে

২০১৫ সালে ৭৫২ জনকে ধর্ষণ, ধর্ষণ সহ হত্যা ৬০ জনকে করার তথ্য পাওয়া গেছে

২০১৬ সালে ৬৫৯ জনকে ধর্ষণ, ৩৭ জনকে ধর্ষণ সহ হত্যা করার তথ্য পাওয়া গেছে

২০১৭ সালে ৮১৮ জনকে ধর্ষণ, ৪৭জনকে ধর্ষণ সহ হত্যা করার তথ্য পাওয়া যায় যা গত পাঁচ বছরে সব থেকে বেশি

আর ২০১৮ সালে ৭৩২ জনকে ধর্ষণ আর ৬৬ জনকে ধর্ষণ সহ হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
(সুত্র: প্রথম আলো)
আরও চলছে যতক্ষণ বা বড় ক্ষতি হচ্ছে ততক্ষণে কেউ পুলিশ বা বাইরে প্রকাশ করে না। এটা তো শুধু আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সুত্রানুসারে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি।

দরকার আমাদের সচেতনতা। দরকার আমাদের প্রতিরোধ গোড়ে তোলা। পুলিশ তো তখন কাজ করবে যখন তাঁরা ঘটনার সত্যতা পাবে তার আগে না। কিন্তু ততক্ষণে একজনের চুড়ান্ত ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যাবে। দরকার আমাদের নিজেদের প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
শুধু আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সুত্রানুসারে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি।

এক সপ্তাহ হয়ে গেছে এ ঘটনার। দু একজন ছাড়া প্রায় সবাই আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে জীবন যাপন করছে।

আন্দোলন অনেকটা থিতিয়ে এসেছে। শুভ্র আর সহ্য করতে পারছে না। মৃন্ময়ীরও কোনো প্রোগ্রেস নেই শরীরের। উল্টে আরও খারাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

শুভ্রা জানে ওদরে গোপন আস্তানার খবর। পুলিশকে ও বলেনি। ও নিজে প্রতিশোধ নিবে তাই।

আজ বিকালে শুভ্র অনেক রিকুয়েস্ট করে একলা মৃন্ময়ীর পাশে থাকার সুযোগ পেয়েছে।

মৃন্ময়ী বেডে শায়িত আছে। শুভ্র মৃন্ময়ীর পাশে চেয়ারে বসে আছে। মৃন্ময়ীর হাত ধরে শুভ্র একটা চুমু খেয়ে কপালে কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে ধরে থাকল।

তারপর শুভ্র মৃন্ময়ীর হাত নিজের বুকের মাঝে নিয়ে বলল,

-মৃন্ময়ী আমি শুধু অপেক্ষা করেছি দেখেছি প্রশাসন কিছু করে কিনা। তারা কিছু করতে পারল না। এবার সময়টা আমার। এই জীবনে আমার আর কোনো চাওয়া পাওয়া নেই।

কিছুক্ষণ পর ওদের ডেরায় যাব আমি। হয় ওরা বাঁচবে নয়তো আমি। ওখান থেকে একা হয়তো ফিরে আসতে পারব না।

হয়তো এটাই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা। তুমি ভালো থেকো মৃন্ময়ী।

মৃন্ময়ীর চোখের কোণা থেকে অনবরত নোনা জলের ধারা বয়ে চলেছে।

শুভ্র আবার বলা শুরু করল,

-মৃন্ময়ী তুমি তো জানো তোমার শুভ্র কখনো কোনোকিছুর সাথে আপোষ করেনি আর ভবিষ্যতেও করবে না।

তাই আজ জীবনে প্রথমবার নিজের কাছের কারও জন্য প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছি।

আর সময় নষ্ট করব না। শুধ এটুকু মনে রেখো, তুমি শুধু আমার।

শুভ্র নিজের চোখের জল মুছতে মুছতো বের হয়ে আসল। মটর সাইকেল চালিয়ে
রওনা দিলো অজানার পথে…

একাত্তর.

আমির শুভ্রর পা ধরে ক্ষমা চইছে বারবার। আমিরের নির্দেশেই মৃন্ময়ীকে তুলে আনা হয় আর ওপর নির্যাতন করা হয়।

শুভ্র লাথি দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলো আমিরকে।

শুভ্র চোখ মুখ জড়ো করে বলল,

-যখন একটা নিরীহ মেয়ের ওপর নির্যাতন করছিলি তখন খেয়াল ছিল না তোর..

শুভ্র আরেকটা লাথি দিয়ে পাশে পড়ে তাকা মোটা রড হাতে তুলে নিয়ে বা হাত দিয়ে নিজের বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বলল,

-আমার এই জায়গায় আঘাত করেছিস তুই। আর তোকে আমি ছেড়ে দিবো। তোদের মতো পয়সাওয়ালা কুকুরকে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া কঠিন। তোদেরকে উচিৎ ছিল রাস্তায় ফেলে কুকুরের মতো মারা কিন্তু সময় স্বল্পতার জন্য এর থেকে বেঁচে গেলেও জীবন নিয়ে ফিরতে পারছিস না আজ আর

মনে রাখিস আল্লাহ কাউকে না কাউকে পাঠায় পৃথিবীতে তোদের মতো জানোয়ারদের শায়েস্তা করবার জন্য।

আমি কে তা জানি না বাট অনেক পাপ করেছিস তুই এবার অফ যা….

আমির কিছু বলবে তার আগেই শুভ্র ডান উঁচু করে আমিরের মাথায় আঘাত করল। আমির মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে।

শুভ্রর ভিতরের পৈশাচিক শক্তি মনে হলো এতক্ষণে বিদায় নিলো।

শুভ্র দরজা দিকে এগুতেই ফোন আসলো ওর। শুভ্র ফোন রিসিভ করতেই ওপাশে পলাশের কান্না মিশ্রিত গলা পাওয়া যাচ্ছে। শুভ্র বলল,

-প্প..পলাশ ক্কী হয়েছে…

পলাশ কোনো কথা কথা বলছে না। সে নোনা জলের ধারা আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে নাকি নিজের ভাঙা গলার স্বর ঢাকার চেষ্টা করছে তা বোধগম্য হচ্ছে না।

শুভ্র আবার বলল,

-কী রে বল কী হয়েছে? চুপ করে আছিস কেন! শুভ্র চিৎকার করে বলল,
-বলবি কী হয়েছে…

পলাশ চিৎকার করে বলল,

-শী ইজ নো মোর! মৃন্ময়ী আর নেই..!

ও চলে গেছে আমাদের একা রেখে…. আর নেই ও…!

তুই চলে আসার পর শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছিল, শেষের দিকে খুব কষ্ট তোর নাম উচ্চারণ করেছিল তারপরই…!

পলাশ আর কথা বলতে পারছে না…কথা গুলো বারবার গলায় আটকে যাচ্ছে ওর…

শুভ্র পলাশকে চিৎকার করে বলল,

-একটা চড় মারব তোকে। কী আবল তাবল বকছিস তুই….

-আবল তাবল না রে…মৃন্ময়ী আর নেই…

ফোনের লাইন কেটে গেল।

“মৃন্ময়ী আর নেই..!” একটা তীক্ষ্ণ ঠান্ডা বাতাস মনে হলো শুভ্রর সারা শরীরে আছড়ে পড়ল৷ ক্ষত বিক্ষত করে দিলো শুভ্রর সারা শরীর।

বুকের ভিতরটা বারংবার হাহাকার করে উঠছে।

শুভ্রর মাথা মনে হচ্ছিল যন্ত্রণায় ছিড়ে যাবে এবার।

যতবার পলাশের বলা কথাটি “মৃন্ময়ী আর নেই!” মনে হচ্ছে ততবারই শুভ্রর শরীর কেঁপে উঠছে। অদ্ভুত শিহরণ বারবার শিহরিত করছে শুভ্রকে।

বুকের ভিতর একটা ফাঁকা ফাঁকা ভাবটা বেড়েই চলেছে।

শুভ্র ঘর থেকে বের হয়ে আসল। ঘরের ভিতর আমিরের মাথা থেকে অনর্গল রক্ত বের হচ্ছে।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। শুভ্রর কেবলই মনে হতে লাগল আজ শুধু শুভ্র একা না প্রকৃতিও কাঁদছে ওর সাথে…

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শুভ্র হাঁটছে কাঁপা কাঁপা গলায় শুভ্র বলল, মৃন্ময়ী আমি পেরেছি। তুমি পৃথিবীতে থাকা অবস্থায়-ই আমি তোমার ওপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিশোধ নিয়েছি। ওপারে ভালো থেকো।

তুমি একাই ভালো থেকো কেমন। তুমি তো স্বার্থপর। এরকম তো ছিলে না তুমি। আমাকে একা রেখেই পাড়ি জামালে ওপারে। একবারও ভাবলে না কী ভাবে থাকব আমি।

কীভাবে চলব আমি.!একবারও ভাবলে না! এতটাই স্বার্থপর তুমি!

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শুভ্র হাঁটছে আর ভাবছে, আজ থেকে কেউ আর ওর বুকে মাথা রাখার স্বপ্নে বিভোর হবে না। আজ থেকে কেউ আর শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে অভিমানী সুরে কথা বলবে না।

মাঝ রাতে ভয় পেলে ফোন দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদবে না।

একদিন দেখা নাহলে কেউ আর অভিমান করে বলবে না “বলো ভালেবাসি”

আজ থেকে শুভ্রকে আর মোবাইলের দিকে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে না যে মৃন্ময়ী ফোন করেছে কিনা…

আজ থেকে কোনো পাগলি মেয়ে আর তার বিয়ের পর কীভাবে সংসার গোছাবে সে স্বপ্নের কথা বলবে না…

আর যখন শুভ্র দুষ্টুমি করে বলে, তাহলে ভালোবাসাবাসি… তখন মৃন্ময়ীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যেত..আজ থেকে আর সেই কারও গাল লজ্জায় লাল হবে না..

কেউ দুমিনিট দেরি করে আসলে আর বকা দিবে না শুভ্রকে..কেউ না…

আজ থেকে সবটা স্মৃতি জুরে থাকবে শুধু হাহাকার আর হাহাকার আর এক অপূর্ণ শূন্যতা…

শুভ্রর শরীর কেঁপে উঠল এটা ভেবে যে আজ থেকে আর কাউকে ভালোবেসে বলতে পারবে না, আমার পাগলীটা…!

অসংখ্য লড়াই শুভ্র সাথে পাশে থেকে লড়েছে বিভিন্ন অন্যায়কারীর সাথে।

আজও মৃন্ময়ী লড়ছিল তবে একা। এক শুন্য পথে লড়ে যাচ্ছিল। জিতবে না জেনেও লড়ছিল মৃন্ময়ী। হয়তো শুভ্রকে এবারও পাশে পেলে এই লড়াইয়ে জিততো মৃন্ময়ী।

কিন্তু আফসোস জীবন যুদ্ধের লড়াইটা সবসময়ই একারই হয়। পাশে থেকে হয়তো সাপোর্ট করতে পারা যায় কিন্তু কখনো অংশগ্রহণ করা যায় না।

যদি অংশগ্রহণ করা যেত..!!!

পিছন থেকে হঠাৎ তীব্র আওয়াজের সাথে একটা গুলি শুভ্রর পায়ের মাংস ভেদ করে বেরিয়ে গেল। শুভ্র একবারও পিছনে তাকাল না। যার পিছুটান নেই তার পিছনে তাকিয়ে কী লাভ…! কেবলই একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিল কেউ আউড়ে চলেছে,
” গগনে গরজে মেঘ ঘন বর্ষা, 
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা…”

বাহাত্তর.

“শুভ্র… শুভ্র… ওঠো। বেলা যে হয়ে এলো। আর কতক্ষণ ঘুমাবে! ওঠো একটু পরেই তো মাগরীবের আজান দিবে।”

শুভ্র ঘুমজোড়া চোখমেলে তাকিয়ে দেখলে নিহারিকা দাঁড়িয়ে আছে।

কিছুক্ষণ সময় লাগল শুভ্রর ঘোর কাটতে। পরে ধীরে ধীরে সব মনে হলো।

আজ কেন জানে না শুভ্রর মৃন্ময়ীর কথা খুব মনে হচ্ছিল। ওর কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়েছিল।

শুভ্র তাকিয়ে দেখল নিহারিকা এখনো কলেজে পরে যাওয়া শাড়ি পরে আছে। বুঝতে পারল হয়তো অনেক্ষণ আগে কলেজ থেকে ফিরেছে ও। কিন্তু কাজের চাপে কাপড় ছাড়তে মনে নাই।

শুভ্র জড়ানো গলায় বলল,

-নিহারিকা আমার অক্ষমতা তোমাকে অনেক বিপাকে ফেলেছে তাই না! সারাদিন বাড়িতে পড়ে থাকি কোনো কাজ করতে পারি না পুরো সংসার তো তোমাকেই চালাতে হয়…

নিহারিকা শুভ্রর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল,

-বাজে কথা বলবে না একদম। তোমার আমার আলাদা কী! সংসার মানেই তো দু’জনের ভাঙা গড়া আবেগের সংমিশ্রণ…!

যাও ফ্রেশ হয়ে নাও। দেখি জ্বরটা কমেছে কিনা…

নিহারিকা শুভ্রর কপালে হাত দিয়ে বলল,

-দুপুরে ঔষধ খাওনি না? তোমরা দুই ভাইবোন আমাকে এবার পাগল করে দেবে। ওদিকে একজন হোস্টেলে নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করে না এদিকে একজন ঔষধ ঠিকমত খায় না।

-না আসলে দুপুরে ঘুমিয়ে গেছিলাম হঠাৎ করে…

নিহারিকা স্মিত হেসে বলল,

-এখন যাও ফ্রেশ হয়ে নাও…

নিহারিকা উঠে দাঁড়িয়ে যেতে চাইলে শুভ্র বলে উঠল,

– নিহারিকা… তোমাকে একটা কথা আমি বলিনি আজও। বলতে পারো লুকিয়েছি তোমার কাছে বা লুকায়নি! সেজন্য পারলে ক্ষমা করে দিও।

-কী কথা! নিহারিকা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে শুভ্র দিকে…

-আমি মৃন্ময়ীকে ভালোবাসতাম। নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম।

বলতে বলতে শুভ্র কান্নায় ভেঙে পড়ল।

নিহারিকা বুঝতে পারল শুভ্র আবার স্মৃতি ভুলতে শুরু করেছে। নিহারিকারও হঠাৎ মৃন্ময়ীর কথা মনে হতেই চোখে জ্বালাপোড়া শুরু করে দিয়েছে। একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছল ছল নয়নে শুভ্রর চোখের জল আলতো ভাবে মুছিয়ে দিয়ে বলল,

-জানি আমি..

শুভ্র অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,

-জানো তুমি…!

-হুঁ! জানি তো! আমার শুভ্র ভালোবাসাকে ভালোবাসতে জানে। সে জানে ভালোবাসা কী? কীভাবে সম্মান করতে হয় ভালোবাসাকে। কীভাবে শ্রদ্ধা করতে হয় ভালোবাসাকে। নয়তো কয়জন ছেলে আছে এখনকার সমাজে যে তার ভালোবাসার মানুষকে অসম্মান করেছে বলে নিজের জীবন বিপন্ন করে লড়াই করে!

আর আমি আমার শুভ্রকে নিয়ে গর্ব করি

শুভ্র অবাক চোখে নিহারিকার দিকে তাকিয়ে আছে।

– ওভাবে কী দেখছ! উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও। আরে ভুলে গেলে আজ আমার শুভ্রা সোনাকে দেখতে আসবে ছেলে পক্ষ। দেখতে আসবে তো…! ও মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে থেকে বের হয়ে গেছে। এখনই চলে আসবে বোধহয়। এসে যদি দেখে তার ভাইয়া এভাবে ছোটো মানুষের মতো কাঁদছে তাহলে আমার কী হাল করবে ভাবো তো!

নিহারিকা উঠে চলে গেল। মৃন্ময়ীর কথা মনে হওয়াতে ওর বুক ফেটে কান্না আসছিল কিন্তু কোনোভাবে তা শুভ্রর সামনে প্রকাশ করল না। আজ এত বছর ধরে শুভ্রকে একটু একটু করে সুস্থ করে তুলতে নিহারিকার প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে, তবুও সে হার মানছে না। মৃন্ময়ীকে নিহারিকাও অনেক ভালোবাসত।

সেদিন শুভ্র আমিরকে ওর শাস্তি বুঝিয়ে দিয়ে যখন ফিরে আসছিল তখন পিছন থেকে ওদের দলের একজন শুভ্রকে গুলি করে৷ পুলিশ ততক্ষণে পৌঁছে যাওয়ায় ওকে উদ্ধার করে।

এতসব ঘটনার চাপ শুভ্রর মা নিতে পারেননি। এক জীবনে নিজের চোখের সামনে স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে এই খবর পাওয়ার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরলোক গমন করেন।

কয়েক ঘন্টা কিন্তু ওই কয়েক ঘন্টায় অনেক হিসেব নিকেশ পাল্টে যায়।

মৃন্ময়ী নেই, শুভ্র হাসপাতালে ভর্তি, শুভ্রর মাও আর নেই। শুভ্রা বাড়িতে একা…!

এতদিনের পরিচিত সব ছবি হঠাৎই ঝাপসা হয়ে গেছিল সেদিন।

সেদিন কেউ পাশে দাঁড়ায়নি ওদের। শুধু একজন ছাড়া।

নিহারিকা!

সবাই যখন মৃন্ময়ী আর শুভ্রর মাকে নিয়ে হায় হুতাস করছিল তখন নিহারিকার সবার প্রথমে মনে হয়েছিল শুভ্রার কথা।

যে চলে গেয়েছে সে গেছে কিন্তু যে আছে তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলা দেওয়া কখনো বুদ্ধিমানের কাজ না…

হয়তো শুভ্রাকে আনতে আরেকটু দেরীতে পৌঁছালে আরেকটা বিপর্যয়ে সম্মুখীন হতে খুব একটা সময় লাগত না।

দেশি কুকুর আর বিদেশি কুকুরের মিলনে অদ্ভুত আরেক জাতের কুকুর বর্তমানে বেড়ে গেছে সমাজে। এরা জৈবিক চাহিদা ছাড়া কিছু-ই বোঝে না।

নিহারিকা এ ঘর থেকে গেছে অনেক্ষণ হলো।

শুভ্রর বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছে করেছিল না৷ সব দায়িত্ব ও নিহারিকার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। সেদিন ও পাশে না দাঁড়ালে হয়তো অথৈ সমুদ্রে ওরা দু ভাইবোন ভেসে বেড়াত। শুভ্রা একজনকে ভালোবাসে আর তার পরিবারের সাথেই আজ পাকা কথা হওয়ার কথা…

শুভ্র বাইরের আকাশে দেখল পশ্চিম আকাশে ডুবন্ত সূর্যের কাছে সাদা মেঘ গুলো গাঢ় লাল হয়ে গেছে। কিছু পাখি কিচিরমিচির করতে করতে আপন নীড়ে ফিরছে,

দিক হীন দূর আকাশে তাকিয়ে শুভ্রর হঠাৎ জসিম উদ্দিনের একটা বিখ্যাত কবিতার লাইন আজ বাস্তব বলে মনে হলো,

“ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবীরের রাগে,

অমন করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ লাগে…!”

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল ওর মনের অজান্তে…

 

সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*