Home Login Register

Naw Story Will Update Regularly......

বখাটে বউ [৩য় অংশ]


প্রিয় পাঠক আমাদের টিম বিনা স্বার্থে আপনাদের জন্য গল্প আর্কাইভ করে, আপনাদের নিকট বিশেষ অনুরোধ যে, বিডিস্টোরি২৪ ডটকম এর স্বার্থে আপনারা এডগুলোতে ক্লিক করবেন, তবে দিনে একবারের বেশী না, যদি আমাদের সাইটকে ভালোবেসে থাকন তো.......
Home / Sazia Afrin Sapna / বখাটে বউ [৩য় অংশ]

Admin › 2 months ago

লেখিকা: সাজিয়া আফরিন স্বপ্না

নির্ঘুম রাতের পর একটা সকাল এলো। আমি নিজের স্বভাব বদলাতে পারলাম না। আসলে একটা রাতে কখনো কি স্বভাব বদলে ফেলা যায়? গেলেও আমি পারি না। তাকে জব্দ করার ফন্দি এটেই কিচেনে গেলাম। বিস্বাদ খাবার তৈরি করলাম। এমনিতেও আমি রান্না বান্না একদম পারি না। তার উপর ইচ্ছে করে খারাপ করা মানেই হলো অখাদ্যের উপরে কুখাদ্য। তবে খাবারটা শুধুই বুইড়া খোকাবাবুর জন্য বানালাম। আমি জানি ধেড়ে খোকা একটুও ঝাল খেতে পারে না। ওর জন্য ডিম ভাজিতে কোনো মরিচ কুচি দেয় না আন্টি। কিন্তু আজকের স্পেশাল ডিম ভাজিতে পেঁয়াজ না দিয়ে শুধু ছয় সাতটা মরিচ কুচি দিলাম সাথে কিছু ধনে পাতা কুচি দিলাম যেনো মরিচ কুচি আর ধনে পাতা মিলে মিশে একাকার হয়। লবণ দেবার দরকার মনে করলাম না। পরোটাতে একগাদা লবণ দেবার দরকার মনে করলাম। সবজিতে হলুদ আর হালকা তেল ছাড়া আর কিছুই দেবার দরকার মনে হলো না। আর কিছু রান্না না করে ফ্রিজ থেকে রান্না করা মাংস বের করে এনে তাতে এক মুঠো মরিচ গুড়ো দিয়ে নেড়ে চেড়ে গরম করলাম। উফ্ কি সুন্দর দেখাচ্ছে মাংস! একটু মুখে দিয়ে দেখার সাহস পেলাম না। এটাকেই বলে মরিচ থেরাপি। সব রেডি করতেই দেখি আন্টি কিচেনে আসছেন। থ্যাংকস গড! বেঁচে গেছি। আরেকটু আগে এলে তো আমার রান্না মাঠেমারা যেতো। আন্টি আমাকে এতো সকালে কিচেনে দেখে অবাক হলেন। হবারই কথা, কারণ আমি তো কিচেন মাড়াই না কখনো। 
__”কি রে এখানে কি করছিস?”
এখন কি বলবো? সত্যি কথাই বলি। সত্যের মৃত্যু নেই। মুখটাকে লাজুকাকৃতির করে বললাম-
__”না মানে আন্টি আপনার ছেলের জন্য নাস্তা বানাচ্ছি।”
__”এখনো বুঝি আমাকে আন্টিই ডাকবি?”
__”আসলে অন্য কিছু ডাকতে আমার লজ্জা করে।”
__”প্রথম বার লজ্জা করবে, তারপর আর করবে না। ডাক একবার!”
__”খালাম্মা।”
আন্টি হেসে ফেললেন। 
__”ফাজিল মেয়ে একটা! মা বল!”
আমি চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম। আন্টি আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন-
__” কি রে কি হলো? বল!”
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম-
__”মা!” 
আন্টি মানে মা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তার বুকে মাথা রেখে আমার আলাদা একটা অনুভূতি হলো, ঠিক যেনো মা মা একটা গন্ধ। আমি বুকে মাথা রেখে বললাম-
__”অনুভূতি বলছে আপনি আমার আরেকটা মা।”
তিনি আমার মুখটা তার সামনে উচু করে ধরে বললেন-
__”মা বলে ডাকছিস আর ‘আপনি’ সম্বধন করছিস? এই সম্বধনে পর পর লাগে জানিস না?”
__”তো কি বলবো?”
__”এখন থেকে ‘তুমি’ করে বলবি।”
__”আচ্ছা।”
__”তা হঠাৎ আমার ছেলের জন্য রান্না করার কারণটা কি জানতে পারি? প্রেম টেম কি হয়ে গেলো নাকি?”
আমি বেশ ভাব নিয়ে বললাম-
__”কি যে বলো না মা? তোমার ঐ বান্দর ছেলের সাথে কোন্ মেয়ের প্রেম হবে?”
__”তা তো ঠিকই। কিন্তু কি এমন হলো যে কিচেনে ঢুকলি তাও আবার এত সকালে?”
এই রে, এখন কি বলি? ভারী বিপদে পড়লাম দেখছি। কিছু খুঁজে না পেয়ে বললাম-
__”আসলে বাবু তো কাল থেকে কাঁচকলার তরকারী খেয়েছে। পেট ভরে তো খেতে পারেনি তাই ভাবলাম…”
মা দুষ্টুমির চোখে তাকিয়ে বললেন-
__”হুম বুঝেছি। তো বাবুটা কি তোরও বাবু?”
__”না না, সে তো তোমার বাবু।”
মনে মনে বললাম, সে আমারো বাবু তবে বুইড়া ধাইড়া খোকাবাবু। মা হেসে উঠে বললেন-
__”তাহলে বাবু বাবু করিস কেনো?”
__”তো কি বলবো?”
__”নাম তো আছে তার একটা।”
বয়ে গেছে তার নাম ধরে ডাকতে আমার। সুন্দর করে সুস্ত্রীর ভাব নিয়ে বললাম-
__”স্বামীর নাম মুখে আনতে নেই তাই বাবু বলি।”
__”ওরে বাপরে! এ মেয়ে তো দেখছি এক ধাপ উপরে।”
এক ধাপ নয় মা, কয়েক ধাপ উপর থেকেই বলছি, বয়ে গেছে ঐ বান্দরকে আমার স্বামী ভাবতে। এসব কুখাদ্য খাওয়াতে হবে তাই তোমাকে পটাচ্ছি মা। প্লিজ মাফ করে দিও আমাকে! ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম-
__”মা আমি তো রান্না করতে পারি না তাই অল্প করে শুধু তোমার ছেলের জন্যই নাস্তা বানিয়েছি। আগে সব শিখে নিই তারপর সবার জন্য করবো।”
মা আমার কপালে চুমু দিয়ে বললেন-
__”আচ্ছা বাবাহ আচ্ছা। বাকী সব নাস্তা আমি বানাচ্ছি। তুই খাবার নিয়ে রুমে যা।”
ওহ নো! খাবার নিয়ে তো রুমে যাওয়া যাবে না। তাহলে তো ধরা পড়ে যাবো। সে যদি বুঝে ফেলে যে এসব আমি বানিয়েছি তাহলে সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। এই সব খাবার মাকে দিয়েই খাওয়াতে হবে। আমি দুখী দুখী মুখ করে ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম-
__”আসলে সে তো আমাকে পছন্দ করে না তাই আমি খাবার নিয়ে গেলেও সে খাবে না। আমি টেবিলে রেখে যাচ্ছি। সে এলে তুমি খাইয়ে দিও। সে সবটা খেলে আমার ভালো লাগবে।”
মা মুচকি হেসে বললেন-
__”আচ্ছা আমি তাকে সবটাই খাইয়ে দেবো। তুই আড়াল থেকে দেখে নিস।”
__”মা আরেকটা কথা হলো, আমি নাস্তা বানিয়েছি এটা তাকে বলবে না। তাহলে তার নাস্তা করাই হবে না।”
__”আচ্ছা বাবাহ ঠিক আছে।”
এবার বুইড়া খোকাবাবু তুমি পালাবে কোথায়? টের পাবা বর্ণর সাথে ফাঙ্গা নেয়ার মজা।

রুমে ঢুকে দেখলাম লাটসাহেব ঘুমাচ্ছেন। ইচ্ছে করছে এক বালতি পানি তার গায়ে ঢালি। হাতও পানি ঢালার জন্য চুলকাচ্ছে। হঠাৎ গতরাতের কথা মনে পড়লো। থাক বাবা রাতের মতো বখাটের জবাব চাই না। দেখা গেলো সে লাফ দিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বললো, “আমি ডুবে যাচ্ছি বাঁচাও বাঁচাও!”
এ ছেলেকে করে কোনো বিশ্বাস নেই তাই এমন রিস্ক নেয়া অসম্ভব। কিন্তু তাকে না জ্বালিয়ে তো শান্তি পাচ্ছি না। এত বেলা পর্যন্ত কিসের ঘুম? আলসে বিড়াল একটা! না না আলসে বিলাই। আরো খারাপ করে বলা উচিত, আলসে বিলি একটা। কোন্ কুক্ষণে যে আমি এই ছেলেটাকে ইফটিজিং করতে গেছিলাম! আজ নিজের দোষেই সে আমার গলার কাঁটা হয়ে গেছে। ওর ঘুমানো দেখে মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। আর সহ্য করতে পারছি না এবার তাকে জাগাতেই হবে। আমি বেডের কাছে দাড়িয়ে তার কানের কাছে জোরে জোরে চিল্লিয়ে বললাম-
__”এই যে লাট সাহেব উঠুন তাড়াতাড়ি আপনাকে আন্টি ডাকছে। ওহ স্যরি মা ডাকছে।”
সে ঘুমের মধ্যে আমার হাত টেনে ধরে বললো-
__”আরেকটু পর উঠবো।”
এই রে হাত ধরলো কেনো? রাতে জাপটে ধরে ছিল আমাকে আর এখন হাত ধরেছে। এ ছেলের তো দেখছি মতলব ভালো না। বললাম-
__”আরেকটু পর উঠবেন ভালো কথা। তাই বলে হাত ধরার কি আছে? ছাড়ুন হাত!”
সে চোখ বন্ধ করেই বললো-
__”হাত কখন ধরলাম?”
__”এই তো ধরে আছেন।”
__”এটা তো আমার কোলবালিশ।”
__”এত চিকন আপনার কোলবালিশ?”
__”তাহলে এটা কোলবালিশের কভারের ফিতা।”
__”ঢং বাদ দিয়ে হাত ছাড়ুন। নইলে আমি কিন্তু আমি চেচাবো!”
__”আমি কোলবালিশ ছাড়লেই ঐ বখাটে বদ মেয়েটা আমার নিরিহ কোলবালিশটাকে মেরে ফেলবে তাই কিছুতেই ছাড়বো না।”
ঘুমের মধ্যে এত কথা বলতে কাউকে দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম কেউ ঘুমের ঘোরে ঠিক ঠিক জবাব দিচ্ছে। তারমানে হলো এটা ফাজলামি ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। আমি জোরে একটা টান মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলাম কিন্তু আমার চুড়ি গুলো সব ওর হাতেই থেকে গেলো। ব্যাথাও পেলাম অনেকটা। রাগে আমি লুচির মতো ফুলে দাড়িয়ে রইলাম। তারপর পানির গ্লাস থেকে পানি নিয়ে ওর চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলাম। সে লাফ দিয়ে বসে আমার দিকে চেয়ে রইলো। তারপর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে চুড়ি দেখে সে চমকে উঠে চুড়ি গুলো বিছানায় ছুড়ে ফেললো। তার ন্যাকা ঢং দেখে আমার তো ইচ্ছে করছে রুমের ভেতরে সাইক্লোন ঘটাই। সে অবাক হবার ভান করে বললো-
__”আমার হাতে চুড়ি কোথা থেকে এলো? এই আপনি চুড়ি খুলে আমার হাতে দিয়েছেন কেনো? আবার কি নতুন প্ল্যান করছেন হুম?”
আমার তো রাগে সারা শরীর খিটখিট করছে। দাঁতে দাঁত পিশে বললাম-
__”এগুলো আপনার কোলবালিশের চুড়ি, সে তো মরে গেছে তাই আপনি হাতে পরবেন বলে নিয়ে এসেছেন।”
সে বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
__”কি সব ফালতু কথা বলছেন? আমি চুড়ি কেনো পরবো? আর কোলবালিশের চুড়ি মানে?”
__”গতরাতে ভুতের কাহিনীর মতো কাহিনী করবেন না একদম। এই সব ন্যাকামী আমার অসহ্য লাগে।”
__”ন্যাকার ড্রামের মুখে এসব মানায় না।”
__”আমি আপনার হাত চেপে ধরে ছিলাম নাকি আপনি আমার হাত চেপে ধরে ছিলেন? আমার হাত চেপে ধরাটা কি ন্যাকামী নয়?”
__”হাত চেপে না ধরলে তো ভয়ানক কিছু করতেন হাত দিয়ে। জাস্ট আত্মরক্ষা করেছি।”
__”ভয়ানক কিছু করতাম মানে?”
__”আপনার মত পাজি বদ বখাটে মেয়েকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না।”
__”আমি এখন পর্যন্ত নিজে থেকে আপনাকে টাচ করিনি আর আপনি আমার হাতের দোষ দিচ্ছেন?”
__”বাহ্! রাতের কথা ভুলে গেলেন? আমাকে ধাক্কা দিয়ে কে ফেলে দিয়েছিল? নাকি ধাক্কা দেয়াটা টাচ নয়?”
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম-
__”ঘুমের মধ্যে ঠেলা লেগে ছিল। ওটা ইচ্ছাকৃত নয়।”
__”আপনার কি ধারণা একটা বখাটে মেয়েকে পাশে রেখে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিলাম? একদম না। আমি সব জানি।”
__”ঘোড়ার ডিম জানেন আপনি।”
__”যাই হোক, এই সাত সকালে আমাকে ডাকতে কে বলেছে? অবশ্য আপনার তো পার্মিশন লাগে না। আপনি এলাকার বখাটে গুন্ডী। যখন যাকে ইচ্ছে আপনি তাকে জাগাতেই পারেন।”
__”কিহ আমি গুন্ডী?”
__”ওহ নো নো, আপনি লেডী রংবাজ।”
__”কিহ আমি রংবাজ?”
__”নো, আপনি লেডী রংবাজ।”
__”সব শোধ নেবে বর্ণিতা।”
__”একটা কথা বলি?”
__”মুখ তো বন্ধ করে রাখেননি, ঘটা করে অনুমোদনের কি দরকার আছে?”
__”তাহলে বরং বলেই ফেলি।”
__”বলুন।”
__”আপনার বৈশিষ্ট্যের সাথে বর্ণিতা নামটা একদম যায় না।”
__”কি নাম যায় আমার সাথে?”
__”অবর্ণিতা”
__”ফাজিল বান্দর ধেড়ে বাবু।”
__”কিহ? আমি ফাজিল বান্দর ধেড়ে বাবু?”
__”তো আপনি কি কচি বাচ্চা?”
__”আপনার সাথে তর্ক করার ইচ্ছে আমার নেই। আমি আরেকটু ঘুমাবো তারপর উঠবো। আপনি এখন যান।”
__”মা মানে আপনার আম্মু বলেছেন, এখন উঠে নাস্তা না করলে তিনি আপনাকে আজকেও কাঁচকলার তরকারী খাওয়াবেন।”
আমার সব টুকু কথা শেষ হবার আগেই সে ধুচমুচ করে উঠে দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। বুঝলাম কাঁচকলা নামক এন্টিবায়োটিক দারুণ কাজ করেছে। সাবাস বর্ণ সাবাস। আজ তোকে মালা দেয়া উচিত। যাই আমিও রেডি হই ধেড়ে খোকার কুখাদ্য খাওয়ার অনুষ্ঠান দেখার জন্য। খুশির ঠ্যালায় কি যে করি!

খোকাবাবু ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কাঁচকলার ভয়ে দৌড়ে ডায়নিংএ বসলো। আমি নাস্তা করতে না গিয়ে আড়ালে দাড়িয়ে থাকলাম। আড়ালে দাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখছি একটু পরে ধেড়ে বাবু অখাদ্য গুলোকে কিভাবে খাদ্য হিসেবে ভক্ষণ করে। আর সেটাই এনজয় করার জন্য আমি অপেক্ষারত। কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের আগমন, খোকাবাবুকে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম। এই তো খোকাবাবু পরোটা ছিড়লো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে পরোটার সাথে ডিম ভাজি ছিড়ে নেবে। ওহ্! সে ডিম ছিড়ে পরোটাতে নিলো এবার খুব দ্রুত সে পরোটা আর ডিমের টুকরো মুখে নেবে। কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসে গেছে, ধেড়ে খোকা খাবার মুখে নিয়েছে। ইয়াহু! 
খাবার মুখে নিতেই বাবুটার চোখ মুখ বিস্বাদ হয়ে গেলো। উফ্ কি দারুণ দেখাচ্ছে তাকে! আই লাভ ইউর বিস্বাদ মুখ ধেড়ে বাবু। সে মুখ কাচুমুচু করে মাকে বললো-
__”নাস্তা কে বানিয়েছে?”
মা একটু চমকে উঠে বললেন-
__”কেনো?”
__”এমন কুখাদ্য আমি জীবনেও মুখে নিইনি।”
__”বাবু রোজ খাবার টেস্টি নাও হতে পারে তাই এভাবে বলতে নেই।”
__”আমি শিওর এটা তোমার রান্না নয়।” আমি খোকাবাবুর পেছন দিকে দাড়িয়ে আছি। মা আমাকে দেখতে পাচ্ছেন। বাবুর কথা শুনে মা আমার দিকে তাকালেন। আমি করুণ মুখ করে দাড়িয়ে আছি। মা আশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। বুঝলাম মা আমাকে খুশি করতে চাইছেন। তারপর তিনি বেশ কড়া গলায় বললেন-
__”এত কথা বললে কিন্তু কাঁচকলার ভর্তা খাওয়াবো। এর চেয়ে এই খাবারটাই বেটার মনে হয়।”
বাবু মুখটা করুণ দুখী দুখী করে বললো-
__”আম্মু দেখো পরোটা লবণে বিষ হয়ে আছে, ডিম ভাজিতে লবণ এক ফোটাও দেয়নি ইভেন পেঁয়াজ না দিয়ে শুধু মরিচ কুচি দেয়া। এত ঝাল অথচ লবণ দেয়া নেই একটুও। আর সবজিতে দেখো হলুদ ছাড়া কিছুই দেয়া নেই। না জানি অন্য খাবার গুলো কেমন অখাদ্য হয়েছে! মাংস মুখে নেয়ার তো সাহসই পাচ্ছি না। তুমিই বলো এসব খাওয়া যায়?”
__”পরোটাতে লবণ বেশি ডিমে লবণ নেই। ভালোই তো, দুটো একসাথে খেলে লবণ ঠিক লাগবে। খেতে শুরু কর।”
__”ওহ নো! আমি নাস্তাই করবো না।”
মা আবার আমার দিকে তাকালেন। বুঝলাম তিনি খুব বিপদে পড়েছেন। একদিকে নিজের ছেলে, আরেক দিকে আমি। কার মন রক্ষা করবেন তিনি!
__”তুই নাস্তা না করলে আমি কিন্তু খুব কষ্ট পাবো বাবু।”
মুখটাকে বাংলার পাঁচের মতো করে ধেড়ে বাবু ওসব কুখাদ্য খাওয়া শুরু করলো। ঝালে ওর চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। উফ্ ফর্সা ছেলেটাকে লাল লাল দেখতে হেব্বি লাগছে। এসো বাবু তোমার কপালের কোণে একটা নজর কাজল লাগিয়ে দিই। এমন টমেটো মার্কা লাল মুখ দেখে যেনো কারো নজর না লেগে যায়। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি বের হচ্ছে। অবশেষে সে সব খাবার খেতে পারলো না। আসলে অমন কুখাদ্য সব খাওয়া পসিবলও নয়। আহ্ কি যে শান্তি লাগছে আমার যা প্রকাশ করতে পারছি না।

ওর খাওয়া শেষ হবার আগেই আমি দৌড়ে রুমে এসে ব্যস্ত থাকার ভঙ্গিতে বেড গোছাতে শুরু করলাম। খাওয়া শেষে সে ঝালে হা করে রুমে ঢুকলো। সে হা করে মুখে হাওয়া নিতে নিতে আমার পেছনে দাড়িয়ে বললো-
__”আমার আম্মুকে পটিয়ে আমাকে জব্দ করছেন তাই না?”
আমি পেছনে ফিরে তাকিয়ে অবাক হবার ভান করলাম। যেনো এই সব কিচ্ছু আমি জানি না। অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললাম-
__”মানে?”
সে রাগী চোখে তাকিয়ে বললো-
__”ওসব অখাদ্য কুখাদ্য আপনি ছাড়া যে কেউ রান্না করতে পারে না তা আমি খুব ভালো করেই জানি।”
আমি মুখ ভেংচি কেটে বললাম-
__”আমি ওসব রান্না করতে কেনো যাবো? আর আপনার জন্য রাঁধতে আমার বয়েই গেছে হুহ।”
__”দেখলাম তো যে কতটা বয়ে গেছে।”
__”নিজেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেনো ভাবছেন?”
__”উহু, আপনি বরং আমাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন তাই তো আমার পেছনে পড়ে আছেন। যাই করুন না কেনো, সীমান্ত আপনাকে পাত্তা দেবে না।”
আমি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললাম-
__”আহা পাগলের সুখ মনে মনে। কে আপনার পাত্তা চাইছে হুম?”
সে আমার সামনে দাড়িয়ে তার মুখটা ঝুকিয়ে আমার মুখোমুখি এনে বললো-
__”অবর্ণিতা চাইছে।”
আমি হাহা করে হেসে বললাম-
__”আপনার ভাব দেখে মনে হচ্ছে বর্ণিতা পাগলি হয়ে গাছে উঠে বলছে আই লাভ ইউ বাবুতা, আই লাভ ইউ বাবুতা।”
সে সোজা হয়ে দাড়িয়ে বললো-
__”এ্যানি টাইম আপনি গাছে উঠতেই পারেন। আপনার মতো বখাটে গুন্ডীকে কোনো বিশ্বাস নেই।”
__”শুনুন ধেড়ে খোকা, এই সব প্রেম পীরিতি আমার আসে না তাই এসব হুদাই ভাববেন না।”
__”ভাবতে তো বাধ্য করছেন।”
মনে মনে কত কি ভেবে রেখেছে বান্দর ছেলে। ইফটিজিংকে অনায়াসে প্রেম ভেবে নিয়েছে, ভাবা যায়! আমি ওর কথাতে পাত্তা না দিয়ে গান গাইতে শুরু করলাম। 
“ঝাল লেগেছে আমার ঝাল লেগেছে
ঝালে মরে যাই আমি ঝালে মরে যাই..”
উফ্ হারমোনিয়াম ছাড়া গান জমছে না তো। আমার গান শুনে সে খাইয়ালাইমু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আমি চোখ মেরে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। রুমে বসে বসে ঝাল খাইয়ালাও বাবু।

বিকেলে ছাদে উঠে হঠাৎ মনে হলো বাপের বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি। আর হারমোনিয়ামটাও নিয়ে আসি। ঘরে বসে একটু ইফটিজিং করবো। পাশাপাশি ছাদ তাই লাফ দিয়েই বাপের বাড়ির ছাদে চলে গেলাম। ছাদ থেকে ডায়নিংএ নামতেই দেখি আব্বু হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এমন করে তাকিয়ে আছে যেনো সে বর্ণিতার আত্মা দেখছে। আব্বুর সামনে দাড়িয়ে বললাম-
__”আব্বু এমন করে তাকিয়ে আছো কেনো?”
__”তুই সদর দরজা দিয়ে না ঢুকে ছাদ দিয়ে এলি কেনো?”
__”পাশের বাড়িতে বিয়ে হলে এমন বিস্ময়কর ঘটনা তো ঘটবেই আব্বু।”
আব্বু হা হা করে হেসে বললেন-
__”তা বাবুটা কেমন আছে? লাঠি দিয়ে আবার তাকে পিটাসনি তো?”
গতরাতের ভুতের ঘটনা মনে পড়লো। মনে পড়ে লজ্জাও লাগলো আবার রাগও হলো। বললাম-
__”সে একটা মহাফাজিল ছেলে। উপরে নিরিহ সেজে থাকে। ভেতরে ভেতরে সেও বখাটে।”
আব্বু চোখ কপালে তুলে বললেন-
__”কেনো সে কি করেছে?”
সে যা করেছে, ওসব তো আর বলা যায় না। হালকা লজ্জা মেয়েদের রাখা উচিত। তাই ঢেকেই রাখলাম। বললাম-
__”সে অনেক কথা, পরে বলবো।”
আব্বু মুচকি হেসে বললেন-
__”হুম। গভীর ব্যাপার স্যাপার মনে হচ্ছে।”
আমি প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম-
__”আমি হারমোনিয়ামটা নিয়ে যাবো।”
আব্বু চোখ কপালে তুলে বললেন-
__”তুই শ্বশুরবাড়িতেও গান গাইবি?”
__”হ্যাঁ গাইবো। সঙ্গীত শীল্পিরা সবখানেই গান গাইতে পারে।”
আব্বু আমার কথা শুনে মুখ কাচুমুচু করে বললেন-
__”এটা তুই একদম ঠিক বলেছিস। কিন্তু অমন গান বিয়ের পরে আর না গাইলে হয় না মা?”
__”আব্বু তুমি নিজেও একজন সঙ্গীত শীল্পি হয়ে এমন কথা বলছো কি করে?”
আব্বু ভয়ে ভয়ে বললেন-
__”না মানে, আমার গান শুনে তোর মা তো বাপের বাড়ি চলে গেছিল যদি সীমান্তও নিরুদ্দেশ হয়ে যায় তাই বলছিলাম…..”
__”আমি তো সেটাই চাই। ঐ বুইড়া বাবুটা আমাকে ছেড়ে চলে যাক। তাই গান গেয়ে ওর কান ঝাঝরা করবো।”
__”স্বামীর সাথে এমন করতে নেই মা।”
__”আমি তো এই বিয়েটাই মানি না। কিসের স্বামী সে? তুমি ওর হয়ে একদম উকালতি করবে না।”
__”আচ্ছা আর কিছু বলবো না।”
__”আমি গান গাওয়ার সময় তোমাকে ডাকবো। তুমি আমার ঘরের বেলকোণ বারান্দায় বসে তবলা বাজাবে।”
আব্বু চোখ কপালে তুলে বললেন-
__”আমি তবলা বাজাবো?”
__”তো কি আম্মু বাজাবে?”
__”বলে দেখ সে যদি বাজায় তাহলে তো আমি বেঁচে যাবো।”
আমি রেগে গিয়ে চিৎকার করে বললাম-
__”জোর করে বিয়ে দিয়েছো আর এখন এসব বাহানা করছো? তবলা তোমাকেই বাজাতে হবে। নইলে দুই বাড়িতেই আমি প্রলয় ঘটাবো বলে দিলাম।”
আব্বু আমার কথা শুনে ভড়কে গিয়ে বললেন-
__”প্রলয় ঘটাতে হবে না। আমি তবলা বাজাবো তো। বুঝলি বর্ণ আমার তবলা বাজাতে কি যে ভালো লাগে!”
আব্বুর কথা শুনে খুব হাসি পেলো কিন্তু হাসি চাপিয়ে রাখলাম। এখন হাসলে সব গুবলেট হয়ে যাবে। আমি মুখটাকে গম্ভীর করে বললাম-
__”রেডি থেকো, আমি এখন যাচ্ছি।”
__”এক কাপ চা খেয়ে তো যেতে পারতি!”
হঠাৎ আমার মনে হলো, আমার আওয়াজ শুনেও আম্মু আসেনি। কেউ আমাকে সম্মান করে না। বিয়ে দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে আমাকে। এসব ভেবে খুব রাগ হলো। বললাম-
__”এতক্ষণ ধরে বসে আছি, কেউ আমার খবর নিয়েছে? লাগবে না তোমাদের বাড়ির চা আমার।”
__”রাগ করিস না মা। কেউ হয়তো তোর আওয়াজ শুনতেই পায়নি।”
__”তুমি কবে থেকে আম্মুর উকিল হলে?”
__”হইনি তো! একদম উকিল হইনি। আমি তো কখনো ল্য পড়িইনি, উকিল কি করে হবো?”
আমি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাম-
__”ফাজলামি রাখো আব্বু। আসল কথা হলো আমাকে তোমরা তাড়িয়ে দিয়েছো। একটাই মেয়ে আমি তোমাদের আর তোমরা আমার গলায় একটা বান্দর ঝুলিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছো।”

আব্বু আসামীর মতো করুণ মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

আমার চেচামেচি শুনে আম্মু ডায়নিংএ এসে আমার সামনে দাড়িয়ে ঝগড়ার মুড নিয়ে বললো-
__”দু দিন ধরে বিয়ে হতে না হতেই খুঁত ধরতে শুরু করেছিস? আর এই বাড়িটা এখন আমাদের বাড়ি হয়ে গেছে?”
আমিও কম ঝগড়া জানি না। মুখ ভেংচি কেটে বললাম-
__”কেনো ধরবো না? আধা ঘন্টা ধরে বসে আছি, খবর নিয়েছো যে আমি কেমন আছি? একটা বান্দরের গলায় তো আমার মতো একটা ঝকঝকে মুক্তা ঝুলিয়ে দিয়ে মুক্তি নিয়েছো।”
আমার কথা শুনে আম্মুর ঝগড়ার মুড ঠুস হয়ে গেলো। সে চোখ কপালে তুলে বললো-
__”সীমান্ত বান্দর আর তুই মুক্তা?”
আমি ভাব নিয়ে বললাম-
__”তা নয় তো কি?”
__”যা আমাকে বলেছিস, বলেছিস, এ কথা আর অন্য কাউকে বলিস না। সবাই তোকে পাগল ভাববে। আর মুক্তি দিলি কোথায়? এসেই তো প্যানপ্যান শুরু করেছিস।”
__”আমার কথা তো তোমার প্যানপ্যান লাগবেই। তোমার চেয়ে মা আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। লাগবে না তোমাদের ভালোবাসা।”
আম্মু বিস্ময়ের স্বরে বললো-
__”মায়ের চেয়ে শাশুড়ি বেশি ভালোবাসে তা এই প্রথম শুনলাম। আমার কান তো ধন্য হয়ে গেলো।”
আমি অভিমানী মুখভঙ্গি করে বললাম-
__”সত্যি কথা শুনলে কান তো ধন্য হবেই। একটাই সন্তান আমি তোমাদের অথচ তুমি তো আমাকে দেখতেই পারো না।”
__”কবে তোকে দেখতে পারলাম না?”
__”দেখতেই যদি পারতে তবে আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে না।”
__”সবারই বিয়ে করতে হয়। সন্তানকে বিয়ে দেয়া বাবা মায়ের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। তাই বিয়ে দিয়েছি। আর তোকে তো কোনো রিকশা ওয়ালার সাথে বিয়ে দিইনি। ছেলেটা যথেষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন, নম্র ভদ্র। তাহলে তোর এত আপত্তি কেনো?”
__”ব্যাপারটা যোগ্যতা নিয়ে নয়, ব্যাপারটা হলো আমি বিয়ে নামক শেকলটা পরতে চাইনি আর তোমরা জোর করে আমার পায়ে শেকল পরিয়েছো। তোমরা সবাই খুব খারাপ। তোমরা অপরাধী।”
__”কিহ আমি অপরাধী? ঐ অপরাধী গানের অপরাধী নাকি আমি?”
এই তো শুরু হয়ে গেলো। বললাম সবাইকে আর উনি একা নিজের কাঁধে টেনে নিলেন। এখন এই কাঁসুন্দি ঘেটে ঘেটে আমাকে শেষ করবে। বললাম-
__”হ্যাঁ তুমিই সেই অপরাধী আর আব্বু সেই গানের গায়ক।”
আমার কথা শুনে আব্বুর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। মনে হয় মনে মনে খুশি হয়েছেন। হাজার হোক সাধনার গান বলে কথা। আব্বু গায়ক এটা শুনে আম্মু রেগে উঠে বললো-
__”তোর আব্বুর গানের কথা আমার সামনে বলবি না বলে দিচ্ছি বর্ণ। আমি ওর গলার গান হতে চাই না।”
আম্মুর কথা শুনে আব্বুর মুখটা ফাটা বেলুনের মতো ঠুস হয়ে গেলো। বললাম-
__”আব্বুর গলার গান তোমাকে হতে হবে না। কত বড় বড় গায়ক তোমাকে নিয়ে গান গাইছে এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে।”
__”কি বললি?”

বুঝলাম এখন আমার উপর দিয়ে ঝড়সহ শিলা বৃষ্টি হবে। তাই আম্মুর কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত আমার রুমে চলে গেলাম।
রুম থেকে হারমোনিয়ামটা নিয়ে বের হতেই আম্মু বললো-
__”এবার ঘরে বসে কা কা করে ছেলেটার কানের পর্দা ফাটা। যেনো সে তোর প্যানপ্যানানি আর এজন্মে শুনতে না পায়। এতে ছেলেটা বেঁচে যাবে।”
আম্মুর কথা শুনে মেজাজ খুব গরম হয়ে গেলো। আজ আর কোনো কথা ভেতরে রাখবো না, সব বলবো। যা হয় হবে। কোমরে আঁচল গুজে বললাম-
__”তোমার প্যানপ্যানানি যে আব্বুর কানের পর্দা ফাটায় সে খেয়াল আছে তোমার?”
আম্মু চেচিয়ে উঠে বললো-
__”কি বললি?”
__”যেটা শুনেছো সেটাই বলেছি।”
__”আমি তোর মতো কা কা করি?”
__”তুমি তো সারা দিন কুহু কুহু করো আর সেটাতেই আব্বুর কানের পর্দা পাতলা হয়ে গেছে। কখন যেনো বেলুনের মতো ঠুস হয়।”
আম্মু রেগে উঠে বললো-
__”আমার স্বামীর কানের পর্দা ফাটাচ্ছি তাতে কার কি?”
__”আব্বু তোমার স্বামী আর সীমান্ত তো পাড়া পড়শীর স্বামী তাই না?”
__”ও ভুলেই তো গেছি যে সীমান্ত তোর স্বামী।”
__”এখন থেকে মনে রেখো যে সে আমার স্বামী। আর আমাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে একদম নাক গলাতে আসবা না।”
__”যাক বাবাহ স্বামী বলে যে স্বীকার করেছিস তাতেই আমি খুশি।”
__”কিহ?”
__”কিছু না তো।”
আমি তো দেখছি মফিজা হয়ে গেছি। কি সব বলছি মাবুদ! হঠাৎ হুড়মুড় করে যুথী চা হাতে আমার সামনে এসে বললো-
__”বন্ন আফা চা খান।”
মনে মনে বললাম, এতক্ষণ পরে চা আনা হয়েছে। চাই না এমন চা। আর মনে হচ্ছে আমি এবাড়ির গেস্ট। আসলেই সবাই খুব খারাপ। এদের সবাইকেই পুলিশে ধরিয়ে দেয়া উচিত। সব কথা মনেই চেপে রেখে রেগে উঠে বললাম-
__”তুই খা তোর চা।”
যুথী চোখ কপালে তুলে বললো-
__”এমা এতক্ষণ ধইরা তো চায়ের লাইগাই উয়ার করতাছিলেন।”
আমি অবাক হয়ে বললাম-
__”উয়ার মানে?”
__”উয়ার মানে যুদ্ধু।”
আমি বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম-
__”দোহাই লাগে ইংরেজী আর বলিস না যুথী। তোর ইংরেজী শুনলে আমার পাহাড় থেকে সাগরে ঝাপ দিতে মন চায়।”
__”হুই বন্ন আফা?”
__”হুই মানে?”
__”হুই মানে ক্যা?”
__”হুই না হোয়াই। এই মেয়ে তুই থামবি?”
সে বেশ ভাব নিয়ে বললো-
__”আফা ভুল ইনলিশই কয় জন পারে কন? ধরেন, আপ্নেই পারেন না।”
__”আমার পারতেও হবে না। এবার তুই এসব রেখে হারমোনিয়ামটা ওবাড়িতে দিয়ে আয়।”
__”উকি।”
__”উকি মানে? উকি দিতে কখন বললাম?”
__”উকি মানে আইচ্ছ্যা।”
আমি রাগে চোখ বড় বড় করে বললাম-
__”যুথী তোর মরণ ঘনিয়ে এসেছে বলে দিলাম।”
সে মাথা নিচু করে করুণ মুখে বললো-
__”আর কমু না বন্ন আফা। তওবা তওবা।”

শ্বশুরবাড়ি ফিরে দেখি লাট সাহেব ওয়াশরুমে যাচ্ছে আর আসছে। বুঝলাম মরিচ থেরাপি খুব কাজে দিয়েছে। এবার তাকে রিয়্যালী কাঁচকলার তরকারী খাওয়াতে হবে। তবে এবার কাঁচকলার সব আইটেম রান্না করবে সম্মানীয় দয়ালু বর্ণিতা; যে লবণ তেলের মায়ায় ওসব তরকারীতে দেয় না। কিচেনে যাই, এখনই লাট সাহেবকে কাঁচকলার স্যুপ খাওয়াবো। অসুস্থ স্বামী বলে কথা, উফ্ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।

কিচেনে যাবার আগে ইউটিউবে ঢুকলাম কাঁচকলার স্যুপের রেসিপি দেখার জন্য। কিন্তু রেসপি পেলাম না। এসব বোধ হয় মানুষ খায় না। কি যে করি! আচ্ছা বর্ণিতাই রেসিপি বানাবে। কিচেনে গিয়ে নিজের রেসিপিতে কাঁচকলার স্যুপ বানালাম। ঝাল দিলে তো মুখে দিয়েই ফেলে দেবে। তাই ঝাল দিলাম না। এটা না হয় একটু টেস্টি করেই বানাই। কারণ কাঁচকলা এমনিতেই স্বাদহীন। দারুণ করে স্যুপ বানালাম কিন্তু চেকে দেখার সাহস পেলাম না। কাকে দিয়ে ধেড়ে খোকাকে খাওয়াবো সেটাও একটা ফ্যাক্ট। আসলে মাকে তো বার বার বলা যায় না। হাজার হলেও বাবু তার নিজের ছেলে, কুখাদ্য ছেলেকে খাওয়াতে পরাণ পুড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই নিজেই রুমে নিয়ে গেলাম। মাবুদ জানে সে খাবে কি না। ওর সামনে স্যুপের বাটি ধরে বললাম-
__”এই যে আপনার খাবার।”
__”কি এগুলো?”
__”স্যুপ।”
__”স্যুপ কেনো?”
__”আপনি অসুস্থ তাই।”
__”সব হয়েছে আপনার জন্য।”
__”আমি কি করেছি।”
__”কুখাদ্য রান্না করে খাইয়েছেন।”
এই টুকু বলেই সে ওয়াশরুমে দৌড় দিলো। আহারে বেচারা বাবুতা।
ওয়াশরুম থেকে সে ফিরতেই বললাম-
__”এটা খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। খেয়ে নিন।”
__”আপনার হাতের খাবার আমি খাবো না। মরে গেলেও না।”
আমি ইনোসেন্ট মুখ করে বললাম-
__”বিশ্বাস করেন এটা খুব ভালো।”
__”কিসের স্যুপ এটা?”
কি বলি এখন? যদি বলি কাঁচকলার স্যুপ তাহলে তো খাবে না। ফিক করে হেসে বললাম-
__”এটা ঔষধি স্যুপ।”
সে হতবাক হয়ে বললো-
__”এমন স্যুপের নাম এর আগে জীবনেও শুনিনি।”
এই রে এখন কি বলে ম্যানেজ করবো? সত্যিই তো এমন নামের কোনো স্যুপ নেই। আর থাকতেও তো পারে। সে আর আমি পৃথিবীর সব কিছুই জানি নাকি? ইন্ডিয়ানরা আয়ুর্বেদিক স্যুপ আবিষ্কার করতেই পারে। আর যদি কেউ এমন স্যুপ না আবিষ্কার করে তবে বর্ণিতা এই বান্দরের জন্য এটা আবিষ্কার করেছে। বললাম-
__”আসলে এখন তো সব কিছুই আয়ুর্বেদিক হয়েছে তাই স্যুপও আয়ুর্বেদিক হয়েছে। মানুষ কি কি সব আবিষ্কার করছে আল্লাহ! আমিও তো ঔষধি স্যুপ দেখে অবাক হয়েছি। নিন খেয়ে নিন।”
সে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। তার নয়ন যেনো বলছে, ‘এই বখাইট্টা মাইয়া ক কি অকামের ফন্দি আটছস?’ সে বললো-
__”কি মতলব আপনার ঠিক করে বলুন তো?”
আমি অবলা নারীর মতো তাকিয়ে বললাম-
__”মতলব নেই তো। কোনোই মতলব নেই।”
__”আমাকে নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। ওসব আয়ুর্বেদিক স্যুপ আপনি খান। সুন্দরী হয়ে যাবেন।”
__”আমি কি অসুন্দরী নাকি?”
__”হ্যাঁ।”
__”কিহ?”
কত বড় সাহস আমাকে অসুন্দরী বলে! ডায়রিয়া হয়েছে ঠিক হয়েছে। খাওয়াবো না আয়ুর্বেদিক স্যুপ। সে ওয়াশরুমেই রাত কাটাকগে হুহ। সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে বললো-
__”আমার পেটের ভেতরে ভালো লাগছে না। প্লিজ একটু খ্যান্ত দিন।”
কাঁচকলার স্যুপ খাওয়াতে না পেরে আমার মনটাই ভেঙে গেলো। এত কষ্ট সব জলে গেলো। ফাজিল বান্দর একটা।

অনেক রাত ধরেই ওয়াশরুমের সাথে খোকাবাবুতার প্রণয় অভিসার চললো। প্রথম দিকে মনে মনে আমার হাসি পেলেও পরে কেনো জানি মায়া লাগলো। এমন করে অসুস্থ হোক এটা তো চাইনি। হালকা আত্মগ্লানি অনুভব হলো। আত্মগ্লানি কেনো হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছি না। বাধ্য হয়ে বিছানা থেকে নেমে স্যালাইন বানিয়ে আনলাম আর সাথে ঔষধও। গ্লাস সামনে ধরতেই সে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো-
__”কি মিশিয়ে এনেছেন?”
এ ছেলে তো দেখছি আমাকে চরম অবিশ্বাস করে। বউকে এমন অবিশ্বাস করা একদম উচিত নয়। মেজাজ গরম হয়ে গেলো। রাগ করে বললাম-
__”বিষ মিশিয়ে এনেছি। খেয়ে ঘুমিয়ে যান তো। আপনার এই ওয়াশরুম মুখি অভিযান আমার আর সহ্য হচ্ছে না।”
সে রোমান্টিক চোখে আমার দিকে তাকালো। ওমাগো! এই ছেলে এমন করে তাকিয়ে আছে কেনো? কাউকে বিষ খেতে বললে মনে মনে আনন্দ লাগে নাকি? নাকি বিষ খেতে বললে মানুষ রোমান্টিক সাগরে পতিত হয়? আগে জানলে তো মধু খাওয়ার কথা বলতাম। না জানি মধু খাওয়ার কথা বললে সে কি কি করতো! ওর তাকানো দেখে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে গলা ভিজাতে এ স্যালাইন আমাকেই খেতে হবে। আমার কপালে এত বিপদ কেনো মাবুদ? অন্যের ভালো করতে গিয়ে নিজের চরম খারাপ হবে নাকি? সে আমার মুখ বরাবর তার মাথা ঝুকিয়ে রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রেম প্রেম স্বরে মানে হালকা ফিসফিস স্বরে বললো-
__”বিষ খেলে ঘুম আসে নাকি? আগে তো জানতাম না ম্যাম।”
এই রে এই ছেলে এমন ইন্টু মিন্টু ভাব নিয়ে কথা বলছে কেনো? আর আমাকে বখাটে মেয়ে না বলে ম্যাম কেনো বলছে? এমন অসুস্থ শরীরেও সিনেমার নায়কদের মতো তার এমন প্রেমঝরা দৃষ্টি দেখে আমার একটু সন্দেহ হচ্ছে। এ ছেলেকে তো কোনো বিশ্বাস নেই। কখন যেনো সে আমার উপর ঠাস করে পড়ে বেহুশ হবার নাটক করবে। এই অভিনেতা লাট সাহেবকে তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। আমি শান্ত স্বরে বললাম-
__”হ্যাঁ বিষ খেলে ঘুম আসবে। কথা না বাড়িয়ে বিষ টুকু খেয়ে নিন।”
সে আরো তীব্র রোমান্টিক চোখে তাকিয়ে বললো-
__”যদি ঘুম না এসে মাতাল হয়ে যাই?”
ওহ নো! এই বান্দরটা এসব কি আবোল তাবোল বলছে? কেনো যে বিষ খাওয়ার কথা বললাম! সবাই আমাকে বখাটে বলে, এই লাট সাহেব কম যায় নাকি? এ তো দেখছি আসল বখাটে। আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম-
__”কি সব পাগলের মতো আবোল তাবোল বলছেন? মাথা কি আপনার পুরাই গেছে নাকি? বিষ খেলে কেউ মাতাল হয় নাকি?”
__”বিষ খেলে যদি ঘুম আসতে পারে তাহলে তো মাতালও হতে পারে।”
কথা তো ঠিকই বলেছে। বিষ খেলে যদি ঘুম আসে তাহলে মাতাল তো হতেও পারে। কি সব গাধীর মতো বলে ফেঁসে গেছি আমি! এখন যদি এই বান্দর মাতাল মাতাল ভাব নেয়, মানে অভিনয় করে তাহলে আমার কি হবে? কে বাঁচাবে আমাকে? নাহ, এ ছেলে একদম সুবিধার না। ম্যানেজ করার জন্য বললাম-
__”মাতাল হবেন না, ঘুম আসবে গ্যারান্টি। এখন খেয়ে নিন তো।”
সে অভিমানী মুখভঙ্গিমায় বললো-
__”না খাবো না।”
ওরে ছেলে! এমন ঢং করছে যেনো আমি তার প্রেমিকা। সে খেতে চাইবে না আর আমি বলবো, “ওলে বাবুতা এসব বলতে হয় না তো! খাও সোনাপাখিতা আমার। এই তো এখন আমার বাবু স্যালাইন আর ডায়রিয়ার ওষুধ খাবে। খাও খাও বাবুতা খাও।” আর এসব শুনে সে আহ্লাদে আঠারোখান হয়ে স্যালাইন আর ওষুধ খাবে। হুহ, বর্ণিতা এসব জীবনেও করবে না বান্দর ছেলে। 
আমি আর কোনো কথা না বলে ওর মুখে ঔষধ গুজে দিয়ে স্যালাইনের গ্লাসটা মুখে ঠেসে ধরলাম। নিরুপায় হয়ে সে ঔষধসহ ঢকঢক করে স্যালাইন খেলো। আমি প্রশান্তির শ্বাস নিয়ে বললাম-
__”এখন লক্ষী ছেলের মতো ঘুমিয়ে যান।”
আমার কথা শুনে সে কিছু না বলে হা করে আমার দিকে চেয়ে রইলো। “লক্ষী ছেলে মতো” এই তিনটা শব্দতে সে আর আমি দু’জনই অবাক হয়েছি। আমার সাথে যে আমার কথা ম্যাচিং হয়নি সেটা আমিও বুঝতে পেরেছি। আমি নিজেও বুঝলাম না যে আমি তাকে লক্ষী ছেলে কেনো বললাম আর কেনোই বা তাকে স্যালাইন খাওয়ালাম!

সে আমার পাশে শুয়ে আমার হাত ধরতেই আমি চমকে উঠলাম। ওমাগো! এই ছেলে হাত কেনো ধরলো? স্যালাইন খেয়ে সত্যিই মাতাল হলো নাকি? এখন আমার কি হবে রে? আমি এক রকম ভয় পেয়েই বললাম-
__”এই আপনি হাত ধরেছেন কেনো? ছাড়ুন বলছি। নইলে কিন্তু আমি চেচিয়ে মাকে ডেকে আনবো।”
আমার হুমকি শুনেও সে কোনো রকম ভয় না পেয়ে শান্ত স্বরে বললো-
__”আম্মু রুমে এলে কি বলবেন শুনি?”
তাই তো! কি বলবো? যা ঘটেছে তাই বলবো। বললাম-
__”বলবো, মা দেখো তোমার ছেলে আমার হাত ধরেছে।”
সে খুব জোরে শব্দ করে হেসে বললো-
__”বখাটে মেয়েটা অনেকটাই অবুঝ দেখছি।”
__”কিহ?”
সে আমার হাতটা তার বুকের উপর রেখে বললো-
__”মাইন্ড করো না প্লিজ! আমার শরীর খারাপ হলে আমি আম্মুর হাত ধরে ঘুমাই। এখন তো বিয়ে করেছি তাই বউয়ের হাত ধরে থাকবো।”
এই রে এই ছেলেকে তো অসুস্থ হতে দেয়া যাবে না। অসুস্থ হলেই তো সে আমার হাত তার বুকে চেপে ধরে শুয়ে থাকবে দেখছি। অসুস্থ মানুষ, কিছু তো বলতেও পারছি না। ধুর কি যে করলাম! বার বার নিজের জালে নিজেই আটকে যাই। আর সে আমাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ সম্বধন করলো কেনো? এ ছেলের তো মতলব অশ্লীল মনে হচ্ছে। হুট করে সে বললো-
__”তুমি বরং আরেকটা হাত দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।”
যা ভেবেছি তাই ঠিক হচ্ছে। আসলেই তো দেখছি এই ছেলে মহাফাজিল আর রিয়্যাল বখাটে। আমি চোখ কপালে তুলে বললাম-
__”এই কেনো কেনো?”
কষ্ট পাচ্ছি এই টাইপের মুখ করে সে বললো-
__”আমার কেমন যেনো লাগছে। আর আমি অসুস্থ হলে আম্মু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।”
ওহ নো! আমি এসব পারবো না। এমনি কি আর ধেড়ে বুড়ো বাবু বলি! ধাইড়া বুইড়া বান্দর একটা। আমাকে ফাঁসাচ্ছে। এর হাত থেকে আমাকে কে উদ্ধার করবে এখন? প্লিজ হেল্প মী আল্লাহ! 
__”কি হলো দাও!”
আমি মুখ ভেংচিয়ে বললাম-
__”আমি এসব পারি না।”
সে দুখী দুখী মুখভঙ্গিমায় বললো-
__”আজ তোমার কারণেই আমি অসুস্থ। আজ আমার ভালোমন্দ কিছু হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে তুমি?”
সত্যিই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। কিছু তো করার নেই। বাধ্য হলাম বান্দরের মাথায় হাত বুলাতে।
__”আচ্ছা দিচ্ছি।”
__”চুলে একটু চাপ দিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলাও।”
কেমন বান্দর ছেলে! আমাকে চাকরানী পেয়েছে। রাগে আমার মাথায় আগুন ধরেছে। তওবা করছি আর জীবনেও এমন কিছু করবো না যেটাতে লাট সাহেব অসুস্থ হবে।
__”বার বার থামছো কেনো? কি ভাবছো নিশ্চুপ ভাবে?”
কি আর ভাববো খোকা? তোমার খোকাগিরি দেখে ঠাডা মার্কা টাস্কি খেয়ে নিশ্চুপ আছি। আমাকে তো দারুণ ফাঁদে ফেলে মজা নিচ্ছো তুমি। তোমার ডায়রিয়া না ছাই হয়েছে। সব আমি বুঝে গেছি। আবার ফাঙ্গা নিলে বর্ণিতার সাথে। সব শোধ নেবো আমি, শুধু সকালটা হতে দাও। সে বললো-
__”কি হলো? হাত আর মুখ দুটোই চুপ কেনো? আমি ঘুমাবো না?”
__”আচ্ছা চুল টানছি।”
__”চুল তো টানতে বলিনি। বলেছি হালকা চাপতে।”
__”আমি হালকা টালকা পারি না।”
আমি জোরে জোরে চুল টানতে শুরু করলাম। চুল সব ছিড়ে যায় যাক। তার হাউস তো মিটুক। ফাজিল বান্দর ছেলে একটা!
__”আরে কি করছো? লাগছে তো! সব চুল ছিড়ে ফেলবে নাকি?”
__”হ্যাঁ সব চুল ছিড়ে ফেলবো।”
__”এমন করে না মেয়ে। স্বামীর সাথে কেউ এমন করে বলো?”
ওরে ছেলে… এসব বলে আমাকে পটানো হচ্ছে? আমি পটবো না, কিছুতেই না।
__”কিসের স্বামী? এই বিয়েটাই তো আমি মানি না।”
__”দেখো তুমি কিন্তু আমাকে বিষ খাইয়ে মাতাল করেছো। এখন যদি এসব বলো তাহলে কিন্তু মাতাল মাতলামি শুরু করবে।”
ওর কথাতে শুনে আমি শক খেয়ে স্তব্ধ হয়ে চুল টানাটানি বাদ দিয়ে বললাম-
__”ঠিক আছে, ঠিক আছে আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। মাতলামি করতে হবে না।”
মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই সে ঘুমিয়ে গেলো। বান্দরটা আমার এক হাত বুকে চেপে ধরে ঘুমাচ্ছে আর আরেক হাত দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। সে তো ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু মাতলামির টেনশনে আমার চোখে ঘুম নেই। আব্বু কেনো তুমি এমন একটা বান্দর আমার মতো একটা মুক্তার গলায় ঝুলিয়ে দিলে? তোমার বর্ণিতার হাল ভীষণ করুণ।

লাট সাহেব ঘুমাচ্ছে আর আমি মাথায় হাত বুলিয়েই চলেছি। এর চেয়ে করুণ দৃশ্য পৃথিবীতে কি আর দ্বিতীয়টা আছে? মাথা থেকে হাত একটু সরালেই সে জেগে যাচ্ছে। আর তার বুকে আমার যে হাতটা চেপে ধরে রেখেছে সেটা তো নড়ানোর উপায়ই নেই। অসহ্য লাগছে আমার। ইচ্ছে করছে তার সব গুলো চুল গুলো ছিড়ে তাকে চুলহীন করে ফেলি। কিন্তু সে উপায়টিও নেই আমার। আমি যে কি জ্বালায় পড়ে আছি তা শুধুই আমিই জানি। এদিকে একটু ঘুম ঘুম ভাব হতেই মনে পড়ছে যদি জেগে উঠে সে মাতলামি করে! মাতলামি সম্পর্কে সিনেমাতে কত কি দেখেছি। দরজায় লাথি দেয়া, অকথ্য গালিগালাজ করা, রুমের জিনিস পত্র ছুড়ে ফেলে দেয়া, এমনকি মারপিটও করে মানুষ মাতাল হয়ে। এসব মনে হলেই ভয় লাগছে। লাট সাহেব যদি এসব করে তাহলে তো লংকা কান্ড শুরু হবে। দেখা গেলো তার মাতলামি দেখে আমি রুমে সাইক্লোন শুরু করলাম আর সেই সাইক্লোনে ওর কিছুই হলো না, যা হবার আমার হলো। তাই আমি লংকা কান্ড ঘটাতে চাইছি না। কি দুঃখে যে বিষ খাওয়াতে গেলাম, মানে স্যালাইন খাওয়াতে গেলাম! সারারাত সে ওয়াশরুমের সাথে প্রণয় অভিসার করতো তাতে আমার কি? আমার যে কেনো এমন ন্যাকা দরদ শুরু হলো সেটা ভেবেই রাগে নিজের গালে নিজেরই চড়াইতে মন চাচ্ছে। আর তার উপরও ভীষণ ভীষণ রাগ হচ্ছে। এমন ন্যাকামি আমার সত্যিই খুব অসহ্য লাগে। সকালটা আগে হোক তারপর ঐ বান্দরটার স্বামী স্বামী ভাব নেয়া দেখে নেবো। কারো কাছে যে একটু হেল্প চাইবো, কে হেল্প করবে আমায়? আব্বু ছিল একমাত্র আমার সাপোর্টার, সেও এখন ঐ লাট সাহেবের পক্ষে। সবাইকে একসাথে জেলে দেয়া উচিত। জামাই শ্বশুর শাশুড়ি একসাথে জেলে বসে খোশগল্প করবে। যত্তোসব!
এসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই কখন যেনো ঘুমিয়ে গেছিলাম। ভোর বেলা ঘুম ভেঙে দেখি আমার হাত বান্দরটার বুকে। আস্তে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। সূর্য উঠে আমাকে রক্ষা করলো। রুম থেকে বেরিয়ে তো আগে নিজেকে উদ্ধার করি! তারপর লাট সাহেবের সাধের ঘুমে জল ঢালবো। না না জল না, বালু ঢালবো। না না গরম ছাই ঢালবো।

কয়েক দিন ধরে গান গাই না। গায়িকা এমন হলে হবে নাকি? এমন করলে তো বখাটে গিরিতে মরিচা ধরে যাবে। এটা তো হতে পারে না কিছুতেই। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি বেলকোণে দাড়িয়ে চিল্লিয়ে আব্বুকে ডাকলাম। আব্বু হন্ত দন্ত হয়ে বেলকোণে এসে হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলেন। বললাম-
__”তবলা আনো।”
আব্বু আসামীর মতো মুখ করে বললেন-
__”মা আমার একটা কথা শোন!”
__”কোনো শোনাশুনি নাই। আমি এখন গান গাইবো আর তুমি তবলা বাজাবে। যাও তবলা আনো।”
__”দেখ মা আমার আজ গানে মন নেই।”
__”মন তো লাগবে না, লাগবে তোমার হাত দুটো, যা দিয়ে তবলা বাজাবে। যাও তবলা আনো।”
আব্বু দুখী দুখী মুখ করে বললেন-
__”তোর আম্মু বলেছে আমি তবলা বাজালে সে নাকি বাপের বাড়ি চলে যাবে।”
__”গেলে যাবে, তাতে কি? এই বয়সেও তুমি এত বউ বউ করো কেনো? আম্মু চলে গেলে আমি আবার তোমাকে বিয়ে দেবো।”
কথা গুলো আমি চিৎকার করে বললাম যেনো আম্মু শুনতে পায়।
__”আস্তে বল আস্তে বল। তোর আম্মু শুনতে পেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।”
__”কিচ্ছু হবে না। যাও তবলা আনো।”
হঠাৎ আম্মু এসে সামনে দাড়ালো। ওয়াও ঢিল লেগেছে তাহলে। আমি কিছু না বলে হারমোনিয়ামে মন দিলাম। আমার ভাব খানা এমন যেনো আমি কোনো জনপ্রিয় সঙ্গীত শীল্পি। খুন করে ফেলবো এমন টাইপের মুখভঙ্গিমায় আম্মু বললো-
__”কাকে আবার বিয়ে দিবি?”
ডোন্ট কেয়ার মুখভঙ্গিমায় আমি বললাম-
__”আমার আব্বুকে।”
__”তোর এত বড় সাহস?”
__”তুমি বাপের বাড়ি চলে গেলে বিয়ে দেবো বলেছি। না গেলে দেবো না।”
__”আমি বাপের বাড়ি গেলেই তাকে বিয়ে দিতে হবে?”
__”হ্যাঁ হবে। আর যাও তো তাড়াতাড়ি। আমরা এখন গান গাইবো। কুইক বাপের বাড়ি চলে যাও।”
__”পেটের মেয়ে যে এত শত্তুর হয় তা এই প্রথম দেখলাম।”
__”দেখা হয়েছে এখন যাও।”
__”এত কষ্ট করে সংসার সাজিয়েছি ঘরে সতীন আনার জন্য নাকি? যাবো না বাপের বাড়ি।”
__”যাবে যাবে। আব্বু এখন তবলা বাজালেই তুমি দৌড়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে। আমি সব জানি।”
আমি আব্বুর দিকে তাকিয়ে বললাম-
__”কুইক তবলা আনো।”
আম্মু রেগে উঠে বললো-
__”যা ইচ্ছে কর তোরা।”
কথাটা বলেই সে বেলকোণ থেকে ভেতরে চলে গেলো। আমার খুব হাসি পেলো আম্মুর ভাব দেখে। পৃথিবীর সব মেয়ে গুলো একটা দিক দিয়ে কি করে যেনো একই রকম। তারা সব ছাড়লেও স্বামীকে কখনো ছাড়ে না। স্বামীর এক চিমটি ভাগ দিতেও পারে না তারা। এটা নিঃসন্দেহে চরম স্বার্থপর ভালোবাসা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি একজন অনুভূতিহীন মানুষ। আমি চেতনায় ফিরে আব্বুকে বললাম-
__”আব্বু দাড়িয়ে কেনো আছো? যাও তবলা আনো। নইলে কিন্তু তবলা না বাজানোর দায়ে আমি আম্মুকে বাপের বাড়ি রেখে আসবো।”
আব্বু অসহায়ের মতো রুম থেকে তবলা এনে বসলো। ওবারান্দায় আব্বু তবলা বাজাচ্ছে আর এ বারান্দায় আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শুরু করতেই আব্বু বললেন-
__”থাম আগে আমি গান গাই।”
__”ওকে।”
আব্বু গান ধরলেন-
“ও আমি ফাঁইছা গেছি, আমি ফাঁইছা গেছি, ফাঁইছা গেছি মাইনকার চিপায়।
আমার এই দিলের চোট বুঝে না কোনো হ্লায়….”
এই টুকু গাইতেই হঠাৎ আব্বু গান থামিয়ে করুণ মুখ করে তাকিয়ে রইলেন। আব্বুর করুণ মুখের ভাষা আমি বুঝতে পারলাম না। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
__”আব্বু থেমে গেলে কেনো? গানটা তো হেব্বি।”
আব্বু অসহায়ের মতো বললেন-
__”এবার তুই গান গা মা। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হতে চাইছে না।”
__”না তুমিই গাইবে। গাও বলছি।”
ধমকের ঠ্যালায় বাধ্য হয়ে আব্বু গান শুরু করলেন-
“দক্ষিণ দিগন্তে সীমান্ত উঠেছে চক্ষু লাল, চক্ষু লাল, চক্ষু লাল…”
আমি বললাম-
__”আব্বু দক্ষিণ দিকে সীমান্ত উঠে? আর সীমান্ত উঠবে কেনো? উঠবে তো সূর্য! কি সব ভুলভাল গাইছো!”
আব্বু ইনোসেন্ট মুখভঙ্গিমায় আমার দিকে নিশ্চুপ চেয়ে রইলেন। আব্বুর মুখভঙ্গি যেনো বলছে, “আমি নির্দোষ, আমি নির্দোষ।”
__”কি হলো আব্বু? আজ তোমার কি হয়েছে? আরেহ বাবাহ আম্মু কোত্থাও যাবে না। তুমি নিশ্চিন্তে গান গাও তো!”
__”আসলে আমি সব ভুলে গেছি রে বর্ণ। তুই বরং দক্ষিণ দিকে একটু তাকিয়ে দেখ।”
আমি হতবাক হয়ে বললাম-
__”দক্ষিণ দিকে কেনো তাকাবো?”
__”একটি বার তাকা মা প্লিজ!”
আমার পেছন সাইডটা হলো দক্ষিণ দিক। আমি পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি লাট বাবু খাম্বার মতো দাড়িয়ে আছে। হারমোনিয়াম বাজানোর তালে আমি টেরই পাইনি যে সে পেছনে দাড়িয়ে আছে। আর ওর চোখ দুটো সত্যিই লাল হয়ে আছে। এত সকালে শান্তির ঘুম ভেঙে দিয়েছি চোখ তো রক্ত বর্ণ হবেই। ঠিক করেছি, বেশ করেছি। আমাকে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে নেয়া, আমার হাত বুকে চেপে রাখা, মাতলামি করার হুমকি দেয়া, সব কিছুর শোধ নেবো আমি। বর্ণর সাথে ফাঙ্গা নেয়ার ফলাফল ভয়াবহ হবেই। মনে মনে বললাম, দাড়িয়ে আছো থাকো, আমি গান গাই তুমি দাড়িয়ে থেকে শুনো ধেড়ে বাবু। গান গাওয়ার জন্য সামনে মুখ ঘুরিয়ে দেখি তবলা আছে আব্বু নেই। এটা কি হলো? মেয়েকে একটা বাঘের মুখে রেখে আব্বু এভাবে পালিয়ে গেলো! এটা কেমন পিতা মাবুদ! ঠিক আছে আজ খোকাবাবুকে মাফ করে দিলাম, আজ তাকে গান শোনাবো না। আমি হারমোনিয়ামটা রেখে উঠে দাড়ালাম। সে দরজা জুড়ে দুই হাত মেলে দিয়ে দাড়িয়ে আছে। রুমে যেতে হলে ওর হাত সরিয়ে যেতে হবে। আমি বেশ ভাব নিয়ে বললাম-
__”হাত সরান ভেতরে যাবো।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
__”কা কা শেষ হলো মহারাণীর?”
__”গানকে কা কা বলবেন না।”
__”কাউয়া সঙ্গীতকে কা কা-ই বলে। আগে নিজের বাপের বাড়ি থেকে কা কা করেছো তাই কিছু বলিনি। আমাদের বাড়িতে এসব চলবে না। হারমোনিয়াম অক্ষত রাখতে চাইলে এই মুহূর্তে ওবাড়িতে রেখে এসো।”
__”এই আপনি আমাকে থ্রেড করছেন নাকি?”
__”সাবধান করছি।”
__”আমার সাধের হারমোনিয়ামে যদি টাচ করেন তাহলে ঘরের সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দেবো কিন্তু।”
__”সিন্ধুকে ঢুকিয়ে রাখো তোমার সাধের হারমোনিয়াম। আমার চোখের সামনে থাকলে ওটা আস্ত থাকবে না।”
__”আমিও দেখতে চাই আস্ত না থাকে কি করে।”
কথাটা বলে তাকে ঠেলে সরিয়ে রুমে ঢুকলাম। এমন ছেলের সাথে কে সংসার করবে? আমার সব কিছুতেই তার বিরোধিতা। অবশ্য আমার কাজ কর্ম তো সুবিধার নয়। না হোক সুবিধার তাই বলে এমন করবে নাকি? ফাজিল বান্দর একটা। আর এই ছেলের কি প্রশংসা আমার বাবা মায়ের কাছে। আজকেই এর হেস্ত নেস্ত করবো।

চলবে……………………………………….



About Author


Administrator
Total Post: [356]

Leave a Reply




Comment: (Write Something About This Post..)

সম্পর্কযুক্ত গল্প

 
© Copyright 2019, All Rights Reserved By BdStory24.Com
About Us || Copyright Issues || Terms & Conditions || Privacy Policy