Home Login Register

Naw Story Will Update Regularly......

বখাটে বউ [২য় অংশ]


প্রিয় পাঠক আমাদের টিম বিনা স্বার্থে আপনাদের জন্য গল্প আর্কাইভ করে, আপনাদের নিকট বিশেষ অনুরোধ যে, বিডিস্টোরি২৪ ডটকম এর স্বার্থে আপনারা এডগুলোতে ক্লিক করবেন, তবে দিনে একবারের বেশী না, যদি আমাদের সাইটকে ভালোবেসে থাকন তো.......
Home / Uncategorized / বখাটে বউ [২য় অংশ]

Sanju › 4 months ago

লেখিকা: সাজিয়া আফরিন স্বপ্না

ইদানিং আমার আম্মু পাশের বাসার বাবুর প্রশংসার গীত শোনায়। এমন ছেলে নাকি পৃথিবীতে আর দুটো নেই। আম্মু তো এমনিতেই সব কিছু বেশি বেশি বলে তারপর উপরে এটা তার সদ্য নতুন বান্ধবীর ছেলে। সব মিলেই ঐ বাবুর গীত শুনতে শুনতে আমার কানের পর্দা ফাটার উপক্রম হয়েছে। সন্ধ্যার কফির সাথে আজকাল অন্য খাবারের দরকার হয় না। পাশের বাসার বাবুর প্রশংসা কফিতে চুবিয়ে খেয়েই আমার পেট ভরে যায়। আব্বুকে তো তাও চোখ পাকিয়ে থামাতে পারি কিন্তু আম্মুকে চোখ পাকালে সেও উল্টা ডাবল চোখ পাকায়। কি যে জ্বালায় পড়েছি খোদা! বাড়িতে থাকাই যেনো দুষ্কর হয়ে গেছে। আমার তো রোজ আম্মুর সাথে ঝগড়া হচ্ছে ঐ বুইড়া বাবুকে নিয়ে।
সন্ধ্যায় কফি নিয়ে বসে টিভি অন করে সদ্য বসেছি ওমনি আম্মু জুড়ে দিলেন রেডিও।
__”জানিস বর্ণ ছেলেটা আসলেই খুব ভদ্র। সবাইকে কত্তো সম্মান করে।”
__”না তো জানি না। সে তো কখনো আমাকে সালাম টালাম করেনি তো তাই জানি না।”
__”তোকে সালাম করবে কেনো? তুই কি মুরব্বী নাকি?”
__”ভাবলাম অতি ভালো ছেলেরা হয়তো ছোট ছোট ছেলে মেয়েদেরও সালাম করে। সেখানে আমি তো খুব ছোট না।”
__”তোর সব কথাই আসলে ত্যাড়া ব্যাকা। একটু সোজা ভাবেও তো কথা বলা যায়।”
__”আর ঐ বাবুটার সব কিছুই সোজা তাই না? ওর প্রশংসা তুমি পানিতে গুলিয়ে খাও, খবরদার তার প্রশংসা আমার কফিতে চুবাতে আসবে না।”
__”নিজের তো কোনো গুণ নেই, অন্যের গুণ শুনলে তো গায়ে জ্বালা করবেই। সবই বুঝি।”
__”বুঝেই যখন ফেলেছো যে আমার গায়ে জ্বালা করছে তাহলে জ্বালা দিচ্ছো কেনো?”
__”আর কত কাল এমন ছন্ন ছাড়া বখাটে জীবন নিয়ে থাকবি? এবার অন্তত বিয়ে থা করে আমাকে উদ্ধার কর।”
__”ঐ ছেলের গুণকীর্তনের সাথে আমার বিয়ের কি সম্পর্ক?”
__”সম্পর্ক থাক বা না থাক, বিয়ে তো তোর করা উচিত। কত ভালো ভালো বিয়ের সমন্ধ এলো, তুই সব রিজেক্ট করেছিস। কখনো বিয়ে করবি না বলে গো ধরে বসে আছিস। পাড়ায় কত জন কত কি বলে, সব তো আমাকেই শুনতে হয়।”
__”আমাকে বসিয়ে খাওয়াতে যদি তোমাদের সব টাকা ফুরিয়ে যায় তাহলে টেনশন নিও না, আমি চাকরির চেষ্টা করবো। চাকরি হলেই তোমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। কিন্তু বিয়ের কথা বলবে না। মাইন্ড ইট।”
ওখান থেকে উঠে রুমে চলে এলাম। মেয়েদের জীবনটা কেনো এমন? এদের ইচ্ছের দাম নেই কেনো? মেয়েদের সব পরাধীনতার মূলেই কেনো আরেকটা মেয়ে থাকে? কেনো একটা মেয়ে বিয়ে করতে বাধ্য?

আন্টি যে আমাকে পছন্দ করেন সেটা তার হাব ভাবএ প্রকাশ পায়। 
আব্বু যে ঐ বাবুকে খুব পছন্দ করেন তা তার কথাতেই বোঝা যায়। আম্মুরও বাবুর প্রশংসা নিয়ে গীত শোনায়। সব মিলেই বিয়ের কথা শুরু। কিন্তু আমি তো বিয়ে করতে চাই না। যাকে আমি ভালোই বাসি না তার সাথে ঘর বেঁধে কি করবো? আর যতো দূর জানি সেও আমাকে ভালোবাসে না। আমার মাঝে এমন প্রেম ভালোবাসা কাজ করে না। আমি সেভাবে কাউকে ভালোবাসতে পারি না। এমন মজা আমি অনেক ছেলের সাথেই করেছি। জ্বালিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছি। ঐ খোকা বাবুকেও জ্বালিয়ে আমি পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছি। এখানে কোনো ভিন্নতা নেই। যদি ভিন্নতা না-ই থাকে তাহলে বিয়ের কথা কেনো উঠবে?

আন্টি আব্বু আম্মুকে ডেকে বিয়ের কথা বলে গেছেন সন্ধ্যায়। আমি ওরুমে ঢুকার সময় বিয়ের কথা শুনে আর ঢুকিনি, বাহির থেকে সব শুনেছি। কাউকে বুঝতে দিইনি যে আমি সব জেনে গেছি। আমি কাউকে বোঝাতেই পারলাম না যে আমি বন্দী জীবন চাই না, আমি কোনো বন্ধনের দায় নিতে চাই না।
রাতে আব্বু রুমে এসে আমার পাশে বসলেন। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন-
__”আর কত বখাটে মেয়ে হয়ে থাকবি? এবার অন্তত বিয়ে করে সংসারি হ মা।”
আমি মাথা নিচু করে বললাম-
__”না আব্বু। আমি এসব পারবো না।”
__”সে খুবই ভালো ছেলে।”
__”তবুও না আব্বু।”
__”তোর আন্টি নিজে তোকে বউমা বানাতে চাইছেন, তার মনে কষ্ট দিবি?”
__”আব্বু তুমি অন্তত আমাকে বুঝার চেষ্টা করো প্লিজ! আমি তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো বিয়েটা করবো কিন্তু ভালোবাসাহীন একটা সম্পর্কের দায় কত দিন বহন করতে পারবো বলো? ভালোবাসাহীন বিয়েটা কি আসলেই বিয়ে বলো?”
আব্বু আর কিছু না বলে মুখ ভার করে উঠে চলে গেলেন। আমি চুপচাপ বসে রইলাম। আমি নিজের ইচ্ছের বাইরে যেতে যে পারছি না। ছেলে যতোই রাজকুমার হোক না কেনো আমি বিয়ে করে কারো হুকুমে উঠাবসা করার পক্ষপাতী নই। তাই বিয়ে কখনো করবো না এটাই আমার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

কেউ আমাকে বিয়ের জন্য রাজী করাতে পারলো না। বিয়ের কথা শুরু হবার পর থেকেই আমি ছাদে যাই না, বেলকোণ বারান্দাতেও যাই না। এমনকি বেলকোণ বারান্দার দরজাও খুলি না। সেদিন বাতাসে বেলকোণের জানালার পর্দা সরতেই দেখি বাবু দাড়িয়ে আছে। এই প্রথম আমি তাকে অকারণে এখানে দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম। জানি না কেনো সেও বদলে গেছে। আব্বু বললেন সে নাকি সারা বিকেল ছাদে বসে থাকে। আব্বু মাঝে মাঝে ওর সাথে কথা বলেন। ওর মন জুড়ে নাকি বিষণ্নতা ছেয়ে আছে যা আব্বুর অন্তর কাঁদায়।

সন্ধ্যায় আমি পায়ে নেইল পলিশ লাগাচ্ছি আর গান শুনছি। আব্বু রুমে এলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। মুখ দেখে বুঝলাম ভয়ানক মন খারাপ তার। বুঝতে আর বাকী নেই যে, আমার বিয়ে নিয়েই তার মন খারাপ। 
__”কিছু বলবে আব্বু?”
__ “তোর কি অন্তর্দেশ কাঁদে না বর্ণ?”
হঠাৎ আব্বুর মুখে এমন কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বিয়ে করতে চাইছি না বলে অন্তর্দেশ কাঁদতে হবে? আজব সব কথা বার্তা!
__”অন্তর্দেশ কেনো কাঁদবে?”
__”ছেলেটার বিষণ্নতা দেখে আমার হৃদয় কাঁদে। কিন্তু তোর অন্তর্দেশ কাঁদে না কেনো?”
সত্যিই আমার অন্তর্দেশ কাঁদে না। কেনো কাঁদে না তা আমি জানি না। আর জানতেও চাই না। আমি শুধু জানি এই ভালোবাসা-বাসি আমার আসে না। কিছুতেই না। যেদিন অন্তরের গভীরে ভালোবাসা অনুভব করবো সেদিন বিয়ের কথা ভাববো।

যুথী রুম ঝাড়ু দিতে আমার রুমে এসে বললো-
__”বন্ন আফা দুলাভাই কেমন দুখী দুখী মুখ কইরা দাড়াইয়া থাকে। সে মন কয় আপ্নেরে ভালোবাসে। দ্যাখলে সেরাম মায়া লাগে।”
আমি ওর দিকে তাকালাম। দেখলাম সে মুখটা করুণ করে কথা গুলো বলছে। কিন্তু ওর তো দুলাভাই আছে বলে আমার জানা নেই। আর যদিও বা থাকে সে আমাকে ভালোবাসবে কেনো? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
__”দুলাভাই কে? আর সে আমাকে ভালোবাসবে কেনো?”
সে লাজুক মুখ করে বললো-
__”দুলাভাই হইলো সীমান্ত ভাইজান।”
__”সীমান্ত কে?”
__”আরে আফা পাশের বাসার ঐ পোলাডা। যারে আপনে কা কা শোনাইতেন।”
__”কা কা শোনাতাম মানে?”
__”কা কা মানে আসলে গান।”
ও তাহলে ঐ বুড়ো বাবুর নাম সীমান্ত! আমি রেগে উঠে বললাম-
__”ভাষা ঠিক করে কথা বলবি। আর ঐ ছেলে কবে থেকে তোর দুলাভাই হলো?”

সে লাজুক মুচকি হেসে বললো-
__”হ্যার লগে যে আপ্নের বিয়ার কথা চলতাছে হেডাই আমি জানি।”
ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে সীমান্ত নামের বাবুর সাথে যেনো ওর বিয়ের কথা চলছে। সে যাই হাব ভাব করুক তাই বলে সে সীমান্তকে আমার বর মীন করে দুলাভাই কেনো ডাকবে? রেগে উঠে বললাম-
__”বিয়ের কথা হলেই বিয়ে হয় নাকি? খবরদার তাকে আর দুলাভাই বলে ডাকবি না! তাহলে কিন্তু আমি তোর দাঁত ভেঙে দেবো।”
আমার কথা শুনে সে ডোন্ট কেয়ার মুখ করে বললো-
__”আইচ্ছ্যা ভাইঙ্গেন। তাও ডাকুম।”
কথাটা বলেই সে রুম ঝাড়ু না দিয়েই বেরিয়ে গেলো। আজকাল দেখছি যুথীও আমার বিরোধী দল হয়ে গেছে। মেজাজটা সাত সকালে গরম করে দিয়ে গেলো।

আমিও পণ করেছি, কিছুতেই আমি ঐ খোকা বাবুকে বিয়ে করবো না। ঘোষণা দিলাম যে আমি চিরকুমারী থাকবো। কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা হলো কেউ আমার ঘোষণাকে পাত্তাই দিলো না। ইভেন আব্বুও না। সন্ধ্যায় এক সাথে নাস্তা করার সময় আমি বললাম-
__”আমার একটা কথা ছিল।”
কারো কোনো জবাব পেলাম না। তাই আবার কথা শুরু করলাম।
__”আমি চিরকুমারী থাকতে চাই আর এটাই আমার জীবনের একমাত্র ইচ্ছে। আশা করি তোমারা আমার এই ইচ্ছেটাকে সম্মান করবে।”
আব্বু আম্মু যুথী কেউ আমার দিকে না তাকালো, না কথার জবাব দিলো। মনে হলো কেউ কিছু শুনতেই পায়নি। তাদের অদ্ভুত আচরণ দেখে আমি হতবাক হলাম। 

বিস্ময়কর ভাবে আমার মতামতের কোনো তোয়াক্কা না করেই আমার বিয়ে ঠিক করলো সীমান্তর সাথে। আম্মু আর আন্টির মধ্যে এতটাই গভীর বন্ধুত্ব হলো যে তারা চান তাদের এই বন্ধুত্ব যেনো চিরকাল থাকে তাই তারা হুট করেই বিয়ের আয়োজন করলেন। আমি তো রেগে আগুন। আমি কিছুতেই বিয়ে করবো না কিন্তু বাড়িতে সবাই এমন ভাবে চলাফেরা শুরু করলো যেনো আমি একটা আত্মা। আমাকে কেউ না দেখতে পাচ্ছে, না আমার কথা শুনতে পাচ্ছে। আমি একাই চিল্লাচিল্লি করে বাড়ি মাত করি আর বাড়ির সবাই স্বাভাবিক ভাবে চলা ফেরা করে যেনো তারা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না, দেখতেও পাচ্ছে না। এমনকি যুথীও আমার সাথে একই রকম আচরণ করছে। 
বিয়ের তারিখ ঠিক হবার পরেও আমি গো ধরে বসে আছি। ওরা যা ইচ্ছে করুক, আমি “কবুল” শব্দটা উচ্চারণ করবো না, কিছুতেই না, মরে গেলেও না। ধেড়ে বাবু, বুড়ো বাবু, খোকাবাবু, যুবক বাবু, কোনো বাবুকেই আমি বিয়ে করতে চাই না।

সন্ধ্যায় আমি বই পড়ছিলাম হঠাৎ দরজায় নক। দরজা খোলাই ছিল। দেখলাম আন্টি মনমরা হয়ে দরজায় দাড়িয়ে আছেন। মুখ দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে, তার ভয়ানক মন খারাপ। আমি ম্লান হেসে বললাম-
__”দাড়িয়ে কেনো আন্টি? ভেতরে আসেন।”
আন্টি ভেতরে এসে আমার পাশে বসতে বসতে বললেন-
__”আজকাল তো তোর মুখটা দেখা যেনো অমাবস্যায় চাঁদ দেখার মতো। তুই তো আমাদের বাসায় যাওয়া ছেড়েই দিয়েছিস। জানি না আমরা কি এমন অপরাধ করেছি।”
আন্টির গভীর অভিমানের সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পেলাম না আমি। কেনো যাই না সে কথা তো আর বলার অবকাশ নেই, সবাই সেটা জানে। তারপরেও মুখের সামনে ওসব বলা সম্ভব নয় তাই বানিয়ে বানিয়ে বলাটাই বেটার। বললাম-
__”এমন ভাবে কেনো বলছেন? আসলে আমার তো সামনে পরীক্ষা তাই পড়ার চাপে রুম থেকে বের হতে পারছি না। আপনি অন্য কিছু ভাববেন না প্লিজ আন্টি!”
আন্টি আমার কথা বিশ্বাস করলেন কি না জানি না। মুখে দেখে তো মনে হচ্ছে এক চিমটিও বিশ্বাস করেননি। মুখটা গম্ভীর করে বললেন-
__”তোর সীমান্তকে ভাল্লাগে না তাই না? বিশ্বাস কর আমার ছেলেটা খুব ভালো। ওর মতো ভালো ছেলে খুব কমই হয়।”
এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমার কি বলা উচিত তা আমি জানি না। বললাম-
__”আমি জানি আপনার ছেলে খুব ভালো কিন্তু বিয়ে সংসার এই সব আমার ভালোলাগে না। আপনার ছেলে আমাকে নিয়ে কখনো সুখী হবে না।”
__”দেখ বর্ণ আমরা এখানে সারা জীবন থাকবো না। দূরে চলে গেলে তোদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা হয়তো ভুলে যাবো; এটাই মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যদি একটা আত্মীয়তা হয় তাহলে এই সম্পর্কটা মজবুত হয়ে সারাটা জীবন থাকবে। তাই আমি চেয়েছি আমাদের মধ্যে একটা বন্ধনের সম্পর্ক হোক।”
__”আপনার ছেলে আমাকে পছন্দ করে না আর আমিও করি না। ভালোবাসাহীন এই বিয়েটাকে কি আদৌ বিয়ে বলা যাবে?”
__”বিয়ে না হোক, আত্মীয়তা তো হবে। আমি তোর মায়ের মতো তাই তোকে জোর নয় অনুরোধ করে গেলাম।”
আন্টি আর কিছু না বলে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি ভীষণ টেনশনে পড়ে গেলাম। বাড়িতে সবাই আমাকে বয়কট করেছে। জানি না নিজের সিদ্ধান্তে কতক্ষণ অটল থাকতে পারবো।

আমিও কারো ইচ্ছেকে পাত্তা না দিয়ে পালিয়ে যাবার প্ল্যান করলাম। অনেক আগে পালিয়ে গেলে খুঁজে ধরে নিয়ে এসে ঠিক বিয়ে দিয়ে দেবে তাই ভাবলাম বিয়ের দিনেই পালিয়ে যাবো। যে যা ইচ্ছে ভাবুক আই ডোন্ট কেয়ার। কিন্তু কোথায় যাবো সেটাই বুঝে উঠতে পারলাম না। বিয়ে উপলক্ষে সব আত্মীয় স্বজন বিয়ের এক সপ্তাহ আগেই আমাদের বাড়িতে এসেছে, তাহলে আমি কার বাড়িতে যাবো? তবুও পথে ঘাটে ঘুরার জন্য প্রস্তুতি নিলাম কিন্তু কোনো ভাবেই পালানোর সুযোগ পেলাম না। কেউ না কেউ সারাক্ষণ আমার রুমে থাকছেই। এদিকে বিয়ে বিয়ে হৈ চৈএ আমার কয়েক দিন ধরে ঘুম নেই। এত আত্মীয় স্বজন আমাদের যে, ফ্লোরেও জায়গা হচ্ছে না। আমার বিছানা ওদের দখলে। এক কাজিনের বাচ্চাওয়ালা বউ তার বাচ্চা নিয়ে আমার খাট দখল করে আছে। আমি কিছু বলতেও পারছি না। শোবার জায়গা না পেয়ে আমিও কয়েকজনের সাথে ফ্লোরেই ঘুমাচ্ছি। বিয়ের এত আগে কেউ বিয়ে খেতে আসে তা আমার জানা ছিল না। ওদের হৈ চৈ দেখে মনে হচ্ছে বিয়েটা যেনো তাদেরই। আর আমি যেনো ওদের বিয়ের দাওয়াত দাওয়াত খেতে এসেছি এ বাড়িতে। এই সব যন্ত্রণার কথা কাকে বলি আমি মাবুদ!

আমার ফুপাতো বোন রেখা, আমার সমবয়সী। এক বছর আগে তার বিয়ে হয়েছে। তার পাশেই রাতে শুয়েছি। শুয়ে শুয়ে পালিয়ে যাবার প্ল্যান করছি। সে আমাকে ঠ্যালা দিয়ে বললো-
__”কি রে বর্ণ, বরের কথা কি ভাবছিস? আমাকে বল আমি কাউকে বলবো না। শুনলাম তোর বর নাকি সেই রকম হ্যান্ডসাম?”
আমার দুঃখে আমি মরি আর এই পাজি বদ মেয়ের আমোদ লেগেছে। রাগ চেপে রেখে বললাম-
__”হ্যাঁ তার হ্যান্ডসামের ঠ্যালায় আমার চোখে ঘুম নাই, কি করি বল তো?”
__”সব মেয়েরই এমন হয় বুঝলি?”
__”সব মেয়েরই এমন হয় মানে? কেমন হয়?”
সে লাজুক মুখ করে বললো-
__” আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হবার পর থেকে আমারো চোখের ঘুম উড়ে গেছিল তোর মতো। আর সব মেয়েরই এমন ঘুম উড়ে যায়।”
__”তোর চোখে ঘুম উড়ে গেছিল কেনো?”
__”কত কি মনে মনে ভাবতে ভাবতে ঘুমানোর টাইম পেতাম না। মানে ঘুম আসতো না।”
__”কি কি ভেবেছিস?”
সে লজ্জায় নুয়ে পড়ে বললো-
__”বরের ভালোবাসা টাসা এসব।”
__”তা যে সব জাগরণ স্বপন দেখে ছিলি তার সব পূরণ হয়েছে?”
সে হতাশ চোখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
__”না রে, কি ভেবে ছিলাম আর কি সব হলো!”
__”তুই বরং আরেকটা বিয়ে কর। যেসব পূরণ হয়নি সেসব পূরণ কর।”
__”কি যে বলিস না!”
__”চাইলে ঐ খোকাবাবুকে তুই বিয়ে করতে পারিস।”
__”খোকাবাবু কে?”
__”যার সাথে আমার বিয়ে হতে চলেছে।”
__”ফাজলামি করিস না তো। ঘুমা এখন।”

বিয়ের দিন ভোরবেলা আমি পালানোর জন্য প্রস্তুতি নিলাম। সবাই ঘুমিয়ে আছে, আমি পা টিপে টিপে বাইরের দরজায় দাড়াতেই হঠাৎ যুথী পেছন থেকে ডেকে বললো-
__”বন্ন আফা পলাইতাছেন নাকি?”
আমি চমকে উঠে থেমে গেলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি যুথী দাঁত কেলিয়ে দাড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওর গলা টিপে ধরি আর দাঁত গুলো ভেঙে ফেলি। বললাম-
__”মানে?”
সে রোমান্টিক মুখভঙ্গি করে বললো-
__”ফিলিমে দেখছি জোর কইরা বিয়া দিলে শাবনুর পিছের দুয়ার দিয়া পলাইয়া যায়গা।”
__”আমি পালাবো কেনো?”
__”হেইডাই তো কথা। শাবনুরের বিয়া হারামীর লগে ঠিক হয় বইলা সে পলাইয়া যায়। কিন্তু আপ্নের বিয়া তো রিয়াজের লগেই হইতাছে তাইলে পলাইবেন ক্যা?”
__”রিয়াজের লগে মানে? আই মীন রিয়াজের সাথে মানে কি?”
__”ও সুরি,শাবনুরের নায়কের নাম তো রিয়াজ। আপনের নায়কের নাম হইলো সীমান্ত।” 
__”একদম আমার নায়ক বলবি না ঐ বুইড়া বাবুকে। আর সুরি কি?”
__”সুরি মানে হইলো দুঃখ। ঐ যে ঠ্যালা গুতা খাইলে যে ইনলিশডা কয়।”
__”ঐটা সুরি না স্যরি। আর ইনলিশ না, ইংলিশ।”
__”ঐ হইলো, অহন কথা হইলো আপ্নে এই দরজা দিয়া কই যাইতাছেন বন্ন আফা?”
আমি রেগে উঠে ধমকের স্বরে বললাম-
__”তোকে বলতে হবে কোথায় যাচ্ছি?”
__”হ কইতে হইবো। খালাম্মা আমারে পাউর দিছে।” 
__”কি দিয়েছে?”
__”পাউর দিছে, মানে ক্ষ্যামতা দিছে।”
__”ওটা পাউর না পাওয়ার হবে। খ্যাঁতা পুড়াই তোর ক্ষমতার। আজ তোকে খুন করে জেলে যাবো থাম।”
আমি কথা শেষ না করতেই হঠাৎ যুথী চিৎকার করতে শুরু করলো।
__”কে কই আছেন জলদি আসেন দেখেন বন্ন আফায় পাগল হই গেছে।”

আমি যুথীর কীর্তি দেখে হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। আর অবাক হলাম আম্মুর ট্রেনিং দেখে। কি কি দিয়ে যে যুথীকে সে পটিয়েছে তা আল্লাহই জানে। এমন ট্রেনিং দিয়েছে যে আমাকে পাগলি প্রমাণ করে তারা তাদের কাজ হাছিল করছে। কি কপাল আমার যে, আমার দলে কেউ নাই। পালাতে তো পারলামই না, উল্টা ধরা খেয়ে চোর সেজে দাড়িয়ে আছি। এখন আমার সম্মানীয় আম্মাজী যে কি করবে তা আল্লাহই জানে! প্লিজ আল্লাহ তুমি অন্তত আমার দলে থাকো! যুথী চিৎকার করেই চলেছে। আম্মু হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলো।

যুথীর চিৎকার শুনে আম্মুসহ খালামনি আর ফুপীও দৌড়ে এলো। ওরা সবাই আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আম্মু যুথীকে বললো-
__”কি হয়েছে রে যুথী?”
যুথী এমন ভাবে হাপাতে শুরু করলো যেনো আমি তাকে খুন করছিলাম আর সে কোনো মতে বেঁচে গেছে। সে ঘনঘন শ্বাস নিতে নিতে বললো-
__”খালাম্মা বন্ন আফায় পাগল হই গেছে।”
আম্মু অবাক হয়ে বললো-
__”কি করে বুঝলি?”
__”আফায় আমারে খুন করতি লাগছিল।”
আম্মু চোখ কপালে তুলে বললো-
__”কেনো?”
__”আফায় পেছনের দজ্জা দিয়া পলাইতে আছিল আমি ধইরালাইছি তাই।”
আম্মু বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকালো। আমিও বড় বড় চোখে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললাম-
__”এখন সামনের দরজা দিয়ে পালাবো। দেখি আমাকে কে আটকায়?”
তারপর আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে চিৎকার করে বললাম-
__”কে আটকাবি আমাকে, সামনে আয়।”
আম্মু আমার কথা শুনে আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে রুমে নিয়ে গেলো। রুমে ঢুকে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বললো-
__”আজ অব্দি একটা প্রেম ভালোবাসা করার মুরদ হয়নি তোর, পালিয়ে কোথায় যাবি আর কার সাথে যাবি পাজি মেয়ে?”
আমি চিৎকার করে বললাম-
__”একাই পালাবো। পালানোর জন্য আবার কামলা লাগে নাকি? রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। দরকার হলে বনে জঙ্গলে বা মরুভূমিতে ঘুরবো তাও বিয়ে করবো না।”
__”আশে পাশে জঙ্গল আছে?”
__”যেখানে আছে সেখানেই যাবো।”
__”আর মরুভূমিতে ঘুরার জন্য তো তোকে আরব দেশে যেতে হবে তাহলে।”
__”দরকার হলে আরব দেশেই যাবো তাও আমি বিয়ে করবো না।”
__”চুপচাপ ঘরে বসে থাক। যদি বেশি তেড়িবেড়ি করিস তাহলে তার ফলাফল খুব খারাপ হবে কিন্তু বর্ণ।”
আমি চিৎকার করে বললাম-
__”ঘরে বসে থাকবো না। আমি পালিয়ে যাবো, সরো সামনে থেকে।”
__”বেশি কথা বললে তোকে ঝাটা থেরাপি দেবো। চুপ করে ঘরে থাক। বাড়ি ভরা আত্মীয় স্বজন, তারা এসব শুনলে না জানি কি সব ভাববে! কোনো আওয়াজ করবি না বলে দিলাম।”
কথাটা বলেই আম্মু রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা লক করে দিলো। হায়রে জীবনটা আমার বাংলা সিনেমা হয়ে গেছে রে! সেই সিনেমার ভিলেন আমার আম্মু আর যুথী। যুথী ঠিকই বলেছে, এখন আমার শাবনুরের হাল হয়েছে। যদি সিনেমা হতো তাহলে এখন একটা ভীষণ দুঃখের গান হতো।

পালানোর সুযোগ না পেয়ে আমি ফাঁসির আসামী হয়ে বিয়ে নামক ফাঁসি হবার জন্য রেডি হলাম। কি আর করা! বাধ্য হলাম ঐ ধেড়ে বাবুকে বিয়ে করতে, তবে এর শোধ বর্ণিতা নিয়েই ছাড়বে। কাউকে শান্তি দেবো না আমি। আজ থেকে সবার শান্তিকে ছুটি দিয়ে দিলাম। 
বরযাত্রী এলো হেটে হেটে, এই ছিল বর্ণিতার কপালে খোদা তায়ালা! ভেউ ভেউ করে কেঁদেও কুল কিনারা না পেয়ে কবুল বলতেই হলো আমাকে। আমার মতো একটা মুক্তার গলায় ঐ বাবু বান্দরটাকে ঝুলিয়ে দিলো সবাই মিলে। আমি তো লুট গেয়া, বরবাদ হো গেয়া খোদা! দুই জন মানুষকে তারা জোর করে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিলো। পাশের বাসাটা আমার শ্বশুরবাড়ি। এই দুঃখ কোথায় রাখবো আমি!

বিদায় লগ্নে আব্বুকে খুঁজে পেলাম না। আম্মুও আমার থেকে দূরে দূরে বিষণ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ যুথী দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো-
__”ও বন্ন আফা গো, আপ্নে আমারে মাফ কইরা দিয়েন। কি করুম কন, আমি তো আপ্নেরে না দেইখা থাকতি পারি না। তাই পাশের বাড়িত বিয়া হইবো শুইনা আমি সেরাম খুশি হই ছিলাম। ভাবছিলাম দৈনিক আপ্নেরে দ্যাখতে তো পামু। তাই সবডির লগে হাত মিলাই ছিলাম।”
যুথীর কথা শুনে অবাক হলাম। মানুষের ভালোবাসার রং নির্যাস সব কিছুই ভিন্ন ভিন্ন হয়। একাক জনের ভালোবাসা প্রকাশের ধরন একাক রকমের, এর ভেতর থেকে ভালোবাসা নিংড়িয়ে বের করাটা খুব কঠিণ। যারা বের করতে পারে তারাই জিতে যায়। আমি ওর মাথায় হাত রেখে বললাম-
__”আমার রুমে যতো কসমেটিকস আছে সব তুই নিস।”
সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো-
__”আমার ওগ্লা কিচ্ছু লাগবো না আফা। আমি চাই আপ্নে সুখে থাকেন।”
__”পাগলি একটা।”

সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমার বর বাবুর পিছু পিছু হেটে হেটে শ্বশুরবাড়ি গেলাম। কতটা হতভাগীনি আমি!
শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতেই একটা মেয়ে আমার হাত ধরে আমাকে বাসর ঘরের বিছানায় বসিয়ে গেলো। সে চলে যাবার আগেই একদল মেয়ে এসে আমাকে ঘিরে বিছানার চার পাশে দাড়িয়ে হিহি শুরু করলো। শাড়ি গহনা পরে আমি আধমরা। এরা সবাই কখন যাবে কে জানে! চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম সারা ঘর ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। বেড সাজিয়েছে বেলি ফুল দিয়ে। এসব দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। এমন ঘোড়ার ডিমের মূলা মার্কা বিয়েতে এত আয়োজনের কি দরকার ছিল? এখন আমাকে সিনেমা স্টাইলে ঘোমটা দিয়ে বসে থাকতে হবে নাকি? থাকবো না বসে আর ঘোমটাও দেবো না। কে যেনো বললো, বর আসছে। এটা শুনে ওরা সবাই রুম থেকে বের হয়ে গেলো। ওরা বের হয়ে যেতেই আমি আগে টান দিয়ে ঘোমটা খুললাম তারপর ওয়াশরুমে ঢুকে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হলাম। কিসের বাসর টাসর হুম! মানি না আমি এ বিয়ে। আর মানি না ঐ বুড়ো বাবুকে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখি বাবু রুমে দাড়িয়ে আছে। ঘোমটা ওয়ালা বউ বিছানায় খুঁজে ছিল কি না কে জানে! আমার এমন পোষাক দেখে সে একটু অবাক হলো মনে হয়। কিছু না বলে সে একটা বই হাতে সোফায় শুয়ে পড়লো। তাকে দেখে আমার মেজাজ ডাবল গরম হয়ে গেলো। ঢং দেখিয়ে বই পড়া হচ্ছে। যতো সব ঢংগি, না না মেল ভার্সনে ঢংগা। বললাম-
__”আমি এখন ঘুমাবো।”
কোনো জবাব নেই। মনে হচ্ছে আমার কথা সে শুনতেই পায়নি। গায়ে আগুন ধরে গেলো। এখন তো বিয়ে করেই ফেলেছি, এখনো কি আমাকে সবার আত্মা ভাবতে হবে নাকি? ঘাড় মোটকে সবাইকে আত্মাগিরি দেখাতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার করে বললাম-
__”শুনতে পাচ্ছেন? আমি এখন ঘুমাবো।”
সে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে অবাক হবার ভান করে বললো-
__”আমাকে বলছেন?”
__”না, আকাশ বাতাসকে বলছি।”
__”আচ্ছা বলতে থাকেন, যদি তারা শোনে।”
__”একদম ন্যাকামী করবেন না। এটা আমার সহ্য হয় না।”
__”আমি নই আপনি ন্যাকামী করছেন। ঘুমাবেন ঘুমান, কে বারণ করেছে?”
__”লাইট জ্বালনো থাকলে ঘুমাবো কি করে?”
__”এভাবেই ঘুমানোর অভ্যেস করেন। আমি অনেক রাত জেগে বই পড়ি।”
__”অতীত ইতিহাস বাদ দিন। বর্তমান হলো নাচতে নাচতে বিয়ে করেছেন তাই মাশুল তো দিতেই হবে আপনাকে।”
__”কে নাচতে নাচতে বিয়ে করেছে? আপনার মতো বখাটে মেয়েকে কোনো ছেলে নাচতে নাচতে বিয়ে করবে না আর আমিও করিনি।”
__”কিহ আমি বখাটে মেয়ে?”
__”সন্দেহ আছে?”
আমি কিছু না বলে বেড থেকে নেমে টেবিল থেকে পানির বোতল হাতে নিলাম তারপর সব পানি ওর গায়ে ঢাললাম। সে লাফ দিয়ে উঠে বললো-
__”এই এই আপনি এটা কি করলেন?”
__”ভিজিয়ে দিলাম।”
__”আপনি যে বখাটে সেটা তো দারুণ ভাবে প্রমান করে দিলেন। ফাজিল বখাটে বদ মেয়ে একটা।”
__”বখাটের দেখেছেন কি? আপনার জীবনটা কয়লা তেজপাতা নিম পাতা আর কচু পাতা করবো। দেখি আপনি কি করেন।”
লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। সে ওয়াশরুমে গেলো চেঞ্জ করতে। রুমে এসে সে আবার লাইট অন করে বললো-
__”এটা আমার রুম তাই আমার ইচ্ছেই শেষ কথা। মাইন্ড ইট।”
__”খ্যাতা পোড়াই মাইন্ডের। লাইট অফ না করলে লাইট ভেঙে ফেলবো বলে দিলাম।”
__”সাহস থাকলে ভাঙুন। এই বাড়িতে বখাটে গিরি চলবে না বলে দিলাম।”
আমি বেড থেকে নেম বেলকোণ বারান্দায় দাড়িয়ে চিৎকার করে আব্বুকে ডাকলাম। বেশ কয়েকবার ডাকার পরে আব্বু দৌড়ে এলো ওবাড়ির আমার রুমের বেলকোণ বারান্দায়। এসে হতবাক হয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন-
__”কি হয়েছে ?”
__”আব্বু লাঠি দাও তো।”
__”কেনো মা? 
__”দরকার আছে। কুইক লাঠি আনো।”
__”মা মারামারি করলে সবাই তোকে খারাপ ভাববে।”
__”ভাবুকগে।”
__”স্বামীকে মারতে নেই মা।”
__”কে স্বামী? এ বিয়ে আমি মানি না।”
__”এসব বলতে নেই।”
__”জোর করে বিয়ে দিয়েছো এবার লাঠি দাও বলছি। না হলে আজ আইলা নার্গিস তিতলিসহ নাম না জানা সব সাইক্লোন হবে।”
__”শান্ত হ মা। ছেলেটাকে মারলে তো মরে যাবে সে।”
__”কখন বললাম যে আমি তাকে মারবো?”
__”তাহলে কাকে মারবি?”
__”আমি রুমের লাইট ভাংবো।”
__”কেনো?”
আমি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাম-
__”এত রাতে সে লাইট অন করে বই পড়ছে। আলোতে আমি ঘুমাতে পারছি না আব্বু। আমার ভীষণ মাথা ব্যাথা করছে। এ তুমি কার সাথে আমাকে বিয়ে দিলে গো!”
বলতে বলতে আমি কেঁদেই ফেললাম।আব্বু অসহায় মুখ করে বললেন-
__”ঠিক আছে আমি এখনই লাঠি এনে দিচ্ছি।” 
আমি দাড়িয়ে রইলাম। কয়েক মিনিট পর আব্বু লাঠি নিয়ে এলেন তারপর করুণ মুখ করে ঐ বারান্দা থেকে লাঠি এগিয়ে দিয়ে বললেন-
__”তুই লাইট ভেঙে ঘুমিয়ে পড়িস মা!”
__”আচ্ছা, গুড নাইট আব্বু।”
__”গুড নাইট।”
আমি লাঠি নিয়ে রুমে এসে ডানে বামে আগে পিছে না তাকিয়ে লাইটটা ভেঙে ফেললাম। তারপর ঘুমাতে গেলাম। বাবু অন্ধকারে তাকিয়ে আছে কি না বুঝতে পারছি না। তাকিয়ে থাক বা ঘুমিয়ে থাক, আই ডোন্ট কেয়ার। লাইট ভেঙে শান্তি পাচ্ছি এটাই বড় কথা।

লাইট ভেঙে শুতেই পারলাম না, বাবু চিৎকার করে বললো-
__”ফাজিল বখাটে, পাক্কা একটা গুন্ডী মেয়ে। সিনেমা নাটকেও এমন ভিলেনি মেয়ে আমি কখনো দেখিনি।”
আমি মুচকি হেসে বললাম-
__”যা কিছু বললেন তার সব আপনি।”
সে চিৎকার করে বললো-
__”কিহ?”
আমি খুব জোরে হেসে ফেললাম। সে বোধ হয় আরো রেগে গেলো। আর আমারো ঈদ ঈদ শুরু হলো। বর্ণর সাথে ফাঙ্গা নেয়ার মজা নেও বাবুতা। বললাম-
__”যে বলে সেই হয়।”
__”এই সব থিওরি কে দিয়েছে আপনাকে?”
আমি বেশ ভাব নিয়ে বললাম-
__”বর্ণকে কে থিওরি দেবে? সে তো একাই এক’শ।”
কি সুন্দর অন্ধকারে দু’জন ঝগড়া করছি। হাউ রোমান্টিক! আসলে ঝগড়া করতে আমার খুব ভাল্লাগে। সেই কখন থেকেই লাইট ভাঙার শান্তি চলছে তো চলছেই, কিছুতেই যেনো সেটা কমছে না। সে বললো-
__”ভেবেছেন আমাকে জ্বালিয়ে আপনি শান্তিতে ঘুমাবেন? নেভার।”
__”ঘুমাই আর না ঘুমাই, লাইট ভেঙে আমি শান্তিতে আছি।”
হঠাৎ সে তার ফোনের লাইট জ্বালিয়ে বললো-
__”সকাল হোক আম্মুকে সব বলে দেবো। কোথায় থেকে এই বখাটে মেয়েকে এনে আমার কাঁধে চাপিয়েছে সেটার হেস্তনেস্ত করবো।”
__”হ্যালো মিস্টার, আমি আপনার কাঁধে চাপিনি, বরং আপনার মতো একটা বান্দর আমার মতো একটা মুক্তার গলায় ঝুলছে।”
__”কিহ?”
__”জ্বী।”
__”আপনি মুক্তা আর আমি বান্দর?”
__”জ্বী বাবু।”
__”এখনই আম্মুকে সব বলে দেবো। আমাকে বান্দর বলছে কত বড় সাহস!”
__”উহু, খালি বান্দর না, আপনি বুইড়া বাবু বান্দর।”
__”কিহ?”
আমি হাহা করে হেসে বললাম-
__”আমার ঘুম পাচ্ছে। আপনি দয়া করে বকবক থামিয়ে আমাকে ঘুমাতে দিন। বউকে ঘুমাতে না দেয়াটা কিন্তু নারী নির্যাতনের মধ্যে পড়ে। আর জানেনই তো যে, আইন এখন নারীদের পক্ষে। এই অপরাধে আপনার একাধিক বার ফাঁসিও হয়ে যেতে পারে। সো বি কেয়ারফুল। গুড নাইট বুইড়া বাবু বান্দর।”

ওর ফোনের লাইটের আলোতে দেখলাম সে সোফায় বসে রাগে ব্যাঙের মতো ফুলছে। দেখে ভীষণ খুশি হলাম। মনে মনে বললাম, ফুলো বাবু ফুলো। তারপর বেলুন হয়ে আকাশে উড়ো। আমি সবাইকে দেখিয়ে বলবো, ঐ বেলুনটা হলো আমার বাবু বর, যে বর্ণর সাথে ফাঙ্গা নিতে গিয়ে বেলুনাকৃতি ধারণ করেছে।

সকালে ঘুম ভেঙে দেখলাম বাবু সোফায় ঘুমিয়ে আছে। আহারে বেচারার কি দুঃখ! আমি না হয় কোণ ঠাসা হয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি, সে কেনো করলো? সে তো পুরুষ মানুষ, প্রতিবাদ করতেই পারতো! প্রতিবাদ না করে বিয়ে যখন করেছে তখন ঠ্যালা তো সইতেই হবে তোমার খোকাবাবু। আমি জ্বালিয়ে তাকে ভষ্ম করবো। যেনো সে নিজেই আমাকে ফেরত পাঠায়। আমি নিজে থেকেই চলে যেতে পারি, এতে আমার আম্মু অশান্তি সৃষ্টি করবে। তাই সব দোষ তার কাঁধে দিয়ে তবেই আমি যাবো। আপাতত তার শান্তির ঘুমটা বিনষ্ট করে শান্তি তো নিই। আমি খাট থেকে নেমে সোফার সামনে গিয়ে দাড়ালাম তারপর ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে চিৎকার করে বললাম-
__”এই যে ধেড়ে বাবু আর কত ঘুমাবেন? এবার উঠুন।”
সে ঘুমের ঘোরে লাফ দিয়ে উঠে বসে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম-
__”এবার উঠুন খোকাবাবু।”
__”আমি উঠে কি করবো? আর সাত সকালে চেচাচ্ছেন কেনো?”
__”কি করবেন না করবেন সেটা আপনার ব্যাপার, কিন্তু ঘুমানো আর যাবে না। আর চেচামেচি করাটা হলো আমার স্বভাব।”
__”আর ঘুমানো যাবে না কেনো?”
__”ইহা এক প্রকার অত্যাচার।”
সে রেগে গিয়ে বললো-
__”দেখুন আপনি কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছেন! এর ফলাফল কিন্তু খুব খারাপ হবে বলে দিলাম।”
আমি ডোন্ট কেয়ার মুখভঙ্গি করে বললাম-
__”সব খারাপ আমি দেখে নেবো, ইহা নিয়ে আপনার টেনশন করতে হবে না।”

রাগ করে সে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ভাবলাম এরপর আর কি কি করে তাকে জব্দ করা যায়। ধ্যাত্তেরি কিছুই তো মাথায় আসছে না। আব্বুর সাথে এটা নিয়ে একটু আলোচনা করতে হবে। পাশের বাড়িটা বাপের বাড়ি হবার এই একটা বিশেষ সুবিধা। আমি রুম থেকে বেরিয়ে ওবাড়িতে যাচ্ছিলাম আব্বুর সাথে দেখা করার জন্য হঠাৎ আন্টির সাথে মুখোমুখি দেখা। আন্টি আমাকে দেখে বললেন-
__”ও তুই উঠেছিস? আয় নাস্তা করবি।”
__”আচ্ছা।”
__”বাবু কোথায়?”
হুট করেই আমার মাথায় একটা আইডিয়া ভর করলো। আমি করুণ মুখ করে বললাম-
__”আসলে আন্টি আপনার ছেলের তো ডায়রিয়া হয়েছে। সারা রাত ধরে সে শুধু ওয়াশরুমে যাচ্ছে আর আসছে। এখনো সে ওয়াশরুমেই।”
__”বলিস কি? এখন তো তাকে এসব খাবার দেয়া যাবে না তাহলে। তাকে তো কাঁচকলার তরকারী খাওয়াতে হবে।”
মনে মনে খুব খুশি হলাম। ভাবতেই পারিনি তার জন্য এমন শাস্তি অপেক্ষা করছে। বললাম-
__”হ্যাঁ আন্টি, আর সাথে স্যালাইনও খাওয়াতে হবে।”
__”আচ্ছা আমি সব ব্যবস্থা করছি তুই নাস্তা করে নে।”
__”ওর খাবার তৈরি হোক তারপর দুজন এক সাথে খাবো।”
একসাথে না খেলে দেখবো কি করে যে কাঁচকলার তরকারী সে কতটা আনন্দ নিয়ে খায়। আর আমার অন্য খাবার দেখে তার জ্বলনিটাও তো দেখতে হবে।
__”বাব্বাহ এত দরদ এক রাতেই সৃষ্টি হয়ে গেছে?”
আমি লাজুক মুখ করে দাড়িয়ে রইলাম।

টেবিলে বাবুর জন্য কাঁচকলার ঝোল, কাঁচকলার বড়া, কাঁচকলার ভর্তা আর ভাত। আর আমার জন্য পরোটা ডিম মাংস সবজিসহ আরো অনেক কিছু। ধেড়ে খোকা এবার টের পাবে বর্ণর সাথে ফাঙ্গা নেয়ার ঠ্যালা।
আন্টি বাবুর প্লেটে ভাত আর কাঁচকলার রকমারি আইটেম তুলে দিলো। বাবু তো চোখ কপালে তুলে আন্টির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বললো-
__”এসব কি?”
আন্টি বললেন-
__”বাবু এসময় এসব খাবারই খেতে হয়। দু’দিন পর থেকে আবার স্বাভাবিক খাবার খাবি।”
__”এ সময় মানে? বিয়ে করলে এসব খেতে হয় নাকি?”
__”আরে বিয়ে না, এসময়ে খেতে হয়।”
__”কোন্ সময়ের কথা বলছো?”
__”এ সময় মানে হলো ডায়রিয়া হলে।”
__”কার ডায়রিয়া হয়েছে?”
__”কেনো, তোর হয়েছে।”
সে চোখ বড় বড় করে বললো-
__”কিহ?”
__”হ্যাঁ।”
__”তোমাকে কে বলেছে যে আমার ডায়রিয়া হয়েছে?”
আন্টি কিছু বলার আগেই আমি বললাম-
__”এমা এসব খাবে না বলে দেখো সব অস্বীকার করছে! কি পেটুক ছেলে রে বাবাহ!”
সে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ লাল করে বললো-
__”ওহ, তাহলে ইনিই এসব বলেছেন। আম্মু জানো তুমি যে এই মেয়টা কতটা ভয়ানক? কাল রাতে সে কি কি করেছে জানো?”
তার কথা শুনে হুট করেই আন্টির মুখ লাজুক লাজুক হয়ে গেলো। আন্টি লাজুক স্বরে বললেন-
__”কাল রাতের কথা বলতে হবে না বাবু। এসব বলতে নেই। বাড়ি ভরা লোকজন কেউ শুনলে কি ভাববে বল! চুপচাপ খেয়ে নে।”
আন্টির কথা শুনে আমার খুব হাসি পেলো। অনেক কষ্টে আমি হাসি চেপে রাখলাম। বাবু আন্টির কথাতে অবাক হয়ে বললো-
__”বলতে কেনো হবে না? ঐ বখাটে মেয়ে কি কি করেছে সব বলবো আমি। সে আমার গায়ে….”
সে সবটুকু কথা বলার আগেই আন্টি তাকে ধমকে থামিয়ে দিয়ে বললো-
__”চুপ একদম। সবার সামনে কেউ এসব বলে নাকি? কবে যে তোর হুশ বুদ্ধি হবে! তোকে নিয়ে আর পারি না!”
__”আমি আবার কি করলাম? সব দোষ তো ঐ বখাটে মেয়ের। সে কেনো এসব করবে? সে করবে তাতে দোষ নেই আর আমি বললেই দোষ?”
__”ওরও দোষ নেই। আসলে এসব হলো বউদের অধিকার তাই।”
বাবু চোখ কপালে তুলে বললো-
__”কিহ? এসব বউদের অধিকার? আগে জানলে ছোট বেলাতেই বাড়ি থেকে পালাতাম।”
আন্টি রেগে গিয়ে বললেন-
__”এসব কথা রেখে খেয়ে নে চুপচাপ।”
__”খাবো তবে কাঁচকলা নয়।”
__”ডায়রিয়া নিয়ে অন্য খাবার খেলে ডায়রিয়া আরো বাড়বে।”
আমি বললাম-
__”আন্টি আপনি উনাকে অন্য খাবার খেতে দেবেন না একদম।”
আমার কথা শুনে খোকাবাবু রেগে গিয়ে বললো-
__”একদম চুপ। ফাজিল বদ বজ্জাত বখাটে মেয়ে একটা।”
আন্টি ওর কথা শুনে বললেন-
__”বাবু তুই ওর সাথে এ ভাবে কথা কেনো বলছিস? আর সে তো এখন মেয়ে নেই, সে এখন তোর বউ। নতুন বউয়ের সাথে কেউ এমন ভাবে কথা বলে?”
খোকাবাবু রাগে গমগম করতে করতে বললো-
__”নিকুচি করেছি বউয়ের। পাক্কা একটা মিথ্যাবাদী মেয়ে সে। সখ করে বউমা বানিয়েছো তুমি আর সব ঝাল যাচ্ছে আমার উপর দিয়ে।”
আমি কাঁদো কাঁদো স্বরে জোরে জোরে বললাম-
__”আব্বু আমি আর এ বাড়িতে থাকবো না গো। এত অপমান আমি আর নিতে পারছি না।”
আন্টি আমার দিকে সমবেদনার চোখে তাকিয়ে বললেন-
__”শান্ত হ মা। আমি সব দেখছি।”
তারপর তিনি তার খোকাবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন-
__”বাবু তুই থামবি? তোর ডায়রিয়া হোক বা না হোক তুই কাঁচকলাই খাবি ব্যাস।”
বাবু করুণ দুখী মুখভঙ্গি করে বললো-
__”আম্মু তুমি ঐ মিথ্যাবাদী মেয়ের জন্য আমাকে কেনো শাস্তি দিচ্ছো? বিশ্বাস করো আম্মু আমার ডায়রিয়া হয়নি।”
__”বাবু আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না। চুপচাপ খেয়ে নে।”

সে কাঁচকলা মুখে দিয়ে বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকালো। আমি তার দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে মুচকি হেসে খেতে শুরু করলাম। আর মনে মনে বললাম, কেমন লাগছে তোমার খোকাবাবুতা? জাতি আজ তোমার অনুভূতি জানতে চায়!

সকাল দুপুর রাত তিন বেলা কাঁচকলার তরকারী খেয়ে ধেড়ে বাবু টারজান হয়ে গেছে। রাতে আমি বেডে বসে চুল বাঁধছি, হঠাৎ সে হুড়মুড় করে রুমে ঢুকে চোখ পাকিয়ে টারজানের মতো উ উ করে বললো-
__”এই যে বখাটে মেয়ে, বেড থেকে নেমে সোফায় গিয়ে ঘুমান।”
__”কেনো?”
সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো-
__”এই বেড আমার। এখানে শুধুই আমি ঘুমাবো।”
আমি মুখ ভেংচি কেটে বললাম-
__”এই বেড আপনার কিন্তু এখানে শুধু আমিই ঘুমাবো। আপনি সোফাতে গিয়ে ঘুমান, যান।”
__”সোফাতে আপনি ঘুমাবেন।”
ওর কথায় মেজাজ গরম হয়ে গেলো। বললাম-
__”কাল লাইট ভেঙেছি আর আজ কিন্তু খাট ভেঙে চুরমার করবো। ভালো চান তো চুপচাপ সোফায় ঘুমান।”
সে উল্টা রাগ দেখিয়ে বললো-
__”তাই ভাঙুন তবুও আমি খাটেই ঘুমাবো।”
কথাটা বলেই সে খাটে এসে ছুঁ মেরে কোলবালিশটা টেনে নিয়ে সোজা শুয়ে পড়লো। তাকে সরানোর কোনো উপায় খুঁজে পেলাম না। আর আমি তো সোফায় ঘুমাতে পারি না। এত কম জায়গায় তো আমার হয় না। সারা খাট গড়াগড়ি করে ঘুমানোর অভ্যেস আমার। একাধিক কোলবালিশও লাগে আমার। গত রাতে ওর কোলবালিশটা দখল করে ছিলাম। আজ তো সে কেড়ে নিলো। আমি ঝামেলা করার কিছু না পেয়ে বললাম-
__”বিছানায় শুয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু কোলবালিশটা ছেড়ে দিন।”
__”কেনো?”
__”আমি কোলবালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারি না তাই।”
__”আমিও কোলবালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারি না।”
আমি ধমকের স্বরে বললাম-
__”এসব কথা রেখে কোলবালিশটা দিন।”
সে কোলবালিশটা আরো চেপে ধরে বললো-
__”দেবো না।”
আমি কোমরে শাড়ির আঁচল গুজে ঠিকঠাক ভাবে বসে, জোর করে কোলবালিশ টেনে নিতেই সে ধরে ফেললো। দু’জন কিছুক্ষণ কোলবালিশ টানাটানি খেললাম। ওর শক্তির সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারলেও খামচি ধরে কোলবালিশটাকে ধরে রাখলাম। অবশেষে যা হবার তাই হলো। কোলবালিশটা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। সারা বিছানা তুলায় ময় হয়ে গেলো। দু’জন হা করে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলাম। সে রেগে গিয়ে বললো-
__”বজ্জাত বদ বখাটে মেয়ে, দিলেন তো আমার সাধের কোলবালিশটা ছিড়ে?”
__”বেশ করেছি। টেনে ধরে ছিলেন কেনো? ছেড়ে দিলে তো আর ছিড়তো না।”
__”ধুর।”
__”এখন তুলো গুলো পরিষ্কার করুন।”
__”আমি ছিড়েছি যে আমি পরিষ্কার করবো?”
__”টানাটানি তো দু’জনই করেছি। সুতরাং আপরাধী দু’জনই।”
__”অপরাধী শুধুই আপনি।”
__”ঠিক আছে।”
আমি আমার শোবার যায়গা থেকে সব তুলো ঝেড়ে ওর গায়ে দিলাম। তারপর আমার জায়গায় শুয়ে পড়লাম। ওর গায়ে তুলোয় মাখামাখি হতেই সে লাফ দিয়ে বসে বললো-
__”এই এই কি করলেন এটা?”
__”আমার জায়গা আমি পরিষ্কার করেছি। এবার নিজের যায়গা নিজে পরিষ্কার করে নিন।”
__”তাই বলে আমার গায়ে দেবেন?”
__”ওখানে শুয়েছেন কেনো? এপাশে শুলে তো আর গায়ে তুলো লাগতো না।”
সে আর কিছু না বলে ওর জায়গাটা ঝেড়ে পাশ ফিরে শুয়ে থাকলো। আমি আবার তাকে জব্দ করার ফন্দি এটে বললাম-
__”আপনি এই পাশে ঘুমান আমি ওপাশে ঘুমাবো।”
__”এটা আমার খাট আর আমি এখানেই ঘুমাই। ইচ্ছে হলে আপনি ওখানে ঘুমান, না হলে ফ্লোর আর সোফা আছে।”
আমি রাগে গম গম করে শুয়ে পড়লাম। এর শোধ নেবেই বর্ণ। রাতে আমার ঘুম এলো না। এপাশ ওপাশ করছি আর তাকে জব্দ করার প্ল্যান করছি। দেখলাম সে ঘুমিয়ে গেছে। হুট করে মাথায় একটা আইডিয়া ভর করলো। উফ্ দারুণ আইডিয়া! আইডিয়াটা ভেবে নিজেকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হলো। এত সুন্দর আইডিয়া আমার মাথায়, ভাবা যায়!
আমি ঘুমের ভান করে তার কাছাকাছি গিয়ে শুয়ে থাকলাম। দেখলাম সে বেহুশের মতো ঘুমাচ্ছে। আমি হালকা ধাক্কা দিলাম তবুও সে টের পেলো না। আরেকটা জোরে ধাক্কা দিতেই সে ফ্লোরে গিয়ে পড়লো। আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকলাম কিন্তু হাসি চেপে রাখতে আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। 
সে ধুপ করে পড়ে লাফ দিয়ে উঠে বসলো। আমি চোখ হালকা তাকিয়ে ডীম লাইটের আলোতে দেখলাম সে খাইয়ালাইমু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। যদি বৃটিশ আমল হতো তাহলে বউ পিটানো সূত্রানুসারে আমি এখন উত্তম মাধ্যম খেতাম। যাই হোক এটা বৃটিশ আমল না তাই নিশ্চিন্তে তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছি। বর্ণর সাথে ফাঙ্গা নিলে এসব ঘটবেই। সে বসা থেকে আমার কাছে এসে দাড়িয়ে বললো-
__”ফাজিল পাজি বখাটে মেয়ে। এমন বদ মেয়ে আমি জীবনেও দেখিনি। আর এই মেয়েই আমার কপালে ছিল আল্লাহ! আম্মু আমার সাথে এটা কি করলো!”
আমি চোখ বন্ধ করে চুপচাপ থাকলাম। তার পরাণ জ্বলছে পুড়ছে সাথে কোমর ব্যাথা করছে, সে তো একটু বলবেই। মনে মনে বললাম, বলো বাবু বলো, আরো মেল্লা করে বলো। আমি তো জানে শান্তি পাচ্ছি এতেই আমার হবে। আমি ঘুমে বিভোর এমন ভান করেই শুয়ে থাকলাম। সে রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে আমাকে ধাক্কা দিলো জাগানোর জন্য। আমি লাফ দিয়ে উঠে বসে চোখ ডলতে ডলতে বললাম-
__” কি হয়েছে?”
তারপর চোখ খুলে দেখি, সে কিলারের মতো চোখ করে আমার দিকে চেয়ে আছে। একটা চাক্কু থাকলে এতক্ষণে সে হয়তো আমার পেটে ঢুকিয়ে দিতো। যেমন করে সে তাকিয়ে আছে বাবাহ একটু ভয়ও লাগছে। তার চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে, এই রে মারবে নাকি? মারলে তো বিপদ। শক্তিতে তো পেরে উঠবো না। কুইক একটা আইডিয়া বের করলাম। আমি চিৎকার করে বললাম-
__”ভুত ভুত ভুত।”
হঠাৎ তার কিলার চোখ ভীতো চোখে পরিণত হলো। সে আমার কাছে এগিয়ে এসে বসলো তারপর ভীতো স্বরে বললো-
__”ভুত কোথায়?”
আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম-
__”এই ভুত কাছে আসবে না বলে দিলাম।”
সে আরো কাছে এসে আচমকা আমাকে জাপটে ধরে বললো-
__”আমি না ভুতে খুব ভয় পাই জানেন!”
আমি তো তার কান্ড দেখে অবাক বনে হারিয়ে গেলাম। হায় আল্লাহ নিজের জালে নিজেই ফাঁসলাম নাকি? আমি চেচিয়ে উঠে বললাম-
__”এই ছাড়ুন বলছি ছাড়ুন।”
__”ছাড়লেই ভুত আমাকে ধরবে। আমি কিছুতেই ছাড়বো না।”
কথাটা বলেই সে আরো শক্ত করে আমাকে জাপটে ধরলো। আমার তো দেখছি দম আটকে আসছে। আমি শান্ত স্বরে বললাম-
__”ভুত চলে গেছে এখন ছাড়ুন।”
সে চোখ বন্ধ করে বললো-
__”আমি জানি ভুত যায়নি।”
আচ্ছা মহা মুশকিলে পড়লাম তো! কি করতে যে কি করলাম! এখন এই খোকাবাবু সারা রাত আমাকে জাপটে ধরে থাকবে নাকি? আব্বু এ তুমি কার সাথে আমার বিয়ে দিলে গো? এতো ভীতু ছেলে বর হয় কি করে? কোথায় সে আমাকে টারজান হয়ে ভুত থেকে উদ্ধার করবে তা নয়, সে নিজেই ভুতের ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আমি ম্যানেজ করার জন্য বললাম-
__”আমাকে একটু ছাড়ুন আমি ভুত মেরে আসি তারপর না হয় আবার জাপটে ধরবেন।”
__”না না ছাড়লেই ভুত আমাকে ধরবে।”
আমি আশেপাশে তাকিয়ে ভুত তাড়ানোর ভান করে হাত নাড়িয়ে বললাম-
__”এই ভুত যা বলছি যাহ। আর আসবি না এ ঘরে।”
আমার কান্ড দেখে আমার নিজেরই খুব হাসি পাচ্ছে। এমন করে পৃথিবীতে কেউ ভুত তাড়ানোর রেকর্ড করে ছিল কি না আমি জানি না। তবে মুরগি তাড়ানোর মতো করে আমি তো ভুত তাড়ালাম কিন্তু খোকাবাবু বিশ্বাস করলো কি না কে জানে! বললাম-
__”ভুতকে তাড়িয়ে দিয়েছি এবার ছাড়ুন।”
__”আমি জানি ভুত যায়নি কারণ এই বাড়িতে আত্মা ঘুরে সেটা আমি দেখেছি।”
__”হোয়াট?”
__”হ্যাঁ আমি নিজে চোখে দেখেছি।”
এবার তো আমারো ভয় করছে। ইয়া আল্লাহ হেল্প মী। হঠাৎ কিসের যেনো একটা আওয়াজ শুনে ভয়ে আমিও তাকে জাপটে ধরে ভুত ভুত করে চিল্লাতে শুরু করলাম। হঠাৎ দরজায় নক শুনে আমি তো প্রায় বেহুশ। এই রে ভুতকে মুরগির মতো করে তাড়ানো বোধ হয় ঠিক হয়নি। নির্ঘাত সে মাইন্ড করেছে। আমার মাথা ঘুরছে, ভুতের হাতেই আমার মরণ এটা ভাবতেই যেনো চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করলাম। হঠাৎ দরজার ওপার থেকে আন্টির গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বুকে প্রাণ ফিরে এলো। খোকাবাবুকে বললাম-
__”যান খুলে দিয়ে আসেন।”
__”আমি বাবাহ বেড থেকে নামবো না আর আপনাকে ছাড়বোও না। আপনিই খুলে দিয়ে আসেন।”
আজব হাদারাম একটা! বললাম-
__”না ছাড়লে খুলবো কি করে? ছাড়ুন বলছি।”
__”না ছাড়বো না।”
আচ্ছা যন্ত্রণা দেখছি! এদিকে আন্টি দরজা ধাক্কিয়েই চলেছেন। অনেক কষ্টে তাকে ধাক্কিয়ে সরিয়ে দরজা খুললাম। আন্টি রুমে ঢুকে বললেন-
__”কি হয়েছে? চিৎকার করছিস কেনো?”
__”আন্টি বাবু ভুত দেখে ভয় পেয়েছে।”
আন্টি হতবাক হয়ে বললেন-
__”কিহ?”
__”হ্যাঁ সে আত্মা দেখেছে।”
__”বাবু কবে থেকে এসব বিশ্বাস করতে শুরু করেছে?”
আমি বাবুর দিকে আঙ্গুল ইশারা করে বললাম-
__” ঐ যে দেখুন কেমন করে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে সে।”
আন্টি ওর দিকে তাকিয়ে বললো-
__”ও তো ঠিকই আছে, ঘুমাচ্ছে।”
পেছনে তাকিয়ে দেখি সে ঘুমিয়ে আছে। আমি হতবাক হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। এই ছেলে ইচ্ছে করেই তাহলে আমার সাথে এসব করেছে? আবার বর্ণর সাথে ফাঙ্গা? এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
আন্টি মুচকি হেসে চলে গেলেন। আমি গিয়ে বাবুর পাশে শুয়ে পড়লাম। রাগে তো আমার শরীর জ্বলছে। বললাম-
__”আন্টি চলে গেছে এখন ঘুমের ভান করা ছাড়ুন।”
সে এদিকে পাশ ফিরে মুচকি হেসে বললো-
__”দেখেছেন বখাটের জবাব আমিও দিতে পারি?”
__”জবাব দিলেন তো নির্লজ্জের মতো। দেখলে তো মনে হয় ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানেন না।”
__”কি নির্লজ্জতা দেখলেন?”
__”অমন করে জাপটে ধরার কি দরকার ছিল?”
__”আপনি তো ভুত দেখে ভয় পাচ্ছিলেন, ভয় যেনো না পান তাই জড়িয়ে ধরেছি।”
__”মিথ্যুক একটা। আপনি ইচ্ছে করে এসব নাটক করেছেন।”
__”হ্যাঁ নাটক করেছি, আপনার মতো বখাটে মেয়েকে কে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরবে? আপনার মধ্যে ফাজলামি ছাড়া আর কি আছে? নারীর মায়া মমতার ছায়া আপনার ভেতরে নেই। জাস্ট আপনি একটা প্রাণী।”

ওর কথা শুনে হুট করেই আমার চোখ জলে ভিজে গেলো। আমি নির্বাক বসে থেকে নিজের চোখে জল দেখে নিজেই অবাক হলাম। জানি না বর্ণিতার চোখে জল এলো কোথায় থেকে! ডীম লাইটের আলোতে আমার ভেজা চোখ তার দৃষ্টিগোচর হলো না কিন্তু বর্ণিতার হৃদয়ে কষ্টের ঢেউ বার বার আচড়ে পড়লো। এই প্রথম আমার মনে এতটা গভীর ভাবে দাগ কাটলো। সত্যিই কি আমি শুধুই প্রাণী?
সে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেলো। আমি বেলকোণ বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। পূর্ব দিক থেকে হাওয়া এসে লাগছে আমার গায়ে। আমি নিস্তব্ধ দাড়িয়ে আধার দেখছি। আজ কেনো যেনো নিজেকে ঐ আধারের মত বড্ড একা লাগছে। সব মানুষের জীবনেই কি এমন একটা নিঃস্ব রাত আসে?

চলবে……………………………………….

About Author


Administrator
Total Post: [358]

Leave a Reply




Comment: (Write Something About This Post..)

সম্পর্কযুক্ত গল্প

 
© Copyright 2019, All Rights Reserved By BdStory24.Com
About Us || Copyright Issues || Terms & Conditions || Privacy Policy