Home Login Register

Naw Story Will Update Regularly......

বখাটে বউ [অন্তিম অংশ]


প্রিয় পাঠক আমাদের টিম বিনা স্বার্থে আপনাদের জন্য গল্প আর্কাইভ করে, আপনাদের নিকট বিশেষ অনুরোধ যে, বিডিস্টোরি২৪ ডটকম এর স্বার্থে আপনারা এডগুলোতে ক্লিক করবেন, তবে দিনে একবারের বেশী না, যদি আমাদের সাইটকে ভালোবেসে থাকন তো.......
Home / Sazia Afrin Sapna / বখাটে বউ [অন্তিম অংশ]

Sanju › 3 months ago

লেখিকা: সাজিয়া আফরিন স্বপ্না

হারমোনিয়ামটা বেডরুমে এনে রাখলাম। যেনো ওটা দেখে লাট সাহেবের গায়ে আগুন জ্বলে। যা ভেবে ছিলাম তাই হলো। অফিস থেকে ফিরে বেডরুমে হারমোনিয়াম দেখে বাবুর মাথায় আগুন ধরলো। সে ধমকের স্বরে বললো-
__”আমার রুমে এটা কেনো?”
আমি মুখ ভেংচি কেটে বললাম-
__”এটা এখন আমারো রুম তাই আমার জিনিস এখানে থাকবেই।”
__”এটা এ রুমে থাকবে না।”
আমি রেগে গিয়ে বললাম-
__”থাকবে থাকবে থাকবে।”
সেও জোর গলায় বললো-
__”থাকবে না, থাকবে না, থাকবে না।”
আমি বিছানা থেকে নেমে ওর সামনে দাড়িয়ে কোমরে আঁচল গুজে বললাম-
__”বেশি কথা বললে দেখবেন ঘরে হারমোনিয়াম আছে কিন্তু আপনিই নেই। বর্ণর সাথে একদম ফাঙ্গা নিতে আসবেন না বলে দিলাম। এর ফলাফল ভালো হবে না।”
হঠাৎ সে শান্ত স্বরে বললো-
__”একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?”
ওর গলার স্বর আমাকে বিস্মিত করলো। এ ছেলের তো হাব ভাব একদম বিশ্বাস করার মতো নয়। নতো স্বরে কথা বলা মানেই তো আমাকে ফাঁসানো। আমি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললাম-
__”কি প্রশ্ন?”
__”তুমি আমাকে জ্বালিয়ে কি সুখ পাও? এখানে আসার পরের সপ্তাহ থেকেই পেছনে পড়েছো। শেষমেশ আমাকে বিয়ে করেই ছাড়লে। আচ্ছা বিয়ে যখন হয়েই গেছে তখন তো একটু ভালো হতেই পারো।”
__”আপনাকে আমি বিয়ে করতে চাইনি। ইনফ্যাক্ট এসব অনুভূতি নেই আমার। আর আমি কবে খারাপ ছিলাম যে আমাকে ভালো হতে হবে?”
__”ওয়াও! কবে তুমি খারাপ ছিলে! কবে ভালো ছিলে সেই তারিখটা বলো?
__”আমি জন্মগত ভাবেই ভালো তাই নির্দিষ্ট তারিখ নেই। মানে হলো জন্ম থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি প্রতিদিনই ভালো।”
__”শুনে আমি তো ধন্য হয়ে গেলাম। এত ভালো মেয়েটা আমার গলায় ফাঁসির মতো ঝুলছে। এই সুখের গল্প আমি কাকে শুনাই মাবুদ!”
__”শুনুন, আমি কারো গলায় ঝুলিনি বরং আমার মতো মুক্তার গলায় আপনার মতো একটা আস্ত বান্দর ঝুলে আছে। আপনার শরীরের ওজনে কবে যেনো আমি দম আটকে মরে যাই।”
__”কিহ আমি বান্দর?”
__”হ্যাঁ আপনি বান্দর হনুমান শিম্পাঞ্জিসহ বানর প্রজাতির সব প্রাণী আপনি।”
__”আমি বানর প্রজাতির হলে আপনি বিড়াল প্রজাতির বুনো বিড়াল।”
__”আমি বুনো বিড়াল নই, আমি মুক্তা।”
আমার কথা শুনে সে হা হা করে হাসলো। ওর হাসিতে আমার গা জ্বলতে শুরু করলো। ঢংগা একটা! হঠাৎ সে হাসি থামিয়ে আমার মুখের কাছে ওর মুখে এনে চোখে চোখ রেখে বললো-
__”সব মেয়ের যে অনুভূতিটা আছে সেটা তোমার নেই কেনো?”
ওর কথা শুনে আমার কেমন যেনো লাগলো। সত্যিই কি আমার সেই অনুভূতিটা নেই? নিজেকে স্বাভাবিক করে মুখ ভেংচিয়ে বললাম-
__”আল্লাহ দেয়নি তাই নেই। আর পুরুষের কৃতদাস হয়ে বেঁচে থাকতে চাইনি আমি।”
সে আবার হাহা করে হেসে বললো-
__”আজকাল ছেলেরাই বউয়ের কৃতদাস। রোজগার করে এনে সব বউয়ের পায়ে ঢালে তারপর আবার ঝাড়িও খায়। তাই খামাখা নিজেকে কৃতদাস ভেবো না।”
আমি ভাব নিয়ে বললাম-
__”নিজেকে কৃতদাস ভাবছি না তো।”
__”ভেরী গুড।”
__”কারণ আমি এই বিয়েটাই মানি না। মাইন্ড ইট।”
__”তাহলে বিয়েটা না করলেই পারতে। অযথা আমার জীবনটা নষ্ট করলে কেনো?”
__”আপনি যে কারণে বিয়েটা করেছেন ঠিক সেকারণেই আমিও করেছি তাই বিয়ে নিয়ে আমাকে দোষ দেবেন না। জীবন আমারো নষ্ট হয়েছে।”
__”আমার কারণ আর তোমার কারণ যে এক সেটা কে বলেছে তোমাকে?”
__”কেউ না। কারণ আমি জানি আপনি আমাকে একদম পছন্দ করেন না। আর সে অপেক্ষাও নেই আমার।”
__”বিয়েতে ইচ্ছে না থাকলে অনেক মেয়েই বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যায়। তুমিও তো যেতে পারতে!”
আমি দুখী দুখী মুখ করে বললাম-
__”আমিও পালিয়ে যেতেই চেয়ে ছিলাম কিন্তু সব আত্মীয় স্বজন তো বিয়ে উপলক্ষ্যে আমাদের বাড়িতে এসে ছিল। তাহলে আমি পালিয়ে কোথায় যাবো? তারপরেও চেষ্টা করে ছিলাম কিন্তু যুথী সব গুবলেট করে দিয়েছে।”
সে ব্যঙ্গ করার ভঙ্গিমায় বললো-
__”আহারে পালিয়ে যাবারও যায়গা নেই?”
__”একদম রসিকতা করবেন না। মেয়েরা বাহিরে নিরাপদ নয় তাই পালাতে পারিনি। কিন্তু আপনি কেনো পালাননি? পথে ঘাটে রেপ হবার ভয়ে?”
আমার কথা শুনে সে লজ্জা পেলো মনে হয়। লাজুক স্বরে বললো-
__”কি সব বলো?”
__”আপনার ভাব দেখে তো সেটাই মনে হচ্ছে। আপনি এক সুন্দরী পুরুষ আর বাহিরে বের হলেই একদল গুন্ডী বখাটে মেয়ে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে, তারপর…. যাই হোক বাকী টুকু আর বললাম না।”
আমার কথা শুনে ওর চোখ মুখ নার্ভাস হয়ে গেলো। ভ্যাবাচাকা খেয়ে সে তোতলিয়ে বললো-
__”এএএখন তো তুমি ররলসিকতা করছো। কি সব পপপপাগলের মতো বববলছো”
ওর তোতলানো দেখে খুব হাসি পেলো। কিন্তু হাসলাম না। এখন হাসা যাবে না। তাহলে সব গুবলেট হয়ে যাবে। বেশ সিরিয়াস ভাবে বললাম-
__”রসিকতা আপনি শুরু করে ছিলেন। একটা মেয়েকে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যাবার জন্য অনুপ্ররেণা দেন কোন্ আক্কেলে? আপনার আক্কেল জ্ঞান নেই? সব আক্কেল কি ধুয়ে শরবত খেয়েছেন?”
আমার কথা শুনে ওর সব তোতলানো উড়ে গেলো। সে স্বাভাবিক ভাবে বললো-
__”যেহেতু এই বিয়েতে তোমার একদম ইচ্ছে ছিল না তাই বলেছি। এতে হয়তো তোমার জীবনটা বাঁচতো, সাথে আমার নিরিহ জীবনটাও বাঁচতো।”
__”আপনি নিরিহ? ওর আল্লাহ রে আমি এই সব কি শুনছি!”
__”সত্যিই তো আমি নিরিহ।”
__”নিজেকে নিরিহ উপাধি দিয়ে নিরিহদের অপমান করবেন না। দেখা গেলো দেশের সব নিরিহরা হুড়মুড় করে এখানে হাজির হয়ে বললো, ‘আন্দোলন ঈদের পর নয় এখনই হবে।’ 
বিয়ে করার ইচ্ছে তো আপনারও ছিল না। তাহলে দোষ শুধু আমাকেই কেনো দিচ্ছেন? আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকেও একটু দোষ দিন!”
__”তোমাকে কে বলেছে যে আমার ইচ্ছে ছিল না?”
ওর এমন কথাতে আমি একটু হতবাক হলাম। বললাম-
__”মানে?”
__”কিছু না।”
কথাটা বলেই সে দ্রুত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না তার কথার মানে। ধ্যাত্তেরি এসব বুঝে আমার কি কাজ? ইচ্ছাতে করুক আর অনিচ্ছাতে করুক, বিয়ে যখন সে করেছে তখন তার মাশুল তাকে দিতেই হবে কড়ায় গন্ডায়।

রাতে বাড়ি ফিরে সে ডিনার করে নিশ্চুপ বসে রইলো সোফায়। বুঝে উঠতে পারলাম না যে আসলেই তার কি হয়েছে। এমনিতেও আমাদের মধ্যে তো তেমন কথা হয় না। যা কথা হয় ঝগড়া ঝগড়া কথা। তাই কি হয়েছে এমন প্রশ্ন করতে আমার ঘোর আপত্তি। আমিও পাত্তা না দিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর সে আমার পাশে এসে শুয়ে বললো-
__”আমি জোর করে সংসার করতে চাই না।”
আমি তার কথাতে হতবাক হয়ে গেলাম। হঠাৎ করে এমন কি ঘটলো যে সে এমন কথা বলছে? বিস্ময়ের স্বরে জিজ্ঞেস করলাম-
__”মানে?”
সে খুব স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিলো-
__”মানে খুব সহজ। তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।”
ওর কথাতে আমি চমকে উঠলাম। আমার চমকে উঠার তো কথা নয় তাহলে কেনো চমকে উঠলাম আমি? বললাম-
__”হঠাৎ এমন কথা কেনো বলছেন?”
খুব সহজ সরল ভাবে সে বললো-
__”সমাজের সামনে বর বউ সেজে থাকার এই নাটকটা আর কত দিন চলবে? আমার আর ভালো লাগছে না। আর আমিও চাই না তুমি বাধ্য হয়ে এই সম্পর্কটার ভেতরে আটকে থাকো। চাইলে চলে যাও আর নিজের মতো করে বাঁচো।”
ওর কথা শুনে মনটা খুশিতে ভরে না উঠে বিষাদে ছেয়ে গেলো কেনো সেটাই বুঝলাম না। আমি তো সত্যিই এই সম্পর্কটা ভেঙে বেরিয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু তার এসব বলার কি কারণ? এটা আমাকে জানতেই হবে। বললাম-
__”আমি নিজের মতো করে বাঁচবো আর আপনি?”
__”আমিও নতুন করে শুরু করবো।”
__”নতুন করে শুরু করবেন মানে?”
__”মানে সংসারি কোনো মেয়ে দেখে বিয়ে করবো।”
ওর মুখে বিয়ের কথা শুনে আমার হার্টবীট অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলো। মনে হচ্ছে এই বুঝি আমার হৃদপিন্ড সব কিছু ভেদ করে বাহিরে বেরিয়ে আসবে। কত বড় সাহস ছেলের, আবার বিয়ে করতে চায়! খুব রাগ হলো। এক রকম চেচিয়েই বললাম-
__”কিহ?”
__”যা বলেছি তাই। এখন ঘুম পেয়েছে গুড নাইট।”
আমাকে ইগ্নোর করা হচ্ছে? বের করছি ইগ্নোর করা। চিৎকার করে বললাম-
__”গুষ্ঠি কিলাই আপনার গুড নাইট এর। বউ ঘরে থাকতে আবার বিয়ে করার কথা বলেন আপনার তো সাহস কম না! এত সখ আপনার বিয়ে করার? নির্লজ্জ ছেলে একটা! আপনাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়া উচিত!”
__”বিয়েই তো শুধু করতে চেয়েছি, এতে নির্লজ্জতার কি আছে? আর তুমি তো এই বিয়েটাকেই মানো না। তাহলে আমি যদি দশটা বিয়ে করি তাতে তোমার কি?”
তাই তো! সত্যিই তো আমি এই বিয়েটাকে মানি না। তাহলে সে বিয়ে করলে আমার কি? কিন্তু আমি আপসেট হয়ে যাচ্ছি কেনো? 
__”ঠিক আছে আমি চলে গেলে যদি আপনি নতুন করে শুরু করতে পারেন তবে আমি চলেই যাবো।”
__”গুড গার্ল।”
__”এখন ঘুমান।”
__”তুমিও ঘুমাও।”
রাগে খিটখিট করে বললাম-
__”আমাকে নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। নিজের চর্কায় তেল দিন।”
__”সেটাও ঠিক। তোমাকে নিয়ে আমি কেনো ভাবতে যাবো?”
__”হ্যাঁ সেটাই তো! আমি আপনার কে যে আমাকে নিয়ে আপনি ভাবতে যাবেন?”
__”হ্যাঁ সত্যিই তুমি আমার কেউ না।”
“তুমি আমার কেউ না” এই বাক্য টুকু যেনো বিষ মাখানো তীরের মতো আমার কলিজাতে এসে বিঁধলো। আমি এই কথার তীরে আহত হলাম। তার মুখ থেকে সত্যি কথা শুনেও এমন আহত হবার কারণ আমি জানি না।
তার বিষ মাখানো তীরের বিষে নীল হয়ে আমার গোটা রাত নির্ঘুম হয়ে গেলো। আমি ঠায় বসে রইলাম।

বিয়ের প্রায় এক মাস হলো। আমি খাই দাই গান গাই, আর তাইরে নাইরে করে তাকে ইফটিজিং করি। মাঝরাতে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিই অকারণেই। সে রেগে যায় আবার ঘুমায়। ওর খাবারে লবণ ঝাল মিশিয়ে খাওয়ার বারোটা বাজাই। এসবে আমি পৈশাচিক আনন্দ পাই। কিন্তু আজকাল গানে আমার মন নেই। ভালো লাগে না গান গাইতে। নিজেকে আর গায়িকা গায়িকা মনে হয় না। যা একটু গানের ইচ্ছে ছিল তা আব্বুর জন্য আর হয় না। আব্বুকে কোনো ভাবেই ডেকে বেলকোণে আনতেও পারি না। আব্বুটাও আর কথা শোনে না। একলা গান গাওয়ার সাহস পাই না আমি। ঐ লাট সাহেবকে যতোটা সহজ সরল ভেবে ছিলাম সে আসলে ততোটা সহজ সরল নয়। ততোটাই বা বলছি কেনো? সে একদম সহজ সরল নয়, সে একটা জটিল মানুষ। যতোবার তাকে ফাঁসাতে গেছি ততোবারই আমি নিজেই ফেঁসে গেছি। বাধ্য হয়ে বাদ দিয়েছি আমার ইফটিজিং অভিযান। সে আমাকে সাবধান করেছে যদি আমি বেসুরো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাই তবে সে আমার হারমোনিয়াম ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেবে। তাই ভাবলাম হারমোনিয়ামটা অন্য রুমে রেখে আসবো। হারমোনিয়ামটা বিছানায় রেখে দেখছি আর ভাবছি প্রথম দিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাওয়ার স্মৃতি। যেদিন খোকাবাবু প্রথম বারান্দায় এসে দাড়িয়ে ছিল। আমিও সেদিন তাকে প্রথম দেখে ছিলাম। হাবলির মতো হা করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি আর সে খাইয়ালাইমু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। ভাগ্যিস সেদিন সে হারমোনিয়ামসহ আমাকে খেয়ে ফেলেনি। আজকাল আমি এই সব ভেবে আনন্দ পাই কেনো সেটাই আমার মাথায় ঢুকে না। ছাদে বসে যেদিন গান গেয়ে ছিলাম সেদিন ঐ লাট সাহেবের যে মুখের করুণ হাল হয়ে ছিল তা চোখে ভেসে উঠছে। উফ্ এখনো তার মুখটা করুণ আকার ধারণ করলে আমার খুব খুশি লাগে। হারমোনিয়ামটা মুছতে মুছতে এসব ভেবে আমি একাই হাসছি। হঠাৎ দেখি লাট সাহেব অফিস থেকে ফিরে এসে রুমে ঢুকলো। আমার দিকে তাকাতেই তার চোখ পড়লো হারমোনিয়ামের দিকে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ সে চিৎকার করে বললো-
__”তোমার আর কোনো কাজ নেই কা কা করা ছাড়া? দিন রাত আমাকে জ্বালানোর চুক্তি তোমাকে কে দিয়েছে? বলো কে দিয়েছে? কি চাও তুমি? আমি এবাড়ি ছেড়ে চলে যাই এটাই চাও তো? ওকে।”
আমি হতবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইলাম। সে চিৎকার করে মাকে রুমে ডেকে আনলো। মা এ রুমে এসে ওর সামনে হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলেন। সীমান্ত বললো-
__”দেখো ভর সন্ধ্যে বেলায় এই মেয়েটা গান নিয়ে বসে আছে। যেনো অফিস থেকে ফিরে এসেই আমার মাইগ্রেন শুরু হয়। একটা সংসারী মেয়ে দেখে তো বিয়ে দিতে পারতে। আমি তো বলিনি যে আমি কখনো বিয়েই করবো না। বিয়ে তো করতামই। একটা ভালো মেয়ের সাথে তো বিয়ে দিতে পারতে। আমার জীবনটা নষ্ট করে দিলে তুমি আম্মু। এই বাড়িটাকে আমার নরক মনে হয়। একদিন ঠিক আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। কোথায় যাবো সে হদিস কেউ পাবে না, মনে রেখো।”
কথাটা গুলো একদমে বলে সে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। মা পিছু পিছু বাবু বাবু বলে ডাকতে ডাকতে রুম থেকে বেরিয়ে সদর দরজা পর্যন্ত গেলেন। সীমান্ত পিছু ফিরে থাকালো না। আমি হা করে চেয়ে রইলাম। এমন একটা ঘটনার জন্য আমি একদম প্রস্তুত ছিলাম না। আজকে কেনো জানি সীমান্তর এই রাগ দেখে আমার ঈদ ঈদ লাগছে না। তার কথা গুলো বার বার আমার কানে বাজছে আর কলিজাতে আঘাত লাগছে। আমি বুঝেই উঠতে পারছি না যে আমার এমন কেনো লাগছে। 
এগারোটা পার হয়ে গেলেও সীমান্ত বাড়ি ফিরলো না। ওর ফোন বন্ধ, মা সেই থেকেই তাকে ফোনে ট্রাই করে যাচ্ছেন। আজ নিজেকে আসামি মনে হচ্ছে। এমন আসামী হয়ে এবাড়িতে থাকতে নিজের কাছেই ইতস্তত লাগছে। আমি মায়ের রুমে গিয়ে বললাম-
__”মা আমি আসছি।”
মা অবাক হয়ে বললেন-
__”আসছি মানে?”
__”আমি চাই না কেউ আমার জন্য নিজের ঘর ছাড়ুক,আমি এতটাও খারাপ মেয়ে নই। আমি চলে গেলেই সে ঘরে ফিরবে। তুমি আমাকে বাঁধা দিও না প্লিজ!”
__”আমার কথা শোন বর্ণ। যাসনা প্লিজ!”
মা পিছু ডাকলেন কিন্তু আমি পিছু ফিরে দেখলাম না। মায়া একটু একটু করে কেটে যাক।

এত রাতে বেল বাজাচ্ছি, যুথী দরজা খুলে আমাকে দেখে অবাক হলো। আমি কিছু না বলে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। কিছুক্ষণ পর আম্মু দরজায় নক করে বর্ণ বর্ণ বলে চিৎকার করতে শুরু করলো। আমি জানি যে আমার আম্মু পরিস্থিতি বুঝবে না। কোনো কালেও সে এসব বুঝেনি। এসব বুঝার অভ্যেস নেই তার। আমার যে কখনো কখনো একলা থাকতে ইচ্ছে করতে পারে সেই সাধারণ নলেজ টুকু তার নেই। দরজা না খোলা পর্যন্ত ননস্টপ সে দরজা ধাক্কিয়েই যাবে। এতে দরজা ভেঙে যায় যাক। নিরুপায় হয়ে দরজা খুলে দিলাম। দেখি আব্বু আর আম্মু উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আম্মু বললো-
__”এত রাতে তুই একা এসেছিস, কি হয়েছে? সীমান্ত কোথায়?”
আমি রেগে গিয়ে বললাম-
__”সীমান্ত সীমান্তে গেছে। আমি কি লন্ডন থেকে আসছি যে একা আসা যাবে না? নাকি বডি গার্ড লাগবে আমাকে পৌছে দিতে? বিয়ে তো দিয়েছো পাশের বাড়িতে তাহলে একলা আসা নিয়ে এত দাফাদাফি করছো কেনো? নাকি আমাকে বাচ্চা মনে করছো? দয়া করে আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
__” এ ভাবে রিয়্যাক্ট করছিস কেনো? কি এমন বলেছি আমি? কি হয়েছে বলবি তো?”
__”বিয়ে দিতে চেয়ে ছিলে বিয়ে দিয়েছো। এবার আমাকে একটু শান্তি দাও। নইলে কিন্তু গলায় ফাঁস দেবো। দোহাই লাগে যাও এখন।”
আম্মু আব্বু দাড়িয়েই থাকলো, আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। নষ্ট এই পৃথিবীতে, নষ্ট সব কিছু। নষ্ট এই অনুভূতিও।

পরের দিন সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো। দরজায় নক শুনে দরজা খুলেই দেখি মা দাড়িয়ে। আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলেন তিনি। তারপর বললেন-
__”বাড়ি ফিরে চল মা।”
__”মা আমায় তুমি ফিরতে বলো না। কেনো ফিরবো না তা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না।”
__”বলতে হবে না। আমি সব বুঝি। এবার ফিরে চল।”
__”মা তুমি আমায় ক্ষমা করো প্লিজ! এই বিয়ের দায় আমি আর বহন করতে পারছি না। আমাদের আলাদা থাকাই বেটার।”
__”এসব তুই কি বলছিস বর্ণ?”
__”এটাই বাস্তব।”
অনেকক্ষণ ধরে নানা ভাবে মা আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মন খারাপ করে চলে গেলেন। মাকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে সত্যিই আমার খুব কষ্ট হলো কিন্তু আমি তার ছেলের সামনে যেতে চাই না। চাই না আমার কারণে তার ঘর নরক হোক। সে ভালো থাকুক আমাকে ছাড়া। বিয়ে একটা মেয়ের ভেতর বাহিরটা বিস্ময়কর ভাবে বদলে দেয় যার হদিস কোনো পুরুষ জানতেই পারে না। হয়তো ঐ লাট সাহেবটাও কখনো এটা উপলব্ধি করতে পারবে না।

সীমান্তর উপর রাগ করে দু’দিন কেটে গেলো । তারপর রাগ পড়তে শুরু করলো। রাগ পড়ে যেতেই বিপত্তি ঘটলো। এর মধ্যে লাট সাহেব কোনো রকম যোগাযোগ করলো না আমার সাথে। সে হয়তো খুব শান্তিতেই আছে। তাকে জ্বালানোর জন্য তো বর্ণিতা নেই, শান্তিতে থাকারই কথা। কিন্তু রাগ পড়ে যাবার পর থেকে আমি তো শান্তিতে নেই। আমার আজকাল আর কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমার মন বেলকোণে পড়ে থাকে। কিন্তু আমি মনটাকে আটকে ঘরে রাখি। ছুটির দিনের বিকেলে আমার মনটা ছাদে যেতে চায়। হয়ত দেখতে চায় সেখানে কেউ একজন বই খুলে চেয়ার পেতে বসে আছে। আমি মনটাকে শেকলে আটকাই। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা একটু সরিয়ে কারো অফিস যাওয়া দেখি। নিজের এমন ছ্যাচড়ামী দেখে নিজেই হতবাক হয়ে তাজ্জব বনে যাচ্ছি। অথচ সেই মানুষটার মনের কোনো হেলদোল নেই। স্বার্থপর একটা! আর এই মানুষটার সাথেই আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে। এদের সবাইকে জেলে দেয়া উচিত।

“শোনো, কাজল চোখের মেয়ে
আমার দিবস কাটে, বিবশ হয়ে
তোমার চোখে চেয়ে!”
সাদাত হোসাইনের কবিতার বই পড়ছি। হঠাৎ এই তিন লাইনে আটকে গেলো আমার হৃদয়। এই টুকু পড়তেই আমার কি হলো জানি না। আমি বিছানা থেকে নেমে সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে, নিজের চোখের দিকে চেয়ে রইলাম। এই চোখে আমি কোনো কালেও কাজল আঁকিনি। কখনো কারো জন্য কাজল আঁকতে ইচ্ছে করেনি। কেনো ইচ্ছে করেনি তা আমি জানি না, কখনো জানার চেষ্টাও করিনি। অথচ আজ তিন লাইন কবিতা পড়ে আমার অনুভূতির ঝটকায় হালকা হাওয়া শুরু হলো। এ হাওয়া ঝড় হয়ে যেনো বয়ে না যায়। ঝড় হয়েই বা কি হবে? আমার চোখে চেয়ে তো কারো দিবস বিবশ হয় না। আর সে অপেক্ষাও নেই আমার। কিন্তু আমার দিবস তো বিবশ হয়ে কাটছে আকাশ পানে চেয়ে। এত তারা চাঁদ সূর্য গ্রহ নক্ষত্র নিয়েও আকাশটা কিন্তু একলাই। অথচ জীবনের এত গুলো বছরে আমি এসব খেয়ালই করিনি কিংবা ভেবেই দেখিনি। আজ আমার বিবশ মনের ওপারে দাড়িয়ে আছে একটা মানুষ, যাকে আমি ভালোবাসি না। আমি বুঝে উঠতে পারি না তাকে ঘিরেই কেনো আমার এই বিষণ্নতা! 
আমি যখন আকাশ নিয়ে ভাবনায় ভীষণ মগ্ন তখন, হঠাৎ চা হাতে যুথী রুমে এলো। বিছায় পড়ে থাকা কবিতার বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকলো। ওর মুখভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে, সে এক ইংলিশ ম্যাম, যে বাংলা ভাষা একদম বুঝে না। আমি চায়ে চুমুক দিতেই সে বললো-
__”দেখেন বন্ন আফা এই ব্যাডা দেখতে কি সুন্দর!”
আমি দেখলাম বইয়ের তলপিঠের মোলাটে লেখকের সুন্দর হাস্যজ্জ্বল একটা ছবি দেয়া আছে। আমি যুথীর কথার জবাব দিলাম না। 
__”আফা এই পোলা ক্যাডা?”
__”এটা কবি, যে এই বইয়ের সব কবিতা লিখেছে।”
__”এমন পোলার লগে আপ্নের বিয়া হইলে ভালা হইতো।”
__”কেনো?”
__”সে আপনেরে নিয়া এক গামলা কবিতা ল্যাখতো।”
__”হইছে থাম। একজনকে বিয়ে করে তো জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেছে। বিয়ের নাম একদম মুখে আনবি না। আমি ঘৃণা করি বিয়ে শাদীকে।”
__”বিয়ারে হ্যাট করেন আর যাই করেন আফা, এই পোলারে আগে দ্যাখলে হ্যার লগেই আপ্নের বিয়া দিলামনি।”
ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে যেনো আমাকে বিয়ে দেয়ার কন্ট্রাক্ট নিয়েছে। বললাম-
__”এ ছেলের বউ অথবা প্রেমিকা আছে। তোর মনের আশা পূর্ণ হতো না।”
সে হতবাক চোখে তাকিয়ে বললো-
__”আপ্নে জানলেন ক্যাম্নে?”
__”কাজল চোখ নিয়ে তো আর হুদাই লেখেনি, কোনো মেয়েকে নিয়েই লিখেছে নিশ্চয়ই। কবি লেখকদের লেখার অন্তরালে কেউ একজন থাকে। যার প্রতি অনুভূতি ঘিরেই তারা লেখে। যেমন রবি ঠাকুরের লেখার অন্তরালে তার বৌদি কাদম্বরী দেবী ছিলেন। পরে নাকি আরো অনেক মেয়েই এসেছিল রবি ঠাকুরের লেখার অন্তরালে। তবে তার বউ কখনো অন্তরালে ছিলেন সেটা শুনিনি। যদিও এসব শোনা কথা। আর ছেলেরা বোধ হয় বউকে নিয়ে এমন রোমান্টিক কবিতা লেখে না। যা লেখে সব অন্য মেয়েকে নিয়ে লেখে। হতে পারে সে প্রেমিকা।”
জানি না কি বুঝে এসব যুথীর মতো নির্বোধ মেয়েকে বললাম। আমার ভেতরে কি এমন আক্ষেপ লুকিয়ে আছে যে এসব কথা যুথীকে বলতে হবে? যুথী ওসব কথার মাথামুন্ডু কিচ্ছু না বুঝে বললো-
__”আপ্নে যদি কবি হইতেন তাইলে আপ্নের লেখার অন্ত আড়ালে ক্যাডায় থাকতো বন্ন আফা?”
ওর কথা শুনে হঠাৎ আমার মনে হলো সত্যিই তো কে থাকতো? অন্তরালে কেউ থাকতো না বলেই হয়তো আমি কবি বা লেখক হইনি। বললাম-
__”তুই থাকতি।”
সে চোখ কপালে তুলে বললো-
__”ওরে আল্লাহ! আমি ক্যান?”
__”আমার ইচ্ছা তাই। এখন তো বুঝেছিস যে আমি কেমন বকের ঠ্যাং মার্কা কবি হতাম?”
__”হ বুঝছি। যাইগা কাম আছে।”
কথাটা বলেই সে উঠে দাড়ালো। তারপর দরজার কাছে গিয়ে পেছন ফিরে চেয়ে বললো-
__”তয় আরেকটা কথা হইলো দুলাভাইরে রাখলেও পারতেন আপ্নের লেখার অন্ত আড়ালে। বস্তাখানেক বকের ঠ্যাং না হয় তারে নিয়াই ল্যাখতেন। বেচারা খুশিই হইতো।”
কথাটা বলেই সে দৌড়ে চলে গেলো। ওর কথা শুনে আমার খুব হাসি পেলো। আমি একাই হেসে লুটিয়ে পড়লাম। আমি খাতা কলম হাতে নিয়ে বকের ঠ্যাং লিখতে বসলাম। আগে পিছে কিছু না ভেবেই লিখলাম-
“আমার দিবস যেনো কাটছে ওগো
আকাশ পানে চেয়ে
তুমি শুনছো নাকি ছেলে?”
কিভাবে যেনো হুড়মুড় করে আমিও তিন লাইন লিখে ফেললাম। কি করে পারলাম সেটাই এক বিস্ময়কর ঘটনা। হঠাৎ মনে হলো আমার দিবস মোটেও আকাশ পানে চেয়ে কাটছে না। ভুল লিখেছি আমি, এমনটা মনে হতেই আমি ক্রস চিহ্ন দিয়ে লেখা কেটে দিয়ে নিচে লিখলাম।

“আমি নই ফেলনা কোনো মেয়ে
সব বিবশতা কাটিয়ে নিয়ে
যাবো তোমায় ভুলে
তুমি শুনছো নাকি ছেলে?
আমি নই ফেলনা কোনো মেয়ে
তোমার জন্যে ভাবতে আমার
গেছে যেনো বয়ে
তুমি শুনছো নাকি ছেলে?”

এই আট লাইন লিখে ভয়ে লাফ দিয়ে দাড়ালাম। আমি যেনো ঘেমে নেয়ে এক হয়ে যাচ্ছি। কবিতা আর বর্ণিতা! ওহ নোহ! এজীবনে কবিতার ‘ক’ও বর্ণিতা কখনো লেখেনি আর সেখানে আজ আট লাইন লিখে না জানি কত কবিকে অজান্তেই আপমান করে বসেছি। এই আট লাইন বকের ঠ্যাং লিখে নিজেকে একটু একটু কবি কবি মনে না হলেও খুব শান্তি পাচ্ছি। ইচ্ছে করছে ঐ লাট সাহেব বান্দরটাকে পঁচিয়ে একটা কবিতা লিখি। কিন্তু আমার মাথায় আর কিছু এলোই না।

সব বিবশতা কাটিয়ে আমি কৃত্রিম খুশি আনার প্রচেষ্টা করে চলেছি। নিজেকে একলা সুখের খেয়ায় ভাসিয়ে হাসতে চাই আমি, উল্লাস করতে চাই আমি। কারণ যে সম্পর্কটাকে কখনো মন থেকে মানতেই পারিনি সেই সম্পর্কটাকে ঘিরে বিষণ্নতা বড্ড বেমানান। এটা বর্ণিতার সাথে যায় না। আমি নিজেকে ভালোবাসি আর নিজেকেই ভালোবাসতে চাই। তাই তো মনটাকে ভালো রাখার উপায় আমাকেই খুঁজতে হবে। অনেক ভেবে ভেবে বের করলাম একলা আকাশে এই একলা আমিটাই কিছু ভালোলাগা উড়াই। যুথীকে ডেকে বললাম-
__”ঘুড়ি বানাতে পারিস?”
সে চোখ কপালে তুলে বললো- 
__”ঘুরি দিয়া কি করবেন বন্ন আফা?”
__”ঘুড়ির সাথে উড়বো। বল পারিস কি না?”
__”ওরে আল্লাহ! ঘুরি তো আর বিমান না। আপ্নে উড়বেন ক্যাম্নে?”
__”এত কথা বাদ দিয়ে বল পারিস কি না?”
__”বানাইয়া দিতে পারুম কিন্তু উড়বো কি না গ্যান্টি নাই।”
__”গ্যান্টি না গ্যারান্টি। ঘুড়ি যদি আকাশে না উড়ে তাহলে ওটা ঘুড়ি বানাতে পারা হলো?”
__”ঘুরির বডি কিন্তুক অন্য ঘুরিগেরে মতনই দ্যাখতে হইবো। খালি উড়বো না এই আর কি!”
__”ঘুড়ির বডি দেখতে এক রকম হলেই হবে নাকি? কি ঘোড়ার ডিম শিখেছিস তুই?”
__”আফা ঘোড়া কিন্তুক ডিম পাড়ে না।”
__”ওমা তাই নাকি? আমি তো জানতাম পাড়ে।”
__”কন কি? দ্যাখছেননি?”
__”এসব কথা বাদ দিয়ে আব্বুকে ডেকে আন। আব্বু নিশ্চয়ই ঘুড়ি বানাতে পারে।”
__”খালুজান আবার কবে ঘুরি উড়াইলো?”
ওর প্রশ্নে অতিষ্ঠ হয়ে বললাম-
__”বিয়ের পরে আব্বু আর আম্মু ঘুড়ি উড়াইছে। তাই বানাতে পারে। এখন যা ডেকে নিয়ে আয়।”
যুথী দৌড়ে গিয়ে আব্বুকে ডেকে আনলো।
আব্বুকে বললাম-
__”ঘুড়ি বানিয়ে দাও তো।”
আব্বু বিস্ময়ের স্বরে বললেন-
__”ঘুড়ি কি করবি?”
__”এটা দিয়ে নিশ্চয়ই ইফটিজিং করবো না?”
__”এটা দিয়ে ইফটিজিং করা গেলে তো হেব্বি হতো। জামাই ব্যাটাকে শায়েস্তা করতাম।”
__”শায়েস্তা তো তোমরা সবাই মিলে আমাকে করেছো।”
আমার কথায় আব্বুর মুখটা ভার হয়ে গেলো। বললেন-
__”শায়েস্তা নয় রে মা, চেয়েছি তোর একটা গোছানো জীবন হোক। একদিন আমরা পৃথিবীতে থাকবো না তখন তুই যে বড় নিঃসঙ্গ হয়ে যাবি। তাই চেয়ে ছিলাম…..”
__”জীবনটা কি গোছানো হলো আব্বু?”
__”ভাবতেই পারিনি যে গোছাতে গিয়ে তোর এলোমেলো জীবনটাকে ভেঙে চুরমার করে ফেলবো। স্যরি রে, ভেরী ভেরী স্যরি।”
__”যাই হোক, এখন ঘুড়িটা বানিয়ে দাও।”
আব্বু নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বললেন-
__”এত বছর চর্চা নেই মনে আছে কি না কে জানে!”
__”যে টুকু মনে আছে সেটুকু নিয়েই শুরু করো।”

অনেক কষ্টে আমরা তিনজন মিলে একটা ঘুড়ি বানালাম। 
যুথী বললো-
__”আফা এই ঘুরি ওড়বেনি তো?”
__”উড়বে না কেনো?”
__”খালুর ঘুরি দেইখা কিরাম যেন লাগতাছে।”
__”দেখা যাক উড়ে কি না।”

কেনো জানি মনে হলো খোলা আকাশে ঘুড়ি উড়ালে আমার মনটা ভালো হবে। ছুই ছুই সন্ধ্যায় যুথীকে সাথে নিয়ে ছাদে গেলাম ঘুড়ি উড়াতে। কিন্তু মনের যেনো কোনো হেলদোল নেই। পাশের ছাদে বারবার চোখ আটকে যাচ্ছে। ঘুড়ির দিকে তাকাবো নাকি পাশের ছাদে তাকাবো? কেনো যে একসাথে অনেক দিকে তাকানো যায় না! ধুর!
হঠাৎ পাশের ছাদে নায়কের আগমন ঘটলো, নায়িকা নায়ককে দেখে মুখ ভেংচিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। নায়ক বিমুগ্ধ চোখে নায়িকাকে দেখছে। নায়িকা ডোন্ট কেয়ার মুখভঙ্গিমায় উপরে চেয়ে আছে, হাব ভাবএ যেনো সে ঘুড়ি উড়ানো মুখস্ত করছে গভীর মনোযোগে। মাঝে মাঝে নায়িকা আড়চোখে নায়কের দিকে তাকাচ্ছে, নায়কের দৃষ্টি কোন্ দিকে সেটা দেখার জন্য। নায়ক একটু ভাব নিয়ে আকাশ বাতাস আর গাছের পাতা দেখছে। নায়িকা আড় চোখে তার পাতা দেখা দেখছে। যুথী নামক কাবাবের হাড্ডিটা একবার নায়ক আর একবার নায়িকার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। এদিকে ঘুড়িটা যে কোন্ দিকে যাচ্ছে তা কেউ জানে না। 
ছাদে লাট সাহেবকে দেখে মনের গভীরে খুশির স্রোত বয়ে গেলেও বাহিরে আমি বিরক্তির ছাপ এঁকে রাখলাম। হঠাৎ যুথীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে সীমান্তর দিকে তাকিয়ে আছে। ধমক দিয় বললাম-
__”ঐ কি দেখিস?”
সে থতমত খেয়ে বললো-
__”কই কি দেখি?”
আমি চোখ পাকিয়ে বললাম-
__”বুইড়া ধাইড়া খোকাবাবুকে দেখার কি আছে রে?”
__”উ না, আমি তো পাতা দেখতাছি।”
__”পাতার কি দেখিস?”
__”ঐ গাছের পাতা এই গাছের পাতারে দেখতাছে। আর এই গাছের পাতাও লুকাইয়া ঐ গাছের পাতারে দেখতাছে। আমি তাগো দেখতাছি।”
আমি হতবাক হয়ে বললাম-
__”এক গাছের পাতা আরেক গাছের পাতাকে দেখছে?”
__”হ”
__”ফালতু কথা রাখ।”
হঠাৎ যুথী লাট সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো-
__”ও দুলাভাই আপ্নে ভালা আছেননি?”
সে মুখে এক চিলতে হাসি এঁকে বললো-
__”হ্যাঁ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো যুথী?”
__”সেরাম ভালা আছি। আইসেন ঘুরি উড়াই।”
__”আমি তো এসব পারি না।”
__”আমি শিখাইয়া দিমুনে।”
ওদের কথা শুনে গা জ্বলতে শুরু করলো। আমার সাথে একটাও কথা না বলে যুথীর সাথে কথা বলছে। আমি কেমন আছি তা জানার দরকার নেই। যুথী কেমন আছে সেটা তার জানতে হবে। থাকবোই না ছাদে। আমি হনহন করে চলে আসতেই শুনলাম, সীমান্ত বললো-
__”আচ্ছা আরেক দিন উড়াবো। এখন একটা জরুরী কাজ আছে।”
যুথী আমাকে ডেকে বললো-
__”বন্ন আফা যাইতাছেন ক্যা?”
আমি রাগ করে বললাম-
__”ঘুম ধরেছে তাই চলে যাচ্ছি।”
__”ঘুরি তো নামাইতে হইবো আফা।”
আমি চেচিয়ে উঠে বললাম-
__”ঐ লাট সাহেবকে বল নামিয়ে দেবে।”
যুথী সীমান্তকে বললো-
__”আফা আপ্নেরে ঘুরি নামাই দিতে কইছে দুলাভাই। আইসেন ঘুরিডা নামাইয়া দেন।”
সীমান্ত বললো-
__”যুথী ঐ বখাটে মেয়েকে বলো, সীমান্ত এসব পারে না।”
যুথী আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
__”আইচ্চ্যা। আফা লাট সাব এই সব পারে না।”
আমি বললাম-
__”কি পারে লাট সাহেব?”
যুথী তাকে বললো-
__”কি পারেন আপ্নে দুলাভাই?”
সে বললো-
__”যুথী তাকে বলো, সীমান্ত তার মতো বখাটে কাজ করতে পারে না। সে খুব ভদ্র ছেলে।”
যুথী আমার দিকে ঘুরে বললো-
__”আফা দুলাভাই আপ্নের মতো বখাইট্টা কাম করতে পারে না। লাট সাব সেরাম ভদ্র।”
আমি রেগে উঠে বললাম-
__”তাকে বল সে যেনো আমাকে নিয়ে টানাটানি না করে।”
যুথী ওর দিকে তাকিয়ে বললো-
__”দুলাভাই আপনে আফারে নিয়া টানাটানি কইরেন না। এর ফলাফল ভালা হইবো না কয়া দিলাম।”
সীমান্ত ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো-
__”তাকে বলো, বখাটে মেয়েকে টানতে সীমান্তর বয়েই গেছে।”
যুথী আমাকে বললো-
__”আফা আপ্নের মতন বখাইট্টা মাইয়ারে টানতে দুলাভাইয়ের বইয়াই গ্যাছে গা।”
আমি যুথীর কীর্তি দেখে প্যাঁচ কষে বললাম-
__”তাকে বল সে একটা ধেড়ে বুড়ো ফাজিল পাজি বদ বজ্জাত খোকাবাবু।”
যুথী কিছু না বুঝেই তাকে বললো-
__”দুলাভাই আপ্নে একখান ধাইড়া বুইড়া ফাজিল পাজি বদ বজ্জাত খোকাবাবু।”
যুথীর কথা শুনে লাট সাহেব বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। যুথী ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললো-
__”ওরে আল্লাহ আমার হাতে কত কাম আর আমি এইখানে কি করতাছি? এই যুতী এইখানে কি করস রে? কাম চুন্নি একখান! খালাম্মা আইজ সেরাম বকবেনি। যাই বাবাহ।”
যুথী নাটাইটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দৌড়ে নিচে চলে গেলো। যুথীর কীর্তিকলাপ দেখে আমার খুব হাসি পেলেও হাসি চেপে রাখলাম। লাট সাহেবের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকে আমি রাগে নাটাই ছেড়ে দিয়ে রুমে চলে এলাম।

“শোনো, কাজল চোখের মেয়ে
আমার দিবস কাটে, বিবশ হয়ে
তোমার চোখে চেয়ে!”
সাদাত হোসাইনের কবিতার বই পড়ছি। হঠাৎ এই তিন লাইনে আটকে গেলো আমার হৃদয়। এই টুকু পড়তেই আমার কি হলো জানি না। আমি বিছানা থেকে নেমে সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে, নিজের চোখের দিকে চেয়ে রইলাম। এই চোখে আমি কোনো কালেও কাজল আঁকিনি। কখনো কারো জন্য কাজল আঁকতে ইচ্ছে করেনি। কেনো ইচ্ছে করেনি তা আমি জানি না, কখনো জানার চেষ্টাও করিনি। অথচ আজ তিন লাইন কবিতা পড়ে আমার অনুভূতির ঝটকায় হালকা হাওয়া শুরু হলো। এ হাওয়া ঝড় হয়ে যেনো বয়ে না যায়। ঝড় হয়েই বা কি হবে? আমার চোখে চেয়ে তো কারো দিবস বিবশ হয় না। আর সে অপেক্ষাও নেই আমার। কিন্তু আমার দিবস তো বিবশ হয়ে কাটছে আকাশ পানে চেয়ে। এত তারা চাঁদ সূর্য গ্রহ নক্ষত্র নিয়েও আকাশটা কিন্তু একলাই। অথচ জীবনের এত গুলো বছরে আমি এসব খেয়ালই করিনি কিংবা ভেবেই দেখিনি। আজ আমার বিবশ মনের ওপারে দাড়িয়ে আছে একটা মানুষ, যাকে আমি ভালোবাসি না। আমি বুঝে উঠতে পারি না তাকে ঘিরেই কেনো আমার এই বিষণ্নতা! 
আমি যখন আকাশ নিয়ে ভাবনায় ভীষণ মগ্ন তখন, হঠাৎ চা হাতে যুথী রুমে এলো। বিছায় পড়ে থাকা কবিতার বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকলো। ওর মুখভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে, সে এক ইংলিশ ম্যাম, যে বাংলা ভাষা একদম বুঝে না। আমি চায়ে চুমুক দিতেই সে বললো-
__”দেখেন বন্ন আফা এই ব্যাডা দেখতে কি সুন্দর!”
আমি দেখলাম বইয়ের তলপিঠের মোলাটে লেখকের সুন্দর হাস্যজ্জ্বল একটা ছবি দেয়া আছে। আমি যুথীর কথার জবাব দিলাম না। 
__”আফা এই পোলা ক্যাডা?”
__”এটা কবি, যে এই বইয়ের সব কবিতা লিখেছে।”
__”এমন পোলার লগে আপ্নের বিয়া হইলে ভালা হইতো।”
__”কেনো?”
__”সে আপনেরে নিয়া এক গামলা কবিতা ল্যাখতো।”
__”হইছে থাম। একজনকে বিয়ে করে তো জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেছে। বিয়ের নাম একদম মুখে আনবি না। আমি ঘৃণা করি বিয়ে শাদীকে।”
__”বিয়ারে হ্যাট করেন আর যাই করেন আফা, এই পোলারে আগে দ্যাখলে হ্যার লগেই আপ্নের বিয়া দিলামনি।”
ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে যেনো আমাকে বিয়ে দেয়ার কন্ট্রাক্ট নিয়েছে। বললাম-
__”এ ছেলের বউ অথবা প্রেমিকা আছে। তোর মনের আশা পূর্ণ হতো না।”
সে হতবাক চোখে তাকিয়ে বললো-
__”আপ্নে জানলেন ক্যাম্নে?”
__”কাজল চোখ নিয়ে তো আর হুদাই লেখেনি, কোনো মেয়েকে নিয়েই লিখেছে নিশ্চয়ই। কবি লেখকদের লেখার অন্তরালে কেউ একজন থাকে। যার প্রতি অনুভূতি ঘিরেই তারা লেখে। যেমন রবি ঠাকুরের লেখার অন্তরালে তার বৌদি কাদম্বরী দেবী ছিলেন। পরে নাকি আরো অনেক মেয়েই এসেছিল রবি ঠাকুরের লেখার অন্তরালে। তবে তার বউ কখনো অন্তরালে ছিলেন সেটা শুনিনি। যদিও এসব শোনা কথা। আর ছেলেরা বোধ হয় বউকে নিয়ে এমন রোমান্টিক কবিতা লেখে না। যা লেখে সব অন্য মেয়েকে নিয়ে লেখে। হতে পারে সে প্রেমিকা।”
জানি না কি বুঝে এসব যুথীর মতো নির্বোধ মেয়েকে বললাম। আমার ভেতরে কি এমন আক্ষেপ লুকিয়ে আছে যে এসব কথা যুথীকে বলতে হবে? যুথী ওসব কথার মাথামুন্ডু কিচ্ছু না বুঝে বললো-
__”আপ্নে যদি কবি হইতেন তাইলে আপ্নের লেখার অন্ত আড়ালে ক্যাডায় থাকতো বন্ন আফা?”
ওর কথা শুনে হঠাৎ আমার মনে হলো সত্যিই তো কে থাকতো? অন্তরালে কেউ থাকতো না বলেই হয়তো আমি কবি বা লেখক হইনি। বললাম-
__”তুই থাকতি।”
সে চোখ কপালে তুলে বললো-
__”ওরে আল্লাহ! আমি ক্যান?”
__”আমার ইচ্ছা তাই। এখন তো বুঝেছিস যে আমি কেমন বকের ঠ্যাং মার্কা কবি হতাম?”
__”হ বুঝছি। যাইগা কাম আছে।”
কথাটা বলেই সে উঠে দাড়ালো। তারপর দরজার কাছে গিয়ে পেছন ফিরে চেয়ে বললো-
__”তয় আরেকটা কথা হইলো দুলাভাইরে রাখলেও পারতেন আপ্নের লেখার অন্ত আড়ালে। বস্তাখানেক বকের ঠ্যাং না হয় তারে নিয়াই ল্যাখতেন। বেচারা খুশিই হইতো।”
কথাটা বলেই সে দৌড়ে চলে গেলো। ওর কথা শুনে আমার খুব হাসি পেলো। আমি একাই হেসে লুটিয়ে পড়লাম। আমি খাতা কলম হাতে নিয়ে বকের ঠ্যাং লিখতে বসলাম। আগে পিছে কিছু না ভেবেই লিখলাম-
“আমার দিবস যেনো কাটছে ওগো
আকাশ পানে চেয়ে
তুমি শুনছো নাকি ছেলে?”
কিভাবে যেনো হুড়মুড় করে আমিও তিন লাইন লিখে ফেললাম। কি করে পারলাম সেটাই এক বিস্ময়কর ঘটনা। হঠাৎ মনে হলো আমার দিবস মোটেও আকাশ পানে চেয়ে কাটছে না। ভুল লিখেছি আমি, এমনটা মনে হতেই আমি ক্রস চিহ্ন দিয়ে লেখা কেটে দিয়ে নিচে লিখলাম।

“আমি নই ফেলনা কোনো মেয়ে
সব বিবশতা কাটিয়ে নিয়ে
যাবো তোমায় ভুলে
তুমি শুনছো নাকি ছেলে?
আমি নই ফেলনা কোনো মেয়ে
তোমার জন্যে ভাবতে আমার
গেছে যেনো বয়ে
তুমি শুনছো নাকি ছেলে?”

এই আট লাইন লিখে ভয়ে লাফ দিয়ে দাড়ালাম। আমি যেনো ঘেমে নেয়ে এক হয়ে যাচ্ছি। কবিতা আর বর্ণিতা! ওহ নোহ! এজীবনে কবিতার ‘ক’ও বর্ণিতা কখনো লেখেনি আর সেখানে আজ আট লাইন লিখে না জানি কত কবিকে অজান্তেই আপমান করে বসেছি। এই আট লাইন বকের ঠ্যাং লিখে নিজেকে একটু একটু কবি কবি মনে না হলেও খুব শান্তি পাচ্ছি। ইচ্ছে করছে ঐ লাট সাহেব বান্দরটাকে পঁচিয়ে একটা কবিতা লিখি। কিন্তু আমার মাথায় আর কিছু এলোই না।

সব বিবশতা কাটিয়ে আমি কৃত্রিম খুশি আনার প্রচেষ্টা করে চলেছি। নিজেকে একলা সুখের খেয়ায় ভাসিয়ে হাসতে চাই আমি, উল্লাস করতে চাই আমি। কারণ যে সম্পর্কটাকে কখনো মন থেকে মানতেই পারিনি সেই সম্পর্কটাকে ঘিরে বিষণ্নতা বড্ড বেমানান। এটা বর্ণিতার সাথে যায় না। আমি নিজেকে ভালোবাসি আর নিজেকেই ভালোবাসতে চাই। তাই তো মনটাকে ভালো রাখার উপায় আমাকেই খুঁজতে হবে। অনেক ভেবে ভেবে বের করলাম একলা আকাশে এই একলা আমিটাই কিছু ভালোলাগা উড়াই। যুথীকে ডেকে বললাম-
__”ঘুড়ি বানাতে পারিস?”
সে চোখ কপালে তুলে বললো- 
__”ঘুরি দিয়া কি করবেন বন্ন আফা?”
__”ঘুড়ির সাথে উড়বো। বল পারিস কি না?”
__”ওরে আল্লাহ! ঘুরি তো আর বিমান না। আপ্নে উড়বেন ক্যাম্নে?”
__”এত কথা বাদ দিয়ে বল পারিস কি না?”
__”বানাইয়া দিতে পারুম কিন্তু উড়বো কি না গ্যান্টি নাই।”
__”গ্যান্টি না গ্যারান্টি। ঘুড়ি যদি আকাশে না উড়ে তাহলে ওটা ঘুড়ি বানাতে পারা হলো?”
__”ঘুরির বডি কিন্তুক অন্য ঘুরিগেরে মতনই দ্যাখতে হইবো। খালি উড়বো না এই আর কি!”
__”ঘুড়ির বডি দেখতে এক রকম হলেই হবে নাকি? কি ঘোড়ার ডিম শিখেছিস তুই?”
__”আফা ঘোড়া কিন্তুক ডিম পাড়ে না।”
__”ওমা তাই নাকি? আমি তো জানতাম পাড়ে।”
__”কন কি? দ্যাখছেননি?”
__”এসব কথা বাদ দিয়ে আব্বুকে ডেকে আন। আব্বু নিশ্চয়ই ঘুড়ি বানাতে পারে।”
__”খালুজান আবার কবে ঘুরি উড়াইলো?”
ওর প্রশ্নে অতিষ্ঠ হয়ে বললাম-
__”বিয়ের পরে আব্বু আর আম্মু ঘুড়ি উড়াইছে। তাই বানাতে পারে। এখন যা ডেকে নিয়ে আয়।”
যুথী দৌড়ে গিয়ে আব্বুকে ডেকে আনলো।
আব্বুকে বললাম-
__”ঘুড়ি বানিয়ে দাও তো।”
আব্বু বিস্ময়ের স্বরে বললেন-
__”ঘুড়ি কি করবি?”
__”এটা দিয়ে নিশ্চয়ই ইফটিজিং করবো না?”
__”এটা দিয়ে ইফটিজিং করা গেলে তো হেব্বি হতো। জামাই ব্যাটাকে শায়েস্তা করতাম।”
__”শায়েস্তা তো তোমরা সবাই মিলে আমাকে করেছো।”
আমার কথায় আব্বুর মুখটা ভার হয়ে গেলো। বললেন-
__”শায়েস্তা নয় রে মা, চেয়েছি তোর একটা গোছানো জীবন হোক। একদিন আমরা পৃথিবীতে থাকবো না তখন তুই যে বড় নিঃসঙ্গ হয়ে যাবি। তাই চেয়ে ছিলাম…..”
__”জীবনটা কি গোছানো হলো আব্বু?”
__”ভাবতেই পারিনি যে গোছাতে গিয়ে তোর এলোমেলো জীবনটাকে ভেঙে চুরমার করে ফেলবো। স্যরি রে, ভেরী ভেরী স্যরি।”
__”যাই হোক, এখন ঘুড়িটা বানিয়ে দাও।”
আব্বু নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বললেন-
__”এত বছর চর্চা নেই মনে আছে কি না কে জানে!”
__”যে টুকু মনে আছে সেটুকু নিয়েই শুরু করো।”

অনেক কষ্টে আমরা তিনজন মিলে একটা ঘুড়ি বানালাম। 
যুথী বললো-
__”আফা এই ঘুরি ওড়বেনি তো?”
__”উড়বে না কেনো?”
__”খালুর ঘুরি দেইখা কিরাম যেন লাগতাছে।”
__”দেখা যাক উড়ে কি না।”

কেনো জানি মনে হলো খোলা আকাশে ঘুড়ি উড়ালে আমার মনটা ভালো হবে। ছুই ছুই সন্ধ্যায় যুথীকে সাথে নিয়ে ছাদে গেলাম ঘুড়ি উড়াতে। কিন্তু মনের যেনো কোনো হেলদোল নেই। পাশের ছাদে বারবার চোখ আটকে যাচ্ছে। ঘুড়ির দিকে তাকাবো নাকি পাশের ছাদে তাকাবো? কেনো যে একসাথে অনেক দিকে তাকানো যায় না! ধুর!
হঠাৎ পাশের ছাদে নায়কের আগমন ঘটলো, নায়িকা নায়ককে দেখে মুখ ভেংচিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। নায়ক বিমুগ্ধ চোখে নায়িকাকে দেখছে। নায়িকা ডোন্ট কেয়ার মুখভঙ্গিমায় উপরে চেয়ে আছে, হাব ভাবএ যেনো সে ঘুড়ি উড়ানো মুখস্ত করছে গভীর মনোযোগে। মাঝে মাঝে নায়িকা আড়চোখে নায়কের দিকে তাকাচ্ছে, নায়কের দৃষ্টি কোন্ দিকে সেটা দেখার জন্য। নায়ক একটু ভাব নিয়ে আকাশ বাতাস আর গাছের পাতা দেখছে। নায়িকা আড় চোখে তার পাতা দেখা দেখছে। যুথী নামক কাবাবের হাড্ডিটা একবার নায়ক আর একবার নায়িকার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। এদিকে ঘুড়িটা যে কোন্ দিকে যাচ্ছে তা কেউ জানে না। 
ছাদে লাট সাহেবকে দেখে মনের গভীরে খুশির স্রোত বয়ে গেলেও বাহিরে আমি বিরক্তির ছাপ এঁকে রাখলাম। হঠাৎ যুথীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে সীমান্তর দিকে তাকিয়ে আছে। ধমক দিয় বললাম-
__”ঐ কি দেখিস?”
সে থতমত খেয়ে বললো-
__”কই কি দেখি?”
আমি চোখ পাকিয়ে বললাম-
__”বুইড়া ধাইড়া খোকাবাবুকে দেখার কি আছে রে?”
__”উ না, আমি তো পাতা দেখতাছি।”
__”পাতার কি দেখিস?”
__”ঐ গাছের পাতা এই গাছের পাতারে দেখতাছে। আর এই গাছের পাতাও লুকাইয়া ঐ গাছের পাতারে দেখতাছে। আমি তাগো দেখতাছি।”
আমি হতবাক হয়ে বললাম-
__”এক গাছের পাতা আরেক গাছের পাতাকে দেখছে?”
__”হ”
__”ফালতু কথা রাখ।”
হঠাৎ যুথী লাট সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো-
__”ও দুলাভাই আপ্নে ভালা আছেননি?”
সে মুখে এক চিলতে হাসি এঁকে বললো-
__”হ্যাঁ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো যুথী?”
__”সেরাম ভালা আছি। আইসেন ঘুরি উড়াই।”
__”আমি তো এসব পারি না।”
__”আমি শিখাইয়া দিমুনে।”
ওদের কথা শুনে গা জ্বলতে শুরু করলো। আমার সাথে একটাও কথা না বলে যুথীর সাথে কথা বলছে। আমি কেমন আছি তা জানার দরকার নেই। যুথী কেমন আছে সেটা তার জানতে হবে। থাকবোই না ছাদে। আমি হনহন করে চলে আসতেই শুনলাম, সীমান্ত বললো-
__”আচ্ছা আরেক দিন উড়াবো। এখন একটা জরুরী কাজ আছে।”
যুথী আমাকে ডেকে বললো-
__”বন্ন আফা যাইতাছেন ক্যা?”
আমি রাগ করে বললাম-
__”ঘুম ধরেছে তাই চলে যাচ্ছি।”
__”ঘুরি তো নামাইতে হইবো আফা।”
আমি চেচিয়ে উঠে বললাম-
__”ঐ লাট সাহেবকে বল নামিয়ে দেবে।”
যুথী সীমান্তকে বললো-
__”আফা আপ্নেরে ঘুরি নামাই দিতে কইছে দুলাভাই। আইসেন ঘুরিডা নামাইয়া দেন।”
সীমান্ত বললো-
__”যুথী ঐ বখাটে মেয়েকে বলো, সীমান্ত এসব পারে না।”
যুথী আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
__”আইচ্চ্যা। আফা লাট সাব এই সব পারে না।”
আমি বললাম-
__”কি পারে লাট সাহেব?”
যুথী তাকে বললো-
__”কি পারেন আপ্নে দুলাভাই?”
সে বললো-
__”যুথী তাকে বলো, সীমান্ত তার মতো বখাটে কাজ করতে পারে না। সে খুব ভদ্র ছেলে।”
যুথী আমার দিকে ঘুরে বললো-
__”আফা দুলাভাই আপ্নের মতো বখাইট্টা কাম করতে পারে না। লাট সাব সেরাম ভদ্র।”
আমি রেগে উঠে বললাম-
__”তাকে বল সে যেনো আমাকে নিয়ে টানাটানি না করে।”
যুথী ওর দিকে তাকিয়ে বললো-
__”দুলাভাই আপনে আফারে নিয়া টানাটানি কইরেন না। এর ফলাফল ভালা হইবো না কয়া দিলাম।”
সীমান্ত ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো-
__”তাকে বলো, বখাটে মেয়েকে টানতে সীমান্তর বয়েই গেছে।”
যুথী আমাকে বললো-
__”আফা আপ্নের মতন বখাইট্টা মাইয়ারে টানতে দুলাভাইয়ের বইয়াই গ্যাছে গা।”
আমি যুথীর কীর্তি দেখে প্যাঁচ কষে বললাম-
__”তাকে বল সে একটা ধেড়ে বুড়ো ফাজিল পাজি বদ বজ্জাত খোকাবাবু।”
যুথী কিছু না বুঝেই তাকে বললো-
__”দুলাভাই আপ্নে একখান ধাইড়া বুইড়া ফাজিল পাজি বদ বজ্জাত খোকাবাবু।”
যুথীর কথা শুনে লাট সাহেব বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। যুথী ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললো-
__”ওরে আল্লাহ আমার হাতে কত কাম আর আমি এইখানে কি করতাছি? এই যুতী এইখানে কি করস রে? কাম চুন্নি একখান! খালাম্মা আইজ সেরাম বকবেনি। যাই বাবাহ।”
যুথী নাটাইটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দৌড়ে নিচে চলে গেলো। যুথীর কীর্তিকলাপ দেখে আমার খুব হাসি পেলেও হাসি চেপে রাখলাম। লাট সাহেবের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকে আমি রাগে নাটাই ছেড়ে দিয়ে রুমে চলে এলাম।

মনটাকে ধরে বেঁধে বেলকোণ আর ছাদে যাওয়া আটকানোর অভিযান চলছে। পাঁচটার পরে অফিস থেকে ফিরে সীমান্ত ছাদে যায়। কেনো জানি না তাকে দেখার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে যাই তখন। ওর মতো হৃদয়হীন মানুষকে দেখবার পিপাসা আমাকে লজ্জিত করে। আমি লজ্জা ঠেলে সরিয়ে ছাদে যাই। আড়চোখে তাকে দেখি। কথা বলি না কেউ কারো সাথে। আজব একটা মানুষ সে! তার কি একটুও ইচ্ছে করে না আমার খবর নিতে? মনে কি পড়ে না তার আমাকে? অভিমানে ভেঙে চুরমার হয়ে যাই আমি। দৌড়ে রুমে চলে আসি। জানি না সব কিছুকে বেপাত্তা করা এই আমিটা কবে থেকে এত অভিমানের মালিক হলাম! আর কবে থেকেই বা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নির্লজ্জ উপাধি নিলাম!

বিয়ের অনেক আগে চাকরীর জন্য এ্যাপলাই করে ছিলাম। হঠাৎ জয়েনিং লেটার চলে এলো। এক সপ্তাহ পরেই জয়েনিং ডেট। পোস্টিং নীলফামারী। ভালোই হয়েছে, ঐ অহংকারী লাটসাহেবের চোখের সামনে থেকে দূরে তো চলে যেতে পারবো। এটা ভেবে মনে মনে একটু শান্তি অনুভব করার চেষ্টা করছি কিন্তু মরার শান্তি আসছেই না। হঠাৎ শুনলাম সীমান্তর ট্রান্সফার হয়ে গেছে। তাকেও চলে যেতে হবে এক সপ্তাহের মধ্যে। কোথায় ট্রান্সফার হয়েছে তা জানি না। বাহ আমরা দু’জনই এখান থেকে চলে যাচ্ছি। ভালোই হয়েছে, আমরা দু’জনই শান্তিতে থাকবো। আমি কতটা শান্তিতে থাকবো তা না জানলেও ঐ লাট সাহেব যে শান্তির সাগরে ভাসবে সেটা আমি জানি।

আব্বু আম্মু আর মা আমাকে রাত দিন বুঝানোর চেষ্টা করেন। আমি যেনো চাকরিতে জয়েন না করে সীমান্ত আর মায়ের সাথে চলে যাই। কিন্তু আমি সেটা মানিনি। যে মানুষটার মনে আমার জন্য কিঞ্চিত স্থান নেই, আমাকে ঘিরে যার মনে ভালোমন্দ কোনো অনুভূতি নেই তার সাথে স্বর্গেও যেতে চাই না আমি। একাকী আমি নরকেও যেতে রাজী। 
আমাকে আটকাতে ব্যর্থ হয়ে আব্বু আম্মু মনমরা হয়ে বসে থাকে। আমি এখান থেকে চলে যাবো, এ জন্মে আমার সংসার হলো না এই সব হাবিজাবি ভেবে তারা নির্ঘুম রাত কাটায়। আমি কারো মন খারাপকে পাত্তা দিই না। মা রোজ এসে আমার সাথে দেখা করে যান। আমাকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য তার চেষ্টার ত্রুটি নেই। কিন্তু তার ছেলে এ পথ মাড়ায় না। বর্ণিতার মনের পথ হয়তো সে চেনেই না। অথবা চিনতেই চায় না। সে না চিনুকগে, আই ডোন্ট কেয়ার। 
মা এসে বললেন-
__”এমন করে বিচ্ছেদ করিস না। দু’জন দুইখানে থাকলে দূরত্ব শুধু বেড়েই যাবে। তুই তো বাবুকে হারিয়ে ফেলবি বর্ণ।”

মনের টান থাকলে দূরত্ব কোনো বিষয়ই না। যোজন যোজন দূরে থেকেও একে অপরকে গভীর ভাবে অনুভব করা যায়, যদি দু’জনার মনজুড়ে দু’জনার বসতি থাকে। সে তো কখনো আমার মনে বসতি স্থাপন করেনি আর তার মনেও আমাকে ঘর বাঁধতে দেয়নি। তাহলে আমি কাকে হারাবো? কবে পেয়েছি আমি তাকে? এসব কথা আমি প্রকাশ করতে চাই না। মনের গভীরে এই কথা গুলো চাপা আকুতি হয়েই অপ্রকাশ্য থেকে যাক।
বললাম-
__”তোমার বাবু কবে আমার ছিল মা? যে আমার নয় তাকে হারাবো কিভাবে?”
মা চিন্তিত মুখে বললেন-
__”তোদের দু’জনার অভিমানের মাঝখানে পড়েছি আমি। কাউকেই বুঝিয়ে উঠতে পারি না। আমার ছেলেটা তো জন্ম থেকেই একরোখা। সে চায় তুই নিজে থেকে ফিরে যা। এদিকে তুই কি চাস কে জানে!”
__”কি এমন অন্যায় করেছি আমি যে নিজে থেকে ফিরবো? আর সে এলেও আমি ফিরবো না।”
মা অসহায় চোখে আমার দিকে তাকালেন। জানি তিনি আর কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। বললাম-
__”তোমার ছেলে আমাকে ছাড়াই ভালো আছে। সে ভালো আছে ভেবে খুশি থাকো মা।”
মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-
__”ভালো নেই রে। চাপা স্বভাবের ছেলেটা মুখ ফুটে কিছু না বললেও আমি সবটা বুঝি। মায়ের মন সব কিছুই টের পায়।”

আমিই বুঝি তাকে বুঝলাম না! সে কি আমায় বুঝে? না বুঝে না, এক সেকেন্ডের জন্যও সে কখনো বুঝেনি। মেয়েদের মন সবাই বুঝতে পারে না। কিন্তু বুঝার জন্য ধৈর্য্য সমেত চেষ্টাও লাগে। ছেলেদের সেই ধৈর্য্য আর চেষ্টাটা নেই। অথচ তারা দিনরাত চিল্লায় মেয়েদের মন দেবতারাও নাকি বুঝে উঠতে পারেনি। আরে তোদের কে বলেছে যে দেবতারা বুঝেনি? তোরা নিজেদের এত পন্ডিত কেনো ভাবিস? ঠিক হয়েছে ঐ লাট সাহেবকে ছেড়ে চলে এসেছি। চাই না পুরুষের দাসী হয়ে বাঁচতে। বুঝতে হবে না আমার মন আর আমিও তার মন বুঝতে চাই না।
বললাম-
__”আমি তোমার ছেলেকে বুঝি না আর বুঝতেও চাই না।”
মা হাতাশ হয়ে নিশ্চুপ ভাবে চলে গেলেন। আমি কি করবো? পারবো না আমি ঐ লাট সাহেবের কাছে নতো হতে।

জয়েনিং লেটার আসার পর থেকে একটা করে দিন কাটছে আর আমার মনের অনুভূতি গুলো কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে। আমি মনের সব ইচ্ছে গুলোকে দমিয়ে দিয়ে মনটাকে রুগ্ন করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। রুগ্ন মনটা আর যাই করুক কারো জন্য কষ্ট হয়তো পাবে না। কিন্তু আমার ভেতরের মন আমার বিরুদ্ধে বিদ্রহ করে উঠে। সে দমে থাকতে চায় না, রুগ্ন হতে চায় না। সে উচ্ছাসিত হয়ে উল্লাসে ভালোবাসতে চায়।
আমি মানুষিক ভাবে প্রস্তুতি নিলাম। আর তিন দিন পর আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। চলে যাবো সীমান্তর মনের আঙিনা ছেড়ে অনেক অনেক দূরে। আর মনের আঙিনা ছাড়ারই বা কি আছে? কবে তার মনের আঙিনায় আমি গিয়ে দাড়িয়েছি। বান্দর ছেলে তো তার মনের চার পাশে চীনের প্রাচীর তুলে রেখেছে। তাই মনের আঙিনা নয় আমি তার দৃষ্টির সীমানা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এতে আমার খুশি হওয়া উচিত। মনের মাঝে ঈদ ঈদ অনুভূতি হওয়া উচিত। কিন্তু এমন কিছুই হচ্ছে না। আমি চেষ্টা করছি এমন অনুভূতি অনুভব করার জন্য কিন্তু আমি ব্যর্থ। দিনরাত আমার নির্লজ্জ মন একটা মানুষকে দেখার জন্য ব্যাকুল। হয়তো তার সাথে আমার আর কখনোই দেখা হবে না। আমি তো এটাই চেয়ে ছিলাম তাহলে আজ কেনো মন জুড়ে এমন প্রলয় চলছে?

সাঁঝ গড়িয়ে আধার নেমেছে। সেদিনের সেই নিঃস্ব রাতের মতো আমার প্রতিটা রাতই যেনো নিঃস্ব হয়ে গেছে। বাহিরে বৃষ্টি মেঘের গর্জন দমকা হাওয়া আর একলা জানালায় দাড়িয়ে এই বর্ণিতা। দমকা হাওয়ার সাথে ঝিরিঝিরি জল এসে আমার মুখটা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমি আধারের মাঝে নৈঃশব্দ খুঁজে চলেছি। যে নৈঃশব্দ জুড়ে কেউ একজন আমার পাশে এসে দাড়াবে। মনের ভেতরে প্রাপ্তির এই প্রত্যাশা আমার মনে মেঘ জমালো। কিছু আক্ষেপ ভেতর ভেতর গর্জন করে উঠলো, চোখেও নামলো ভরা বর্ষা। 
রাতের শেষ প্রহরে বৃষ্টি ছেড়ে গেলো, আমি বালিশে মাথা রেখে কিছু জলের সাক্ষী বালিশকে করে ঘুমিয়ে গেলাম।

সকালে যুথীর ডাকে ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলে দেখি লাট সাহেব আমার রুমে দাড়িয়ে আছে। হায়রে আমার চোখ! আজকাল যুথীকেও ঐ লাটসাহেব ভেবে বসছি। এই হতভাগী মন, এমন করে আমাকে শাস্তি দিস কেনো? পিটিয়ে তোকে সোজা বানিয়ে দেবো বলে দিলাম। খবরদার ঐ লাট সাহেবকে নিয়ে ভাববি না!
আমি এক ঝলক দেখে চোখে এক আকাশ ঘুম নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে বললাম-
__”সাত সকালে আমাকে ডাকতে কে বলেছে তোকে? কবে তোর আক্কেল জ্ঞান হবে রে ব্যক্কল? তুই আসলে আমার হাতে খুন হবি।”
সে চেচিয়ে বললো-
__”কিহ?”
বাহ্! আমার মনের প্রমোশনে যুথীর গলার আওয়াজটাও ঐ লাটসাহেবের মতো শুনছি। পাশ ফিরে দেখতে চেয়েও দেখলাম না। হয়তো দেখবো লাটসাহেবের রূপ ধরে যুথী দাড়িয়ে আছে। যাই হোক আমিও কিছুতেই ভুল করছি না। ওপাশ ফিরে চোখ বুজে থেকেই বললাম-
__”চেচামেচি না করে সুন্দর ভাবে আমার জন্য এককাপ আদা লেবুর কড়া চা বানিয়ে আন। চোখের ঘুমটা একদম ছাড়তেই চাইছে না।” 
কোনো আওয়াজ পেলাম না। বুঝলাম যুথী কিচেনে চলে গেছে। আমার চোখ আবার তন্দ্রায় মেতে উঠলো। কিছুক্ষণ পর জেগে উঠলাম সীমান্তর গলার স্বরে।
__”এই যে মহারাণী আপনার চা নিন।”
নাহ! আর পারছি না। এই লাটসাহেবের ভুত আমাকে ছাড়াতেই হবে। আজ ভুত মেরে বাণিজ্যে যাবো। উঠে বসলাম। তাকিয়ে দেখি লাট সাহেব চা হাতে দাড়িয়ে। চোখ ডলে আবার তাকালাম। তাও তাকেই দেখতে পেলাম। কি ভ্রমের মধ্যে পড়েছি মাবুদ! পরীক্ষা করার জন্য বললাম-
__”শোন তুই আজ আমার চুলে প্যাক লাগিয়ে দিবি। এখনই গিয়ে রেডি কর। আমি গোসল করবো। মাথাটা কেমন যেনো এলোমেলো লাগছে।”
চায়ের কাপটা পাশের টেবিলে রেখে সে বললো-
__”এই যে বখাটে মেয়ে শোনো, আমি যুথী নই, আমি সীমান্ত। বখাটে থেকে প্রমোশন নিয়ে পাগলি হয়েছো দেখছি। তা স্বামীকে দূরে রাখার বিরহে কি মাথার সব তার ছিড়ে গেছে নাকি?”
এই লাট সাহেব এই রুমে কি করছে? আর এসব কি বলছে সে? বাড়ি এসে বর্ণিতাকে অপমান করার সাহস সে কোথায় পেলো? বদ বজ্জাত পাজি বান্দর ছেলে একটা! 
আমি বেড থেকে নেমে দাড়িয়ে গেলাম। বললাম-
__”আপনি এখানে কেনো?”
সে খুব সাধারণ ভাবে জবাব দিলো-
__”চলে যাচ্ছি তাই বিদায় নিতে এসেছি। হাজার হলেও তুমি আমার বিয়ে করা বউ। দায় তো থেকেই যায়।”
ওর কথাতে একটু অবাক হলাম। কিসের দায় তার? কবে সে বউ বলে মেনেছে আমাকে? বললাম-
__”ওহ, দায় এড়াতে এসেছেন তাহলে?”
__”না, দায় সারতে এসেছি।”
__”দায় সারার অনুরোধ কে করেছে আপনাকে?”
__”নিজ দায়িত্বে সারছি।”
__”আচ্ছা সারুন।”
সে আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললো-
__”এক ঘন্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে। এক ঘন্টা পর আমি এ এলাকা ছেড়ে চলে যাবো।”
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম-
__”কি এটা?”
সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিলো-
__”ডিভোর্স পেপার।”
হঠাৎ যেনো আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেলো। আমার ভেতরে নাম না জানা ঝড় তোলপাড় শুরু করলো। 
__”কিহ?”
__”কখনো কি ডিভোর্স পেপারের নাম শোনো নি?” 
__”শুনেছি।”
__”সিগনেচার করে পাঠিয়ে দিও। আমি অপেক্ষা করছি।” 
আমার গলা দিয়ে স্বর বের হলো না। আমি নির্বাক তার দিকে চেয়ে রইলাম। সে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। অথচ আমি কিচ্ছু বলতে পারছি না। বর্ণিতা কিছু বলতে পারছে না, এমন মুহূর্ত জীবনে এই প্রথম। 
__”কি হলো বলছো না কেনো? সিদ্ধান্ত জানাটা আমার জন্য খুব জরুরি আর হাতেও সময় নেই।”
আমি মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালাম। সে চলে গেলো আর আমি ফ্লোরে বসে পড়লাম। সে একদিন আমাকে বলেছিল আমি নাকি জাস্ট একটা প্রাণী। আর সে কি? সে কি মন-ওয়ালা?

খাম খুলতে ভয় লাগছে। যে সম্পর্কটাকে আমি কখনো মন থেকে মানতেই পারিনি সেই সম্পর্কটাকে ভাঙতে আজ আমার হৃদপিন্ড বারংবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার কলিজা ছিদ্র হয়ে যাচ্ছে। তবে কি আমি জাস্ট প্রাণী নই?
জানি না কবে কখন কিভাবে আমার অনুভূতির বদল ঘটেছে। তবে কি আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি? না না এটা কিভাবে সম্ভব? তাকে ভালোবাসার মতো কি কারণ থাকতে পারে? কোনোই কারণ নেই। আমি তাকে ভালোবাসি না, কিছুতেই না।

অনেকক্ষণ খামটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম। সময় দিয়ে ছিল এক ঘন্টা। তার মধ্যে ২৫ মিনিট কেটে গেছে। এখনো খামটা খোলার সাহস পাইনি। 
অবশেষে চোখ বন্ধ করে খামটা খুললাম। ভেতর থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করলাম। কাগজের ভাজ খুলতেও ভয় লাগছে। বর্ণিতার এমন ভীতো রূপ দেখে আমি সত্যিই হতবাক। মনটাকে খুব করে শক্ত করতে গিয়ে দেখি আমার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। আমি দৌড়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। কারণ আমার চোখের জল আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। যখন মায়া বাড়িয়ে কোনো লাভ হয় না তখন মায়া কাটাতে হয়। ভালোবাসার জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করা গেলেও ভালোবাসাহীন একটা মানুষের জন্য এক ফোটা ছাড় দেওয়াটা শুধু বোকামী নয় পাগলামিও। তাই হৃদয়হীন একটা মানুষের বিরুদ্ধে আমার মনটা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। সে পারলে আমি পারবো না কেনো? চোখ মুছে কাগজের ভাজ খুললাম। 
___________________________________
বর্ণিতা

প্রথম যেদিন তোমাকে দেখে ছিলাম সেদিনই একটা ভালো লাগার ধাক্কা এসে লেগে ছিল আমার বুকের ঠিক বাম পাশে। আমি কিছুক্ষণ হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে নিশ্চুপ দাড়িয়ে ছিলাম। বেসুরো গান গাওয়া বখাটে মেয়েটা এমন করে হৃদয়ে ধাক্কা মারতে পারে সেটা ভেবেই আমি অবাক হয়ে ছিলাম, কিন্তু বুঝতে দিইনি তোমায়। এরপরেও অনেক বার তোমার সাথে আমার দেখা হয় কিন্তু বলা হয়ে উঠেনি তোমাকে আমার এই ভালোলাগার কথা। তোমার এই দিন রাত আমার পেছনে লেগে থাকাটা আমার মনে খুশির স্রোত বইয়ে দিতো। চুপচাপ এই আমিটা হঠাৎ কোলাহল এর প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। নিজের অগোচরে আমার অন্ত:করণ তোমাকে বার বার চেয়েছে। অথচ আমি যখনই তোমার সামনে দাড়িয়েছি তখনই বিরক্তি ছাড়া কিছুই বুঝাতে পারিনি। এক সময় বিয়ের কথা শুরু হলো। আমি মনে মনে এটাই চেয়ে ছিলাম। আম্মু হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলো তোমাকে বউ বানাবে। এ খবর শুনে আমি সারারাত জেগে বসে ছিলাম। তারপর থেকে বারান্দায় ছাদে কত তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। শুধু মাত্র তোমাকে এক পলক দেখার জন্য কিন্তু তুমি আসোনি। এই বিয়েতে তোমার ঘোর আপত্তি ছিল। সেটা জেনেও আমি তোমাকে চেয়েছি। ভালোবাসা যে কতটা অবুঝ হয় তা নিজেকে দিয়েই বুঝেছি।
চেয়ে ছিলাম তোমার মতো একটা বখাটে বউ, যে আমার নিশ্চুপ জীবনটাকে হৈ হুল্লোড়ে ভরিয়ে রাখবে। সেদিন বলতে পারিনি আমি তোমাকে খুব করে চাই। বলতে পারিনি আমার এই এলোমেলো জীবনটাকে তুমি গুছিয়ে দেবে? বলতে পারিনি, আমার প্রতিটা রাতের ঘুম হবে তুমি? বলতে পারিনি আমি শুধু তোমাকেই চাই, খুব করে ভীষণ ভাবে চাই…
বিয়ের পর তোমাকে একটু একটু করে সামলে নিতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু সেদিন ট্রান্সফারের কাগজটা হাতে পাবার পর আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গেছিল। আমি ট্রান্সফারের জন্য একদম প্রস্তুত ছিলাম না। তারপর কি থেকে কি হয়ে গেলো। আমি অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তোমার সাথে খারাপ আচরণ করে বসলাম। তারপর স্যরি বলার জন্য তোমার কাছে আসতে চেয়েও সাহস পাইনি। 
এখন বুঝতে পারছি যে, আমার নার্ভাস ভালোবাসা আসলেই স্বীকৃতি পাবার যোগ্য নয়। তবুও বলছি আমার সাথে যাবে তুমি বর্ণিতা?

আমি তোমাকে ভালোবাসি বর্ণিতা, খুব খুব ভালোবাসি…….

সীমান্ত 
_____________________________________________

চিঠির শেষ লাইনটা ঝাপসা চোখে পড়ে শেষ করলাম। চিঠি বুকে আঁকড়ে আবার ফ্লোরে বসে গেলাম। কঠোর হৃদয়হীনা বর্ণিতার চোখে আজ অশ্রুস্রোত বইছে। জানি না আমি তাকে ভালোবাসি কি না। আমি চিঠি হাতে বসেই রইলাম। এই কাঠের মতো রসহীন মানুষটা নাকি আমাকে ভালোবাসে। আমার কাছে সব কিছুই অবিশ্বাস্য লাগছে। এক ঘন্টা শেষ হতেই সীমান্ত আবার এলো। আমি নির্বাক তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার অশ্রুসিক্ত নয়ন হয়তো তাকে বিস্মিত করলো। কিন্তু আমি কাঁন্না আটকে রাখতে পারছি না। আমি চাইছি না সে আমার ভেজা চোখ দেখুক। তার সামনে কাঁদতে আমার খুব আপত্তি। 
সে নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো-
__”সিদ্ধান্তটা জানতে এসেছি। বেশি কিছু বলতে হবে না। হ্যাঁ অথবা না বলো।”
আমার গলা দিয়ে এখনো স্বর বের হচ্ছে না। সে উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর বললাম-
__”হ্যাঁ।”
__”আর এক ঘন্টা সময় দিলাম রেডি হবার জন্য। জানি মেয়েদের রেডি হতে আরো বেশি সময় লাগে কিন্তু আমার হাতে সময় নেই।”
কথাটা বলেই সে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

ওরা গাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি রেডি হয়ে নিলাম। তারপর আব্বু আম্মুর থেকে বিদায় নিতে গেলাম। আমাকে দেখে তারা অবাক হলেও খুব খুশি হলো। যদিও আমি দূরে চলে যাচ্ছি বলে তারা এক রকম কষ্ট পাচ্ছে। 
বিদায় লগ্নে আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কাঁদলেন। আমিও নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। আব্বু চোখ মুছে বললেন-
__”দেখিস সীমান্ত তোকে খুব সুখে রাখবে।”
এই টুকু বলে আব্বু আর কথা বলতে পারলেন না। আমি আম্মুর সামনে দাড়াতেই সে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো-
__”যাবার আগে আম্মুর সাথে একটু ঝগড়া করবি না?”
কথা টুকু বলতেই আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁন্নায় ভেঙে পড়লো। কোথাও যুথীকে দেখতে পেলাম না। আম্মুকে বললাম-
__”যুথী কোথায়? তাকে তো দেখছি না?”
__”যুথী রুমে দরজা আটকে বসে আছে। কত করে ডাকলাম কিন্তু সে এলো না।”
__”কেনো?”
__”হয়তো তোর বিদায় মানতে পারছে না তাই।”

যুথীর ঘরের দরজা নক করলাম কিন্তু কোনো সাড়া নেই। জোরে জোরে ডাকলাম-
__”এই যুথী দরজা খোল। আমি চলে যাচ্ছি তো। “
তবুও কোনো আওয়াজ নেই। আবার দরজা ধাক্কিয়ে ডাকলাম। তারপর সে ভেতর থেকেই জবাব দিলো-
__”আমি কিছুতেই আপ্নের সন্মুখে খারামু না বন্ন আফা।”
__”কেনো?”
__”আমার কইলজ্যা কাঁনা হইয়া যাইতাছে।”
এরপর শুধু যুথীর কাঁন্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম।
__”কি হয়েছে তোর? দরজা খোল বলছি।”
__”খুলুম না।”
আমি চেচিয়ে বললাম-
__”এবার কিন্তু তোর কপালে দুঃখ আছে বলে দিলাম।”
সে দরজা খুলে মাথা নিচু করে আমার সামনে এসে দাড়ালো। 
__”কি হয়েছে তোর?”
__”আপ্নেরে না দেইখা থাকুম ক্যাম্নে আফা?”
কথাটা বলেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। আমি ওর কাঁন্নায় হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই মেয়েটা ভেতর ভেতর যে আমাকে এতটা ভালোবাসে সেটা আমি টেরই পাইনি। আমি ওর মাথায় হাত রেখে বললাম-
__”আমি কি চিরকালের জন্য চলে যাচ্ছি নাকি? আবার আসবো তো।”
সে কাঁদতে কাঁদতে বললো-
__”পাশের বাসায় থাকবেন বইলা সবার লগে হাত মিলাই ছিলাম। যেন যখন তখন আপ্নেরে দ্যাখতে পাই। বিশ্বাস করেন আফা যদি আগে জাইনতাম ঐ ব্যাডা আপ্নেরে নিয়া চইলা যাইবো তাইলে তার লগে আপ্নের বিয়া হইতে দিতাম না। যেমন কইরাই হোক বিয়া ভাইঙ্গা দিতাম।”
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম-
__”কি করে ভাঙতি?”
সে মুখ বাকিয়ে বললো-
__”ঐ ব্যাডার নামে কলংক দিতাম।”
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম-
__”ভালো মানুষের নামে কলংক দিতি?”
সে গভীর মমতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো-
__”আপ্নেরে চোখের সন্মুখে রাখার লাইগা আমি সব করতে পারি গো বন্ন আফা।”
__”যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন শান্ত হ। হাতে সময় বেশি নেই, ওরা আমার জন্য গাড়িতে অপেক্ষা করছে। এরপর যখন আসবো তখন তোকে সাথে নিয়ে যাবো। মন খারাপ করিস না সোনা।”
যুথী আর কিছু না বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদতে শুরু করলো। তাকে খুব কষ্টে ছাড়িয়ে বাহিরে গেলাম। দেখলাম লাট সাহেব দাড়িয়ে আছে। 
ট্রাকে সব ফার্নিচার উঠানো হয়েছে কি না সেটা দেখছে সে। দেখলাম সব ফার্নিচারের সাথে আমার হারমোনিয়ামটাও আছে। বেশ অবাক হলাম। 
__”হারমোনিয়াম এখানে কেনো?
সে আমার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো-
__”যৌতুক ওটা আমার।”
__”কিহ?”
__”যাও তবলা নিয়ে এসো।”
__”কেনো? ওটাও যৌতুক নাকি?”
সে দুষ্টুমির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো-
__”হ্যাঁ। যখন তুমি আমাকে ইফটিজিং করবে তখন আমি তবলা বাজাবো।”
__”কেনো?”
__”ইফটিজিং এর জবাব দেবো তাই।”
__”আপনি তো বখাটে নন।”
__”বখাটের বর তো আমি।”
__”আপনি আমার বর?”
__”তো কি পাড়া পড়শীর বর আমি?”
__”হতেই পারেন।”
হুট করে সে মাথা নিচু করে আমার কানের কাছে তার মুখ এনে ফিসফিস করে বললো-
__”ভালোবাসো আমায়?”
আমিও ফিসফিস করে বললাম-
__”বাসি তো, একটু একটু হালকা হালকা এক চিমটি।”
সে অবাক চোখে তাকিয়ে বললো-
__”এটা আবার কেমন ভালোবাসা?”
আমি ভাব নিয়ে বললাম-
__”এটা বখাটে ভালোবাসা।”
সে হাহা করে হেসে বললো-
__”বখাটে বউ আমার!”
এই প্রথম আমি সীমান্তকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখছি। আমি বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি তার দিকে।

গাড়িতে বসলাম, সে আমার পাশে এসে বসলো। আমি জানালা খুলে বাহিরে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে আজ প্রকৃতি প্রেমের রঙে সেজেছে। আমি আলাদা একটা অনুভূতি অনুভব করছি। আমার খোলা চুল গুলো বাতাসে উড়ে বার বার আমার চোখ মুখ ঢেকে দিচ্ছে। হঠাৎ সে আমার কপাল থেকে চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে বললো-
__”বাতাসটাও তোমার মতো বখাটে একদম।”
আমি ওর দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
“এই যে ভেজা চোখের মেয়ে
আমার দিবস কাটে বিবশ হয়ে
তোমার অশ্রু পানে চেয়ে।”

আমি ওর কথা শুনে হতবাক হলাম। কখন বর্ষার জলের মতো আমার চোখে জল জমেছে তা বুঝতেই পারিনি। সে হাত দিয়ে আমার চোখের জল মুছিয়ে আমার মাথা হেলিয়ে ওর কাঁধে রাখলো। তারপর হঠাৎ সে আমার কানে কানে ফিসফিস করে বললো-
__”আমি তোমায় ভালোবাসি মেয়ে!”
ওমাগো! এই ছেলে আমাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলবে নাকি? আমি মাথা উচু করে চোখ মেরে বললাম-
__”আমি তোমাকে বখাটে টাইপের ভালোবাসি।”
সে লাজুক মুখভঙ্গিমায় বললো-
__”এমন ভালোবাসার নাম এই প্রথম শুনলাম।”
__”এই নতুন অনুভূতি সমেত ভালোবাসা তোমার জীবনকে তেজপাতা আর তোমার হৃদয়কে কয়লা বানিয়ে দেবে।”
__”এ তো দেখছি জ্বলাতঙ্কময় ভালোবাসা।”
আমি ওর চুলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে সব চুল এলোমেলো করে দিলাম। ওর চোখ ঢেকে গেলো চুলে। সে চুল গুলো চোখ থেকে সরিয়ে তার মুখটা আমার মুখের দিকে ঝুকিয়ে এনে বললো-
__”এটা কি হলো?”
__”এটা বখাটে বউয়ের ইফটিজিং হলো।” 
সে বিমুগ্ধ চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলো। এই রে এই ছেলের চোখ দুটো তো ভয়ানক সুন্দর! অথচ এতো দিনেও আমি তা খেয়াল করেই দেখিনি। কি সাংঘাতিক ঘটনা!
___________________________________________
গল্পের কোনো শেষ নেই তবুও ইতি টানতেই হয় অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে। ভালোবাসারও কোনো সীমান্ত নেই, ভালোবাসা চলে অন্তহীন বিরামহীন ভাবে। বর্ণিতা আর সীমান্তর ভালোবাসা যেনো চলতে থাকে অনন্তকাল ধরে। শত সহস্র জনম ধরে তারা ভালোবেসে যাক অবিরাম……. 
শুভ সমাপ্ত 

About Author


Administrator
Total Post: [358]

Leave a Reply




Comment: (Write Something About This Post..)

সম্পর্কযুক্ত গল্প

 
© Copyright 2019, All Rights Reserved By BdStory24.Com
About Us || Copyright Issues || Terms & Conditions || Privacy Policy