Home Login Register

সুপ্রিয় পাঠক বিশেষ কারণবসত আগামী কিছুদিন গল্প নিয়মিত আপডেট বন্ধ থাকবে, সাময়িক এই সমস্যার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি ।

প্রেমাতাল [পর্ব-৩৬-৪০]


প্রিয় পাঠক আমাদের টিম বিনা স্বার্থে আপনাদের জন্য গল্প আর্কাইভ করে, আপনাদের নিকট বিশেষ অনুরোধ যে, বিডিস্টোরি২৪ ডটকম এর স্বার্থে আপনারা এডগুলোতে ক্লিক করবেন, তবে দিনে একবারের বেশী না, যদি আমাদের সাইটকে ভালোবেসে থাকন তো.......
Home / উপন্যাস, মৌরি মরিয়ম / প্রেমাতাল [পর্ব-৩৬-৪০]

Admin › 9 months ago

প্রেমাতাল

পর্ব-৩৬-৪০

লেখকঃ Mouri Morium

সবসময় এরকমই হয় নিজ থেকে তিতির কখনোই এগিয়ে আসে না। কিন্তু মুগ্ধ যখন একবার শুরু করে দেয় তিতির আর ছাড়তেই চায়না। নেশা হয়ে যায় ওর। বুদ্ধদেব গুহ লিখেছেন, ‘মধুতে যে মরে তাকে বিষ দিয়ে মারতে নেই।’ কোন বইতে যেন লিখেছেন? ‘সবিনয় নিবেদন’ নাকি ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ তে? এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তা সে যে বইতেই লিখুক না কেন কথা সত্য। তাই মুগ্ধ ওকে মধু দিয়েই মারলো। অনেকদিন ধরে এরকম একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল মুগ্ধ! কিন্তু তিতির তো দেখাই করতে চাইতো না। যাই হোক, এবার কিছু তো একটা হবে। ফলাফল নিশ্চিত সুপ্রসন্ন! তারপর তিতিরকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে এল মুগ্ধ। পুরো রাস্তায় কেউ কোন কথা বলেনি। তিতির আর একটি বারের জন্যও তাকালো না মুগ্ধর দিকে। গলির মাথায় যেতেই তিতির বলল, -“আমাকে এখানেই নামিয়ে দাও। বাসার সামনে তোমার সাথে যেতে চাচ্ছি না।” -“হুম, ঠিকাছে তুমি বোসো। আমি তোমার জন্য একটা রিক্সা নিয়ে আসি।” -“রিক্সা লাগবে না, এটুকু তো হেটেই চলে যেতে পারব।” -“তোমার শরীরটা এখন উইক। পারবে না।” -“বেশী বাড়াবাড়ি করো না। এটুকু কোন রিক্সা যায় নাকি? দুই কদমে চলে যেতে পারবো।” একথা বলেই তিতির গাড়ি থেকে নামছিল। মুগ্ধ তিতিরের হাত ধরে থামালো। বলল, -“সবকিছু নিয়ে আরেকটু ভেবো প্লিজ। আরেকটা বার ট্রাই করো বাবা-মাকে রাজী করাতে? তোমাকে ছাড়া থাকার অনেক চেষ্টা করেছি তিতির, পারছি না।” তিতির একথার কোন উত্তর না দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, -“আমি আসছি।” তিতির যতক্ষণ ধরে হেটে হেটে গেল ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো মুগ্ধ। তিতির একবারও পেছন ফিরে তাকালো না। বাড়ির গেটের ভেতর ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়লো তিতির। কয়েক সেকেন্ড পর ভেতর থেকেই উঁকি মারলো। মুগ্ধ ততক্ষণে ঘুরে গেছে। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। তারপর চলে গেল। যতক্ষণ গাড়িটা দেখা যাচ্ছিল ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো তিতির। মুগ্ধ চোখের সীমানার বাইরে যেতেই উপরে চলে গেল। দু’বার বেল দেয়ার পরও কেউই দরজা খুলছে না। তিতিরের কষ্ট হচ্ছিল দূর্বল শরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে। এরপর তিতির কলিং বেলের সুইচটা অনেকক্ষণ চেপে ধরে রইলো। তখন চম্পা এসে দরজা খুলে দিয়ে আবার দৌড়ে চলে গেল ড্রইং রুমে। তিতির দরজা আটকে ড্রইং রুমের দরজায় দাঁড়াতেই দেখতে পেল মা ডিভানে শুয়ে আছে, বাবা আর ভাবী সোফায় বসে। আর চম্পা ফ্লোরে বসে আছে। যে যেখানে যেভাবেই থাক না কেন সবার মনোযোগ টিভির দিকে। টিভিতে একটা ইন্ডিয়ান বাংলা সিরিয়াল চলছে। যেখানে এই মুহূর্তে একটা ছেলেকে কোন এক পার্টিতে তার শ্বশুর সবার সামনে অপমান করছে। একটা মেয়ে কাঁদছে, মেয়েটা সম্ভাবত ছেলেটার স্ত্রী। মা উত্তেজনায় শোয়া থেকে উঠে বসে বলল, -“দেখসো দেখসো কি ভাল ছেলেটাকে কিভাবে অপমান করতেছে। অমানুষ একটা, আরে ব্যাটা খালি টাকাই দেখলি! নিজের মেয়েটার সুখের দিকে তাকাইলি না!” তিতিরের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। হায়রে জীবন! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে চলে গিয়ে দরজা লাগালো। আয়না ধরে নিজের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে তিতির। মাত্র কিছুক্ষণ আগে মুগ্ধ ছিল এখানে। নিজেই নিজের ঠোঁট স্পর্শ করলো। মুগ্ধকেই অনুভব করতে পারছে। ইশ কি সুখ দিল মুগ্ধ। আচ্ছা, মুগ্ধর যখন অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়ে যাবে তখনও কি মুগ্ধ এভাবেই সুখ দেবে ওর বউকে? হয়তো দেবে না, কিন্তু সত্যি যদি দেয়! তাহলে সেটা কিভাবে সহ্য করবে তিতির? ধুর, তিতির তো জানবেই না তো সহ্য করার ব্যাপারটা আসছে কোত্থেকে? কিন্তু এসব তো শুধু ওর অধিকার, অন্য কাউকে পেতে দেবে না ও। মুগ্ধর শেষ কথাটা কানে বাজছিল। ‘আরেকবার চেষ্টা করো’। কিন্তু কিভাবে চেষ্টা করবে ও? কম চেষ্টা তো করেনি। রাতে খাওয়ার টেবিলে বাবা বলল, -“তিতির মা..” তিতির বাবার উল্টোদিকে ঠিক মুখোমুখি বসা ছিল। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, -“জ্বী বাবা, বলো?” -“তোর চাচ্চু তোর জন্য যে প্রপোজাল টা এনেছিল সেটা কিন্তু এসলেই ভাল। ছেলেটা তোর ছবি দেখে তোকে খুবই পছন্দ করেছে। এখনো বিয়ে করেনি। একবার কথা বলে দেখ, ভাল লাগতেও তো পারে। ছেলেটা কিন্তু অসাধারণ, লাখে একটা যাকে বলে।” তিতির মুখের ভাতটুকু শেষ করে স্পষ্ট স্বরে বলল, -“বাবা, আমি বিয়ে করলে মুগ্ধকেই করবো এবং তোমাদের সম্মতিতেই। অন্য কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমাকে কেটে ফেললেও আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।” মা টেবিলের উল্টোদিকে বসে ছিল। উঠে এসে তিতিরের গালে একটা চড় মারলো। এত জোরে মারলো যে তিতির টাল সামলাতে না পেরে পাশে বসে থাকা ভাবির গায়ের উপর গিয়ে পড়লো। মা বলল, -“কোন বিয়েসাদির দরকার নেই তোর। এমনি থাকবি আজীবন। মাস্টার্স কম্পলিট হলেই চাকরী খুঁজবি। বিয়ে দেব না তোকে।” মা একথা শেষ করেই আবার নিজের চেয়ারে বসে খাওয়া শুরু করলো। তিতির উঠে সোজা হয়ে বসতেই তান্না বলল, -“বাবা, আজীবন লক্ষী মেয়ে লক্ষী মেয়ে বলেছ না? দেখো এখন তোমার লক্ষী মেয়ের অধঃপতনের নমুনা।” তিতির উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। দরজা লাগিয়ে ফ্লোরে বসে কাঁদতে লাগলো। কেউ পেছন থেকে ডাকলো না আজ। অথচ আগে ও একবেলা না খেয়ে ঘুমাতে পারতো না। ঘুমিয়ে পড়লেও মা নাহয় ভাইয়া প্লেটে করে ভাত এনে ওর মুখে তুলে খাইয়ে দিত। ও ঘুমের ঘোরেই খেত। ওর ফ্যামিলির কেউ কখনো ওর কোন কিছুতে বাধা দেয়নি, কখনো খোঁচা দিয়ে কথা বলেনি গায়ে হাত তোলা তো বহুদূরের কথা। মাত্র কিছুদিনের ব্যাবধানে সবকিছু কেমন বদলে গেল। তারপর আরো কয়েক মাস পার হয়ে গেল। এর মধ্যে মুগ্ধ অনেকদিনই ফোন করেছে, তিতির কখনো ধরেছে, কখনো ধরেনি। ধরে কি বলবে সেই তো এক কথা নিয়ে তর্কাতর্কি হবে। কি লাভ এসব করে! কিন্তু একদিন রাতে ইন্টারনেট অন করতেই হোয়াটস এ্যাপে মেসেজ এল। মুগ্ধর নাম দেখেই বুকটা কেঁপে উঠলো তিতিরের। মুগ্ধ একটা অডিও পাঠিয়েছে। তিতিরের মন বলে, ‘তারাতারি প্লে কর তিতির’। আর ওর ব্রেইন বলে, ‘খবরদার তিতির, ভুলেও প্লে করিস না। মরবি মরবি।’ শেষপর্যন্ত মনেরই জয় হলো। তিতির অডিওটা প্লে করতেই মুগ্ধর গিটারের টুংটাং শুরু হয়ে গেল। তারপর গান…. “যে কটা দিন তুমি ছিলে পাশে, কেটেছিল নৌকার পালে চোখ রেখে। আমার চোখে ঠোঁটে গালে তুমি লেগে আছো.. যেটুকু রোদ ছিল লুকোনো মেঘ দিয়ে বুনি তোমার শালে ভালবাসা, আমার আঙুলে হাতে কাধে তুমি লেগে আছো.. তোমার নখের ডগায় তীব্র প্রেমের মানে, আমিও গল্প সাজাই তোমার কানে কানে, তাকিয়ে থাকি হাজার পরদা ওড়া বিকেল, শহর দুমড়ে মুচড়ে থাকুক অন্য দিকে। ট্রাফিকের এই ক্র্যাকার ফোনই.. আমাদের স্বপ্ন চুষে খায়। যেভাবে জলদি হাত মেখেছে ভাত নতুন আলুর খোসার এই ভালবাসা, আমার দেয়ালঘড়ি কাঁটায় তুমি লেগে আছো.. যেমন জড়িয়ে ছিলে ঘুম ঘুম বরফ পাশে, আমিও খুঁজি তোমায় আমার আশেপাশে, আবার সন্ধ্যেবেলা ফিরে যাওয়া জাহাজ পাশে, বুকে পাথর রাখা আর মুখে রাখা হাসি, যে যার নিজের দেশে আমরা স্রোত কুড়োতে যাই। যেভাবে জলদি হাত মেখেছে ভাত নতুন আলুর খোসার এই ভালবাসা আমার দেয়ালঘড়ি কাঁটায় তুমি লেগে আছো। যে কটা দিন তুমি ছিলে পাশে কেটেছিল নৌকার পালে চোখ রেখে আমার চোখে ঠোঁটে গালে তুমি লেগে আছো।” গানটা শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না তিতির। কান্নায় ভেঙে পড়লো তিতির। গানটার প্রত্যেকটা শব্দ যেন ওদের জন্যই লেখা হয়েছে। ও আগেও বহুবার শুনেছে এই গানটা, তখন ওর এরকম ফিলিং হয়নি। মুগ্ধও যেন একটু বেশিই আবেগ দিয়ে গেয়েছে। কেন মুগ্ধ এমন করছে! মুগ্ধ এমন করলে ও বাঁচবে কি করে? মুগ্ধ কি একটুও বোঝে না? মুগ্ধকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কিভাবে দেখবে! একটা ছবিও তো নেই। মুগ্ধর ছবিওয়ালা ফোন, মেমরি কার্ড সবই তো কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেছিল ভাইয়া। মুগ্ধ তো ইদানীং ফেসবুকও ইউজ করে না। শুধু হোয়াটস এ্যাপের এই ছবিটা দেখে তো মন ভরছে না তিতিরের। কোনভাবে রাতটা পার করলো। তারপর সকাল সকাল উঠেই ৮ টার মধ্যে রেডি হয়ে বের হয়ে গেল তিতির। সিএনজি নিয়ে ৯:১৫ এর মধ্যেই তিতির পৌঁছে গেল মুগ্ধর অফিসের সামনে। না মুগ্ধর সামনে যাবে না, শুধু দূর থেকে একবার দেখেই চলে যাবে। মুগ্ধর অফিস ১০ টায়। কখন আসবে কে জানে। মাত্র সকাল হলো এখনি রোদ খা খা করছে। ওড়নাটা মাথায় তুলে ঘোমটা দিয়ে নিল। মুগ্ধর অফিসের ঠিক অপজিটে একটা বিউটি স্যালুন। তার সামনে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়ালো তিতির। মুগ্ধ যেদিক দিয়েই আসুক না কেন তিতির ওকে দেখতে পাবে। প্রায় আধাঘন্টা অপেক্ষা করার পর পৌনে ১০ টার দিকে দেখলো মুগ্ধর গাড়িটা এসে অফিসের সামনে থামলো। গাছের আড়াল থেকেই লুকিয়ে দেখছিল তিতির। রাস্তার এপাশ-ওপাশ হলেও দুরত্ব অনেক। তবু তিতিরের দেখতে প্রব্লেম হচ্ছিল না। মুগ্ধ গাড়ি নিয়ে বেজমেন্টে চলে গেল। হায় খোদা! যদি বেজমেন্ট থেকেই লিফটে উঠে যায় তাহলে তো ও দেখতেই পাবে না। না মুগ্ধ বেজমেন্ট থেকে ফিরে এল। সিকিউরিটির সাথে কথা বলছে। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, টাই, সানগ্লাস সব মিলিয়ে কি যে দারুন লাগছে মুগ্ধকে! শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করছে। মুগ্ধ সিকিউরিটির সাথে কথা বলা শেষ করে হাসছিল। ইশ কি মারাত্মক সে হাসি! কতদিন পর দেখছে তিতির। অবশেষে মুগ্ধ ভেতরে চলে গেল। এক পা ভেতরে দিয়েই আবার ফিরে এলো। আশেপাশে তাকালো, কি খুঁজছে ও? পকেট থেকে ফোন বের করলো। তারপর পরই তিতিরের ফোনে কল এলো। মুগ্ধ ফোন করেছে! ভাগ্যিস ফোনটা সাইলেন্ট ছিল। কিন্তু মুগ্ধ কি কিছু বুঝতে পারলো নাকি এমনিতেই ফোন করেছে? কি করবে ফোন কি ধরবে নাকি ধরবে না? ভাবতে ভাবতেই কলটা কেটে গেল। মুগ্ধ বিরক্ত হয়ে আবার কল দিল। তিতির কি করবে কি করবে করেও কলটা রিসিভ করেই ফেলল। -“হ্যালো।” -“হ্যা, হ্যালো তিতির.. তুমি কোথায়?” -“এইতো ক্যাম্পাসে যাচ্ছি। এত সকালে তুমি?” -“আসলেই ক্যাম্পাসে যাচ্ছো?” -“হ্যা, ক্লাস আছে।” এমন সময় মুগ্ধর সামনে দিয়ে একটা গাড়ি গেল। যার ভেতর গান বাজছে, “Nothing gonna change my love for u…” গানটা মুগ্ধ একই সাথে ফোনের মধ্যেও শুনতে পেল। ব্যাস মুগ্ধ এখন সিওর তিতির আশেপাশেই আছে। মুগ্ধ আশেপাশে হাটছে আর খুঁজছে। বলল, -“তিতির, সিরিয়াসলি বলো.. তুমি কোথায়? তুমি কি বনানী? যদি এসে থাকো তো মিট মি প্লিজ। আমি তোমাকে দেখতে চাই।” -“না, আমি বনানী কেন আসতে যাব? আমি ধানমন্ডিতে।” এমন সময় মুগ্ধ দেখে ফেলল তিতিরকে। এক দৌড় দিল রাস্তা ক্রস করার জন্য। অর্ধেকটা আসতেই একটা গাড়ি এসে পড়লো, তিতির আঁৎকে উঠলো। মুগ্ধ থেমে গেল। গাড়িটা চলে যেতেই মুগ্ধ আবার দৌড় দিল। এক দৌড়ে তিতিরের সামনে। তিতির কোথায় যাবে বুঝে উঠতে পারলো না। এমনভাবে ধরা খাবে ভাবেনি। মুগ্ধ বলল, -“পাবলিক প্লেস না হলে এমন একটা চড় মারতাম এখন তোমাকে যে জীবনে ভুলতে পারতে না। ফাজিল মেয়ে, যেমন ভাই তেমনি তার বোন।” তিতিরের কান্না পেল, কিন্তু কাঁদলো না। একটুও রাগ করলো না। তিতির জানে এটা মুগ্ধর ভালবাসা প্রকাশেরই একটা ধরণ। মুগ্ধ আর অফিসে গেল না। ফোন করে ছুটি নিয়ে নিল। তিতিরকে নিয়ে হাইওয়েতে চলে গেল। একসময় মুগ্ধ বলল, -“এমন আর কখনোই করোনা তিতির। জানো তোমাকে একটা বার দেখার জন্য আমার মনটা কেমন করে? আর তুমি কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখে চলে যাও। এমন করে কি লাভ বলো?” তিতির একথার উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলো, -“একটা কথা রাখবে?” -“কি?” -“আগে এটা জিজ্ঞেস করলে বলতে ‘বলো’ আর এখন বলছ ‘কি?’ এখন আর আগের মত ভরসা নেই তোমার।” -“আরে না না পাগলী! আমি তো অন্য কথা বলছিলাম হঠাৎ তুমি অন্য কথা বলায় জিজ্ঞেস করে ফেলেছি। বলো কি কথা রাখতে হবে।” -“আমি প্রায় ১ বছর ধরে বাসায় বন্দী। কেউ বেধে রাখছে না, কিন্তু নিজেই বের হইনা। প্রায় প্রতিদিনই কথা শুনতে হচ্ছে বাসায়। আর পারছি না। আমাকে একটু কোথাও নিতে যাবে?” -“হ্যা বলো কোথায় যেতে চাও।” -“ঢাকার বাইরে, একদিনের জন্য জাস্ট। একটু রিফ্রেশড হতে চাই।” মুগ্ধ অবাক হয়ে বলল, -“মানে? ঢাকার বাইরে যাবে? তোমার ফ্যামিলি জানলে…” আর বলতে দিল না তিতির। মুখ চেপে ধরলো। তারপর বলল, -“একটা দিনের জন্য আমি সবকিছু থেকে দূরে চলে যেতে চাই। যেখানে ফ্যামিলি থাকবে না, প্রব্লেম থাকবে না, দুশ্চিন্তা থাকবে না, ভয় থাকবে না, শুধু তুমি আর আমি থাকবো। নিয়ে যাবে না?” -“হুম নিয়ে যাব। কবে যাবে বলো?” -“এক্ষুনি।” -“মানে? এখন যাবে? বাসায় বলে এসেছো?” -“নাহ, আজ আমার গ্রুপ স্টাডির জন্য ফ্রেন্ডের বাসায় থাকার কথা ছিল। সেই হিসেবেই আমি বলে বেড়িয়েছিলাম। গত পরশু ও আমার বাসায় ছিল। প্রব্লেম নেই। আর আমার আসলে এই মুহূর্তেই মনে হলো কোথাও গেলে ভাল লাগবে। সুযোগও আছে কিন্তু তুমি ছুটি কি পাবে?” -“আজ তো ছুটি নিয়েই নিয়েছি।” -“কিন্তু আজ তো থাকবো। কাল আসবো। কালকের ছুটি নিতে হবে না?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“মাথাটা গ্যাছে না? কাল শুক্রবার।” -“ওহ, আমার খেয়ালই ছিল না।” -“ওকে, কোথায় যাবে বলো।” -“তুমি যেখানে নিয়ে যাবে।” -“কক্সবাজার?” -“ধুর, ওটাতো আরেক ঢাকা। খালি বিল্ডিং আর বিল্ডিং।” -“তাহলে?” -“এনি আদার অপশন?” -“পাহাড়ে তো কতই গিয়েছি দুজনে। চলো এবার সিলেটে যাই। ওখানে আমাদের একসাথে যাওয়া হয়নি। পাহাড়, নদী, ঝড়না সবই আছে।” -“আচ্ছা।” -“কিন্তু আমি তো উলটো এসে পড়েছি। এমন সৌভাগ্য হবে জানতামও তো না।” -“এখন ঘুরে যাও।” মুগ্ধ গাড়ি ঘোরালো। তিতির বলল, -“আমি যদি ঘুমাই তুমি কি রাগ করবে?” -“রাগ কেন করবো?” -“এত লম্বা জার্নি, আমি ঘুমাবো আর তুমি এতটা রাস্তা একা একা বোর হয়ে ড্রাইভ করবে।” -“আরে নাহ পাগল, তুমি পাশে থাকলে কিছুতেই আমি বোর হইনা।” -“তবু, আচ্ছা চলো বাসে যাই। তাহলে তোমাকে কষ্ট করে ড্রাইভ করতে হবে না।” -“না বাসে গেলে যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে, গাড়িতে গেলে দুপুরের মধ্যে পৌঁছতে পারবো। আর তুমি তো জানো ড্রাইভ করতে আমার অনেক ভাল লাগে।” -“আচ্ছা। বাসায় জানাবে না?” -“পরে। যখন ব্রেক নেব তখন জানিয়ে দেব।” -“আচ্ছা।” এরপর তিতির মুগ্ধর দিকে ফিরে সিটে হেলান দিয়ে মুগ্ধর একটা হাত টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, -“এক হাতে চালাতে পারবে?” -“হুম। তো কয়হাত লাগবে?” -“তাহলে এই হাতটা আমার কাছেই থাকুক? আমি একটু ঘুমাই। জানো অনেক রাত ধরে ঘুমাতে পারি না আমি। এখন তোমার স্মেল নিয়ে নিয়ে ঘুমাবো, ঘুমাই?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“ঘুমাও।” তিতির শুনতে পেল না মুগ্ধর শেষ কথাটা। কারন ও ততক্ষণে ঘুমে তলিয়ে গেছে। মুগ্ধর হাত-পা কাঁপছে। আজ কতদিন পর তিতির স্বাভাবিক ব্যাবহার করছে ওর সাথে। ঘুরতে যেতে চেয়েছে! তাও আবার ঢাকার বাইরে! ইভেন যাচ্ছেও! কি যে ভাল লাগছে মুগ্ধর। মুগ্ধ জানে এ ভাললাগা ক্ষণিকের তবু যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুতেই সুখ। তিতির চোখ মেলে দেখলো গাড়িতে ও একা। মুগ্ধ নেই, গাড়ি একটা শপিং মলের সামনে পার্ক করা। এটা কোথায় বুঝতেও পারছে না। তিতির মোবাইল বের করে মুগ্ধকে কল করলো, -“হ্যালো, আমার ঘুমকুমারীর ঘুম ভেঙে গেল?” -“হুম। আপনি আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেছেন?” -“তুমি লক করা আছো তাই একা রেখে আসলেও প্রব্লেম নেই। আমি তোমককে ডেকেছিলাম কিন্তু তুমি ওঠোনি তখন। আমি মলে ঢুকেছি, কিছু কেনাকাটা আছে।” -“কি আবার কিনবে?” -“আরে হুট করে এসেছি না? সাথে জামাকাপড় তো নেই, পড়বো কি? দুজনের জামাকাপড় কিনতে ঢুকেছি।” -“শুধু তোমারটা কেন তাহলে। আমার আজ ফ্রেন্ডের বাসায় থাকার কথা ছিল না? একটা এক্সট্রা সালোয়ার-কামিজ আছে সাথে।” -“ওহ, সেটা ভাল কথা কিন্তু বিছনাকান্দিতে কি তুমি সালোয়ার-কামিজ পড়ে পানিতে নামবে? সামলাতে পারবে তো?” তিতির উচ্ছাসিত হয়ে বলল, -“আমরা বিছনাকান্দি যাব?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“তো সিলেট এসেছি কেন?” -“ওয়াও, আমি খুশি ধরে রাখতে পারছি না। বাই দ্যা ওয়ে, সিলেট এসেছি মানে? আমরা কি সিলেট চলে এসেছি?” -“হ্যা।” -“বাপরে! এতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি?” -“ব্যাপার না।” -“তুমি কোনো ব্রেক নাওনি?” -“নাহ।” -“কষ্ট হয়েছে অনেক?” -“আরে না।” মুগ্ধ ততক্ষণে কথা বলতে বলতে বাইরে চলে এসেছে। গাড়ির দরজা খুলে বলল, -“আসুন ম্যাম।” তিতির হেসে বেড়িয়ে এল। শপিং মলে ঢুকে কেনাকাটা করছে এমন সময় তিতির লেডিস শার্ট দেখছিল। কয়েকটা কালারের মধ্যে বেবি পিংক টা বেছে নিল তিতির। মুগ্ধ বলল, -“এটা নিও না। ব্ল্যাক কিংবা নেভি ব্লু টা নাও।” -“কেন এটা খারাপ লাগছে? তুমি তো বলেছিলে আমাকে লাইট কালারে ভাল লাগে।” মুগ্ধ বলল, -“এটা পড়ে পানিতে নামবে? নাকি এমনি পড়তে নিচ্ছো?” -“পানিতে নামার জন্যই তো নিচ্ছি।” -“তোমার সেন্স অফ হিউমার ভাল, কিন্তু মাঝে মাঝে সেটা কাজে লাগাও না কেন?” -“কি করলাম আবার? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।” মুগ্ধ এবার কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, -“হালকা কালারের ড্রেস পড়ে ভিজলে সব দেখা যায়।” তিতির লজ্জা পেয়ে পিংক টা রেখে নেভি ব্লু টা নিল। পিংক টা এমনভাবে ছুড়ে রাখলো যেন ওটাতে কোন পোকা পড়েছে। কেনাকাটা শেষ করে ওরা লাঞ্চ করে নিল। তারপর গাড়িতে উঠতেই তিতির বলল, -“আমরা উঠছি কোথায়? হুট করে এলাম রুম পাব তো?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“বুকিং দেয়া হয়ে গেছে।” -“সিরিয়াসলি? কোথায়?” -“শুকতারা ন্যাচার রিট্রিট।” তিতির চোখদুটো বড় বড় করে বলল, -“রিসোর্ট?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“হ্যা।” -“ওয়াও। খুব ভাল হয়েছে, আমার হোটেলে একদম ভাল লাগে না।” -“সেজন্যই তো রিসোর্টে থাকবো।” কিন্তু হঠাৎই চিন্তায় পড়ে গেল তিতির। বলল, -“কিন্তু খরচটা তো অনেক বেশি হয়ে যাবে।” -“তাতে কি? কতদিন তো কোথাও যাই না। হোকনা একটু খরচ, ডেইলি ডেইলি তো যাচ্ছি না।” -“কেন যাওনা?” -“তুমি ছাড়া এখন আর কোথাও যেতে ভাল লাগে না।” তিতির চুপ হয়ে গেল। কে জানে এটাই হয়তো মুগ্ধর সাথে শেষ ট্যুর! রিসোর্টের রিসিপশানে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ বলল, -“স্কিউজমি, আমাদের বুকিং ছিল।” ম্যানেজার একটা ফর্ম দিল ফিলাপ করার জন্য। এতদিন যত যায়গায় গিয়েছে এসব ফর্মালিটিজ মুগ্ধই করেছে। আজ ফর্মটা তিতিরের দিকে এগিয়ে দিল। যা সবসময় মুগ্ধ লিখে এসেছে আজ তা লিখলো তিতির। Mr. Mehbub Chowdhury Mugdho with Mrs. Titir Mehbub. ……………………………………………. ……………………………………………. ……………………………………………. ফর্মালিটিজ শেষ করতেই একজন কেয়ারটেকার ওদের দোতলায় নিয়ে গিয়ে রুম খুলে দিয়ে বলল, -“স্যার, লাঞ্চ করবেন?” -“না না আমরা লাঞ্চ করে এসেছি। ডিনার করবো এখানে।” -“ওকে স্যার, কিছু লাগলে ইন্টারকমে ১০১ এ কল করলেই হবে।” -“ওকে, থ্যাংকইউ।” -“মোস্ট ওয়েলকাম স্যার।” ছেলেটি চলে যেতেই মুগ্ধ-তিতির ঘরে ঢুকলো। তিতিরের মনটাই ভরে গেল। বিশাল একটা ঘর। লাল ইটের সিরামিকের দেয়াল। বেতের বিছানা, বেতের আলমারি, বেতের ড্রেসিং টেবিল, সাথে কাঠের ফ্রেম করা আয়না। ঘরের পুরো একটা দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে থাই গ্লাস লাগানো। ওপাশে একটা বারান্দা, বারান্দায় যাওয়ার জন্য বড় একটা দরজাও আছে, দরজাটাও গ্লাসেরই। ভেতর থেকেই দেখলো বারন্দার ওপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় দেখা যায়। পুরো গ্লাসের দেয়ালটায় লাল রঙের পর্দা লাগানো। বেড কভার, বালিশের কভার সব সাদা। বিছানায় সামনে, টয়লেটের সামনে পর্দার সাথে মিলিয়ে লাল রঙের পাপোশ বিছানো। সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগলো। তিতির দরজা খুলে বারান্দায় গেল। সেখানে গিয়ে আরেকটা সারপ্রাইজ পেল। বারান্দার একপাশে বাগানের মত ঘাস লাগানো হয়েছে, পাশে সাদা গোল সিরামিকের টবে ফুলের গাছ। অন্যপাশে একটা ডিভান রাখা। পুরো বারান্দায় রেলিং বলে কিছু নেই। তবে বাউন্ডারি আছে, সেখানেও ঘাস ও ছোট ছোট বাগানবিলাশ লাগানো হয়েছে। আর বারান্দার ওপারে উন্মুক্ত পাহাড়, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। বান্দরবান আর সিলেটের দূরে থাকা সবুজ সৌন্দর্যের একটা পার্থক্য রয়েছে। বান্দরবানের দূরের সবুজগুলো গাঢ় সবুজ। আর সিলেটের দূরের সবুজগুলো হালকা সবুজ, কিন্তু উজ্জল। তবে দুটো সৌন্দর্যই চোখ জুড়ানো, মন ভোলানো। কারো সাথে কারো তুলনা করা চলে না। হঠাৎ মুগ্ধ তিতিরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর চুলের গন্ধ নিল। তিতির মুগ্ধর বাহুডোরে থেকেই ফিরলো মুগ্ধর দিকে। তারপর মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মুগ্ধ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, -“দেখো অবস্থা। এজন্য নিয়ে এলাম নাকি?” তিতির চোখ তুলে মুগ্ধর দিকে তাকালো। মুগ্ধ ওর চোখ মুছে দিল। তিতির বলল, -“তুমি ফর্মটা কেন আমাকে ফিলাপ করতে দিলে?” -“কেন, কি হয়েছে তাতে?” -“মিস্টার এন্ড মিসেস লেখার পর আমার কেমন যেন একটা ফিলিং হলো।” মুগ্ধ হেসে জিজ্ঞেস করলো, -“কেমন?” -“জানিনা, কেমনই যেন! বোঝাতে পারব না।” -“সবসময় তো আমিই ফিলাপ করি এবং তখন আমার এই ফিলিং টাই হয়। তোমাকে এটার সাথে পরিচয় করানোর জন্যই আজ তোমাকে ফিলাপ করতে দিয়েছি।” তিতির আবার কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল, -“সব ঠিকঠাক থাকলে তো আজ আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফই থাকতাম।” -“আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফই তিতির। আমাদের আত্মার বিয়ে অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে। তোমার কি মনে হয়না আমাদের সম্পর্কটা শুধু একটা প্রেম না। তার থেকেও অনেক বেশি কিছু?” -“হয় তো।” -“হুম, এবার কান্নাটা থামাও না বাবা। আর গোসলে যাও। আমরা বিকেলে বের হব।” -“কোথায় যাব?” -“কোথাও একটা যাব। কোথায় তা এখনো জানিনা।” মুগ্ধ তিতিরের চোখটা আবার মুছে দিল। তিতির বলল, -“তুমি আমাকে কতদিন ধরে কোলে নাও না বলোতো?” মুগ্ধ একথা শুনে এক সেকেন্ডও দেরী করলো না। কোলে তুলে নিল তিতিরকে। তারপর ঘরে নিয়ে গিয়ে নামাতে নিল আর তিতির বলে উঠলো, -“নামিও না, নামিও না।” মুগ্ধ অবাক হয়ে বলল, -“কেন?” -“গোসল করবো না? বাথারুমে দিয়ে আসো।” -“ওহ, ওকে।” মুগ্ধ তিতিরকে বাথারুমে রেখে ফেরার সময়ই তিতির শাওয়ার ছেড়ে ওকে ভিজিয়ে দিল। মুগ্ধ লাফিয়ে উঠে বলল, -“এটা কি করলে বলোতো?” তিতির হো হো করে হেসে দিল। মুগ্ধও ওকে টেনে শাওয়ারের নিচে এনে ভিজিয়ে দিল। কোথায় তিতির সরে যাওয়ার চেষ্টা করবে তা না করে মুগ্ধর টাই টা আলগা করে শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে দিল। তারপর ওর গলার পিছনে দুহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো ওর চোখের দিকে। মুগ্ধ যখন বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারলো তখন তিতিরের ওড়নাটা টেনে ফেলে দিল। তারপর তিতিরের কোমর জড়িয়ে উঁচু করে শূন্যে তুলে নিজের সমান করে বলল, -“উইল ইউ কিস মি?” তিতির চোখ নামিয়ে হাসলো। শাওয়ারের পানি তিতিরের চুল বেয়ে বেয়ে এসে পড়ছে মুগ্ধর ঠোঁটে, চোখে, বুকে। মুগ্ধ বলল, -“এমনভাবে করো তিতির যার ফিল টা আমার মধ্যে মৃত্যু পর্যন্ত থাকবে?” তিতির মুগ্ধর দুই গালে হাত রেখে আরো একটু কাছে চলে গেল। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট বসালো। শাওয়ারটা ছাড়াই রইলো। বেশ অনেকক্ষণ পর মুগ্ধ আচমকা তিতিরকে নামিয়ে দেয়ালে ঠেকিয়ে পাগলের মত চুমু খেতে লাগলো। তিতিরের ঠোঁটের কত যায়গায় যে কামড়ে দাগ বসিয়ে দিল তার কোন হিসেব নেই। অবশ্য তিতির যে মুগ্ধর কত চুল টেনে ছিঁড়লো তারও কোনো ইয়ত্তা নেই। মুগ্ধও একসময় তিতিরের ঠোঁট ছেড়ে গলায় নেমে এল। হাত চলে গেল কোমরে। পাগলামি চলতেই থাকলো। তিতিরের চোখ দুটো বন্ধ, ঘনঘন নিঃস্বাস ফেলছে। তখনই মুগ্ধ একটা হাত কোমর থেকে সরিয়ে তিতিরের পিঠের কাছে নিয়ে গেল। গলায় চুমু খেতে খেতেই তিতিরের পিঠ বরাবর কামিজের চেইনটা খুলে ফেললো। ভেজা পিঠে ভেজা হাত রাখতেই মুগ্ধর খেয়াল হলো তিতির আজ কিছুতেই না করছে না মুগ্ধকে কিন্তু ওর ফ্যামিলি তো সত্যিই কোনদিন মানবে না। একদিন হয়তো তিতিরের বিয়েও হবে অন্যকারো সাথে সেদিন যদি তিতিরের আফসোস হয় আজকের দিনটার জন্য? চেইনটা আবার লাগিয়ে দিল। তিতির অবাক হয়ে চোখ খুললো। মুগ্ধ বলল, -“তারাতারি গোসল করে বেড়িয়ে এসো। এর বেশি ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে।” একথা বলে তিতিরের কপালে একটা চুমু দিয়ে ঘরে চলে গেল মুগ্ধ। মুগ্ধ বেড়িয়ে যাওয়ার পর তিতির যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই বসে পড়লো। পাগলের মত কাঁদতে লাগলো। কান্নাটা কোনভাবেই থামাতে পারছে না। কিন্তু কেন কাঁদছে তা ও নিজেও ধরতে পারছে না। এত আদর পেয়ে সুখে কাঁদছে নাকি যা পেলনা তার জন্য কাঁদছে! মুগ্ধ বাথরুম থেকে বের হয়ে নতুন কেনা টাওয়াল টা নিয়ে সোজা বারান্দায় চলে গেল। ডিভানে বসে শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলল ফ্লোরে। টাওয়াল টা পড়ে প্যান্ট টা খুলে সেটাও ছুড়ে ফেলল। রাগে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়লো। তান্নাকে পেলে এখন খুন করতো ও। শুধুমাত্র তান্নার জন্য আজ নিজের তিতিরকে আদর করতেও হাত কাঁপে মুগ্ধর। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ছেলে হয়ে জন্মে যে পাপ করে ফেলেছে, আল্লাহ কাঁদার ক্ষমতাটা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি। অনেকক্ষণ পার হয়ে গেল। তিতিরের গোসল এখনো হয়নি? ওকে ওই অবস্থায় ওভাবে ফেলে আসায় কি কষ্ট পেয়েছে? ওর ওই অবাক দৃষ্টি তো অন্তত তাই বলছিল। ও কি এখন কাঁদছে? মুগ্ধ বাথরুমের দরজায় নক করলো, -“তিতির? আর কতক্ষণ? আজ এত টাইম লাগছে যে? পরে ঠান্ডা লেগে যাবে তো।” তিতির চোখ মুছে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ালো। বলল, -“আসছি।” মুগ্ধ তিতিরের গলা শুনেই বুঝলো ও কেঁদেছে। তখন ওর আরো বেশি অসহায় লাগতে শুরু করলো। কি করবে ও? ওর হাতে কি সত্যি কিছু আছে? তিতির গোসল শেষ করে খেয়াল করলো জামাকাপড় ভেতরে আনেনি। রিসোর্টের টাওয়ালটা গায়ে পেঁচিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘরে উকি দিল। কিন্তু মুগ্ধকে দেখতে পেল না। মুগ্ধ আবার কোথায় গেল! তখনই বারান্দায় চোখ পড়তেই মুগ্ধকে দেখতে পেল। বলল, -“এই, শোনোনা।” মুগ্ধ বারান্দা থেকেই বলল, -“কি?” -“আমি তো কাপড় আনিনি।” -“ওহ দাড়াও, দিচ্ছি।” -“শোনো।” -“কি?” -“টাওয়াল আছে ভেতরে। শুধু কাপড় দিলেই হবে।” -“আচ্ছা।” মুগ্ধ নতুন কেনা পোলো শার্ট আর থ্রি-কোয়ার্টার নিয়ে দরজার সামনে এসে বলল, -“নাও।” তিতির হাত বাড়ালো। মুগ্ধ ওর হাতে ওগুলো দিল। কিছুক্ষণ পর তিতির বেড়িয়ে আসতেই মুগ্ধ ঢুকলো। কেউ কারো দিকে তাকালো না। তিতির চুল মুছে বিছানায় শুয়ে পড়লো। হঠাৎ তিতিরের নজরে পড়লো শপিং ব্যাগ গুলোর দিকে। তিতির যখন অন্তর্বাস কিনছিল, মুগ্ধকে তখন ভাগিয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে। ততক্ষণে মুগ্ধও কিছু কিনেছিল যা দেখেনি তিতির। ও অবশ্য গাড়িতে উঠে দেখতে চেয়েছিল কিন্তু মুগ্ধ বলেছিল, -“তুমি কি কিনেছো আমি দেখতে চেয়েছি? যেহেতু চাইনি তুমিও আমারগুলো দেখতে পারবে না। সবারই পারসোনাল জিনিস থাকতে পারে।” তিতির উঠে গিয়ে শপিং ব্যাগ গুলো খুলতেই দেখলো অরেঞ্জ,রেড আর এশ কালারের কম্বিনেশনের একটা জর্জেট শাড়ি ব্ল্যাক পাড়! সাথে ব্ল্যাক কালারের রেডিমেড স্লিভলেস ব্লাউজ, ম্যাচিং পেটিকোট, বাহ! মুগ্ধর বরাবরই সবদিকে খেয়াল থাকে আর পছন্দটাও ফার্স্টক্লাস। সব ইউনিক জিনিস ওর চোখে পড়ে। ঝটপট শাড়িটা পড়ে ফেলল তিতির। শাড়িটা পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই মনটা ভাল হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের খারাপ লাগাটা এখন আর ওর মধ্যে নেই। কারন, মুগ্ধ বেড়িয়ে যখন ওকে এভাবে দেখবে মুগ্ধরও ভাল লাগবে। হলোও তাই। দরজা খুলে খালিগায়ে টাওয়াল পড়া মুগ্ধ চুল ঠিক করতে করতে বেড়িয়ে এল। তিতিরকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। তিতির হাসি হাসি মুখ করে বলল, -“সারপ্রাইজ!” -“দিলে তো আমার সারপ্রাইজ টা নষ্ট করে।” -“নষ্ট হয়নি। আমি সারপ্রাইজ পেয়েছি। তাইতো ইচ্ছে হলো তোমাকেও দেই।” মুগ্ধ তিতিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, -“সত্যি সারপ্রাইজড হয়েছি।” তিতির হাসলো। মুগ্ধ তিতিরের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, -“তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।” তিতিরের মাথায় শয়তানি ঘুরঘুর করছিল। খুব ইচ্ছে করছিল মুগ্ধর পড়নের টাওয়ালটা একটা টান দিয়ে খুলে ফেলতে। বেশ হতো। কিন্তু একাজ ও করতে পারবে না। ভাবতেই লজ্জা লাগছে। মুগ্ধ সরে গিয়ে ব্যাগ থেকে কাপড় বের করলো। প্যান্ট পড়তে পড়তে বলল, -“ভাল হয়েছে শাড়ি পড়েছো। চলো সিলেট সিটিটা আজ ঘুরে ফেলি।” -“হুম চলো।” -“আর রিসোর্টের ভেতরেও কিন্তু অনেক কিছু আছে। এটার অনেক বড় এরিয়া।” -“অনেক কিছু বলতে?” -“ইকো পার্ক, সুইমিংপুল আরো কি কি যেন।” -“আর কালকের প্ল্যান কি?” -“কাল সকাল সকাল আমরা একবারে বেড়িয়ে পড়বো। বিছনাকান্দি ঘুরে দুপুরেই রওনা দিব। রাতের মধ্যে ঢাকা। রাত হলেই তো তোমার বাসায় খোঁজ পড়বে, তাই না?” -“হ্যা।” মনটা সামান্য খারাপ হলো তিতিরের। সুন্দর সময় কেন এত তারাতারি চলে যায়? আনমনে ভাবছিল ও। এমন সময় মুগ্ধ আচমকা তিতিরের চুল মুছে দিতে শুরু করলো। বলল, -“চুলগুলো আজও মুছতে শিখলে না।” তিতিরের চোখে পানি এসে গেল। অনেক কষ্টে কান্নাটাকে হজম করে নিল। ইশ, আজীবনের জন্য তিতির মুগ্ধর এই টুকরো টুকরো ভালবাসা গুলো হারিয়ে ফেলবে একসময়। মুগ্ধ হয়ে যাবে অন্য কারো স্বামী, তিতির হয়ে যাবে অন্য কারো স্ত্রী! তার আগেই যদি জীবনটাকে থমকে দেয়া যেত? ইশ এমন করলে কেমন হয় আজ তিতির কোনো একটা বিষ কিনে নিয়ে আসবে লুকিয়ে লুকিয়ে, তারপর সেই বিষ গোপনে রাতের খাবারের সাথে মিশিয়ে মুগ্ধকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে পড়ে থাকবে এখানে। ওদের ভালবাসার হ্যাপি এন্ডিং হবে। আইডিয়াটা কিন্তু বেশ। কিন্তু বিষ কোথায় পাওয়া যায়? ওষুধের দোকানে কি পাওয়া যায়? -“এই তিতির? কি হলো? কি ভাবছো?” তিতির ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এল। বলল, -“তেমন কিছুনা। আমাদের প্রথম পরিচয়ের কথা ভাবছিলাম।” -“ওহ। বাই দ্যা ওয়ে, তুমি শাড়ি পড়া শিখতে গেলে কেন?” -“তো? প্রত্যেকবার মায়ের কাছে যেতে ভাল লাগে নাকি?” -“না মানে, তুমি যদি না শিখতে তাহলে আমি সেই ছোটবেলার মত আবার পড়িয়ে দিতে পারতাম।” তিতির কোমরে হাত দিয়ে এক টানে কুচিগুলো খুলে ফ্লোরে ফেলে দিল। তারপর বলল, -“ইচ্ছে করলে যেমন কোন কাজ শেখা যায়, ইচ্ছে করলে তেমন কোন কাজ ভোলাও যায়। আমি ভুলে গেছি কিভাবে শাড়ি পড়তে হয়।” মুগ্ধ হেসে শাড়িটা তুলে নিল। পড়াতে পড়াতে বলল, -“তুমি ইদানীং অনেক দুষ্টু হয়েছো।” -“তোমাকে না পেয়ে না পেয়ে।” মুগ্ধ আর কিছু বলল না। মনোযোগ দিয়ে শাড়ির কুচি দিতে লাগলো। কুচি দেয়া শেষ করে হাটু গেড়ে বসে কুচিগুলো কোমরে গুঁজে দিয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, -“পৃথিবী গোল, কিছু কিছু ঘটনার রিপিটেশন তো হতেই পারে, তাই না?” তিতির অন্যদিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা লাজুক হাসি দিল। মুগ্ধ তিতিরের নাভির ডানপাশে চুমু খেল। তিতির হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল। মুগ্ধ বলল, -“এত হাসির কি হলো?” -“সুড়সুড়ি লেগেছে।” -“বাহরে! এমনই বুঝি হয়? প্রথমবার তো হাসোনি, সুড়সুড়ি তখন কোথায় ছিল?” -“আরে তখন তো বুঝেই উঠতে পারিনি কি হচ্ছে!” মুগ্ধ উঠে দাঁড়ালো। তিতির কাছে এসে মুগ্ধর বুকের লোমের মধ্যে নাক ঘষলো, গাল ঘষলো আর তারপর ঠোঁটও ঘষলো। মুগ্ধ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে সবটা অনুভব করছিল। তারপর তিতির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতদুটো মুগ্ধর বুকের ঠিক মাঝখানটায় মেলে রাখলো। তারপর মাথা উঁচু করে মুগ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, -“তোমার যখন অন্য কারো সাথে বিয়ে হবে তখন এরকম খালিগায়ে তাকে বুকে নেবে না। নিতে হলে কিছু একটা পড়ে তারপর নিবে।” -“আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবো না। করলে এতদিনে করে ফেলতাম।” -“তবুও, করতে হতেও পারে তাই বলছি সব করতে পারো কিন্তু তাকে খালি বুকে হাতও রাখতে দেবে না। চুমুও দিতে দেবে না বুকে। এটা শুধু আমার রাজত্ব করার যায়গা।” মুগ্ধ হাসলো। তিতির বলল, -“হেসোনা, হাস্যকর লাগতে পারে কিন্তু আমার এরকম কিছু কথা রাখতে হবে তোমাকে।” -“ওকে রাখবো। বাকীগুলো কি?” -“তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিতে পারবে না।” -“ওকে দিবনা, তারপর?” -“হাঁস বার-বি-কিউ করে খাওয়াবে না।” -“ওকে, স্পেসিফিকলি হাঁস বললে তাই জিজ্ঞেস করছি তাহলে কি মুরগী বার-বি-কিউ করে খাওয়ানো যাবে?” -“যাবে।” -“আচ্ছা আচ্ছা, ওকে। তারপর?” -“তার ভেজাচুল মুছে দিতে পারবে না।” -“ওকে দিবনা, নেক্সট?” -“তার সাথে লিপকিস করার সময় আর যেখানে ইচ্ছা সেখানে হাত রাখতে পারো কিন্তু এক হাত কোমরে আরেক হাত কানের নিচে রাখবে না।” মুগ্ধ মুখ টিপে টিপে হেসেই চলেছে। বলল, -“আচ্ছা, তারমানে লিপকিস করা যাবে?” -“হ্যা, যাবে। কিন্তু হাত সাবধান।” -“আচ্ছা, তারপর?” -“তাকে কক্ষনো কোলে নিতে পারবে না।” -“ওকে নিবনা, আর?” -“কখনো ওর কপালে কিস করবে না।” এবার একটু বেশিই হাসলো মুগ্ধ। বলল, -“আচ্ছা করবো না। তারপর?” -“তোমরা দুজন কখনো একসাথে গোসল করবে না।” -“এই এই, ওয়েট ওয়েট.. এতক্ষণ তুমি সেসবই নিষেধ করেছো যা যা আমি তোমার সাথে করেছি। কিন্তু এটা কি বললে? আমি তুমি তো কখনো একসাথে গোসল করিনি। তাহলে এটা না করলে কেন?” -“আমার ইচ্ছে!” মুগ্ধ হেসে তিতিরের কপালে চুমু দিয়ে বলল, -“ওকে, তিতিরপাখি! বিয়েই তো করবোনা। তবু যদি কোনদিন করি তো তুমি যা যা নিষেধ করলে তার সব আমি মনে রাখবো।” তিতির হাসলো। মুগ্ধ ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। বিকেলটা রিসোর্টের মধ্যের ইকো পার্ক আর শহরের মধ্যেই একটা চা-বাগানের আশেপাশে ঘুরে কাটালো ওরা। ভেতরে ঢোকার পারমিশন পেল না। তারপর সন্ধ্যা হতেই ওরা মাজারে গেল। আর তারপর মাজার থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে উঠেই মুগ্ধ জিজ্ঞেস করলো, -“বলোতো এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা?” পাশে বসে তিতির আনমনে চুলগুলোকে আঙুল দিয়ে আচড়াচ্ছিল। মুগ্ধর প্রশ্ন শুনে বলল, -“কোথায়?” -“সুরমা নদীতে একটা ভাসমান রেস্টুরেন্ট আছে। স্টাইল করে বলতে গেলে বলতে হবে ওটা একটা ছোট জাহাজ। কিন্তু আসলে একটা লঞ্চ।” তিতির হাসলো। বলল, -“রেস্টুরেন্টে গিয়ে কি হবে?” -“খাব।” -“ডিনার না রিসোর্টে করবে বললে?” -“এটা প্রি-ডিনার। সন্ধ্যার নাস্তা।” -“পারোও তুমি।” -“অবশ্যই পারি। এক যায়গায় এসেছো সেখানকার স্পেশাল খাবার গুলো খাবে না?” -“তুমি খাও।” রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে মুগ্ধ বলল, -“তোমার কপালে একটা মাঝারী সাইজের কালো টিপ থাকলে ভাল লাগতো।” -“ও হ্যা, তুমি তো টিপ আর কাজল পছন্দ করো। কিন্তু সাজ পছন্দ করো না এই ব্যাপারটা আমার মাথায় সেট হয়ে গেছে। তাই সাথে কিছুই রাখা হয় না।” -“থাক, এটা নিয়ে আবার আফসোস করতে বসোনা যেন।” তিতির হাসলো। মুগ্ধ বলল, -“এইযে তুমি শুধু স্যুপ নিলে আমি অন্যকিছু খেতে জোড় করলাম না কেন বলোতো?” -“কেন?” -“কারন, এখান থেকে বেড়িয়ে আমরা আরেকটা রেস্টুরেন্টে যাব। এখানে কম খেলে সেখানে ভাল করে খেতে পারবে তাই।” তিতির হেসে বলল, -“মানে কি? কি ঢুকেছে তোমার পেটে আজ?” -“আমি অনেক খেতে পারি, সেটা তুমি তো জানোই। আসলে আমি যেটা খেতে বেড়িয়েছি এখানে সেটা নেই তাই আরেকটাতে যেতে হবে।” -“সেটা কি?” -“সাতকড়া গরুমাংস।” -“সাতকড়া কি?” -“অস্থির জিনিস। অনেক স্বাদ, অনেক।” -“কিন্তু সেটা কি বলবে তো?” -“একটা ফল, দেখতে লেবুর মত। যেটা দিয়ে গরুমাংস রান্না করা হয়। কিযে স্মেল রে ভাই। এটা সিলেটের স্পেশাল জিনিস। সিলেট ছাড়া আর কোথাও পাবে না।” -“ওহ। তোমার বলার ধরণ দেখে খেতে ইচ্ছে করছে।” -“অবশ্যই খাবে।” -“খেতে পারবো কিনা কে জানে!” -“কেন?” -“ঠোঁট জ্বলছে। কত জায়গায় কেটেছে কে জানে!” -“ইশ, আসলেই? কেটে গেছে?” -“কামড়ালে কাটবে না?” -“শুধু জ্বলছে না ব্যাথাও করছে?” -“ব্যাথাও করছে।” -“আহারে, সরি।” -“সরি বলোনা। শোধ করে দিব রাতেই।” মুগ্ধ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, -“রিয়েলি? আমি চারপায়ে খাড়া।” -“তোমার পা দুটো।” -“হ্যা, তোমার দুটো সহ বলেছি।” হাসলো তিতির। মুগ্ধও সে হাসিতে তাল মেলালো। ওখান থেকে ওরা চলে গেল নবান্ন রেস্টুরেন্টে। সাতকড়া গরুমাংস আর পরোটা অর্ডার করলো। মুগ্ধকে অবাক করে পরপর তিন প্লেট গরুমাংস নিল তিতির। সাথে চারটা পরোটাও শেষ। মুগ্ধ হেসে বলল, -“কি বলেছিলাম না?” তিতির খেতে খেতে বলল, -“একটু ঝাল বেশি কিন্তু পৃথিবীতে এত মজার কিছু থাকতে পারে আমার জানা ছিল না, জাস্ট ওয়াও। স্মেলটাই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তারপর সাতকড়ার টুকরাগুলোও খেতে খুব মজা” -“পৃথিবীতে এর চেয়ে মজার জিনিস অবশ্যই আছে। আসলে এধরণের জিনিস আমরা সচরাচর খাই না তো। তাই হঠাৎ খেলে অনেক ভাল লাগে। আর এটা ঝাল কিছু না। রান্নাটাও ঝাল হয়নি, তোমার ঠোঁট কেটে গেছে তাই ঝাল লাগছে।” -“হুম, আচ্ছা.. এগুলো কিনতে পাওয়া যায় কোথায়?” -“বাজারে অভাব নেই। আর রাস্তার পাশেও ঝুড়ি ভরে নিয়ে বসে থাকে দেখোনি লেবুর মত?” -“খেয়াল করিনি। যাই হোক, যাওয়ার দিন আমি নিয়ে যাব।” -“আচ্ছা। রান্নার সিস্টেম জানোতো?” -“না, আলদা কোনো সিস্টেম আছে নাকি? ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরা করে মাংসের মধ্যে দিয়ে দেব।” -“আজ্ঞে না। শুধু খোসাটাই রান্না করতে হয়। ভেতরের অংশটা খেতে হয়না ফেলে দিতে হয়, ওটা তিতা।” -“ও।” -“আর মাংসটা যেভাবে ইচ্ছা রান্না করে নামানোর ২০-৩০ মিনিট আগে দিয়ে রান্না শেষ করতে হবে। শুরুতেই দিলে তিতা হয়ে যাবে। খুবই সেন্সেটিভ জিনিস।” ওর কথা শুনে কতক্ষণ হাসলো তিতির। বলল, -“সত্যি, তোমার সাথে ছাড়া আমি কোথাও গেলে শুধু সেখানে যাওয়া হবে আর আসা হবে। সেখানকার কিছুই জানা হবে না, পাওয়া হবে না। সব কিছুই ঝাপসা থাকবে অথচ আমি বুঝবোও না।” -“আমিও প্রথমে কিছুই জানতাম না তিতির। আস্তে আস্তে ঘুরতে ঘুরতে জেনেছি। যেখানে যাবে সেখানকার রাস্তাঘাট, মানুষজন, পরিবেশ সবকিছু খেয়াল করলে আপনাআপনি সব জেনে যাবে।” যখন ওরা রিসোর্টে ফিরলো তখন ৯ টা বাজে। রুমে ঢুকে চেঞ্জ করার জন্য কাপড় নিল তিতির। মুগ্ধ বলল, -“পড়ে থাকোনা শাড়িটা।” তিতির হেসে বলল, -“আচ্ছা। এই চলোনা বারান্দায় গিয়ে বসি। বারান্দাটা অনেক সুন্দর।” -“তুমি যাও, আমি চেঞ্জ করে আসছি।” বারান্দায় গিয়ে তিতিরের চোখে পড়লো ফ্লোরে মুগ্ধর জামাকাপড় পড়ে আছে। ওগুলো তুলে রুমে ঢুকতেই মুগ্ধ বলল, -“হায় হায়, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ওগুলোর কথা। দাও আমাকে দাও, ধুয়ে দেই তারাতারি, না শুকালে ঝামেলায় পড়ে যাব।” -“না, আমি ধুয়ে দিচ্ছি।” -“আরে আমি ধুতে পারবো তো।” -“জানি, আমিও ধুতে পারবো। আমি থাকতে তুমি ধোবেই বা কেন?” -“আরে! মেয়ে বলে কি? তুমি কি আমার কাপড় ধোয়ার জন্য আছো নাকি?” -“আমার ইচ্ছে, আমি ধোব। সরো তো।” তিতির জোড় করে কাপড়গুলো ধুয়ে দিল। মুগ্ধ খালি গায়ে সাদা রঙের একটা হাফ প্যান্ট পড়ে বিছানায় শুয়ে টিভি দেখছিল। তিতির কাপড়গুলো বারান্দায় মেলে দিয়ে ঘরে এসে মুগ্ধর কোলের মধ্যে শুয়ে পড়লো। বলল, -“টিভিটা বন্ধ করোনা।” মুগ্ধ টিভি বন্ধ করে বলল, -“তুমি পাশে ছিলে না তাই দেখছিলাম।” -“ভাল করেছো, এখন তো আমি চলে এসেছি।” মুগ্ধ তিতিরকে জড়িয়ে ধরে বলল, -“তাই তো দেখছি।” -“তুমি আবার খালি গায়ে? কিছু একটা পড়ো।” -“আমি তো বাসায় খালিগায়েই থাকি, অভ্যাস।” -“এসব দেখে দেখে আমার নজর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।” -“সিরিয়াসলি তিতির তোমার কথাবার্তা শুনলে মনে হয় কি ছেলেদের বুকের লোম যেন অতি বিশেষ কিছু। কিন্তু আসলে কিছুই না। অতি সামান্য জিনিসকে তুমি মহিমান্বিত করেছো।” -“আমার কাছে অতিসামান্য না।” -“আচ্ছা বুচ্ছি কিন্তু হঠাৎ শুয়ে পড়লে যে? এখনি শোধ করবে নাকি?” তিতির লজ্জা পেয়ে বলল, -“জানিনা।” মুগ্ধ বলল, -“প্লিজ শোধ করে দাওনা।” -“আমি পারবো না।” -“তখন তো খুব বড় মুখ করে বলেছিলে।” তিতির লজ্জা পাচ্ছিল। মুগ্ধ বলল, -“এখনো ব্যাথা করছে ঠোঁট?” -“হুম।” -“এসো, বিষ দিয়ে বিষক্ষয় করে দিই।” তিতির সরে গিয়ে বলল, -“ইশ না। অনেক ব্যাথা।” -“আচ্ছা, আলতো করে।” এবার আর তিতির সরলো না। তারপর মুগ্ধ তিতিরের ঠোঁটে আলতো করেই চুমু খেতে লাগলো। তার মধ্যেই তিতিরের ফোনটা বেজে উঠলো। বাবা ফোন করেছে, উঠে বসে ফোনটা ধরলো তিতির, -“হ্যা, বাবা বলো।” -“কী অবস্থা মা তোর? কেমন আছিস?” তিতির হেসে বলল, -“সকালেই তো মাত্র এলাম বাবা, ভাল আছি।” -“ও হ্যা তাই তো। তুই কোথাও গেলে ঘর অন্ধকার হয়ে থাকে। তা কি করছিস?” -“প্রজেক্ট ওয়ার্কটা করছিলাম বাবা, এখন একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম। একটু পর আবার করবো। যেভাবেই হোক, দুদিনের মধ্যেই কম্পলিট করতে হবে।” -“হুম, কাল কখন আসবি?” -“বাবা, আমি কাল নাও আসতে পারি। প্রজেক্ট ওয়ার্ক টা কম্পলিট হলেই আসব। নাহলে আসব না। পরশু আসবো।” -“সেকী!” -“রুপাদের বাসাতেই তো আছি বাবা, টেনশান কিসের? নাকি বিশ্বাস হচ্ছে না? আন্টির সাথে কথা বলবে?” -“না না ছি ছি, আন্টির সাথে কেন কথা বলবো? আর টেনশান না। আসলে তোকে না দেখলে ভাল লাগে না তো। তুই লাগলে থাক কালকেও সমস্যা নেই।” -“ওকে বাবা। ডিনার করেছো?” -“নাহ, এখন করবো।” -“আমিও।” -“ঠিকাছে মা। আমি তাহলে রাখছি। তান্না ফোন করলে ধরিস না। কাল আসবি না শুনলে আবার কি না কি বলবে তোকে। আমি ওর সাথে কথা বলে নেব।” -“আচ্ছা বাবা। তুমি যা বলবে।” ফোন রেখে মন খারাপ করে বসে রইল তিতির। মুগ্ধ বলল, -“কি হলো?” -“বাবাকে কতগুলো মিথ্যে বললাম!” -“হুম, তাই দেখলাম আর অবাক হলাম।” তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল, -“তোমার জন্য আমি সব পারি।” -“শুধু ফ্যামিলির অমতে আমাকে বিয়েটা করতে পারো না।” -“এটা করলে আমার বাবা মরে যাবে। বিশ্বাস করো শুধুমাত্র বাবার জন্যই আমি এটা পারি না।” -“আচ্ছা বাদ দাও, এসব ভেবে মন খারাপ করার কোন মানে হয়না। কিন্তু এটা বলো বাবাকে কেন বললে কাল ফিরবে না।” -“ও হ্যা, আরেকটা দিন থাকতে ইচ্ছে করছিল খুব, তাই আরেকটা দিনের পারমিশন নিলাম।” -“আর বললে যে আন্টি মানে রুপার আম্মুর সাথে কথা বলিয়ে দেবে। এটা বললে কোন সাহসে?” তিতির হেসে বলল, -“জানি বাবা কথা বলবে না তাই বলেছি। জানি এটা অন্যায়। কিন্তু বাবা যদি ছেলের কথা না শুনে একটা বার সব যাচাই করে দেখতো। জেদ না ধরে থেকে তোমার আমার বিয়েতে রাজী হতো তাহলে তো আজ আমাকে এতবড় মিথ্যেবাদী হতে হতোনা। আর আমাকে নকল মিসেস তিতির মেহবুব হতে হতোনা। আসল মিসেস তিতির মেহবুবই হতাম। তখন আজ যা করছি তা অন্যায় বা খারাপ হতো না।” মুগ্ধ তিতিরের হাত ধরে টেনে নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে বলল, -“তুমিই একমাত্র আসল মিসেস তিতির মেহবুব। সেদিনই কনফার্ম হয়েছিলে যেদিন আমি লাভ ইউ বলার পর তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।” তিতির হাসলো। মুগ্ধ বলল, -“আচ্ছা, শোনো।” -“বলো।” -“তালগাছে উঠবে?” তিতির অবাক হয়ে বলল, -“কি? তালগাছে উঠতে যাব কেন? আর আমি গাছে উঠতে পারিও না।” -“ছোটবেলায় কখনো বাবা তোমাকে পায়ের তলায় ঠেকিয়ে উপর উঠিয়ে দোলায়নি?” হঠাৎ মনে পড়ে গেল তিতিরের। বলল, -“হ্যা হ্যা। বাবা এরকম করতো, ভাইয়াও করতো। পায়ের তলাটা আমার পেটের সাথে ঠেকিয়ে আমাকে উঁচু করে ফেলতো। আমি উপুর হয়ে থাকতাম। বাবা বলতো এটা তালগাছ। উফ কি যে মজার ছিল ছোটবেলাটা।” -“সেটার কথাই বলছি। উঠবে?” -“তুমি ওঠাবে?” -“হ্যা।” -“কিন্তু আমি তো বড় হয়ে গিয়েছি। বাবা তো নিতো সেই ছোট থাকতে। যখন ক্লাস টু কি থ্রিতে পড়ি।” -“আমার কাছে তুমি এখনো ছোটই, এসো তো। তোমাকে তালগাছে উঠাই।” মুগ্ধ তিতিরকে তালগাছে উঠিয়ে হাতে হাত ধরে রাখলো। অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো তিতিরের। ও জানে মুগ্ধর সাথে সারাটা জীবন থাকলে পার্থিব সমস্ত সুখগুলো মুগ্ধ ওর পায়ের কাছে এনে রাখতো যা পৃথিবীর আর কেউ পারবে না। তিতির খিটখিট করে হাসছে। আর মনে মনে হাজার ফোটা চোখের জল জমিয়ে ফেলছে পরে ফেলার জন্য। এখন ফেলা যাবে না। মুগ্ধ কত সখ করে ওকে তালগাছে উঠিয়েছে। কাঁদলে কষ্ট পাবে না? -“উফ, এবার নামাও। আমি টায়ার্ড হয়ে গিয়েছি।” কোনমতে হাসি থামিয়ে তিতির একথা বলল। মুগ্ধ ওকে তালগাছ থেকে নামিয়ে ওভাবেই পা ভাজ করলো। তিতির সেই ভাজ করা পায়ে হেলান দিয়ে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, -“তালগাছে উঠালে তুমি আর টায়ার্ড হলাম আমি।” -“স্বাভাবিক, কারন তুমি অতিরিক্ত হেসেছো।” তিতির বলল, -“গরম লাগছে।” -“হ্যা, এসি রুম হলে ভাল হতো কিন্তু শুধু নন-এসিগুলোই খালি ছিল। ইশ, তোমার কষ্ট হচ্ছে না?” -“আমার বাপের বাড়িতে এসি নেই যে এসি ছাড়া আমি থাকতে পারবো না।” একথা শুনে মুগ্ধ হাসলো। বলল, -“গরম কিন্তু কাপলদের জন্য অনেক ভাল।” -“কিভাবে?” -“জানোনা?” -“কোনটার কথা বলছো?” -“বসন্ত প্রেমের ঋতু, আর গ্রীষ্ম ?” -“ঘুমের?” -“নাহ, বসন্ত প্রেমের ঋতু, আর গ্রীষ্ম কামের।” তিতির লজ্জা পেয়ে বলল, -“ধ্যাত।” -“সিরিয়াসলি, এটা তুমি জানোনা?” -“শুনেছি, কিন্তু এটা একটা ফালতু কথা।” -“মোটেও না, এটা সত্যি। দেখোনা গরমের দিনেই মানুষের বাচ্চাকাচ্চা বেশি হয়। আগের বছর গরম থেকে প্রসেসিং শুরু হয়তো।” তিতির মুগ্ধকে মারতে লাগলো। মুগ্ধ বলল, -“আমাকে মেরে কি লাভ? সত্যি বলছি। আমাদের দেশের জনসংখ্যা এত বেশি কেন বোঝোনা? একমাসও তো ঠিককরে শীত পড়ে না। অলমোস্ট সারাবছরই গরম।” যখন খোঁপা করছিল তখন মুগ্ধ হা করে তাকিয়ে ছিল। মুগ্ধ প্রায়ই এভাবে তাকিয়ে থাকে তাই তিতির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না। মুগ্ধ বলল, -“তিতির তোমাকে একটা কথা কখনো বলা হয়নি।” -“কি?” -“যখন তুমি খোঁপা করতে থাকো আমার তোমাকে দেখতে খুব ভাল লাগে।” -“এটা কিকরে ভাললাগার মত কিছু হতে পারে?” -“আমার ভাল লাগে। মনে আছে রেমাক্রিতে তোমাকে যখন মেঘ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম তখন তুমি খোঁপা করতে করতে কটেজ থেকে বেড়িয়ে এসেছিলে?” -“কি জানি হতে পারে। খেয়াল নেই।” -“হুম, সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা লেগেছিল। অন্যরকম সুন্দর লাগে যখন তুমি খোঁপা করতে থাকো।” -“তুমি না বলেছিলে আমাকে খোলা চুলে ভাল লাগে? আর আমারও তো মনে হয় আমকে খোলা চুলেই ভাল লাগে।” -“তুমি আমার কথাটা ধরতে পারোনি, খোঁপা করা অবস্থায় ভাল লাগে সেটা বলিনি। চুলগুলো দুহাতে নিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে খোঁপা করে হাত নামিয়ে আনা পর্যন্ত এই সময়টা খুব ভাল লাগে।” -“ওহ। তোমার চোখ আছে বলতে হবে। তোমার মত করে যদি দুনিয়ার সব ছেলেরা তাদের গার্লফ্রেন্ড দের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতো তাহলে ঘরে ঘরে এত অশান্তি হত না।” মুগ্ধ তিতিরের একটা হাত ধরে হাটতা কাছে নিয়ে আসলো। তারপর হাতের উল্টোপিঠে চুমু দিয়ে বলল, -“সব মেয়েরা যদি তোমার মত করে তাদের বয়ফ্রেন্ডদের রেসপেক্ট করতো তাহলে ছেলেরাও মুগ্ধ হয়ে তাদের গার্লফ্রেন্ডদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতো।” তিতির হেসে বলল, -“আচ্ছা বাদ দাও, একটা কথা শোনোনা?” -“কি?” -“এখানে কি মহুয়া পাওয়া যায়? খেতে ইচ্ছে করছে।” -“অসম্ভব। ওই জিনিস আমি তোমাকে আরর জীবনে খেতে দেব না। মাতাল হয়ে যাও তুমি। যাদের কন্ট্রোল নেই তাদের খাওয়ার অধিকারও নেই।” -“নাহয় একদিন একটু হলাম কন্ট্রোললেস!” -“নো নো। এই ভুল আমি আর করতে লাগিনি।” তিতির মুগ্ধর হাত ধরে বলল, -“প্লিজ প্লিজ, একটুখানি খাব।” -“না, আর এখানে ওসব পাওয়াও যায়না। আর পাওয়া গেলেও আনতাম না।” তিতির মন খারাপ করে ফেলল। মুগ্ধ বলল, -“রাগ করে লাভ নেই। সত্যি এখানে ওসব পাওয়া যায়না। আর গেলেও কোথায় পাওয়া যায় আমি জানিনা।” -“আচ্ছা ঠিকাছে। রাগ করিনি তবে ওরকম কিছু হলে ভালই হতো।” -“হুম। আমার পাগলপ্রায় অবস্থা হতো আর কি!” -“আচ্ছা, আমাকে একটা কথা বলো না?” -“কি” অন্য কারো সাথে যখন বিয়ে হবে তখন কি করবে না করবে সে ব্যাপারে যে এত নিষেধাজ্ঞা দিলাম, তুমি আমাকে কোন নিষেধাজ্ঞা দেবে না?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“হ্যা একটা নিষেধাজ্ঞা আছে।” -“কি?” -“তুমি কারো সামনে কখনো লজ্জা পেও না।” তিতির চোখ নামিয়ে হাসলো। মুগ্ধ বলল, -“লজ্জা পেলে তোমাকে অন্যরকম সুন্দর লাগে, লোভ হয়। চাইনা সেই লোভটা আর কারো হোক।” -“তুমি একটা পাগল।” -“অবশ্য এটাও ঠিক যে তুমি আমার সামনে যত লজ্জা পাও পৃথিবীর অন্য কোন ছেলের সামনে ততটা পাবে না।” -“কিভাবে বুঝলে?” -“মেয়েরা যার সামনে যত বেশি লজ্জা পাবে বুঝতে হবে তাকে তত বেশি ভালবাসে। তুমি আমার থেকে বেশি করে কাউকেই ভালবাসতে পারবে না। জানি সেটা।” তিতির আর কোন কথা না বলে মুগ্ধর বুকের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। অনেক চেষ্টা করেও কান্না আটকাতে পারলো না ও। কেঁদেই ফেলল। ওর চোখের পানি মুগ্ধর বুকে পড়তেই মুগ্ধ বলল, -“তিতিরপাখি, কাঁদছ কেন?” -“আমাদের দুজনের কারো ভালবাসায়ই তো কোন খাঁদ নেই। তো আমরা কেন দুজন দুজনকে পাবো না, বলো? কি ভুল করেছি আমরা?” মুগ্ধ তিতিরের চোখ মুছে দিয়ে বলল, -“আমার বাঁ পাঁজরের হাড় দিয়ে বোধহয় আল্লাহ তোমাকে বানায়নি। অথচ আমরা ভালবেসে ফেলেছি। ভুলটা আমাদের এখানেই।” -“তাহলে তোমার জন্য আমার বুকটা কেন এত পোড়ে?” -“ভালবাসো যে।” তিতিরের কান্না থামলো না। বলল, -“আমি মানি না এসব। আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবো না। আর তোমাকেও অন্য কারো হতে দেব না। কেউ তোমাকে বিয়ে করতে আসলে খুন করে ফেলবো আমি তাকে।” মুগ্ধ তিতিরকে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে রাখলো কিছুক্ষণ। তারপর তিতিরের মুখটা ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, -“কান্না থামাও, আমার কথা শোনো।” তিতির কান্নাটাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করলো। মুগ্ধ বলল, -“হয়তো জীবনে এরকম সময় আমরা আর পাব না। এভাবে কান্নাকাটি করে এত মধুর সময়কে বিধুর করার কোন মানে হয়?” তিতির চুপ। মুগ্ধ আবার বলল, -“শোনো, আমরা যে দুদিন এখানে আছি, কান্নাকাটি তো দূরের কথা। একবার মনও খারাপ করবে না। চলোনা স্বপ্নের মত করে কাটাই এই দুটো দিন।” -“আচ্ছা, ঠিকাছে।” ঠিকাছে বলেও তিতির কাঁদতে লাগলো। মুগ্ধ একটু সময় দিল তাই আর কিছু বলল না। ওকে জড়িয়ে ধরে রইলো শুধু। কাঁদতে কাঁদতে তিতির কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মুগ্ধ ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠে পড়লো। বাসায় কল করে মায়ের সাথে কথা বলে নিল। কতক্ষণ টিভি দেখলো, নিউজপেপার পড়লো। ঘুমানোর চেষ্টা করলো ঘুমও আসছে না। ঘুম যখন আসছেই না এক কাপ কফি খাওয়া যায়। একটা কফির অর্ডার করে কফিও খেয়ে নিল। সময়ই কাটছে না। আসলে তিতির ঘুমিয়ে আছে বলে ওর মনে হচ্ছে ওর পৃথিবীটাই ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান ছিল তিতিরের জন্য প্রথমে ভেবেছিল আজই সারপ্রাইজটা দিয়ে দেবে। পরে যখন তিতির আগামীকালও থাকার পারমিশন নিল তখন ঠিক করলো কাল দেবে। কিন্তু এখন তো ইচ্ছে করছে ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে আজই দিতে। নাকি কালই দেবে? দোনোমনা করতে লাগলো। তিতির ঘুমিয়ে থাকলেই তো আরেঞ্জমেণ্টটা সহজ হবে। কাল যদি না ঘুমায়?” -“তিতির? এই তিতির? ওঠোনা প্লিজ। কতক্ষণ ধরে ডাকছি বলোতো?” -“উম্মম্মম্ম, আম্মি ঘুম্মাই।” -“জানি তো, একটু পর আবার ঘুমাবে। আমিও ঘুমাবো। কিন্তু এখন একটু চোখ মেলে তাকাও।” তিতির ঘুমের ঘোরেই তাকালো। বলল, -“কি?” -“কোলে উঠবে?” -“হুম” মুগ্ধ এতক্ষণ বিছানার পাশে বসে ছিল। এবার উঠে দাঁড়ালো। তিতির তাকিয়ে ছিল মুগ্ধর দিকে। ঘুমে জড়ানো কন্ঠে বলল, -“তোমার বুকটা এত সুন্দর কেন? দেখলেই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।” মুগ্ধ বলল, -“হুম, আমারও। এবার উঠেন আপনি।” -“তোমারও মানে? তুমি কিভাবে তোমার বুক খাবে? তোমার গলা কি এতটা ফোল্ড হয়? তারচেয়ে আমাকে খেতে দিলেই ভাল হতো।” তিতিরের ঘুমের ঘোর কাটেনি। মুগ্ধ হেসে বলল, -“আচ্ছা, তো বুকে আসো।” তিতির লাফিয়ে উঠে মুগ্ধর বুকে ঝপিয়ে পড়লো। মুগ্ধ ওকে কোলে নিতেই ওর খেয়াল হলো ঘরের লাইট বন্ধ। আর সারাঘরে অসংখ্য মোমবাতি জ্বলছে। মোহময় পরিবেশ। তিতিরের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেড়িয়ে গেল, -“ওয়াও।” মুগ্ধ তিতিরকে কোলে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাড়ালো। ড্রেসিং টেবিলের উপরেও দুটো মোম জ্বালানো ছিল। মুগ্ধ ওকে কোল থেকে নামিয়ে দু’চোখের উপর চুমু দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। তিতিরের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। তারপর মুগ্ধ ওকে আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড় করালো। বলল, -“চোখ খুলবে না।” তিতির আদুরে কন্ঠে বলল, -“আচ্ছা।” হঠাৎ গলায় কিছুর স্পর্শ অনুভব করতেই চোখ মেলে তাকালো তিতির। মুগ্ধ ওকে একটা নেকলেস পড়িয়ে দিচ্ছে। শাড়ির সাথে ম্যাচিং হালকা একটা নেকলেস। তারপর মুগ্ধ পেছন থেকে তিতিরের কোমর জড়িয়ে ধরে দুষ্টু হাসি একটা মুখে লাগিয়ে তাকিয়ে রইল আয়নায়। তিতিরের একে তো চোখে ঘুম তার উপর মোমের আলোয় নিজেদেরকে আয়নায় দেখতেও বেশ লাগছিল। আবেগে আর কথা বলতে পারছিল না ও। মুগ্ধ তিতিরের ঘাড়ের উপর থেকে চুল সরিয়ে একটা চুমু খেল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে একটা চুমু দিয়ে বলল, -“আই লাভ ইউ।” তিতির শুধু মাথাটা মুগ্ধর দিকে ফিরিয়ে বলল, -“আই লাভ ইউ টু।” তারপর মুগ্ধ পেছন থেকেই তিতিরের গালে হাত রেখে ওর ঠোঁটে চুমু খেতে লাগলো। তিতিরের প্রায়ই যেটা মনে হয় সেটাই মনে হচ্ছিল তখন। ইশ, এখনি যদি ওরা মরে যেত!সকাল সকাল গাড়ি ছুটে চলেছে গোয়াইনঘাটের পথে। শহর ছেড়েছে অনেকক্ষণ। গোয়াইনঘাট থেকে নৌকায় করে যাবে বিছনাকান্দি। মুগ্ধ ড্রাইভ করতে করতে বলল, -“একটা সুপুরুষ ছেলের সাথে কিস করতে করতে একটা মেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে আমি আগে জানতাম না। তাও আবার দাঁড়ানো অবস্থায়!” তিতির মন খারাপ করে বলল, -“আর কত পচাবে?” -“আজীবন পচাব, আজীবন খোঁটা দিব। কি করে পারলা ওই অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়তে? আর তারপর এত ডাকলাম উঠলেই না।” -“কখনোই এত ডাকোনি। হয়তো একটা ডাক দিয়েছো, আমি উঠিনি তাই আর ডাকোনি।” -“আজ্ঞে না ম্যাম, আমি আপনাকে কম হলেও ৪/৫ বার ডেকেছি।” -“ইশ না।” -“এখন এই কথা বললে একটা গাড্ডা দিব মাথার মধ্যে।” -“সরি।” -“এখন সরি বলে কি হবে? ২ রাত থাকবো তার মধ্যে একটা চলেই গেল।” -“আমি কি ইচ্ছে করে ঘুমিয়েছি বলো?” -“কি জানি!” -“মানে কি? তুমি ভাবছো আমি ইচ্ছে করে ঘুমিয়েছি?” তিতিরের অপরাধবোধ দেখে মুগ্ধর খুব মজা লাগছিল। ওকে আরো তাতানোর জন্য বলল, -“হতেও পারে।” -“নাহ, বিশ্বাস করো। কখন ঘুমিয়েছি টেরই পাইনি।” -“ভাল করেছ।” -“আমি সত্যি সরি। আমাকে মাফ করে দাও।” মুগ্ধ অভিমানী কন্ঠে বলল, -“এখন এগুলো বলে লাভ নেই। সারারাত আমার একা একা অনেক কষ্ট হয়েছে। ঘুমই আসছিল না। তারপর ভোরের দিকে ঘুমিয়েছি।” তিতির নিজের কান ধরে বলল, -“এই দেখো কান ধরছি। এবার তো মাফ করো।” মুগ্ধ ভাব ধরে বলল, -“ঠিকাছে ঠিকাছে। কান ধরতে হবে না।” -“আমি আজ রাতে এক মিনিটের জন্য ঘুমাবো না।” -“এহ, জোকস অফ দ্যা ইয়ার।” -“সত্যি।” মুগ্ধ এবার হাসি হাসি মুখ করে বলল, -“তোহ, সারারাত জেগে কি করবে?” তিতির এবার লজ্জা পেল। কিন্তু ওর কথার অর্থ না বোঝার ভান করে বলল, -“কি আর করবো? যা করি তাই করবো! ওই মানে গল্পগুজব আর কি! আর ঘুমালে তুমি ঘুমানোর পর ঘুমাবো।” মুগ্ধ এতক্ষণ পর হেসে দিল। তিতিরের বুকের ভার নেমে গেল। বুঝতে পারলো মুগ্ধ আসলে রাগ করেনি দুষ্টুমি করছিল। কিন্তু রাগ করার মতই একটা ঘটনা ঘটেছে। গতরাতে কিস করতে করতেই কি করে যে ঘুমিয়ে পড়লো। ইশ এত সফটলি আদর করছিল মুগ্ধ, আরামেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। দোষ কি তাহলে ওর? তিতির যখন এসব ভাবছিল মুগ্ধ তখন বলল, -“দেখা যাবে বাসর রাতেও তুমি নাক ডেকে ঘুমাবে। আর আমি বসে বসে মশা মারবো।” একথায় তিতির চমকে তাকালো মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধরও খেয়াল হলো, যেখানে ওদের বিয়েই হবে না সেখানে এসব কি নিয়ে ভাবছে মুগ্ধ! দুজনেই চুপ হয়ে গেল। কেউ এই বিষয়ে আর কোন কথা বলল না। দুপাশে জমি মাঝখানে রাস্তা। জমির কোথাও কোথাও বৃষ্টির কারনে পানি উঠে গেছে। হঠাৎ গাড়ি থামালো মুগ্ধ। তিতির বলল, -“কি হলো?” -“তরমুজ খাব।” তিতিরের নজরে পড়লো রাস্তা দিয়ে একটা তরমুজের ভ্যান যাচ্ছে। মুগ্ধ নেমে দুটো তরমুজ কিনে আনলো। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, -“তোমার না তরমুজ প্রিয়?” -“হুম। তোমারও তো প্রিয়।” -“সেজন্যই নিলাম।” -“হ্যা কিন্তু কেটে আনলে না কেন? কাটবো কি করে?” -“তরমুজ আবার কাটা লাগে নাকি?” -“তো খাব কি করে?” -“যখন খাব তখনই দেখো।” কিছুদূর গিয়ে মুগ্ধ একটা কালভারটের সামনে গাড়ি থামালো। তারপর তিতিরকে বললো, -“নামো।” তিতির নামলো। মুগ্ধ একটা তরমুজ নিয়ে নামলো। তারপর কালভারটের পাথুরে ফুটপাতের সাথে বারি দিতেই তরমুজটা ফেটে গেল। আরেকবার বারি দিতেই তরমুজটা ভেঙে কয়েকটা অসমান টুকরা হয়ে গেল। তিতির হেসে দিল। তিতির পড়ে ছিল থ্রি-কোয়ার্টার আর শার্ট। মুগ্ধ পড়ে ছিল হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওরা যখন ভাঙা তরমুজ কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিল লোকজন যেতে যেতে হা করে দেখছিল। তিতির বলল, -“উম্মম্মম্মম্ম, তরমুজটা অন্নেক মিষ্টি।” -“হুম। কালো তরমুজগুলো মিষ্টিই হয়।” -“এই, দেখো এরকমভাবে তরমুজ খেয়ে আমার হাতমুখ পুরো মেখে গেছে।” মুগ্ধ হাসলো। তিতির বলল, -“হাসছো কেন?” -“এমনি।” -“এমনি না, এমন দুষ্টুমার্কা হাসি তুমি তখনই দাও যখন তোমার মাথায় কোনো দুষ্টুমি ঘুরতে থাকে।” মুগ্ধ হাসি হাসি মুখ করেই বলল, -“আচ্ছ, তারাতারি খেয়ে শেষ করো। রওনা হতে হবে।” -“বলো না কেন হাসলে?” -“পরে বলছি বাবা। একটু পরে বলি?” -“আচ্ছা।” তরমুজ খাওয়া শেষ হতেই আবার দুজনে গাড়িতে উঠলো। মুগ্ধ গাড়ি স্টার্ট দিল। তিতির বলল, -“ইশ তরমুজের রস লেগে মুখ, গাল আর হাতগুলো কেমন আঠা আঠা মিষ্টি মিষ্টি হয়ে আছে! তোমারও এমন হয়েছে?” -“কই না তো। দেখো তুমি।” -“আসলেই তোমার এরকম হলো না কেন?” -“আমি কি তোমার মত হালুম হুলুম করে খেয়েছি নাকি?” -“ইশ, আমি বলে হালুম হুলুম করে খেয়েছি? তুমি এটা বলতে পারলে?” মুগ্ধ হাসতে লাগলো। তিতির বলল, -“আচ্ছা যাও আমি হালুম হুলুম করেই খেয়েছি। খুশি? এবার আমার ব্যাগ থেকে একটু পানিটা বের করে দাও। হাতমুখ ধোব।” গাড়ি থামালো মুগ্ধ। বলল, -“দেখি কেমন মিষ্টি মিষ্টি হয়েছে?” একথা বলেই মুগ্ধ আচমকা তিতিরের ঠোঁটে চুমু খেল। তারপর বলল, -“তোমার ঠোঁট এম্নিতেই অনেক মিষ্টি। তরমুজের রস তার কাছে তুচ্ছ।” তিতির লজ্জা পেয়ে লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নিল। মুগ্ধ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, -“এটা করবো ভেবেই তখন হেসেছিলাম।” তিতির আর কিছু বলল না। গোয়াইনঘাট থেকে ওরা একটা নৌকা নিল। সাথে জুটে গেল ছোট্ট একটা গাইড। বয়স ১৩/১৪ হবে। নৌকা চলতে শুরু করতেই মুগ্ধ তার সাথে আর মাঝির সাথে গল্প জুড়ে দিল। তিতির খেয়াল করলো নদীর চারপাশটা বড্ড সুন্দর। সবুজ আর সবুজ। নদীর পানিটাও কি সুন্দর। দূরের পাহাড়গুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মুগ্ধ মাঝিকে বলল, -“মামা, আগে পান্থুমাই চলো। ওদিকটা ঘুরে বিছনাকান্দি যাবা।” মাঝি মাথা নাড়লো। দূর থেকেই প্রথমবার যখন পান্থুমাই ঝরনা দেখতে পেল তিতির দুইহাত নিজের গালে রেখে চিৎকার করে উঠলো, -“ওয়াও, এটা কি দেখতে পাচ্ছি আমি?” মুগ্ধ হেসে বলল, -“এটাই পান্থুমাই ঝরনা।” -“এত সুন্দর কিভাবে? উফফফ।” নৌকা আরো যত কাছে যেতে লাগলো ঝরনার পানি পড়ার শব্দ আরো কাছে আসতে লাগলো। বিশাল বিশাল সবুজ গাছে ভরা দুই পাহাড়ের মাঝখানে সুন্দরী ললনার মত কোমর বাঁকিয়ে আছে পান্থুমাই। একসময় নৌকাটা থামিয়ে দিল মাঝি। তিতির বলল, -“মামা, থামালেন কেন এখন? যান না। আমি ওই ঝরনার নিচটায় যাব।” মাঝি কিছু বলার আগেই মুগ্ধ বলল, -“প্রথমত, ওই ঝরনার নিচে গেলে স্রোত নৌকা উলটে দেবে। দ্বিতীয়ত, ওই ঝরনাটা ইন্ডিয়াতে।” -“মানে কি এত সুন্দর একটা ঝরনা কিনা ইন্ডিয়াতে? অথচ এত কাছে! ধ্যাত শুধু দেখতেই পারলাম। ছুতে পারলাম না।” -“হুম, যদিও ঝরনাটা আমাদের দেশে না কিন্তু আমরা বাংলাদেশীরা তাও ঝরনাটা দেখতে পারি। অথচ ওটা ইন্ডিয়াতে হওয়া স্বত্তেও ইন্ডিয়ানরা দেখতে পারে না। দেখতে হলে ওদের ভিসা নিয়ে এপাড়ে আসতে হবে। নাহলে ওই ব্রিজটা দিয়ে কোথাও যেতে হবে।” তিতির ব্রিজটা দেখলো। একদম ঝরনার সামনে দিয়ে একটা ব্রিজ এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে চলে গেছে। তারপর বলল। -“ওদের ঝরনা ওরা কেন দেখতে পারবে না?” -“কারন ঝরনাটা একদম সীমান্তে, এবং পুরোটাই আমাদের দেশে মুখ করা।” -“ইয়েস! একদম ঠিক হয়েছে।” এতক্ষণে ঝরনার কাছে যেতে না পারার আফসোস কাটলো তিতিরের। মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে চলল বিছনাকান্দির পথে। নদীটি মোটেও গভীর না। কাছাকাছি যেতেই নৌকা এক যায়গায় আটকে গেল। যায়গাটা বোধহয় একটু উঁচু। গাইড রাজু আর মুগ্ধ নামলো নৌকায় ধাক্কা দিয়ে যায়গাটা পার করার জন্য। নামতেই দেখলো ওখানে হাটু সমান পানি। তিতির মুগ্ধকে বলল, -“আমিও নামবো।” মুগ্ধ বলল, -“নামবে? নামো।” তিতিরও নেমে ধাক্কা দিল। ধাক্কা দিতেই পানি ছিটকে এসে খানিকটা ভিজিয়ে দিল ওদেরকে। তিতিরের খুব আনন্দ হলো। হাসতে লাগলো, ওকে এভাবে হাসতে দেখে মুগ্ধরও ভাল লাগলো। নৌকা যখন আবার একা একা চলতে শুরু করলো মুগ্ধ বলল, -“এবার ওঠো তিতির।” -“না আমি উঠবো না। নৌকা ধরে ধরে পানির মধ্যে হাটবো।” মাঝি বলল, -“আপু সামনে তো অনেক পানি। হাটতে পারবেন না ওখানে।” মুগ্ধ কথা না বাড়িয়ে তিতিরকে কোলে উঠিয়ে নৌকায় তুলে দিল। তারপর নিজেও উঠলো। তিতির রাগী রাগী মুখ করে মুগ্ধর দিকে তাকালো। মুগ্ধ হাসি হাসি মুখ করে একটা ফ্লাইং কিস ছুড়লো। তবে সেলিব্রেটিদের মত হাত দিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে নয় শুধুই ঠোঁটের ইশারায়। তারপর তিতির মিষ্টি একটা হাসি দিল। এই যায়গাটায় নদী থেকে পাথর উঠানো হয়। পাথর উঠিয়ে নদীর পারে একের পর এক রেখে রেখে পাথরের পিরামিড বানিয়ে ফেলেছে কতগুলো। তিতির সেই পাথরের পিরামিড গুলোই দেখছিল। আর দেখছিল বিছনাকান্দির পাহাড়। না পৌঁছালেও পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। দুপাশে পাহাড়, মাঝখানে ফাঁকা। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো দুপাশের পাহাড় একদম সমান উচ্চতার। আল্লাহ বুঝি গজফিতা দিয়ে মেপে মেপে বানিয়েছেন। তিতির ভেবেছিল দূর থেকে পাহাড়গুলোকে নীল মনে হচ্ছে। কিন্তু এখন দেখছে পাহড়গুলো আসলেই নীল রঙের। পাহাড়ের নীচের দিকটা গাঢ় নীল, উপরটা হালকা নীল। মুগ্ধ বলল, -“তিতির, এদিকে তাকাও.. পানিটা দেখো।” তিতির তাকাতেই দেখতে পেল পানিটা স্পষ্ট দুই রঙের। একপাশে নদীর পানি যেমন হয় হালকা সবুজ ভাব, আরেকপাশে স্বচ্ছ নীল পানি। পানির নিচের বালু, ছোট ছোট মাছ, শৈবাল সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিতির এক্সাইটমেন্টে মুগ্ধর হাত চেপে ধরে বলল, -“এটা কি করে সম্ভব?” -“সবই আল্লাহর সৃষ্টি।” -“উফফ এত সুন্দর পানি।” তিতির নীলপানি গুলো হাতে করে উঠালো। হাতের মধ্যেও পানিগুলো নীলই দেখালো। তিতির মুগ্ধকে বলল, -“দেখো, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম আকাশের রিফ্লেকশান বুঝি। কিন্তু পানিগুলো আসলেই নীল।” -“নীলই তো। এখানে সবই নীল। এখনি বুঝবে না। পৌঁছে নিই তখন বুঝতে পারবে।” বিছনাকান্দি পৌঁছেই তিতিরের চোখে নীলের নেশা ধরে গেল। আকাশ নীল, পাহাড় নীল, পানি নীল। নীলের যে কতরকম শেড হতে পারে তা বিছনাকান্দি এলেই দেখা যাবে। ওরা নৌকা থেকে যেখানে নেমেছে তার একটু সামনে থেকেই পাথর শুরু। ছোট বড় অসংখ্য পাথর। সামনেই ভারতীয় সীমান্ত, ওপাশে শিলং। শিলং থেকে বয়ে আসা নদীটিই সেই নীল পানির উৎস। অজস্র পাথরের বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে নদীটি। এখানে নদীতে হাটুসমান পানি। তার নিচে পাথর। যেখানে ওরা নৌকা থেকে নেমেছে সেখানে গিয়ে নদী গভীর হয়েছে। নীল সৌন্দর্য দেখতে দেখতে তার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল তিতির! নিজের অবচেতন মনেই একটার পর একটা পাথর লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে নেমে যাচ্ছিল পানিতে। মুগ্ধ মাঝির ফোন নাম্বার নিচ্ছিল যাওয়ার সময় যোগাযোগ করার জন্য। নাম্বার নিয়ে তাকাতেই দেখে তিতির অনকদূর নেমে গেছে। মুগ্ধ দৌড়ে এক পাথর থেকে অন্য পাথরে গিয়ে গিয়ে ভেজা পিচ্ছিল পাথরে যাওয়ার আগেই ধরে ফেলল। রেগে গিয়ে বলল, -“তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি তো আল্লাহর রহমতে কম না, তাহলে মাঝে মাঝে এমন গাধামি কেন করো?” তিতির অবাক হয়ে বলল, -“আমি কি করলাম?” -“আমি ফোন নাম্বারটা নেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা গেল না? একা একা নামছিলে কেন? সাহস ভাল কিন্তু এত সাহস তো ভাল না।” -“ইশ, সরি। তুমি যে আসছিলে না খেয়ালই করিনি। আমি তো ভেবেছি তুমি সাথেই আছো।” -“খেয়াল করবেনা কেন?” -“আরে এত সৌন্দর্য দেখে আমার তো মাথাই ঠিক নেই, পাগল হয়ে যাচ্ছি। রাগ করোনা প্লিজ।” -“ড্যাম ইওর রাগ। জানো পাথরগুলো কতটা পিচ্ছিল? পিছলে পড়ে গেলে শুধু ব্যাথাই পাবে তা না স্রোতের সাথে ভেসে হারিয়ে যাবে নদীর মধ্যে।” -“আমি তো সাঁতার জানি।” -“হেহ! সাঁতার জানে। স্রোতের ভয়াবহতার ব্যাপারে কোন আইডিয়া আছে?” তিতির প্রায় কান্না করে দিচ্ছিল। চোখে পানি ছিল না কিন্তু গলাটা কেঁপে উঠলো যখন বলল, -“সরি আর এরকম করবো না।” মুগ্ধর বুকটাও সাথে সাথে কেঁপে উঠলো। বলল, -“আরে আরে কাঁদছ নাকি? আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তাই একটু কড়া কথা বলে ফেলেছি।” তিতির সামলে নিল। বলল, -“না, ঠিকাছে।” মুগ্ধ তিতিরকে কোলে তুলে নিল। তারপর পানির মধ্যে নামতে নামতে বলল, -“বকেছি তো পরে বেশি আদর করে পুষিয়ে দেব। মন খারাপ করোনা প্লিজ। তুমি যদি পা পিছলে পড়ে যেতে? ব্যাথা পেতে না বলো? পাথরের সাথে ঘষা খেয়ে তোমার এই সুন্দর সুন্দর পা গুলো ছিলে যেত না?” -“তুমি আমার পা দেখেছো কিভাবে?” -“কেন তুমি যখন যখন থ্রি-কোয়ার্টার পড়েছো তখন তখনই তো দেখেছি।” -“যখন যখন বলতে? আমি তো ট্যুরে যাওয়া ছাড়া পড়িনা।” -“ওইতো, নাফাখুম ট্রিপে দেখেছি। আজ দেখেছি।” -“মানে কি? এখন নাহয় বুঝলাম দেখেছো আমি তোমার গার্লফ্রেন্ড, তাকাতেই পারো! কিন্তু নাফাখুম ট্রিপে তো আমি তোমার গার্লফ্রেন্ড ছিলাম না, তখন কেন দেখেছো?” মুগ্ধ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, -“না মানে, এত সুন্দর জিনিস দেখে কি চোখ ফিরিয়ে রাখা যায় বলো? তাছাড়া আমি ততদিনে তোমাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। আকর্ষণ টা একটু বেশিই ছিল। তোমার সবকিছুতে নজর দিতাম।” তিতির চোখ বড় বড় করে বলল, -“সবকিছু বলতে?” ততক্ষণে ওরা পানিতে নেমে গিয়েছে। তিতিরকে পানির নিচে পাথরের উপর বসিয়ে দিয়ে বলল, -“না না, নেগেটিভলি নিও না। মানে আমি তোমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। একদিন তোমার পেটও দেখে ফেলেছিলাম।” তিতিরের চোখগুলো এবার বেড়িয়ে আসতে চাইলো। বলল, -“নাফাখুম ট্রিপে?” -“হুম।” -“কিভাবে?” -“ওইযে যেদিন আমরা রেমাক্রি পৌঁছেছিলাম তুমি গোসল করে বাইরে এসে কাপড় মেলে দিচ্ছিলে তখন তোমার টপসটা উঠে গিয়ে পেট বের হয়ে গিয়েছিল।” -“তার মানে তো এক্সিডেন্টলি বের হয়ে গেছিল। আর তুমি কিনা হা করে দেখছিলে?” -“না বাবা, আমি একবার দেখে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।” -“কে জানে!” -“কিন্তু তারপর অনেকদিন চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠতো সেই দৃশ্য, উফফফ!” তিতির ওর বুকে একটা কিল দিয়ে বলল, -“যাহ, অসভ্য একটা।” মুগ্ধ হেসে বলল, -“আচ্ছা শোনো না, যখন তোমাকে কোলে তুলে হাটছিলাম তখন আশেপাশের মানুষগুলো তাকিয়ে ছিল।” -“হুম, খেয়াল করেছি আমি। দেখুক গিয়ে।” -“তুমি খুব এনজয় করো না? মানুষ যখন হা করে দেখে আমাদের?” -“করি তো। খুব প্রাউড ফিল করি আমি।” মুগ্ধ হাসলো। কথা বলতে বলতেই মুগ্ধ পানিতে শুয়ে পড়লো। কিন্তু একটা হাত দিয়ে তিতিরকে ধরে রেখেছিল। তিতির বলল, -“এই এত স্রোতের মধ্যে তুমি শুয়ে পড়লে যে? আমার ভয় লাগছে।” মুগ্ধর পুরো শরীর পানির নিচে। মাথাটা পানি থেকে উঠিয়ে বলল, -“কিছু হবে না, প্রটেকশন আছে। ওই দেখো পা একটা পাথরে আটকে রেখেছি।” -“প্লিজ ওঠো তুমি। আমার ভয় করছে কারন, আমার বসে থাকতেই প্রব্লেম হচ্ছে। তুমি ধরে না রাখলে স্রোতের তোরে কবেই ভেসে যেতাম।” -“তুমি আমাকে নিয়ে নাফাখুমের মত ভয়ঙ্কর যায়গায়ও ভয় পাওনি আর এখানে ভয় পাচ্ছো?” -“ওখানে তো সেফটি বেল্ট ছিল।” -“এখানেও পা ঠেকানো ওই পাথরটা সেফটি।” -“উফ তিতির তুমি না!” উঠে বসলো মুগ্ধ। তারপর বলল, -“আমি তোমাকে ধরে রেখেছি, তুমি একটু শোও।” -“এত মানুষের মধ্যে আমি শোবো?” -“এত মানুষ কোথায় পেলে? বিছনাকান্দিতে অনেক মানুষ হয়। এখন তো মানুষ নেই বললেই চলে।” -“তবু, যেকয়জন আছে তারা আমার অপরিচিত।” -“বাপরে, বিছনাকান্দির বিছনায় না শুয়ে গেলে অনেক বড় কিছু মিস করবে। কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে নেই বাবা। একা থাকলে হয়তো তাকাতো, কিন্তু এত হ্যান্ডসাম একটা ছেলে আছে সাথে। ওরা তো বুঝে তাকালে চোখ গেলে দেব।” তিতির একটা হাসি দিয়ে শুয়ে পড়লো পানির মধ্যে। মুগ্ধ হাত ধরে থেকে বলল, -“পুরো শরীর পানির নিচে ডুবিয়ে দাও। শুধু মাথাটা পাথরটার উপরে রাখো তাহলে কানে পানি যাবেনা।” তিতির তাই করলো। মুগ্ধ বলল, -“আরে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন? চোখ বন্ধ করে রাখো।” তিতির চোখ বন্ধ করলো। মুগ্ধ আবার বলল, -“হাতদুটো দুপাশে ছড়িয়ে দাও পাখির মত তাতে পানির মধ্যে শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারবে।” তিতির তাই করলো। তারপর মুগ্ধ ওকে ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিতেই তিতির তাকিয়ে বলল, -“আমি পারবো ব্যালেন্স রাখতে কিন্তু তুমি ধরে থাকো ভাল লাগে।” -“না তিতির। কিছু কিছু জিনিস ফিল করতে একা হওয়া প্রয়োজন। এখানে কোন মানুষজন না থাকলে দুজনে মিলে ফিল করা যায় এমন কিছু ফিল করাতাম তোমাকে। যেহেতু মানুষজন আছে তাই একটা কথাও না বলে যেভাবে বললাম ওভাবেই থাকো কিছুক্ষণ। আমি পাশেই আছি।” তিতির আর কথা বলল না। মুগ্ধ যেভাবে বলল সেভাবেই শুয়ে রইলো। কোনো অজানা পাহাড়ের অজানা ঝরনার গা বেয়ে নেমে আসা হিমশীতল পানি তিতিরের সারা অঙ্গ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এভাবে ছোঁয়ার জন্য আবার শাস্তি দেবে না তো মুগ্ধ? একথা ভেবে নিজের মনেই হেসে উঠলো তিতির। আস্তে আস্তে টের পেল নদীর কলকল ধ্ধনিতে মুখরিত চারপাশ। শব্দটা যেন ওর বুকের ভেতর হচ্ছে, আসলে তা তো না। কিন্তু শব্দটা পানির মধ্যে আর স্রোতের পানিগুলো কানের এত কাছে যে অন্য কোনো শব্দ আর কানে আসছে না। শব্দটা আস্তে আস্তে কেমন যেন করুন শোনালো। কিন্তু এত অসাধারণ যে কোনো ওস্তাদের বাজানো সানতুর, সেতার বা সারদের চেয়ে কোনো অংশে কম মনে হলো না। কখন যে তিতিরের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে মিশে গেল সে পিয়াইন নদীর নীল জলে তা কেউ জানলো না। একসময় মুগ্ধ বলল, -“এবার চোখ দুটো খুলে আকাশের দিকে তাকাও।” তিতির তাকাতেই অন্যরকম এক অনুভূতি রইলো। একটু আগের সব অনুভূতি তো রইলোউ সাথে আরো যোগ হলো খোলা নীল আকাশের সৌন্দর্য। এবার মনে হতে লাগলো ও এমন কোনো অচেনা জগতে আছে যেখানে একই সাথে পাখির মত আকাশে ওড়া যায় আবার জলকন্যার মত পানিতে সাঁতারও কাটা যায়। কয়েক ঘন্টা পানিতে থাকার পর যখন ওরা পানি থেকে উঠলো হঠাৎই বৃষ্টি নামলো, ব্যাপক বৃষ্টি। তিতির চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিবিলাস করছিল। কিন্তু মুগ্ধর প্রচন্ড ক্ষুদা লেগেছে। দুপুর পেড়িয়ে বিকেল হয়ে গিয়েছে, সেই সকালে খেয়ে বেড়িয়েছে। পথে আসতে আসতে হাবিজাবি খেয়েছে, -“তিতির, খুব ভুল হয়ে গিয়েছে একটা জিনিস।” তিতির চোখ খুলে মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল, -“কি?” -“ভাত খেয়ে পানিতে নামা উচিৎ ছিল। স্রোত ছিল যে অনেক, স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে পানিতে থাকায় এনার্জি শেষ।” -“আহারে! তো খেয়েই নামতে।” -“খেয়াল ছিল না, তাছাড়া তখন তো আর ক্ষিদেও ছিল না।” -“ও।” -“তোমার ক্ষিদে পায়নি?” -“বুঝতে পারছি না। আসলে আমি এখনো ঘোর থেকে বের হতে পারছি না।” -“স্বাভাবিক, প্রথমবার এমনই হয়। কিন্তু আমার তো ভাত খাওয়ার জন্য জানটা বের হয়ে যাচ্ছে।” -“ইশ।” ততক্ষণে মাঝি আর রাজু ওদের দেখতে পেয়ে চলে এসেছে। তিতির ওদের জিজ্ঞেস করলো, -“ওই দোকানটাতে ভাত পাওয়া যায়?” রাজু বলল, -“না আফু, চিপস, কেক, বিস্কুট আছে।” মুগ্ধ বলল -“ভাত হাদারপাড় ছাড়া পাওয়া যাবে না না?” -“না।” তিতির বললো, -“হাদারপাড় গিয়ে খাই তাহলে।” মুগ্ধ বলল, -“আমার লাশ যাবে তাহলে। কারন, ওইটা অনেক দূর।” -“ধুর, তোমার যত আজেবাজে কথা।” তিতির দোকানে চলে গেল।” মুগ্ধ বলল, -“আরে আরে, কোথায় যাও?” -“তোমার লাশ হওয়া ফেরাতে।” দোকানে গিয়ে বলল, -“ভাই, এখানে ভাত পাওয়া যাবে?” দোকানদার বলল, -“না।” -“চাল পাওয়া যাবে?” মুগ্ধ ততক্ষণে দোকানের সামনে চলে এল। বলল, -“আরে পাগল এটা কি চালের দোকান?” দোকানদার বলল, -“এইখানে চাল নাই।” তিতির বলল, -“প্লিজ কিছু চাল বিক্রি করুন, যেভাবেই হোক। আমার স্বামী ক্ষুধার জালায় মারা যাচ্ছে।” তিতিরের কথায় মাঝি আর রাজু হেসে দিল। মুগ্ধ আর দোকানদার হা করে চেয়ে রইলো। তিতির বলল, -“প্লিজ ভাত নাহলে চাল কিছু একটার ব্যবস্থা করুন।” দোকানদার কিছু বলার আগেই মুগ্ধ বলল, -“এই আমার ক্ষিদে নেই, চলো। অযথা বিরক্ত করছো ওনাকে, থাকলে তো দিতোই।” মুগ্ধ জোর করে নিয়ে যাচ্ছিল তিতিরকে। পেছন থেকে দোকানদার ডাকলো, -“ও ভাই দাঁড়ান।” ওরা দাঁড়ালো। দোকানদার বলল, -“আমার বউ খুদের ভাত পাডাইছিল। আমি আর আমার ভাই খাওয়ার পরও আছে। খাইবেন?” তিতিরের মুখে বিশ্ব জয় করার হাসি ফুটে উঠলো। মুগ্ধ কিছু বলার আগেই লাফিয়ে পড়ে বলল, -“হ্যা খাবে, খুদের ভাত তো ওর খুব প্রিয়।” মুগ্ধর মনে পড়ছে না খুদের ভাত কবে ওর প্রিয় ছিল। দোকানদার উঁচু উঁচু করে বেড়ে একপ্লেট খুদের ভাত দিতেই তিতির মুগ্ধর হাতে দিয়ে বলল, -“এই নাও খাও।” আরেকপ্লেট যখন দিতে নিল, তিতির বলল, -“না না আর লাগবে না। আমি খাব না। ওর জন্যই চাইছিলাম।” মুগ্ধ এখনো খাওয়া শুরু করছেনা দেখে দোকানের দাওয়ায় বসে তিতির হাত ধুয়ে নিজেই খাইয়ে দিল। মুখে দিয়ে মুগ্ধর মনে হলো অমৃত খাচ্ছে। শুধু ক্ষুদার জন্য না। রান্নাটাও ছিল চমৎকার। বোম্বাই মরিচ দিয়ে রান্না করেছে বোধয়। ঘ্রাণেই অর্ধেক পেট ভরে গেল। বাইরে ঝুমবৃষ্টি হচ্ছে। ভেজা শরীরে বিয়ে না করা বউ কিংবা বউয়ের থেকেও বেশি এমন মানুষটার হাতে তারই ভালবাসা দিয়ে জোগাড় করা খাবার খেতে খেতে মুগ্ধর বুকের ভেতর আবেগের তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। মেয়ে হলে হয়তো এতক্ষণে কেঁদেই ফেলতো। নাইবা পেল ওকে সারাজীবনের সহধর্মিণী হিসেবে, যা পেয়েছে ওর কাছ থেকে এমনকি এখনো পাচ্ছে তা অনেকে ভালবেসে সার্থক হয়ে বিয়ে করা বউয়ের কাছ থেকেও এর একশোভাগের এক ভাগ পায়না। মুগ্ধ বলল, -“শুধু আমাকে দিচ্ছো কেন? এতটা কি আমি একা খেতে পারবো?” -“হ্যা পারবে।” -“না পারবো না, তুমিও খাও। আর এটা অনেক টেস্টি। না খেলে মিস করবে।” -“উফ তুমি খাও তো।” -“তুমি না খেলে আমিও খাব না। অগত্যা তিতিরও খেল মুগ্ধর সাথে। খাওয়া শেষ হতেই তিতির দোকানদারকে বলল, -“ভাই আপনার নাম কি?” -“সুরুজ আলী।” -“সুরুজ ভাই আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি আপনার এই ঋণ কোনদিনও শোধ করতে পারবো না। আপনি জানেন না আপনি আমার কত বড় উপকার করলেন।” সুরুজ আলী কোন অজানা কারনে লজ্জা পেল। বলল, -“না না আপা কি যে বলেন।” মুগ্ধ বলল, -“সুরুজ ভাই, আমি জানি আপনি এটা বিক্রি করেন না। আপনার স্ত্রী যত্ন করে আপনার জন্য রান্না করে পাঠিয়েছে। তবু আমরা ক্ষুদার সময় খেয়েছি। আপনি যদি দামটা রাখেন আমি খুব খুশি হব।” সুরুজ আলী বলল, -“না না, ভাইজান আমি টাকা রাখতে পারমু না। এটা তো আমার ব্যবসার জিনিস না। আর বাড়তিই ছিল।” -“তবু ভাই, রাখেন। আর লজ্জা দিয়েন না। এমনিতেই আমার বউ অনেক লজ্জায় ফেলেছে।” সুরুজ আলী টাকা রাখতে চাচ্ছিল না। মুগ্ধ জোর করে তার হাতের মুঠোও টাকা গুঁজে দিল। তিতির বলল, -“সুরুজ ভাই, আজ থেকে আপনি আমার ভাই। আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আপনার বাড়িতে বেড়াতে আসব। ভাবীকে বলবেন এরকম খুদের ভাত রান্না করতে। এটা পৃথিবীর অন্যতম সুস্বাদু খাবার।” সুরুজ আলী অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। লোকটি বোধহয় খুব আবেগী। কারন, তিতিরের কথায় তার চোখ ছলছল করে উঠলো। সে বলল, -“অবশ্যই আসবেন আপা।” নৌকার কাছে যেতে যেতে তিতির বলল, -“আমি তোমাকে লজ্জায় ফেলেছি না?” মুগ্ধ একহাতে ওকে বুকে ধরে হাটতে হাটতে বলল, -“এত ভালবাসিস কেন রে পাগলী?” তিতির আহ্লাদে আটখান হয়ে গেল। মুগ্ধ আবার বলল, -“আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসবে, না?” -“যেটা বাস্তবে কখনো হবার নয় সেটা যদি কল্পনাতে ভেবে সুখ পাওয়া যায় তাতে দোষের কি?” মুগ্ধ তিতিরের কপালে একটা চুমু দিল। তিতির চোখ বন্ধ করে তা সাদরে গ্রহন করলো। তারপর বলল, -“আচ্ছা, তখন যে বলেছিলে মানুষজন না থাকলে দুজনে মিলে উপভোগ করা যায় এমন কিছু করতে। সেটা কি?” -“তোমাকে একবার আমার বুকে, আরেকবার পিঠে নিয়ে সাঁতার কাটতাম।” -“সিরিয়াসলি?” -“হ্যা।” -“পারবে তুমি?” -“কেন পারবো না? তোমার ওজন কত ৫০?” -“না, ৪৮।” -“আর আমার ৮০, ভরসা হয়না? তাছাড়া পিউকে পিঠে নিয়ে সাঁতরাতে পারলে তোমাকে নিতে পারবো না? তোমরা তো অলমোস্ট সেম। ওর ওজন হয়তো তোমার থেকে সামান্য বেশি।” -“তাহলে প্লিজ চলো… এখন তো মানুষজন একদম নেই বললেই চলে।” মুগ্ধ হাসতে লাগলো। বৃষ্টি, ব্যাপক বৃষ্টি! ঝুমবৃষ্টি… নদীর নীল পানিতে বৃষ্টির ইয়া বড় বড় ফোঁটা পড়ছে, আর শামুকের শেপ তৈরি হচ্ছে পানিতে। তার মধ্যে উলটা সাঁতার দিচ্ছে মুগ্ধ। মুগ্ধর বুকের উপর ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে তিতির। যতটা কষ্ট হবে ভেবেছিল মুগ্ধ ততটা হচ্ছে না। কারন, তিতিরও পা দিয়ে সাঁতরাচ্ছে মুগ্ধর বুকের উপর শুয়ে। দুজনই একসাথে পা দিয়ে পানিগুলোকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে সাঁতার কাটছে আর পাগলের মত হাসছে। হাসির শব্দ ফাঁকা যায়গায় বার বার বাজছে। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন মিলিয়ে যাচ্ছে তখন বড্ড করুণ শোনাচ্ছে। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসেনা ওদের। ওরা আজ ভাসছে। আজ ওরা মানুষ নয়। ওরা জলমানব আর জলমানবী।

About Author


Administrator
Total Post: [352]

Leave a Reply




Comment: (Write Something About This Post..)

সম্পর্কযুক্ত গল্প

 
© Copyright 2019, All Rights Reserved By BdStory24.Com
About Us || Copyright Issues || Terms & Conditions || Privacy Policy