তোমায় আমার প্রয়োজন [৮ম অংশ]

লেখাঃ আফরোজা আক্তার (মেঘলা)

তনু কারো কথাই শুনে নি । নিজের মেয়েকে নিয়ে রুমে গিয়ে বসে আছে । এদিকে তাওহীদ সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে । কিন্তু কেউই তেমন পাত্তা দিচ্ছে না । আফরোজও ক্লান্ত এদের বুঝাতে বুঝাতে । তাওহীদের এই এত বছরে আজ নিজেকে অনেক ভিখারী মনে হচ্ছে । সে কোন জিনিস চেয়েছে আর সে তা পায় নি তা কখনও হয় নি । কিন্তু আজ সে তার বউকে পাচ্ছে না । এর থেকে আর বড় কোন ভিখারী নেই বলে মনে হয় না ।

.
– রুমেল , তুমি কিছু বলবে না 
– আমি কি বলবো তাওহীদ ভাই , কম কষ্ট তো আমার বোন টা পায় নি , ওইদিন আপনার কলার ধরেছিলাম তবুও ওর চোখে পানি দেখেছি আমি । আপনি আমাদের তাহুরার বাবা এটা আমরা অস্বীকার করি না আর কখনও করবো না কিন্তু তনু হয়তো আর যেতে চায় না 
– ভাবীর সাথে আমি কি একবার কথা বলে দেখবো ? 
– তাতে কোন লাভ হবে না মনে হচ্ছে 
– একবার চেষ্টা করে দেখিই না রুমেল ভাই 
– দেখতে পারেন , তবে আমার বোন যা বলবে তাতেই আমরা রাজি

.
এই কথা বলে রুমেল বাহিরে বের হয়ে যায় । সাকিল আর রাত্রি এতক্ষন মাইশা আর রুমেলকে ফলো করেছে তবে অবশ্যই দুজন দুজনের মত ফলো করেছে । রুমেল চলে যাওয়ার পর মাইশা ভেতরের দিকে পা বাড়ায় ।

দীর্ঘ ৩০ মিনিট পরে মাইশাও ব্যর্থ হয়ে ড্রইং রুমে ফিরে আসে । মাইশার মুখের ভঙ্গীমা টাই বলে দিচ্ছে তনু রাজি হয় নি । 
এখন আর একটাই উপায় আর তা হচ্ছে তনুর মা । তাওহীদ ওনার সাথেও কথা বলতে চায় ।

.
তাওহীদ সুরিয়া বেগমের রুমের দরজার সামনে ,

.

– আসতে পারি ? 
– কে , ওহ তুমি , আসো
– আসসালামু আলাইকুম কেমন আছেন ? 
– ওয়ালাইকুম আসসালাম , আর কেমন থাকবো , ডায়াবেটিস হয়ে পড়ে আছি
– ওষুধ খাচ্ছেন তো 
– হ্যাঁ , ছেলে বউ মেয়েরা খাওয়ায় 
– ওহ 
– কিছু বলবা ? 
– জ্বি 
– বলো
– আপনি তো মা , সব তো বুঝেন । তনুশাকে যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন 
– বাবারে আমি অসহায় , আমি এই জীবনে কম কষ্ট করি নাই , আমার মতো আমার মেয়েও অনেক কষ্ট করছে । তবে আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করছে । কত আশা করে তোমার সংসারে গেল , ভাবছিলাম তুমি আমার মেয়েটাকে বুঝবে কিন্তু কি করলা তোমরা সবাই মিলে , আমার মেয়েটাকে রাতের অন্ধকারে বের করে দিলা
– আন্টি সেইদিন অনেক বড় পাপ করে ফেলছিলাম 
– তোমার করা পাপের ফল আমার মেয়েটা আজও বয়ে বেরাচ্ছে 
– রুমেল রুবেলের মতো আমিও আপনার আরেক ছেলে আন্টি , দয়া করে তনুশাকে একটু বুঝান 
– আমি যদি জোড় করি আমার মন রাখতে আমার মেয়ে ঠিকই এক কাপড়ে তোমার সাথে চলে যাবে কিন্তু কোনদিন ও তোমাকে স্বামী হিসেবে মানতে পারবে না তুমি ওর কাছে ওর সন্তানের বাবা হয়েই থাকবে 
– তাহলে আপনারা কি চান বলেন তো ? 
আমি আমার মেয়েটাকে ছাড়া চলে যাই
– নাহ তো আমরা এইসব কিছুই চাই না । আমি শুধু তোমাকে বললাম , তনু ইসলামের শরীয়ত মোতাবেক এখনও তোমার বউ । এখন তুমি নিজেই চেষ্টা করো তোমার বউয়ের মান কি করে ভাঙাবে 
– ধন্যবাদ 
– তাওহীদ শুনো
– জ্বি বলেন 
– ৫ বছরের চাপা অভিমান , সময় লেগে যাবে অনেক , অল্পতে ধৈর্য হারিও না না হয় এইবার সত্যি সত্যিই ওকে হারিয়ে ফেলবে

.
সুরিয়া বেগমের কথায় মাথা নেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় তাওহীদ । নিজেকে আজ তার বড্ড বেশি একা মনে হচ্ছে । 
লং জার্নি করাতে এদিকে আফরোজও ক্লান্তু । আফনান আর তাহুরা তনুর রুমে খেলছে । আজ ৬ টা মানুষ কোন না কোন দিক থেকে দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে আছে ।

.
[{(৬ টা মানুষ ? কে কে ? তাহলে আরও কিছু রহস্য আছে । চলেন উন্মোচন করি )}]

.
তনু-তাওহীদ 
রুমেল-রাত্রি
মাইশা-সাকিল

.
দুন মাসের একটা সম্পর্ক । যা সহজেই চাপা পড়ে গেছিল তার ক্ষতস্থানটায় আজকে আবার ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে ।

.
রুমেল ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে । রাত্রি রান্না ঘরে , তনয়ার কাছে আস্ক করে মাইশা এই সুযোগে ছাদে যায় । ছাদে গিয়ে এক কোণায় নজর পড়ে মাইশার । রুমেল দাঁড়িয়ে আছে এক কোণায় । হাতে সিগারেট । এদিক সেদিক তাকিয়ে মাইশা পায়ের কদম বাড়ায় রুমেলের দিকে । 
রুমেলের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় মাইশা । রুমেলের কাধে হাত রাখে মাইশা

.

– তুমি ? 
– হ্যাঁ আমি 
– কেউ দেখলে খারাপ ভাববে 
– আমি কিছু বলতে এসেছি
– পরে শুনবো 
– নাহ , এখুনি শুনতে হবে 
– জেদ করো না মাইশা
– আমার অপরাধ টা কি ছিল জানতে পারি কি 
– অপরাধ আমার ছিল , অপরাধ আমার বোনের ছিল , তাই সরে এসছি
– ভুল , তার আগের সরেছো , হয়তো তখন আপনার জীবনে রাত্রি ছিল 
– অহেতুক কথা বলো না , স্বামী সংসার নিয়ে ভালো থাকো
– বিয়ে যখন করেছি , ভালো তো আছিই 
– তাহলে ভালো থাকো 
– আমি এখনও জানলাম না কিন্তু আমার অপরাধটা কি 
– রাত্রি দেখলে প্রবলেম হবে মাইশা যাও এখান থেকে 
– শুধু কি ভাইয়া আর ভাবীর প্রবলেমের জন্য সেদিন রাতের পর আমার সাথে সব শেষ করে দিয়েছিলেন 
– আমি জবাবদিহি করতে বাধ্য নই 
– বাকি আসল কারন টা রাত্রি 
– বার বার বলছি যাও এখান থেকে 
– একদিনের জন্যেও কি ভালোবাসেন নি ? 
– কোন টা জানতে চাও ? 
– আমি জানি রুমেল কখনও মিথ্যা বলে না 
– সত্যিটা হচ্ছে ভালোবেসেছিলাম , মিথ্যাটা হলো আমি এখন আর তোমাকে ভালোবাসি না 
– রাত্রি অনেক ভালো , তাই না ? 
– শুধু ভালো না , ওর মতো মেয়েই হয় না আমি তনু আর রাত্রির মাঝে অনেক মিল পাই
– ওহ , আর আমি
– তুমিও ভালো , যেই মেয়েটা সবার চোখের আড়ালে কয়েকদিনের পরিচয়ে আমায় ভালোবেসেছে সে আর যাই হোক খারাপ নিশ্চয়ই হবে না , এই জন্যই সরে এসেছি । আজ একসাথে থাকলে সিচুয়েশনটা আরও খারাপ হতো 
– আপনি অনেক পাষান রুমেল 
– পরিস্থিতি করে দিয়েছে
– হ্যাঁ , অবশ্য পরিস্থিতিই সব কিছু পরিবর্তন করে দেয় 
– তুমি ভালো আছো , নিজের জীবনে মুভ-অন করেছো এটাই অনেক , আমি অনেক খুশি 
– আমিও খুশি আপনার ভালো থাকা দেখে
– হ্যাঁ ভালোই আছি এক রকম , জীবনের সাথে সংগ্রাম করে যাচ্ছি আরকি
– সাথে তো এমন একজন আছে যে সব দিক থেকে আপনাকে রক্ষা করে নিবে 
– হ্যাঁ , আমার রাত্রি সব পারে
– হ্যাঁ দেখেই বুঝা যায় 
– হুম 
– জীবন বড়ই অদ্ভুত তাই না 
– হয়তো 
– আচ্ছা আপনি ভাবীকে একটু বুঝাবেন 
– সত্যি বলতে আমি নিজেও চাই না ও আর ফিরে যাক , তাই নিজ থেকে কিছুই বলতে চাইনা 
– কেন
– উত্তর টা বললে হয়তো মনে কষ্ট পাবে , যাই হোক তোমার স্বামীর কথা বলো 
– সাকিল অনেক ভালো একজন মানুষ , অনেকটা ফেরেশতার মতো 
– যাক আলহামদুলিল্লাহ 
– কত সহজেই আমরা সব মাটি দিয়ে দিলাম , তাই না ? 
– সব সম্পর্কের হ্যাপি এন্ডিং হয় না মাইশা 
– হয়তো 
– যেমন আমাদের হলো না
– হ্যাঁ 
– আচ্ছা এইবার নিচে যাও , কেউ দেখে ফেলবে
– আসছি 
– এসো

.
মাইশা পিছনে ঘুরে গিয়ে আবার রুমেলের দিকে ফিরে তাকায় ।

.

– রুমেল 
– হু
– একটা রিকুয়েস্ট করি ? 
– বলো 
– রাখবেন তো 
– সাধ্যের মধ্যে থাকলে অবশ্যই রাখবো 
– সম্পর্ক টা দুইমাসের হলেও অনুভূতি গুলো ছিল গভীর , আমার এই কান জোড়া ৫ বছর যাবত মরে আছে , একবার সেই নামটা ধরে ডাকবেন ? 
– দুইমাসের সম্পর্কে আর কি এমন গভীরতা 
– প্লিজ 
– মাইশু ভালো থাকো

.
মাইশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে নি দৌড়ে এসে রুমেলকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে দেয় মাইশা । মাইশার এমন কান্ডতে রুমেল অনেক অবাক হয়ে যায় । 
এইভাবে এই অবস্থায় ওদের দুইজনকে দেখে ফেললে অনেক প্রবলেম হয়ে যাবে ।

.
– মাইশু , কি করছো কি 
– আমি পারছি না 
– নিজেকে সামলাতে শেখো , এমন করো না , প্লিজ 
– আমি সত্যিই পারছি না
– আস্তে কাদো , প্লিজ এখানে সিনক্রিয়েট করো না 
-……………….
– আমার মাইশু তো অনেক স্ট্রং , তাই না 
– হ্যাঁ 
– কেদো না , দোয়া করি স্বামী নিয়ে ভালো থাকো
– আসি 
– যাও , আর শুনো চোখ গুলোকে ভালোভাবে মুছো
– আচ্ছা

.
মাইশার পায়ের আওয়াজ পেয়ে আরেক জোড়া পা দৌড়ে সেখানকার সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায় । আরও এক জোড়া পা সেই মুহুর্তে এই ছাদে অবস্থা করছিল , ছাদের দরজার পিছনে ছিল সে । লুকিয়ে লুকিয়ে সেও সব দেখে নেই । 
চোখের পানি মুছতে মুছতে রাত্রি রান্নাঘরে ঢুকে যায় । হ্যাঁ দৌড়ে নিচে নেমে আসা মেয়েটা রাত্রিই ছিল । মাইশার পিছন পিছন সেও ছাদে যায় । তার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল । তাই সে সত্যিটা জানতেই মাইশার পিছনে গিয়েছিল । আর সত্যিটা শুধু শুনেই নি দেখেছেও সরাসরি ।

.
অন্যদিকে আরেকজন এই দুইবছর ভ্রমের মধ্যে ছিল । আজ তার কাছে সব পরিষ্কার । এইবার তার কাছে সব ক্লিয়ার । বিয়ের প্রথম প্রথম মাইশা কেন তার কাছে আসতো না । তার কারন আজ তার সামনে । তার মানে সেই আরেকজন মাইশার স্বামী সাকিল ছিল । সব ধোঁয়াশার সমাপ্তি ঘটে গেল আজ ।

.

রাত্রির নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে । অন্যদিকে সাকিল কি বলবে , কি ভাববে , কিছুই বুঝতেছে না । সব কেমন যেন গুলিয়ে যায় তার , কি করতে এখানে আসা আর কি হয়ে গেল । এ যেন কেচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা ।

.
রাত ১১ টা সবাইকে তাদের শোয়ার ব্যবস্থা করে দেয় রাত্রি আর তনয়া । বাসাটা বড় হওয়ায় প্রবলেম হয় নি । রুমেল আর রাত্রির রুমে আফরোজ আর ওয়াসিমের শোয়ার ব্যবস্থা করা হয় । আজ রাত টা ওরা ছাদের চিলেকোঠার ঘরটায় ম্যানেজ করে নেবে । তাহুরার জোড়াজুড়ি তে তাওহীদ আজকের রাত টা তনুর রুমে থাকবে । রুবেল তার বন্ধুর বাসায় চলে গেছে । আর তনয়া তার মায়ের সাথে শেয়ার করে নিয়েছে । 
চিলেকোঠার ঘরটায় এসে কেমন যেন থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয় । না বলে রাত্রি তো না বলে রুমেল । নিচে কোণার রুমটার পরিবেশ একদম শীতল । মাইশা এক পাশে তো সাকিল একপাশে । তনুর ঘরটার অবস্থাও অনেকটা এক রকম । চুপচাপ । তাহুরার বক বক শুনে যাচ্ছে তাওহীদ আর তনু । রাত গভীরের অপেক্ষা – রুমেল রাত্রির কাছে আসার অপেক্ষা , সাকিলের অশান্ত মনে শান্তি আসার অপেক্ষা , তাওহীদ তনুকে নিজের করে পাওয়ার অপেক্ষা । 
অপেক্ষা 
অপেক্ষা 
অপেক্ষা 
তিন জোড়া কপত-কপতির আজ অপেক্ষার পালা ।

.
আজ রাত্রি চুপচাপ । অন্যান্য দিন শুয়ে শুয়ে রুমেলের সাথে গল্প করে । কিন্তু আজ অনেক চুপচাপ সে । রুমেল সন্ধ্যার ঘটনাটা নিয়ে বড়ই চিন্তিত । 
সাহস করে রাত্রিকে ডেকেই বসে রুমেল ,

.
– রাত্রি 
-…………..
– রাত্রি ঘুমিয়ে গেছ নাকি
-……………
– রাত্রি 
-…………….
– জানো তো রাত্রি মানুষ ঠিকই বলে , ঘুমের মানুষকে জাগানো যায় কিন্তু যে ঘুমের ভান ধরে তাকে জাগানোর সাধ্য কারো নেই 
– কিছু বলবে
– এতক্ষন শাকলাম সাড়া দিলা না যে
– মাথা ধরে আছে , তাই 
– মিথ্যাটাও তো ঠিক মতো বলতে পারো না , তবুও ব্যর্থ চেষ্টা করছো 
– কিছু বলার থাকলে বলো 
– রাগ করেছো কোন কারনে ? 
– নাহ , সেই সন্ধ্যা থেকেই দেখছি আমার সাথে ভাড় ভাড় , কি ব্যাপার ? 
– কিছু না রুমেল , ঘুমাও 
– বলো না প্লিজ , আর এইদিকে ঘুরো 
– ঘুমাও প্লিজ 
– রাত্রি এইদিকে ঘুরতে বলছি

.
রুমেলের দিকে মুখ করে ,

.
– তুমি কাঁদছিলে রাত্রি ? 
– নাহ , চোখ ব্যাথা তাই পানি পড়তেছে
– মিথ্যা কেন বলতেছো , তোমার চোখে-মুখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে 
-……………….. 
– কি দেখছো এইভাবে , বলো না কি হয়েছে 
– একটু ছাদে বের হবে ? 
– ঘড়িতে কয়টা বেজেছে দেখেছো
– চলো না 
– ১ টা ২৮ বাজে রাত্রি , এত রাতে ছাদে বের হওয়াটা ঠিক হবে না
– চলো না 
– আচ্ছা চলো

.
ছাদের কোণায় রুমেল-রাত্রি পাশাপাশি দাঁড়ানো । রাত্রি আকাশ দেখছে , রুমেল রাত্রিকে । রুমেল ডান হাতটা রাত্রির কাধে রেখে বাম হাত টা দিয়ে রাত্রির হাতটা ধরে ।

.
– কি হয়েছে রাত্রি ? 
– মাইশা তো অনেক ভালো মেয়ে দেখে বুঝলাম , ও-কে ছাড়লে কেন ? 
– রাত্রি……………. 
– সরি রুমেল সব শুনে ফেলেছি আমি 
– রাত্রি আমি তোমাকে……. 
– আগে বললেও তো পারতে আজ তিনটা বছর তোমার সাথে সংসার করি , আমি কি এই কথাটা শুনার অধিকার রাখি নি রুমেল ? 
– রাত্রি তুমি যা ভাবছো তা নয় 
– তাহলে কি রুমেল , তুমিই বলো , তাহলে কি ? 
– রাত্রি কি হচ্ছে কি , এইভাবে কাঁদছো কেন ? 
– আমি যা দেখলাম তারপরও কি চুপ থাকা যায় রুমেল ? 
– তুমি যদি সব দেখে থাকো , তাহলে তুমি নিশ্চয়ই সব শুনেছো , তাই নয় কি ? 
– হ্যাঁ সব কিছুই শুনেছি , কিন্তু কষ্ট টা আমার সেখানেই যে আমাকে আগে বললে কি হতো ? 
– মাইশা আমার অতীত রাত্রি , আর রিলেশনটা তখনও স্ট্যাবল হয় নি তার আগেই সব শেষ , হ্যাঁ , তবে আমি পারতাম ও-কে বিয়ে করতে কিন্তু তাতে প্রবলেম হতো , সবার ভালোর জন্য কিছু কিছু সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়াই ভালো রাত্রি 
– জানো রুমেল খুব লেগেছে আমার , খুব লেগেছে এখানে যখন মাইশা তোমাকে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে 
– রাত্রি একটা কথা বলি তোমাকে শুনো , মাইশা বা তোমাকে আমি কখনোই কমপেয়ার করবো না , কেন বলো তো ? কারন , মাইশা মাইশার জায়গায় আর তুমি তোমার জায়গায় । দু’জনকে আমি দুইভাবে দেখি । সে আমার অতীত , হয়তো অনেক বছর পর দেখে সামলাতে পারে নি নিজেকে , মিথ্যা বলবো না আমিও নিজেকে সামলাতে পারি নি । তাই এখানে চলে এসেছিলাম । আর হ্যাঁ মাইশার প্রতি মনের কোথাও একটা ভালোবাসা আজীবন থেকে যাবে আমার । আর তুমি আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যত পথ চলার সঙ্গী । তোমার অস্তিত্ব আমার সবটা জুড়ে । তোমার অস্তিত্ব জানান দেয় আমাকে যে রুমেল তুই আজ এখানে শুধু এই মেয়েটার জন্যে । এ ছাড়া তোর গতি নেই , তোর গতিবিধি শূন্য । বুঝলে ? 
– মাইশাকে অনেক ভালোবাসতে , তাই না ? 
– অবুঝের মতো কথা বলো না , ওর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বসে থাকলে তোমার সাথে ৩ টা বছর কাটাতে পারতাম না আমি , এর থেকে বাড়তি কথা বলতে চাই না আমি , তুমি একজন শিক্ষিতা নারী । তোমার সব বুঝা উচিত বলে আমি মনে করি । আর যা দেখেছো যা শুনেছো এবং যা জেনেছো তাতে আমাদের এই সম্পর্কটা আরও স্ট্রং হয়ে গেল 
-………………. 
– রাত্রি i love you , & i always love you
-………………. 
– রাত্রি love you , love you , love you 
I still love you সোনা 
– love you too রুমেল

.
এই বলে রুমেল রাত্রিকে নিজের কাছে টেনে নেয় । কপালে চুমু দিয়ে রাত্রিকে নিজের বুকে জড়িয়ে নেয় রুমেল । আর রাত্রি পরম আদরে রুমেলের বুকে মাথা গুজে রাখে ।

.
– রুমেল………… 
– হ্যাঁ 
– একটা কথা বলি ? 
– বলো 
– আসলে ,,, আসলে 
– কি আসলে , বলো , কি হয়েছে আবার 
– নাহ মানে 
– কি আশ্চর্য , বলবা তো , তাই না ? 
– রু,,,রু,,,,মেল , আসলে আমি 
– কি তুমি , তুমি কি বলো 
– রুমেল i am pregnant

.
কথাটা শুনে ৪৪০ বোল্ডের শক খায় রুমেল । রাত্রির মুখটা বুক থেকে উঠিয়ে নিজের সামনে তুলে ধরে ।

.
– স,,,স,,,স,,,,সত্যিইইইইইইইই
– হুম 
– কিভাবে কি ? 
– লাষ্ট মান্থ এ মিস হয়ে গেছে , ভেবেছিলাম এই মান্থে ক্লিয়ার হয়ে যাবে , কিন্তু এই মান্থের ডেটও ওভার , তাই আজকে সকালে চেক করছিলাম 
– তারপর,,,,,,,, 
– রেজাল্ট পজিটিভ 
– ওহ জানননননন , আর তুমি এখন আমায় এই কথা বললা 
– ভেবেছিলাম রাতে বলবো , কিন্তু……. 
– কোন কিন্তু না রাত্রি , তোমার রুমেল তোমারই আছে । আর ও ওর লাফে মুভ-অন করে ফেলেছে সো আর ভয় নাই , ওকে জান ?
– হুম 
– তুমি জানো না তুমি আমাকে আমার জীবনের সেরা উপহারটা দিলা আজকে
– আমায় ভালোবাসবে তো ? 
– আবার জিগায়,,,,,,,,,,,,, আমার বাবুর আম্মুকে আমি না ভালোবেসে থাকতেই পারবো না 
– ভালোবাসি রুমেল , সত্যিই তোমাকে অনেক ভালোবাসি আমি 
– আমিও রাত্রি , আর এই সন্তান হচ্ছে আমাদের ভালোবাসার প্রদীপ 
– রুমেল
– হ্যাঁ বলো
– আমার না আজ তোমার আদর খেতে খুব ইচ্ছে করছে গো
– তাই ? 
– হুম
– এতদিন যে আমি আসতে চাইতাম নিজে তো দূরে দূরে থাকতেন , আর এখন ? 
– খোটা দিচ্ছো তো , আচ্ছা যাও কর‍তে হবে না , ঘুমাবো বাই

.
এই বলে রাত্রি সামনে অগ্রসর হয় । আর ওমনি রুমেল রাত্রির হাত ধরে টেনে নিজের বুকের সাথে লাগায় , তারপর কোলে তুলে রুমে যায় । খাটে শুইয়ে দেয় রাত্রিকে , দরজা লাগিয়ে লাইট টা অফ করে দেয় রুমেল । রাত্রির কাছে গিয়ে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দেয় রাত্রির কপাল গাল , ঠোঁট । 
ভালোবাসার শক্তি দিয়ে জয় করে নেয় নিজেদের ভালোবাসা । সন্দেহে না থেকে নিজেরাই সমাধান করে নেয় তাদের প্রবলেম গুলো । রুমেল-রাত্রির ভালোবাসার অস্তিত্বটাও জানান দেয় (আমার মা-বাবা আসলেই অনেক খুশি , কই তোমরা ? কি করো ? ৮ মাস পরে আমিও আসবো তোমাদের কোলে)

.

নিচের একটা রুমে সাকিল আর মাইশা শুয়ে আছে । রুমেল কে দেখার পর মাইশার অস্থিরতাটা অনেকটা বেড়ে গেছে । রাতে ঠিকমত খেতেও পারে নি মেয়েটা । ওদিকে সাকিল উঠে গেছে । বারান্দায় গিয়ে স্মোক করছে সে । আজ না চাওয়া সত্ত্বেও কিছু অপ্রীতিকর সত্যি তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে । যা কখনও না আসলেই পারতো । অন্তত এই চাপা যন্ত্রনা ভোগ করতে হতো না সাকিলকে । মাইশার নিজের অস্থিরতাটা এখনও কাটে নি । তার মনেও প্রশ্ন । সে কি সাকিলকে ঠকাচ্ছে ? নাকি সে এই বিয়েটা মন দিতে পারছে না ? সাকিলের কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে সাইডে তাকিয়ে দেখে পাশের জায়গাটা খালি । তার মানে সাকিল নেই । শান্ত দৃষ্টিতে বারান্দায় তাকায় মাইশা । নাইট-ড্রেসের বেল্টটা বাধতে বাধতে বারান্দায় যায় মাইশা । সাকিল কখনও এইভাবে স্মোক করে না । হয়তো আজ সত্যিটা দেখে ঠিক থাকতে পারছে না ।

.
– সাকিল
-………… 
– সাকিল 
– হ,,হ্যাঁ 
– কি হলো , এত রাতে স্মোক করছো ? 
– এমনি 
– এটা অন্যের বাড়ি সাকিল 
– তো , আমি এখানে বাজে কাজ করছি নাকি 
– কি ব্যাপার সাকিল এইভাবে কথা বলছো যে 
– যাও ঘুমাও গিয়ে 
– কি হয়েছে সাকিল
– কিছু না , আমি কাল সকালেই চলে যাবো 
– মানে 
– খুব সোজা , ঢাকা ব্যাক করবো আমি
– আর আমি ? 
– তুমি যা ভালো বুঝবে করবে , যেতে চাইলে যাবে আর না যেতে চাইলে প্রবলেম নাই , রুমেল দিয়ে আসবে 
– মানে
– কিছু না
– কোনখানের কথা কোথায় নিয়ে পয়েন্ট অনুযায়ী মেরে দিয়েছো সাকিল । এখানে রুমেল ভাই আসলো কেন
– কেন , আসা টা কি খুব ভুল হলো নাকি ? 
– সাকিল , কি সব বলতেছো 
– ওহ , সরি সরি মাইশু , আই এম এক্সট্রিমলি সরি মাইশু

.
মাইশু নাম টা শুনেই বুকের মাঝে কামড় দিয়ে ওঠে মাইশার । এই নামে তো রুমেল তাকে ডাকতো । আর আজকে লাষ্ট ডাকছে সন্ধ্যায় ছাদে । তার মানে কি সাকিল সবটা জেনে গেছে ।

.
– সাকিল , যা বলার আছে ক্লিয়ারলি বলো
– কিছু না মাইশা 
– দাড়াও সাকিল , আধা কথা বলো না , বললে পুরোটা বলে যাও 
– কিছুই বলার নাই আমার , শুধু বলবো এই দুইটা বছর আমি একটা ধোঁয়াশায় ছিলাম , এখন মনে হচ্ছে এই দুইবছরে যতবার আমি তোমার কাছে গেছি মনে হচ্ছে আমি তোমাকে রেপ করেছি
– সাকিললললল………….
– আস্তে মাইশা 
– তুমি এই কথাটা বলতে পারলা , এই দুইবছরে যতবার তুমি কাছে এসেছো , তুমি কি আমায় জোড় করেছিলে ? নাকি আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করেছিলে ? তাহলে রেপ বললে কেন সাকিল
– রুমেলের কাছে থাকতে তাই ভালো হতো 
– রুমেল আমার অতীত সাকিল
– তাই বলে আজ অতীতটা দেখে নিজেকে আটকাতে পারো নি তাই না 
– সাকিল……… 
– দৌড়ে তো ওর বুকে গিয়েই পড়লে তাই না 
– সাকিল…………… 
– আমাকে তো এইভাবে কখনও ধরো নি
– আমি ধরি নি তোমায় সাকিল 
– নাহ
– সাকিল উপরে আল্লাহ আছে
– সবার উপরেই আছে মাইশা , কি না করলাম আর কি পেলাম তার বদলে
– ভালোবাসি তোমাকে সাকিল 
– তুমি ভালোবাসো রুমেলকে
– বাসতাম , সাকিল , ভালো বাসতাম 
– এখনও বাসো
– নাহ সাকিল , উনি ওনার লাইফে মুভ-অন করেছে , আর আমি আমার লাইফে 
– তারপরও রেষ টা রয়ে গেছে 
– উফফফফফ সাকিল কেন বুঝতেছো না এখানে এসেছি ভাবীকে ফিরিয়ে নিতে
– কিন্তু ফিরে পেলে অন্য একজনকে 
– নাহ সাকিল আমি তোমাকেই ভালোবাসি
– কথায় কথা বাড়ে মাইশা , যাও ঘুমিয়ে পড়ো 
– নাহ , তুমি বিশ্বাস করো আমি তোমাকেই ভালোবাসি , হ্যাঁ মানছি রুমেল ভাইকে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি নি ঠিক কিন্তু আমি এতটাও খারাপ না 
– কথা বলো না , যাও ঘুমাও 
– সাকিল , দাড়াও কথা শুনো আমার

.
সাকিল মাইশার কথা উপেক্ষা করে রুমে চলে আসে । যা মাইশার একদম পছন্দ হয় নি । রাগে দুঃখে মাইশাও রুমে দৌড়ে আসে । এসে দেখে সাকিল শোয়ার ব্যবস্থা করতেছে তবে বিছানায় নয় সোফায় । এটা দেখে মাইশার মাথায় রক্ত চেপে যায় । দৌড়ে গিয়ে সাকিলের হাতটা চেপে ধরে ।

.
– কি সমস্যা তোমার সাকিল
– কোন সমস্যা নেই 
– তাহলে এখানে কেন 
– তুমি খাটে শোও আমি এখানে শুয়ে যাবো 
– কেন ? 
– এমনি মাথা ধরছে
– সাকিল নাটক করো না 
– shut up , just shut up , কিসের নাটক হ্যাঁ কিসের নাটক , যাও এখান থেকে
– আমি যাবো না , তুমি খাটে শুবে , চলো
– আমি যাবো না
– তুমি যাবে
– না 
– হ্যাঁ

.
সাকিলের মেজাজ অনেক খারাপ হয়ে যায় । সে মাইশাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় মধ্যে ফেলে দিয়ে সোফায় চলে আসে । মাইশার চোখ দিয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে । তবুও সে হাল ছাড়ে নি । কারণ সে জানে সাকিল এমনিতে চুপচাপ থাকলেও তার অনেক জেদ । আর একবার জেদ উঠলে সেই জেদ আর সহজে কমে না । তাই যা করার সে নিজেই করবে । চোখের পানি মুছে , সাকিলের কাছে যায় । সাকিল এইবার অনেক রেগে যায় । মাইশাকে দেখে সে আবার বলে উঠে ,

.
– কি হলো কি আবার কেন আসছো , যাও ঘুমাও
-………………… 
– যাও , সরো 
-………………….
– যাও , স………………..

.
বাকিটা শেষ করতে দেয়নি সাকিলকে মাইশা । ওমনি চট করে সাকিলের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দেয় মাইশা । 
সাকিল সেই মুহুর্তে পুরো অবাক হয়ে যায় । নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ সাকিল । মাইশা তার কোমল শরীর দিয়ে সাকিলকে ধরে রেখেছে । এক সময় সাকিলও শান্ত হয়ে যায় । পুরো শরীরের ভারটা ছেড়ে দেয় সোফার উপরে মাইশা সাকিলের হাতটা ছেড়ে দিয়ে সাকিলের গালে হাত দেয় । সাকিলের হাতটা মাইশার কোমড়ে চলে যায় । প্রায় ১০ মিনিট পর মাইশা সাকিলের ঠোঁট ছাড়ে ।

.
– ভালোবাসি তো তোমাকে , অনেক ভালোবাসি 
– আর রুমেল
– সে আমার অতীত , আর তুমি বর্তমান । প্লিজ এমন করো না ভালোবাসার তোমাকে
– যাও ঘুমাও
– তুমিও চলো 
– আমি এখানেই ঠিক আছি
– কিন্তু আমি ওখানে ঠিক নেই
– কেন ? 
– স্বামী এখানে আর আমি ওখানে , ভালো লাগবে না আমার 
– তাই
– হ্যাঁ , চলো

.
মাইশা সাকিলকে নিয়ে খাটে যায় । দুইজন শুয়ে পড়ে । লাইট অফ করে দেয় । মাইশা সাকিলের একদম কাছে চলে আসে ।

.
– ভালোবাসো একটু
– এখানে
– হ্যাঁ 
– নাহ বাসায় যাই তারপর 
– নাহ , এখনি
– আহহহ মাইশা 
– হুসসসসসস

.
অতঃপর দুজনে মিলে ডুব দেয় ভালোবাসার অথৈ সাগরে । মাইশা তার অতীতকে ভুলে বর্তমানকে আপন করে নিয়েছে । এতে একদিকে যেমন না পাওয়ার বেদনা অন্যদিকে পরিপূর্ণতা । ভালোবাসা যে সব সময় জিতে যাবে তা কিন্তু নয় । কিছু ভালোবাসা অপরিপূর্ণতায় আড়াল থেকে যায় । যার চাক্ষুস প্রমান রুমেল আর মাইশা । অপূর্ণর মাঝেও তারা পূর্ণতা পেয়েছে ।

.

দুটো ভালোবাসা এখন ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেরাচ্ছে । কিন্তু আসল মানুষ দুজন কষ্টে ভেসে যাচ্ছে । তাওহীদ বার বার তনুর সাথে কথা বলতে চাচ্ছে । কিন্তু পারছে না । মেয়েকে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তনু । তনুর দিকে এক রকম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাওহীদ । মা মেয়ে উভয়কেই পরীর মতো লাগছে । দুজনেই দুজনের মতো করে অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারী । নাহ এভাবে আর না , তার তনুকে চাই , তার মেয়ে চাই তার । সে তার বউ-মেয়ে উভয়কেই চায় । ভালোবেসে ফেলেছে আবার তনুকে তেমনি ঘৃণা লাগছে তার নিজের প্রতি । তনু তার জায়গায় ঠিক , সেই মুহুর্তে তাওহোদের তনুর মায়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে । সন্ধ্যায় তিনি বলেছিলেন ,

.

“”” – তাওহীদ শুনো
– জ্বি বলেন 
– ৫ বছরের চাপা অভিমান , সময় লেগে যাবে অনেক , অল্পতে ধৈর্য হারিও না , না হয় এইবার সত্যি সত্যিই ওকে হারিয়ে ফেলবে “””

.

এইবার তনু যত যাই কিছু করুক না কেন তাওহীদ হাল ছাড়বে না । তার অর্ধাঙ্গিনীকে তার চাই । ভালোবাসার ফুলে গাথা মালা দিয়ে আবার বরণ করে সে তার তনুশাকে । কারন তাওহীদে জীবনে তনুশার প্রয়োজন অনেকখানি

.
আস্তে করে উঠে গিয়ে তনুর সাইডে গিয়ে বসে তাওহীদ । তনুর শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তাওহীদের মুখের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে । তাওহীদের হাসির পিছনে চাপা কষ্টের রেখাটাও স্পষ্ট বুঝা যায় । যেমন অন্যায়টা সে ৫ বছর আগে করেছে আজ সে তার মাসুল গুনছে ।

.
জীবনটক আসলেই সিনেমেটিক । এখানে ম্যাটিনি সো থেকে শুরু করে ব্লকব্লাস্টার সোও দেখা যায় । শুধু চরিত্র গুলো কাল্পনিক না হয়ে বাস্তব হয়ে রয়ে যায় । 
তাওহীদের বড় বেশি ইচ্ছে করছে এখুনি তনুকে ডেকে তুলতে ঘুম থেকে । যেই ভাবা সেই কাজ । তাওহীদ তনুকে ডেকে তুললো

.
– তনুশা 
-…………..
– এই তনুশা 
-…………..
– তনুশা , প্লিজ উঠো 
– কিহ ব্যাপার , কিছু বলবেন ? 
– হ্যাঁ 
– বলুন 
– এখানে না , ছাদে চলো
– আপনার মাথা ঠিক আছে রাত ৪ টা বাজে আমি এখন ছাদে যাবো , যান ঘুমান 
– তনুশা উঠো
-……………. 
– তনুশা উঠো প্লিজ , ওকে ছাদে যেতে হবে না , বারান্দায় চলো 
– আপনি যান ঘুমান
– তুমি চলো তনুশা , না হয় কিন্তু
– কিন্তু কি , রাত ৪ টা বাজে কি শুরু করেছেন 
– চলো আগে তুমি 
– আচ্ছা চলুন

– তনুশা 
-…………..
– এই তনুশা 
-…………..
– তনুশা , প্লিজ উঠো 
– কিহ ব্যাপার , কিছু বলবেন ? 
– হ্যাঁ 
– বলুন 
– এখানে না , ছাদে চলো
– আপনার মাথা ঠিক আছে রাত ৪ টা বাজে আমি এখন ছাদে যাবো , যান ঘুমান 
– তনুশা উঠো
-……………. 
– তনুশা উঠো প্লিজ , ওকে ছাদে যেতে হবে না , বারান্দায় চলো 
– আপনি যান ঘুমান
– তুমি চলো তনুশা , না হয় কিন্তু
– কিন্তু কি , রাত ৪ টা বাজে কি শুরু করেছেন 
– চলো আগে তুমি 
– আচ্ছা চলুন

.
তাওহীদ তনুকে বারান্দায় নিয়ে যায় । বারান্দায় দুইটা বেতের চেয়ার ছিল । সেখানে তাওহীদ তনুকে বসতে বলে । এই মুহুর্তে তাওহীদকে অনেকটা সাইকো লাগছে তনুর । সাইকো নয় তো কি ? রাত ৪ টা বেজে ১৫ মিনিট আর সে এখন বারান্দায় বসছে মিটিং করতে । আজব পাবলিক ।

.
– আপনার সমস্যা কি , বলবেন একটু 
– কোন সমস্যা নাই তনুশা
– তাহলে এমন অটিস্টিকের মতো করছেন কেন ? 
– মানে ? কি বললা তুমি , আমি অটিস্টিক ? 
– তাই মনে হচ্ছে আমার 
– তোমার তা মনে হওয়ার কারণ ? 
– এখন রাত প্রায় ৪ টা ১৫ । আর আপনি আমায় ঘুম থেকে তুলে এখানে এনে বসিয়েছেন 
– তনুশায়ায়ায়া……… 
– কি তনুশা তনুশা করেন হ্যাঁ , কিসের তনুশা , তনুশা মরে গেছে৷। ৫ বছর আগে আপনি খুন করেছেন তনুশাকে 
– কি যা তা বলতেছো 
– যা তা নয় , ঠিক বললাম । এখন আসছেন আদিক্ষেতা দেখাতে । খবরদার নেক্সট টাইম এমন কিছু করবেন না । কাল মেয়েকে নিয়ে চলে যাবেন এখান থেকে 
– তুমি আমার সাথে রাগ করে মেয়েটাকে মা ছাড়া করবা । ও মাম্মাম বলতে অজ্ঞান , এই একটা দিন আমি ও-কে কিভাবে সামলেছি তা আমিই জানি 
– ঠিক হয়ে যাবে পরে । নিয়ে চলে যাবেন আপনাকে আপনার মেয়ে ছাড়া থাকতে হবে না । বুঝেছেন ? 
– কি হয়েছে তনুশা , এমন করছো কেন 
– কি হয়েছে ? কিছুই হয় নি । এমন করছি কেন ? কিছুই করি নি
– তনুশা ফিরে চলো প্লিজ 
– সকাল বেলা মেয়েকে নিয়ে সোজা বেরিয়ে যাবেন । আর ভুলেই এই কথা বলবেন না 
– তনুশায়ায়া , কেন বুঝো না তোমায় আমার প্রয়োজন 
– আমার আপনাকে প্রয়োজন নেই 
– তনুশা 
– গুড নাইট

. এই বলে তনু উঠে চলে যায় । তাওহীদ সেখানেই চুপ করে বসে থাকে । শ্বাশুড়ির কথাটাই ঠিক । চাপা অভিমানটা বড্ড কষ্ট করে মনের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে । সহজে সে তার জায়গা দিবে না কাউকে । চেয়ারের মধ্যে মাথা দিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুম চলে আসছে তাওহীদের সে নিজেও জানে না ।

.

পরদিন সকালে ,

.
রাত্রি তনয়া তনু মিলে নাস্তা রেডি করছে । রাত্রিকে বেশ চনমনে লাগছে । সকাল সকাল গোসল , ভেজা চুলে এক কথায় দারুন লাগছে তাকে । তনয়া দেখে মজায় মজায় বলে উঠলো ,

.
– কি গো ভাবীজান , রাত কেমন কাটলো 
– রাত রাতের মতই কাটলো 
– আচ্ছা তাই নাকি 
– হুম 
– তা এই ভেজা চুলের রহস্য কি
– মানে কি
– সকাল সকাল গোসল কেন ? 
– আপুউউউ , দেখছো তোমার বোন কি সব বলে
– ছুটকি কি বলিস এইসব
– দিদি থাম তো আমি আর ছোট নেই৷, ওই কও রাতে কি কি করলা
– আপুউউউউউ , ওরে এইবার একটা বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো তো , তাহলে ও বুঝবে রাতে কি কি করে 
– থাম তো তোরা , বাসায় মেহমান , শুনলে কি বলবে ।

.
রান্না ঘরের দরজার সামনে মাইশা দাঁড়িয়ে ছিল । সব শুনে নিয়েছে সে । কষ্ট হলেও কষ্ট গুলো আড়াল করে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে ধরেছে সে

.
– তুমি অনেক ভালো থাকো রুমেল । সত্যি রাত্রি অনেক ভালো মেয়ে । অনেক সুখে রাখবে তোমাকে । ভেবে নিবো তোমার আর আমার পথের সমীকরণটা মিলার ছিল না তাই মিলে নাই । আর আমার সাকিলও আমায় যথেষ্ট ভালোবাসে । আল্লাহ আমাউ করে দিয়েন আমি বিপথে বেকে গিয়েছিলাম । আমি আমার বরকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারি না (মনে মনে)

.
রাত্রির চোখ যায় মাইশার দিকে । রান্নাঘরের বেসিনের উপরের আয়নাটায় ওকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা । ওর ও ভেজা চুল । দেখে মনে হচ্ছে সেও সকালে গোসল করেছে । তার মানে কি কাল রাতে তাদের মাঝেও । রাত্রির মনটা মুহুর্তে আরও খুশি হয়ে যায় । সেও চেয়েছে মাইশা খুশি থাকুক । ভালো থাকুক । না পাওয়ার যন্ত্রনা ভুলে গিয়ে পাওয়া সুখ গুলোকে মুঠো বন্দী করে ভেসে চলুক ভালোবাসার শেষ সীমানা অবদি । কালকের খারাপ লাগা গুলো আজ মায়ায় রূপ নিয়েছে রাত্রির । মাইশাকে দেখে নিজেই ডাক দেয় ,

.
– আরে মাইশা , ওইখানে কি করছো ? ভেতরে আসো

.
রাত্রির কথা শুনে ধ্যান ভাঙে মাইশার । হাসি মুখে সেও রান্নাঘরে যায় । মাইশাকে দেখে তনয়া আরও ফাইযলামি শুরু করে

.

– তোমারও সেম অবস্থা ? 
– মানে 
– এই ভাবী আমিও বিয়ে করবো প্লিজ ছেলে খুজো
– এএএএএএএএএ
– এএএ নয় হ্যাঁ , তাহলে আমিও প্রতিদিন সকালে গোসল করবো 
– আল্লাহ গো , এই মেয়ে বলে কি
– কেন মাইশা আপু , ভুল কিছু বললাম 
– এ তো দেখি বিয়ে পাগলী 
– ইসসসসস , এইভাবে বলো না । লজ্জা লাগে তো আমার
– আহারেএএএএ কি লজ্জা তার 
– মাইশা ওর কথায় কিছু মনে নিও না ও অলয়েজ এমন করে আমার সাথে
– নাহ রাত্রি ঠিক আছে , ব্যাপার নাহ
– এই ছুটকি তোমার ভাই কই গো
– ভাইয়া তো চা নিয়ে ছাদে গেল

.
তনয়ার কথা শুনে বুকে কামড় দেয় মাইশার । কারণ কিছুক্ষন আগেই সাকিলও চায়ের কাপ নিয়ে সকালের হাওয়া খেতে ছাদে গেছে । অজানা ভয়ে বুক শিহরিত হতে থাকে মাইশার । রুমে চলে আসে । বার বার মাথায় হাত দিয়ে শুধু এক টেনশন তার ,

.

– তাহলে তো ওরা দুজন একসাথে । হায় আল্লাহ এখন কি হবে । কাল রাতে তো সাকিল অনেক রেগেছিল । যদি এখন উলটাপালটা কিছু হয় । ছি ছি মুখ দেখাতে পারবো না এখানে

.
এইসব উলটাপালটা ভাবছে মাইশা । হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তার ।

.
অপরদিকে ,

.
ওয়াসিম আর আফরোজ রুমেই আছে । নিজেরা নিজেরা কথা বলছে ।

.
– শুনো না 
– হ্যাঁ বলো 
– তনুকে তো রাজি করাতে পারছি না 
– হুম
– কি করবো বলো তো ? 
– আমার কি মনে হয় জানো 
– কি 
– ওদের একা ছাড়া উচিত , দেখো আমরা বললে তো আর তনু মানবে না তাই না
– হ্যাঁ
– তার চেয়ে বরং ওদের দুজনকেই বুঝতে দাও ব্যাপার টা 
– তাও ঠিক বলেছো
– তবে যাওয়ার আগে একটু বুঝিয়ে যেও 
– আচ্ছা
– এখন শরীর কেমন তোমার
– ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ
– আচ্ছা , তুমি থাকো আমি একটু ছাদে যাই 
– আচ্ছা যাও

.

ছাদে ,

.
রুমেল দাঁড়িয়েছিল । সাকিলও কাছে গেছে রুমেলের । কথা বলে দুজনে ,

.
– আসসালামু আলাইকুম 
– ওয়ালাইকুম আসসালাম
– কি অবস্থা রুমেল সাহেব 
– এই তো ভাই চলে কোম রকম । আপনার ? 
– আছি ভাই ভালো 
– ওহ 
– তা এখন কিসে আছেন 
– ন্যাশনাল ব্যাংকে , জি এম পদে আছি
– ওহ তাই নাকি , অনেক ভালো পজিশন তাহলে 
– জ্বি ভাই আল্লাহর রহমতে আছি 
– ভাবিও কি জব করে 
– হ্যাঁ , একই ব্যাংকে 
– ওহ আচ্ছা

.
তারপর চায়ের কাপে দুজনেই চুমুক দেয় । সাকিল ভাবছে কালকের কথাটা কি এখন তুলবে ? কিন্তু যদি হিতে বিপরীত হয়ে যায় । আর যেখানে মাইশা তার অতীতকে ভুলে গেছে । সেখানে নাই বা হলো বাড়াবাড়ি । এইসব ভেবে সাকিল চুপ থেকে গেল ।

.

তনুর বাসায় থাকতে কেমন যেন লাগছে । রান্নাঘরে ওদের কথা গুলো তনুর বুকে ছুরির মতো গিয়ে বিধেছে । তারও তো এমন সুখী হওয়ার কথা ছিল । ভালোবাসা নিয়ে থাকার কথা ছিল । স্বামী সন্তান সংসার এইসব নিয়ে থাকার কথা ছিল । কিন্তু কি হয়ে গেল ? এমন টা না হলেও তো পারতো ? মেয়েটার জন্য অনেক মায়া লাগছে তনুর । কাল তো জেদের বশে বলে দিল মেয়েকে নিয়ে চলে যেতে , আসলেই কি থাকতে পারবে তনু তাহুরাকে ছাড়া । বাচ্চা মেয়েটা কেদে কেদে শেষ হয়ে যাবে ।

.

অন্যদিকে ,

তাওহীদের মন মেজাজও ভালো না । বাসা থেকে বের হয়ে গেছে সে । সেই রেষ্টুরেন্টে বসে আছে যেখানে মেয়ের সাথে দেখা হয়েছিল । আজ বড় অসহায় লাগছে নিজের কাছে তাকে । তনুশা কিছুতেই রাজি হচ্ছে না । আর একবার চেষ্টা করবে সে । তারপর যা করার করবে ।

.

দুপুরের দিকে তাওহীদ বাসায় আসে । রাস্তায় সব ভেবে নিয়েছে । কি কি বলবে তনুকে । এসে সোজা তনুর রুমে ঢুকে যায় তাওহীদ । তনু তখন কাপড় পরছিলো । 
বুকে কাপড় ছিল না । তাওহীদ সেই অবস্থায় তনুকে দেখে ফেলে । আর ওই অবস্থাতেই তনুকে তার দিকে ঘুরায় ।

.

– এ কি ধরনের অসভ্যতা 
– মানে 
– একজনের রুমে আসতে হলে নক করে আসতে হয় , জানেন না আপনি ? 
– একজন কেন হতে যাবে , বউয়ের ঘরে আসছি নকের কি দরকার 
– কিসের বউ , বের হোন রুম থেকে 
– তনুশা , এমন করতেছো কেন
– বের হোন এই ঘর থেকে
– আমি তোমার সাথে কথা বলতে আসছি
– আমি কিছুই শুনতে চাই না 
– তনুশায়ায়ায়ায়া
– একটা অসভ্য , ইতর , বড়লোক খারাপ মানুষ , নিজেকে কি মনে করেন , সব টাকায় পাওয়া যায় , হ্যাঁ । বলা নেই কওয়া নেই আমার ঘরে চলে এলেন । কেন এসেছেন হ্যাঁ কেন এসেছেন । জোড় করে আমায় রেপ করতে আসছেন যাতে আমি আপনার সাথে যেতে বাধ্য হই । 
– তনুশায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া

.

তনুর কথা শুনে তাওহীদের মাথায় আগুন ধরে যায় । কি বললো মেয়েটা এইসব । তাও আবার তাওহীদকে । এইবার তাওহীদেরও মেজাজ খারাপ হয়ে যায় । সেও চিৎকার চেচামেচি শুরু করে

.

– তোমার প্রবলেম কি তনুশায়ায়ায়া । এমন করতেছো কেন , আর এইসব কি বলতেছো তুমি , হ্যাঁ , আমি তোমাকে রেপ করতে আসছি ? 
– বলা তো যায় না 
– তনুশায়ায়ায়ায়ায়ায়া
– চিৎকার দিবেন না , যান বের হয়ে যান তো 
– হবো না , কি করবা 
– ওকে আমিই বের হয়ে যাই
– কোথাও যাবা না তুমি , এইখানেই থাকবা তুমি
– আমি আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই
– তুমি বাধ্য 
– না 
– হ্যাঁ

.
এইবার তাওহীদের মাথায় আরও আগুন চেপে যায় । এইবার হাতটা উঠেই যায় তনুর গাল বরাবর ।

.

– থামলেন কেন , মারেন মারেন , আরে মারেন না , মারেন 
– তনুশা স্টপ
– আরে মারেন আপনি 
– তনুশা স্টপ
– কেন স্টপ কেন , মারেন আপনি , এইসবই তো চাচ্ছেন আপনি , তাই না ? 
– তনুশায়ায়ায়ায়ায়া

.

সবাই ওদের চিৎকার চেচামেচি শুনে রুমের সামনে চলে আসে । অথচ ওদের ধ্যান ঝগড়াতে ।

.
কিন্তু কেউ বুঝে নাই পরবর্তীতে এই ঝগড়ার পরিমান এত খারাপ হবে । সামনে যে এত বড় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তার হলফ কেউ করে নি । এমনকি তাহুরা তনু তাওহীদ কেউই না ।

 থামলেন কেন , মারেন মারেন , আরে মারেন না , মারেন 
– তনুশা স্টপ
– আরে মারেন আপনি 
– তনুশা স্টপ
– কেন স্টপ কেন , মারেন আপনি , এইসবই তো চাচ্ছেন আপনি , তাই না ? 
– তনুশায়ায়ায়ায়ায়া 
– কি তনুশা , হ্যাঁ কি তনুশা । সব ভুলে গেছেন নাকি , আমি কিন্তু কিছুই ভুলি নি
– তনুশা আস্তে কথা বলো
– হ্যাঁ , এত বছর তো আস্তে কথা কেন , কথাই তো বলি নি আমি , তাহলে আজ কেন ?

.

সবাই অবাক হয়ে দেখছে । তবে কেউ কিছু বলছে না । ভেবেছিল এই ঝগড়ার মধ্যেই হয়তো ওদের সব কিছুর অবসান ঘটে যাবে । তবে হিতে বিপরীত হয়ে গেল ।

.

– কতবার বলবো আমি , কতবার বললে তুমি বিশ্বাস করবে যে আমি সেদিন ভুল করেছি ভুল করেছি ভুল করেছি আর সেই ভুলের মাসুল আজ অবদি গুনতেছি । তুমি শুধু নিজের টাই বুঝতেছো তনুশা আমার দিকটা বুঝতেছো না 
– কি , হ্যাঁ কি বললেন , হা হা হা , কে কোথায় আছো শুনে যাও আমি নাকি এনাকে বুঝি না , আপনি আমাকে বুঝেছিলেন ? 
– আবারও সেই কথাতে পড়ে আছে , আমার জায়গায় যে কেউ থাকলে সেম করতো 
– নাহ , ভুল কথা এটা , কেউ সেম করতো না , কেউ না । আরে জেল খানায় ফাঁসি দেয়ার আগেও কয়েদিকে প্রশ্ন করা হয় শেষ ইচ্ছা কি , কাটগড়ায় রায় দেয়ার আগে অপরাধীকে বলা হয় তোমার কিছু বলার আছে ? আর সেখানে আমাকে , ভুলে গেছেন সে রাতের কথা ? 
– উফফফফ , তনুশা আমি বলছি তো আমি ভুল করেছি , আচ্ছা বলো কি করলে তোমার রাগ কমবে , পায়ে ধরবো ? না হয় তোমার পায়ের জুতো দিয়ে আমায় আঘাত করো , তারপরও এমন করো না প্লিজ
– তাহলে যদি বলি ফিরিয়ে দিন আমার ৫ টা বছর , ফিরিয়ে দিন আমার হাসি গুলো , ফিরিয়ে দিন আমার এতগুলো দিন , ফিরিয়ে দিন আমার বাবাকে , পারবেন ? 
– আমি মানছি আমি ভুল করেছি , যার কোন ক্ষমা হয় না , তবুও প্লিজ আমায় ক্ষমা করো , প্লিজ

.

সবাই ওদের ঝগড়া দেখছে । আফরোজ কয়েকবার থামাতে গিয়েও ছিল । কিন্তু কাজ হয় নি । তাই আর কেউ থামানোর চেষ্টাও করে নি । সবাই ভেবেছে চাপা অভিমানগুলো বেরিয়ে আসুক ।

.
– এখনও দাঁড়িয়ে আছেন এখানে 
– তো কি করবো এখন আপনি 
– চলে যান , যান , চলে যান 
– তনুশা ভালোয় ভালোয় বলছি চলো , না হয় কিন্তু খবর আছে 
– আপনি একজন খারাপ মানুষ , যে নিজের বউকে বিশ্বাস করা না । যে নিজের বুঝটাকে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় । রাতের অন্ধকারে বাড়ির বউকে বের করে দেয় । আরে আপনারা সব্বাই স্বার্থপর৷ স্বার্থের জন্য আমায় ব্যবহার করেছেন
– ভুলে যেও না তনুশা তুমিও কিন্তু আমায় ভালোবেসে বিয়ে করো নি । নিজের স্বার্থে বিয়ে করছো আমার বাবার প্রস্তাবে ।

.
এই কথা শুনে তনুও অনেক রেগে যায় । সবার দিকে তাকিয়ে দেখে তনু । তারপর দৌড়ে এসে সবার মুখের উপরে দরজা লাগিয়ে দেয় তনু । দরজা লাগানো দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে যায় । এইবার তনু আবার বলা শুরু করে ,

.
– কি বললেন আপনি , নিজের স্বার্থে বিয়ে করছি আমি আপনাকে ? 
– হ্যাঁ , আমার বাপও স্বার্থের জন্য তোমার কাছে গেছে আর তুমিও রাজি হয়ে গেছ 
– তাহলে তো বলতে হয় স্বার্থের জন্য আপনিও আমার কাছে এসেছেন । দিনের পর দিন আমার শুয়েছেন , দিনের পর দিন আমার সাথে সে………… , তারপরও বলেছেন আমি নাকি বেশ্যা , তাহলে আপনি কতটুকু ভালো হলেন , রাতের অন্ধকারে বের করে দিলেন । যেই বাবা মাকে এত ভালোবাসলাম তারা পর্যন্ত আমার সাথে এমন করলো । আমার ভাইটার চাকরি নিয়ে নিল । তাহলে আপনি কোথাকার একদম ফেরেশতা হলেন , বলেন আমায় , বলেন ? 
– তনুশা , ভুলে গেছো সুইজারল্যান্ডে তুমিই আমার কাছে ধরা দিয়েছিলে , আমি কিন্তু যাই নি তোমার কাছে

.
পরিস্থিতি এতই খারাপ হয়ে যায় যে তনু এক সময় তাওহীদের কলার পর্যন্ত ধরে ফেলে । আজ তনু কেন জানি নিজেকে সামলাতে পারছে না । চাপা গলায় চোখে ফেটে বেরিয়ে যাবে মনে হচ্ছে তার ।

.
– কেন গেছিলাম জানেন নি আপনি ? কেন শুয়েছিলাম আপনার সাথে বুঝেন নি আপনি ? নাকি সে রাতে শরীরের উন্মাদনাগুলো এতই বেড়ে গিয়েছিল যে আমার যন্ত্রনাগুলো চোখেই পড়ে নি আপনার । আরে একজন স্বামীই তো বুঝে তার স্ত্রী সতী নাকি অসতী । তাহলে আপনি বুঝলেন না কেন আমি শুদ্ধ ছিলাম নাকি অসুদ্ধ ছিলাম । সে রাতে নিজেকে আপনার কাছে বিলিয়ে দিয়েছিলাম এই কারণেই যাতে আপনি আমার সতীত্বের প্রমান পান । আমি আদৌ রাফাতের সাথে শুয়েছিলাম কিনা তা তো আপনার বুঝা উচিত ছিল । সোজা কথায় , আমি ভার্জিন ছিলাম নাকি না বুঝেন নাই আপনি 
– তনুশায়ায়ায়ায়ায়ায়া (ঠাস…ঠাস)

.

তাওহীদ আর নিজেকে সামলাতে পারে নি । থাপ্পড়টা মেরেই দিলো তনুকে সে । থাপ্পড় রর বেগ এতই দ্রুত ছিল যে সামাল দিতে না খাটে গিয়ে পরে তনু । তারপর জেদের বসে তাওহীদ খাটে গিয়ে তনুর উপরে উঠে যায় । জোড় করে তনুর ঠোঁট জোড়াকে নিজের ঠোঁটের আয়ত্ত্বে নিয়ে আসে তাওহীদ । দুহাত দিয়ে তাওহীদকে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেই যাচ্ছে তনু । কিন্তু লাভ হচ্ছে না । তাওহীদ জোড় করে ধরে রেখেছে তনুকে । চাদর খামছে প্রায় দলা করে নিয়েছে তনু । দুচোখ বেয়ে ক্রোধের চোটে পানি বেয়ে বেয়ে পড়ছে । 
আর অন্যদিকে তাওহীদ যতক্ষন না পর্যন্ত নিজের শরীরের রাগ কমাতে পারছে তনুকে ধরেই রেখেছে । মিনিট পনেরো পরে তনু নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাওহীদকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ফেলে ।

.

– নির্লজ্জ , বেহায়া , লম্পট , চরিত্রহীন পুরুষ । সরে যা আমার চোখের সামনে থেকে , দূর হয়ে যা । আমি তোকে কেন তোর ছায়াও দেখতে চাই না । বেরিয়ে যা তুই । আল্লাহ করুক তোর এই চেহারাটা যাতে আমায় দেখতে না হয় । এই জীবনে যাতে তুই চোখ মেলে আমার দিকে না তাকাতে পারিস । আল্লাহ করুক তোর মৃত্যুর খবর যাতে আমি পাই । তুই বের হয়ে যা আমার সামনে থেকে ।

.

তনুর কথায় আজ সত্যি তাওহীদ আহত । মন থেকে আহত । হৃদয় থেকে আহত । এতটাই আহত যে পিষিয়ে দিয়েছে তনু তাওহীদকে । চরিত্রহীন পুরুষের দাগ লাগিয়ে দিল তনু তাকে । মরে যাওয়ার অভিশাপ পর্যন্ত বেরিয়ে গেল ওর মুখ থেকে । টপ টপ করে পানি গুলো দ্রুত গতিতে তাওহীদের চোখে থেকে বেরিয়ে যায় । ছুটে গিয়ে তনুর চুলের পিছন দিক টা ধরে ফেলে তাওহীদ ।

.

– শেষ পর্যন্ত অভিশাপটা দিয়েই দিলি 
– এখন গায়ের জোড় দেখাবেন তাই না 
– আপনি কেন তুই তুই বল , তাই তো বলেছিলি তাই না তুই তুই বল । মৃত্যুর অভিশাপ দিয়েছিস না তুই । যাহ আল্লাহ কবুল করুক তোর এই কথাটা । আল্লাহ তুমি আমার বউয়ের কথাটা যত দ্রুত সম্ভব কবুল করে নিও । ভালো থাক তুই । মেয়েকে তোর কাছেই দিয়ে গেলাম

.

এই বলে চোখের পানি গুলো বা হাত দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে যায় তাওহীদ । ড্রইং রুমে সবাইকে উপেক্ষা করে সোজা বেরিয়ে যেতে থাকে তাওহীদ । যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যায়

.

– তাহুরাকে রেখে চলে এসো তোমরা আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি

.
এইটুকু বলেই বেরিয়ে যায় সে । আর অন্যদিকে তনু ফ্লোরে বসে বালিশ চাপা দিয়ে কান্না শুরু করে । রাত্রি , তনয়া , আর মাইশা দৌড়ে তনুর রুমের সামনে যায় । হুলস্থুল অবস্থা রুমের । বিছানার চাদর এলোমেলো , তনু নিজেও এলোমেলো । রাত্রি , তনয়া আর মাইশা সবাই মিলে তনুর কাছে যায় । বার বার জিজ্ঞাসা করতে থাকে । শুধু একটাই উত্তর দেয় তনু ,

.

– মাইশা দয়া করে তোমরা চলে যাও । দয়া করো , আমায় বাচতে দাও । চলে যাও তোমরা , প্লিজ চলে যাও

.
তনুর এমন কথায় ভালো মন্দ কিছুই বলে নাই মাইশা । 
সেইদিন বিকেলেই সবাই ঢাকা চলে আসবে বলে সব গুছিয়ে নেয় । খাওয়া দাওয়া হয় নি কারো । পরিস্থিতি এমন হয়ে গেছে যে খাওয়া কারো গলা দিয়ে নামবে না । এর মধ্যে দিয়ে তাহুরা এসে বড্ড বেশি বিরক্ত করছে তনুকে ।

.

– মাম্মাম পাপাই তই 
-………….. 
– মাম্মাম পাপাই তই
-…………..
– ও মাম্মাম , মাম্মাম পাপাই তই
– তাহুরা বিরক্ত করো না 
– ও মাম্মাম বলো না পাপাই তই 
– তাহুরায়ায়ায়া (ঠাস…ঠাস)
– এ,,,,,,,এ,,,,,,,,,
– চুপ একদম চুপ , এত পাপাই পাপাই কিসের , রেখে আসছিলাম না পাপাইর কাছে , আসছিস কেন , বেয়াদব একটা , আমার হাড় মাংস জ্বালিয়ে খাইছিস , যা সর এখান থেকে

.

বাচ্চা মেয়েটার সাথেও এত বাজে ব্যবহার করলো তনু । রুমেল-রাত্রি একসাথে সব দেখেও ফেলে সাথে শুনেও ফেলে

.

– তনুউউউউউ , তুই ও-কে এইগুলা কি বললি ? 
– সমস্যা কি তোমার আপু , তাহুরা কি করছে যে ও-কে আজকে মারলা তুমি
– এইখান থেকে যাও
– হ্যাঁ হ্যাঁ বের করে দে আমাদেরকেও । তুই আমার ভাগনির গায়ে হাত দিছিস , ওই হাতটা যদি আমি কেটে না দিছি 
– আহহহহ রুমেল থামো তো , আপু পাগল হয়ে গেছে৷, তাহুরাকে কোলে নাও , রুম থেকে চলে আসো , আর আপু তুমি তাহুরার কাছে আসবা না , এই বলে গেলাম আমি 
– মিমি ও মিমি
– জ্বি মাম্মাম পাখি 
– মাম্মাম আমায় মেরেতে তেনো
– তোমার মা পাগল হয়ে গেছে সোনা , তুমি চলো আমার সাথে মাম্মাম পাখি আর মিমি আর মনি মিলে আজকে আইসক্রিম খেতে যাবে , চলো মাম্মাম
– তলো , মাম্মাম পতা

.
যন্ত্রনাটা আরও দ্বিগুণ হয়ে যায় তনুর । 
মেয়েটাকে পর্যন্ত আজকে চড় মেরে দিল । এত রাগ কোথা থেকে উদয় হয়েছে কে জানে ? 
বিকেল সাড়ে ৪ টা , ওরা সবাই যাওয়ার জন্য রওনা দিবে এখন । আফরোজ এসেছে তনুর সাথে কথা বলতে । তনু আজ সারাদিনেও রুম থেকে বের হয় নি ।

.

– আসবো ? 
-………. 
– নক নক , 
– কে , ওহ আপু আসো 
– চলে যাচ্ছি ঢাকাতে , তাই দেখা করতে এলাম
– আরও দুইটা দিন থেকে যাও আপু
– যার জন্য আসা তা তো ফুলফিল হলো না তাই চলে যাচ্ছি । আচ্ছা একটা কথা বলি ? 
– হ্যাঁ আপু বলো 
– তাওহীদকে এইভাবে কষ্ট না দিলেও পারতি 
– আপু তুমিও , তুমি তো সব জানো তাই না
– হ্যাঁ সব জানি , এমন কি এটাও জানি যে তাওহীদ আজও তোকে ভালোবাসে 
– ওটাকে ভালোবাসা বলে না 
– তাহলে কোন টাকে ভালোবাসা বলে , কাছে থেকে সারাক্ষণ লুতুপুতু করাই কি ভালোবাসা । মানলাম অনেক অন্যায় করেছে তোর সাথে যার ক্ষমা হয় না তেমনি অনেক কষ্ট পেয়েছে ছেলেটা । একবার ভেবে দেখেছিস কি সে আজ পর্যন্ত বিয়েও করে নি । মাইশার কাছে শুনেছিলাম , কানাডায় কত সম্বন্ধ পাঠিয়েছে ওর মা সবার সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে ও । তোকে যেমন কষ্ট দিয়েছে তার চেয়ে নিজে জ্বলেছে তিনগুন । যাই হোক , যা করার করেছিস । শুধু এতটুকুই বলবো তোর মেয়েটার বাবা-মা উভয়কেই লাগবে । একটা সন্তান সর্বদিক থেকে তার বাবা-মা উভয়কেই চায় । অথচ তুই সেই বাচ্চার সামনে দলিল ছুড়ে দিয়েছিস , তুই কাকে চাস মা নাকি বাবা । এখন বলবি ওকে তো ওর বাবার কাছে দিয়ে আসছি । আমি বলবো সব থেকে বোকামি এখানেই করেছিস । জীবন টা খুব ছোট হয় তনু , হয়তো ৫ টা বছর নষ্ট হয়ে গেছে । কিন্তু বাকি জীবন টা তো কাটাতেই পারতি তাই না ? যাই হোক , তীর জীবন তোর সব , ডিসিশন টাও তোর ভালো থাক । দোয়া করিস , আসি

.
তনুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে যায় আফরোজ । আফরোজের বিশ্বাস সে যতটুকু বলেছে তনু যদি সত্যিই বুদ্ধিমতি হয় তাহলে সে সব বুঝবে । 
৫ টা নাগাদ সবাই বের হয়ে যায় । রুম অন্ধকার করে বিছানায় পড়ে থাকে তনু । চোখের পানি গুলো যেন পাল্লা দিচ্ছে , থামছেই না । কারো কিছুই বলার নেই তনুকে । সবাই যে যার মতো কাজ করছে । সুরিয়া বেগম সব দেখেও চুপ কারণ তিনি তাওহীদকে ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েছিলেন । হয়তো তাই চুপ আছেন । 
এইদিকে রাত্রি প্রেগন্যান্ট । তা নিয়ে ওরা সবাই অনেক আনন্দিত । কিন্তু কারো মুখেই হাসি নেই । সবাই এক রকম ঘোরের মাঝে আছে । কি হওয়ার কথা ছিল আর কি হয়ে গেল ?

.

এক সপ্তাহ পর ,

.

এত দিন না তাওহীদ তনুকে কল দিয়েছে না তনু তাওহীদকে । হ্যাঁ তবে দুইদিন আগে রাত্রির সাথে মাইশার কথা হয়েছে । তাহুরার কথা জিজ্ঞেস করার জন্য কল দেয়া । 
মাইশার কাছ থেকেই সব জানতে পারে রাত্রি । তাওহীদ ভালো নেই , একদম ভালো নেই । চট্টগ্রাম থেকে যাওয়ার পর একদম শান্ত হয়ে গেছে । তাহুরা আর তনুর ছবি দেখে সারাদিন কাটে তার । ইদানীং মদ খাওয়া শুরু করেছে আবার । রাত করে বাসায় ফিরে । আরও অনেক কিছুই বদ অভ্যাস করে নিয়েছে এই কয়েকদিনে সে । তাওহীদের মা-বাব দিন রাত কান্নাকাটি করে নাতিনের জন্য , বউয়ের জন্য । একটাবার তাহুরাকে দেখতে চায় এই সেই আরও অনেক কিছুই ।

.

ঢাকা ……………………

.

– কত রাত হয়ে গেছে এখনও ছেলেটা ফিরলো না 
– মা টেনশন নিয়েন না চলে আসবে তাওহীদ 
– তুমি আরেকবার কল দাও না সাকিল
– মাইশা মাত্র ১১ টা , আর ইদানীং তো ও রাত করেই বাড়ি ফেরে 
– সাকিল আমার বা চোখ টা সকাল থেকে লাফাচ্ছে বাবা , মন টাও কু ডাকছে , একবার কল দাও না বাবা 
– আচ্ছা দিচ্ছি মা

.

কয়েকবার কল হলো কিন্তু রিসিভ হলো না

.

– রিসিভ করে নাই তো মা
– ওহহহহ রে আল্লাহ , কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছো
– ভুলে গেলে আম্মু , কোন পাপের জানো না ? 
– হ্যাঁ রে মা , মনে আছে । সেই পাপের মাসুল গুনতে হচ্ছে আমাদের 
– সাকিল কি মনে হয় গো 
– অফিসে তো নেই , 
– হুম

.

প্রায় এক ঘন্টা পরে সাকিলের ফোনে একটা কল আসে ।

.

– হ্যালো আসসালামু আলাইকুম , 
– ওয়ালাইকুম আসসালাম
– কে বলছেন ? 
– ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বলছিলাম 
– জ্বি বলেন 
– আমি একটা মোবাইল থেকে নাম্বার টা পেলাম 
– ক্লিয়ার করে বলবেন প্লিজ , কি হয়েছে
– দেখুন একটা গাড়ি হাইওয়ে তে এক্সিডেন্ট হয়েছে । ওই গাড়িতে যিনি ছিলেন তার মোবাইল থেকে আপনার নাম্বার পেয়েছি 
– accident , whatttttttttttt 
– আল্লাহ গোওওওওও , আমার ছেলেএএএ
– কি বলছেন কি কিসের এক্সিডেন্ট , গাড়ির নাম্বারটা বলেন তো 
– AWM 60-59-399 
– whattttttttttttttttt 
– চলে আসুন তারাতারি , রোগীর অবস্থা আশংকাজনক

.
ফোন টা কেটে যায় । সাকিল ধুপ করে সোফায় বসে পড়ে । মাইশা আর রাবেয়া বেগম চিৎকার দিয়ে কান্না করে উঠে ।

.

তাহলে কি তনুর অভিশাপ টা লেগেই গেল ? হ্যাঁ হয়তো সব কিছু অবসান এখানেই ঘটে গেল । হয়তো তাওহীদ সব কিছুর ইতি টেনে দিয়েছে । হয়তো জীবনে করা কিছু ভুল কিংবা অজান্তে হয়ে যাওয়া কিছু পাপের শাস্তি এইভাবেই হয় ।

রাত প্রায় ১২ টা ৪৫ মিনিট ,

.

যে যেভাবে ছিল , সে সেভাবেই হাসপাতালে ছুটে গেছে । হাসপাতালে গিয়ে দেখে সেখানে পুলিশও আছে । তাওহীদের পরিবারকে দেখে পুলিশ ওনাদের দিকে এগিয়ে আসেন ।

.

– আসসালামু আলাইকুম 
– ওয়ালাইকুম আসসালাম , আমি সিনিয়র ইন্সপেক্টর শাওন 
– হ্যালো স্যার 
– হ্যালো , দেখুন গাড়িটার খুবই বাজে অবস্থা , আর তাছাড়া রোগীর অবস্থাও তো ভালো না

.

ইন্সপেক্টর এর কথা শুনে রাবেয়া বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন । মাহবুব সাহেব তো যায় যায় অবস্থা । মনে হচ্ছে বহু কষ্টে সে দাঁড়িয়ে আছে ।

.

– মা কান্না করবেন না , আসুন তাওহীদকে দেখতে যাই 
– হ্যাঁ আপনারা বরং রোগীর কাছে যান আর মিষ্টার সাকিল আপনি আমার সাথে একটু পর দেখা করুন 
– জ্বি স্যার

.
কোন রকম দেরি না করেই O.T তে নিয়ে যাওয়া হয় তাওহীদকে । সাকিল নিজ দ্বায়িত্বে রাবেয়া বেগম এবং মাহবুব সাহেব কে বসিয়ে দেন চেয়ারে । মাইশাও পাশে বসা । সাকিল এই সুযোগে পুলিশের সাথে দেখা করে ,

.

– আরে মিষ্টার সাকিল
– জ্বি স্যার , এইবার বলুন 
– দেখুন এটা একটা এক্সিডেন্ট । এক্সিডেন্ট স্পট থেকে কিছুই পাওয়া যায় নি । ভাগ্য ভালো ছিল মোবাইল টা ছিটকে রাস্তায় এসে পড়ছে । যেই ট্রাকটা চাপা দিয়েছে তাকে আমরা আটক করছি । শালা মাল খেয়ে ট্রাক ড্রাইভ করছিল । তাই এক্সিডেন্টটা হয়ে গেছে । আর গাড়িটা যিনি ড্রাইভ করছিলেন তিনিও অন্যমনস্ক ছিলেন , 
– এছাড়া আর কিছু নেই তো ? 
– জ্বি না 
– ওকে ধন্যবাদ 
– আচ্ছা আসি তাহলে 
– ওকে আল্লাহ হাফেজ

.

পুলিশ বিদায় নেয় । ওইদিকে O.T চলছে । সাকিল আরেক ডক্টরের সাথে কথা বলছে , গার্জিয়ান ছাড়া রোগীকে কেন O.T তে নেয়া হলো । ডক্টর ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছেন । 
প্রায় এক ঘন্টা পর মানে রাত প্রায় ২ টার মতো বাজছে তখন O.T থেকে সিনিয়র ডক্টর বেরিয়ে আসেন । এত রাতে O.T করতে এসে ডক্টরকেও বিরক্ত লাগছিল । 
সাকিল মাহবুব সাহেব ছুটে গেলেন ওনার কাছে

.

– কেমন বুঝলেন ডক্টর 
– আপনারা ? 
– আমরা রোগীর ফ্যামিলি
– ওহ আচ্ছা , দেখুন অবস্থা ক্রিটিক্যাল , ততটা ভালো না । বুকের দুইটা পাজর ভেঙে গেছে , মেরুদন্ডতেও চোট এসেছে , ঘাড়েও ফ্র্যাকচার , ডান হাত , বাম পা এর অবস্থা খুব খারাপ , মাথায়ও আঘাত পেয়েছে , বলতে পারেন তিনি এখন একজন জ্যান্ত লাশ । ৩৬ ঘন্টার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না । হয়তো কোমায় চলে যেতে পারে নয়তো প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে , আর হ্যাঁ ৩৬ ঘন্টা পর হাত আর পায়ের অবস্থা আমরা দেখবো , যদি দেখি ভালো না তাহলে হয়তো কেটে ফেলতে হবে । দোয়া করেন সব আল্লাহর কাছে 
– এ আপনি কি শুনালেন ডক্টর , এর থেকে তো ভালো হতো এটা বলতেন যে ও মারা গেছে 
– আহহহহ আব্বু , কি বলো
– আমি বাপ হয়ে ছেলেকে কি করে এই অবস্থায় দেখবো 
– সামলাও নিজেকে আব্বু 
(ঘাড় ঘুরিয়ে) আমুউউউউউউউ 
– মায়ায়ায়ায়া

.

রাবেয়া বেগম ছেলের কথা শুনে অজ্ঞান হয়ে গেলেন । এখন ওনাকে নিয়ে টানাটানি । রাত পোহাবারও খবর নেই । বিপদের রাত গুলো হয়তো এত বড়-ই হয় । রাবেয়া বেগমকে অন্য কেবিনে রাখা হয়েছে । অতিরিক্ত টেনশন করে বি পি লো হয়ে গিয়ে ঘুরে পড়ে গেছেন তিনি । ইনজেকশন , স্যালাইন দিয়ে ওনাকে রাখা হয়েছে । তাওহীদকে I.C.U তে রাখা হয়েছে ।

.

পরদিন সকাল ৮ টা ,

.
তনু রেডি হয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল । অফিস থেকে প্রায় ১ মাসের ছুটি নিয়েছিল । কিন্তু কয়েকদিন লেট হয়ে গেছে । অফিসে রাখবে কিনা তাই এখন সন্দেহ । কোন রকম রেডি হয়ে বেরিয়ে যেতে ধরে তনু ,

.

– কোথায় যাচ্ছিস ? 
– অফিসে মা , ছুটি তো কয়েকদিন আগেই শেষ হয়ে গেল । প্রিন্সিপাল স্যার আর কল দিলেন না , দেখি কি বলে
– ওহ

.

তনুও এক পা বাহিরে দেয় আর ওর ফোনটা বেজে ওঠে । নাস্তার টেবিলে রুমেল , রাত্রি , রুবেল , তনয়া সবাই এক সাথে ওর দিকে তাকায় । সকাল সকাল কার ফোন । তনু ফোন রিসিভ করে । ফোনের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ ,

.

– হ্যালো মাইশা , কাদছো কেন 
– ভাবীইইইই 
– কি হয়েছে মাইশা , কি হয়েছে কাদছো যে
– ভাবীইইইই ভাইয়ায়ায়ায়া

.

ধুরুম করে তনুর বুকে মনে হয় পাথর পড়ে যায় । মাইশার এইভাবে কান্নার মানে কি ?

.

– ক,,,ক,,,কি-ই হয়েছে মাইশা
– ভাইয়ার এক্সিডেন্ট হয়েছে গতকাল রাতে 
-…………….
– ভাইয়া ভালো নেই ভাবী , ও মরে যাবে নয়তো কোমায় চলে যাবে , ডক্টর কোন আশ্বাস দিচ্ছে না , একবার আসবা প্লিজ ? 
-……………..
– হ্যালো ভাবী
-……………..
– হ্যালো , হ্যালো

.

হাত থেকে মোবাইল টা পড়ে যায় তনুর । সেখানেই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তনু । ওর এই অবস্থা দেখে সবাই ছুটে আসে । রুমেল বার বার প্রশ্ন করছে তনুকে কিন্তু কোন জবাব নেই তার

.

– কিরে কে কল দিছে ? 
-………
– এই আপু কথা বলো , কি হয়েছে 
– ভাইয়া কল টা লাইনে আছে , দেখতো কে কল দিছে
– আরে এটা তো মাইশার কল ,
হ্যালো মাইশা ? 
– রুমেল ভাইইইইইইইই
– কি হয়েছে মাইশা , কাদছো কেন
– ভাইইইই আমার ভাইয়াটায়ায়ায়া
– মানে , ভাইয়াটা মানে ? কি হয়েছে
– ভাইয়া এক্সিডেন্ট করছে ভাই ,
– কিহহহহহহহ
– হ্যাঁ ভাই , গতকাল রাতে এক্সিডেন্ট করছে । অবস্থা খুব খারাপ , ডক্টর কোন আশ্বাস দেয় নাই ভাই 
– ক,,,কিইইই করে হলো এইসব 
– জানি না ভাই , পুলিশ ফোন পেয়ে আমরা হাসপাতালে আসছি । এইদিকেও মায়ের অবস্থাও ভালো না 
– ওহ আল্লাহ
– তাহুরা আর ভাবীকে নিয়ে আসেন ভাই 
– মাইশা আমি দেখছি কি করা যায় 
– হ্যাঁ ভাই , একটু তারাতারি করেন প্লিজ
– হু তুমি রাখো

.

তনু সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছে । সবাই রুমেলের কাছ থেকে তাওহীদের এক্সিডেন্ট এর খবর পায় । তনু আস্তে আস্তে নিজের রুমে চলে আসে । ও এখনও মাথায় আনতে পারছে না কি হয়ে গেল এটা । তাওহীদের এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে । তাহলে কি সেইদিনের তনুর দেয়া অভিশাপ টা লেগে গেল । তনু চেয়েছিল আর তাওহীদও বলেছিল । তাহলে কি এর জন্যেই এক্সিডেন্ট টা হয়ে গেল ? ফ্লোরে ধুপ করে বসে পড়ে তনু । একদম চুপ হয়ে আছে সে ।

সুরিয়া বেগম তনুর রুমে আসে । পাথর হয়ে ফ্লোরে বসে থাকা মেয়েটাকে একদম পুতুল লাগছে । মেয়ের সামনে গিয়ে বসে সুরিয়া বেগম ।

.

– কিরে মা , এইভাবে বসে পড়লি যে ? ঢাকা যাবি না ? 
-…………..
– কিরে চুপ কেন ? কথা বল 
-…………..
– কিরে , চুপ করে আছিস কেন ? পাথর হয়ে গেছিস নাকি , তনু , এই তনুউউউ
– মাহ , কেউ কাউকে অভিশাপ দিলে কি সহজে লেগে যায় ? 
– মানে ? 
– বলো না মা , অভিশাপ কি লেগে যায় ? 
– কেন এইসব কথা বলিস , এই গুলা কুসংস্কার , মিথ্যা কথা এইগুলা 
– তাহলে আমার অভিশাপ কি করে লেগে গেল মা 
– মানে ? কি করছিস তুই 
– হ্যাঁ মা , আমিই তো ও-কে অভিশাপ দিছিলাম , ওর যাতে মৃত্যু হয় , ওর মরা মুখ টাও যাতে আমায় না দেখতে হয় 
– তুই এইসব কি বলস
– হ্যাঁ মা , এখন কি হবে মা , আমার মেয়েটা বাবা হারা হয়ে যাবে মা
– তনুউউউউউ , চুপ কর মা চুপ কর 
– ও মা , মা , ও মা আমি এটা কি করলাম মা , ও তো একটা ভুল করছিল আর আমি ওর মৃত্যু কামনা করলাম , কি করে মা ?

.

তনুর আহাজারি , বিলাপ শুনে রাত্রি আর তনয়া দৌড়ে রুমে চলে আসে । কাদতে কাদতে অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হয়ে গেছে তনুর । শরীরটা পুরো মিশে যাচ্ছে ফ্লোরে ।

তনুকে অনেক কষ্টে শান্ত করিয়ে ১০ টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় রুমেল , তনু আর তাহুরা । ছোট্ট বাচ্চাটা মায়ের কান্নার কারণ খুজছে বার বার । কিন্তু খুজে পাচ্ছে না । সাকিলের সাথে যোগাযোগ করে প্রায় ৫ ঘন্টা পর দুপুর ৩ টা ৩২ এ হাসপাতালে পা রাখে তনু , তাহুরা । 
নিচ থেকে সাকিল ওদের নিয়ে যায় । 
তনুকে দেখে মাহবুব সাহেব কেদে দেয় । মাইশাও কেদে কেদে অস্থির ।

.

– মা রে দেখ , তোর সাথে করা সব অন্যায়ের ফল আজ ওই I.C.U তে শুয়ে আছে

.

তনু ঘাড় ঘুরিয়ে I.C.U র দরজার দিকে তাকিয়ে আছে । মধ্যিখানে মাইশা এসে জড়িয়ে ধরে তনুকে ।

.

– ভাবীইইইইই , ভাইয়ায়ায়ায়া
– আমি একটু ভেতরে যাবো , ব্যবস্থা করতে পারবে ?

.
তনুর এমন শান্ত কথায় সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে ।

.

– কিন্তু ভাবী , ডক্টর নিষেধ করেছেন 
– সাকিল ভাই , একটু ব্যবস্থা করেন না ভাই । ভেতরে যাবো

.

তনুর এই শান্ত আচরণে বুঝাই যাচ্ছে ও-কে ঘাটানো যাবে না । কারণ ঝড় আসার আগে পরিবেশ এমন শান্তই থাকে । 
তাই ডক্টরের সাথে কথা বলে তনুর ভেতরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে তাওহীদ । 
I.C.U র ভেতরে এসে তাওহীদের বেডের পাশে রাখা চেয়ার টায় বসে পড়ে তনু । তাওহীদকে দেখছে সে । বলতে গেলে পুরো শরীরটাই ব্যান্ডেজে মোড়ানো । নিথর একটা দেহ পড়ে আছে , যেন মনে হচ্ছে বেডে একটা লাশ রেখে দেয়া হয়েছে । তাওহীদকে এই অবস্থায় দেখে তনুর ভেতরটা ভেঙে গুরিয়ে যায় ।

.

আস্তে আস্তে হাতটা তাওহীদের হাতের উপরে রাখে তনু । তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে মুখটা তাওহীদের কাছে আনে তনু । বিড় বিড় করে কি যেনো বলছে তনু । একদম আস্তে করে কথাগুলো বলছে সে তাওহীদকে ।

.

– শুনছেন , এই শুনছেন 
-……..
– উঠেন , দেখেন আমি আসছি 
-………
– এই , উঠেন না , এই যে আমি আসছি তো 
-……..
– কি শুয়ে আছেন ? আর এমন এক্সিডেন্ট কি করে হলো ? আপনি তো অনেক ঠান্ডা মাথায় গাড়ি ড্রাইভ করতেন ওহ বুঝছি , আমি যে ওইদিন অভিশাপ দিলাম , তার জন্যই কি এক্সিডেন্ট হয়েছে ? আচ্ছা সরি আর অভিশাপ দিব না । আমার রাগ উঠেছিল অনেক তাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে 
-………
– কি ব্যাপার কথা বলেন না যে , আপনার আম্মুনকেও নিয়া আসছি , এখন তো উঠেন 
-………
– উঠবেন না তো , কি হয়েছে আপনার , উঠেন বলছি উঠেন 
-……… 
– উঠেন না প্লিজ , আমি এখন থেকে আপনার কাছেই থাকবো , উঠেন না একটু


এক সময় শান্ত হয়ে থাকা গলাটা কান্নায় রূপ নেয় । বার বার আকুতি জানায় একটাবার উঠে যাক তার স্বামী । 
ওদিকে ছোট্ট তাহুরাও বুঝে গেছে যে তার পাপাই অসুস্থ । ফুপির কোলেই ঘুমিয়ে গেছে বাচ্চাটা । সাকিল তাহুরাকে আর মাইশাকে পাঠিয়ে দেয় বাসায় । বাচ্চা মেয়ের এখানে থাকা ঠিক হবে না ।

.

সেইদিন সারাদিন সারারাত তনু তাওহীদের কাছে ঠায় বসা । শুধু নামাজের সময় উঠে নামাজ পড়েছে তাও কেবিনের মধ্যেই । 
শেষ রাতের দিকে তাহাজ্জুদ এর নামাজ আদায় করে ফজর নামাজ পড়ে তাওহীদের মাথার কাছে বসে ইয়াসিন সূরা পড়ছে । মুখটা ব্যান্ডেজের জন্য দেখা যাচ্ছে না ভালো করে তার উপরে অক্সিজেন লাগানো । 
নিজেকে অনেকটা শক্ত করে নিয়েছে তনু । অভিশাপ যখন নিজেই দিয়েছে সেই অভিশাপও কাটাবে সে নিজেই । শুধু ওর একটু ভালো হওয়ার অপেক্ষা ।

.

কথায় আছে খুজলে নাকি আল্লাহকেও পাওয়া যায় । কিছু কিছু ঘটনা এমন হয় যা বাস্তবকেও কাল্পনিকতায় রূপ দেয় । সেইদিন তনুর অভিশাপ দেয়াটা হয়তো ঠিক ছিল না আবার অভিশাপ দিলেই যে লেগে যাবে তাও কেউ জানতো না । 
সেইবার হয়তো তনুর ৫ ওয়াক্ত নামাজ , তনুর মানত করা ১০০ রাকাত নফল নামাজ , সৎ ও নেক মনে চাওয়া দোয়ার জন্য সে যাত্রায় প্রাণ ফিরে পায় তাওহীদ । প্রায় ১ মাস এক প্রকার মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করেছে মানুষ টা । একটু সুস্থ তবে মনের দিকে অনেক অসুস্থ । সেইদিনের তনুর ব্যবহার আজও তার মনে আছে । এত অসুস্থ তবুও তনু সেবা করে যাচ্ছে কিন্তু তাওহীদ একটা কথাও বলে নি তনুর সাথে শুধু মেয়েটার সাথে ইশারায় কথা বলতো 
এই এক মাসে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে । তনুও সব দিক মেনে নিয়েছে । রাবেয়া বেগম , মাহবুব সাহেব বার বার সেইদিনের জন্য ক্ষমা চায় তাই তনুও ক্ষমা করে দেয় ।

.

আজ শুক্রবার ,

.

তাওহীদকে ডিসচার্জ করে দিবে । তাই তনু রুমেলকে বলেছে ঢাকাতে আসতে । বিকেলের দিকে সাকিল আর রুমেল মিলে তাওহীদকে বাসায় নিয়ে আসবে

.
তনু সব গুছিয়ে রেখেছে । পুরো রুমটায় নতুন চাদর , নতুন কার্টেন , নতুন সব কিছু ডক্টর বলেছে সুস্থ করতে হলে আগে পরিবেশ সুস্থ রাখতে হবে । 
কিন্তু এইসবের মাঝে কি আদৌ গড়ে উঠবে সেই ভালোবাসার বন্ধন টুকু । যা আজ দুজনের জন্যেই নষ্টের দিকে ।

.
চলবে…………………



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*