তোমায় আমার প্রয়োজন [৬ষ্ঠ অংশ]

লেখাঃ আফরোজা আক্তার (মেঘলা)


দুইদিন অতিবাহিত হয়ে যায় । কিন্তু তাওহীদের মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না । কেন জানি তনুকে আরো অপমান করতে মন চায় তার । কিন্তু চেয়েও পারে না সে । 
কেমন জানি লাগে তার কাছে আবার ক্ষমাও করতে পারছে না তনুকে । কারন তার চোখে তনু আজও অপরাধী । এই অপরাধের একটাই শাস্তি আর তা হচ্ছে তাওহীদের ঘৃণা নিয়ে বেচে থাকা । আর তাই হচ্ছে । 
.
সেইদিন তনুর উপরে রাগ করে বাসায় এসে ফোন টা ভেঙে ফেলে তাওহীদ । ফোন কিনবে কিনবে করে আর কেনা হয় নি তাই আজ দুপুরের দিকে অফিস থেকে মোবাইল কিনতে শপিং মলে যায় তাওহীদ । একটা ফোন থাকা প্রয়োজন , তাই ফোন ভেঙে আবার দৌড় দেয় ফোন কিনতে । 
মোবাইল শো-রুমে মোবাইল দেখছিল তাওহীদ , হঠাৎ তার কানে লাগে 
.
– মাম্মাম , ও মাম্মাম আমায় এতা(এটা) কিনে তাও(দাও) না 
– নাহ মাম্মাম পাখি এটা ভালো না , আরেকদিন অন্যটা কিনে দিব 
– নাহ এতাই(এটাই) তাই(চাই) আমাল(আমার)
– তাহুরা , দিন দিন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছো তুমি , চলো 
.
মায়ের মুখে নিজের নাম শুনে ঠোঁট ফুলিয়ে রাখে তাহুরা । আসলে মা তাকে মাম্মাম পাখি ডাকে কিন্তু যখন নাম ধরে ডাকে তখন সে বুঝে যে তার মা অনেক রেগে আছে । একদম মায়ের মত হয়েছে নীরবে কাদে সে । চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কিন্তু শব্দ নেই । 
গ্লাসের ওপার থেকে সবটা খেয়াল করলো তাওহীদ । তাহুরার মাঝে অদ্ভুত মায়া কাজ করছে । তাওহীদ অনেক লজ্জিত ওইদিনের কথার জন্য যেদিন তাহুরাকে সে অবৈধ বলেছিল । বাচ্চাটা একদম নিষ্পাপ । মোবাইল রেখে সে শো-রুম থেকে বেরিয়ে যায় । তাহুরাকে এক পাশে দাড় করিয়ে তনু কিছু কিনতেছে । এমন টাইমে তাওহীদ পিছন থেকে গিয়ে তাহুরার কাধে হাত রাখে । তাহুরা ঘাড় ফিরিয়ে দেখে তার চশমা আংকেল দাড়ানো । এক গাল হেসে আস্তে আস্তে বলে , 
.
– তশমা আংতেল(চশমা আংকেল)
– এখানে আসো 
– তলো(চলো)
.
একটু সাইডে নিয়ে আসে তাহুরাকে । 
.
– কি হলো কাদছিলে কেন
– মাম্মা বতা(বকা) দিয়েতে(দিয়েছে)
– কি পছন্দ হয়েছিল মাম্মাম পাখির 
– আতো(আসো) দেকাই(দেখাই)
– চলো 
.
তারপর কিডস সেকশনে ইয়ায়া বড় একটা টেডি দেখায় সে তাওহীদকে । পুরো টেডি পুতুলটা পিংক কালারের ছিল । মাথায় টুপি দেয়া । অনেক সুন্দর একটা টেডি । 
.
– দেতলে(দেখলে) তো 
– এটা পছন্দ ? 
– হুম অনেত(অনেক) কিন্তু মাম্মাম দিল না
– আমি কিনে দেই ? 
– দিবে 
– হুম 
– তাহলে দাও 
– আচ্ছা চলো 
– তলো (চলো) তলো(চলো) আমাল(আমার) লতুন(নতুন) আলেকটা(আরেকটা) টেডি হবে 
.
তাওহীদ মুচকি হেসে দেয় । তারপর তাহুরাকে নিয়ে শোপের ভেতরে গিয়ে ৪৫০০ টাকা দিয়ে টেডি টা কিনে দেয় । 
এদিকে তনু তাহুরাকে না পেয়ে প্রায় পাগল হয়ে যায় । মেয়েকে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে তনু । এদিক সেদিক ঘুরে দেখছে তবু খুজে পাচ্ছে না সে তাহুরাকে । প্রায় কেদে দেয় তনু । 
পরে তাহুরা দৌড়ে এসে পিছন থেকে তনুকে জড়িয়ে ধরে । 
.
– মাম্মাম এইতো আমি
.
তাহুরার আওয়াজ পেয়ে তনু পিছনে ফিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে । অনেকগুলো চুমো খায় মেয়েকে তনু 
.
– মাম্মাম পাখি কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি
– তাই(যাই) নি তো 
– তাহলে 
– আমি তো ওই তশমা(চশমা) আংতেল(আংকেল) এর সাতে এই টেডি টা আনতে গেতিলাম(গেছিলাম)
.
তাহুরার ইশারায় তনু সামনে তাকায় আর তাওহীদকে দেখতে পায় । 
.
– তোমাকে না কতবার বলেছি অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু নিবা না 
– তরি(সরি)
– ফিরিয়ে দিয়ে আসো যাও
– লাখি(রাখি) না মাম্মাম প্লিত(প্লিজ)
– না 
.
তারপর তাওহীদ তনুর সামনে এসে দাঁড়ায় । ইচ্ছে করছে ভরা শপিং মলে অনেক গুলো কথা শুনাতে তনুকে । তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করে তনুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে । 
.
– এত দেমাগ ? ঠিক আগের মত 
– আমার সন্তান থেকে দূরে থাকবেন , চলো তাহুরা 
.
তনু তাহুরার হাত ধরে চলে যেতে ধরলে তাওহীদ তাকে আটকে ধরে , 
.
– রাফাতের এক কালের বন্ধু হিসেবে তার মেয়েকে তো কিছু দিতেই পারি , তাইনা ? 
.
তাওহীদের মুখ থেকে এই কথা টা শুনে তনু ভড়কে যায় । রাগ টা আর কন্ট্রোল করে রাখতে পারে তনু । 
.
– ও আমার সন্তান , শুধুমাত্র আমার , ওর উপর কারো অধিকার নেই । না রাফাতের না অন্য কারো । আর হ্যাঁ ও আমার পাপের ফসল । এইবার খুশি আপনি ? না ও রাফাতের অংশ না অন্য কারো , ও আমার পাপের অংশ । 
– তনুশায়ায়ায়া 
– আস্তে , খবরদার চেচাবেন না । নিজের মন কে প্রশ্ন করেন । করেন নিজের মন কে । তাওহীদ সাহেব আমি কি একদিনের জন্যেও আপনার সাথে শুই নি ? প্রশ্ন করেন নিজের মন কে আপনি কি একদিনের জন্যেও আমায় স্পর্শ করেন নি ? এইসব যদি মিথ্যা হয় , হ্যাঁ তাহুরা আমার পাপের ফসল । আমার কয়েক রাতের সুখের ফসল ও । খুশি আপনি ? 
চলো তাহুরা 
.
দোতলার উপরে পুরো মলের মানুষ দাঁড়িয়ে সব শুনেছে । তনু যখন কথা গুলো বলছিল তখন তার চোখ দিয়ে পানির সাথে আগুনও ঝরছিল । তাওহীদের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো তনুর এইসব কথা শুনে । 
.
তনু বাসায় এসে নিজেকে রুমে আটকে দেয় । সবাই দরজার সামনে গিয়ে চিল্লাপাল্লা শুরু করে দেয় । তারপর রুমেল তাহুরাকে কোলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে । 
.
– মামুনি , কি হয়েছে মাম্মামের
– জানি না তো মামা সোনা
– মামুনি মনে করে বলো তো 
– ও হ্যাঁ একতা(একটা) আংতেল(আংকেল) এর সাতে মাম্মামের ঝগড়া হয়েতে(হয়েছে) 
– আংকেল ? কোন আংকেল ? 
– ওই যে তশমা(চশমা) আংতেল(আংকেল)
.
সবাই বুঝে যায় তাহুরা কার কথা বলছে 
.
– তাওহীদ 
– হ্যাঁ ভাইয়া তাহুরা হয়তো তাওহীদ ভাইয়ার কথাই বলছে
– এইখানেও শান্তি দিবে না নাকি আজ ওর একদিন কি আমার একদিন 
– রুমেল , কোথাও যাবা না তুমি , বসো এখানে 
– তুমি জানো না রাত্রি এই লোক খুব খারাপ
– থামো বলতেছি , এই তনয়া তাহুরাকে নিয়ে অন্য রুমে যাও 
– আচ্ছা ভাবি 
.
রাত্রির কথায় তনয়া তাহুরাকে নিয়ে অন্য রুমে রেখে আসে । এইদিক দিয়ে রাত্রি রুমেল কে সব বুঝিয়ে বলে । 
.
– শুনো রুমেল , এটা আপুর ব্যাপার । আপু কি আমাদের বলেছে যে তোরা যা গিয়ে কথা বল ? বা কিছু , এখন যদি তুমি যাও তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে আর আমরা এইসব কিছুই চাই না না চায় আপু । সো হুটহাট সিদ্ধান্তে যেও না আগে দেখো আপু কি বলে 
– হ্যাঁ রুমেল , বউমা ঠিক বলেছে । আর তাছাড়া তনুকে তো চিনিসই সে কোন ঝামেলা চায় না তাই তো ৫ বছর আগে সব মাটি চাপা দিয়ে দিল বিনা ঝামেলায় 
.
সেদিন রাতে তাওহীদের মাথায় বার বার তনুর কথাগুলো আসতেছিল ।
.
– তনুশা কি বললো ? তাহুরা রাফাতের বাচ্চা নয় , অন্যের বাচ্চা , পাপের ফসল , কয়েক রাতের সুখের ফসল , আমি কি তনুকে স্পর্শ করে নি ? আবার সেইদিন রাস্তায় বললো তাহুরা অবৈধ নয় , এইসব কথার মানে কি ? ও কি বলতে চায় ? 
.
তাওহীদ বার বার কথা গুলো রিভাইন করতে থাকে । কিন্তু কাজ হয় না , কিছুতেই সে বুঝতে পারে না কথা গুলোর মানে কি ছিল । 
তারপর পরক্ষণেই মনে পড়ে , ৫ বছর আগে সুইজারল্যান্ডে তো তাদের……. 
.
– হ্যাঁ সেইদিন তো আমি আর ও………
তাহলে কি তাহুরা কি আমার……….. 
কিন্তু বুঝবো কিভাবে তাহুরা আমার বাচ্চা কারন তনুশা তো রাফাতের সাথেও সম্পর্ক রেখেছে । তাহলে তাহুরা তো রাফাতের সন্তানও হতে পারে , হয়তো আমার সামনে সাধু সাজার জন্য এইভাবে বলেছে । কিন্তু তাহুরা তো আমারও সন্তান হতে পারে , নাহ এর ব্যবস্থা করতেই হবে । 
.
তাওহীদের এখন একটাই লক্ষ্য তাহুরা কার সন্তান বের করা । এটা জানা না অবদি তার শান্তি নেই । 
গত দুইদিন তাওহীদ সব এক করে দিয়েছে তাহুরা কার সন্তান এটা জানার জন্য । অবশেষে সে সেই পার্কে চলে যায় যেখানে তাহুরা খেলতে যায় । 
.
– এই যে মাম্মাম পাখি 
– তুমি আবাল(আবার) আসচো
– হুম কেন , আসতে মানা বুঝি
– আমাল(আমার) মাম্মাম বলেতে(বলেছে)তোমাল(তোমার) সাতে আল(আর) কথা বলতে না 
– কেন 
– জানি না 
.
কথার ছলে তাওহীদ তাহুরার মাথা থেকে একটা চুল কেটে নেয় । 
.
– তুমি আমাল(আমার) তুল(চুল) কেন ধরেতো(ধরেছো)
– তোমার চুলে ময়লা ছিল সোনা 
– ওও আত্তা(আচ্ছা) তা তা (টা টা) তলে(চলে) তাই(যাই)
– আচ্ছা বাই বাই 
.
তাওহীদ বড় দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায় । সে যেই কাজ টা করতে যাচ্ছে তা কি আদৌ ঠিক হবে ? আবার পরক্ষণেই ভাবে সন্দেহ দূর করতে তো দোষ নেই । তাই সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটালে সেম্পল গুলো জমা দেয় । তাহুরা আর তার সেম্পল গুলো সেখানে জমা দিয়ে সে গভীর টেনশনে আছে । DNA এর রেজাল্ট আসতে আসতেও এক সপ্তাহ লাগবে । এই এক সপ্তাহ যে সে কিভাবে কাটিয়েছে সে নিজেই জানে । 
আর অন্যদিকে তনু তাহুরাকে নিয়ে রংপুর যাওয়ার ব্যবস্থা করতে থাকে । তনু এখানে থাকবে না , কারন তনু বুঝে গেছে তাহুরা আর তার এখানে থাকা একদম ঠিক হবে না । এখানে তাওহীদ যতদিন আছে তনুর থাকা হবে না । সে চায় না আর কোন ঝামেলায় পড়ুক । কিংবা সে আর তাওহীদের সামনে পড়ুক । 
.
এক সপ্তাহ পর , 
.
তাওহীদের হাতে DNA রিপোর্ট । রিপোর্ট টা হাতে নিয়ে হসপিটালের করিডোরে বসে আছে তাওহীদ । খাম টা খুলার অপেক্ষায় । তাওহীদ খাম টা খুলে । রিপোর্ট দেখে তাওহীদের চোখের পানি গুলো চিক চিক করে । 
হ্যাঁ তাহুরা তার সন্তান । তাওহীদ আর তনুর কাটানো সেই কয়েক রাতের ফসল হচ্ছে তাহুরা । আর এক মুহূর্ত ও দেরি করে নি তাওহীদ । সোজা বেরিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে বাসায় চলে আসে । দরজা আটকে রিপোর্ট টা বুকে জড়িয়ে ফ্লোরে বসে অনেক্ষণ কাদে তাওহীদ । নিজের উপরে অনেক ঘিন লাগছে তার । তার নিজের ঔরসজাত হচ্ছে তাহুরা । আর সে নিজের সন্তান কে সেইদিন অবৈধ বলে গালি দিয়েছে । এই কষ্ট সে চিৎকার করতে থাকে । 
.
– তাহুরা আমার সন্তান । আমার মেয়ে , আমার পরী সে , আমার ছোট্ট পরী । আমার কলিজা । আমি আমার সন্তানকে নিয়ে আসবো আমার কাছে । নিয়ে আসবো আমার পরীকে । 
.
তাওহীদ মেয়েকে কাছে পাওয়ার জন্য উতলা হয়ে ওঠে । তার মেয়েকে তার চাই , তার পরীকে তার চাই । 
আর ওইদিকে তনু তাহুরাকে নিয়ে কাল রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে 

পরদিন সকাল সকাল তাওহীদ বাসা থেকে বেরিয়ে যায় । গন্তব্য তনুর বাসা , সেখানেই তো তার মেয়ে আছে । সে আর এক মিনিটও সময় নষ্ট করে নি । গাড়ি নিয়ে ছুটে চলে তনুর বাসার দিকে ।
অন্য দিকে তনু বাসায় সবার থেকে বিদায় নিচ্ছে । রুমেল গিয়ে দিয়ে আসবে তনু আর তাহুরাকে । তাহুরাও মুখ ভার করে আছে । সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে তার জন্যে । 
.
– না গেলে কি হয় না ? 
– কয়েকটা দিন গিয়ে থেকে আসি মা 
– তাহুরা টাও মন খারাপ করে আছে আপু
– ও ঠিক হয়ে যাবে রাত্রি , এখানে থাকলে ও আরো অসুস্থ হয়ে যাবে
– হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক 
– আচ্ছা আসি মা 
– আচ্ছা আয় , সাবধানে থাকিস 
– আচ্ছা 
.
তনু তাহুরাকে কোলে নিয়ে রেডি এখনই বাসা থেকে বের হবে । আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাওহীদ এসে সেখানে উপস্থিত ।
.

তাওহীদকে দেখে হতবাক হয়ে যায় সবাই । তনুর মা হয়ে থাকে , আজ থেকে ৫ বছর আগে একেই জামাই হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল । আর আজ ৫ বছর পর আবার ওনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে । 
.
– কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ওকে ? 
– এ আমার সন্তান , আমি একে যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারি 
– না পারো না , এ আমার সন্তান 
– কিহ , কি বললেন , এ আপনার সন্তান ? 
– হ্যাঁ , আমার বাচ্চা , তুমি ওকে নিয়ে কোথাও যেতে পারবে না 
– এক্সকিউজ মি , তাহুরা শুধু আমার সন্তান আর কারো না
– shut up , just shut up , আমার মেয়ে আমায় দাও 
– কিহহহহহহহ
– আমার বাচ্চা আমায় দাও , তুমি যে খারাপ আমি জানি কিন্তু এতটা নিচ জানতাম না , একজন সন্তানকে তার বাবার কাছ থেকে আলাদা রেখেছো এত বছর , আর এখন চোরের মত পালিয়ে যাচ্ছো আমার মেয়েকে নিয়ে how dare you আমার বাচ্চা আমায় দাও 
– খবরদার , হাত টা ওইখানেই রাখুন , আমার মেয়ের দিকে হাতটা আসবে তো হাতটা কাধ থেকে কেটে ফেলে দিব 
.
তনুর এই কথা শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে যায় । এটা কি বললো তনু তাও তাওহীদকে । তাওহীদের বিস্ময়ের শেষ নেই৷ তনুর দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে 
সে । 
.
– তোমার সাহস হয় কিভাবে তুমি আমায় এইসব বলো
– কেন ? বলতে ক্ষতি কোথায় ? আপনি কোন সাহসে আমার সন্তানের দিকে হাত বাড়িয়েছেন 
– ও আমারও সন্তান
– নাহ , ও শুধু আমার একার সন্তান ওর উপরে শুধু আমার অধিকার 
– ওর উপর আমারও অধিকার আছে
– কিহহহ , কিসের অধিকার ? কেমন অধিকার ? কোন অধিকার ? এত বছর কোথায় ছিল এ অধিকার ? 
.
তনুর কথায় অনেকটা সাহস পায় রুমেল । রুমেল আর সহ্য করতে না পেরে তাওহীদের কলার ধরে ফেলে । পরস্থিতি অন্যদিকে অন্যদিকে মোড় নেয় । 
.
– অনেক তো হলো , আর কত ? এইবার চুপচাপ এইখান থেকে কেটে পড়ো 
– how dare you ? তোমার সাহস হয় কিভাবে , তুমি আমার কলার ধরো ? 
– সাহস লাগবে না , চুপচাপ বেরিয়ে যাও এখান থেকে
– আহহহহ রুমেল কি শুরু করলি , ছাড় , ছাড় বলছি 
– নাহ মা অনেক ছেড়েছি আর না
– রুমেল ছাড়ো বলছি
.
রাত্রি গিয়ে রুমেলকে ছাড়িয়ে আনে । 
.
– তনুশা আমার মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামের বাহিরে পা রেখে দেখাও শুধু , আইনের দরজায় যেতে আমার মাত্র ২ মিনিট সময় লাগবে
.
এই বলে তাওহীদ পিছনে ঘুরে চলে যেতে ধরে আর ঠিক তখনই , 
.
– পাপাই……………….. 
.
ডাক টা শুনে থমকে যায় তাওহীদের পা জোড়া । পা জোড়া সামনের দিকে আর এগুচ্ছে না । পিছনে ফিরে করুণ নজরে তাকিয়ে আছে তাওহীদ তনুর দিকে । 
.
– মাম্মা এই তি(কি) আমাল(আমার) পাপাই ? 
-……………..
– মাম্মাম ও মাম্মাম , বলো না এই তি(কি) আমাল(আমার) পাপাই ? 
.

 মাম্মা এই তি(কি) আমাল(আমার) পাপাই ? 
-……………..
– মাম্মাম ও মাম্মাম , বলো না এই তি(কি) আমাল(আমার) পাপাই ? 
.
তাহুরার কথায় তাওহীদ পিছনে তাকিয়ে থাকে । চোখের পানি গুলো চিক চিক করছে তার । টলটলে পানি গুলো আরেকটু হলে পড়ে যাবে গাল বেয়ে পড়ে যাবে । 
তনু দেখছে তাওহীদকে । একজন বাবা তার সামনে আজ দাঁড়ানো । তার সন্তানের বাবা দাঁড়ানো আজ তার সামনে দাঁড়ানো । 
অন্যদিকে মেয়ের প্রশ্ন , দুয়ে মিলে সংকটাপন্ন মুহুর্তে ঝুলছে তনু । 
.
– মাম্মাম ও মাম্মাম এতাই(এটাই) আমাল(আমার) পাপাই ? 
– তাহুরা পাখি 
.
তাওহীদের মুখ থেকে তাহুরা পাখি নাম টা শুনে তনুর চোখের পানি দ্রুত বেয়ে পড়ছে 
.
– ও মাম্মাম , মাম্মাম গো 
– জ্বি মাম্মাম পাখি
– এতাই আমাল পাপাই
– হ্যাঁ মাম্মাম পাখি এটাই তোমার পাপাই
– তুমি এই পাপাইয়ের কথা বলতে তব(সব) তময়(সময়) 
– হ্যাঁ মাম্মাম পাখি এটাই তোমার পাপাই যার কথা তোমাকে বলতাম 
.
তনুর কথা শুনে তাহুরা এক গাল হেসে দেয় , 
.
– পাপাই , পাপাই , মাম্মাম আমায় নামাও পাপাইয়ের কোলে যাবো 
– তাহুরা পাখি 
বলে দুইহাত সামনে বাড়িয়ে দেয় তাওহীদ । যা দেখে তনু অবাক , সাথে বাকিরাও । 
তাহুরা কোলের মধ্যেই মোড়ামুড়ি শুরু করে দিয়েছে । সে তার পাপাইয়ের কোলে যাবে । তাহুরাকে আটকে রাখা যাচ্ছে না ।
তনু আস্তে করে হাতের বাধন টা খুলে দেয় 
তাহুরা ছোট্ট পায়ে এক দৌড়ে তার পাপাইয়ের কোলে চড়ে যায় । তাহুরাকে কোলে নিয়ে নিচে ফ্লোরে বসে পড়ে তাওহীদ । কেদে দেয় মেয়েকে জড়িয়ে ধরে । মেয়ের মুখে পাপাই ডাক শুনে তাওহীদের ৫ বছরের নিষ্প্রাণ কলিজায় যেন প্রাণ ফিরে আসে । তার যে একটা মেয়েও আছে সে এতদিন জানতো না । 
.
– পাপাইয়ের সাথে যাবা মাম্মাম ? 
– তাবো(যাবো) পাপাই 
– সত্যি যাবা ? 
– হুম তলো(চলো)
– চলো 
– দালাও(দাড়াও) মাম্মাম আমি তাই(যাই) পাপাইয়ের সাথে ? আবাল(আবার) তন্দায়(সন্ধ্যায়) তলে(চলে) আতবো(আসবো)
-……………….
– ও মাম্মাম তাই(যাই)
.
তাওহীদ তনুর উত্তরের অপেক্ষায় আছে । তাহুরার বার বার বলায় তনু শেষে উত্তর টা দিয়েই দেয়
.
– তুমি যেতে চাও ? 
– হুম এত্তু(এট্টু) তাবো(যাবো) 
– আচ্ছা যাও 
– তকে(ওকে) মাম্মাম 
.

তাওহীদ তাহুরাকে নিয়ে চলে যায় । আর তনু আস্তে করে এসে সোফায় বসে পড়ে । ওদিকে রুমেল প্রচুর ক্ষেপে আছে তনুর উপরে । 
.
– তুই কোন পরিপ্রেক্ষিতে তাহুরাকে ওর সাথে দিছিস 
– ও তাহুরার বাবা 
– তা এতদিন কই ছিল ওর বাবা 
– এখন আছে 
– রংপুরে যাওয়ার কি হবে 
– ক্যান্সেল করে দে 
– মা তোমার মেয়ে পাগল হয়ে গেছে 
– আহহহহহ রুমেল কি সব বলো
– তুমি চুপ থাকো রাত্রি 
– তুমি থামো , যাও অফিসে যাও 
.
রুমেল রেগে মেগে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় । আর তনু রুমে চলে আসে । আজ তনু মূর্তি হয়ে গেছে । চোখের পানি গুলোও শুকিয়ে গেছে তার 
আর ওদিকে তাওহীদ তাহুরাকে বাসায় নিয়ে আসছে । মোকলেস কে তাহুরার পরিচয় দেয়ায় মোকলেস ভিষণ রকম অবাক হয়ে যায় । কিন্তু পরে আর কিছু বলে নি । চুপচাপই ছিল সে । এদিকে তাওহীদ ঢাকায় কল করে মাহবুব সাহেব রাবেয়া বেগম , মাইশা-সাকিল সবাইকে বলে দেয় তাহুরার কথা । প্রথমে সবাই অবাক । কিন্তু পরে তাওহীদ সব টা বুঝিয়ে দেয় । মাইশা অনেক খুশি তনুকে খুজে পাওয়ার ক্ষেত্রে । রাবেয়া বেগম খুশি তবে নাতিনের জন্যে । ছেলেকে স্ট্রেইট জানিয়ে দিয়েছেন তাহুরাকে নিয়েই যাতে তাওহীদ ঢাকা ফিরে । 
.
তাওহীদ তাহুরাকে কোথায় রাখবে কু করবে ভেবে কুল পাচ্ছে না । তার মেয়ে কবে পৃথিবীতে এলো ? কবে এতো বড় হয়ে গেলো ? সে টের টিও পেলো না । 
তাহুরা অনেক খুশি আজকে তার পাপাইকে পেয়ে । 
.
– মাম্মাম কি খাবে ? 
– আইতিক্রিম(আইসক্রিম)
.
মেয়ের আবদার অনুযায়ী বাসায় আইসক্রিমের মেলা বসিয়ে দেয় তাওহীদ । মেয়ের যেটা পছন্দ সেটাই নিবে । মেয়েকে মাথায় রাখবে না পিঠে রাখবে সে ভেবেই পাচ্ছে না । এতদিন পরে নিজের সন্তানকে পেয়েছে তাওহীদ । আনন্দে সে আত্তহারা । খুশি যেন থামেই না তার । 
অন্যদিকে তনু , রুমের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে । 
পিছন থেকে একটা হাত এসে তনুর কাধকে স্পর্শ করে । হাতের স্পর্শ বলে সে হাত হচ্ছে তনুর মায়ের । মায়ের স্পর্শ সব সন্তানরাই বুঝে ফেলে । 
.
– মা কিছু বলবা ? 
– বুঝলি কি করে আমি আসছি 
– তুমি আমার মা , তোমার স্পর্শ আমি বুঝবো না 
– কিরে মা , তাহুরাকে দিয়ে দিলি কেন ? 
– কি করতাম মা আমি , শত হোক তাওহীদ ওর বাবা , আমি বাবা আর সন্তান কে আর কত আলাদা করতাম 
– তাহলে তোর কি হবে তাওহীদ যদি তাহুরাকে না দেয় 
– দিবে মা , দিবে , আমার মেয়েকে আমাকে দিতেই হবে তার 
– এত সিউর কিভাবে হচ্ছিস কিভাবে 
– তুমি দেখে নিও তাহুরা আসবে 
– আসলেই ভালো 
– হু 
.
অন্যদিকে তাহুরা খেলায় মেতে আছে । মায়ের কাছে যাওয়ার কথা তার মনেই নেই । 

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ৮ টা । তাহুরার খেলার দিকেই মন । ঘড়িতে তাকাচ্ছে বার বার তাওহীদ । মনে মনে ভাবছে তনুকে একটা কল করলে ভালো হতো । কিন্তু নাম্বারই তো নেই । 
অন্যদিকে বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছে তনু । কখন তার মেয়ে টা আসবে । সিড়িটা খালি পড়ে আছে । কলিংবেল টাও বাজছে না । তাহলে কি কলিজার ধন টাও হাত ছাড়া হয়ে গেলো ? 
চোখের কোণ বেয়ে পানি গুলো ঝরে যাচ্ছে । এমন সময় রুমেল এসে সামনের চেয়ার টায় বসে । 
.
– কিরে , মন টা কু ডাকছে তো ? 
– নাহ তেমন কিছু না 
– বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছিস যে
– ও তো এখনো এলো না রুমেল
– তোর কি মনে হয় আসবে আর ? 
– আসবে রে আসবে , ও আমার মেয়ে
– কেন দিতে গেলি ? 
– সকালে মা ও একই প্রশ্ন করেছিল কেন দিলাম , কি করতাম বল ? ওর ও তো জানা দরকার ওর বাবা কে ? আমার মেয়েটা আর যাই হোক পিতৃ পরিচয়হীন ছাড়া বাঁচবে না 
– হঠাৎ এমন বললি ? কিরে কেউ কিছু বলছে নাকি 
– ওর স্কুলে কয়েকজনকে কথা বলতে শুনেছিলাম , তাহুরার বাবাকে তো কখনো দেখি না , ওর কি বাবা আছে আদৌ , 
আমার বাচ্চাটা কেন প্রশ্ন হয়ে থাকবে বলতে পারিস 
– ওদের কাজ নেই খেয়ে দেয়ে কি করবে তাই সমালোচনা নিয়েই ব্যস্ত তারা 
– তাওহীদকে আমি কখনো ক্ষমা করবো না আর না তাওহীদ আমাকে যে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে রাফাত ওকে সে বিষ আর কাটবে না আমি চাইও না কাটুক , কিন্তু আমি প্রথমবারের জন্য তাওহীদের চোখে একজন বাবার মমতা দেখেছি যে তার সন্তানকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল । তাহুরাকে দেখছিস এতটুকু মাম্মাম পাখিটা আমার , আমাকে বলে মাম্মাম এতাই তি আমাল পাপাই ? কি করে বলতাম যে না এ তোমার পাপাই নয় 
– সবই বুঝলাম , কিন্তু এটা কি ভেবেছিস তাওহীদ যদি তাহুরার কাস্টাডি চেয়ে আপিল করে , তখন কি করবি 
– রায় আমার কাছেই আসবে নয়তো দুজনকে এক হতে হবে । আপাতত তা নিয়ে ভাবছি না , ভাবছি আমার মাম্মাম পাখি টা যাতে কারো কাছে প্রশ্ন হয়ে না থাকে কিংবা ওর জন্মটা যাতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে না থাকে 
– আচ্ছা কাদিস না 
– এখনো আসছে না কেন , বুঝতেছ না 
– হয়তো আসবে না 
– মেয়েটা রাতে কাদবে রে 
.
এমন সময় কলিংবেল টা বেজে ওঠে । তনু দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে । দেখে খেলনা হাতে তাহুরা দাঁড়িয়ে আছে আর পাশে তাওহীদ । মেয়েকে জড়িয়ে ধরে তনু 
হাজারো চুমু একে দেয় মেয়ের গালে নাকে মুখে । তাওহীদ তনুর দিকে তাকিয়ে আছে । তনুকে দেখতে বড্ড ক্লান্তু লাগছে । চোখের চারপাশ টা কালো হয়ে গেছে । বরাবরের মতো আজও সাদা কাপড় পড়ে আছে সে । 
.
– মাম্মা আমি তলে(চলে) আসতি(আসছি)
– মাম্মাম পাখি , মাম্মাম তোমাকে অনেক মিস করেছে 
– আমি কলি(করি) নি , পাপাই ছিল সাতে
– খেয়েছো মাম্মাম পাখি 
– হ্যাঁ মাম্মাম , পাপাই আতো(আসো) ভেতলে(ভেতরে) আতো(আসো)
– নাহ আম্মুন , আরেকদিন যাবো তুমি যাও রুমে যাও আম্মুন আমি তোমার মাম্মামের সাথে একটু কথা বলবো 
– আত্তা(আচ্ছা) , ওহহহহহ পাপাই কাল আমাল(আমার) স্তুলে(স্কুলে) যাবা 
– কেন আম্মুন 
– কাল তবার(সবার) মাম্মাম পাপাই আসবে আজকে মিস বলেতে(বলেছে)
আমাল(আমার) তো মাম্মাম আছে পাপাইও আছে দুজনেই যাবে 
– আচ্ছা কাল আমিও যাবো আম্মুন , এখন তুমি রুমে যাও 
– লাপ্পিউ পাপাই 
– লাভ ইউ টু আম্মুন
.
তাহুরা পুতুল নিয়ে খেলা করতে করতে ভেতরে চলে যায় । তনুও ভেতরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় , আর তখনি 
.
– শুনো
.
তনু থেমে যায় , 
.
– আমি তাহুরার সাথে রোজ দেখা করতে চাই 
– ও আপনার সন্তান , আপনার রক্ত বইছে ওর মাঝে , দেখা করবেন ওর সাথে , সমস্যা নাই
– ধন্যবাদ , আর আমি ওকে আমার কাছেই রাখতে চাই , এই ৫ বছর আমি ওকে ছাড়া থেকেছি আর না 
– আসছি 
– ওর স্কুলে প্রোগ্রাম কখন কাল 
– ১১ টায় 
– কোন ক্লাসে পড়ে আমার আম্মুন টাহ 
– প্লে তে দিয়েছি এবার 
– ওহ , ওকে 
.
তাওহীদ চলে যায় । তনু কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে । একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে দরজা টা ভেতর থেকে লক করে দেয় তনু ।
.

পরদিন সাড়ে ১০ টায় তাওহীদ তনুর বাসার সামনে এসে গাড়িতে হর্ন দেয় । শব্দ পেয়ে তাহুরা বারান্দায় দৌড়ে চলে যায় । বারান্দা দিয়ে দেখছে তাওহীদের গাড়ি নিচে দাঁড়ানো । তারাতারি করে রুমে এসে বলে 
.
– মাম্মাম , তালাতালি(তারাতারি) কলো(করো) পাপাই চলে আসছে 
– তুমি রেডি হয়ে গেছো তো 
– হুম 
– তাহলে নিচে যাও মাম্মাম আসতেছি
– তকে(ওকে)
.
তাহুরা দৌড়ে নিচে নেমে যায় । 
.
– পাপাই………………. 
.
বলে এক দৌড়ে তাওহীদের কোলে চড়ে যায় । তাওহীদও মেয়েকে পেয়ে অনেক খুশি । খুব সুন্দর করে সেজেছে মাম্মাম পাখি টা । লাল রঙের গাউন টায় বেশ মানিয়েছে ছোট্ট পরীটাকে । তাওহীদ চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছে তার ছোট্ট মেয়েকে
.
– আমার আম্মুন কে আজ অনেক কিউট লাগছে 
– ত্যাংকু
– ইউ আর মোষ্ট ওয়েলকাম বিউটিফুল লেডি
– হি হি হি 
.
মেয়ের খিল খিল শব্দ করে হেসে ওঠায় তাওহীদের কলিজা টা আবার সতেজ হয়ে ওঠে । 
.
– চলো আম্মুন আমরা যাই 
– দালাও(দাড়াও) পাপাই , মাম্মামও তো আতবে(আসবে)
– কই তোমার মাম্মাম 
– ও মাম্মাম , মাম্মাম , পাপাই ওই তো মাম্মাম 
মাম্মাম এত্ত লেত(লেট) কেন করলা 
– সরি পাখি , চলো 
.
তাওহীদ একবার তনুর দিকে তাকিয়েছে , আজও সাদা শাড়ি তবে আজকের শাড়ি টা স্লিক এর মতো । একদম গায়ে লেগে আছে । হাতে এক জোড়া চিকন চুড়ি , ঠোঁটে একদম হালকা লিপস্টিক দেয়া । এক কথায় একদম সিম্পল । 
পরক্ষণেই তনু বুঝে যায় তাহুরা তো তাওহীদের সাথে যাবে , তাহলে সে কি করে যাবে । তাই বুদ্ধি করে তাহুরার কাছে যায় তনু । তাহুরা তখনও তাওহীদের কোলে । মেয়েকে একটু এলিয়ে কাছে এনে কপালে চুমু দেয় তনু , 
.
– মাম্মাম পাখি তুমি পাপাইয়ের সাথে যাও
মাম্মাম রিক্সা নিয়ে আসতেছি 
– তেনো(কেনো) 
– প্লিজ পাখি জেদ করে না , তুমি যাও মাম্মাম রিক্সা করে চলে আসতেছি 
.
মেয়ের মন খারাপ থেকে তাওহীদ তনুকে বলে , 
.
– গাড়িতেই ওঠো , দুজন এইভাবে আলাদা আলাদা গেলে সবাই কি ভাববে 
– তাহুরাকে নিয়ে আগান , আমি স্কুলের একটু পিছনেই নামবো , সমস্যা নেই 
– আমার সমস্যা আছে , গাড়িতে বসো 
– ইয়েএএএএএএএএ আমি আজকে মাম্মাম পাইয়ের সাতে স্তুলে(স্কুলে) যাত্তি(যাচ্ছি)
– ইয়েএএএএ ইয়েস আম্মুন , চলো যাওয়া যাক 
– তলো(চলো)
.
স্কুলে পৌঁছে তারা দুজনেই সুন্দর ভাবে সিচুয়েশন টা সুন্দর করে সামলে নেয় । কেউ বুঝতেও পারে নি তাদের মাঝে এত প্রবলেম । অন্যদিকে তাহুরাও খুশি । তনু সব দিক ভেবেই তাওহীদকে তাহুরার কাছে আসতে দিয়েছে । তাহুরার বাবার খুব প্রয়োজন , বাবার পরিচয়টা খুব প্রয়োজন তার । তাই সব দিক বিবেচনা করে তনুর এই সিদ্ধান্ত । 
.
স্কুলের অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে প্রায় দুপুর হয়ে যায় । এদিকে তাহুরা পাখির ক্ষুধা লেগে গেছে। সে আবার একটু ক্ষুধা সহ্য করতে পারে না । কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিয়েছে ম্যাডাম । 
.
– কি হয়েছে আম্মুন 
– আমার তুধা(ক্ষুধা) লাগছে পাপাই
– কি লাগছে 
– ওর ক্ষুধা লেগেছে , মাম্মাম পাখি আর একটু বাসায় গিয়ে খাবো কেমন ? 
– না মাম্মাম আমি এখনি খাবো
– কিন্তু………… 
– কোন কিন্তু নয় , আমার আম্মুন এখনি লাঞ্চ করবে , ওকে আম্মুন 
– তকে(ওকে) পাপাই , লাপ্পিউ পাপাই
– লাভ ইউ টু আম্মুন 
.
প্রায় ১০ মিনিট পর তারা একটা রেস্টুরেন্টের সামনে নামে । তাহুরাকে কোলে নিয়ে তাওহীদ রেস্টুরেন্টে যায় । 
তাহুরার প্রতি এতো ভালোবাসা , এতো আদর-মমতা সব কিছুই চোখে পড়ে তনুর । একজন ভালো স্বামী সে কখনোই ছিল না তনুর চোখে কিন্তু একজন পরিপূর্ণ আর দ্বায়িত্ববান বাবা হতে পেরেছে তাওহীদ তনুর কাছে । তনু চায় তাহুরা সব দিক পরিপূর্ণ ভাবে পাক । আর তার জন্য তার বাবাকেও প্রয়োজন । হয়তো তাওহীদের সাথে দেখা না হলে তাহুরাকে সারাজীবন বাবা বিহীন কাটাতে হতো । কিন্তু হয়তো আল্লাহ চেয়েছেন একটু অন্যরকম হোক । তাই এই চট্টগ্রামে তাওহীদকেই পাঠিয়ে দিয়েছেন । 
কথা গুলো বসে বসে ভাবছে তনু । নিজের শরীর টাও আজকাল চলে না তার । বুকের উপরের দিক টায় প্রায় রাতেই ব্যাথা করে ওঠে । শরীরের ক্লান্তি টাও দিন দিন বেড়েই চলেছে তার । সামনে বসা তাওহীদ আর তাহুরার দুষ্টুমি দেখছে সে । তার মেয়েটা অনেকদিন পর তার বাবাকে পেয়ে কত খুশি । 
.
– মাম্মাম , ও মাম্মাম 
– হ,,,হ,,,,হ্যাঁ মাম্মাম পাখি বলো 
– খাইয়ে তাও(দাও)
– মাম্মাম পাখি , কতবার না তোমাকে বলি কথা গুলো স্পষ্ট করো , কবে করবে মাম্মাম পাখি ? 
– হি হি হি 
– হি হি করে না মাম্মাম পাখি , 
– পাপাই তলো(চলো) আমলা(আমরা) আজতে(আজকে) ঘুত্তে(ঘুরতে) তাই(যাই)
– কোথায় ঘুরতে যাবে আম্মুন 
– তলো(চলো) তেভাল তাই
– কিহহহহহ , 
– মাম্মাম পাখি তেভাল না নেভাল হবে 
– মাম্মাম তুমি পতা(পঁচা) খালি ভুল ধলো(ধরো)
– তুমি ভুল বলো কেন ? 
– ধুল 
– ধুর 
– মাম্মাম 
– মাম্মাম পাখিইই 
.
খিল খিল করে তাহুরা হেসে দেয় । তাওহীদ তনুর দিকে তাকিয়ে আছে । কেন জানি তনুকে অসুস্থ অসুস্থ লাগছে তার কাছে । কিন্তু ওইযে ইগো , ইগোটাই বড় সমস্যা । আর তনু যা করছে তার সাথে সে তা জীবনেও ভুলবে না । তাই তার এতো ইগো । 
দুপুরে লাঞ্চ সেড়ে বিকেলে ঘুরে তাহুরাকে অনেক কিছু কিনে দিয়ে বাসার সামনে ড্রপ করে দেয় তাওহীদ । এখন তাহুরার বায়না তার পাপাইকেও রাতে থাকতে হবে তার সাথে । সে তার পাপাই-মাম্মামের সাথে ঘুমাতে চায় । তনু কি করবে বুঝতেছে না অন্যদিকে তাওহীদও বুঝতেছে না কি করবে ? 
.
– না না পাপাই তলো তুমি তলো আমাল কাতে ঘুমাবা তলো 
– না আম্মুন আরেকদিন যাবো 
– না না তলো এখুনি তলো 
– আম্মুন জিদ করে না , আরেকদিন যাবো 
– না না 
– মাম্মাম পাখি , শুনো 
– বলো
– পাপাইয়ের সাথে তুমি থাকতে চাও? 
– হুম 
– আচ্ছা তাহলে পাপাইয়ের সাথে চলে যাও কাল তো স্কুল অফ , সকালে চলে এসো
– না না আমাল তোমাকেও লাগবে , পাপাই আতো আমাল সাতে আতো
.
প্রায় কয়েক্ষন যাবত জোড়াজুড়ি করার পর তনু দেখছে তাহুরাকে সামলানো যাচ্ছে না । অগত্যা তনু তাওহীদকে বলেই ফেলে , 
.
– কোন অসুবিধা না হলে আজ রাত টা এখানে থেকে যান , ওর ভালো লাগবে 
– কিন্তু
– তিন্তু না তলো পাপাই তলো 
.
মেয়ের জেদের কাছে হার মানতেই হয় ওদের দুজনকে । গাড়ি পার্ক করে তাওহীদও তনু আর তাহুরার সাথে উপরে উঠে যায় । কলিংবেল বাজলে তনুর মা গিয়ে দরজা খুলে দেয় । তাওহীদকে দেখে ভূত দেখার মতো অনেকটা চমকে যায় সুরিয়া বেগম । 
.
– নানুমনি দেকো পাপাই আত্তে , আমাল সাতে তাকবে
– ভেতরে আয় তোরা 
.
বাসা পুরো খালি । রুমেল-রাত্রি নেই , তনয়াও নেই , রুবেলের তো নাইট শিফট তাই অফিসে আছে । 
.
– মা 
– ওরা কই 
– রাত্রি আজকে ওর বাবার বাসায় গেছে সাথে তনয়াও গেছে আর রুমেল অফিস করে ওইখানেই থাকবে 
– ওহ 
.
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তনু । ভালোই হয়েছে কেউ নেই বাসায় , না হয় তাওহীদকে দেখে কার কেমন রিয়েকশন হতো কে জানে ? ভালোই হলো কেউ নেই 
.
– পাপাই তলো আমাদের রুমে তলো
– চলো
.
অনেক অস্বস্তি হচ্ছে তাওহীদের । কেমন কেমন জানি লাগছে । কিন্তু কিছুই করার নেই । কিছুক্ষন পর তনু এক সেট পাজামা-পাঞ্জাবি নিয়ে আসে । রাতে পড়তে হবে তো , তাই ব্যবস্থা করা আরকি
.
– এটা পড়তে পারেন , ফরমালে তো আর সারারাত থাকা যাবে না 
– হুম 
– তাও তাও পাপাই তেঞ্চ কলে আতো
– ওকে পাকনি বুড়ি 
.
রাতের জন্য কি খাবার রাখা আছে সেইগুলো ও দেখতে হবে তনুকে । রান্না ঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করছে তনু । 
.
– মা 
– হু
– কি রান্না করেছিলে আজকে , কি আছে আজকের রাতের জন্যে
– মাংস ভিজিয়েছি , ভাত বসাবো , আর দুপুরের বেগুনের তরকারি আছে
– উহু মা উনি তো এইসব খায় না , আচ্ছা সরো , আমি মাংস আর ভুনা খিচুড়ি করে দেই 
– তুই রান্না করবি
– কেন মা , মনে হয় করি না , আর আজ তাহুরার বাবা আসছে আমার বর না 
– ওহ 
– যাও তুমি একটু বিশ্রাম করো
– নাহ ঠিক আছি , দে পেয়াজ , মরিচ কুটে দেই 
– দিবা ? 
– হু দে
– তাহলে দাও 
.
অন্যদিকে তাওহীদ ওয়াশরুমে এসে ফ্রেশ হয়ে পাঞ্জাবি টা গায়ে জড়ায় । পাঞ্জাবিটা খুব চেনা চেনা লাগছে তার । হ্যাঁ মনে পড়েছে পাঞ্জাবিটা তাওহীদের । এইতো সেই পাঞ্জাবিটা যেটা ৫ বছর আগে বিয়ের পরদিন যখন তনুর বাড়িতে এক রাত ছিল তখন পড়েছিল । বুকের সাইডে সেম ফুলটা ছিল । হ্যাঁ সেই পাঞ্জাবিটাই তো এটা তার মানে এতো বছর ধরে এটা তনু আগলে রেখেছে । কিন্তু কেন ? 
প্রশ্নটা খচ খচ করছে তাওহীদের মনে । ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে ছোট্ট তাহুরা নিজের ড্রেস নিয়ে নাড়াচাড়া করছে । 
.
– কি করে আম্মুন টা 
– পাপাই দেকো না এতা খুলতে পালি না
– আসো পাপাই খুলে দেই 
– নাহ , আমাল লজ্জা কলে 
– হা হা হা ওরে বুড়ি রে 
– তাও ওই তয়ারের(ড্রয়ারের) কাতে তাও খুলো আর আমাল নাইত(নাইট) ত্রেস(ড্রেস) তা নিয়ে আতো
– যো আজ্ঞা রাজকুমারী 
.
কাবার্ডের দরজা খুলে মেয়ের নাইট ড্রেস টা খুজছে তাওহীদ । কিন্তু চোখ পড়লো তনুর ড্রেসের সাইডে । ভিষণ অবাক হয়েছে তাওহীদ ড্রেস গুলো দেখে । সব গুলো ড্রেস সাদা রঙের । সাদা শাড়ি , সাদা কাপড় , সাদা সালোয়ার কামিজ , সাদা স্কার্ট , সাদা টপস , সাদা ওড়না সব কিছুই সাদা । কাবার্ড জুড়ে যদি রঙিন কিছু থাকে তা হচ্ছে তাহুরার ড্রেস গুলো আর তনুর সব কিছুই সাদা । দৃষ্টির আড়ালে থেকে সাদা রঙ টা বড়ই উজ্জ্বল লাগে । 
নাইট ড্রেস এনে মেয়েকে পড়িয়ে দেয় তাওহীদ । এখন খাওয়ার পালা । 
তনু এসে ডেকে নিয়ে যায় ওদের । তাওহীদ প্রথমে খেতে চায় নি পরে মেয়ের জোড়াজুড়িতে খেতে যায় । টেবিল সাজিয়ে দিয়েছে তনু । ক্লান্ত শরীর টা আরো ক্লান্তু লাগছে তার । চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ । তাওহীদ বুঝতে পেরেছে যে কিছুক্ষন আগেই রান্না করা হয়েছে । 
.
– মাম্মাম পাখি তোমাকে মাম্মাম খাইয়ে দেই ? 
– তাও 
– আচ্ছা 
.
প্লেটে খাবার দেয় তনু । একটু অবাক হয় তাওহীদ । সেই ভুনা খিচুড়ি । আজও ভুনা খিচুড়ি করেছে তনু সাথে ডিম ভাজা মাছ ভুনা আর মাংস ভুনা । খাবারের টেবিলের আশেপাশে তনুর মাকে না দেখতে পেয়ে তাওহীদ বলে 
.
– আন্টি আংকেল খাবেন না ? 
– মা রাতে রুটি খান , ডায়াবেটিস হয়ে গেছে তাই খেয়ে শুয়ে গেছে 
– ওহ আর আংকেল 
– বাবা আজ প্রায় সাড়ে ৪ বছর হলো মারা গেছেন 
.
কথাটা শুনে প্লেটের মধ্যেই হাতটা থেমে যায় তাওহীদের । কথাটা শুনে খুব খারাপ লেগেছে তাওহীদের । কারন সে অন্তত দেখেছে তনু অনেক এটাচড ছিল তার বাবার সাথে । মন রক্ষার্থে অল্প কিছু খেয়ে নিয়েছে তাওহীদ । তনু বরাবরই রান্না টা ভালো করে । আজও বিপরীত কিছু হয় নি । তাহুরাকে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে রুমে পাঠিয়ে দেয় তনু । তাওহীদও রুমে চলে যায় । কিছুক্ষন পর দরজার পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে ডাইনিং রুমের টেবিল টাতে । তনু একা একা বসে খাচ্ছে । প্লেটের দিকে নজর দেয় তাওহীদ । অল্প কয়েটা খিচুড়ি নিয়েছে প্লেটে , খালি খিচুড়ি কয়টা মুখে ভরে দিয়ে পানি দিয়ে গিলছে তনু , না নিলো মাছ না নিলো মাংস । এমন করে তিন লোকমা খেয়ে বাকি খিচুড়ি গুলো এটো করে ফেলে দিল । তারাতারি তাওহীদ দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে খাটে চলে যায় । তাহুরা তখন তার বাবার মোবাইলে টেম্পল রান খেলতে ব্যস্ত । 
.
– আম্মুন টা কি করে
– আম্মুন তা গেম তেলে
– ওহ আচ্ছা তাই 
– পাপাই আমাতে একতা ত্যাব কিনে দিবা ? 
– আচ্ছা কিনে দিবো কিন্তু তুমি তো এখনও ছোটো আছো আম্মুন ট্যাব দিয়ে কি করবে 
– কিত্তু কলবো না তুধু গেম তেলবো
– আচ্ছা 
.
এমন সময় তনু রুমে আসে । হাটতে হাটতেই তাহুরাকে বলতেছে
.
– মাম্মাম পাখি ঘুমিয়ে পড়ো 
– তুমিও আতো 
– মাম্মাম আজ তোমার মনির রুমে ঘুমাবো তুমি আর পাপাই ঘুমিয়ে পড়ো 
– না না তুমিও আতো 
– মাম্মাম পাখি আজকে কিন্তু বড্ড বেশি বায়না করতেছো 
.
মায়ের ধমক খেয়ে ছোট্ট তাহুরা কেদে দেয় । এটা যে তার ঢং এর কান্না তা খুব ভালো করেই জনে তনু । 
.
– আচ্ছা হয়েছে হয়েছে মাম্মাম পাখি নামের এক বুড়ির কাদতে হবে না এখন 
– তুমি আতবা কি না 
– ফ্রেশ হয়ে আসি , তুমি চোখ বন্ধ করো 
– তকে
.
তনু ফ্রেশ হয়ে এসে তাহুরার পাশে এসে শুয়ে পড়ে । 
আজ ৫ বছর পর আবার তনু তাওহীদ এক খাটে । শুধু ব্যবধান মাঝে আছে তাদের দুজনের কোন এক সময়ে কাটানো একান্ত কিছু মুহুর্তের ফসল তাহুরা । সময় টা বড্ড স্বার্থপর সে শুধু নিজের তাগিদেই ছুটে এ চলে । 
.
মাঝরাতে হঠাৎ বুকের মধ্যে থাকা ব্যাথাট চিন চিন করে জানান দিচ্ছে তনুকে । দুপাশ থেকে কেমন জানি চাপা ব্যাথাটা ক্রমশ বেড়ে উঠছে তনুর । ঘুমটা ভেঙে যায় তনুর । আস্তে করে উঠে গিয়ে ডাইনিং রুমে চলে যায় তনু । কিছুক্ষণ সেখানে বসে সময় কাটায় তনু । ওষুধ খেয়ে আবার এসে শুয়ে পড়ে তনু । 
এইসব কিছু কেউ একজন দেখছিল আর সে হচ্ছে তাওহীদ । মনে তার অনেক প্রশ্ন । তনু এমন হয়ে গেল কেন ? তার কি সমস্যা ? আর রাফাতের সাথের সম্পর্কটা তা কি ছিল ? প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তাওহীদ । 
.
পরদিন তাহুরাকে ঘুমে রেখেই চলে যায় তাওহীদ । অফিসে প্রচুর কাজ থাকায় বেরিয়ে যায় তাওহীদ । আর এদিকে তাহুরা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে দেয় । তার পাপাইকে চাই এক্ষুনি চাই । 
তনু বুদ্ধি করে তাওহীদের নাম্বারটা নিয়ে নেয় । তখন সেই নাম্বারে কোন দিয়ে তাহুরাকে দিয়ে দেয় তনু । 
তনুর ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ফোন টা রিসিভ করে তাওহীদ । 
.
– হ্যালো 
– হ্যালো পাপাইইইইইইই
– কি হয়েছে আনার আম্মুনের , আমার আম্মুন কাদছে কেন ? 
– তুমি আমায় ফেলে তলে গেতো কেন 
– কে বলেছে আম্মুন , পাপাই তো অফিসে আছি 
– তুমি তালাতালি তলে আতো তো পাপাই 
– আচ্ছা আম্মুনটা 
.
সময় গুলো ভালোই কেটেছেভেই কয়েকটা দিন । তাওহীদের এদিকের কাজ তেমন শেষ । এইবার ঢাকায় ফেরার পালা । তাওহীদ তো তাহুরাকে ছেড়ে কখনোই ঢাকা যাবে না । গেলে তার মেয়েকে নিয়ে যাবে সে । 
কিন্তু তাওহীদের মনে প্রশ্ন , তাহুরা তো তার মাকে ছেড়ে ঢাকা যাবে না । আবার তাওহীদকেও ঢাকা যেতে যাবে না । 
তাহুরা একদিকে যেমন তার মাকে চায় অন্যদিকে সে তার বাবাকেও চায় । 
এই ব্যাপারে তাওহীদ বসতে চায় তনুর সাথে । যেই ভাবা সেই কাজ । 
তাওহীদ তনুর সাথে দেখা করে তাও বাসায় নয় কোন এক রেস্টুরেন্টে । 
.
– জ্বি বলেন কি বলবেন 
– আমি কাল ঢাকা চলে যাচ্ছি 
– ওহ
– এখন আমি তো তাহুরাকে ছেড়ে যাবো না
– মানে 
– আমি ওকে আমার সাথে করে নিয়ে যেতে চাই 
– কোথায় ? 
– কোথায় মানে , ঢাকায় 
.
তাহলে কি তনুর অনুমানটাই ঠিক ছিল ? তাওহীদ তাহুরাকে নিয়ে যেতে চায় নিজের সাথে । তাহলে তনু , ও বাঁচবে কাকে নিয়ে ? 
.

 

এইবার ঢাকায় ফেরার পালা তাওহীদের । তাওহীদ তো তাহুরাকে ছেড়ে কখনোই ঢাকা যাবে না । গেলে তার মেয়েকে নিয়ে যাবে সে । 
কিন্তু তাওহীদের মনে প্রশ্ন , তাহুরা তো তার মাকে ছেড়ে ঢাকা যাবে না । আবার তাওহীদকেও ঢাকা যেতে যাবে না । 
তাহুরা একদিকে যেমন তার মাকে চায় অন্যদিকে সে তার বাবাকেও চায় । 
এই ব্যাপারে তাওহীদ বসতে চায় তনুর সাথে । যেই ভাবা সেই কাজ । 
তাওহীদ তনুর সাথে দেখা করে তাও বাসায় নয় কোন এক রেস্টুরেন্টে । 
.
– জ্বি বলেন কি বলবেন 
– আমি কাল ঢাকা চলে যাচ্ছি 
– ওহ
– এখন আমি তো তাহুরাকে ছেড়ে যাবো না
– মানে 
– আমি ওকে আমার সাথে করে নিয়ে যেতে চাই 
– কোথায় ? 
– কোথায় মানে , ঢাকায় 
– তাহুরা কি যাবে ? 
– জানি যাবে না , তাই তো এখানে আসা 
– আমায় কি কিছু করতে হবে ? 
– তাহুরা তার মাকেও চায় সাথে বাবাকেও
আর আমি কোন মতেই তাহুরাকে এইবার ছাড়তে পারবো না 
– তো 
– তো , তাহুরাকে আমি ঢাকা নিয়ে যাবো সাথে তোমাকেও যেতে হবে
– আমি গিয়ে কি করবো ? আপনি চাইলে তাহুরাকে নিয়ে যেতে পারেন
– হা হা হা , মিস তনুশা তুমি বরাবরই পাক্কা খেলোয়াড় , তুমি খুব ভালো করেই জানো যে তাহুরা যাবে না তাই গা-ছাড়া কথা বলছো
– আপনার কি তাই মনে হয় ? 
– দেখো তর্কে যেতে চাচ্ছি না আমি চাই তাহুর আমার কাছে থাকুক আর তাহুরার থাকা টা ডিপেন্ড করছে তোমার উপরে । আমার দুর্বল পয়েন্টই হচ্ছে তাহুরা , সো আমার দুর্বল জায়গা নিয়ে একবার তো বিশ্বাসঘাতকতা করেই ফেলেছো আর একবার করতে যেও না 
– কবে যেতে চাচ্ছেন ? 
– কালকেই 
– ঠিক আছে 
– তুমি যাচ্ছো তো ? 
– হ্যাঁ , তবে আপনার পরিবার ? 
– তা আমি ম্যানেজ করে নিব 
– আসছি 
.
তনু বের হয়ে গেছে রেস্টুরেন্ট থেকে । এতক্ষন তাওহীদের অভিযোগ গুলো শুনছিল তনু । কিন্তু কাল রাতে সব ভেবে নিয়েছে তনু । সব তার ভাবনা মতোই চলছে । এখন শুধু সব সেট-আপ দেয়ার পালা তনুর । 
আজ সে বড্ড বেশি ক্লান্তু । জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে আজ বড্ড বেশি ক্লান্তু হয়ে গেছে । 
.
বাসায় এসে সব কিছু ম্যানেজ করে নেয় তনু । তনু বরাবরই চটপটের । সব কিছু নিমিষেই ব্যাক-আপ দিতে পারে শুধু নিজের জীবন টাকেই ব্যাক-আপ দিতে পারলো না । তাহুরাকে ১ ঘন্টার মাঝে সব শিখিয়ে দিয়েছে তনু । তনুর কাছে সবার ছবি ছিল সবাইকে দেখিয়ে চিনিয়ে দিয়েছে তাহুরাকে । এটা দাদান এটা দিদুন এটা ফুপি আম্মু তাহুরা সবাইকেই চিনে ফেলেছে ১ ঘন্টার মধ্যে । 
রুমেল তনুর এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ । সে কোন মতেই চায় নি যে তাহুরা ঢাকা যাক আর সেখানে তনুও যাচ্ছে । এটা তার সহ্য হচ্ছে না । 
অপরদিকে ভাইয়ের রাগ জেদ সবটা জানে তনু । তনুর ভালোবাসা দিয়ে সে আবার তার ভাইয়ের মন গলাতে পারবে তাও সে জানে তাই আর বেশি বাড়ায় নি কথা । 
.
.
পরদিন তাহুরা আর তনুকে নিয়ে ঢাকা রওনা দেয় তাওহীদ । ৩ ঘন্টা জার্নি করে মাহবুব মেনশনে পা রাখে তাওহীদ সাথে তাহুরা আর তনু । চেনা পরিবেশে আবার পা রাখে তনু , তবে এবার অচেনা হয়ে ঠিক যেমন ৫ বছর আগে ২২ তারিখ রাত ১১ টা ৩০ মিনিটে পা রেখেছিল এই বাড়িতে । 
তাহুরাকে নিয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথে বাড়িতে আনন্দের ধুম পড়ে যায় । মাহবুব সাহেব এবং রাবেয়া বেগমের আনন্দের সীমা নেই । তাহুরাও দাদা দাদি কে পেয়ে লুতুপুতু । তনু তখনও বাহিরে । ভেতরে যাবে কি যাবে না দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে আটকে আছে । তাওহীদ আগেই সবাইকে সব টা জানিয়ে দিয়েছিল । প্রায় ১০ মিনিট পর তনু বাড়িতে ঢোকে । এই সেই বাড়ি যেই বাড়ি থেকে কোন এক অন্ধকার রাতে তাকে বের করে দেয়া হয়েছিল । আর আজ সেখানে ৫ বছর পর আবার আসতে হলো তাকে শুধুমাত্র মেয়ের জন্যে । তনুকে দেখে সবাই অবাক । আগের থেকে অনেকটা বদলে গেছে তনু । চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে । শরীরটাও ভেঙে গেছে অনেকটা । সাদা কাপড় । এসবের মাঝেও তনু অন্যরকম সৌন্দর্য নিয়ে আছে । এখনকার তনুর দিকে দু দন্ড তাকিয়ে থাকলেই আপনা আপনি চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার মতো হয়ে যায় সবার । 
অবাক কর কথা হচ্ছে কেউই কথা বলে নি তনুর সাথে । শুধু রাবেয়া বেগম কাছে গিয়ে দারুন একটা কথা বলেছেন 
.
– ভেবে নিও না মাথায় চড়ে বসবে , আমার একমাত্র নাতিনের জন্য তোমাকে এখানে রাখা , আর কিছুই না , নিজের অবস্থান টা কখনো ভুলবা না
– আপনারা যে স্বার্থপর তা আমার জানা আছে , স্বার্থের জন্য আপনারা অনেকখানি নিচেও নামতে পারেন তাও আমার জানা , তবে এবার আমিও স্বার্থের জন্যেই এসেছি আমার মেয়ের জন্য এসেছি 
– দেখা যাবে , টাকা পয়সার লোভ তো আগের থেকেই ছিল তোমার , তাই তো আমার ছেলে থাকা সত্যেও আরেক বড় লোক ধরে রাখছিলা , তাই না 
– ভুল বললেন , টাকা পয়সার লোভ কখনো ছিল না বরং আপনারা ভুলে যাচ্ছেন আপনারাই আমায় এনেছেন । আপনার ওই মদতি জুয়ারি ছেলেকে ঠিক করার জন্য । আর রইলো কথা সম্পত্তি টাকা পয়সার , আমি থুক ফেলি এমন সম্পত্তি আর টাকা পয়সার উপরে আর থুক ফেলি আপনার ওই ছেলের উপরে 
.
এই কথা বলে তনু উপরে চলে যায় । রাবেয়া বেগম তো পারে না এখনি তনুকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে । 
মাইশাও উপরে যায় । গিয়ে দেখে তনু দক্ষিন পাশের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে । মাইশা বুঝে যায় তনুর দাঁড়িয়ে থাকার কারন । আস্তে করে কয়েকবার ভাবি বলে ডাকে মাইশা কিন্তু জবাব পায় নি তনুর কাছ থেকে । তারপর কিছু একটা মনে করে আপু বলে ডাক দেয় মাইশা । আর তখন তনুর জবাব হয় , 
.
– জ্বি , কিছু বলবে 
.
এইবার আর মাইশার বুঝতে বাকি থাকে না কিছু । সবটা পরিষ্কার তার কাছে । ভাবি ডাকটার সাথে তনুর আর কোন সম্পর্ক নেই তাই বুঝিয়ে দিয়েছে তনু । 
.
– না বলছিলাম কি……………
– আমার থাকার মতো কোন ঘর আছে কি 
– কেন তুমি তো…………… 
– প্লিজ , অন্য কোন কথা বলো না , একটা রুমের ব্যবস্থা করো
– আচ্ছা 
– আর হ্যাঁ , তুমি অনেক কিউট হয়ে গেছো আগের থেকে
– তাই তোমার তাই মনে হয়
– হ্যাঁ , বিয়ে করলে কবে ? 
– এই তো সামনের মাসের ৫ তারিখ দুই বছর হবে
– যাক আলহামদুলিল্লাহ ভালো 
– জিজ্ঞাসা করলে না কার সাথে করলাম
– সাকিল ভাইয়া অনেক ভালো একজন মানুষ , দেখে রেখো ওনাকে 
.
এই বলে তনু সামনের দিকে চলে যায় । টপ টপ করে পড়ে যাওয়া চোখের পানি গুলো মুছে ফেলে মাইশা । 
তাওহীদের রুমের পাশে একটা রুম খালি পড়ে আছে । ওই রুমটা তনুর জন্য ঠিক করে দেয় মাইশা ।
.
দিন আসে রাত যায় আবার রাত আসে দিন যায় , সময় থেমে নেই । তাহুরাকে নিউ স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে । নতুন পরিবেশে এসে নিজেকে ভালোই মানিয়ে নিয়েছে তাহুরা । দাদান দিদুন ফুপি ফুপার চোখের তারা সে এখন । বাবার কলিজা সে এখন । আর মায়ের অন্তর তো সে আগের থেকেই ।
ইদানীং তাওহীদের তনুকে আবার ভালো লাগতে শুরু হয়েছে । তনুর শারীরিক অবস্থা ততটা ভালো না দেখলেই বুঝা যায় কিন্তু বুঝতে দেয় না কাউকে । শুয়ে বসেই থাকে অনেকটা সময় নিয়ে । তাওহীদের কাছে খুব খারাপ লাগে , তনুকে যখনই দেখে তখনই বুকের পাশ টা চিন চিন করে উঠে তাওহীদের । আর আরো বেশি খারাপ লাগে যখন তনুকে সাদা কাপড়ে দেখে তখন । কিন্তু কিছুই বলতে পারে না 
.
একদিন বিকেলে তাওহীদ তাহুরাকে নিয়ে গার্ডেনে খেলছিল ওই সময় তাওহীদের বাবা মাহবুব সাহেব ছেলের পাশে গিয়ে বসেন । 
.
– কিছু বলবে বাবা ? 
– হুম 
– বলো
– সারাটা জীবন কি এইভাবেই থাকবি ? 
– বেশ তো আছি বাবা
– এইভাবে থাকাকে থাকা বলে না 
– ভালো আছি আমি বাবা
– তনুশাকে নিয়ে আবার শুরু কর 
– বাবা…………..
– ওইযে দেখ তোদের অংশ আমার দিদিভাই টা , সে যখন বড় হবে কি জবাব দিবি ? 
– জানি না বাবা 
– ভেবে দেখ কি করবি , আর হ্যাঁ মনে হচ্ছে ৫ বছর আগে একটা পাপ করেছিলাম আমি , প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে করবো জানি না 
আর শুন পারলে তনুকে বলিস সাদা কাপড় পড়া ছেড়ে দিতে 
.
বাবার কথা গুলো মন দিয়ে ভাবে তাওহীদ । সম্পর্কটা কি ঠিক করে নেয়া যায় না ? তাওহীদ কি এই ভাঙা সম্পর্কটা কে ঠিক করতে পারবে ? তনু কি এখন রাজি হবে ? 
সব কিছু বিশ্লেষণ করে তাওহীদ সিদ্ধান্ত নেয় যে সে একবার হলেও তনুর সাথে কথা বলবে । 
.
তাওহীদের এক ক্লাইন্ট আজ বাসায় আসবে । ব্যবসার কাজে ঢাকা আসছে সাথে বউ বাচ্চাও আসছে । তাই তাওহীদের সাথেও দেখা করতে আসে । 
সব রান্না বান্না আজকে তনুই করেছে । রাবেয়া বেগম একটু অসুস্থ , আর মাইশা রান্নার ব্যাপার টা ততটা ভালো বুঝে না তাই তনুকেই সাহায্য করতে হয়েছে । সব রান্না একা হাতে করেছে সে তাও এই অসুস্থ শরীরে । 
দুপুরের দিকে তাওহীদের ক্লাইন্ট তার বউ বাচ্চা নিয়ে বাসায় হাজির হয় । তাওহীদ সাকিল মিলে তাদের সাথে কথা বলে মাইশাও আছে । সবার সাথেই মোটামুটি কথা বলে ওরা তাওহীদের ওয়াইফের সাথে কথা বলতে চায় । মাইশা ব্যাপার টা বুঝে গিয়ে তনুকে উপরে ডাকতে যায় । তনুও আর কি করবে ? মান সম্মানের প্রশ্ন , সম্মান রক্ষার্থে যেতে তো হবেই । তাই তাদের সামনে যায় তনু । 
.
– আসসালামু আলাইকুম ভাবি
– ওয়ালাইকুম আসসালাম , আসসালামু আলাইকুম 
– ওয়ালাইকুম আসসালাম
কেমন আছেন ভাবি ? 
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ? আপনারা কেমন আছেন ? 
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি 
ভাবি কি অসুস্থ নাকি ? 
– নাহ ভাবি , গরম বেশি পড়ে তো তাই ক্লান্ত লাগে 
– ওহ তবে তাওহীদ ভাইয়া কিন্তু অনেক লাকি আপনার মতো বউ পেয়েছে 
.
অন্যদিকে তাহুরা তো এমনিতেই মিশুক আরও পেয়েছে পিচ্চি পিচ্চি বাবু তাদের নিয়ে মেতে আছে সে । 
দুপুরের খাবার খেয়ে আরও কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে তারা চলে যায় । তনু সব গুছিয়ে পরিষ্কার করে রাতে তাহুরার কাছে যায় । গিয়ে দেখে বাপ-মেয়ে গল্প করতেছে । মেয়ে বাপের কোলে চড়ে গল্প শুনে । তনু তাহুরার কাপড় গোছাতে গোছাতে বলে , 
.
– মাম্মাম পাখি , তুমি ঘুমাও নি এখনো তুমি কাল স্কুল আছে তাই না 
– এত্তু পলেই ঘুমাবো মাম্মাম একন গল্প তুনি 
– ঘুমিয়ে যাও পাখি 
– হুম 
– আজ তো আমার আম্মুন অনেক খুশি ছিল তাই না আম্মুন 
– হুম পাপাই কুব খুতি 
– পারভেজ আংকেলের বাবুদের সাথে খেলে ভালো লেগেছে ? 
– হুম অনেত ভালো লেগেতে , পাপাই ও পাপাই
– হুম আম্মুন বলো 
– আমার একতা ভাই তাই যেমন শুভ্রার কাছে আতে ভাই

এই কথা শুনে তাওহীদ-তনু দুজনেই অবাক হয়ে যায় । তাহুরা কি বুঝে বললো তাও তারা বুঝে নি ? 
.
– তাহুরায়ায়ায়ায়ায়া , বড্ড বেশি পেকে গেছো ইদানীং , চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো , আবার যদি এইসব বলেছো তো দেখে নিও আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না 
মনে রেখে দিও কথা টা 
.
তনু রেগে মেগে রুম থেকে বের হয়ে যায় । তাওহীদ চুপচাপ বসে থেকে তনুর বিহেভ টা দেখলো শুধু । তনু যে এত রেগে যায় বা ওর বিহেভ যে এতো খারাপ হয় তা আজ দেখলো তাওহীদ । যেই তাহুরাকে ও চোখে হারায় সেই বাচ্চাটাকে আজ এইভাবে ধমকে গেল তনু । বাচ্চাটা মায়ের ধমক শুনে ঠোঁট ফুলিয়ে চুপ করে কাদতে থাকে । কাদতে কাদতে এক সময় ঘুমিয়ে যায় বাবার কোলে ।
তাহুরাকে শুইয়ে দিয়ে তনুর রুমের দিকে পা বাড়ায় তাওহীদ । আজ কথা বলেই নিবে সে । তনু কেনই বা তাহুরাকে এইভাবে ধমক দিল তাও জিজ্ঞেস করবে সে । দরজার কাছে গিয়ে পা জোড়া থমকে যায় তাওহীদের । দরজাটা ফাঁক করা ছিল খানিকটা । সেই ফাঁক দিয়ে তাওহীদ দেখছে তনু রুমে পায়চারী করছে আর ডান হাত টা দিয়ে বুকের বা পাশ য়া চেপে ধরে আছে । কখনো চেপে ধরছে আবার কখনো ডলছে । আবার পানি খাচ্ছে । তনুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তাওহীদের চোখের কোণে পানি জমে যায় তাওহীদ তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে । পানি খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় তনু 
.
তাওহীদ প্রায় অনেক্ষন করিডোরে পায়চারী করে । রাত যখন প্রায় ২ টা তখন তাওহীদ আবার তনুর রুমের সামনে যায় । উঁকি দিয়ে রুমের ভেতর টা দেখে তাওহীদ । তনু ঘুমিয়ে আছে । ড্রিম লাইটের আলোতে তনুকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । তাওহীদ দরজাটা আরেকটু ফাঁক করে রুমের মধ্যে যায় । গিয়ে দেখে তনু ঘুমাচ্ছে । অনেক ক্লান্ত লাগছে তনুকে । শরীরটা মনে হয় আর চলছে না তার । তাওহীদ বেশ বুঝছে সবটা । তনুর বুকে হাত দেয়া , বুকে প্রেস করা , লুকিয়ে ওষুধ খাওয়া , প্রচন্ড শরীর খারাপ নিয়ে সবাইকে বলা যে সে ভালো আছে সব কিছুই ভাবাচ্ছে তাওহীদকে । তনুকে নিয়ে কালকেই ডক্টর কাছে যাবে তাওহীদ । 
বিছানার পাশে সোফায় বসে আছে তাওহীদ । ঘুমন্ত তনুকে দেখছে সে । দুইহাতকে মুষ্ঠি করে বেধে থুতনিতে লাগিয়ে ভাবছে তাওহীদ । 
.
– তোমার কোথায় কষ্ট হয় তনুশা , বুকের বা পাশ টা কি ব্যাথায় চিন চিন করে উঠে ? আমায় কেন বলছো না তুমি ? এতটা শক্ত হয়ে গেছ কি করে তনু ? চোখের পানি গুলোকে আজ বড় অস্ত্র বানিয়ে নিয়ে নিজেকে শক্ত করে নিয়েছো তনু ? যেই রাফাতের জন্য আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলা আর আজ সেই রাফাত ছেড়ে চলে গেল । নাকি জানতে পেরেছিল যে তুমি তার নয় আমার সন্তানের মা হতে চলেছিলে তাই ছেড়ে চলে গেছে । 
.
কথা গুলো ভাবছে আর চোখের পানি গুলো টুপ টুপ করে পড়ছে তাওহীদের । নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না তাই আস্তে করে চোখ জোড়া মুছে চশমাটা চোখে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় তাওহীদ । 
অপেক্ষা কাল সকালের । তনুকে নিয়ে হসপিটালে যাবে সে । আর কোন একভাবে রাফাতের সাথে আবার যোগাযোগ করবে তাওহীদ । তনুকে কেন ছেড়ে দিল তা জিজ্ঞাসা করবে রাফাতকে । আর তনুর সব ভুল মাপ করে দিয়ে তাহুরার জন্যে তনুকে আবার আপন করে নেবে সে । কিন্তু সবার আগে এটা জানা জরুরী যে কি হয়েছে তনুর ? ডক্টর এর সাথে সকাল সকাল এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখবে সে । শুধু কাল সকাল টা হোক । 
.
.
.
চলবে………………………

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*