তেজ

লেখা: ফ|য়স|ল আহম্মেদ শ|ওন

মেয়েটা কে ছিলো?
.
আমি ঢাবিতে চান্স পাওয়ার পর সব থেকে খুশি মনে হয় রাত্রি হয়েছিলো। কিন্তু ওর সেই খুশিটা তিলে তিলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো আমার ডিমান্ড দেখে। ও আমার মেঝ চাচার ছোট মেয়ে।বলতে গেলে আমাদের জয়েন ফ্যামিলি। শুধু খাওয়া দাওয়ার দিক দিয়ে আমরা আলাদা খাই। দাদার তৈরি করা বাড়ির তিন তালায় রাত্রিরা থাকে আর আমরা দুই তালায় থাকি। বয়সের দিক দিয়ে ও আমার তিন বছরের ছোট। মেয়েটাকে সেই ছোট বেলা থেকে দেখে আসতেছি।খুব চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে ছিলো ও। কলেজে উঠার পর সেই স্বভাবটা তিলে তিলে গ্রাস হয়ে গিয়েছে। ওর প্রাইভেট টিচার বলতে আমি নিজেই ছিলাম। কলেজে কচিং আর আমি নিজেই ওকে বাসায় পড়াতাম। মেয়েটা ইংরেজিতে কিছুটা দুর্বল ছিলো। যখন ওকে পড়াতে বসতাম তখনি ওকে বলতাম, ভাল করে একটু পরিস ভাল ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে। 
কিন্তু ওর উত্তর গুলো খুব ত্যাড়া টাইপের ছিলো। আমার কথা শোনে ও বলতো, কেন ভাল ভার্সিটিতে চান্স না পেলে কি হবে?
মেয়েটার নিজের প্রতি একটুও কনফিডেন্স ছিলোনা।
ওর কথা শোনে খুব রাগ উঠতো। একদিন এরকম ত্যাড়ামি করাতে থাপ্পড় ও খেয়েছিলো আমার হাতে। সেই দিনের পর থেকে টানা সাত দিন আমার কাছে পড়তে আসে নাই। খুব রাগি স্বভাবের মেয়ে ছিলো। আমার কথা শুনত তবে কিছুটা একরোখা টাইপের ছিলো মেয়েটা। পরে আমি নিজেই ওদের রুমে যেয়ে পড়তে বসতে বলেছিলাম। ও কিছুনা বলে পড়তে বসেছিলো।
.
ভার্সিটতে এক অনুষ্ঠানে আমার বন্ধুদের সাথে কিছু ছবি তুলেছিলাম। আমার কয়েকটা মেয়ে ফ্রেন্ডের সাথে ছবি তোলে ফেসবুকে আপলোড দিয়েছিলাম। সেইখানে রাত্রি কমেন্ট করেছিলো, ভার্সিটিতে পড়ালেখা নাতো এইসবি করতে যায়।
ও আমার প্রতি কিছুটা দুর্বল ছিলো যা আমি ওর কথা বার্তা থেকেই বুঝতাম। আবেকের চাপে এমনটা করতেছে বলে, আমি আর কিছু বলতাম না মেয়েটাকে।ভাবতাম ঠিক হয়ে যাবে একটা সময়। একদিন ওকে পড়ানোর সময় ও আমাকে হঠাৎ করে বলে উঠলো, আচ্ছা তোমার কেমন মেয়ে পছন্দ?
“………..
“কি হলো কথা বলতেছোনা কেন?
“আমার মতো।
“যেমন?
“ভালো ভার্সিটিতে পড়বে। গুণবতী হবে।এই আর কি।
“ওহ! গুণবতী মেয়ে কিন্তু ভালো ভার্সিটি তে পড়েনা তাহলে কি চলবেনা? 
ওর কথা শোনে আমি কি বলবো কিছুই বুঝতেছিলাম না। ও যে এইখানে ওকে নিজেকে মিন করে কথাটা বলেছে তা আমি বুঝতেই পেরেছিলাম। এই মেয়েটা কি!! নিজের প্রতি একটুও কনফিডেন্স থাকবেনা তাই বলে। তারপর আমি ওকে বলে উঠলাম, না চলবেনা।
আমার কথাটা শোনে মেয়েটার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। তারপর আর কিছু না বলে চুপচাপ পড়তে লাগলো। 
.
আস্তে আস্তে করে ওর এইচ.এস.সি এক্সাম টা চলে আসলো। পরিক্ষার হলে আমি নিজেই ওকে নিয়ে যেতাম। ঠিক আজকেও আমি ওকে এক্সাম দিতে নিয়ে আসছি। আজ ওর ইংরেজি ২য় পত্র এক্সাম। ও হলে ঢুকার পর খেয়াল করলাম যূথী আমার দিকে কিছুটা এগিয়ে আসছে। 
.
যূথী আমার সামনে আসার পর বলে উঠলো, কিরে তুই এখানে?
“চাচাতো বোনটাকে নিয়ে আসলাম তুই?
“আমার বাসুরের মেয়েকে নিয়ে আসছি। ও এবার এক্সাম দিতেছে।
“ওহ।
তারপর দুইজন এক পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলাম। যূথী আমার কলেজ ফ্রেন্ড। ভার্সিটি ভর্তি হওয়ার পরেই ওর বিয়ে হয়ে গেছে। কি আর করার মেয়ে বলে কথা। তবে এখনো পড়াশোনা করতেছে। 
.
পরিক্ষা শেষ হওয়ার পর সব ছাত্র-ছাত্রী বের হতে লাগলো। খেয়াল করলাম সবার সাথে রাত্রিও বের হচ্ছে। ওকে খুব খুশি খুশি লাগছিলো। পরিক্ষা হয়তো ভাল হয়েছে। রাত্রি যখন দূর থেকে দেখলো আমি আর যূথী খুব হেসে কথা বলতেছি। তখন আমি ওর মুখের দিকে খেয়াল করে দেখলাম। ওর মুখের থেকে সেই হাসিটা বিলিন হয়ে গিয়েছে। তারপর যূথীর থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম।
.
রাত্রির সামনে আসার পর আমি যেই বলতে যাবো ওর এক্সাম কেমন হয়েছে? ঠিক তখনি ও নিজেই আমাকে বলে উঠলো, মেয়েটা কে ছিলো?
“আমার কলেজ ফ্রেন্ড। তোর পরিক্ষা কেমন হইছে?
“বাসায় যাবো।
“চল কিছু খাই!
“নাহ।
“ফুসকা খাবি?
“কিছু খাবোনা। আমি বাসায় যাবো।
তারপর আমি আর কিছুনা বলে চুপ করে একটা রিকশা ডাক দিয়ে দুইজন উঠে বসলাম।
.
রিকশাতে উঠার পর আমি ওকে বলে উঠলাম, দেখি প্রশ্নটা?
ও কিছুনা বলে চুপ করে ফাইল থেকে প্রশ্নটা বের করে আমার হাতে দিলো। প্রশ্ন নিয়ে দেখলাম রাইটিং সাইট ওর কমন পড়েছে। আমি আবার ওকে বলে উঠলাম,এক্সাম কেমন হইছে? 
মেয়েটা কিছুনা বলে চুপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো। 
আমিও আর ওকে দ্বিতীয় বারের মতো কিছু জিজ্ঞাস করলামনা। ও যে যূথীর সাথে আমাকে হেসে কথা বলতে দেখে এমনটা করছে। আমি ঠিকি বুঝতে পেরেছিলাম।
.
রিকশা বাড়ির সামনে আসার পর মেয়েটা রিকশা থেকে নেমে সোজা বাড়ির ভিতর ঢুকে গেলো। আমি বুঝি না এই মেয়েটার এতো তেজ কেন? আমিও আর কিছু না ভেবে রিকশাওয়ালাকে রিকশার ভাড়া টা দিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেলাম।
.
দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণের জন্য রেস্ট নিচ্ছিলাম। বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত বাহিরে দুইটা টিউশানি পেয়েছিলাম এই মাসে। সেইখানে আবার কিছুক্ষণ পর যেতে হবে। 
.
টিউশানি শেষ করে বাসায় আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যার আযান পড়ে গেলো।তারপর আমার রুমের ভিতর ঢুকে কিছুক্ষন পায়চারী করলাম। পড়শু রাত্রির আইসিটি পরিক্ষা। আজকে যেমন তেজটা আমার সাথে দেখালো, মনে হচ্ছেনা পড়তে আজকে আসবে! ওর এমন হুটহাট তেজ দেখানোর স্বভাবটা সেই ছোটবেলা থেকেই ছিলো কিন্তু এখন জানি একটু বেশি বেশিই করতেছে মেয়েটা। আমিও ওর এমন তেজের ধার ধারী না। শুধু এক্সামটার জন্য ধার ধারতে হচ্ছে। যে রাগ ওর কি থেকে কি করে ফেলে কে জানে। তাই আর কিছু না ভেবে ওদের রুমে যেতে লাগলাম।
.
ওদের রুমে ঢুকেই দেখলাম চাচী টিভির রুমে বসে টিভি দেখতেছে। আমি চাচীকে বলে উঠলাম, চাচী রাত্রি কই?
“সেই যে পরিক্ষা দিয়ে এসে গোসল করে রুমে ঢুকছে এখনো বের হয় নাই। এই পর্যন্ত এতোবার ডাকলাম কিছু খেয়েনে তবুও কিছু না খেয়ে রুমের ভিতর বসে আছে। মনে হয় পরিক্ষা খারাপ হইছে।
.
আমি আর কিছুনা বলে সোজা ওর রুমের ভিতর যেয়ে ঢুকলাম। ওর রুমে যেয়ে দেখে মেয়েটা বালিস জড়িয়ে ধরে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে বসে আছে। ওর সামনে যেয়ে ওর কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে ফেললাম। মেয়েটা আমার দিকে একটু কড়া করে তাকালো। আমার কেন যেনো ওর এরূপ তাকানোর ভঙ্গি দেখে খুব হাসি পেলো। ওর এই তাকানোর ভঙ্গিটাতে যে কত প্রকারের অভিমান জড়িয়ে ছিলো তা বুঝা যেতো, যদি আমি একটু হাসি দিতাম তাহলে। কিন্তু আমি না হেসে ওকে বলে উঠলাম, হইছেটা কি তোর হুম!
“কি হবে?
“এখন পর্যন্ত নাকি কিছু খাস নাই?
“….
জড়তে একটা নিশ্বাস নিয়ে কি মনে করে যেনো ওকে বলে উঠলাম, মেয়েটার কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। আর মেয়েটা ওর বাসুরের মেয়েকে নিয়া আসছে। ওর বাসুরের মেয়েও তোদের সাথে এক্সাম দিতেছে।
আমার কথাটা শোনে রাত্রি আমার দিকে একটু তাকালো। আমি আবার ওকে বলে উঠলাম, এক্সাম কেমন হইছে?
“মেয়েটা কি তোমাদের সাথে পড়তো?
আমার কথার উত্তর না দিয়ে মেয়েটা আমাকেই আবার প্রশ্ন করে উঠলো। আমি বলে উঠলাম, এখনো পড়ে তবে আমাদের সাথেনা।
“আচ্ছা একটা কথা বলি?
“বল
“আমি ভালো ভার্সিটিতে চান্স না পেলে তুমিতো আর আমার সাথে ভালো করে কথা বলবানা তাই না?
“আমি এমনটা কখনো বলছি?
“বলো নাই কিন্তু তোমার ভাব সাব বলে দেয়। 
“তুই কিন্তু এখনো বলিস নাই এক্সাম কেমন হইছে?
“ভালোই হইছে।
“পরশু আই.সি.টি এক্সাম। যা কিছু খেয়ে পড়তে বস। প্রথম দুই চাপ্টার আজকের রাতের মধ্যে শেষ করে ফেলবি। আর বাকিগুলা কাল শেষ করবি।
.
কথাটা বলে যেই ওর রুম থেকে বের হতে যাবো তখনি মেয়েটা আমাকে বলে উঠলো, ওই!
আমি ওর দিকে ফিরে বলে উঠলাম, কি হইছে?
“আমি ফুসকা খাবো।
“এখন!
“হুম এখনি নিয়া যাবা। খেয়ে এসে পড়তে বসবো।
আমি আর কিছুনা ভেবে বলে উঠলাম, আচ্ছা ঠিক আছে চল।
মেয়েটা যে আমাকে শেষ কবে ভাইয়া বলে ডাকছে সেইটা আমি ভুলে গেছি। ওই,শুনো এই দুইটা ভাষায় মেয়েটা এখন আমাকে ডাকে। 
.
ফুসকা খেয়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য যেই রিকশাতে উঠতে যাবো ঠিক তখনি রাত্রির মোবাইলটা ওর হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেলো। মোবাইলটা আমি মাটি থেকে উঠিয়ে সাইট বাটুমে চাপ দিয়ে দেখলাম ডিসপ্লেটা আবার গেলো কিনা। নাহ ডিসপ্লের কিছু হয়নি। তবে ওর মোবাইলের সাইট বাটুমে টিপ দেওয়ার পর দেখলাম মোবাইলের স্কিনে আমার ছবি দিয়ে রেখেছে। আমি আর কিছু না বলে মোবাইলটা ওর হাতে দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। ওর দিকে তাকাতেই খেয়াল করলাম। কেমন একটা উদাসীন মুড নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বলতে গেলে ওর প্রতি আমার তেমন কোনো ফিলিংস কাজ করেনা তবে মেয়েটা যে কেন এমন শুরু করছে আল্লাহ জানে।
.
বাড়ির সামনে আসার পর রিকশা থেকে নেমে ভাড়াটা দিলাম। বাড়ির ভিতর ঢুকতে ঢুকতে মেয়েটা আমাকে ঠিক টিপিকাল মুভির ন্যাকা নায়কাগুলার মত করে বলে উঠলো, একটা কথা বলি শুনবা?
“কি কথা?
“শুনবা কিনা বলো?
“হুম শুনবো।
“আই.সি.টি এক্সামের পর এগারো দিন বন্ধ। শুক্রবার তো পহেলা বৈশাখ একটু ঘুরতে নিয়া যাবা?
“দেখি।
“দেখি কি? নিয়ে যেতেই হবে। আর চার – পাচঁ ঘন্টার জন্য আমার পড়া শোনার আহামরি ক্ষতিও হবে না।
“আচ্ছা ঠিক আছে।
“সত্যিতো!
“হুম। এখন বাসায় যেয়ে সোজা পড়তে বসবি। 
“আচ্ছা।
কথাটা বলেই যেই দুই তালা আমাদের রুমে ঢুকতে যাবো তখনি মেয়েটা আমাকে আবার বলে উঠলো, ওই শোনো!
“কি?
“কিছুনা। 
কথাটা বলেই হাসতে হাসতে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে তিন তালায় যেতে লাগলো। এই মেয়েটা যে কি হইতাছে দিন দিন বুঝাই মুশকিল এই ভালো এই খারাপ।
.
শুক্রবার সকালে ঘুমটা ভাঙ্গলো রাত্রির ফোনে। ফোনটা রিসিভ করে কিছুক্ষন কানের কাছে ধরে রাখার পর মেয়েটা বলে উঠলো, ঘুম ভাঙ্গে নাই এখনো!
“হুম।
“কি হুম! কয়টায় ঘুমাইছিলা রাতে?
“তিনটা। 
“কি? কি করছিলা এতো রাত পর্যন্ত?
“পড়ছিলাম। 
“ওহ! কখন বের হবা?
“বিকেলবেলা।
“তোমার এশ কালার পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামাটা আমি আইরন করে তোমার পড়ার টেবিলে রাইখা আসছি ওইটা পড়বা আজকে।
“তোরে ওইগুলা আইরন করতে কে বলছে?
“কেউ বলে নাই। তোমাকে ওই পাঞ্জাবিটা তে ভালো লাগে তাই করছি। 
“তুই যে আমার রুমে আসছোস মা দেখছে?
“জেঠি নিজেই আমাকে ওই গুলা খুজার জন্য হেল্প করছে।
“এই যে দুই লাইন বেশি করছ এর জন্যেই তোর উপর রাগ উঠে।কি দরকার ছিলো এইগুলা করার?
“মন চাইছে তাই করছি। ইচ্ছা হইলে পইড়ো না হলে নাই। রাখলাম।
কথাটা বলেই তেজ দেখিয়ে মেয়েটা ফোনটা কেটে দিলো। মোবাইলটা কান থেকে সরিয়ে দেখলাম ১১টা ৪০ বাজে। বিছানাতে কিছুক্ষণ চোখ বুজে থেকে। তারপর সোজা ফ্রেশ হতে টয়লেটে চলে গেলাম।
.
টয়লেট থেকে একবারে গোসল করেই বের হোলাম। দুপুরতো হয়েই গেছে প্রায়। আর তাছাড়া নামাজেও যেতে হবে। রুমে এসে পড়ার টেবিল থেকে পায়জামাটা পড়লাম। কেন জানি ইচ্ছে করেই ওই পাঞ্জাবিটা না পড়ে অন্য একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিলাম। তারপর রুম থেকে বাহিরে বের হয়ে মাকে বলে উঠলাম, মা নাস্তা দেও।
কিছুক্ষণ পর মা নাস্তা নিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, কিরে তুই এই পাঞ্জাবি কেন পরলি?
“কেন কি হইছে?
“টেবিলে আইরন করা পাঞ্জাবিটা চোখে দেখস নাই?
“হুম দেখছি। 
“তো পরলিনা কেন?
“ওইটা ভালো লাগেনা।
“শখ কইরা রাত্রি আইরন করছে যাতে ওইটা তুই পরছ।আর কই যাবি? ও যে বল্লো ঘুরতে নিয়া যাবি তুই?
“কই আর যাবো, শিশুটারে শিশুপার্ক থেকে ঘুরায়া নিয়া আসি।
“শিশু আর নাই! সকালে ঘুম থেকা উঠে আইসা আমার সাথে নাস্তা বানালো। সব তরকারি কুটে দিয়ে তারপর বাসায় গেছে।
“ভালো করছে। 
কথাটা বলেই কোনো মতো খাওয়াটা শেষ করে রুমে চলে গেলাম।
.
দুপুরে নামাজ পড়ে এসে খাওয়াটা শেষ করে রুমে যেয়ে একটু বিছানায় হেলান দিলাম। হেলান দেওয়ার সাথে সাথে আমার চোখটা পড়ার টেবিলের দিকে পড়লো। সেই পাঞ্জাবিটার দিকে। এক দৃষ্টিতে পাঞ্জাবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এমন কেন এই মেয়েটা। আচ্ছা ও কি সত্যি বড় হয়ে গেছে? কিই? আমার কাছেতো সেই আগের মতোই লাগে ওকে। কথাগুলা ভাবতে না ভাবতেই মেয়েটা আবার ফোন দিয়ে উঠলো। আমি ফোনটা রিসিভ করার সাথে সাথেই মেয়েটা বলে উঠলো, আমি কিন্তু রেডি। চলো এখন বের হয়ে যাই।
“রৌদ্রটা কমুক।
“তুমি কি হ্যা! এখন রোদ্রটা কমার জন্য বসে থাকবা?
“আচ্ছা ঠিক আছে। বের হ!
“গুড বয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসতেছি।
কথাটা বলেই রাত্রি ফোনটা কেটে দিলো।
.
আমি বিছানা থেকে উঠে টেবিল থেকে পাঞ্জাবিটা আমার হাতে নিলাম। তারপর কেন যেনো পরনে থাকা পাঞ্জাবিটা খুলে এই পাঞ্জাবিটা পড়লাম। আয়নার সামনে যেয়ে পাঞ্জাবির হাতাটা কিছুটা টেনে উপরে উঠিয়ে, চুল গুলো হাত দিয়ে একটু ঠিক করে ঘাড়টা ডান দিক বাম দিক ঘুড়িয়ে দেখলাম, নাহ! এই পাঞ্জাবিটাতে আমাকে একটু বেশিই কিউট লাগতেছে। আমার চেহারাটা যেনো কালোরঙ এর থেকে শ্যামলা বর্ণে পরিবর্তন হয়ে গেছে। তারপর বডিস্প্রেটা নিয়ে যেই মাড়া শুরু করলাম তখনি আওয়াজ পেলাম মা বলতেছে, আল্লাহ! আমার মাটারে দেখি চিনাই জাইতেছেনা। অনেক সুন্দর লাগতেছে তোরে মা। 
“আসো একটা ছবি তুলি।
কথাটা শোনার পর বুঝলাম রাত্রি আসছে। আমি রুমের ফ্যানটা বন্ধ করে যেই বাইরে গেলাম কিছুটা অবাক না হয়ে পারলাম না। বাদামি রঙ এর সুতির একটা শাড়ি পরনে। একদম সাদামাটা লাগছিলো। ঠিক সাদা-কালো টিভির সুন্দরি নারীটার মতো রূপ ধারণ করেছিলো। কিছু চুল সামনে আর বাকি গুলো পিছনে রেখেছে। ভালোই লাগছিলো।
পরক্ষনে মেয়েটা আমার দিকে কেমন করে যেনো তাকিয়ে বলে উঠলো, চলো বের হই।
আমি ওর দিক থেকে চোখটা কোনো রকম ভাবে চাপিয়ে বলে উঠলাম, হুম চল।
.
রুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে মাও আমাদের সাথে নিচ পর্যন্ত এসে আমাকে বলে উঠলো, ওই ওরে দেইখা রাখিস।
আমি মার দিকে তাকিয়ে জাষ্ট বল্লাম, ঠিক আছে।
.
তারপর একটা রিকশা ঠিক করলাম ফেরি ঘাট যাওয়ার জন্য। কারন ঘুরার মতো ভালো জায়গা পুরান ঢাকায় আছে। রিকশাতে উঠার পর খেয়াল করলাম, এলাকার পোলাপান গুলা রাত্রির দিকে তাকিয়ে আছে। আমার কাছে জিনিসটা জানি কেমন লাগলো। তাই আস্তে করে রিকশার হুকটা টেনে দিলাম। ব্যাপার টা ও ঠিকি বুঝতে পেরেছে। তাই আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু হাসলো না। মেয়েটা ওর হাতে থাকা ছোট পার্টস ব্যাগটা থেকে দুইটা চুইংগাম বের করে আমার হাতে দিয়ে বল্লো, এই নাও খাও। 
.
কথাটা বলেই ও ওর চুইংগামটা খেতে লাগলো। আজকে ওর দিকে খুব তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করতেছে। বলতে গেলে কি, সব মেয়েরাই সুন্দর আর সব মেয়েদের মাঝেই সুন্দর্যটা পর্দার আড়ালের ভিতর অগুছানো ভাবে ডাকা থাকে। যদি সে বুদ্ধি করে সেই পর্দাটা ঠেলে তার অগুছানো ভাবটা গুছানোতে পরিবর্তন করতে পারে তাহলেই সে প্রকৃতিতে আরেকটা সুন্দরর্যের উৎস বিরাজ করাতে পারবে। যার প্রমানটা আমি এই মেয়েটার থেকে পেলাম।
.
রিকশাটা কিছু দূর যাওয়ার পর মেয়েটা বলে উঠলো, রিকশার হুকটা এখন নামিয়ে দাও।
তারপর আমি রিকশার হুকটা নামিয়ে দিলাম।
মেয়েটা আমাকে আবার বলে উঠলো, ভাবছিলাম তুমি পাঞ্জাবিটা পরবানা।
“পরছিতো।
“হুম দেখলামতো। তবে আজকে তোমাকে কেমন যেনো বাচ্চা বাচ্চা লাগতেছে।
কথাটা বলেই মেয়েটা একটু ওর চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করলো আর তখনি আমার নাকে ওর চুলের মৃদু ঘ্রাণটা আসলো। আজ ওর সাথে কেন যেনো খুব ভেবে কথা বলতেছি আমি। 
.
ফেরি ঘাট আসার পর রিকশা থেকে নেমে রিকশা ভাড়াটা দিয়ে। সোজা নৌকায় যেয়ে উঠলাম নদীটা পার হওয়ার জন্য। নৌকা মাঝি চালানোর কিছুক্ষন পর মেয়েটা আমাকে হুট করে বলে উঠলো, আমার ব্লাউজের ফিতাটা খুলে গেছে একটু বেধে দিবা?
মেয়েটা বল্লোটা কি! খুব অবাক হয়ে গেলাম। মেয়েটা ওর চুল গুলো পিছন থেকে চাপিয়ে ওর পিঠটা আমার দিকে ঘুরিয়ে বলে উঠলো, হুম বেধে দাও।
আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দই যেনো বের হচ্ছে না। আমার চুপ করে থাকা দেখে ও আমার দিকে কিছুটা বেকে তাকিয়ে বলে উঠলো, কি হলো বাধো। হালকা করে বাধবা।
আমি আস্তে করে ফিতাটা ধরে কোনমতো বেধে দিলাম। তারপর মেয়েটা চুলগুলো আবার পিছনের দিকে নিয়ে ওর মোবাইলটা বের করে ছবি উঠাতে লাগলো। আর আমাকে একটু সাইডে টান দিয়ে আমাকে নিয়েও কয়েকটা ছবি তুললো।
.
নৌকা ঘাটে ভিড়ার পর। নৌকা থেকে নেমে আমি ওকে বলে উঠলাম, কই যাবি? রমনায় নাকি অন্য কোথাও?
“রমনায় যাবো।
তারপর আবার সেখান থেকে সোজা রমনা পার্ক যাওয়ার জন্য রিকশায় উঠলাম। 
রিকশাটা উর্দু রোড আসার পর একটু বেশিই গতি নিয়ে আগে বাড়তেছিলো। বাতাসের সাথে সাথে ওর চুল, শরীর থেকেও কেমন জানি একটা মিষ্টি ঘ্রাণ আসতেছিলো। আমি এই দিকটার তেমন গুরুত্ব দিতে চাচ্ছিলাম না। তবুও কেন জানি না দিয়েও পারলাম না। বার বার নৌকায় ঘটে যাওয়া সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। হুট করে মেয়েটা আবার ওর পার্টস ব্যাগটা থেকে একটা ডেইরি মিল্ক বের করে একটু ভেঙ্গে ওর হাত দিয়ে আমার মুখের সামনে দিলো। যেই আমি ওইটা হাতে নিতে যাবো তখনি মেয়েটা আমাকে বলে উঠলো, উঁহু হা করো।
কেন জানি আমি ওর উপর আজ রাগো দেখাতি পারতেছিনা। আর তাছাড়া ওর এই রকম এড্যাল্ট টাইপের পাগলামি গুলা ওর আজকের গেটাপের সাথে খুব মানিয়ে ছিলো। 
.
আমিও আর কিছু না বলে ওর হাত থেকে চকলেট টুকু খেয়ে নিলাম। এমন করে মেয়েটা চার বারের মতো আমাকে খায়িয়ে দিলো আর নিজে খেলো।
.
প্রায় বিশ মিনিট পর রমনায় এসে পৌছালাম। খুব ভিড় ছিলো বিদায় রিকশা থেকে নেমেই ও আমার হাতটা ধরলো। তারপর টুকটাক কথা বলতে বলতে হাটতে লাগলাম। মেয়েটা যে কখন আমার হাতের মাঝখান দিয়ে ওর এক হাত ঢুকিয়ে দুই হাত দিয়ে পেঁচিয়ে আমার হাতটা ধরে হাটতে ছিলো। তা আমি খেয়ালি করি নি।ওর এমন কান্ড মনে হচ্ছিলো মেয়েটা যেনো একটা লক্ষে পৌছানোর জন্য একেকটা স্টেপ পাড় হচ্ছে। ওর দিকে তাকাতেই দেখি মেয়েটা ওর কাজল কালো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আজ ওর দিকে তাকাতেও যেনো কেমন ফিল হচ্ছে। 
.
কিছুদূর যাওয়ার পর মেয়েটা বলে উঠলো, একটু কন্সার্ট দেখে যাবো কেমন?
“ভিড় হবে খুব।
“তুমি আছোনা।
কথাটা বলেই মেয়েটা আমার দিকে তাকালো। আমি আর কেন যেনো না করতে পারলামনা। 
.
নাগরবাউলের তিন চারটা গান শোনার পর ওকে নিয়ে বের হয়ে গেলাম সেখান থেকে। তারপর ওর কথায় টি.এ.সি তে যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। 
.
হঠাৎ করে রাত্রি আমার হাতের পশম গুলো টান দিয়ে উঠলো। আমি কিছুটা ব্যাথা পেয়ে বলে উঠলাম, উফ! কি হইছে?
“ঘুরতে তো নিয়ে আসছো কিছু খাওয়াবা না?
” কি খাবি?
“রিকশাটা থামায়ি ওই সামনে থেকে স্যান্ডুইচ নিয়া আসো আর একটা ম্যারেন্ডা আনবা।
তারপর রিকশাটা থামিয়ে স্যান্ডুইচ আর ম্যারেন্ডা এনে ওর হাতে দিলাম।
রিকশার ভিতরেই দুইজন খেতে লাগলাম। 
.
টি.এ.সির সামনে রিকশা এসে থামার পর। দুইজন নেমে কিছুটা হেটে একটা গাছের সামনে এসে বসলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছিলো। আমাদের আশে পাশে অনেক কাপল ছিলো। এদের মাঝে আমাদের দুইজন কে যে কেউ দেখে ভাববে আমরাও একটা কাপল। আমি মোবাইলটা বের করে যেই লকটা খুলতে যাবো। তখনি মেয়েটা আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে বলে উঠলো, এখন মোবাইল না টিপালে হয়না।
“কেন কিছু বলবি?
“হুম।
“বল
“আজকে কিন্তু আমাকে একটুও রাগ দেখাও নাই। 
“কেন রাগ দেখালে ভাল হতো?
“সেই সুযোগ দিলেতো!
আমি ওর কথা শুনে হাসলাম। ভালোই কথা শিখে গেছে মেয়েটা। হুট করে আমার হাতের আঙ্গুল গুলো ধরে বলতে লাগলো, তোমার আঙ্গুল গুলো এমন বেকা ত্যাড়া কেন?
“কই ঠিকিতো আছে।
“উহু বড় ছোট আছে।
“তা তো থাকবেই।
“কেন থাকবে?
কথাটা বলেই আমার দিকে তাকায়ে একটু হাসলো।
“বাসায় যাবি না?
“হুম যাবো তো। 
কথাটা বলেই আমার হাতটা ধরে বলতে লাগলো, আচ্ছা আমি যদি ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাই তাহলে আমি যা চাইবো তা দিবা?
“দেখা যাবে।
“হ্যা বা না বলো। দেখা যাবে চলবে না।
“হ্যা।
আমি জানি ও কি চাইবে। এমনটা চেয়েও যদি ভালো দিকে ও যেতে পারে তাহলে আমার কোনো আফসস নেই।
মেয়েটা আমার দিকে একটু তাকিয়ে আবার বলে উঠলো, সত্যিতো?
“হুম
“তাহলে ধরে নিলাম ভালো ভার্সিটিতে চান্স না পেলেও আমি যা চাইবো তা দিবা।
কথাটা বলেই মেয়েটা হেসে দিলো।কি সুন্দর মঘা বানিয়ে দিলো মেয়েটা আমাকে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বল্লাম, তুই এমনি করবি সব সময়?
“হুম।
“চল বাসায় যাবো। বেশি রাত হলে তোর জেঠা বকবে।
“ওকে। 
.
সেইখান থেকে রিকশাতে উঠে ঘাটে আসার পর নৌকা করে ফেরিঘাট পৌছিয়ে। আবার বাসায় যাওয়ার জন্য রিকশাতে উঠলাম। রিকশাতে উঠার পর মেয়েটা আমাকে বলে উঠলো, হুকটা একটু উঠিয়ে দাও। 
আমিও আর কিছুনা বলে হুকটা উঠিয়ে দিলাম। হুকটা উঠানের পরেই মেয়েটা আমার হাতটা পেঁচিয়ে ধরে কাধে মাথা রেখে চুপ করে বসে রইলো। আমি কিছু বলতে যেয়েও থেমে গেলাম। আমার প্রতিটা নিশ্বাসে যেনো ওর চুলের ঘ্রাণ গুলো আমার শরীরের ভিতরে প্রবেশ করছিলো।
.
বাড়ির প্রায় কাছাকাছি আসার পর আমি ওকে বলে উঠলাম, রাত্রি আইসা পড়ছি উঠ।
“উঁহু।
“তুই কি পাগল হইছোস? কেউ দেখলে?
কথাটা একটু রাগ নিয়েই বল্লাম। মেয়েটা তৎক্ষণাৎ আমার কাধে থেকে মাথা চাপিয়ে চুলগুলো ওর ঠিক করতে লাগলো। আজ কেন যেনো ওর সব কিছুই আমার ভালো লাগতেছে। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারতেছি না। এক অজানা টানে।
.
বাড়ির সামনে আসার পর রিকশা থেকে নেমে। সোজা বাড়ির ভিতর ঢুকে গেলাম। দুইতালায় উঠার পর যেই রুমে নক করবো তখনি মেয়েটা পাঞ্জাবিটা পিছন দিক থেকে টান দিয়ে বলে উঠলো, আমি চেষ্ঠা করবো আমার বেষ্টা দিয়ে ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার জন্য। বাকিটা তুমি জানো। আর তোমার এই আতলামির স্বভাব গুলো ছাড়ো।
কথাটা বলেই আমার খুব কাছে এসে মেয়েটা আমার গালে আলতো করে চুমু খেয়ে, আতেল কোথাকার!
কথাটা বলেই দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে লাগলো। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটা আমাকে দ্বিতীয় বারের মতো মঘা বানিয়ে দিলো!
<><><><><><> সমাপ্ত <><><><><><>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*