ডাকিণী

(১ম পর্ব)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

আজ আমার নতুন কর্টেজ কিনলাম। ফার্মাসিউটিক্যালস এ নতুন চাকুরী পেয়ে যেন কপাল হঠাৎ খুলে গেছে আমার। পাঁচ মাসের বেতন জমিয়ে কিনে ফেললাম এই কর্টেজটা। বিশাল কর্টেজ। সে তুলনায় প্রায় পানির দামে কিনেছি। ৭০ হাজার ইউরোতে এই বিশাল কর্টেজটা শুধু কপালগুণেই জুটতে পারে। কর্টেজটা আমি পোলিশ সরকারের কাছ থেকে নিলামে কিনেছি। এটা আগে একটা গীর্জা ছিল। সারাটা দিন পুরো কর্টেজ ঘুরে ফিরে দেখলাম। ওনেক পুরাতন বাড়িতেই ভুগর্ভস্থ কুঠুরি থাকে, কিন্তু আমার কর্টেজের ভুগর্ভস্থ কুঠরি বেশ ভিন্ন ধরনের। এক সারিতে পাঁচটা ঘর সবগুলিতেই ধাতব শিখ দিয়ে ঘেরা। কেমন যেন জেলখানা জেলখানা ভাব। উপরে একটা বিশাল লাইব্রেরি পুরাতন বই পুস্তকে ঠাসা। লাইব্রেরীতে কয়েকটা বই ঘাটতেই একটা পুরাতন বাইবেল আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মনে হল বাইবেলটা যেন টেনে আমার হাতটা তার উপর নিয়ে গেল। বাইবেলটার প্রথম পাতা উল্টাতেই একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। বাইবেলের প্রতিটা পাতার একপিঠে ছাপা আর অপর পিঠে কাঠ কয়লায় ছোট ছোট মেয়েলী হস্থাক্ষরে পোলিশ ভাষায় লেখায়। ধর্মকর্মে আমার এতটুকু আগ্রহ নেই তাই বাইবেল বাদ দিয়ে উল্টোপিঠের লেখাগুলি পড়তে শুরু করলাম। লেখার উপরে শিরোনাম ছিল ডাকিণী। প্রথম পাতার সরল বঙ্গানুবাদ হবে অনেকটা এরকম,
“আমি এক হতভাগী। নাম আলেস ভন্টেইজিয়ান। আমাকে ওরা ডাকিণীবিদ্যা চর্চার অপরাধে এখানে ধরে এনেছে। আমার বাবার একটা সরাইখানা ছিল। মা অনেক আগেই মারা গেছেন। গত সপ্তাহে বাবাও মারা যান। বাবার মৃত্যু পর আমিই সরাইখানার মালিক হই ও তাকে হারানোর শোক ভুলে কাজে মন দেই। সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে আসছিলো। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে দুদিন আগে। আমার সরাইখানায় একজন অতীথি মারা যায়। আমার যতটুকু বিশ্বাস লোকটা অতিরিক্ত মদ গিলে অক্কা পেয়েছে। কিন্তু কারা যেন গুজব ছড়িয়ে দেয় আমি নাকি ডাকিণী। আমি বুঝি ডাকিণীবিদ্যা প্রয়োগ করে আমার বাবা আর ওই অতীথিকে খুন করেছি। অতপর গীর্জা থেকে প্রিস্টের নির্দেশে আমাকে এখানে বন্দি করে আনা হল। সরাইখানাটা গীর্জার সম্পত্তি হিসাবে দখল করে নেওয়া হল। ডাকিণীবিদ্যার কিছুই জানিনা আমি। তবুও ওরা আমাকে কষে চাবুক মারল। কতবার আমি ওদের বললাম আমি ডাকিণী নই, আমি আলেস, তোমরা সবাই আমাকে চেন, আমি প্রতি রবিবার গীর্জায় প্রার্থনায় আসি, কিন্তু ওরা কেউ আমার কথা শুনল নাহ। একসময় আমি জ্ঞান হারালাম। তারপর জেগে দেখি আমি এখানে পড়ে আছি। জানিনা আমাকে আরো কত শাস্তি সইতে হবে তবুও আমি পণ করেছি যাই হোক না কেন আমি ডাকিণীর অপবাদ স্বীকার করব নাহ। বাইবেলটা আমার কুঠোরির এক কোণে পড়ে ছিল। মশালের নিচে থেকে এক টুকরা কয়লা নিয়ে পবিত্র বাইবেলে আমি ইশ্বরের নামে শপথ করে লিখছি, আমি ডাকিণী নই। ”
প্রথম পাতা পড়ার পরে মনের অজান্তেই মেয়েটার জন্যে চোখে পানি চলে আসলো। আমি জানতাম মধ্যযুগে মেয়েদের ডাকিণী অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হত কিন্তু কখন ভাবিনী এমন একজন ভিক্টিমের সাথে এভাবে পরিচিত হব। বুঝতে পারলাম আমার কর্টেজটাই সেদিনের গীর্জা ছিল আর কর্টেজের ভুগর্ভস্থ পাঁচ কুঠোরির কোন একটাতেই আলেসকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার পরের পৃষ্টার গতবাধা বাইবেলের লেখা উল্টাতেই আলেসের লেখাটা পেয়ে গেলাম।
“আজ দুদিন হল আমি এখানে আছি। এর মধ্যে এরা আমাকে একফোঁটা পানিও খেতে দেয় নি। একবার আমার প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে আমি ওদের অনেক ডাকলাম কিন্তু কেউ আমাকে বাহিরে নিয়ে গেল না। শেষে বাধ্য হয়েই এক কোণে কাজ সারলাম। হে ঈশ্বর কোন অপরাধে এই শাস্তি দিচ্ছ আমায়। খানি আগে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। মা কে স্বপ্নে দেখলাম আমার জন্যে গোশত আর রুটি নিয়ে এসেছে। তারপর জেগে দেখি একটা ইঁদুর আমার পায়ের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। ওটাকে ধরে ওর গলায় দাঁত ফুটিয়ে দিলাম। দুদিন উপোস থাকার পর এই ইঁদুরের রক্ত আমার পিপাসার্থ গলায় অমৃতসম মনে হল। ইঁদুরটা খানিকটা খাওয়ার পরেই এক পাহারাদার আমাকে দেখে ফেলল। ও চিৎকার করে বলতে লাগল আমি নাকি ইঁদুরটা খেয়ে প্রমান করে দিয়েছি আমি একটা ডাকিণী। আরো কয়েকজন পাহারাদার এসে ওর সাথে যোগ দিল। আমি ওদের বললাম আমি ক্ষুধার্ত হয়েই এটা খেয়েছি কিন্তু ওরা শুনল নাহ। একজন শিখের ফাক দিয়ে হাত গলিয়ে আমার গালে সশব্দে চড় বসিয়ে দিল। আমি মাটিতে পড়ে গেলে ওরা আমার সেলে ঢুকে ইঁদুরের বাকীটুকু নিয়ে গেল, প্রিস্টকে আমার ডাকিণীবিদ্যা চর্চার প্রমাণ দেখাবে বলে। আজ যা ঘটলো তাতে ওদের কাছে আমার ডাকিণী হওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেল। কিন্তু ঈশ্বর তো জানেন আমি ডাকিণী নই, আমি তার একনিষ্ঠ সেবক।”
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি ঢুকরে কেঁদে উঠলাম। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের উপর চলা অমানুষিক নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা পড়ে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমার মায়ের কাছে উদভ্রান্তের মতো ফোন দিলাম। আম্মু আমার লালচে চোখ আর ফোলে উঠা নাক দেখে আতঁকে উঠলো। আমি আম্মুকে আলেসের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম আম্মু, তোমাকে খুব মিস করছি তাই চোখে জল চলে আসছে। আম্মু কিছুক্ষণ আমাকে খুটিয়ে দেখে একগাল হেসে বলল পাগলী মেয়ে আমার। চিন্তা করিস নাহ। আগামী উইকএন্ডেই আমি তোর নতুন বাসায় বেড়াতে আসব। আমাকে দাওয়াত দিবি তো? আমিও খানিক হেসে বললাম নাহ। তোমাকে দাওয়াত দেওয়ার কি আছে? তোমাকে তো কোলে করে আমার বাড়িতে নিয়ে আসব। এভাবে আম্মুর সাথে কথা বলতে বলতে একসময় মন ভালো হয়ে গেল। সেদিন আর আলেসের ডায়েরি পড়িনি। পাছে যদি আবার মন খারাপ হয়ে যায়। একটা কমেডি মুভি দেখে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। কাল আবার অফিসে যেতে হবে।
সেরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমার কর্টেজের পেছনে কুয়োর পাশেই একটা মাঝারি ক্যাম্পফায়ারের মতো অগ্নিকুণ্ড যা জ্বলতে জ্বলতে একসময় একটা নারীমূর্তির আকৃতি ধারণ করলো, আর পর একটা কর্কশ চিৎকার, আর অগ্নিকুণ্ডটা দপ করে নিভে গেল।
পরদিন সকালে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে বাথরুমের আয়নায় চোখ পড়লো। ধুলি মাখা আয়নায় কে যেন ছোট ছোট হস্থাক্ষরে পোলিশ অক্ষরে সাইন দিয়েছে আলেস। চমকে দুপা পিছিয়ে আসলাম। তারপরে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গিয়ে আয়নায় ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম ওখানে কিছুই লিখা নেই। পুরোটাই ধুলি মাখা। আপন মনেই হাসতে লাগলাম। বুঝলাম এসব অচেতন মনের ফালতু কল্পনা। সেদিন অফিসের শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বিকালেই ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার মাসিক শুরু হয়েছিল তাই আরো বেশী ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। বিকালে সূর্যালোক থাকতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই কর্টেজের কোন বাতিই জ্বালাই নি। রাত ঘনিয়ে এলে কর্টেজটা অন্ধকারই থেকে যায়। মাঝরাতে একটা করুণ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। অন্ধকার রুমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না আমি। কিন্তু মনে হচ্ছিলো কান্নাটা আমার পাশের লাইব্রেরী থেকেই আসছে।হাতড়ে হাতড়ে রুমের আলো জ্বালিয়ে গেলাম পাশের লাইব্রেরীতে। যাওয়ার সময় আমার ডেজার্ট ঈগল পিস্তলটা সাথে নিলাম। ভাবলাম হয়তো কর্টেজে কোন নেকড়ে ঢুকেছে। রাতে মাঝেমধ্যে নেকড়ের ডাক অনেকটা মানুষের কান্নার মতোই মনে হয়। তাই আমি ঝুকি নিতে চাই না। আমার রুম থেকে বেরুনোর সাথে সাথেই কান্নার আওয়াজটা থেমে গেল। লাইব্রেরীতে গিয়ে আলো জ্বালালাম। লাইব্রেরীতে কিছুই নেই। তবে গতকালের বাইবেলটা ডেস্কে খোলা পড়ে আছে। আমি কাছে গিয়ে দেখলাম গতদিন আলেসের যে দুই পাতা আমি পড়েছিলাম তার পরবর্তী পাতা অর্থাৎ তৃতীয় পাতা বেরিয়ে আছে। যেন আমার পড়ার অপেক্ষায়। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে গতকাল আমি বাইবেলটা বন্ধ করে শেলফে তুলে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ এটা ডেস্কে এলো কিভাবে? ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে বাইবেলটা তুলে আলেসের লেখাগুলি পড়তে শুরু করলাম। ..

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*