গ্যাংস্টার [৬ষ্ঠ পর্ব]

লেখাঃ রওনাক ইফাত জিনিয়া

কয়েক বছর আগের কথা আমি তখন এইটে পড়ি।পাশের এলাকায় ভাল স্কুল থাকায় ওখানে ভর্তি হই।একদিন আমি আর মিতু স্কুলে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একটা ছেলে আমাদের পথ আটকালো।ছেলেটা আমাদের সাথে দুষ্টামি করা শুরু করল।আমি চুপচাপ ছিলাম কিন্তু মিতু উত্তর দিচ্ছিল ছেলেটার কথার।কথা বলার একপর্যায়ে ছেলেটা মিতুর হাত ধরে ফেলল।আমরা ছাড়ানোর চেষ্ঠা করছিলাম কিন্তু ছেলেটা হাত ছাড়ছিল না।শেষে বাধ্য হয়ে আমি একটা চড় দেই আর ছেলেটা মিতুর হাত ছেড়ে আমাকে দেখে নিবে বলে শাসিয়ে যায়।

এরপর কয়েকদিন কেটে যায় আমরাও বিষয়টা ভুলে যাই।হঠাৎ করেই একদিন বিকেলে স্কুল থেকে আসার সময় ঐ ছেলে সাথে আরো কয়েটা ছেলে নিয়ে আমাদের সামনে আসে।আমরা দুজনেই খুব ভয় পেয়ে যাই।

~কি সুন্দরী বলেছিলাম না আবার দেখা হবে আর তুমি যা দিয়েছিলে তা সুদে-আসলে ফেরত দিব।

ছেলেগুলো আমাদের তুলে নিতে চাচ্ছিল এমনসময় কয়েকটা ছেলে এসে তাদের আটকায়।

–কিরে কি হচ্ছে এসব?

~দেখেন ভাই সব ব্যাপারে জড়িয়েন না এটা নিয়ে কোন কথা বলবেন না।আর আমরা আপনাদের গ্রুপের কারো ক্ষতি করিনি।শুধু শুধু এসব বিষয় নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে না লাগাই ভাল।

–কিন্তু হচ্ছেটা কি আর এই মেয়ে দুটাকে নিয়ে এমন কেন করছিস?

~এই শালীর তেজ বেশী আমাকে চড় মেরেছিল তাই আজ তেজ কমাতে নিয়ে যাচ্ছি।

–তোর যে চরিত্র শুধু শুধু নিশ্চয়ই চড় মারেনি?মেয়েদের জীবন নিয়ে এভাবে খেলিসনা চলে যা এখান থেকে।

~সে যাইহোক আমি বুঝে নিব।আপনার এত লাগছে কেন আপনার তো কেউ না?

–ওদের ছেড়ে দিয়ে চলে যা বলছি।

~না।কিছুতেই না।আজতো তেজ আমি কমাবই।

–তাহলে কিন্তু ভাইকে জানাতে হবে আর জানসইতো ভাই কেমন?

~দেখুন এদেরতো আমি শিক্ষা দিবই তারজন্য যদি আপনার ভাই কিছু বলে তবে আমরাও আমাদের মতি ভাইকে জানাব।শুধু শুধু এই একটা মেয়ের জন্য দুই ভাইয়ের মধ্যে লাগানো কি ঠিক হবে ভাই?

–তোরা তাহলে আমার কথা বুঝতেই পারিসনি।ভাই যদি জানতে পারে তোরা একে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিস তখন কি হবে তা নাহয় তোরা দেখে নিস।

~কেন এই মেয়ে কি ভাইয়ের কেউ নাকি?

–কি মনে হয় তোদের চড় মারার সাহস এই এলাকায় কারো হতে পারে?

~তা ঠিক তবে আপনি ঢপ পারছেন কারন এই ভাইয়ের কোন আত্নীয় হলে আমরা চিনতাম।

–আরে এই তো ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড।ভাই যদি এসব জানে তোদের খবর হয়ে যাবে।

~কি?আপনি সত্যি বলছেন?না না আপনি ঢপ মারছেন এদের বাঁচানোর জন্য।

–মিথ্যা কেন বলব?আর দেখ ভাবি ছাড়া কোন ছেলেকে চড় মারার সাহস কোন মেয়ের হতে পারে?

~কিন্তু…

–কোন কিন্তু না দ্রুত সরি বলে কেটে পড় নয়ত ভাইকে যেয়ে বললে কি যে হবে?

~আগে বলবেন না।সরি ভাবি আমি জানতাম না আপনি ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড।ভুল হয়ে গেছে দয়াকরে ভাইকে এসব বলবেন না।নাহিদ ভাই আপনি বলে দেননা যেন ভাইকে কিছু না বলে।

–তুমি ভাইকে কিছু বলোনা কেমন?
.
.ছেলেটা কথা বলে আমার দিকে চোখ দিয়ে ইশারা দিল আর আমিও কিছুই না বুঝে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম।ঐছেলেগুলো চলে গেল কিন্তু আমার মাথায় কিছুই ঢুকলনা।কোন ভাই?কিসের ভাই?আমিই বা কবে কার গার্লফ্রেন্ড হলাম?মাথায় এতগুলা প্রশ্ন।

আমিঃ আচ্ছা আপনি এসব কি বললেন আমিতো কিছুই বুঝতে পারছিনা?

–এই এলাকায় নতুন নাকি?

আমিঃ জ্বী।এই এলাকার P.L.H স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছি।কেন?

–জানো ওরা কারা আর তুমি নাকি ঐ ছেলেটাকে চড় মেরেছ?

আমিঃ চড় মারার মত কাজ করেছিল তাই মেরেছি।

–এখন যে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল বুঝো তুলে নিয়ে কি করত?

আমিঃ (….)

–তোমাদের বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলতে হল আমাদের।

আমিঃ তাই বলে এসব মিথ্যে?কোন ভাইয়ের কথা বলছিলেন আর যদি বলারই ছিল বোন বানাতে পারলেন না এসব বললেন কেন?

–ওরা ভাইয়ের দুইবোনকে ভাল করেই চিনে আর তখন এটাই মুখ থেকে বেড়িয়ে গেছে।

আমিঃ কিন্তু আপনি কত বড় একটা কথা বলেছেন বুঝতে পারছেন?এখন আমি নাহয় আপনার জন্য বেঁচে গেছি বলে কিছু বললামনা কিন্তু আপনার ভাই কিন্তু আপনাকে…

–ওসব আমি বুঝে নিব।ভাই খুব ভাল আর তার মেয়েদের প্রতি কোন আগ্রহ নেই তাই আমি ভাইকে ঠিক বুঝিয়ে নিব।তুমি বরং সাবধানে থেকো আর পারলে হাতটা কম চালিও।তবে এখন এলাকায় তোমার আর সমস্যা হওয়ার কথা না।তবুও যদি সমস্যা হয় তবে রাতুল ভাইয়ের কথা বলো সমস্যা হবেনা।

মিতুঃ আপনাদের অনেক ধন্যবাদ নাহিদ ভাই এখন আমরা আসি।
.
.এরপর আর আমাদের সমস্যা হয়নি।তবে সবথেকে বড় সমস্যাটা হল আমি এমন একজনের গার্লফ্রেন্ড হয়ে গেলাম যাকে আমি চিনিইনা আর না দেখেছি কখনও।এখন কোন ছেলে ডিস্ট্রার্ব করতে আসলেই মিতু বলে চিনেন ওকে ওই কিন্তু রাতুলের গার্লফ্রেন্ড।সত্যি বলতে খারাপ লাগছিলনা ভালই লাগছিল আর ওটা আমার এলাকা ছিলনা তাই পরিচিত কারো কানে কথাটাও এলোনা।এদিক দিয়ে আমি আর মিতু ইচ্ছামত চলতে পারছিলাম।
.
.কথায় আছে চোরের দশদিন আর গেরস্থের একদিন।ধরা আমাদেরও একদিন খেতে হল আর সেটা একদম জায়গা মত।তখন দ্বিতীয় বার্ষিকি পরীক্ষা চলছে তখন আর সেদিন গণিত পরীক্ষা ছিল।বীজগণিত ভাল পরলেও পাটীগণিতে কিছুটা দূর্বল ছিলাম তাই পরীক্ষায় দশ ছাড়তে হয়েছিল বলে মনটা খারাপ।বাড়ি আসছিলাম হঠাৎ একটা লোক আমাদের দাঁড়া করালো।

লোকঃ তোমরা কি এইস্কুলেই পড়?

মিতুঃ জ্বী কেন?

লোকঃ তোমাদের নাম কি?

মিতুঃ আমি মিতু আর ওই নীলা।আপনি কে বলুনতো আর এতকথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?

লোকঃ না মানে নীলা..

মিতুঃ ভুলেও ও নাম মুখে আনবেন না।আপনি মনে হয় নীলাকে চিনেননা।

লোকঃ আসলেই আমি চিনতামনা তবে এখন চিনলাম।আসলে আমি নীলাকে কিছু কথা বলতে চাই।

মিতুঃ ভাই ওখানেই চেপে যান নয়ত খুব খারাপ হয়ে যাবে।

লোকঃ কি হবে?

মিতুঃ আপনিতো দেখি কিছুই জানেন না।নীলা কে জানেন?নীলা রাতুল ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড।

লোকঃ হা হা হা।তাই নাকি?জানতাম নাতো

মিতুঃ হাসার কি হল আর এখনতো জেনে গেলেন এবার নিজের রাস্তা মাপেন নয়ত ভাই জানলে আপনার খবর আছে।কিরে নীলা তুই চুপ করে আছিস কেন কিছু বল?

আমিঃ দেখুন আমার মনটা এমনিতেই খারাপ দয়াকরে জরুরী কোন কথা থাকলে বলেন নয়ত আপনি এখন আসতে পারেন।

লোকঃ তুমি কি আসলেই রাতুলের গার্লফ্রেন্ড?

(যদিও আমি নিজে কোনদিন কাউকে বলিনি আমি রাতুলের গার্লফ্রেন্ড কারন ঐ কাজটা মিতু করত আমার এসব বলতে রুচিতে লাগত কিন্তু এই প্রথম আমি বললাম)

আমিঃ কেন কোন সন্দেহ আছে?থাকলে নাহিদ ভাই আর রাতুলকে জিজ্ঞেস করে নিবেন।

লোকঃ আমি তোমাকেই খুজছিলাম আসলে এলাকায় আমি নতুন আর আমার কিছু ঝামেলা হয়ছে তাই রাতুলকে খুজছিলাম।পরে একজন বলল তুমি ওর গার্লফ্রেন্ড তোমাকে বললে নাকি দ্রুত কাজ হবে।আমাকে রাতুলের সাথে দেখা করিয়ে দেওনা।

আমিঃ আমি পারবনা আপনি যে কাউকে রাতুলের কথা বললেই আপনার দেখা করার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

লোকঃ অন্য সবাই আর তুমি কি এক?তুমিতো ওর আপনজন তোমার কথার মূল্যই অন্যরকম।
.
.এভাবে অনেক কথা হল লোকটা কিছুতেই আমাকে ছাড়ছেনা।এদিকে আমিও স্বীকার করতে পারছিলামনা যে আমি রাতুলকে জানিই না আবার আমি লোকটাকেও রাতুলের সাথে দেখা করাতে পারছিলামনা কারন আমি নিজেইতো চিনিনা।হঠাৎ করে মিতু বলে উঠল।

মিতুঃ আচ্ছা ঠিক আছে কাল এইসময় এখানে থাকবেন আপনার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

মিতুর কথা শুনে আমি কি বলব বুঝতেই পারছিলামনা।লোকটা চলে গেল আমি মিতুকে ধরতেই ওই বলল চিন্তা না করতে ওর কাছে নাহিদ ভাইয়ের নাম্বার আছে তাকে বলে ঠিক একটা ব্যবস্থা করে নিবে।আমিও চিন্তামুক্ত হলাম কিছুটা তবে পুরোপুরি হতে পারছিনা।

পরদিন পরীক্ষা শেষে বের হতেই লোকটার সাথে দেখা।বারবার একই কথা বলছিল রাতুল কোথাই।আমি মিতুরদিকে তাকাতেই মিতু আস্তে বলল চিন্তা না করতে নাহিদ ভাইয়ের সাথে কথা হয়েগেছে রাতুল ভাই চলে আসবে।কিছুক্ষন যাওয়ার পরও রাতুল এলোনা দেখে মিতু নাহিদ ভাইকেই কল দিল আর কিছুক্ষন পরে নাহিদ ভাই এল।

নাহিদ ভাইঃ আরে মিতু তুমি আমাকে কেন আসতে বললে আর ভাইতো এখানেই আছে।

মিতুঃ কোথায় আপনার ভাই?

নাহিদ ভাইঃ কেন এইযে

(বলেই লোকটাকে ইশারা করল।আমি আর মিতু দুজনেই একসাথে “কি” বলে উঠলাম আর দুজনেই চোখে সরিষা ফুল দেখছিলাম।তারমানে আমরা রাতুলকেই কাল ওসব কথা বলেছিলাম।আমরা কি বলব ভাষা খুজে পাচ্ছিলামনা।আমাদের এই অবস্থা রাতুল হাসছিল)

নাহিদ ভাইঃ কি ব্যাপার ভাই আপনি হাসছেন কেন আমিতো কিছুই বুঝলাম না?

রাতুলঃ তোর বুঝার দরকার নেই।তুই এখন যা আমি পরে তোর সাথে দেখা করব।

নাহিদ ভাইঃ আচ্ছা।আর ভাই কোন লোক যেন আপনার সাথে দেখা করতে চাইতেছিল তারসাথে একটু কথা বলে নিয়েন।

রাতুলঃ তুই যা আমি বলে নিব কথা।

(বেশ কিছুক্ষন আমি আর মিতু চুপ করে আছি দেখে রাতুল প্রথম কথা বলল)

রাতুলঃ এতদিন শুনে এসেছি মায়ের কাছে মামাবাড়ির গল্প বলার কথা আজ নিজেই দেখলাম।হা হা হা।

আমিঃ দেখুন প্রথমে কিন্তু এই কাহিনী নাহিদ ভাই শুরু করেছে আর পরে যখন কাজে লেগেছে তখন মিতু ব্যবহার করেছে।আমি কালকেই প্রথম ব্যবহার করছি আর আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন আমি তেমন মেয়ে নই তাই আর কখনও কিছু বলবনা।

রাতুলঃ নাহিদ আমাকে সব বলেছিল।কিন্তু সেদিনের পর থেকেও তোমরা একই কাহিনীর ব্যবহার করছ দেখে অনেকেই আমাকে অনেক কিছু বলেছে তাই আমি তোমাদের দেখতে এসেছিলাম।ভাগ্যিস এসেছিলাম।

আমিঃ দেখুন আমরা দুঃখিত আর হবেনা।

রাতুলঃ ঠিক আছে।তবে ইচ্ছে করলেই কাহিনীটা সত্যি করতে পার।

আমিঃ মানে?

রাতুলঃ কিছুনা ভাল থেকো আর কোন সমস্যা হলে আমাকে জানিও।
.
.এরপর আমি বা মিতু কেউই আর এই কাহিনীর ব্যবহার করিনি কিন্তু রাতুলের ঐদিনের কথা বলার পর স্কুলেও ছড়িয়ে গেল আমার আর রাতুলের সম্পর্কের কথা।কাউকেই আমি বিশ্বাস করাতে পারিনি ঘটনা মিথ্যে কারন তখন রাতুলের গ্রুপ বা ওর বিরোধী গ্রুপ সবাই আমাকে ভাবি ডাকা শুরু করেছে।রাতুলও মাঝে মাঝেই রাস্তায় আমাদের দাঁড় করিয়ে কথা বলত।আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু করতে বা বলতে পারতামনা কারন সে রাতুল গ্রুপের লিডার ছিল অনেক ক্ষমতা তার আর এই ক্ষমতার জন্যেও তারে কিছু বলার সাহস আমাদের হয়নি।ধীরে ধীরে অবস্থা এতটাই খারাপ হল যে কোন ছেলে স্কুলে আমার সাথে কথা বললে বা বিরক্ত করলে পরদিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হত আর এসবকিছু রাতুলের কাজ ছিল।একবার তারসাথে এসব বিষয়ে কথাও বলেছিলাম সে জানিয়ে দিল সে আমাকে ভালবাসে।

আমার মাথা ঘুরছিল কি করব ভেবে।যদিও ভুলের শুরু আমার দ্বারা হয়নি তবুও আমার একটা ভুল আমাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলেছে।ধীরে ধীরে আমাদের এলাকাতেও বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেল আর পরিবারও জেনে গেল।আমি পরিবারকে সত্য কথাই বলেছি।কিন্তু রাতুল নাকি আমাকে প্রথম দেখাতেই ভালবাসতে শুরু করেছে।পরিস্থিতি এমন হল যে টেনে উঠতেই বাধ্য হয়ে আমার পরিবার আমাকে বিয়ে দিতে চাইল।তাতেও সমস্যা রাতুল আমার পরিবারকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল সে আমাকে বিয়ে করবে আমার বিয়ে অন্য কারো সাথে হতে পারেনা।তারপর বাবা অনেক কষ্টে হাসানের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে যদিও বিয়ের কোন ইচ্ছেই আমার ছিলনা তবুও S.S.C পরীক্ষার মাত্র তিনমাস আগেই আমার বিয়ে ঠিক হল।রাতুর যেন জানতে না পারে এই বিষয়ে তাই খালার বাসাতে বিয়ের আয়োজন করা হল কিন্তু সেখান থেকেই রাতুল আমাকে কিডন্যাপ করে।এরপরের ঘটনা সবার জানা।
(চলবে)



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*