গ্যাংস্টার [১০ম পর্ব]

লেখাঃ রওনাক ইফাত জিনিয়া

.রাতুলঃ তুমি ঘুমাওনি?সরি আমি…

আমিঃ আজ আমাকে কিছু সত্যি কথা বলবেন?

রাতুলঃ বল কি জানতে চাও?

আমিঃ বসেন বলছি।সত্যিই কি ভালবাসেন আমায়?

রাতুলঃ হুম।নিজের থেকেও বেশি।

আমিঃ কিন্তু আমিতো আপনাকে একটুও ভালবাসিনা আর কখনও ভালবাসতে পারব কিনা তাও জানিনা এসব জেনেও কি আপনি আমার সাথে থাকতে চান?

রাতুলঃ হুম চাই।কারন আমি জানি একদিন তুমি আমাকে ঠিক ভালবাসবে।আমি সেদিনের অপেক্ষাতে বছরের পর বছর এভাবে থাকতে রাজি।

আমিঃ তাই বুঝি সেদিন..

রাতুলঃ আমি জানি নীলা সেদিন আমি যা করেছি তা পাপ।তুমি আমার স্ত্রী হলেও তা করার অধিকার আমার ছিলনা কিন্তু সেদিন রাগের বশে কাজটা করেছি ঠিকই কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি।আমাকে একটা সুযোগ দাও আমি সব ঠিক করে দিব।
.
.তারপর যদিও আমি রাতুলকে ভালবাসতে পারিনি তবে তার সাথে স্বাভাবিক জীবন যাপনের চেষ্টা করছিলাম।পরের পরীক্ষা গুলোতে রাতুল আমাকে নিয়ে যেত ও নিয়ে আসত।ধীরে ধীরে রাতুলের সাথে সময় কাটাতে শুরু করি।এখন আর রাতুলকে দেখলে আমার শরীর রাগে জ্বলে যায়না।আসলে ধীরে ধীরে রাতুলের জন্য আমার মনে হয়ত জায়গা তৈরি হচ্ছে।আমি সব ভুলে নতুন ভাবে শুরু করতে চাই সবকিছু।তবে নাহিদ ভাই কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে।আগের মত আর বাসায় আসেনা আর আসলেও বেশ চুপচাপ।দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল।
.
.বেশ কিছুদিন ধরেই শরীরটা ভাল লাগছেনা।কিছুই খেতে ইচ্ছে হচ্ছেনা আর খেলেও বমি হয়ে যাচ্ছে।সেদিনতো হঠাৎ করে জ্ঞান হারালাম।যখন জ্ঞান ফিরল দেখলাম সবাই রুমে বসে আছে।

রাতুলের মাঃ আমি কোনদিন ভাবতেই পারিনি এই দিনটা দেখতে পাব আর তাও এতদ্রুত!আজ সত্যিই আমি বহুদিন পর এত খুশি হলাম আর এই সবকিছু হয়েছে শুধু তোর জন্য মা।দোয়া করি আল্লাহ্ তোরে অনেক সুখী করুক।

আমিঃ কি হয়েছে মা?আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা দয়াকরে একটু ভেঙ্গে বলবেন?

রাতুলের মাঃ তুই মা হতে যাচ্ছিস নীলা আর আমি দাদু।

(কথাটা শুনে মাথা ঘুরতে শুরু করল।এটা কিভাবে সম্ভব?রাতুলের সাথেতো আমার এখনও আমার কোন শারীরিক সম্পর্ক নেই তারমানে এটা সেদিনের ঘটনার ফল?না।এটা কিছুতেই হতে পারেনা।তিনটা মাস আমি যেই ঘটনা ভুলার জন্য চেষ্টা করেছি আজ সেই ঘটনা এভাবে আবার আমার সামনে আসতে পারেনা।চাইনা আমার এই বাচ্চা।চোখ থেকে দুফোঁটা পানি পড়ে গেল।

রিমাঃ ভাবি এখনতো আনন্দে কাঁদছ দুদিন পর সে এসে যখন জ্বালাবে তখন কষ্টে কাঁদতে হবে বুঝলা?

রাতুলের মাঃ রিমা,নাহিদ চল আমরা এখন যাই।বাচ্চার বাবা-মাকে একটু একা থাকতে দে।

(সবাই চলে গেলে রাতুল আমার পাশে বসে আমার হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল)

রাতুলঃ আজ আমি এতটাই খুশি যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিনা নীলা।এতদিন আমি অনেক অন্যায় করেছি কিন্তু এখন থেকে তুমি আর আমাদের বাবুকে নিয়ে আমি সব নতুনভাবে শুরু করব।তোমরাই হলে আমার পৃথিবী আর কিছুই চাইনা আমার।জানো ডাক্তার যখন প্রথম কথাটা বলল আমিতো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আল্লাহ্ আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার দিতে যাচ্ছে।তুমি ভাবতেও পারছোনা নীলা আমি আজ কতটা খুশি।না চাইতেই তুমি আমাকে সবচেয়ে দামী উপহার দিতে যাচ্ছো নীলা।আমাদের পরিবার পূর্ণ হতে যাচ্ছে নীলা।নীলা?এই নীলা?আমি এতকথা বলে যাচ্ছি আর তুমি একটা কথাও বলছোনা?

(আমি কেঁদে কেঁদে বললাম)

আমিঃ আমি এই বাচ্চা চাইনা।

রাতুলঃ কি?এসব কি বলছ তুমি নীলা?তোমার মাথা ঠিক আছেতো?বাচ্চা আল্লাহ্ র দেয়া অনেক বড় একটা উপহার নীলা।উঁনি আমাদের আজ সেই উপহারই দিতে যাচ্ছেন আর তুমি বলছ এই বাচ্চা তুমি চাওনা?কেন নীলা?কেন?

আমিঃ কেন?কেন জানেন না আপনি?সব ভুলে গেছেন?আপনার মত আমিও সব ভুলে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু এই বাচ্চা আবার সব মনে করিয়ে দিল।এই বাচ্চা আপনার সেই ধর্ষনের প্রমাণ যা আমি প্রতিনিয়ত ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি।নিজের স্বামীর কাছে ধর্ষিত হওয়ার ফল এই সন্তান।এই থাকলে প্রতিনিয়ত আমার মনে সেদিনের ঘটনা সতেজ হয়ে উঠবে তাই আমি এই বাচ্চা চাইনা।

রাতুলঃ এসব তুমি কি বলছ নীলা?আমি স্বীকার করি তোমার অমতে আমার সেদিন আগানো ঠিক হয়নি কিন্তু তাতে এই বাচ্চার কি দোষ?সেতো কোন অন্যায় করেনি।অন্যায় করেছি আমি তার শাস্তি তুমি আমাকে দাও একটা নিষ্পাপ প্রাণকে দিতে পারনা যে এখনও এই পৃথিবীর মুখই দেখেনি।পাপ করলে আমি করছি সে করেনি আর আল্লাহ্ চেয়েছেন বলেই এটা হয়েছে আল্লাহ্ না চাইলে কখনও এই প্রাণের জন্মই হতোনা।নীলা আমাদের কারো অধিকার নেই এই প্রাণকে নষ্ট করার।আমি আমার ভুল স্বীকার করছি তবে এই কোন অবৈধ সন্তান নয় এই বৈধ।

আমিঃ যখনই আমি একে দেখব আমার সেদিনের কথা মনে পড়বে।

রাতুলঃ যখনই তোমার সেদিনের কথা মনে পড়বে তুমি আমাকে শাস্তি দিও নীলা আমি তোমার সব শাস্তি মাথা পেতে নিব কিন্তু ভুলেও একে হত্যা করার কথা ভেবোনা।
.
.এরপরের দিনগুলো অতিবাহিত হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আমার কাছে তা অনাকাঙ্খিত।যখনই আমি নিজেকে আয়নায় দেখতাম আমার সেদিনের কথা মনে হত।তবে ধীরে ধীরে আমার মাঝে মাতৃত্ব জেগে উঠল।ভাবতাম আসলেইতো এই বাচ্চার কোন দোষ নেই।
আমার কোন অধিকার নেই একে হত্যা করার কারন স্বয়ং আল্লাহ্ র ইচ্ছেতেই এসব হয়েছে।পরিবারের সবাই মিলে আমার অনেক খেয়াল রাখত।রাতুল যতক্ষন বাসায় থাকত ততক্ষন পানিটা পর্যন্ত ভরে খেতে দিতনা।বলত যা লাগবে শুধু আমায় বলবে।চাওয়ার আগেই সব হাতের কাছে পেয়ে যেতাম।রাতুল ঐসব মারামারি ছেড়ে নিজের ব্যবসা আর পরিবারের প্রতি মনোনিবেশ করল।তবে নাহিদ ভাই খুব একটা আসতনা।বলতে গেলে আমার মা হওয়ার সংবাদটা শোনার পর মাত্র দুদিন এসেছিল তবুও অনেক দরকারে পড়ে।দেখতে দেখতে আমার সাত মাস চলছে।আজকাল কোন কাজই আমি করতে পারিনা তবে আমাকে করতেও হয়না।পরীক্ষা করে যেদিন জানতে পারলাম আমার পেটে একটা নয় দুটো বাচ্চা সেদিনতো রাতুল পুরো হাসপাতালকেই মিষ্টি খাইয়েছিল।
[বিঃদ্রঃ রাতুলতো গ্যাংস্টার এই ভয়ে মানুষ আর মিষ্টি খায়নি বলে পুরো হাসপাতালকে খাইয়েছে  ].
.রাতুলের আনন্দ সেদিন দেখে কে?ওর আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল বাচ্চা আমার না ওর হচ্ছে।বাচ্চা নিয়ে ওর পাগলামি দেখে আমার খুব হাসি পেত।আমাকে এভাবে উপদেশ দিত যে মনে হত পৃথিবীতে আমিই প্রথম মা হতে যাচ্ছি।আমার যাতে খারাপ না লাগে তাই আমার মাকে এনে বাসায় রাখা হল।মা বলেছিল আমাকে ওই বাসায় নিয়ে যাবে।রাতুল সোজা না বলে দিল।এমন একটা ভাব যেন আমি আমার বাবার বাসায় গেলে তারা আমার কোন যত্নই নিবেনা।যাইহোক সবমিলে বহুদিন পর নিজেকে খুব সুখী লাগছে।রাতুলের কৃত সব কাজ আমি ভুলে গেছিলাম আর ওই এখন আসলেই একজন আদর্শ ছেলে,স্বামী,বাবা আর ভাই হয়ে উঠেছিল।সবমিলে সবাই খুব ভাল কাটাচ্ছিলাম দিনগুলো।
.
.আমার আটমাস চলছে।একটা মাস পরেই আমার আর রাতুলের দুসন্তান এই পৃথিবীতে আসবে।সেদিন নাহিদ ভাই বাসায় এল।একি হাল হয়েছে তার?চোখের নিচে কালি, শরীরের হাড় বের হয়ে গেছে,ফর্সা রং শ্যামলা হয়ে গেছে,দেখলেই বুঝা যায় এই কয়েক মাস তার কেমন কেটেছে।কতদিন পর এসেছে বাসায় সে।বাসায় এখন আমি আর মা আছি।মা গোসল করছে তাই আমিই বসে অনেকক্ষন গল্প করলাম তার সাথে কিন্তু নাহিদ ভাইকে কেমন অন্যমনস্ক লাগছে।কিছুক্ষন পরে নাহিদ ভাই আমাকে বলল-

নাহিদ ভাইঃ এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পার নীলা?যদিও জানি তুমি কোন কাজ করোনা।

আমিঃ আরে ভাই এভাবে বলছেন কেন?আপনি বসেন আমি এক্ষুনি দিচ্ছি।
.
.পানি নিয়ে এসে দেখি নাহিদ ভাই চলে যাচ্ছে।

আমিঃ নাহিদ ভাই এইতো আসলেন ঘন্টাও হলোনা এক্ষুনি কোথায় যাচ্ছেন?

নাহিদ ভাইঃ আর বলোনা একটা জরুরী কল এল এখনই যেতে হচ্ছে।দাও পানিটা খেয়েই যাই এত কষ্ট করে এনেছ।

আমিঃ এই নিন ভাই পানি।
.
.নাহিদ ভাই পানি খেলে আমি গ্লাসটা নিয়ে যেও আসতে যাব ওমনি ফ্লোরে পিছলা খেয়ে পড়ে সামনেই সিঁড়ি থাকায় সিঁড়িতে গড়ে পড়ে যেতে লাগলাম।নাহিদ ভাই আমার হাতটা ধরলেও আমার হাতটা কিভাবে যেন ফসকে গেল আর আমি পড়ে গেলাম।নাহিদ ভাই জোরে নীলা বলে চিৎকার দিল আর আমি মা বলে।তারপর আর কিছুই মনে নেই আমার।আমি জ্ঞান হারালাম।
.
.যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমি হাসপাতালে।আমি তাকিয়ে দেখি সবাই হাসপাতালে।রাতুল পাশে বসে আসে।চোখগুলো লাল দেখেই বুঝা অনেক কেঁদেছে ওই।আমি নিজের পেটে হাত দিয়ে দেখি আমার পেটে কিছু নেই।আমার বাচ্চা!তবে কি?না না এটা কিছুতেই হতে পারেনা।

আমিঃ রাতুল আমার বাচ্চা কোথায়?আমার বাচ্চার কিছু হয়নিতো?এই রাতুল তুমি কথা বলছ না কেন?বলোনা বাচ্চা কোথায়?আমার বাচ্চাআআআআ

রাতুলঃ নীলা তুমি শান্ত হও।দয়াকরে এভাবে কেঁদোনা।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*