Home Login Register

সুপ্রিয় পাঠক বিশেষ কারণবসত আগামী কিছুদিন গল্প নিয়মিত আপডেট বন্ধ থাকবে, সাময়িক এই সমস্যার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি ।

কৃষ্ণকলি [পর্ব- ৪,৫,৬]


প্রিয় পাঠক আমাদের টিম বিনা স্বার্থে আপনাদের জন্য গল্প আর্কাইভ করে, আপনাদের নিকট বিশেষ অনুরোধ যে, বিডিস্টোরি২৪ ডটকম এর স্বার্থে আপনারা এডগুলোতে ক্লিক করবেন, তবে দিনে একবারের বেশী না, যদি আমাদের সাইটকে ভালোবেসে থাকন তো.......
Home / অনামিকা ইসলাম, রোমান্টিক গল্প / কৃষ্ণকলি [পর্ব- ৪,৫,৬]

Admin › 10 months ago

কৃষ্ণকলি

লেখা- অনামিকা ইসলাম “অন্তরা”

[পর্ব- ৪,৫,৬ ]

জি, আপনার বোধ হয় আর কোনো কষ্ট করতে হবে না। সুইটি এখন থেকে আমার সাথে’ই যেতে পারবে। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে কথা’টা বলছিলাম আমি। – সেই জন্য’ই তো বললাম ভালো’ই হলো। মৃদু হেসে বাঁধনের জবাব। “আচ্ছা, আসি আন্টি। আসসালামু আলাইকুম।” বাঁধনের মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। একমিনিট দাঁড়ান, আমিও অফিসে যাব। কথাটা বলে আমায় থামালো বাঁধন। বাঁধন ওর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। বাঁধনের পাশের সিটে চুপচাপ বসে আছি এই আমি। গাড়ি চলছে। কিন্তু গাড়ি মুখে’ই কোনো কথা নেই। দুজনে’ই নিরব। -তারপর??? কলেজ থেকে ফিরবেন কখন? নিরবতা ভেঙে বাঁধনের প্রশ্ন। – ফিরব কখন সেটা তো জানি না। তবে ৩টা ২০পর্যন্ত কলেজ টাইম। সামনের দিকে তাকিয়ে বাঁধনের প্রশ্নের জবাব দিলাম আমি। বাঁধন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল- ” তাহলে তো মনে হয় আমার সাথে ফিরতে পারবেন। আমিও অফিস থেকে চলে আসব ৪টার দিকে। ততক্ষণে আপনার নিশ্চয় অফিশিয়াল কাজ সব শেষ হয়ে যাবে??? -হুম, শেষ হয়ে যাবে। প্রতিউত্তরে আমার জবাব। তারপর বাকি রাস্তা আর কোনো কথায় হয়নি। বাঁধন আমাকে কোনো প্রশ্ন করেনি আর আমিও কোনো কথা বলার সুযোগ পায়নি। গাড়ি থেকে নামার সময়___ ” এই! সাবধানে, সাবধানে!!! গাড়ি আসছে….” বাঁধনের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট হাসি দিয়ে বললাম- আসি তাহলে…. বাঁধন আমার দিকে তাকিয়ে বলল- ” অপেক্ষা করব ৪টার সময় এখানে।” বাঁধনের থেকে বিদায় নিয়ে কলেজ গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। আমার প্রথম ক্লাস ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের ফিজিক্স সকাল ১০টায়, দ্বিতীয় ক্লাস ২য় বর্ষের ছাত্রীদের ফিজিক্স দুপুর ১২টা ৪০মিনিটে। ১টা ২০মিনিটে আমার ক্লাস শেষ। তারপর আমার পুরো অবসর। অফিসিয়াল কাজ সেরেও ২টা কিংবা আড়াইটার ভিতর কলেজ থেকে বের হওয়া যাবে, আর ছাত্রীদের প্রাইভেট কিংবা কোচিং করালে তাহলে সেটা অন্য কথা। সেদিন ক্লাস+অফিসিয়াললি কাজ সেরেও দেখলাম ঘড়িতে মাত্র ২টা বেজে ২০মিনিট। অন্য কোনো কাজ না থাকায় বের হয়ে গেলাম কলেজ থেকে। কলেজ গেইটে গিয়ে অটোতে উঠব কি না সেই দ্বিধাদ্বন্ধে পরে গেলাম। বাঁধন তো বলেছিল ৪টায় বাসায় ফিরবে, ততক্ষণ কি আমি অপেক্ষা করব? মাত্র তো আড়াইটা বাজে। না, থাক। আমি বরং বাসায় চলে যায়। এই বলে বাসায় চলে যাচ্ছিলাম।পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে আমার সামনে থামল। গাড়ির কাছাকাছি যেতে’ই দেখলাম বাঁধন বসে।। আপনি? এ সময়? আপনার না ৪টার আসার কথা? অবাক হয়ে বাঁধনকে প্রশ্ন করলাম। ~ আমারও তো একই প্রশ্ন মিস কৃষ্ণকলি! আপনি এ সময় এখানে??? বাঁধনের প্রশ্নোত্তরে বললাম, আমার দুইটা ক্লাস। সেটা ১টা ২০পর্যন্ত’ই। অফিসিয়াল কাজও তেমন ছিল না। তাই টিফিন করে সোজা চলে আসলাম। আমার অফিসে এখন লাঞ্চটাইম চলে। অসুস্থ্যতার অজুহাত দেখিয়ে বস মামার থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসলাম। হেসে হেসে বাঁধনের জবাব। – বস মামা? সেটা আবার কেমন ডাক? আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম বাঁধনকে। বস মামা মানে বস আমার মামা হয়। আপন মামা। বাবার অনুপস্থিতিতে ঐ মামায় বাবার কোম্পানির দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন। – আংকেল? আংকেল কোথায়??? বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বাঁধনকে প্রশ্নটা করলাম। বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল__ বাবা?!!! বাবা হারিয়ে গেছে। আমাদের রেখে দুর অজানায় পালিয়ে গেছে। বাঁধনের কথা শুনে হচ্ছিল আমার ভিতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ভেঙে চূরমার হয়ে যাচ্ছে। কোনো কথা না বলে বাঁধনের পাশের সিটে গিয়ে বসলাম, ছোট্ট করে বললাম “স্যরি”। বাঁধন মনে হয় আমার এই স্যরি’টা আশা করে নি। তাই তো আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল- ” Sorry?!!! But Why?” আমি জানতাম না আংকেল নেই। জানলে এভাবে আপনাকে কষ্ট’টা মনে করিয়ে দিতাম না। আমি আবারও বলছি স্যরি….. আর আল্লাহ ওনাকে শান্তিতে রাখুক সেই দোয়ায় করি। ভেজা গলায় কথাগুলো বললাম। এদিকে বাঁধনের অবাক হওয়ার মাত্রা’টা যেন বেড়ে’ই চলছে উত্তরোত্তর। বাঁধন অবাক হওয়ার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল। আর তাই তো আমার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করল- ” নেই মানে? What do you mean?” চোখের জলটুকু মুছলাম। করুণ চোখে বাঁধনের দিকে তাকালাম। তারপর___ ” আমি সত্যি’ই দুঃখিত। আমি জানতাম না আংকেল আর এ পৃথিবীতে নেই। আর যখন জানতে পারলাম তখন মনে হলো আংকেলের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমি আপনাকে অনেকটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। এই জন্য I am sorry….” আচমকা বাঁধন stopped, stopped বলে চেঁচিয়ে উঠল। আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম। কিন্তু এভাবে চেঁচানোর মানে’টা বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর বলল, আমার বাবা হারিয়ে গেছে দুর অজানায়,তার মানে এই নয় আমার বাবা আর বেঁচে নেই। আমার বাবা বেঁচে আছে। ওনাকে বেঁচে থাকতে’ই হবে। আমাদের ভালোবাসার টানে ওনাকে একদিন ফিরে আসতেই হবে। তা পৃথিবীর যে প্রান্তে’ই হোক না কেন। এটুকু বলে বাঁধন চুপ হয়ে গেল। আমিও কোনো কথা বাড়ালাম না। তাই আমিও চুপ করে আছি। কিন্তু কৌতূহলী মনকে কিছুতেই শান্তনা দিতে পারছি না। পারছিলাম না একটা হিসেব মিলাতে। হিসেবটা মিলানোর জন্য আমার বাঁধনের হেল্প দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে ওকে এ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস না করাই ভালো। আর তাই চুপ করে আছি। মিনিট দশেক এভাবে একই স্থানে গাড়ির ভেতর ২জন চুপ করে বসে ছিলাম। নিরবতা ভাঙে বাঁধন। সামনের দিকে তাকিয়েই বলতে থাকে___ ” বাবা ছিলেন ভিষন ছটফটে এবং দুরন্ত স্বভাবের। সারাক্ষণ কাঁধে গিটার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো’ই ছিল ওনার স্বভাব। দুরন্ত এবং চঞ্চল বাবা ছিলেন স্বাধীনচেতা আর মুক্তমননের অধিকারী। কোনো ধরাবাধা নিয়ম ওনি পছন্দ করতেন না। আর তাইতো লেখাপড়া শেষ করে দাদার ব্যবসায়ে যোগ না দিয়ে একটা এফএমে আর.জে হিসেবে জয়েন করলেন। সেই রেডিওর পোগ্রামের মাধ্যমে’ই আমার বাবা অসংখ্য দুঃখী মানুষের দুঃখ দুর করে দিয়েছেন। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার বাবা হয়ে গেলেন সকলের প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। দিনে কাঁধে গিটার নিয়ে বন্ধুদের সাথে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো আর রাত্রে রেডিওতে মানুষের লাইফ সাপোর্ট দেওয়া। এটুকুই ছিল বাবার কাজ। বাবার জীবন যেন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু না!!! বাবার জীবন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাবার জীবনে আরো একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সেটা ছিল ‘সংসার’। কিন্তু বাবার হাবভাব দেখে মনে হতো সংসারের প্রতি যেন ওনার কোনো দায়িত্ব’ই নেই। বাবা মাকে একদম’ই সময় দিত না। দিত না বললে ভুল হবে, আসলে বাবার সময় হতো না। মা সব দেখেও চুপ করে ছিল। ভাবত পরে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সুইটি জন্ম নেওয়ার পরেও যখন বাবার চালচলনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না, তখন আমার মা মুখ খুলে। বাবাকে এই নিয়ে কথা বলে। দাদাও বাবাকে বকাঝকা করত। মায়ের বকবকানি, দাদার বকাঝকা আমার বাবার ব্যক্তিত্বে বোধ হয় আঘাত হানে। তাই তো একদিন ভোরে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাবা বাসা থেকে চলে যায়। বাবা চলে যান বলে গেছেন। কিন্তু কোথায় চলে গেছে সেটা বলে যান’নি। আমার মা আজও বিশ্বাস করে বাবা আসবে। ওনাকে আসতে’ই হবে। এফএমে লাখো মানুষের শ্রোতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলা’টা তো খুব ভাগ্যের ব্যাপার। তাহলে আংকেলকে সবাই কেন এমন করত? আমি আজ’ই আন্টির কাছে যাব। আন্টির কাছের কাছে গিয়ে আংকেলের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে বলব। কারন- আংকেল অবশ্যই একবার হলেও ফোন দিয়েছিল আন্টিকে। -খবরদার! যা বলছো এখানেই। এই কথা’টা যাতে মায়ের সামনে না বলা হয়। তাহলে কিন্তু…… (……)……??? আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত চোখে কথাটা বলল বাঁধন। কেন? ওনি কি এফএমকে ভালোবাসেন না? প্রশ্ন করলাম বাঁধনকে। তাচ্ছিল্যের স্বরে বাঁধনের জবাব, ” ভালোবাসা?!!! হা, হা। ঘৃণা করে মা। শুধু ঘৃণা না, ভয়ংকর ঘৃণা। এই নামটাই ওনি সহ্য করতে পারেন না আমার মা। এফএমের “ফ”টাও সহ্য করতে পারেন না। বাঁধনের কথা শুনে আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। বলতে পারলাম না, বাঁধন! আমিও তো এফএমে প্রোগ্রাম করতাম একসময়। প্রতি বৃহস্পতি’বার দিন আমায় সেখানে যেতে হতো প্রোগ্রাম করার জন্য। অবশ্য মধ্যিখানে অনেকটা দুরে সরে গিয়েছিলাম রেডিও থেকে। কিন্তু আজ এতবছর পর লাখো শ্রোতার ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে যখন সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আবার প্রোগ্রাম’টা শুরু করব, তখন…..(……)…..??? যাক! এখন কথা না বলাটাই শ্রেয়। আর তাই আমিও কোনো কথা বললাম না। চুপ করে বাঁধন গাড়ি চালালো। বাকি রাস্তা একটা কথাও হলো না আর। সেদিন বান্ধবী ডাঃ নুসরাত কল দিয়ে বলল, ও ঢাকায় ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। আমাকে দেখতে ওর ভিষণ ইচ্ছে হচ্ছে। আমি যেন ওর বাসায় যায়। কলিজার টুকরা বান্ধবীর ইচ্ছে বলে কথা। ফেলতে পারিনি। বাঁধনের মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে ছুঁটে চললাম নুসরাতের বাসার উদ্দেশ্যে। ১ঘন্টার মধ্যে’ই নুসরাতের ওখানে গিয়ে পৌঁছলাম। ওকে দেখে বুঝতে পারলাম এতক্ষণ ধরে আমার’ই অপেক্ষায় গেইটের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে সেকি খুশি! ওর কাছে যাওয়ার সাথে সাথে জড়িয়ে ধরল আমায়। অনেক দিনের দুঃখ কষ্ট জমে পাহাড়ের মত হয়ে গিয়েছিল আমার ভিতর। সেই দুঃখ-কষ্টের একটু একটু ওকে বলতে লাগলাম। ঘন্টা দু’য়ের মধ্যে’ই মনে হলো আমার ভিতর যে বরফগলা পাহাড় ছিল, সেটি একটু একটু করে গলতে শুরু করেছে। সন্ধ্যায় হালকা নাস্তা করা শেষে দু’বান্ধবীর মধ্যে কিছু কথা হয়। কথোপকথনগুলো এমন ছিল____ নুসরাত:- তারপর? তোর প্রোগ্রামের কি খবর? এখনো করিস প্রোগ্রাম’টা? আমি:- না। তবে কথা দিয়েছিলাম শুরু করব। কিন্তু আমি মনে হয় ওদের কাছে দেওয়া কথাটা রাখতে পারব না। শুরু করতে পারব না প্রোগ্রাম’টা? নুসরাত:- কেন? কেন??? আমি:- বাড়িওয়ালাী এফএম নামটা সহ্য করতে পারে না, ঘৃণা করে। নুসরাত:- মানে?!!! মানে কি মায়া??? নুসরাতের সাথে বাঁধনের বলা কথাগুলো’ই পুনারবৃত্তি করলাম। আমার কথা শুনে নুসরাত চিন্তিত মনে বাহির পানে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ওর চোখে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। লাফ দিয়ে আমার কাছে এসে বলল, আইডিয়া! – কি idea? তোর তো প্রতি বৃহস্পতিবার রাত্রে প্রোগ্রাম, তাই না? – হুম। আর সেই বৃহস্পতিবার দিন কলেজ থেকে এসে আন্টিকে আমার বাসায় থাকার কথা বলে তুই যদি আমার এখানে চলে আসিস, তারপর রাত্রে আমি তোকে রেডিও অফিসে দিয়ে আসি। তাহলে কেমন হয় ব্যাপার’টা? – Yes. খুশিতে নুসরাতকে জড়িয়ে ধরলাম। কিন্তু পরক্ষণে মুখটা নিকষ কালো অন্ধকারের ন্যায় হয়ে যায়। নুসরাতের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বারান্দায় চলে গেলাম। বারান্দায় গিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। নুসরাত পিছন থেকে গিয়ে কাঁধে হাত রাখে। নুসরাতের দিকে একবার তাকিয়ে চোখটা ফিরিয়ে নিলাম। আমার দৃষ্টি তখন বারান্দার রেলিংয়ের ভিতর দিয়ে দুর অজানায় চলে গেছে। বান্ধবী নুসরাত চুপটি করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মিনিট পাঁচেক পর মুখ খুলে নুসরাত। তোকে খুব ভালোবাসেন ভদ্রমহিলা, তাইনা? নুসরাতের দিকে না তাকিয়েই বললাম- হ্যাঁ। বড্ড বেশীই ভালোবাসেন ওনি আমাকে। এরকম ভালোবাসা আমি আমার জীবনে পূর্বে একজনের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন- আমার মা। মা মারা যাওয়ার এই যে এত বছর পর আমি একটু তৃপ্তির হাসি দিতে পারি, সে ঐ মহিলার জন্য। যিনি আমার মা সমতুল্য। ওনি এমন একজন মানুষ যার মাঝে আমি মায়ের ছায়া খুঁজে পায়। খুঁজে পায় মায়ের সেই স্নেহমাখা ভালোবাসা, আদর-সোহাগ এবং শাসন। ওনার সাথে আমার পরিচয় তিনদিনের। অথচ দ্যাখ…. ওনি যেন আমার শিরায়-উপশিরায় মিশে আছেন। – তো! কি করবি?(নুসরাত) আমি করব না প্রোগ্রাম। আমি চাই না ঐ প্রোগ্রাম করতে যেটা করতে গিয়ে মায়ের সাথে দিনের পর দিন মিথ্যা কথা বলতে হবে। মাকে ঠকানো হবে। আমি আমার মায়ের সাথে এরকমটা করতে পারব না। ওনার স্নেহের মূল্য আমি এভাবে দিতে চাই না। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থেমে গেলাম। নুসরাত আমার কাছে এসে বলল, তুই তাহলে রেডিওর জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে চাচ্ছিস, এই তো?!!! হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমি এ জগত থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছি। তুই প্লিজ আমায় জোর করিস না। নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বিনীত ভঙ্গিতে কথাটা বলছিলাম। তোর যা ভালো মনে হয়। নুসরাত রুমে চলে গেল। নুসরাতের পিছু পিছু আমিও রুমে গেলাম। রাতের রান্নাটা দু’বান্ধবি মিলে করলাম। অনেক দিন পর দু’বান্ধবী একসাথে খাবার খেলাম। বুঝলি মায়া! একেই বলে সত্যিকারের বন্ধুত্ব। এই যে দুজন দুজনকে ছেড়ে এতটা দিন এতটা দুরে ছিলাম, অথচ সম্পর্কে একটুও ফাটল ধরে নি। সেই আগের মতই হাসি, আনন্দ, খুনসুটিতে ভরপুর আমাদের সম্পর্ক। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে কথাটা বলল নুসরাত। মনের টান’টাই আসল নুসরাত। আর দূরত্ব কখনো কোনো সম্পর্কের অন্তরায় হতে পারে না, যদি সেখানে একে অপরের প্রতি টান, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকে। তা যে কোনো সম্পর্ক’ই হোক না কেন। নুসরাতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে জবাব দিলাম। একদম ঠিক কথা বলছেন ম্যাম। এখানে মনের টান’টাই মূখ্য। (নুসরাত) ডাক্তার সাহেবা! রাত’তো অনেক হয়েছে। তাই দয়া করে ঘুমান। কালকে সকালে তো আপনাকে আবার হসপিটালে যেতে হবে, তাই না? (আমি) Okey, good night…..(Nusrat) Good night….(Myself) ঘন্টা দেড়েক হয়ে গেছে শুয়ে আছি। নুসরাত মনে হয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠে বসলাম। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে ধীর পায়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম। ফেসবুক লগইন করলাম। দীর্ঘ ৬বছর পর চিরচেনা সেই “মায়া” আইডিতে ঢুকলাম। শত শত মেসেজ। মেসেজ পাঠিয়েছে মায়ার পাগল ভক্তরা। হ্যাঁ, ওরা আমার সেই পাঠক যারা একটা সময় আমার লেখা গল্প,কবিতা না পেলে পাগল হয়ে যেত। মেসেজের পর মেসেজ দিত। কখনো গল্প, কবিতা দিতে দেরি হলে আমার প্রতি ওদের অভিযোগের অন্ত ছিল না। আজ এই যে এতদিন এফবিতে ঢুকলাম মনে হচ্ছে ওরা এতটা দিন আমার নামের পাশে সবুজ বাতিটা জ্বলার অপেক্ষায়’ই ছিল। আজ যখন সবুজ বাতিটা জ্বলে উঠল তখন ওরা ঝাপিয়ে পরে ইনবক্সের উপর। শত শত পাঠকের শত শত মেসেজ। তন্মধ্যে একটা মেসেজের মধ্যে চোখটা আটকে গেল। যেখানে লেখা ছিল- Very bad, Maya. Very bad. সখাকে পেয়ে বন্ধুকেই ভুলে গেলে?!!! সবার সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে উত্তর দিলাম ঐ মেসেজকৃত আইডিতে। যে আইডির লোকটি সাথে ফেসবুকে প্রথম পরিচয় আমার। লোকটি প্রবাসী। নাম “শফিক”। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। চোখে সানগ্লাস। পরনের ধূসর কালো গেঞ্জিটা ধূসর বর্ণের চাদরে আবৃত। মুখের মিষ্টি হাসিটা যেন সবসময় লেগে থাকে। লোকটার ছবি দেখলে কেমন যেন এক ভালো লাগা কাজ করে। বাঁধনের চেহারার সাথে লোকটার চেহারার অদ্ভুত মিল রয়েছে। বাঁধনের সাথে পরিচয়ের শুরু থেকে শেষ অবধি এই লোকটার জানা। ওনার সাথে শেষ কথা হয় সেদিন, যেদিন বাঁধন শেষ বার আমার এলাকায় গিয়েছিল। বাঁধনের সাথে দেখা করার আগ মুহূর্ত শফিক সাহেবকে ফোন দিলাম আমি। বুকটা তখন ধুরু ধূরু করে কাঁপছে। সেদিন বন্ধু শফিকের কাছে কাঁপা গলায় দোয়া চেয়েছিলাম। বলেছিলাম- “দোয়া করবেন বন্ধু। দেখা করতে চাচ্ছি।” সেদিন সেই কথাগুলোই ছিল বন্ধু শফিকের সাথে আমার শেষ কথা। তারপর আর কথা হয়নি ওনার সাথে। ফেসবুক আইডি, সিম কোনোটাই আর ইউজ করা হয়নি বাঁধনের কাছে প্রত্যাখিত হওয়ার পর থেকে। মেসেঞ্জারটা ওপেন করার সাথে সাথে বন্ধু শফিকের কল। কোনো দ্বিধা না করে কলটা রিসিভ করে ফেললাম। ওপাশ থেকে এক মধ্য বয়স্ক লোকের কন্ঠে ভেসে উঠে____ ” কেমন আছে এখন মায়ার বাঁধন?” “কেমন আছে এখন মায়ার বাঁধন?” বেশ ভালো! ছোট্ট করে বলে থেমে গেলাম আমি। কিছু সময় নিরবতা তারপর জনাব শফিক সাহেবের প্রশ্ন- কতজনের নানা হলাম? শফিক সাহেবের এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তাইতো চনকে উঠে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, মানে? মানে হলো আমার মায়া বন্ধুর কোল আলো করে এ পর্যন্ত কয়জন এলো? আমি কতজন ছেলে মেয়ের নানা হতে পেরেছি? বন্ধু শফিকের কথা শুনে কন্ঠ’টা স্তব্ধ হয়ে আসে। উত্তর দিতে গিয়েও দিতে পারিনি। কেন জানি মনে হচ্ছিল কথারা সব বুকের ভেতর প্রকান্ড এক পাথর রুপ ধারন করেছে। প্রচন্ড এক যন্ত্রণায় ভেতরটা ছটফট করে উঠল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম আমি। পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষটিকে এত সহজে হারিয়ে ফেলার বেদনায় জমে থাকা নীল কষ্টের তুষারগুলো গলে গলে পড়তে শুরু করল অশ্রু হয়ে। এই মুহূর্তে বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া পেছনের স্মৃতিগুলোই আমাকে পীড়া দিচ্ছে। বাঁধনের স্মৃতিগুলো বার বার হৃদয়ের ক্যানভাসে ভেসে উঠছে। হুশ হয় বন্ধু শফিকের কথায়। এই মেয়ে! কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে তোর? চোখের অশ্রু মুছে হাসিমুখে উত্তর দিলাম, কই? কিছু না তো!!! ভুলে গেলি? আজকে রাত পোহালে শুক্রবার। আজকের দিনেও তুই মিথ্যে বলবি? উফ্! বন্ধু শফিকের কথায় মনে পরল আজকের দিনটা একটা সময় আমার আর বাঁধনের জন্য কতটা স্পেশাল দিন ছিল। ২০১০ সালের এই দিনে দু”জন দু’জনকে ভালোবাসার কথাটা বলছিলাম। ইস! কতই না সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো…. কখনো যদি বাঁধনের সাথে ঝগড়া হতো, আর সেটা যদি হতো শুক্রবার দিন, তাহলে বাঁধনের মুখ থেকে এই একটা কথায় শুনতাম- ” মায়া! আজ না শুক্রবার?!!! আজকের দিনেও তুমি ঝগড়া করবে? রাগ করে থাকবে?” বাঁধনের এই একটি কথায় থেমে যেত সব ঝগড়া, উড়ে যেত সব রাগ। বাঁধনকে বলতাম- এই দেখো! চুপ করলাম। আর ঝগড়া করব না। এবার হলো তো??? আর রাগ? সেটা কি আদৌ গেছে?(বাঁধন) – হ্যাঁ, গেছে। আমি আর রেগে নেই। আমার কথা শুনে বাঁধন গম্ভীর গলায় প্রমান চাইত। আমি যে রেগে নেই তার প্রমাণ হিসেবে একটা হাসি দিতে বলত। জোর করে হলেও হাসি দিতাম এভাবে- ” হি হি হি হি হি হি হি হি হি হি হি হি” হাসি হাসি মুখে বাঁধন বলত, এইতো আমার পেত্নী হাসছে। প্রেমিকরা ওদের প্রেমিকাদের হাসির বর্ণনা কত সুন্দর, কত নিঁখুত ভাবে গল্প-উপন্যাসে তুলে ধরেন। আর বাঁধন?!!! আমার হাসিকে পেত্নীমার্কা হাসির সাথে তুলনা করত। রাগান্ধিত স্বরে বলতাম- আমি পেত্নী, নাহ? সিরিয়াস ভঙ্গিতে বাঁধন বলত- হ্যাঁ, তুমি পেত্নী। আচ্ছা, আচ্ছা। রাখি। রাগ দেখিয়ে ফোনটা কেটে দিতে যাব, তখনই ও বলে উঠত- শুনো! তুমি শুধু আমার পেত্নী। আর কারো না। এ পেত্নীটা শুধুই আমার। বাঁধনের এই একটা কথায় আমার সমস্ত রাগ দুরে সরে যেত। ভিতরের আনন্দটা চেপে বলতাম- শয়তান! বাঁধনও আমার সাথে সাথে লম্বা করে বলত- শয়তান! তারপর আবার সেই হাসি। পেত্নী মার্কা হাসি। Oh, hlw mem! কিছু’তো বলুন। সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি। শফিক সাহেবের কথায় সম্ভিত ফিরে। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেদিন বাঁধনের সাথে দেখা করতে যাওয়ার পর থেকে ওনার বাসায় আশ্রয় নেওয়া পর্যন্ত সবটা খুলে বললাম। আমার কথা শুনে জনাব শফিক সাহেব চুপসে গেলেন। শুধু চুপসে নয়, কিছুক্ষণের জন্য ওনি হয়তো নির্বাকও হয়ে গেছেন। যার কারনে ওনি কোনো কথা বলতেছেন না। টানা ৫,৬মিনিট নিরবতা চলল। ওনার কথা বলার কোনো আভাস’ই পাচ্ছি না। নিরবতা ভেঙ্গে মুখ খুললাম আমি। বন্ধু শুনতে পাচ্ছেন? হ্যাঁলো, হ্যাঁলো বলতে বলতে পিছনে ঘুরে তাকালাম। নুসরাত অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে এভাবে দেখে চমকে উঠলাম আমি। ফোন’টা কান থেকে নামিয়ে, তু তু তু তু….ইই……???? হ্যাঁ, আমি। মায়ার বাঁধনের বর্তমান অবস্থান জানার জন্য’ই ঘুম থেকে জেগে উঠা। আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে নুসরাতের জবাব। ই ইয়ে মানে আসলে নুসরাত আমি তোকে….. সম্পূর্ণ কথাটা বলতে পারিনি। তার আগেই আমার মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে রাগান্বিত ভঙ্গিতে জোর গলায় বলতে থাকে নুসরাত, তুই কিভাবে এমনটা করলি? কিভাবে তুই আমার থেকে এত বড় সত্যি’টা লুকাইলি? আমি কি কখনো’ই কোনো ভালো বন্ধু ছিলাম না??? নুসরাত কথা’টা তো শুন। চুপ! একদম চুপ। তুই কোনো কথা বলবি না।রাগান্বিত স্বরে নুসরাতের জবাব। আমি আর কোনো কথা বাড়ালাম না। চুপ করে আছি। নুসরাত ১ঘন্টার আলাপকে সাড়ে ৩ঘন্টা বানালে প্যাঁচাল পেরে। প্যাঁচাল শেষে যখন হাফিয়ে উঠে আমার দিকে তাকালো। আমি তখন সোফায় বসে ঝিমুচ্ছি। নুসরাত আমার কাছে দৌঁড়ে গিয়ে আমার দু’বাহু ঝাকিয়ে বলে- এই ঘুমোবে না একদম! তুই এখন এই মুহূর্তে আমার সাথে চলবি। আধো ঘুম আধো জাগরিত অবস্থায় আমি নুসরাতকে বললাম- ” কোথায় যাব?” নুসরাত আমার কানের কাছে এসে জোরে জোরে বলতেছে- ” কোথায় আবার? বাঁধনের বাসায়। আমায় তুই বাঁধনের বাসায় নিয়ে চলবি। ঐ হারামজাদাকে আমি দেখতে চাই। দেখতে চাই কেমন বেকুব যে গার্লফ্রেন্ডের কন্ঠ শুনেও গার্লফ্রেন্ডকে চিনে না।” কি?!!! চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালাম। এই মুহূর্তে আমার চোখ থেকে নিদ্রাদেবী প্রস্থান করেছে। কি, কি করিস না; আমি বাঁধনের বাসায় যেতে চাচ্ছি। ওর সাথে আমার কথা আছে। নিয়ে চল আমায় সেখানে……

চলবে…..

About Author


Administrator
Total Post: [352]

Leave a Reply




Comment: (Write Something About This Post..)

সম্পর্কযুক্ত গল্প

 
© Copyright 2019, All Rights Reserved By BdStory24.Com
About Us || Copyright Issues || Terms & Conditions || Privacy Policy