কলঙ্কিনী [৯ম পর্ব]

লেখা: রওনাক ইফাত জিনিয়া

আজ দুমাস হল আমি বাবার বাড়িতে আছি।হ্যাঁ সেদিন মুখ খুলেছিলাম বাবার বাড়িতে আসার কথা বলার জন্যেই।সুমনের বাবা আমাকে থাকার জন্য জোর করলেও তার পরিবারের লোকজনের ব্যবহারে ওখানে টিকে থাকাটা খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমার জন্য তাই চলে আসা।আজও সুমনের কোন খুঁজ জানিনা।এতদিন সুমনের সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে আমার পরিবারকে মিথ্যে ভাল থাকার কাহিনী শুনালেও এখন সবাই সত্যিটা জেনে গেছে।

দেখতে দেখতে পাঁচটা মাস কেটে গেল সুমন একটাবারও আমার খবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।আসলে না করাটাও স্বাভাবিক কারন ওইতো আমার সাথে সংসারটাই করতে চায়নি কখনও তাই স্মরণ করবেই বা কেন?যদিও প্রথমদিকে একবার সুমনের বাবা আমাকে নিতে এসেছিল কিন্তু বাবা যেতে দেয়নি আমাকে বলেছিল সংসারটা যেহেতু সুমনের সাথে করব আমি তাই সুমন নিতে এলেই আমাকে যেতে দিবে।বাবা আরো বলেছিল একবার সুমনের বাবার কথায় বিশ্বাস করে ভালো করে ছেলের খোজ না নিয়েই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অনেক বড় ভুল সে করেছে আর না।এরপর আর সুমনের বাবাও আসেনি আমার খবর নিতে।ঐ পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ নেই আমাদের।বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে এভাবে আর আমাকে অনিশ্চিত একটা সম্পর্কে জড়িয়ে রেখে লাভ নেই তাই তালাক নিয়ে নেয়াটাই ভাল।তালাকের ব্যাপারে সুমনের পরিবারকে জানানো হলে তারা কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।তারা হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি বরং বলেছিল আমরা যা চাই তাই করতে পারি।তাই বাবা তালাক নিয়ে বলেই সিদ্ধান্ত নিলো।

সপ্তাহ খানেক পরই শুধু আমি ছাড়া সুমনসহ প্রায় ত্রিশজন মানুষ একত্রিত হল আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে।আমি ঘরে বসে অপেক্ষা করছিলাম কখন আমার ডাক আসবে।অবশেষে প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমাকে সেখানে ডাকা হলো।সাতটা মাস পর আমি আজ প্রথম সুমনকে দেখলাম।আমি ওরদিকে তাকালেও আমার দিকে তাকানোর ইচ্ছে ওর হয়নি।জানি আমি ওর মনে আমার জন্য বিন্দুমাত্রও জায়গা করে নিতে পারিনি তবে মাত্র পনের দিনের সংসারে সুমন আমার অনেকটাই কাছের কেউ হয়ে গেলে।সুমনই ছিল আমার জীবনে প্রথম পুরুষ যার এতটা কাছে আমি গিয়েছিলাম।ওই ওর প্রয়োজনের তাগিদে আমার কাছে এলেও ওর কাছে আসাটা আমার কাছে প্রাপ্তি ছিল আমার প্রয়োজন ছিলনা।থাক সেসব কথা আজ আর কোন পুরাতন কথা মনে করতে চাইনা কারন আমি সুমনকে ছাড়তে না চাইলেও সুমনের জীবনে আমার কোন স্থান নেই তাই আজ আমি ওকে মুক্তিই দিয়ে দিব।
দীর্ঘ চারঘন্টা দুপক্ষের নানা ধরনের কথাবার্তার পর অবশেষে তালাকের সিদ্ধান্তই স্থির হল।বিয়ের আটমাসের মাথায় সেদিনই সুমনের সাথে আমার তালাকটা সম্পন্ন হল।শেষবারের মত আমি সুমনের দিকে আরেকবার তাকালাম অথচ তখনও সুমন আমার দিকে তাকায়নি।যেখানে সুমন অন্য কাউকে ভালোবাসে বলে আমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়ে সংসারটা করতে পারেনি সেখানে আজ সুমন বলল ওই নাকি আমাকে নিয়ে সংসারটা করত যদি আমি চরিত্রহীন না হতাম।আমার চরিত্র খারাপ, বিয়ের আগেই কারো সাথে সম্পর্ক ছিল ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের কথা শুনতে হল আমার।সুমনের বলা মিথ্যে কথাগুলোর কাছে আমার পরিবারের সুমনের বিরুদ্ধে বলা সত্যি কথাগুলোও সেদিন সবার কাছে মিথ্যে প্রমাণিত হল।আমি কলঙ্কিনী উপাধীতে ভূষিত হলাম।ভাবতেই অবাক লাগে কত সহজেই না সুমন আমার গায়ে কলঙ্কের কালিমা লেপে দিয়ে গেল।আসলে আমি তো মেয়ে তাই একটা মেয়ে হিসেবে আমার গায়ে কালিমা মেখে দেয়াটা খুবই সহজ।

সুমনের সাথে তালাকের পর শুভকে বাবা তিনমাস জেলে রেখেছিল।না।আমার সাথে শুভ যা করেছিল তা পুলিশকে জানানো হয়নি বরং অন্য একটা মামলায় শাস্তি দেয়া হয়েছিল শুভকে।সত্যিটা বলা সম্ভব ছিল না কারন আমি একটা মেয়ে তার উপর তালাকপ্রাপ্ত।এমনিতেই আমার কলঙ্কের কোন অভাব ছিলনা তাই সবাইকে শুভর ব্যাপারে জানিয়ে আর কলঙ্কিত করতে চায়নি বাবা।

তিনমাস পর শুভ জেল থেকে বেরিয়ে পড়ে।এরপর শুভ বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করে।আমার জীবনটা এলোমেলো হলেও সে সুখেই সংসার করছিল।এরপর আমার জন্য অনেক বিয়ের ঘর এসেছে ঠিকই কিন্তু শেষে একটাও টিকেনি।অবশেষে হাসিবের সাথে আমার বিয়ে হল আর তারপরের কাহিনী সবার জানাই আছে।

অনেকতো হল অতীতের স্মৃতিচারণ এখন বর্তমানে আসা যাক।দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন চলে গেল আর আজ আমার বাবু এই পৃথিবীর মুখ দেখল।না।আমি পারিনি।বারবার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আমার পেটের ভেতর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা অস্তিত্বের জন্য আমি পারিনি নিজেকে শেষ করতে।অন্য সবার কথা বাদ দিলাম আমি এতই অভাগী যে নিজের একমাত্র ভাবির কাছেও বিভিন্ন কটু কথা শুনতে হয়েছে আমার।সকল অপবাদ মুখ বুজে সহ্য করেছি কাউকে পাল্টা উত্তরও কখনও দেইনি আমি।কাকে কি বলতাম?কিছু বলতে গেলেই ভাইয়ের কানে কথা যেত আর বাবা আর ভাই যদি কোনভাবে জানতে পারত ভাবির এসব কথা তবে ভাই হয়ত আমার জন্য নিজের সংসারটাকে ভাঙ্গতেও পিছপা হত না।ভাবিতো ঠিকই বলত আসলেই তো আমি অপয়া ছিলাম।জীবনে যেখানে গিয়েছি সেখানেই সব লণ্ডভণ্ড করেছি এমনকি আমার জন্যেই ভাবি তার সংসারটাও নিজের মত করে সাজাতে পারছিল না।আমাকে হালকা কটু কথা বললেও আমার আগেই ভাই তা ধরে ফেলো আর ভাবির সাথে তার এ নিয়ে কথা কাটাকাটি চলত।তাই আমি কখনও ভাবির কথার পাল্টা উত্তর আমি দেইনি কারন আমি চাইনি ভাইয়ের সংসারে আর আগুন লাগাতে।যাইহোক, অনেক কষ্টের পর আমি প্রথম যখন আমার ছেলের মুখখানা দেখেছিলাম আমার সকল কষ্ট নিমিষেই শেষ হয়ে গিয়ে ছিল।জীবনে বহুবছর পর নিজেকে খুব সুখি মনে হচ্ছিল।বাবু হওয়ার পর আমার জীবনটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল।এখন আর নিজেকে শেষ করার ইচ্ছে মনে জাগেনা বরং আমার ছেলেটার জন্য অনেক বছর বাঁচতে ইচ্ছে হয়।

আজ আমার ছেলেটা দুবছর বয়সে পা রাখল।কিভাবে যেন দেখতে দেখতে নিহানের বয়স দুবছর হয়ে গেল।এতদিন আমার বেঁচে থাকার কোন উদ্দেশ্য না থাকলেও এখন নিহানের ভাল আর সুখে থাকাটাই আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।আজকাল বাবা শরীরটা খুব একটা ভাল যাচ্ছেনা এদিক দিয়ে ভাবির কথা বলাটাও দিনদিন বেড়েছে কারন এতদিন এই সংসারে আমি একা বোঝা হলেও এখন আমার ছেলে নতুন বোঝা হিসেবে উদ্ভব হয়েছে কিনা।তবে আমার ভাই নিহান আর তার ছেলে নাহিয়ানের মাঝে কখনও কোন পার্থক্য করেনি বরং নিহানকে একটু বেশিই ভালবাসে।নিহানও মামাকে দেখলে আমার কোল ছেড়ে মামার কোলে যাবার জন্য অস্থির হয়ে যায়।নিহানের জন্য ভাই তার একবছরের ছোট্ট ছেলে নাহিয়ানকেও অনেকক্ষন নিজের কাছে রাখতে পারেনা আর এই বিষয়টাও ভাই আর ভাবির সম্পর্কে সমস্যা সৃষ্টি করে মাঝে মাঝেই।অনেক চেষ্টা করেও আমি নিহানকে ঠিক করতে পারিনি।আসলে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত ছেলেটা আমার মামাতেই সেই আদর খুঁজে বেড়ায় আর আমার ভাইটাও সর্বোত্তম চেষ্টা করে ছেলেটাকে বাবার অভাবটা বুঝতে না দিতে।

তিনটা বছর কেটে গেছে।আজ আমার ছেলের বয়স পাঁচবছর।বাবা পরলোক গমন করেছে বছর হয়ে গেল।বাবা মারা যাবার আগে আমার ভাগের সম্পত্তির অংশটুকু ও একটা বাড়ি আমার নামে করে গিয়েছিল।আমার বারবার মানা করা সত্ত্বেও অনেকটা আপু আর ভাইয়ের জোরেই বাবা কাজটা করে গিয়েছে।অবশ্য বাবার এই কাজে আমার খুব একটা লাভ হয়নি কারন আমার একার পক্ষে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে সেই আলাদা বাড়িতে থাকা সম্ভব ছিলনা বলে আজও আমি বাবার ভিটেতেই পড়ে আছি আর ভাবির কথা শুনাটাতো এখন আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে।আজ আর আমি অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করিনা তবে তিক্ত অতীত আমার পিছু ছাড়েনি।না চাইতেও প্রায়ই ছেলের কমন একটা প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে হতেই হয়।

–মা সবার আব্বু আছে আমার আব্বু কোথায়?আমার আব্বু কি বেঁচে নেই মা?বলনা মা আব্বু কোথায়?

যদিও হাসিব কখনও আমার বা নিহানের কোন খবর রাখেনি তবুও জীবিত মানুষটাকে আমি মৃত বানাতে পারিনি।আমার ছেলেটাকে বলতে পারিনি “নিহান বাবা তোমার আব্বু বেঁচে নেই”।ছেলের প্রশ্নের জবাবে একটা কথাই বলতে হয়েছে-

–নিহান বাবা তোমার আব্বু বেঁচে আছে তবে সে অনেক দূরে থাকেতো তাই সেখান থেকে আসতে পারেনা।খুবদ্রুতই তোমার আব্বু তোমার কাছে চলে আসবে।

–কবে আসবে মা?

–খুব তাড়াতাড়িই আসবে।

–সেই কবে থেকেই তো তুমি শুধু বলে আসছো আব্বু আসবে কিন্তু আব্বু তো আজও আসেনি?

ছেলের এইসব প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হলেও আমার ছেলের কোন ক্লান্তি নেই।আসলে ছোট ছেলের কচি মনটাতে আমি আঘাত দিতে পারিনি তাই মিথ্যে গল্প শুনাতে বাধ্য হয়েছি।মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করেছি আল্লাহ্’র কাছে বারবার যে কবে আমার ছেলেটা বড় হবে?কবে ওই বুঝবে ওর মায়ের কষ্ট?কবে ওই বুঝতে পারবে সত্যটা কি?কবে ওই সত্যিটা মেনে নিতে শিখবে?? আমার ছেলের মাথায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রশ্ন যোগ হলেও উত্তর ছিল না।উত্তর একটাই সেটা ওর বড় হওয়া কারন ওর বাবা-মার সম্পর্কের জটিলতা ওর ছোট মাথা দিয়ে উপলব্দি করা সম্ভব ছিল না।এখন আল্লাহ্’র কাছে আমার একটাই প্রার্থনা ছিল যেন আমার নাহিনটা খুবদ্রুত বড় হয় আর সবকিছু বুঝতে পারে।

সেদিন ঘরের ভেতর বসে আমি কাপড় গুছাচ্ছিলাম আর নাহিনটা বাইরে নাহিয়ানের সাথে খেলছিল।হঠাৎ নাহিন দৌড়ে ঘরে এসে বলল-

–মা আব্বু এসেছে।

আমি নাহিনের কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারিনি তাই পাল্টা প্রশ্ন করলাম-

–কার আব্বু এসেছে নাহিন?

–কার আবার আমার আব্বু এসেছে মা।

ছেলের কথা শোনে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।কি বলব বুঝতে পারছিলাম না।এতবছর পর হাসিব কোথা থেকে আসবে?হাসিবের এখানে আসাটা ভূলেও সম্ভব ছিল না কারন হাসিব আমার সাথে তালাকের দুমাসের মাথায় আরেকজনকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছে।এতদিনে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেশ সুখেই আছে ওই তাই আমাকে বা নাহিনকে মনে করে ওর আমাদের দেখতে আসাটা অসম্ভব।বুঝতে পারলাম নাহিনের অবশ্যই ভুল হচ্ছে।আমাকে চুপ থাকতে দেখে ছেলেটা আমার আমাকে ধাক্কা দিয়ে আবার বলতে লাগল-

–চল না মা পরে আব্বু চলে যাবে।

–বাবা নাহিন তোমার আব্বু এখানে আসতে পারেনা সেতো অনেক দূরে থাকে তার আসতে আরো সময় লাগবে বাবা।তুমি বড় হলে পরে তোমার আব্বু আসবে বাবা।

–তুমি বুঝতে পারছো না মা আব্বুর কাজ শেষ তাই দ্রুত চলে এসেছে।

ছেলেকে বুঝাতে বুঝাতে ক্লান্ত আমি তাই বাধ্য হলাম আসল ঘটনা কি তা বুঝার জন্য।বুঝতে পারছিলাম না কে আমার ছেলের মাথায় এসব বাজে ধারনা গুলো ঢুকালো।বের হয়ে যা দেখলাম তা খুব অদ্ভুতই ছিল।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*