কলঙ্কিনী [৮ম পর্ব]

লেখা: রওনাক ইফাত জিনিয়া

–তুমি সত্যিই জানোনা তুমি কিভাবে আমাদের মাথা কেটেছ নাকি জেনেও না জানার ভান করছো কোনটা?

–আজব তো আমি অভিনয় কেন করব আর মিথ্যে বলে আমার কি লাভ?

–মিথ্যে বলে যদি তোমাদের লাভ নাই হয় তবে তোমরা মিথ্যে কেন বলেছ আমাদের?কেন সত্যটা গোপন রেখেছ?

–কি মিথ্যে বলেছি?আমার জানা মতে আমি বা আমার পরিবার আপনাদেরকে কোন মিথ্যে বলিনি।

–তাই নাকি?

–জ্বী।

–এখন আবার আরেকটা মিথ্যে।

–এত ভূমিকা না করে বলে দিলেই তো পারেন কি মিথ্যে বলেছি?

–খবরদার ভুলেও আমাকে রাগ দেখানোর চেষ্টাও করোনা।যে মেয়ে বিয়ের আগেই কারো সাথে বিছানায় যায় এমন খারাপ চরিত্রের মেয়ের রাগ সহ্য করাতো দূরের কথা তার কথাও সহ্য করা অসম্ভব।আমার জায়গায় অন্য যে কেউ হলে এতক্ষনে তোমার ও তোমার পরিবারের অবস্থা খারাপ করে ছাড়ত এত নিকৃষ্ট একটা খেলা খেলার জন্য কিন্তু আমি এসবের কিছুই করবনা।কেন জানো?কারন তুমি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছ।তোমার জন্য তমার সাথে আমাকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হয়েছে তবে এখন আর আমার কোন সমস্যা নেই আর বাবাও এখন আমার উপরে আর কোন কথা বলতে পারবেনা।আমি আজ সত্যিই খুব খুশি তবে আমি শাস্তি না দিলেও বাবা তোমাকে আর তোমার পরিবারকে এত সহজে ছেড়ে দিবেনা।তোমরা কি ভেবেছিলে সত্যিটা কখনও আমরা জানতে পারব না আর তুমি ও তোমার পরিবার এভাবেই আমাদের বোকা বানিয়ে যাবে?ভুল।সত্য কখনই চাপা থাকেনা।আর তোমরা অনেক বড় অন্যায় করেছ সত্যটা গোপন রেখে।তোমার সম্পর্কের ব্যাপারে আমাদের জানানো উচিত ছিল।

–দেখুন আপনারা কার কাছে কি শুনছেন আমি জানিনা তবে যাই শুনেছেন মিথ্যে শুনেছেন।আপনি আমার জীবনে প্রথম পুরুষ যে আমার এতটা কাছে এসেছে।আপনার আগে আর কোন পুরুষের সাথে আমার শারীরিক,মানসিক বা অন্য কোন ধরনেরই কোন সম্পর্ক ছিলনা।

–তাই নাকি?তবে সোহানুর রহমান (শুভ) টা কে?

–শুভ ভাই বলেছে?

–বাহ্ কি ভালোবাসা!নাম শুনেই বুঝে গেছো আমি কোন শুভর কথা বলছি।একেই বলে খাটি ভালোবাসা।তা এমন একটা প্রেমিক থাকতে আমাকে কেন বিয়েটা করেছিলে?আমি নাহয় বাবার দেয়া কথার জালে ফেঁসে গিয়েছিলাম তুমিতো ফাঁসনি নাকি পুরাতন বলে তাকে আর ভাল লাগছিল না?

–দেখুন কথা সাবধানে বলবেন বলে দিচ্ছি। আমি আপনার মত না।

–কি বললে আমার মত না?তা আমি তোমার চেয়ে নিচু স্তরের কি করলাম?

–প্রথমত সত্যি না জেনেই আমার উপর এরূপ মিথ্যে দোষারোপ করছেন আর দ্বিতীয়ত আমি আপনার মত দুজনকে নিয়ে খেলিনাই।

–আমি দুজনকে নিয়ে খেলেছি মানে?কি বলতে চাও তুমি?আমি কোন দুজনকে নিয়ে খেলেছি?

–আপনি যাকে ভালোবাসেন কি যেন নাম বললেন তার?

–তমা?

–হ্যাঁ তমা।

–আপনি অস্বীকার করতে পারবেন আপনি তমা আর আমার সাথে খেলেন নি?

–কি আমি তোমাদের সাথে খেলেছি?কিভাবে?

–আপনিতো আমাকে আপনার নিজের ইচ্ছেই বিয়ে করেননি তাইনা?

–হুম বাবা বাধ্য করেছিল।

–তবে আমাকে কেন কাছে টেনে নিয়েছিলেন?কেন আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন?কেন বলেননি আপনি আমাকে মন থেকে কখনও মেনে নিতে পারবেন না?কেন বলেননি আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন?

–বাবার জন্য।

–ও আচ্ছা।মানলাম আমাকে বিয়ে করার বিষয়টাতে নাহয় আপনি বাবার কথায় বাধ্য ছিলেন কিন্তু আমার কাছে আসার বিষয়ে কি আপনার কোন বাধ্যবাধকতা ছিল?আর বিয়ের পর আপনি ইচ্ছে করলেই কিন্তু আমাকে সব বলতে পারতেন।কিন্তু না আপনি বলেননি।আসলে আপনার গাছের আগেরটাও চাই আবার তলারটাও চাই।আমিতো ভেবেছিলাম আপনার আগে যার সাথেই সম্পর্ক থাকুক না কেন আপনি অতীত ভুলে আমার সাথে নতুন করে শুরু করতে চেয়েছেন।কিন্তু না।আমি ভুলছিলাম।আসলে আপনি তমাকেও ভালোবাসেন না যদি বাসতেন তবে কখনই আমার কাছে আসতে পারতেন না।

–মুখ সামলিয়ে কথা বল নিশি।আমি তোমার কাছে গিয়েছি এটা ঠিক তবে আমি কোন পাপ করিনি কিন্তু তুমি করেছ।আমি যার কাছে গিয়েছি সে আমার বিয়ে করা বউ ছিল।কিন্তু তুমিতো বিয়ের আগেই পরপুরুষের কাছে গিয়েছিলে।

–এত ভূমিকা না করে সরাসরি বললেই পারেন আমাকে ভালো না লাগলেও, পছন্দ না হলেও আমার শরীরটা আপনাকে আকর্ষিত করেছিল।

–আরে নিজে ঠিক না হয়ে আমাকে কিভাবে এসব কথা বলছ?

–আমি নিজে ঠিকই আছি।

–তাই নাকি?বিয়ের পূর্বেই কারো সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো কোন দিক দিয়ে ঠিক বলতে পারো?

–আমি আগেও বলেছি এখন আবার বলছি আমার কারো সাথে কোন ধরনের সম্পর্ক নেই।আপনি যা শুনেছেন বা জেনেছেন সেসব ভুল।

–তাই নাকি?

–হুম।

–শুভ কেন শুধু শুধু তোমার নামে মিথ্যে কথা বলতে যাবে?

–কারন সে আমাকে বিয়ে করতে চাইত কিন্তু আমি রাজী ছিলাম না বলে এমন করছে।

–তাই?

–জ্বী।

–আমাকে খুব বোকা মনে হয় কি তোমার?

–নাতো।কেন?

–ঐ যে তোমার মিথ্যে কথাগুলো বিশ্বাস করতে বলছ।

–দেখুন প্রকৃতপক্ষেই আমি নির্দোষ সে আমার সংসার ভাঙ্গার জন্য এমন করেছে আর কিছুনা।আমি খারাপ হলে বিয়ের তৃতীয়দিনের মাথায় নিজের স্বামীর মনে অন্য কারো বাস জেনেও তারসাথে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারতাম না।

–তুমি জানতে আমি তমাকে ভালোবাসি?

–হুম আমি জানতাম আপনার কারো সাথে রিলেশান ছিল তবে তার নাম তমা তা জানতাম না।

–কে বলেছে তোমাকে তমা সম্পর্কে?

–কেউ বলেনি আমি নিজেই জেনেছি।

–কিভাবে?

তারপর সুমনকে আমি যেভাবে জেনেছি সব বললাম।সুমন আমাকে কিছু বলার আগেই তার ফোনে একটা কল এল আর সুমন বেড়িয়ে গেল।সুমন না বললেও আমি বুঝতে পারলাম ওটা তমার কল।এরপর আর সুমনের সাথে আমার কোন ধরনের কথা হয়নি।রাতেও সুমন ঘরে আসেনি।জানিনা কাল আমার সাথে কি হতে যাচ্ছে তবে মন বলছে খারাপ কিছুই হতে যাচ্ছে।হাজার চেষ্টা করেও আমি আমার মনটাকে কিছুতেই স্বাভাবিক করতে পারছিনা।

পরদিন আমার পরিবারের মুরব্বীরা সবাই আসল।প্রায় দুঘন্টার উপরে বিভিন্ন ধরনের কথা বলার পর এটাই প্রমাণিত হয় যে আমি নির্দোষ না তবে তাদেরও কিছু দোষ থাকায় আমাকে আরেকটা সুযোগ দেয়া হল সাথে সুমনকেও।আমি বারবার চেষ্টা করেছি সবাইকে এটাই বুঝাতে যে সুমন আমাকে ভালোবাসেনা আর না সে আমার সাথে সংসার করতে চায়।কিন্তু কেউ বুঝল না।বিচার করে সবাই চলে গেল।সেদিন সুমনও বাড়ি থেকে চলে গেল।আসলে সুমনের বাবা নিজেও চাননি এই বিয়েটা ভেঙ্গে যাক।সত্যি বলতে সুমনের বাবার এই বিষয়টা আমার মাথায় আসেনি।

দুমাস হল সুমনের কোন খবর নেই।আমি এখনও সুমনের বাড়িতেই রয়েছি।আসলে আমি বহুবার আমার বাড়িতে যেতে চাইলেও সুমনের বাবা যেতে দেননি।আবার সুমনের বাবার অমতে গোপনে প্রতিনিয়ত আমার উপর চলত নির্যাতন।সুমনের পরিবারের কেউ আমাকে পছন্দ করতে পারছিল না শুধু সুমনের বাবা ছাড়া।আমিও তাদের কি দোষ দিব বুঝতেছিনা।সবই ভাগ্য আমার ভাগ্য কিন্তু সুমনের বাবার আমাকে যেতে না দেয়ার বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।এভাবে আরো কিছুদিন গেল কিন্তু কোন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি।সুমনতো বাড়িতে ফিরেইনি উল্টো ওর পরিবার আমার উপর তাদের নির্যাতন দিনদিন বাড়িয়ে চালাচ্ছিল।ধীরে ধীরে সবকিছু আমার সহ্যের বাহিরে চলে যাচ্ছিল।কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।এদিকে সুমনের বাবা কিছুতেই আমাকে আমার বাড়িতে যেতে দিতে রাজী ছিল না অন্যদিকে সুমনের বাড়ির অন্যরা সেখানে থাকাটা অসম্ভব করে দিচ্ছিল।শেষে বাধ্য হয়ে আমাকেই মুখ খুলতে হলো।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*