অভিশপ্ত ভালোবাসা [শেষ অংশ]

রওনাক ইফাত জিনিয়া

:আজ শোভন কল দিয়েছিলো বললো আমার সাথে কি যেন কথা বলবে তাই দেখা করতে চাইলো।
–তুমি কি বলেছো?
:কিছুনা কল কেটে দিয়েছি।
–ভালো করেছো ওর সাথে কথা বলার বা দেখা করার কোন দরকারই নেই।
.
.রাতে ঘুম আসছেনা বুঝতে পারছিনা আমি কি করবো?শোভনের সাথে দেখা করবো নাকি করবোনা?পাশ ফিরে দেখি আকাশ ঘুমাচ্ছে।আমার জন্য আকাশকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখতে একদম ভালো লাগছেনা।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সকাল হলো বুঝতে পারলাম না।সকালে রান্না করে রান্না করে একসাথে খেতে বসলাম।আকাশ বললো-
:কি ব্যাপার তোমাকে এমন লাগছে কেন শরীর ঠিক আছেতো?
–আমি ঠিক আছি।
:তোমাকে দেখে ঠিক মনে হচ্ছেনা রাতে ঘুম ঠিকমতো হয়েছিলো?আর তুমি খাচ্ছোনা কেন শুধু বসে আছো?
–খাচ্ছিতো।তুমিও খাও।
:নীরা আমি ভাবছি আজ একটু দুজনে মিলে কোথায় একটু বেড়াতে গেলে হয় না ভালো লাগবে?
–আমিও তাই ভাবছিলাম।
:ঠিক আছে খেয়ে নাও পরে আমরা বের হবো আর দুপুরে বাহিরে খাবো।
–ঠিক আছে।এখন খাও।
.
.খাওয়ার পর আকাশ টিভি দেখছে আর আমি ঘর গুছাচ্ছি।হঠাৎ আকাশ বললো-
:নীরা 11টা বাজে দ্রুত তৈরী হও এসব কাজ পরেও করা যাবে।আমি তৈরীতো।
–একটু বসো আমি আসছি।
:তাড়াতাড়ি করো।
–হুম আসছি।
.
.বহুদিন পর আজ নদীর পাড়ে হাঁটছি।শরীর শীতল করা হাওয়া বইছে।চারিদিকটা একেবারে কোলাহলমুক্ত এক ধরনের নীরবতা বিরাজ করছে।আমি পানিতে পা ভিজিয়ে বসে আছি আর সাথে আকাশ।সত্যিই খুব অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা এখানেই থেমে যাক আর আমরা দুজন এভাবেই একা বসে থাকি অনন্তকাল।নিজেকে খুব সুখী একজন মনে হচ্ছে। এই শীতল হাওয়া শুধু শরীর নয় মনটাকেও শীতল করে দিচ্ছে।মনে হয় কোন দুঃখ, কষ্ট কিছুই যেন নেই এই জীবনে।এক আকাশের নিচে আরেক আকাশের পাশে বসে আছি আর সামনে নদী।সত্যিই আমি খুব ভাগ্যবতী তাই আকাশের মতো এমন একজনকে জীবনসঙ্গীরূপে পেয়েছি।আকাশ কথা বলছে আর আমি মুগ্ধ হয়ে ওর কথা শুনছি।আকাশ বললো-
:নীরা?
–হুম।
:আমি শুধু একাই কথা বলছি তুমি আজ কোন কথাই বলছো না যে?
–শুনছিতো।আজ কথা বলতে নয় বরং তোমার কথা শুনতে বেশি ভালো লাগছে।
:আচ্ছা থাক।আজ শুধু নিরব বসে থাকবো আর নদী দেখবো।
–হুম।
.
.দুজনেই চুপচাপ বসে আছি আর পরিবেশটা উপভোগ করছি।জায়গাটা আমাদের দুজনের খুব পছন্দের জায়গা কারন এদিকটাই লোকজনের চলাচল কম তাই দুজনে বসে প্রাণ ভরে নদীটা উপভোগ করতে পারি।প্রায় ঘন্টা দুই পর আকাশকে বললাম-
–আকাশ আমি ফুসকা খাবো।
:জানিতো।চলো তবে উঠি এখন।
–হুম।চলো।
.
.কথা শেষ করে উঠতে যাবো হঠাৎ মাথাটা একটু ঘুরে গেলো।সাথে সাথে আকাশ আমাকে ধরে ফেললো আর আমি ঠিক আছি কিনা জানতে চাইলো আমি ঠিক আছি বললাম।কিন্তু কিছুদিন ধরে কেন জানি হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঘুরছে আমার।মনে হয় এই কয়েকদিন অতিরিক্ত টেনশন ছিলো এরজন্যেই হয়তো এমন হচ্ছে।কিন্তু আকাশ জানলে শুধু শুধু চিন্তা করবে তাই ওরে বললাম আমি ঠিক আছি।
আমি ফুসকা খাচ্ছি আর আকাশ আমারদিকে তাকিয়ে আছে দেখে বললাম-
–কি হলো খাচ্ছোনা কেন?
:তোমার খাওয়া দেখছি।এতো তাড়াতাড়ি খাচ্ছো দেখে মনে হচ্ছে আজকেই শেষ খাচ্ছো।একটু আস্তে খাও লাগলে আরো দিতে বলবো সমস্যা নাই।
–হুম।
.
.খাওয়া শেষ করে আকাশ আমাকে নিয়ে শপিংয়ে গেলো।প্রায় ঘন্টা ঘুরে আমার জন্য একটা শাড়ি কিনলো।সবাই বলে মেয়েরা নাকি কোনকিছু কিনার জন্য দোকান ঘুরে কিন্তু আকাশ আমার জন্য কিছু কিনার আগে দশটা না দেখে কিনেনা।আমি আকাশের জন্য একটা ঘড়ি কিনলাম।কেনাকাটা যখন শেষ করে বের হবো তখন আবার মাথা ঘুরছে।এবার আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি জ্ঞান হারালাম আর কিছুই মনে নেই।যখন জ্ঞান ফিরলো নিজেকে আমাদের বিছানায় আবিষ্কার করলাম।দেখি আকাশ পাশে বসে আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর আমি তাকাতেই বললো-
:এখন তোমার কেমন লাগছে নীরা?
–ভালো।আমি এখানে আসলাম কিভাবে আর কি হয়েছিলো আমার?
:কিছুই হয়নি হঠাৎ তুমি জ্ঞান হারিয়েছিলে আমিতো খুব চিন্তায় পড়েগিয়েছিলাম পড়ে তোমাকে বাসায় নিয়ে আসি আর ডাক্তারকে খবর দেই।ডাক্তার বলেছে চিন্তার কোন কারন নেই তুমি একদম ঠিক আছো শুধু ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে হবে।আমি মাকে কল দিয়েছি মা কালকেই বাসায় আসছে।
–মাকে কল দেয়ার কি দরকার ছিলো আমিতো একদম ঠিক আছি?
:তুমি ঠিকমতো নিজের খেয়াল রাখোনা তাই আজ এই অবস্থা হয়েছে।মা আসলে তোমাকে ঠিক করতে পারবে তুমিতো আমার কোন কথাই শোনোনা।আর একটা কথা তুমি অফিস থেকে ছুটি নেও কারন তোমার শরীর দূর্বল তাই তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন।
–আমি ঠিক আছি বললামতো।
:না তুমি ঠিক নেই আর কয়দিন ধরেই তোমার শরীর ঠিক ছিলোনা অথচ তুমি আমাকে কিছুই বলার প্রয়োজন মনে করোনি কিন্তু এখন আর না।ও তোমাকে তো একটা কথা বলাই হয়নি আমার প্রমোশন হচ্ছে।
–এতো খুব আনন্দের কথা।তোমার কি দূরে কোথাও ট্রান্সফার হচ্ছে?
:কেন?
–না।মাকে যে আসতে বললে তাই ভাবলাম তুমি হয়তো আমাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাবে বলেই উনাকে খবর দিচ্ছো।
:না।আমি তোমাকে ছেড়ে……..

.
:আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছিনা।আর আমার শুধু একার না তোমারও প্রমোশন হচ্ছে কারন তুমি আমাদের টিমটিমের মা আর আমি বাবা হতে যাচ্ছি।তুমি আমাকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটাই দিতে যাচ্ছো নীরা।
–সত্যিই?তুমি সত্যি বলছো?
:হুম একশো ভাগ সত্যি।
–সত্যিই আমি মা হতে যাচ্ছি?
:হুম সত্যি।সত্যি।সত্যি।
–জানো আমার না বিশ্বাস হচ্ছে না।এরজন্যেই মনে হয় কদিন থেকেই মাথাটা ঘুরছিলো আর আমি ভাবছিলাম প্রেশার lowএর জন্যেই এমন হচ্ছে।
:কদিন থেকেই শরীর এমন আর আজও যখন তোমার মাথা ঘুরলে আমি জানতে চাইলাম তুমিতো তবুও সত্যিটা বললেনা।
–এখন থাকনা এসব।
:আচ্ছা এখন তোমার শরীর কেমন সত্যিটা বলবে কিন্তু?
–একটু দূর্বল লাগছে তবে তেমন কিছুনা।
:অনেক্ষন কথা হলো।দুপুর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি তুমি বসো আমি সালমাকে বলে খাবার কিছু আনছি।
–তুমি খেয়েছো?
:না।আমারও খাওয়া হয়নি।আসলে ডাক্তার যখন খবরটা দিলো আমি এতোটাই আনন্দিত হয়েছি যে খাওয়ার কথা ভুলে গেছিলাম।আমি খাবার আনছি তারপর একসাথে খাবো।
–আচ্ছা।(আকাশ গিয়ে খাবার নিয়ে এলো আর আমাকে নিজ হাতে খাওয়াচ্ছে।আমি বললাম)তুমি খাচ্ছোনা যে?
:আগে তুমি খাও আমি খাবো।
–আগে পরে না একসাথে খাবো।হা করো
:হুম।
.
.পরদিন সকালেই গ্রাম থেকে সবাই চলে এলো।সবাই এমন ভাবে আমার খেয়াল রাখছে আমার মনে হচ্ছে আমি বাচ্চা নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারিনা।আকাশের কথা কি বলবো ওইতো পারলে সারাক্ষন আমার পাশেই বসে থাকতো।এভাবে দিনগুলো ভালোই যাচ্ছে মনে হচ্ছে আমি সন্তান না বরং অমূল্য কোন রত্ন তাদের উপহার দিতে যাচ্ছি।আর মাত্র চারটে মাস বাকি তারপরই আকাশের টিমটিম এ পৃথিবীর আলো দেখতে যাচ্ছে।সবার আনন্দ দেখে কে?সবাইকে এতো খুশি দেখে নিজেরও খুব ভালো লাগছে।তবে শোভন সব সময়ই কল দেয় আর আমি ওর কল রিসিভ করিনা দেখে একেক সময় একেক নাম্বার থেকে কল দেয় বলে এখন আমি অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা কলগুলো রিসিভ করাই বন্ধ করে দিয়েছি।জানিনা আকাশের সাথে পরে আরো কথা হয়েছে কিনা কারন আকাশ কখনো ওর কথা কিছু বলেনি।কথা হলেও হয়তো আকাশ আমাকে কিছু বলবেনা কারন ওই কখনো আমাকে চিন্তায় রাখতে চায়না।তবে শোভন খুব বেশি বিরক্ত করছে দেখে একদিন রিসিভ করে বলেই দিলাম যে-
–আমাকে কখনো কল দিয়ে বিরক্ত করোনা শোভন।আমি আমার স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ ভালোই আছি দয়াকরে আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
:সন্তান?সন্তান এলো কোথা থেকে?
–আসেনি আসবে।আমার আর আকাশের সন্তান।
>মানে?
–এখানে না বুঝার কি আছে?
>এতো সহজে আমাকে পর করে দিলে?
–তুমিতো কখনো আমার আপন ছিলেই না তাই পর করার তো প্রশ্নই আসেনা।
>আর আমার ভালোবাসা?
–আমি কি কভু তোমাকে বলেছি আমি তোমাকে ভালোবাসি?বলিনিতো আর তুমি আমাকে ভালোবাসলে সেখানে আমার কিছু করার নেই।
>আমার জন্য কি কভু তোমার কিছু করার ছিলো যে আজ থাকবে?তুমি শুধু আমার জীবনটাকে শেষ করে দিলে।সর্বদাই তোমাকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছি আর ভেবেছি একদিন না একদিন সেই স্বপ্ন ঠিক পূরণ হবে কিন্তু… থাক এসব কথা।ভালো থেকো আর দোয়া করো আমি যেন মরে যাই তবেই তোমার সব সমস্যার সমাধান ঘটবে।অন্যথায় যতদিন আমি বেঁচে থাকবো ততদিন তোমাকে ভুলতে পারবোনা আর তোমার জন্য তা সমস্যার সৃষ্টি করবে।
.
.কথাগুলো বলেই শোভন কল কেটে দিলো।এরপর শোভন আর কল দিতোনা।সত্যি বলতে শোভনের জন্য একটু খারাপ লেগেছে কারন ওই আমাকে ভালোবাসতো।তবে আমার কিছুই করার ছিলোনা কারন যদিও আমার আর আকাশের বিয়েটা পারিবার থেকেই হয়েছে তারপরও আমি আর আকাশ একে অপরকে অনেক ভালোবাসতাম।আমার জীবনে শোভনের কোন স্থান ছিলোনা আর না কভু থাকবে।যাইহোক আর দুমাস মাত্র বাকি আমাদের সন্তানের পৃথিবীতে আসার।ইতিমধ্যেই আকাশ ছেলে-মেয়ের নাম ঠিক করে রেখেছিলো।যেদিন জানতে পারলাম আমাদের মেয়ে হবে সেদিন তো আকাশ আনন্দে মনে হয় মাটিতে পা ই ফেলতে পারছেনা।আসলে ওই প্রথম থেকেই মেয়ে চাইতো আর বলতো মেয়েটা নাকি ঠিক আমার মতো হবে তাই ওই খুব খুশি।শুধু ওই না বাসার সবাই খুব খুশি।আজ আমার বাবা-মা বেঁচে থাকলে হয়তো তারাও খুব খুশি হতেন কিন্তু মা তো ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছিলো আর বাবা একবছর হলো।তবে আকাশের বাবা-মা কখনো আমাকে তাদের অভাবটা বুঝতে দেননি একদম নিজের মেয়ের মতোই আমাকে ভালোবাসেন তারা।হঠাৎ একটা নাম্বার থেকে কয়েকবার কল আসলো দেখে শেষে রিসিভ করলাম।ওপাশ থেকে বললো-
>কেমন আছো নীরা?
–ভালো।কে বলছেন?
>আমি….

 

আমি শোভন।
–তুমি?
>বলেছিলাম আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করবোনা কিন্তু আজ আবার করলাম।নীরা আমি কয়েকদিন পর কানাডা চলে যাচ্ছি যাওয়ার আগে তোমাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই।দেখা করবে আমার সাথে নীরা?
–না শোভন আমি তোমার সাথে দেখা করতে পারবোনা।দেখো আমি pragnancy এর শেষ পর্যায়ে আছি এখন আমার পক্ষে একা কোথাও যাওয়া সম্ভব না কারন কেউ আমাকে একা কোথাও যেতে দিবেনা।
>কাল আমার জন্মদিন।কখনো কোন উপহার তোমার কাছে চাইনি দয়াকরে জন্মদিনের উপহার হিসেবেই নাহয় শেষবারের মতো আসো।প্রতিজ্ঞা করছি আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করবোনা।আর তুমি শুধু হ্যাঁ বলো তোমাকে আনার ব্যবস্থা আমি করবো।
–দেখো আমি এই অবস্থাতে একা এতো দূরে যেতেও পারবোনা।
>কাল তুমি শুধু বাসা থেকে বের হবে আমি তোমার বাসার সামনে গাড়ি তৈরী রাখবো।দয়াকরে এখন আর না বলোনা প্রতিজ্ঞা করছি আমি তোমাকে আর কখনো বিরক্ত করবোনা।
–আমি তোমাকে কথা দিতে পারছিনা।আমাকে ভাবার একটু সময় দেও।
>ঠিক আছে রাতে SMS করে জানিও আমি তোমার SMS এর অপেক্ষায় থাকবো।
–আচ্ছা।
.
.শোভন কলটা কেটে দিলো।আমি কিছুই বুঝতে পারছি না আমার কি করা উচিত।শোভনকে আমি ছোট থেকেই জানতাম ওই খারাপ ছেলে ছিলোনা কিন্তু আমার সাথে যা করেছে তাও তো ভুলতে পারছিনা।শোভন বলেছে শেষবারের মতো একবার দেখতে চায় তবে আমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে?যদি ওই কোন ক্ষতি করে আমার।না।না।আমি যাবোনা একা।আকাশ আসুক ওর সাথে কথা বলে দেখি ওই কি বলে।রাতে আকাশের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং শেষ করে আসতে অনেক রাত হবে বললো।এদিকে শোভন বারবার কল দিয়েই যাচ্ছে কি বলবো ওরে আমি?কেন জানি মন যেতে মানা করছে তবে ওর কথা শুনে আবার কেন জানি মনে হচ্ছে ওরে বিশ্বাস করি।অনেক রাতে আকাশ বাসায় এলো।আকাশ যখন শুতে গেলো আমি ওরে ধীরে ধীরে বললাম-
–আকাশ তোমার সাথে একটু কথাছিলো যদিও জানি আজ তুমি অনেক ক্লান্ত তবুও একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কথা বলা উচিত।
:আমি ঠিক আছি।বলো তুমি কি বলবে?
–আজ না শোভন কল দিয়েছিলো ওই নাকি কদিন পর দেশ থেকে চলে যাচ্ছে।তাই ওই আমাকে শেষবারের মতো একবার দেখা করতে বলছে আর কাল নাকি ওর জন্মদিন তাই কাল বলছে দেখা করার জন্য।
:ও।তা তুমি কি ওর সাথে দেখা করতে চাও?
–আসলে আমি না বুঝতে পারছিনা কি করবো কেন জানি মন থেকে যেতে ইচ্ছে করছেনা তবে ওই প্রতিজ্ঞা করেছে আর কখনো নাকি আমাদের বিরক্ত করবেনা।তাই কেন জানি ওরে এবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে আর মনে হচ্ছে এর থেকে সত্যিই যদি ওই আমাদের জীবন থেকে সরে দাঁড়ায় তবে আমরা শান্তিতে আমাদের জীবনটা কাটাতে পারতাম।প্রতিনিয়ত আর ভয়ে ভয়ে কাটাতে হবেনা আর কিছুদিন পর আমাদের সন্তান এই পৃথিবীতে আসবে তাই আমি চাচ্ছি ওর বিষয়টা এখানেই শেষ করতে।কি ব্যাপার আকাশ তুমি এভাবে বসে আছো কিছুতো বলো?তুমি যা বলবে আমি তাই করবো।
: তোমার যদি মনে হয় যেতে তবে অবশ্যই যাবে। আর আমি কি যাবো তোমার সাথে নাকি তুমি একাই যাবে?
–তুমি গেলে হয়তো দুজনেই অস্বস্তি অনুভব করতে পারো তাই আমি দিয়াকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি।তুমি কি বলো?
:দিয়া গেলে আমি কিছুটা চিন্তামুক্ত থাকতে পারি।আর তোমার যদি কোন বিষয়ে একটুও অন্যরকম লাগে তবে সাথে সাথে আমাকে কল দিবে আমি তোমাদের ফলোকরে ওর বাসার কাছেই কোথাও থাকবো।আচ্ছা তোমরা যাবে কিভাবে?
–ওইতো বললো গাড়ি নাকি পাঠাবে আমাকে নিতে।
:আচ্ছা।চিন্তা করোনা আমি তোমার কাছেই থাকবো।এখন ঘুমাও অনেক রাত হয়েছে।
.
.শোভনকে SMS করে জানিয়ে দিলাম আমি আর দিয়া আসবো।ওই পাল্টা SMS এ জানালো সকাল দশটায় গাড়ি আমাদের বাসার সামনে থাকবে।জানিনা আকাশ কি ভাবছে তবে আমার মতো আজ ওরো চোখে ঘুম নেই তা ওর নাড়াচাড়া দেখেই বুঝতে পারছি।তবে আমি একবার শোভনের মুখোমুখি হতে চাই।সামনে থেকে ওরে বুঝাতে চাই আমার জীবনে ওর সত্যিকারেই কোন স্থান নেই।আমি শুধুই আকাশের অন্যকারো কথা আমার দ্বারা চিন্তা করাও পাপ সমতূল্য।আমাকে ভুলে ওই যেন ওর জীবনটা নতুনভাবে শুরু করে আর আমাকেও আমার মতো করে থাকতে দেয়।
সকালে উঠে নাস্তা করে দিয়াকে নিয়ে বের হলাম আর আকাশকে বললাম একটু পর বের হয়ে আমাদের ফলো করতে।একঘন্টা পর আমি শোভনের বাড়িতে গেলাম।গিয়ে দেখি অনেকেই এসেছে আর আমি যেতেই শোভন নিজে এসে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলো।বললো-
>কেমন আছো?আসতে কোন সমস্যা হয়নিতো?
–না।আমি ঠিক আছি।
>ভাবতে পারছিনা তুমি আসবে তবে মনে বিশ্বাস ছিলো যে তুমি আসবে।ইনি কে?
–ওই আমার ননদ দিয়া।বাসা থেকে একা বের হতে দিতোনা তাই ওরে সাথে আনা।
>ভালো করেছো।কেমন আছেন আপনি?
~(দিয়া বললো)জ্বী আমি ভালো আছি।আপনি?
>আমিও ভালো।
–শোভন আমি কিন্তু বেশিক্ষন থাকতে পারবোনা।
>এইমাত্রই তো আসলে এখনি যাওয়ার কথা বলছো?দুপুরে না খেয়ে যেতে পারবেনা।
–না।আমি এতোক্ষন থাকতে পারবোনা বাসার সবাই চিন্তা করবে।
>আচ্ছা আগে আসো কেকটা কাটি তারপর নাহয় বাকি কথা।
.
.শোভন কেক কাটলো তারপর…..

শোভন কেক কাটলো তারপর সবাই একসাথে বসে গল্প করছে কিন্তু শোভনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখলাম।তাই আমি শোভনের কাছে গিয়ে বললাম-
–অনেক্ষন তো হলো এবার সত্যিই আমাদের যাওয়া উচিত।
>কি বলছো এতো দ্রুত?
–হুম।
>আরে না।বসে গল্প করো একটুপর খাওয়া-দাওয়া করে পরে যাবে।
–আসলে আমার ভালো লাগছেনা কারো সাথে কথাও বলতে পারছিনা।
>আমি আছিতো আর বলে দিয়েছি এখনই খাবার দিবে।কেমন আছো তুমি?যদিও দেখে ভালোই মনে হচ্ছে।
–হুম আমি ভালো আছি।
>আকাশ তোমাকে অনেক ভালোবাসে তাইনা?
–হুম নিজের থেকেও বেশি।
>আচ্ছা ওই কি তোমাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে?
–কখনো পরিমাপ করিনি আর না কখনো করতে চাই।
>কেন?
–কারন তুমি আমাকে ওর মতো ভালোবাসলে কখনো ঐ মিথ্যা ছবিগুলো বানাতে পারতে না।
>সেটাতো একটা পরীক্ষা ছিলো।আচ্ছা তুমি যে এসেছো আকাশ জানে?
–হুম।আমি ওরে না জানিয়ে কিছু করিনা।
>আকাশের প্রতি এতো ভালোবাসা আর আমার প্রতি এতো ঘৃণা?আচ্ছা আমিতো কখনো তোমার ক্ষতি করিনি তবে আমার জীবন থেকে কেন সব সুখ কেড়ে নিলে?
–আমি তোমার জীবন থেকে সুখ কেড়ে নিয়েছি?
>তোমার জন্য নিজের সবকিছু হারিয়ে আজ নিঃস্ব আমি আর তুমি?
–দেখ বাবা যে তোমাকে তার প্রভাব খাটিয়ে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য করেছিলো তা আমি সেদিন জানলাম আর আজ বাবার হয়ে ক্ষমা চাইতেই আমি এসেছি।স্বীকার করছি বাবা যা করেছে হয়তো ঠিক করেনি কিন্তু এখনতো আর কিছু করার নেই।তুমি দয়াকরে সব ভুলে নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নাও আর আমাকেও আমার মতো থাকতে দাও।
>বাবাকে হারিয়ে আমার একমাত্র অবলম্বন মা ছিলো তাকেও হারিয়ে এখন এতিম আমি।আর আজ কতো সহজে তুমি ক্ষমা চেয়ে নিলে আর আমাকে বললে নতুন করে জীবন গুছাতে।চাইলেই কি সবকিছু ভোলা যায়?
–তুমি এখন কি করতে চাও?প্রতিশোধ নিতে চাও?
>না নীরা।আমি কিছুই চাইনা শুনেছি আল্লাহ্ যা করেন আমাদের ভালোর জন্যেই করেন আর আল্লাহ্ যা করবেন তাও ভালোর জন্যেই করবেন।আমার কথা বাদ দাও তোমার ননদ অনেক্ষন যাবত খেয়াল করছে পরে কিছু মনে করতে পারে আর খাবার দিয়ে দিয়েছে আগে খেয়ে নাও।
.
.কথাগুলো বলেই শোভন কোথায় যেন চলে গেলো।আমি দিয়াসহ সবার সাথে খেতে বসলাম।খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ আকাশ ফোন দিয়ে বললো ওর একটা জরুরী মিটিংয়ে যেতে হবে তাই আমি আর দিয়াকে একটু কষ্টকরে একাই যেতে হবে।আমি বললাম ঠিক আছে তুমি চিন্তা করোনা আমরা চলে যাবো।খাওয়া শেষে শোভনকে খুজঁছি এমন সময় হাতে একটা বক্স নিয়ে শোভন বললো-
>কি ব্যাপার এতো দ্রুত খাওয়া শেষ?
–হুম।তুমি কোথাই গিয়েছিলে কতক্ষন যাবত খুজঁছি?
>আমাকে খুজঁছিলে?
–হুম।তোমার জন্মদিন অথচ তোমাকে রেখেই খেয়ে নিলাম।এখন আমাদের বের হতে হবে নয়তো দেরি হয়ে যাবে তাই তোমাকে বিদায় জানানোর জন্যেই খুজঁছিলাম।
>দাঁড়াও আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি ওই তোমাদের নামিয়ে দিবে আর এইটা তোমার জন্য।
–না।না।এসবের কোন দরকার নেই।আর এই বক্সের মধ্যে কি আছে?
>এখানে তোমার পছন্দের বরইয়ের আচার আছে।ছোটবেলায় দেখতাম বরইয়ের আচারের প্রতি তোমার অন্যরকম একটা দূর্বলতা রয়েছে।আর এখনতো তোমার আচার খাওয়ার সময়ই তাই ভাবলাম তুমি আমাকে উপহার দিলে আর আমি তোমাকে কিছু দিবোনা তা কি হয় তাই এটা তোমার জন্য।
–ধন্যবাদ।আর তোমার দেয়া এই উপহারের কথা আমার মনে থাকবে।ভালো থেকো আর আমাদের জন্য দোয়া করো।
>আমি জানি তুমি কভু এই উপহারের কথা ভুলতে পারবে না তাইতো এই উপহার দেয়া।আর এতো সহজে তুমি আমাকে ভুলে যাবে তা কি হয় তাইতো যাতে ভুলতে না পারো তারজন্য এ ব্যবস্থা।
–মানে?
>মানে হলো তুমি এই আচার খুব পছন্দ করো তাই এটাই দিলাম যাতে তোমার মনে থাকে।আর নিশ্চিন্তে থাকো আমি তোমাকে আর কোনদিন আমার দেখা দিবোনা আর তোমার সামনেও আসবোনা।তবে আমি জানি তুমি জীবনে একবার হলেও আমার সাথে দেখা করতে চাইবে।
–এতো আত্নবিশ্বাস তবে তোমার কথাগুলো বুঝতে পারছিনা কেমন যেন রহস্যময় লাগছে?
>বাদ দেও তো আমার কথা।আল্লাহ্ তোমাকে ভালো রাখুক এই আশাই রাখি।
–তুমিও ভালো থেকো।আসছি।
>হুম।
.
.আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠলাম।আকাশ নেই আর এই অবস্থায় এখানে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব নয় তাই শোভনের গাড়ি করেই বাড়িতে আসা তবে শোভনের কথাগুলো কেমন যেন লাগছে।জানিনা ওর কথাগুলোর মানে কি ছিলো তবে ওর প্রতি আমার একটা খারাপ লাগা কাজ করছে।কারন কোন না কোনভাবে আমার জন্যেই ওই ওর মাকে হারিয়ে যা আমি ভুলতে পারবোনা।যাইহোক সুস্থভাবেই বাসায় আসলাম।এসেই আকাশকে কল দিয়ে বলে দিলাম আমি ঠিক আছি আর সুস্থভাবেই ফিরেছি।তবে সত্যি বলতে শোভনের শেষ কথাগুলো কিছুতেই বুলতে পারছিনা।আর শোভনের দেয়া আচারের বক্সটার দিকেও বারবার চোখ চলে যাচ্ছে।কি অদ্ভুত!শোভনের মনে আছে আমি এই আচার এতো পছন্দ করি?এসব ভাবতে ভাবতে চোখ লেখে যায়।হঠাৎ কারো স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গলো চেয়ে দেখি আকাশ পাশে বসে আছে আর আমাকে তাকাতে দেখে বললো-
:কি হলো এই অসময়ে শুয়ে আছো শরীর ঠিক আছে তো?
–হুম।আসলে……..

–হুম।আসলে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে গেলো টেরই পেলামনা।তুমি কখন এলে আর আমাকে ডাকনি কেন?
:একটু আগেই এসেছি।তুমি শুয়ে আছো বলে ডাকিনি।
–তুমি বসো আমি নাস্তা নিয়ে আসি।
:না আমি এখন খাবোনা।বসো গল্প করি।
–জানো আজ শোভন আমাকে আচারের একটা বক্স দিয়েছে।
:তাই নাকি?
–হুম।আর জানো আজ ওর কথাগুলো আমার কাছে কেমন যেন লেগেছে।
:থাক এসব কথা।ওর পর্ব এখানেই শেষ এখন তুমি শুধু তোমার কথা ভাবো কেমন?
–হুম।
.
.এরপর দিনগুলো ভালোই যাচ্ছে।কিছুদিন পর শরীরটা ঠিক ভালো যাচ্ছেনা তারপর হঠাৎ করেই আমার ব্লিডিং শুরু হয়।হাসপাতালে নেয়া হলো ডাক্তার বললো দ্রুত কিছু পরীক্ষা করতে হবে বর্তমান অবস্থা বুঝার জন্য।এরপর কি হয়েছে আমার কিছুই মনে নেই।যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলাম আকাশ আমার পাশে আমার হাত ধরে বসে আছে।আমার জ্ঞান ফিরতে দেখে নার্স ডাক্তারকে ডাকতে গেলো।আর আকাশ বললো-
:এখন কেমন লাগছে নীরা?
–ভালো।(নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম আমাদের বাচ্চাটা আর আমার পেটে নেই তাই আকাশকে বললাম) আমাদের বাবু কোথায় আকাশ?
:তোমার শরীর এখন খুব দূর্বল।এসব পরেও জানতে পারবে এখন নয়।
–আমি একদম ঠিক আছি।বলোনা আমার বাবু কোথায়?একটাবার আমাকে দেখাও না।
.
.এমন সময় ডাক্তার এলো আর ডাক্তার আসতেই আকাশ কি কাজে যেন রুম থেকে চলে গেলো।ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করতে করতে বললো-
~এখন কেমন ফিল করছেন?
–জ্বী ভালো।আচ্ছা ডাক্তার আমার বাচ্চা কোথায় আমি তাকে একটু দেখতে দেখতে চাই?
~আপনার শরীর খুব দূর্বল তাই এখন আপনার বিশ্রাম নেয়া উচিত।
–সমস্যাটা কি?আকাশকে বললাম ওই ও আমাকে এড়িয়ে গেলো আর এখন আপনি।সত্যিকরে বলেনতো আমার বাচ্চা কোথায়?(কথাগুলো বলে উঠতে যাচ্ছিলাম দেখে ডাক্তার বললো)
~দেখেন আপনি কিন্তু সিজারিয়ান আর আজ দুদিন পর আপনার জ্ঞান ফিরলো এখন আপনাকে শুধু বিশ্রাম নিতে হবে বাকি বিষয়গুলো আপনার স্বামী দেখছেন তাই আপনার চিন্তিত হওয়ার কোন দরকার নেই।
–কিন্তু আমার বাচ্চা?
~ওইতো আপনার স্বামী চলে এসেছেন আমি একটু তার সাথে কথা বলবো আর আপনি কিন্তু কোন কথা না বাড়িয়ে বিশ্রাম নিবেন।
.
.কথাগুলো বলেই ডাক্তার আকাশকে নিয়ে বাইরে গেলো।আমি বুঝতে পারছিনা ওরা কেন আমার কথাই শুনতে চাচ্ছেনা।
.
.____<শোভন>____
.
.হা হা আমি পেরেছি।সত্যিই আজ আমি পেরেছি নীরা।তোমাকে শুধু মন থেকে ভালোবেসে ছিলাম কিন্তু তার বিনিময়ে আমি কি পেয়েছি?নিজের জীবনটা নষ্ট হয়েছে আর একমাত্র অবলম্বন ‘মা’ তাকেও আমি হারিয়েছি।তোমাকে ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে আমি এতোকিছু পেয়েছি আর তুমি কিছুই পাবেনা তা কি হয় নীরা?না।তাইতো তোমাকেও কিছু দিয়েছি আমি।তোমাকে ভালোবাসার জন্য তোমার বাবা তার প্রভাব খাটিয়ে আমাকে আর মাকে বাড়ি ছাড়া করে।আর মাকে নিয়ে আমাকে কত অপমানই না সহ্য করতে হয়।শেষে মা আর সহ্য করতে না পেরে আমাকে এতিম করে চলে যায়।এতিম হয়ে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব তখন জানলাম তোমার বিয়ে হয়েছে আর স্বামী সংসার নিয়ে সুখে আছো।যেই তোমাকে ভালোবাসার জন্য আমার এই অবস্থা সেই তুমি এতো ভালো কিভাবে থাকতে পারো বলোতো?তাইতো আকাশের সাথে দেখা করলাম আর সবকিছু বললাম সাথে কিছু ছবিও দিলাম।ভেবেছিলাম আকাশ তোমার জীবন থেকে সরে যাবে আর আমি তোমাকে আমার জীবনসাথী করবো।কারন যাকে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়েছিলাম তাকে তো আমার যেকোন উপায়েই আমার করে পেতে হতো।কিন্তু না।এবারো আমি পরাজিত হলাম।আকাশ আর তোমার মিল হয়ে গেলো আর আমি আঁটি হয়েই রয়ে গেলাম।এরপর অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু আকাশকে তোমার জীবন থেকে সরাতে পারিনি।শেষে যখন শুনলাম তোমার আর আকাশের বাচ্চা আসতে চলেছে এই পৃথিবীতে তখন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি।তোমার জন্য আমার জীবনটা শেষ অথচ তুমি দিব্যি সুখে সংসার করবে আর আমি দেখে যাবো এতো মহান আমি না।তাইতো তোমার সাথে অভিনয় করে তোমাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাওয়ার কথা বলা।তোমাকে যেমন নিজের থেকে বেশি ভালোবেসে ছিলাম ঠিক তেমনি তোমাকে আমার মতো জীবনযাপনের ব্যবস্থাও করেছি।আমি কষ্টে থাকবো তুমি সুখে থাকবে বিষয়টা ঠিক কেমন হয়ে যায়না?তাই তোমাকে আমার মতো থাকার ব্যবস্থা করেছি।আমি যেমন নিজের মাকে হারিয়েছি ঠিক তেমনি তুমি তোমার সন্তানকে হারিয়েছো।প্রিয় কারো চলে যাওয়ার কষ্ট আমি একাই পাবো আর তুমি পাবেনা তা কি হয়?তোমাকে বলেছিলাম না নীরা এমন একদিন আসবে যেদিন তুমি জীবনে একবার হলেও আমার মুখোমুখি হতে চাইবে কিন্তু কখনো পারবেনা আর আমি তোমাকে কখনো আমাকে ভুলতে দিবোনা।আজ আমি আমার কথা রেখেছি।এজীবনে কখনো তুমি আমাকে ভুলতে পারবেনা।এখন দেখবো কেমন তোমার আকাশের ভালোবাসা?তুমি কখনো সন্তানের মা হতে পারবেনা জেনেও ওই তোমাকে আগের মতো মেনে নিতে পারবে কি?আমি যেমন সমাজের কাছে অপমানিত হয়েছি এখন তুমিও হবে।তোমাকে দেবার মতো এর থেকে ভালো আর উপহার আমি খুঁজে পাইনি।এখন শুধু আমি না জানবো আমার সাথে তুমিও আছো একই কষ্টের সহযাত্রী হিসেবে।হা হা হা…….

নীরার সাথে আমার বিয়েটা পারিবারিকভাবে হলেও প্রথম দেখাতেই আমি ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।তাইতো যতোই সময় অতিবাহিত হয়েছে প্রতিনিয়ত আমি আরো বেশি করে ওর প্রেমে পড়েছি আর জানি ওই ও আমাকে খুব ভালোবাসে।স্বীকার করি আমাদের মাঝে একবার শোভনের জন্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে আর আমি ওর কথা বিশ্বাসও করেছি কিন্তু পরে আমি নিজের ভুল বুঝতে পারি।তাইতো আমাদের মাঝে শোভনকে আর কোনো সমস্যার সৃষ্টি করতে দেয়নি।প্রতিদিনই শোভন নতুন উপায়ে চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হতে পারেনি।তারপর তো আরো সফল হতে পারেনি কারন আমার আর নীরার সন্তান এই পৃথিবীতে আসতে চলেছিলো।সেদিন যখন নীরা বললো ওই শেষবারের মতো শোভনের সাথে দেখা করে ওরে আমাদের জীবন থেকে সরে যাওয়ার কথা বলতে চায়।তখন আমি মন থেকে কেন জানি নীরার কথাগুলো মেনে নিতে পারছিলাম না তারপরো ওরে বলি ঠিক আছে যা ভালো মনে হয় করো।কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারিনি সেদিন মনে মনে কি যেন একটা হারানোর ভয় আমাকে ঘিরে রেখেছিলো।তাই নীরার সাথে যাওয়ার কথা ভাবি কিন্তু একটা জরুরী মিটিংয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত আর সাথে থাকতে পারিনি।তারপর যখন নীরা বললো ওই ঠিকমতো বাসায় এসেছে শুনে স্বস্তি পেয়েছিলাম। বাসায় এসে যখন জানতে পারলাম শোভন নীরাকে আচারের বক্স দিয়েছে কি বলবো নীরাকে ভেবে পাচ্ছিলাম না।একবার মন বলছিলো সব ঠিক আছে আরেকবার মন বলছিল না আচারে হয়তো অন্যকিছু আছে তাই প্রথম নিজে খেয়ে তারপর নীরাকে খেতে দিয়েছিলাম।কিছুদিন পর হঠাৎ নীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে আর খুব ব্লিডিং হতে থাকে তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।কিন্তু ডাক্তার যখন পরীক্ষা করে বললো নীরাকে এমন একটা কেমিক্যাল ধীরে ধীরে দেয়া হয়েছে যা আমাদের সন্তানটাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নিয়েছে।আর এখন নীরাকেও একইদিকে নিয়ে যাচ্ছে তখন কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।ডাক্তার বললো দ্রুত বাচ্চাটাকে বের করতে হবে নয়তো নীরাকেও বাঁচানো সম্ভব হবেনা।নীরা আর কখনো মা হতে পারবেনা কথাটা শুনে মাথায় আসমান ভেঙ্গে পড়েছিলো কিন্তু আমাকে শক্ত হতে হতো তাই নিজেকে ভাঙ্গতে দেয়নি।কিন্তু দুদিন পর নীরা জ্ঞান ফিরে যখন বাচ্চার কথা জানতে চাইলো কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।ডাক্তার বললো নীরার মানসিক অবস্থা বেশি ভালোনা আর এদিক দিয়ে ওরে সত্যিটাও বলতে পারছিলাম না।শেষে বাধ্য হয়ে ওরে সত্যিটা বলতে হলো যে আমাদের সন্তান আর নেই কিন্তু আমি ওরে কিছুতেই বলতে পারলামনা যে আর কখনো ওই সন্তানের মা হতে পারবেনা।কারন আমাদের বাচ্চাটা নেই এটা শুনেই নীরার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।তারপর ধীরে ধীরে ওই সুস্থ হয় আর ওই আবার বাচ্চা নিতে চায়।শুধু ওইনা আমার পুরো পরিবার চায় বংশধর কিন্তু আমিতো জানি তা কখনো সম্ভব নয় কারন নীরা কখনো মা হতে পারবেনা আর না আমি পারবো ওরে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করতে।ইদানিং বাবা-মার জোরটা একটু বেশিই তাই বললাম আমি আর কখনো বাবা হতে পারবোনা।কথাটা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেছিলো।পরে নীরা আমাকে বলে দেখো অনেকেরই তো বাচ্চা নেই আমাদেরও নাহয় নাই হলো।আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি আর তুমিই আমার সব আমার আর কাউকে চাইনা।মাও নীরাকে বুঝালো দেখো আকাশ তোমাকে অনেক ভালোবাসে তুমি কখনো ওরে ছেড়ে যেওনা।আমি জানি যদি মা সত্যিটা জানতো তবে কখনোই এখনকার মতো সহজে বিষয়টা মেনে নিতোনা বরং আমাকে আবার বিয়ে করতে বাধ্য করতো।কিন্তু সত্যিটা আমি বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারিনি নীরা জেনে গিয়েছিলো।আর ওই আমাকে আরেকটা বিয়ে করার জন্য বাধ্য করছিলো আর বলছিলো ওর জন্য কেন আমি বাবা-মাকে ঠকাবো?আমি শুধু বলেছিলাম আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে নীরা?নীরা আর কোন কথা বলতে পারেনি শুধু নিরবে কেঁদেছে কারন সে কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি।প্রতিনিয়ত সে শোভনের সাথে শেষবারের মতো দেখা না করতে যাওয়ার কথা ভেবেছে।আমি জানি আমার নীরার কোন ভুলছিলোনা আর যদি ওর কোন ভুল থেকে থাকে তবে তা শোভনের মতো একটা ছেলে ওরে ভালোবেসেছিলো এটাই ভুলছিলো।প্রকৃতপক্ষে ওর কিছুই করার ছিলোনা কারন শোভনের মতো ছেলেরা আসলে কাউকে ভালোই বাসতে পারেনা,ওরা শুধু পারে প্রতিশোধ নিতে যা ওই নিয়েছে।ওই ভেবেছিলো ওই জয়ী হয়েছে কিন্তু না আমি কখনো ওরে জয়ী হতে দিবোনা।জীবনে যতদিন বেঁচে থাকবো আমি নীরার চোখে একফোঁটা পানি আসতে দিবোনা।হয়তো নীরা আমাকে সন্তান দিতে পারবে না তাতে কি হয়েছে ওইতো আমার জীবন।ওই আছে বলেই আমি আছি আর কিছুর দরকার নেই আমাদের।
.
.__–নীরা–__
.
.ডাক্তার যখন আকাশকে ডেকে নিয়ে গেলো তখন বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা হয়েছে।শেষে যখন কোন মতেই আমাকে মানাতে পারছিলোনা তখন আকাশ বললো আমাদের বাচ্চা বেঁচে নেই।বুঝতে পারছিলাম আমার বাচ্চাটার কিছু হয়েছে কিন্তু কখনও কল্পনাও করিনি যে আমার বাচ্চাটা বেঁচে নেই।কোনভাবেই এটা মেনে নিতে পারছিলাম না শেষে আকাশ আমাকে বুঝিয়ে শান্ত করলো।কিন্তু একটু সুস্থ হয়ে যখন আকাশকে বললাম আমার বাচ্চা চাই আকাশ কেমন যেন এড়িয়ে যেতে লাগলো।প্রথমে ভাবলাম আমি অসুস্থ তাই এখন বাচ্চা চাচ্ছেনা।কিন্তু যখন পরিবারের সবাই বাচ্চা নেয়া জন্য জোর করছিলো তখন ওই বললো ওর নাকি কি একটা রোগ হয়েছে যার কারনে ওই কখনো বাবা হতে পারবেনা।শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু আমিতো আকাশকে ভেঙ্গে যেতে দিবোনা তাই বলেছিলাম অনেকেরইতো বাচ্চা হয়না আকাশ আমাদেরও নাহয় নাই হলো।আমরা একে অপরের জন্যেই অনেক আর কারো দরকার নেই আমাদের।কিন্তু কিছুদিন পর যখন আসল তথ্যটা সামনে এলো যে আমি কখনো মা হতে পারবোনা।শোভনের প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে আমি আমার মাতৃত্ব হারিয়েছি তখন ভেঙ্গে পড়েছিলাম।আকাশ আমার কথা ভেবে মিথ্যে বলেছিলো।ওরে আবার বিয়ে করতে বলি কিন্তু ওই বলে উঠে আমি ওর জায়গায় থাকলে কি করতাম?কোনমতেই আকাশকে রাজি করানো গেলোনা উল্টো আকাশ প্রতিজ্ঞা করালো যেন এই কথা জীবনে কেউ না জানে।ওই আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে ভাবতে পাবরেনা তখন অনেক কেঁদেছি আর ভেবেছি কেন আমার সাথে এমন হলো?আকাশ আমাকে কখনো কষ্ট পেতে দেয়নি বরং সবসময় আগলে রেখেছে।আমার জীবনে যদি কোন অভিশাপ থেকে থাকে তবে তা অবশ্যই শোভন।ওর ভালোবাসা আমার জীবনে অভিশাপ স্বরূপ যা আমার সুখের জীবনটাকে কষ্টের নীল আলোতে ভরে দিতে চেয়েছে।কিন্তু আমি বলবো আমার জীবনে অবশ্যই বড় কোন পূণ্য ছিলো যার জন্যেই আমি আকাশের মত কাউকে জীবন সাথী হিসেবে পাই।যে কিনা আমাকে এত ভালোবাসে যে তার ভালোবাসার প্রাচীর ভেদ করে শোভন কেন কেউ কখনও আমাকে ছুঁতে পারবেনা।শোভন ভেবেছে ওই আমার চরম ক্ষতি করেছে কিন্তু আমি বলবো আমি পৃথিবীর সবথেকে বেশি সুখী কারন আল্লাহ্ আমাকে আকাশ দিয়েছে।তোমাকে আমি মনে করবো শোভন তবে তা শুধু এটা বুঝানোর জন্য যে আল্লাহ্ আমাকে আকাশের ভালোবাসার মত পবিত্র ভালোবাসা দিয়েছে যেখানে তোমার মত কারোর অভিশপ্ত ভালোবাসার আমার জীবনে কোন স্থান নেই।তোমার ভালোবাসা অভিশপ্ত ভালোবাসা যা কাউকে কখনো সুখী করতে পারেনা না তুমি নিজে কখনো সুখী হবে।প্রতিনিয়ত আমার আর আকাশের পবিত্র ভালোবাসা দেখে তুমি কষ্টের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরবে।।।।।।


____(সমাপ্ত)____

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*