অভিমান [৭ম পর্ব]

লেখাঃ রাকিবুল হাসান

আমি আর পাত্তা দিলাম না। আমি আমার কেবিনে এসে পড়লাম। তারপর কিছুক্ষন পরে ইলা এসে আমার হাত টানতে টানতে ঘুরতে যাবে বলে বের করে নিয়ে আসলো। তারপর আমরা গেলাম উত্তরা দিয়াবাড়ি!

জায়গাটা আমার প্রিয় জায়গা গুলোর মধ্যে অন্যতম! ঢাকার ব্যস্ত নগরীর জাম ঠেকিয়ে এখানে এসে দাঁড়ালে সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যায়৷ দু’হাত দু’দিকে বাড়িয়ে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। এ যেনো এক প্রশান্তি আর প্রকৃতির মায়াজাল এর হাওয়া! যার সামান্য টুকু পাই আমি এই জায়গায়! আর পাই মাঝ রাতে ছাদে বা ভোরে সূর্য মামা জাগার আগে!

আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি ইলার সাথে এসেছি। আমাকে এত শান্তি পেতে দেখে ইলা হয়তো আমায় কিছু বলে নি। তবে কিছুক্ষন পরে ও আমায় বলে উঠলো,

– রাকিব? যার জন্য আসলাম সেটা করবে না? (ইলা)
– যার জন্য আসলাম মানে? (আমি)
– তোমার অতীত টা জানতে চাও না তুমি?
– চাই। 
– হুম। তাহলে আসো, ঘাস গুলোর উপরে বসে নেই।
– চলো।

তারপর ঘাস গুলোর উপরে বসলাম! ইলা আমার সামনে সোজাসুজি হয়ে বসলো। তারপর বলতে শুরু করলো,

ইলা ঃ———
রাকিব তোমার আর আমার দেখা হয়েছিলো ঠিক এইজায়গা তে ৩ বছর আগে। আমি প্রায় ই আসতাম এই খানে। তোমাকে দেখেছিলাম মাঝে মাঝে। তবে আমি তখন বেশি একটা গুরুত্ব দিতাম না। তোমাকে তখন আমার কাছে জোকার জোকার টাইপ লাগতো। আমি আসতাম কারন আমি এই জায়গা টার প্রেমে পড়েছিলা, তাই! কিন্তু আমি জানতাম না যে তুমি আমায় ফলো করছো!

আস্তে আস্তে বুঝতে পারি! আমি বাসা থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে বাসায় ফিরা পর্যন্ত তুমি আমায় ফলো করতা! আমি বুঝতে পারতাম না প্রথম প্রথম। একদিন আমার এক বান্ধুবি আমায় বলেছিলো, যে তুমি আমায় ফলো করছো৷ তারপর থেকে আমি লক্ষ্য রাখতাম! আসলেই কি তুমি আমায় ফলো করতা নাকি না। আমি দেখি যে আসলেই তুমি আমায় ফলো করতেসো। আমার কাছে ব্যাপার টা খুব বিরক্তি কর লাগতেছিলো!

প্রতিদিন বাসা থেকে তোমায় মারার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসতাম। কিন্তু আমি বাসার গেট থেকে বের হয়ে তোমায় দেখলেই আমার মাথার সব কিছু ঘুরে যেতো। আমি বাকরুদ্ধ হিয়ে যেতাম জানো। আমার ইচ্ছে হত সময় টা একটু থেকে যাক। দূরত্ব টা কমে যাক।

কিন্তু এইগুলো কেনো হতো আমার সাথে সেটা আমি বুঝতে পারতাম না। আমি কারো সাথে কিছু শেয়ার করতে পারতাম না। আমার লজ্জ্বা লাগতো। আয়নায় নিজেকে দেখতাম আর তোমায় ভেবে লজ্জ্বায় মুখ লুকাতাম কাঁথার নিচে। এমনি ভাবেই দিন গুলো যাচ্ছিলো তোমার আর আমার।

তবে হুট করে একদিন তুমি এই জায়গায় ঠিক আমিরা যেখানে বসে আছি। প্রোফোজ করেছিলে তুমি আমায়। আমি ভুলতে পারবো না এ দিন টার কথা। আমি অপেক্ষা করছিলাম এই দিনটার জন্য! তবে তোমার উপর আমার একটু অভিমান জমে ছিলো তাই আমি সেদিন কিছু বলিনি তোমায়। বলেছিলাম ১০ দিন পর! সেদিন তুমি আমায় ভয়ে ভয়ে জড়িয়ে ধরেছিলে। আর কাঁপতেছিলে। তোমায় দেখে হাসি পেলেও রাগ হচ্ছিলো। তারপর আমিই তোমায় শক্ত করে জড়িয়ে ছিলাম। আর তুমি বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিয়েছিলে! তারপর থেকে আমারদের এক নতুন অধ্যায় এর সূচনা হয়।

ভালোই যাচ্ছিলো আমাদের দিনগুলো।

— তবে বিপত্তি বাঁধালো তোমার বাবা ইলা….!! (আমি বলে উঠলাম)

আমি একথা বলায় ইলা অবাক হয়ে আমার দিকে তাঁকালো। ওর চোখে মুখে শুধু একটাই জিজ্ঞাসু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, ” তোমার সব মনে পড়ে গিয়েছে ?? “

আমি ওর এই প্রশ্নের উত্তর দিলাম,

– হুম। আমার সব মনে পড়ে গিয়েছে। আর আমি তো ভুলিই নি। মনে পড়া তো দূরে থাক! (আমি)
– তবে কেনো? এতদিন আমায় বলো নি কেনো? (ইলা)
– অভিমান হয়েছিলো তোমার উপর!
– কেনো? 
– কারন টা খুব স্বাভাবিক! তুমি জানো আমি বেঁচে আছি। তোমার বাবা তোমায় বলেছিলো সে আমায় প্রাণে মারেনি তাহলে তুমি আমায় একটু দেখতে আসলে না কেনো? 
– বাবা তো বলেছিলো তোমায় সে মারেনি। তুমি নাকি আত্নহত্যা করেছো?? (চোখ থেকে পানি পড়ছে)
– তুমি এটা কি করে ভাবলে ইলা? আমি নিজেই অনেকের আত্নহত্যা করতে দেই নি। সেখানে আমি কেনো এটা করতে যাবো? আর তুমি আমায় খুজতে পারলে না একটু?
– খুজেছি তো। অনেক খুজেছি। কিছু পাই নি তোমায়।
– কিভাবে পাবে বলো তো? তুমি তো আমায় মন দিয়ে খোজ নি? (অভিমান নিয়ে বললাম)
– প্লিজ রাকিব? তুমি বোঝেও অবুঝ হচ্ছো কেনো? আমি তোমার স্ত্রি ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিলো তুমি বেঁচে আছো। তাই আমাকে বিয়ে করে নিতে বলেছিলো। কিন্তু আমি করিনি তোমার জন্য। তোমার এই বুকে একটু জায়গা পাওয়ার জন্য। তুমি জানো? কত রাত আমি ঘুমাতে পারি নি? কত রাত আমার মনে হয়েছে মরে যাই। কিন্তু চেষ্টা করতে গেলেই তোমার ছবি ভেশে উঠতো। যার কারনে আমার আর নিজেকে শেষ করে দেওয়া হতো না। তোমার আমায় করা প্রতিটা ছোয়া আমার কাছে এখন জীবন্ত মনে হয়! তোমার স্পর্শ গুলো তোমার আস্তিত্ব জানান দিতো আমাকে। ফিল করতাম আমি। আর এখন তুমি এগুলো বলছো? (কেঁদে ফেলল)
-…….. (চুপ করে থাকলাম)….
– কি হল? বল আমায়? আমার কি অপরাধ ছিলো? আমি কি করতাম? তুমি কি করতা আমার মত জায়গায় থাকলে? তুমি জানো না তোমার লাগা প্রতিটা আঘাত আমার গায়েও লেগেছে? তোমার কষ্ট গুলো আমার ও লেগেছে? তুমি বুঝ না? বুঝো না এই বুকে শুধু তুমি আছো? শুধু তুমি? আর কারো ছিটেফোটাও জায়গা নেই? (আমার কলার চেপে বলল)

আমার কলার থেকে হাত ছাড়িয়ে আমি উঠে চলে আসতে লাগলাম গাড়ির কাছে৷ ইলার ড্রাইভার কে কিছু টাকা দিয়ে পঠিয়ে দিলাম। তারপর গাড়িতে বসে ইলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম! ইলা এসে বসে পড়লো। ও সামনে আমার সাথে বসলো। ও আগের মতই সিট বেল লাগালো না। এটা ওর মনে নেই? নাকি আমাকে বাজানোর জন্য ও এটা করছে?

আমি আর পাত্তা দিলাম না। আগের মত করে সিট বেল লাগিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করলা ! লক্ষ্য কোথায় জানি না। তবে চলতে হবে। ইলার প্রতি একটু অভিমান জমে আছে আমার৷ সেটা পূরন না হওয়া পর্যন্ত ওর সাথে আগের মতই কলিগ – বস এর সম্পর্ক চালিয়ে যাবো।

গাড়ি চালানোর সময় ইলা আমার হাত ধরেছিলো। তবে আমি ছাড়িয়ে নিয়েছি। ও কাঁদছিলো। সেটা আমার ভালো না লাগলেও অভিমান এর কারনে এড়িয়ে গেলাম বিষয় টা। 
চলবে??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*