অবেলার অভিলাষ [অন্তিম অংশ]

লেখাঃ শারমিন আক্তার সাথী

__বাবা আমি জা‌নি প‌রিবা‌রের বিরু‌দ্ধে গি‌য়ে বি‌য়ে করা মো‌টেও ঠিক না। কারন প‌রিবা‌রে বিরু‌দ্ধে গি‌য়ে বি‌য়ে কর‌লে একজ‌নের ভা‌লোবাসা পে‌লেও বা‌কি প‌রিবা‌রের অভিশাপ কুড়া‌নো লা‌গে। তা‌তে সুখী হবার চেষ্টা ক‌রেও হ‌তে পা‌রে না। কিন্তু প‌রিবারই য‌দি বুঝ‌তে না চায় ত‌বে আমরা কী কর‌বো ব‌লেন? জীবন কখ‌নো একার বুঝ ব্যবস্থায় চ‌লে না। সবার বুঝব্যবস্থা ল‌া‌গে, হোক সেটা প‌রিবার বা আত্মীয়। হ্যাঁ পা‌লিয়ে যাওয়াটা অন্যায় তবে তার পিছ‌নে স‌ঠিক রিজনটা তো দেখ‌তে হ‌বে।

আচ্ছা একবার নাহয় মানলাম, য‌দি তনয়ার সা‌থে রিসা‌দের বি‌য়ে হ‌তো। ত‌বে কী হ‌তো? বড় জোড় রিসাদ তনয়ার সা‌থে ক‌য়েকমাস সংসার করে ছে‌ড়ে দি‌তো। নয়ত তনয়া ওর ঘ‌রের কো‌নে আগাছার মত প‌রে থাক‌তো। কিন্তু বর্তমা‌নে তনয়া একজন সফল নারী। ও নি‌জের পা‌য়ে দা‌ড়িয়ে‌ছে। সাবলম্বী আজ ও। এখন ওকে কা‌রো কা‌ছে জবাব দি‌হিতা কর‌তে হ‌বে না। নি‌জের মত ক‌রে নি‌জের জীবনের সিদ্ধান্ত নি‌তে সক্ষম তনয়া। আর আমি আপনার মে‌য়ে‌কে এতটা ভা‌লোবা‌সি ঠিক যতটা মানুষ বেঁ‌চে থাকার জন্য নি‌জে‌কে ভা‌লোবা‌সে।

তবুও যাই হোক তনয়া পা‌লি‌য়ে গি‌য়ে অন্যায় কর‌ছে। ত‌বে এতটাও অন্যায় ক‌রে‌নি যে আপ‌নি ওকে মে‌য়ে ব‌লে প‌রিচয়ই দি‌বেন না। তারপর গত ক‌য়েকমা‌সে কতব‌ার ক্ষমা চে‌য়ে‌ছে। কিন্তু আপ‌নি ক্ষমা ক‌রেন‌নি। এভা‌বে শক্ত ম‌নের হ‌বেন না বাবা। আমি তো জা‌নতাম একটা মে‌য়ে‌কে সব থে‌কে বে‌শি ভা‌লো তার বাবা বা‌সে। বাবার রাজকন্যা হয় একটা মে‌য়ে। ত‌বে আপ‌নি কেন আপনার রাজকন্যার একটা ভুল মাফ কর‌তে পার‌ছে না! ওর হ‌য়ে আমি ক্ষমা চাই‌ছি। প্লিজ বাবা এবার সব ভু‌লে যান, তনয়া স‌ত্যি অনেক কষ্ট পা‌চ্ছে।

আয়া‌তের কথা শু‌নে তা‌লিব মাহমুদ কিছুক্ষন থম মে‌রে ব‌সে রইল। কী বল‌বে সেটা বোধয় ভে‌বে পা‌চ্ছে না। তার ছে‌লের বয়‌সি একটা ছে‌লে তার মু‌খের উপর এতগু‌লো কথা ব‌লে দি‌লো! অথচ তি‌নি ছে‌লেটার ম‌ু‌খের উপর কিছু বল‌তে পার‌ছে না। কেন?
স‌ত্যি বল‌তে ছে‌লেটা তো একদম উচিৎ কথা ব‌লে‌ছে। নি‌জের দম্ভ আর রা‌গে এত‌দিন তি‌নি প্রায় বি‌বেগশূন্য হ‌য়ে প‌রে‌ছি‌লো। তাই নি‌জের মে‌য়ের দিকটাও দে‌খে‌নি তি‌নি। বেশ কিছুক্ষন চুপ ক‌রে থে‌কে তি‌নি আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে বলল, আমি এ বিষ‌য়ে তোমার সা‌থে প‌ড়ে কথা বল‌ছি।

আয়াত ঠিক আছে ব‌লে তা‌কে সালাম দি‌য়ে বের হ‌য়ে গে‌লো। কারন তা‌লিব মাহমুদ এত‌দিন যে, ভু‌লের ম‌ধ্যে ছি‌লো হঠাৎ ক‌রেই কেউ তা‌র ভুলটা চো‌খে আঙুল দি‌য়ে ধ‌রি‌য়ে দিয়ে‌ছে তাই নি‌জেকে সাম‌লা‌তে সময় লাগ‌বে তার।

৫২!!
আয়াত বাসায় ঢু‌কে দে‌খে সা‌ড়ে চারটা বাজে। আজ অফি‌সে হাফ ডে ছি‌লো, আর তনয়ার কা‌জের চাপ কম থাকায় তনয়া এগা‌রোটার দি‌কেই বাসায় চ‌লে আস‌ছে। আয়াত অফি‌সের কাজ শেষ ক‌রে তা‌লিব মাহমুদ এর সা‌থে দেখা ক‌রে বাসায় আস‌ছে। ব্যস্ততায় আজ দুপ‌ুরের খাবার খাবারও টাইম পায়‌নি। পে‌টের ভিতর ইদুর দৌড়া‌চ্ছে। রু‌মে ঢু‌কে দে‌খে তনয়া ঘুমা‌চ্ছে। দুপু‌রে তনয়া ফোন দি‌য়ে‌ছি‌লো আয়াত খে‌য়ে‌ছে কিনা জান‌তে? আয়াত মিথ্যা বল‌ছি‌লো খে‌য়ে‌ছে। নয়ত তনয়া খে‌তো না। আয়াত তনয়ার মু‌খের দি‌কে তা‌কি‌য়ে হা‌সি দি‌লো। এ মে‌য়েটা‌কে দেখ‌তেই ওর সকল ক্লা‌ন্তি কোথায় যে‌নো উধাও হ‌য়ে গে‌লো। তনয়া বে‌ঘো‌রে ঘুমা‌চ্ছে। কাপড় আলোথা‌লো হ‌য়ে আছে। প্লা‌জোটা হাঁটু পর্যন্ত উঠে গে‌ছে, জ‌ামার বু‌কের কাছ থে‌কে ওড়নাটা সরে গে‌ছে।

আয়াত হে‌সে বলল, কপাল ভা‌লো বাসায় আমরা দুজন থা‌কি, তাই তনয়া অগোছা‌লো ভা‌বে ঘু‌ম‌লেও কেউ দে‌খে না। কিন্তু যখন সবার সা‌থে থাকা শুরু কর‌বো তখন ওকে বল‌তে হ‌বে ঘুমা‌নোর আগে যে‌নো অবশ্যই রুম লক ক‌রে রা‌খে। আয়াত তনয়ার পা‌শে ব‌সে, কপা‌লে চু‌মো খে‌য়ে ওর জামা ঠিক ক‌রে দি‌লো। চু‌পি চু‌পি শাওয়ার নি‌লো, যা‌তে তনয়ার ঘুম না ভা‌ঙে। তনয়া জে‌গে ওঠার আগেই খে‌য়ে নি‌তে হ‌বে নয়ত য‌দি শো‌নে দুপু‌রে খায়নি ত‌বে আয়া‌তের অবস্থা বা‌রোটা বাজাবে। আয়াত ডায়‌নিং টে‌বি‌লে ব‌সে খাবার বা‌টি থে‌কে ঢাকনা উঠি‌য়ে খাবার দে‌খে বুঝ‌লো তনয়া দুপু‌রে খায়‌নি। যেমন রান্না কর‌ছি‌লো ঠিক তেমন ভা‌বেই আছে। আয়াত বল‌ছে, এই মে‌য়েটা‌কে নি‌য়ে আর পা‌রি না। ও আমা‌কে যতটা ভা‌লোবা‌সে ওকে খাবার খাওয়া‌তে আমা‌কে ততটাই প্যারা নি‌তে হয়। সবসময় খাওয়া নি‌য়ে বাহানা। বি‌য়ের আগে একা থাক‌তে কী কর‌তো আল্লাহই জা‌নে।

আয়াত রু‌মে গিয়ে তনয়ার মাথায় হাত বুলা‌তে বুলা‌তে মৃদু স্ব‌রে তনয়াকে ডাক‌লো। তনয়া ঘুম ঘুম চো‌খে আয়াত‌কে দে‌খে মাথাটা হালকা উচু ক‌রে আয়া‌তের কো‌লে মাথা দি‌য়ে পে‌টে মুখ গু‌জে দি‌লো। আয়াত বলল, 
__তু‌মি দুপু‌রে খাওনি কেন?

ঘুম ঘুম গলায় তনয়া বলল,
__তু‌মিও খাও‌নি তাই।

__তোমায় কে বল‌ছে আমি খাই‌নি?

__আমি অফি‌সে ফোন দি‌য়ে‌ছিলাম, তু‌মি ক্যা‌ন্টি‌নে খাও‌নি। আর তাছাড়া ইদা‌নিং তু‌মি বাই‌রের খাবার খে‌তে চাওনা। তাই অনুমান করলাম খাও‌নি।

__অ‌নেক অনুমানগিরী কর‌ছেন এখন উঠো খাবে।

__পার‌বো না।

আয়াত তনয়া‌কে কো‌লে তু‌লে বলল, এখন পার‌বে। তারপর বে‌সি‌নের সাম‌নে নি‌য়ে গি‌য়ে দাড় ক‌রি‌য়ে দি‌লো কিন্তু তনয়া ঘু‌মে ঢু‌লুমু‌লো কর‌ছে। আয়াত এক হা‌তে ওকে বু‌কের সা‌থে ধ‌রে, অন্য হা‌তে চো‌খে পা‌নির ঝাপসা দি‌তেই তনয়া চোখ মে‌লে ঠোঁট ব‌া‌কি‌য়ে বাচ্চা‌দের কান্না কর‌তে কর‌তে বল‌ল,
__তু‌মি আমা‌কে ঘুমতে দাও না‌ কেন?

আয়াত হা হা ক‌রে হে‌সে,কান্না করা অবস্থায় তনয়ার ঠোঁ‌টে চু‌মো খে‌য়ে বলল, আজ ঘুম‌তে দি‌বো। এখন চ‌লো খাবে। আমারও খুব ক্ষুদা পে‌য়ে‌ছে।
আয়াত ‌নি‌জেই তনয়া‌কে খাই‌য়ে দি‌লো। সা‌থে নি‌জেও খেলো।

‌খাওয়া শেষ ক‌রে আয়াত ব্যালক‌নি‌তে গি‌য়ে বস‌তেই তনয়া এসে ওর পা‌শে ব‌সে মাথাটা আয়া‌তের বু‌কের কা‌ছে এলি‌য়ে দি‌য়ে বলল, 
__এত কেন ভা‌লোবা‌সো?

__ভা‌লোবাসার জন্য কোন বি‌শেষ কারন লা‌গে না।

__তবুও ব‌লোনা প্লিজ।

আয়াত তনয়ার কপা‌লে নি‌জের কপাল ঠে‌কি‌য়ে, তনয়ার না‌কে নাক ঘ‌ষে বলল,
__কারন এই অভিলাষী একটা জীবন্ত প্রানবন্ত পুতুল। আর এই পুতুলটার ভিতর আমার প্রাণ পা‌খিটা লু‌কি‌য়ে আছে। তাই এটা‌কে খুব খুব যত্ম ক‌রে রা‌খি যা‌তে পুতুলটার ভিতরে থাকা আমার প্রাণ পা‌খিটা আঘাত না পায়।

দুজন দুজনার খুনসু‌টিময় মি‌ষ্টি মি‌ষ্টি প্রে‌মে মে‌তে উঠ‌ছে। সন্ধ্যার আগেই ঝুম বৃ‌ষ্টি শুরু হ‌লো। তনয়া বৃ‌ষ্টি‌তে ভিজ‌তে চাই‌লে আয়াত ভিজ‌তে দেয়নি তাই রাগ ক‌রে গোমরা মু‌খে ব‌সে আছে।

রাত এগা‌রোটা, 
কিছুক্ষন আগে থে‌কে আবার ঝ‌ড়োবৃ‌ষ্টি শুরু হ‌য়ে‌ছে। এবার আয়াত তনয়া‌কে বলল, 
__চ‌লোনা একসা‌থে ভি‌জি।

আয়াতের বল‌তে দে‌রি কিন্তু তনয়ার দৌ‌ড়ে ছা‌দে যে‌তে দেরী হ‌লো না। মাঝ রা‌তে দুজন প্রেমময়ী মানুষ ভা‌লোবাসাময় বৃ‌ষ্টি‌তে ভিজ‌ছে। কাঁপন ধরা‌নো হিম শীতল বৃ‌ষ্টির নহ‌ড়ের স্প‌র্শে কে‌ঁপে উঠ‌ছে তনয়া। ভিত‌রে পাগলামী বে‌ড়ি‌য়ে আস‌ছে। ঠোঁট দু‌টো কাঁপ‌ছে আর আয়া‌তের নেশা ধ‌রে যা‌চ্ছে। নিস্তব্ধ বৃ‌ষ্টি ভেজা রা‌তে, নির্জন ছা‌ঁদে ব‌সে দুজন মান‌বি একে অপ‌রের গরম নিশ্বা‌সে আবদ্ধ হ‌চ্ছে। দুজন‌ দুজন‌কে জ‌ড়িয়ে ধ‌রে হিম শীতল বৃ‌ষ্টির ঠান্ডা স্পর্শ থে‌কে নি‌জে‌দের উষ্ম রাখ‌তে চাই‌ছে।
অনেকক্ষন ভে‌জার পর আয়াত বলল, চ‌লো তনয়া আরো ভিজ‌লে জ্বর বাঁধা‌বে। ‌কিন্তু তনয়া যে‌তে নাড়াজ। কোন উপায় না পে‌য়ে আয়াত তনয়াকে কো‌লে ক‌রে নি‌য়ে গে‌লো। তনয়ার ঠান্ডায় কাঁপ‌ছে। ঠোঁট দু‌টো ঠান্ডায় নীল বর্ন ধারন ক‌রে‌ছে। দা‌ঁতে দাঁত লে‌গে ঠকঠক ক‌রে কাঁপ‌ছে দুজন। ড্রেস বদ‌লে আয়াত তারাতা‌রি তনয়ার চুল মু‌ছে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শু‌কি‌য়ে দিলো। গরম গরম চা ক‌রে দুজ‌নে খে‌লো, কিন্তু তবুও তনয়া কাঁপ‌ছে। আয়াত তনয়া‌কে বু‌কে নি‌য়ে ক‌ম্বোল মু‌ড়ি‌য়ে বলল, এখন ঠান্ডা চ‌লে যাবে। এভাবে আমায় জ‌ড়ি‌য়ে থা‌কো।

তনয়া‌কে অনেক্ষন জ‌ড়িয়ে থাকার পর তনয়া আয়া‌তের উষ্ম পর‌শে স্বাভা‌বিক হ‌য়েই ঘুম রা‌জ্যে পা‌রি জমা‌লো। আয়াতও তনয়া‌কে নি‌জের বু‌কের ম‌ধ্যে নি‌য়েই ঘু‌মি‌য়ে পড়‌লো।

৫৩!!
আজ শুক্রবার তাই দুজনারই অফ‌ডে। সকা‌লের নাস্তা করার পর আয়াত বলল,
__তনয়া একটা প্রশ্ন ক‌রি?

__আজব আমাকে প্রশ্ন কর‌তে তোমার আবার অনু‌মো‌তি নেয়ার কী দরকার? বলো?

__তোমার ম‌তে লাভ ম্যা‌রেজ বে‌শি ভাঙার কারন কী?

__তনয়া কিছুক্ষন চুপ থে‌কে বলল, হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন আয়াত?

__আ‌রে তেমন কিছু না। জাস্ট তোমার মতামত জান‌তে চাই। দে‌খো পা‌রিবা‌রিক বিষয়টা আমি জানি কিন্তু ছে‌লে‌-মে‌য়ে ভা‌লো‌বে‌সে বি‌য়ে ক‌রেও কেন প‌রে একে অপর‌কে ছে‌ড়ে দেয়?

__আস‌লে আয়াত আমি ম‌নে ক‌রি এখা‌নে দুজনারই বুঝব্যবস্থার অভা‌বের কার‌নে। বি‌শেষ করে মে‌য়ে‌দে‌র।

__‌যেমন?

__‌যেমন, যখন দু‌টো মানুষ ‌প্রে‌মের সম্প‌র্কে থা‌কে তখন দুজনার ফাস্ট প্রায়ো‌রি‌টি দুজন দুজনকে দেয়। তারপর মে‌য়েটার সকল রেসপন্স‌সিবি‌লিটি তার বাবার উপর থাকে। মে‌য়েটার সকল চা‌হিদা তার বাবা পূরন ক‌রে। মুক্ত পা‌খির মত থা‌কে থা‌কে সে। আর ছে‌লেটার ক্ষে‌ত্রেও তাই।‌ কারন বাবা মা বি‌য়ের আগে ছে‌লে‌দের উপর তেমন প্রেসার দেয়না। সংসা‌রের খরচ তখন ছে‌লেটা‌কে বহন কর‌তে হয় না। সে প্র‌তিষ্ঠিত ‌হোক বা না হোক। কিন্তু বি‌য়ের পর মে‌য়েটার সকল রেসপন্স‌সি‌বি‌লি‌টিস প‌রে ছে‌লেটার উপর। হ্যাঁ এ ক্ষে‌ত্রে মে‌য়েটা চাক‌রিজী‌বি হ‌লে ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু তবুও দা‌য়িত্ব তো দা‌য়িত্বই তাইনা!

‌তো বি‌য়ের পর ছেলেটা এটা ভা‌বে তার উপর এখন তার গাল‌ফ্রেন্ড না বরং স্ত্রীর দা‌য়িত্ব। গার্ল‌ফ্রেন্ড‌কে ফোন ক‌রে জানপা‌খি, সোনাপা‌খি ব‌লে চক‌লেট দি‌য়ে প্রেম নি‌বেদন করা গে‌লেও স্ত্রীর সম্পূর্ণ দা‌য়িত্ব ছে‌লেটার উপর থা‌কে। তখন ছেলেটা তার সবটা দি‌য়ে নি‌জের স্ত্রীর সকল চা‌হিদা পূরন ক‌রে তা‌কে ভা‌লো রাখার চেষ্টা করে। এখন স্ত্রীর সকল চা‌হিদা পূর‌নের জন্য অবশ্যই ছে‌লেটা‌কে অনেক প‌রিশ্রম কর‌তে হ‌বে। তো অতি‌রিক্ত প‌রিশ্রমে ছে‌লেটার মন থে‌কে প্রে‌মিক মনটা উঠে দা‌য়িত্বশীল স্বামীর মন হ‌য়ে যায়। যার কার‌নে বি‌য়ের পর ছে‌লেটা বি‌য়ের আগের মত মে‌য়েটা‌কে সময় দি‌তে পা‌রে না। যার ফ‌লে মে‌য়েটা ভা‌বে ছেলেটা‌ তা‌কে বি‌য়ের পর কম ভা‌লোবা‌সে। এখা‌নে ছে‌লেটা কিন্তু কম ভা‌লোবা‌সে না বরং সে তার ভা‌লোবাসার মানুষটা‌কে সুখী কর‌তে চায়।

তারপর বি‌য়ের পর প‌রিবা‌রের লোক কেমন যে‌নো হ‌য়ে যায়। যে বাবা মা বি‌য়ের আগে ছে‌লের কাছ থে‌কে সংসার খরচ ছে‌লে দি‌তে চাই‌লেও নি‌তো না। কিন্তু বি‌য়ের পর প‌রিবার ছে‌লের উপর আরো বে‌শি প্রেসার দেয়। যার কার‌নে দুজ‌নের চা‌হিদা পূর‌ণের জন্য ছে‌লেটা‌কে আরো ক‌ঠোর প‌রিশ্রম ক‌র‌তে হয়। এদি‌কে লাভ ম্যা‌রে‌জে প‌রিবার তো এম‌নিও মে‌য়েটার সা‌থে তেমন ভা‌লোভা‌বে মি‌শে না আর ছে‌লে‌টি কা‌জের চা‌পে মে‌য়ে‌টি‌কে সময় দি‌তে পা‌রে না। ফ‌লে মে‌য়ে‌টি একাকি থাকে। আর এটা তো জানাও একা মানু‌ষের শূন্য ম‌স্তিষ্ক শয়তা‌নের আড্ডাখানা। তখন শয়তান তা‌র মন‌কে দখল ক‌রে আর মে‌য়ে‌টি ভাবে ছে‌লে‌টি কেন তা‌কে ছে‌লে‌টি আগের মত সময় দেয়না? হয়ত তা‌কে ভা‌লোলা‌গে না বা পরনারী‌তে আসক্ত হ‌য়ে পড়ছে আরো হ্যান ত্যান ভাবনা।

‌কিন্তু স‌ত্যি বল‌তে একটা ছে‌লে যখন একটা মে‌য়ের দা‌য়িত্ব নেয় তখন সে তার সবটা দি‌য়ে মে‌য়েটা‌কে সুখী করার চেষ্টা ক‌রে। কিন্তু সেই সুখী করাটাই মে‌য়েটা‌কে দুঃখী ক‌রে দেয়। কারন একজন গার্ল‌ফ্রেন্ড এর ডিমান্ড অনেক থাক‌লেও একজন ওয়া‌ইফের ডিমান্ড শুধু তার স্বামীর থে‌কে কিছু সময়।

‌কিন্তু ছে‌লেটা সে প‌রিবার, স্ত্রী আর ভ‌বিষ‌্যতের ভাবনায় টেন‌শ‌নে মাথার ভিতর যুদ্ধ শুরু ক‌রে দেয়। তারপর প‌রিবার স্ত্রীর দোষ ব‌লে আর স্ত্রী প‌রিবা‌রের দোষ ব‌লে তো মেন্টাল টর্চা‌রে বেচা‌রা আধা মেন্টাল হ‌য়ে যায়। যখন টর্চার নি‌তে পা‌রে না তখন খুব রাগ ওঠে আর রাগ দেখায় মে‌য়েটার উপর। কারন প‌রিবা‌রের উপর তো রাগ দেখা‌নো সম্ভব নয় তাই মে‌য়েটার উপর রাগ করে। স‌ত্যি বল‌তে এদিক দি‌য়ে ছে‌লেরা বড় অসহায়। কারন আমরা মে‌য়েরা কষ্ট হ‌লে, স্ত্রী স্বামীর কা‌ছে আর মা ছে‌লের কা‌ছে বল‌তে পা‌রে কিন্তু একটা ছে‌লে তার ক‌ষ্টের কথাগু‌লো বলার মত কাউকে পায়না। তখন ভিত‌রে ভিত‌রে সে গুম‌রে মরে।

জা‌নো ছে‌লেরা তার রাগটা তার স্ত্রীর উপর কেন দেখায়? কারন মানুষ রাগ বা ভা‌লোবাসা তা‌কেই দেখায় যা‌কে সে বন্ধু ভা‌বে। আর বি‌য়ের পর একটা ছে‌লে তার স্ত্রীর মা‌ঝে বন্ধুত্ব খোঁ‌জে কিন্তু আমরা মে‌য়েরা তার উপ‌রের রাগটা দে‌খে ভিতরটা পড়‌তে পা‌রি না। ফ‌লে আরো বে‌শি ঝগরা ক‌রি। যার কার‌নে সম্প‌র্কে ভাঙন হয়। আরো অনেক বিস্তা‌রিত আছে বল‌তে গে‌লে দু রাত পার হ‌য়ে যা‌বে।

জা‌নো আয়াত সম্পর্ক কখ‌নো একার দা‌য়ি‌ত্বে সুন্দর হয়না। সম্পর্ক সুন্দর করার দা‌য়িত্ব দুজনার। মেয়েটা‌কে বুঝ‌তে হ‌বে আমার স্বামী যা কর‌ছে আমা‌দের সুন্দর ভ‌বিষ‌্য‌তের জন্য কর‌ছে। আর ছে‌লেটা‌কেও মে‌য়েটা‌কে একটু সময় দি‌য়ে ভা‌লোবাস‌তে হ‌বে। ত‌বেইনা হ‌বে হ্যা‌পি ম্যা‌রেড লাইফ। উক্ত ব্যাখ্যা শুধু লাভ ম্যা‌রে‌জের জন্য না, এরেঞ্জ ম্যা‌রে‌জের জন্যও। বুঝলা?

__বাপ‌রে আমার তানুপা‌খিটা কত কত জা‌নে। আমি তো এটা‌কে বাচ্চা ভে‌বে‌ছিলাম। কিন্তু এটা তো পুরাই জ্ঞা‌নের দা‌দি।

__আ‌মি কী করলাম যা লেখার লে‌খিকা লিখ‌ছে আর তু‌মি যে জ্ঞা‌নের দা‌দি ডাকলা এটা লে‌খিকার হ্যাজবেন্ড এর ডায়লগ দিলা। হি হি হি

(আস‌লে লম্বা ব্যাখা শু‌নে বোর হ‌চ্ছি‌লেন তাই মজা করলাম।   চ‌লেন গ‌ল্পে যাই)

__আচ্ছা তনয়া যারা তোমার ব্যাখ্যার বিপরীত মা‌নে পরকীয়া করে তা‌দের কী বলবা?

__ওগু‌লো তো শয়তান, জা‌হিল, জা‌নোয়ার, ইতোর, বাদর, কুকুর, পৃ‌থিবীর সব থেকে নিকৃষ্ঠ জন্তু যারা নি‌জের হ্যাজ‌বেন্ড বা ওয়াইফ‌কে ধোকা দি‌য়ে প‌রকিয়ায় মা‌তে। ওদের কী কর‌তে হয় জানো? চৈত্র মা‌সের রো‌দে দশতলার ছা‌দে একটা চেয়ার পে‌তে চেয়া‌রে ব‌সি‌য়ে মাথায় বড় বর‌ফের গোলা চা‌পি‌য়ে চেয়া‌রের নি‌চে আগুন ধরি‌য়ে দি‌তে হয়। রো‌দে বরফ গল‌বে আর নিচ থে‌কে জ্বলবে।

__বাপ‌রে কী ভয়ংকর শা‌স্তি।

__ঐ তু‌মি আমার সাম‌নে পরকীয়া নামক এই ফালতু ট‌পিকটা একদম উঠাবা না। চ‌লো দুপুরের রান্না কর‌তে হ‌বে।

৫৪!!
বিকালবেলা আয়াত তনয়ার হা‌তে মে‌হেদী দি‌য়ে দি‌চ্ছে তখন দরজার বেল বে‌জে উঠ‌লো।

__আয়াত! আবার পিঠ চুলকা‌চ্ছে।

__তনয়া তোমা‌কে মে‌হেদী দি‌তে বলাটাই ভুল হ‌য়ে‌ছে। (হা হা হা) মে‌হেদী দেয়ার পর থে‌কে কখ‌নো তোমার নাক চুলকায়, কখ‌নো গাল, কখ‌নো পেট, এখন আবার পিঠ।

__আমি তো এক হা‌তে দি‌তে চে‌য়ে‌ছিলা তু‌মি দু হা‌তে দি‌য়ে দি‌লে। দু হা‌তে দেয়ার পর এখন ম‌নে হ‌চ্ছে সারা শরী‌রে কোন পোকা হাঁট‌ছে।

__হা হা হা। এটা শুধ‌ু তোমার না। যখনই দেখবা তোমার দু হাত কোন কা‌জে আট‌কে থাক‌বে তখনই সবার এমন হয়। নাও এবার হা ক‌রো। তা ম্যাডাম বল‌লেন না পা‌কোয়া কেমন হ‌য়ে‌ছে?

__অ‌নেক টে‌ষ্টি। বোঝায়ই যায় না তু‌মি আজ প্রথম বার বা‌নি‌য়েছো।

__আচ্ছা। আপ‌নিই কো শি‌খি‌য়ে দি‌য়ে‌ছেন ম্যাডাম। শুক‌রিয়া মহারানী।

__‌বে‌শি বে‌শি হ‌য়ে যা‌চ্ছে না।

__‌মো‌টেও না।

__আয়াত এখন হাত ধু‌য়ে ফে‌লি?

__না। আগে ঠিকমত মে‌হেদীর রঙ গা‌ড়ো হতে দাও। চুপচাপ ব‌সে থা‌কো। এই তু‌মি কী কখ‌নো স্থির থাক‌তে পা‌রো না?

__না পা‌রি না। আমার চুলটা বেঁ‌ধে দাও। বারবার চো‌খে পড়ছে।

__হায় আল্লাহ আজ তু‌মি আমার অবস্থা বা‌রোটা বা‌জি‌য়ে ছাড়‌বে। 
আয়াত তনয়ার চুলগু‌লো বেঁ‌ধে পিছন থে‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে তনয়ার কা‌টে চু‌মো খে‌য়ে বলল। আমার অভিলাষী‌কে মে‌হেদীর র‌ঙে রাঙাবতী লা‌গে। তোমার হা‌তে মে‌হেদী বেশ মানায়। ভা‌লোবাসি রাঙাবতী। তনয়া একটা প্রশ্ন ক‌রি?

__হুমম।

__তু‌মি পরকীয়া নামক কথাটা শুন‌লে রাগ কেন ক‌রো?

__রাগ না আয়াত! ঘৃণা লা‌গে খুব। একবার ভা‌বো নি‌জের হাজ‌বেন্ড ওয়াইফ থাক‌তেও পরনারী বা পরপুরু‌ষে আসক্ত কেন হ‌বে? য‌দি নি‌জের স্বামী বা ওয়াইফ‌কে ভা‌লো নাই লা‌গে বা তা‌দের মন মত না হয় ত‌বে ডি‌ভোর্স দি‌য়ে দি‌তে পা‌রে। এতে সেও সুখী হ‌বে আর তার হাজ‌বেন্ড বা ওয়াইফও সুখী হ‌বে। অন্তপ‌ক্ষে তারা নতুন ভা‌বে নি‌জে‌দের জীবন তো শুরু কর‌তে পার‌বে। রোজ রোজ ধোঁকার স্বীকার তো হ‌বে না। অনেকগু‌লো প‌রিবার আর জীবন বেঁচে যা‌বে। জা‌নো কত কত প‌রিবার এই পরকীয়া নামক নোংড়া‌মির কার‌নে ভে‌ঙে যায়।

__হুম ঠিক বল‌ছো। আচ্ছা তনয়া আমার এমন কোন জি‌নিস বা অভ্যাস আছে যা তোমার পছন্দ নয়?

__হ্যাঁ।

__সেটা ব‌লো?

__অ‌তি‌রিক্ত প‌জে‌সিভ তু‌মি।

__‌রি‌য়ে‌লি!

__ই‌য়েস।

__‌কিভা‌বে?

__আবার জি‌জ্ঞেস ক‌রো কিভা‌বে? কোন ছে‌লে আমার সা‌থে বা আমি কোন ছে‌লের সা‌থে কথা বল‌লে বা হাত মিলা‌লে, তোম‌ার চোখ মুখ কেমন হয় দেখ‌ছো কখ‌নো! রা‌গে পু‌রো বেলু‌নের মত ভু‌লে যাও। ম‌নে নেই দীপুর সা‌থে হাত মিলা‌নোর পর কেমন কর‌ছিলা? বাপ‌রে! তোমার সেই কান্ড করার পর আমি ছে‌লে‌দের থে‌কে যথাসম্ভব দূ‌রে থা‌কি।

__‌সেটা তো দীপু তোমা‌কে নোংড়া নজ‌ড়ে দেখ‌তো ব‌লে।তোমার বন্ধু‌দের সা‌থে কথা বল‌লে তো কিছু ব‌লি না।

__হ্যাঁ ব‌লো না ত‌বে তারা আমার হাত ধর‌লে বা দুষ্ট‌মি ক‌রে গা‌য়ে হাত দি‌লে তখন যে তোমার প্রচন্ড রাগ হয় সেটা আমি বুঝ‌তে পা‌রি।

__‌তো রাগ হবে না কেন? বললাম তোমার পা থে‌কে মাথা পর্যন্ত পু‌রোটাই শুধু আমার। কেন তনয়া আমার অতি‌রিক্ত প‌জি‌সিভ হওয়া‌তে বু‌ঝি তু‌মি কষ্ট পাও? তাহ‌লে আমার প‌জেসিভ হওয়া কমা‌নোর চেষ্টা কর‌বো। আস‌লে তোমার আশে পা‌শে কোন ছে‌লে দেখ‌লে আমার মাথা ঠিক থা‌কে না। তখন তোমার উপর খুব রাগ ক‌রি।

__আরে কী ব‌লো? ইনফ্যাক্ট আমার কা‌ছে আরো ভা‌লো লা‌গে। কারন কী জা‌নো?

__কী?

__কারন আমি তখন বুঝতে পা‌রি তু‌মি পু‌রোটাই আমার। আর আমা‌কে বে‌শি ভা‌লোবা‌সো ব‌লেই তো তোমার রাগ হয়। স‌ত্যি বল‌তে মে‌য়েরা তোমার মত প‌জি‌সিভ হাজ‌বেন্ড ‌বে‌শি পছন্দ ক‌রে। যে রাগও দেখা‌বে অনেক ভা‌লোবাস‌বে। হি হি।

__পাগলী একটা আমার। আমি প‌জে‌সিভ কিন্তু স‌ন্দেহবাদী নয়। তোমায় ভা‌লোবা‌সি ব‌লে তোমার পা‌শে অামি ব্যাতীত অন্য কাউ‌কে চিন্তাও কর‌তে পা‌রি না। রাগ হয় খুব। ত‌বে তোমায় অনেক বিশ্বাস ক‌রি পাগ‌লের মত ভা‌লোবা‌সি। জা‌নি আমার অভিলাষী এমন কিছু কর‌বে না যা‌তে আমা‌দের বিশ্বাস ভা‌ঙে।

__হ্যাঁ আয়াত জা‌নি‌ তো। তু‌মি তো আমার আয়াত। তাই।

আয়াত তনয়াকে অনেকগু‌লো ভা‌লোবাসার পরশ দি‌য়ে বলল,
__ম্যাডাম তনয়া আপ‌নি চা খা‌বেন?

__হুমম খে‌তে পা‌রি ত‌বে দুজন এক ম‌গে।

__ও‌কে বসো নি‌য়ে আসছি।

আয়াত রান্না ঘ‌রে যাবে তখন দরজার বেল ‌বে‌জে উঠ‌লো। আয়াত দরজা অল্প একট‌ু খু‌লে দেখ‌লো তানভী। তানভীকে দে‌খে আয়াত দড়জা খু‌লে বলল,
__আ‌রে শালাবাবু যে, আসেন আসেন। তা কেমন চ‌লে দিনকাল?

__ভালো ভাইয়া আপনার?

__ভ‌লো। আর আপ‌নি খুব ভা‌লো সময় এসে‌ছেন, আপনার বো‌নের জন্য চা বা‌না‌চ্ছিলাম। এখন চা আপ‌নি বানা‌বেন!

__আ‌রে ভাইয়া আস‌তেই কা‌জে লা‌গি‌য়ে দিলা?

__‌তোর বোন হা‌তে মে‌হেদী দি‌য়ে ব‌সে আছে। কতক্ষন যাবত বড্ড জ্বালা‌চ্ছে। আমা‌কে দি‌য়ে পা‌কোরাও বা‌নি‌য়ে‌ছে তাই এবার আমি তো‌কে জ্বালা‌বো। তনয়া‌কে তো কিছু বল‌তে পা‌রি না। তাই তো‌কে জ্বালা‌বো।

__তানভী হা হা ক‌রে হে‌সে বলল, ঠিক আছে। ত‌বে বাই‌রে আরো লোক আছে। সবার জন্যই তো নাস্তা বানা‌তে হ‌বে।

__কারা?

আয়াত দরজা পু‌রোটা খুল‌তেই ভূত দেখার মত চম‌কে উঠ‌লো। কারন আয়াত বাবা, আর তনয়া বাবা মা, তান‌ভির, তা‌মিম, লা‌বিবা, মেঘা, আয়াজ, তৃ‌প্তি। আয়াত চোখ কচ‌লে আবার সাম‌নে তাকা‌লো। নাহ ভুল দেখ‌ছে না। আয়াত তা‌দের সালাম দি‌য়ে খুব বিন‌য়ের সা‌থে ভিত‌রে আস‌তে বলল।

তারা ভিত‌রে আস‌ছে। তার আগে তানভী তনয়ার কা‌ছে গিয়ে বলল, 
__কী‌রে হাতে মে‌হেদী কেন লা‌গি‌য়ে‌ছিস?

__আয়াত দি‌য়ে দি‌ছে।

__ওহ। তোর ঐ হনুমান বরটা মে‌হেদী লাগা‌তেও জা‌নে?

__খবরদ‌ার তানভী আয়া‌তকে এসব বল‌বি না।

__আহা গা‌য়ে লাগ‌ছে। তা কী খা‌চ্ছিস?

__পা‌কোরা, আয়াত বা‌নি‌য়ে‌ছে। খে‌য়ে দেখ ভিষন টে‌ষ্টি।

আয়াত তনয়ার সাম‌নে এসে বলল, প‌রে খে‌য়ো আগে পিছ‌নে তা‌কি‌য়ে দে‌খো। তনয়া দা‌ড়ি‌য়ে পিছ‌নে তাকা‌তেই চোখ বড় বড় ক‌রে ফেল‌লো। ভ‌য়ে কপা‌লে বিন্দু বিন্দু ঘাম জম‌ছি‌লো। ধী‌রে ধী‌রে আয়াতের পিছ‌নে লু‌কি‌য়ে গে‌লো। তনয়ার বাবা অবাক হ‌লো, কারন মে‌য়েরা ভয় পে‌লে বাবার কা‌ছে এসে লুকায়। এখা‌নে তার মে‌য়ে তা‌কে ভয় পে‌য়ে হাজ‌বেন্ড এর পিছ‌নে লুকা‌চ্ছে। বিষয়টা একজন বাবার জন্য সুখ দুঃখ মি‌শ্রিত। দুঃখ কারন বাবা তার মে‌য়ের এতটা ভরসা হ‌য়ে উঠ‌তে পা‌রে‌নি হয়ত, আর সুখের কারন তার মে‌য়ে এমন একজন‌কে পে‌য়ে‌ছে যা‌কে সে চোখ বন্ধ ক‌রে বিশ্বাস কর‌তে পা‌রে। আয়াত তনয়া‌কে সাম‌নে দাড় ক‌রি‌য়ে দি‌লো। তনয়া মাথা নিচু ক‌রে চুপ ক‌রে রইল।

তনয়া বা তনয়ার বাবা কেউ কোন কথা বল‌ছে না। সবাই নিশ্চুপ। আয়াত সবাই‌কে বস‌তে ব‌লে, তনয়া‌কে বে‌সি‌নের সাম‌নে নি‌য়ে এসে মে‌হেদী তু‌লে হাত ধুয়ে দি‌য়ে বলল,
__বাবার সা‌থে কথা কেন বল‌ছো না?

__ভয় কর‌ছে।

__পাগলী তোমার বাবা হয়। তোমা‌কে খে‌য়ে ফেল‌বে না। যাও কথা ব‌লো?

__য‌দি আবার বকা দেয়?

__এবার বকা দি‌বে না। আমি আছি তো। চ‌লো। 
আয়াত তনয়ার হাত ধ‌রে তা‌দের সাম‌নে নিয়ে গে‌লো। তনয়া মাথা নিচু ক‌রে রইল। আয়াত হালকা ধাক্কা দি‌য়ে বলল, কী হ‌লো কথা ব‌লো!
তনয়া ওর বাবার দি‌কে তা‌কি‌য়ে বলল,

__‌কেমন আছো বাবা?

__তনয়ার বাবা মাথা নিচু ক‌রে বলল, ভা‌লো। তুই?

__ভা‌লো।

তারপর আবার সবাই চুপ। প‌রি‌বেশটা বেশ থমথ‌মে, আয়াত বিষয়টা বুঝ‌তে পে‌রে স্বাভা‌বিক করার জন্য তৃ‌প্তি‌কে বলল,
__তৃ‌প্তি আম্মু কেমন আছো?

__ভা‌লো আং‌তেল। তৃ‌প্তি আয়া‌তের কা‌ছে এসে বলল, আং‌তেল অাং‌তেল ইতু, ইতুন আর তুতন তোতায়? ওদেল আমি তুব মিস ক‌রি। 
তনয়া বিড়াল তিনটা‌তে ধ‌রে এনে তৃ‌প্তির কা‌ছে দি‌লো। তৃ‌প্তি সে দি‌ব্বি বিড়াল নি‌য়ে ছোটছু‌টি‌তে মে‌তে উঠ‌ছে। বা‌কি সবাই টুকটাক কথা বল‌ছে। তনয়া রান্না ঘ‌রে গে‌লো, সবার জন্য নাস্তা ব‌ানা‌তে আয়াত সা‌থে গে‌লো কিন্তু লা‌বিবা এসে বলল,

__আয়াত ভাইয়া! সবসময় তো বৌ এর হেল্প ক‌রেন এবার নাহয় আমি ক‌রি। এম‌নি আপনারা আমার হক নষ্ট কর‌ছেন?

__‌কিভা‌বে ভা‌বি? (আয়াত)

__আ‌রে বি‌য়ের পর ননদ‌কে ভা‌বি সব শি‌খি‌য়ে দেয়। নন‌দের বরের কাছ থে‌কে নাঈয়ো‌রি‌তে মোটা অং‌কের সালা‌মি নেয় আমি তো কিছ‌ুই পেলাম না। আপনারা নি‌জেরা একা একাই সব কাজ শেষ কর‌লেন!

__আয়াত দুষ্ট‌মি ক‌রে বলল, ঠিক আছে আজ‌কে ক‌রে দিন এম‌নি‌তেও ক‌দিন যাবত আপনার ননদ দি‌চ্ছে না।

__‌কেন ভাই হরতাল চল‌ছে না‌কি?

__‌জি, আপ‌নি নাহয় আজ হরতালের অবসান ঘ‌টি‌য়ে দিন। মোটা অং‌কের ঘুষ দি‌বো গ্যারা‌ন্টি।

__ভাবি! এই তোমরা দুজন এসব কী বল‌ছো? উল্টা পাল্টা কথা! লজ্জা ক‌রে না। (তনয়া)

__লা‌বিবা তনয়া‌কে ধমক দি‌য়ে বলল, তুই চুপ কর। ওনারা উল্টা পাল্টা কর‌তে পার‌বে আমি বল‌তে পার‌বো না।

__‌তোমরা ব‌লো আমি গেলাম। (তনয়া)

আয়াত তনয়ার হাত ধ‌রে থা‌মি‌য়ে, পিছন দি‌য়ে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বলল, কোথায় যা‌চ্ছো জানপা‌খি! যা লজ্জা পাবার ভা‌বির সাম‌নে পাও। লা‌বিবা হে‌সে বলল,
__আপ‌নি ভাই বড্ড পা‌জি।

__ভা‌বি ছে‌লেরা পা‌জি না হ‌লে তখন আবার আপনা‌দেরই প্রব‌লেম হ‌বে। হা হা হা।

__যাক এমনই থাকুন দোয়া ক‌রি। আমাদের পাগলীটা‌কে খুব ভা‌লোবাসুন।

__আমিও তো ভা‌লোবাস‌তে চাই কিন্তু আপনার ননদ দেয়না।

__‌‌তো নি‌জে আদায় ক‌রে নি‌বেন।

আজ লা‌বিবার চো‌খে মু‌খে আলাদা সুখী সুখী ভাব। তনয়া আয়াত বুঝতে পার‌ছে তান‌ভির আর তার ম‌ধ্যে সব‌কিছু ঠিক হ‌য়ে গে‌ছে। আয়াত বলল,
__ভা‌বি একটা কথা বলুন, আমার বাবা আপনা‌দের সা‌থে কী ক‌রে আস‌লো?

__‌সে‌কি আমরা তো আপদের বা‌ড়ি থে‌কে এখা‌নে এলাম।

আয়াত তনয়া দুজ‌নেই অবাক হ‌য়ে বলল,
__কী ব‌লেন?

__হ্যাঁ। বাবাই আপনা‌দের বা‌ড়ি নি‌য়ে গে‌ছি‌লো। আপনা‌দের প‌রিবা‌রের সবার সা‌থে মিট করলাম কিন্তু আপনার মা ছি‌লো না।

__হ্যাঁ মা গতকাল অামার খালা বা‌ড়ি গে‌ছে। সপ্তাহ খা‌নিক পর আস‌বে। (আয়াত)

__হ্যাঁ। আপনার বাবা বল‌ছে। তার সা‌থে আমার শ্বশুর আপনা‌দের বিষ‌য়ে কথা বলল।

__আম‌া‌দের বিষ‌য়ে? কী কথা ভা‌বি? (তনয়া)

__‌তো‌দের আবার আনুষ্ঠা‌নিকভা‌বে বি‌য়ে দি‌বে মা‌নে বড় রি‌সিপশ‌নের ব্যবস্থা কর‌বে। বাবা বল‌ছে তার একমাত্র মে‌য়ের বি‌য়ে এমন ভা‌বে অনুষ্ঠান কর‌বে যা‌তে সবার তাক লে‌গে যায়। (লা‌বিবা)

__কী বল‌ছো কী ভা‌বি? বাবা মা‌নে আমি তো কিছুই বুঝ‌তে পার‌ছি না।

__হ্যাঁরে পাগলী। বাবা এখা‌নে তোর সা‌থে সব ঠিক কর‌তে আস‌ছে। কিন্তু তুই তো বাবার সা‌থে কথাই বল‌ছিস না।

__আ‌মি তো ভ‌য়ে।

__‌দেখ‌ছো আমি বললাম তোমা‌কে কথা বল‌তে। শোন তানুপা‌খি তোমার বাবা সে বড় তাই তার ভিতর আত্মসম্মান বোধটাও বে‌শি। আর সব থে‌কে বড় কথা বাবারা কখ‌নো সন্তা‌নের কা‌ছে ক্ষমা চায় না, সে ভুল বাবা‌দের হোক না কেন! বাবারা তো বড় তাই না পা‌খিটা। একটু বোঝার চেষ্টা ক‌রো। তু‌মি আরেকবার স্য‌রি বলো দেখবা বাবা সব ভু‌লে তোমায় ক্ষমা ক‌রে দি‌বে। (আয়াত)

__স‌ত্যি তো?

__হুমম। চ‌লো।

আয়াত তনয়া‌কে নি‌য়ে গি‌য়ে ওর বাবার পা‌শে বসা‌লো। তনয়া মাথা নিচু ক‌রে বলল,
__বাবা মাফ ক‌রে দাওনা এবার!

তা‌লিব মাহমুদ তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে বলল,
__কখ‌নো কখ‌নো বাবারাও ভুল ক‌রে। সন্তানরা কী তা‌দের মাফ ক‌রে দি‌তে পা‌রে না! আমাকেও মাফ ক‌রে দে মা।

তনয়া ওর বাবার হাত ধ‌রে বলল,
__না বাবা অন্যায় আমি করে‌ছি বা‌ড়ি ভ‌র্তি লোক জ‌নের ম‌ধ্যে থে‌কে পা‌লি‌য়ে এসে তোমার সম্মান হা‌নি ক‌রেছি।

__আ‌মি তো‌কে বুঝ‌তে চেষ্টা কর‌লে, তোর আর পালাতে হ‌তো ন‌া।

বাবা মে‌য়ে দুজন দুজ‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে কাঁদ‌ছে। আর বা‌কি সব‌াই খুশি‌তে ‌মি‌ষ্টি মি‌ষ্টি হাস‌ছে। একটা সম্প‌র্কে দীর্ঘ তিক্ততার পর ঠিক যেমন মধুরতা আসে ঠিক তেমন।

সবাই মি‌লে এটা ঠিক কর‌লো সাম‌নের মা‌সে বি‌য়ের তা‌রিখ ঠিক কর‌বে। যে‌হেতু আয়া‌তের মা উপ‌স্থিত নেই তাই দিনক্ষন তা‌র সা‌থে ব‌সে ঠিক কর‌বে। আর তাছাড়া আয়াত বা তনয়ার বাবা দুজ‌নেই এ মা‌সে ব্যস্ত। কিন্তু আগামীকাল আয়াত তনয়া তা‌দের বাসায় বেড়া‌তে যা‌বে। তনয়ার বাবা তনয়াকে একবা‌রে মা‌নে বি‌য়ের আগ পর্যন্ত তার কা‌ছে থাক‌বে ভে‌বে নি‌য়ে যে‌তে চাই‌ছি‌লো কিন্তু আয়াত প‌লি‌টিকস ক‌রে সেটা ঘু‌রি‌য়ে দি‌লো।
আয়া‌তের বাবা বলল, আপাতত ওদের দুজন‌কে নি‌জে‌দের মত ক‌রে সময় দি। এক মাস সবসময় আমাদের সাথে ওরা যোগা‌যোগ কর‌বে যাওয়া আসা কর‌বে। এতে দু প‌রিব‌ারের ব‌ন্ডিং হিসা‌বে ওরা দুজন সু‌তো হ‌বে। তাছাড়া এক প‌রিবার থে‌কে আরেক প‌রিবা‌রে শিফট হ‌তে গে‌লে নি‌জে‌দের ভিতর কিছু বোঝাপারা দরকার তাছাড়া ওরা যে‌হেতু স্বামী স্ত্রী তো ওদের দুজন‌কে প্রাই‌ভে‌সি দেয়া হোক। বা‌কিটা ধীরে ধীরে সবাই মি‌লে ঠিক কর‌বো। 
সবাই তার কথায় সহমত হলো।

সবাই কথা বল‌ছে তখন আয়া‌তের বাবা এসে বলল, 
__‌তোরমত বদ ছে‌লে জীব‌নে দে‌খি‌নি।

__কী করলাম?

__হারামজাদা নি‌জের বাব‌া‌কে ব্ল্যাকমেইল ক‌রে আবার ব‌লিস কী করল‌াম! তখন কী বল‌লি? তনয়া‌কে যে‌নো ওর বাবা দেড় মা‌সের জন্য নি‌য়ে না যায়। আমি যেভা‌বে হোক আটকা‌বো, নয়ত

__নয়ত তু‌মি যে রং নাম্বারে একটা আন্টির সা‌থে ফ্লা‌টিং কর‌ছিলা সেটা মা‌কে ব‌লে দি‌বো। য‌দিও রং নাম্বারে কথা আমি বল‌ছিলাম। কিন্তু সেটা আমি জা‌নি, তু‌মি জা‌নো মা‌ তো জা‌নে না। হি হি

__এ জন্যই তো‌কে বদ বললাম।

__‌নি‌জের আপন ছে‌লের জন্য এতটু‌কো কর‌তে পার‌বে না। জা‌নো বাবা একটা বিষয় নি‌য়ে খুব টেনশ‌নে আছি।

__কী?

__ আচ্ছা বাবা মাকে কিভা‌বে মানা‌বো?

__ভাব‌তে দে। সব শুধু বাবার ঘা‌ড়ে চা‌পি‌য়ে দিস।

__এ জন্যই তো তু‌মি পৃ‌থিবীর সেরা বাবা। তু‌মি তো আমার বন্ধু। আই লাভ ইউ।

__হ‌য়েছে হ‌য়ে‌ছে আর মাখন দি‌তে হ‌বে না। এখন চল পা‌জি ছে‌লে। সবার কা‌ছে চল।

সবাই আরো কিছুক্ষন গল্প ক‌রে সন্ধ্যার পর চ‌লে গে‌লো। আয়াতনয়া তা‌দের খে‌য়ে যে‌তে বল‌ছি‌লো কিন্তু তারা বল‌লো প‌রে এক‌দিন খা‌বে। তনয়া আজ ভিষন খু‌শি ওর তো আজই বা‌ড়ি যে‌তে মন চাই‌ছি‌লো। কিন্তু আয়াত প্রথমবার শ্বশুরবা‌ড়ি যা‌বে তো একটা প্রিপা‌রেশ‌নের ব্যাপার আছে। তাই কাল বিকা‌লে যা‌বে। ক‌দিন সেখা‌নে থাক‌বে। তনয়া শুধু কাল‌কের অপেক্ষা কর‌ছে। কতমাস পর কাল নি‌জের বা‌ড়ি যা‌বে। ভাব‌তেই খু‌শি‌তে মনটা নে‌চে উঠ‌ছে ওর। সবাই চ‌লে যে‌তেই তনয়া দরজা লক ক‌রে আয়া‌তের বু‌কে ঝা‌ঁপি‌য়ে পড়‌লো।

আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বলল, 
__Thank ,u thank u, thank u, thank u. তু‌মি জা‌নো না, আয়াত তু‌মি আমায় ঠিক কতটা খু‌শি দি‌য়েছো।

__আ‌মি কী ক‌রে‌ছি?

__ঠঙ ক‌রো না। আমি জা‌নি এ কাজ তু‌মি ছাড়া কেউ ক‌রে‌নি। আয়াত খু‌শিতে আমার পু‌রো শরীর কাঁপছে একটু শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে রা‌খো না প্লিজ। একটু শান্তে ক‌রে দাও তো! সব কিছু অবিশ্বাস্য লাগ‌ছে।

আয়াত তনয়া‌কে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে নি‌জের বাহু ডো‌রে আবদ্ধ ক‌রে ফেলল। নি‌জের গরম নিশ্বা‌সে তনয়ার নিশ্বাসটা আবদ্ধ করে ফেল‌লো। এভা‌বে অনেকক্ষন থাকার পর আয়াত বলল, 
__ম্যাডাম অনেক কাজ প‌ড়ে আছে। চলুন ঘরটা গু‌ছি‌য়ে ফে‌লি।

তনয়া চোখ বন্ধ ক‌রে আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রেই রইল। কান্না পা‌চ্ছে খুব। চোখ থে‌কে দরদর ক‌রে জলকণা বে‌ঁয়ে আয়া‌তের শা‌র্টে মি‌লিয়ে যা‌চ্ছে। তনয়া কাঁদ‌ছে আর ভাব‌ছে এমন একটা মানুষ, যে ওকে পাগ‌লের মত ভালোবা‌সে, ওর সব দুঃখগু‌লো‌কে একটু একটু করে দূর ক‌রে দি‌চ্ছে, প্র‌তি নিয়ত ভা‌লোবাসার নতুন নতুন রঙ দেখা‌চ্ছে। এ মানুষটা‌র হা‌তে নি‌জের জীবনটা র্নিভ‌য়ে তু‌লে দেয়া যায়। না আয়াত‌কে কোন ভা‌বেই কষ্ট দি‌বো না। ও আমায় যতটা ভা‌লোবাসা দি‌য়ে‌ছে তার থে‌কেও বে‌শি ওকে দি‌বো। ভা‌লোবা‌সি আয়াত খুব ভা‌লোবা‌সি। আয়াত‌কে ভা‌লোবা‌সি কথাটা তনয়া প্র‌তি মুহূ‌র্তে ম‌নে ম‌নে ব‌লে কিন্তু শব্দ হ‌য়ে বের কর‌তে পার‌ে না। একটা খুব বি‌শেষ মুহূ‌র্তের অপেক্ষায় আছে।

নি‌জের শা‌র্টে তরল কিছু অনুভব ক‌রে আয়াত তনয়ার মুখটা উঁচু কর‌লো। তনয়া কাঁদ‌ছে আর কান্নার কারনটাও আয়াত জা‌নে। তনয়া চোখ বন্ধ করেই আয়া‌তের পা‌য়ের উপর নি‌জের পা তু‌লে আয়াতের গলা জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে উঁচু হ‌য়ে আয়া‌তের ঠোঁ‌টের ঠিক কা‌ছে নি‌জের ঠোঁট জোড়া নি‌য়ে গে‌লো। আয়াত তনয়া‌কে সামলাতে ওকে জ‌ড়ি‌য়ে নি‌লো। দুজনার নিশ্বাস এতটা কা‌ছে যে, দুজন দুজনের নিশ্বা‌সের শব্দ শুনে গুন‌তে পার‌ছি‌লো। তনয়া অধির হ‌য়ে আয়া‌তের স্প‌র্শের অপেক্ষা কর‌ছে। আয়াত মুচ‌কি হে‌সে তনয়ার অপেক্ষার অবসান ঘট‌লো।

‌সে রা‌তে তনয়া তার পু‌রোটা ভা‌লোবাসা আয়া‌তের মা‌ঝে লু‌টি‌য়ে দি‌য়ে‌ছি‌লো। সমার্পন ক‌রে‌ছি‌লো নি‌জের আত্মাটা‌কে। নি‌জে‌কে হা‌রি‌য়ে ওরা দুজন দুজনা‌তে সমা‌র্পিত হ‌য়ে‌ছি‌লো। ভা‌লোবাসার নতুন দু‌নিয়ায় বিরাজ ক‌রে‌ছি‌লো দুজন।

৫৫!!
প‌রের দিন বিকা‌লে আয়াত নতুন জামা‌য়ের মতই শ্বশুর বা‌ড়ি গে‌লো।

সকাল থে‌কে তনয়াদের বা‌ড়ি‌তে তো‌র‌জোড় শুরু হ‌য়ে গেছে। নতুন জামাই আস‌বে ব‌লে কথা। 
আয়াত তনয়াও সকাল থে‌কে শ‌পিং কর‌তে ব্যাস্ত। সবার জন্য কিছু‌না কিছু কিন‌লো। অনেক রক‌মের ফল মি‌ষ্টি, ম‌নে হয় পু‌রো দোকানসহ কি‌নে নি‌লো। তনয়া এত এত নি‌তে নি‌ষেধ কর‌ছে কিন্তু আয়া‌তের এক কথা প্রথম শ্বশুরবা‌ড়ি যা‌চ্ছে তাই যাবার মতই যা‌বে।

এত‌দিন পর তনয়া নি‌জের বা‌ড়ি যা‌বে ভাব‌তেই বুকটা ধরাম ধরাম কর‌ছে। গ‌ড়ি‌তে ব‌সে আছে আয়াত তনয়া, সাম‌নে আয়াজ গা‌ড়ি চা‌লাচ্ছে আর মেঘা পা‌শে বসা। আয়া‌তের দু বন্ধু আর আয়া‌তের বাবা আমজাদ হো‌সেন পিছ‌নের গা‌ড়ি‌তে আস‌ছে। তনয়া‌কে বার বার ঘাম‌ছে, আয়াত সেটা দে‌খে তনয়ার হাত ধ‌রে বলল,
__‌টেনশন হ‌চ্ছে?

__হুমম।

__‌ডোন্ট ওরি আমি আছি তো।

__বু‌কের ভিতর কেমন যে‌নো কর‌ছে? ম‌নে হ‌চ্ছে কেউ হাতু‌রি পিটা কর‌ছে।

আয়াত তনয়ার বু‌কে হাত দি‌য়ে বলল, এখা‌নে?

তনয়া লজ্জায় লাল হ‌য়ে আয়া‌তের হাতটা স‌রি‌য়ে দি‌য়ে ফিস‌ফি‌সি‌য়ে বলল, একটু তো লজ্জা করো তোমার ছোট ভাই বোন এখা‌নে। 
আয়াত দুষ্ট‌মি হা‌সি দি‌য়ে তনয়ার হাতটা নি‌জের হা‌তের মু‌ঠোয় জ‌ড়ি‌য়ে নি‌য়ে বলল, টেনশন ক‌রো না। সব ঠিক হ‌বে।

সবাই মি‌লে তনয়া‌দের বাড়ি‌তে গেলো। আয়া‌তের মা সব জা‌নে এমন‌কি আয়াতনয়া‌র বি‌য়ে‌তে মতও দি‌য়ে‌ছে কিন্তু তি‌নি এখনও তনয়া‌কে মন থে‌কে মান‌তে পা‌রে‌নি। কিন্তু আয়াতের বিশ্বাস সম‌য়ের সা‌থে সা‌থে সব ঠিক হ‌য়ে যা‌বে।

শ্বশুর বা‌ড়ি পৌঁ‌ছে আয়াত দরজার সাম‌নে পা রাখ‌তেই তনয়ার কা‌জিনরা দরজা আট‌কে ধ‌রে বলল, 
__দুলাভাই সালা‌মি না দি‌লে কাজ হ‌বে না।

আয়াত সালা‌মি দি‌তে গে‌লে আয়াজ বলল, 
__আরে ভাইয়া তোর শা‌লী‌দের শর্ত এত তারাতা‌রি ‌কেন মে‌নে নি‌চ্ছিস। দেখ আমি কিভা‌বে হ্যা‌ন্ডেল ক‌রি। আয়াজ তনয়ার বোন‌দের সাম‌নে গি‌য়ে বলল, বেয়ানরা আমার ভাইয়ার মত হ্যান্ডসাম দুলাভাই আর আমার মত কিউট বেয়াই এর জন্য কি সালা‌মি সে‌ক্রিফাইজ করা যায় না? 
তনয়ার এক কাজিন ‌জে‌রিন বলল,

__‌বেয়াই আপনা‌দের কিউট‌নেস দেখেই তো কম চাইলাম, নয়ত ডাবল চাইতাম। আচ্ছা আরো একশ ক‌মি‌য়ে দিলাম কেমন। খু‌শি এবার!

__আয়াজ মুখ ভেং‌চি কে‌টে বলল, আপ‌নি মহান। আপনার দয়ার সীমা নেই বেয়ান। দে ভাইয়া তোর পে‌ত্নি শালী‌দের সালা‌মি দে।

__জে‌রিন বলল, পে‌ত্নি যখন ঘা‌ড়ে কামর বসা‌বে তখন টের পা‌বেন। হুহ।

তারপর আরো কিছুক্ষন দুষ্টমি ক‌রে সবাই‌কে ভিত‌রে নি‌য়ে বসা‌লো। এতমাস পর নি‌জের বা‌ড়ি এসে তনয়া খু‌শি‌তে পাগল হ‌য়ে যা‌চ্ছি‌লো। সদ্য যৌব‌নে পা দেয়া কি‌শোরীর মত ছোটাছু‌টি কর‌ছিলো। তনয়া‌কে এত খু‌শি দে‌খে আয়া‌তের বেশ ভা‌লো লাগ‌ছি‌লো।

তারপর সবাই‌কে যখন আপ্যায়ন করা হ‌চ্ছি‌লো তখন
আয়া‌তের শালীরা দুষ্ট‌মি ক‌রে আয়াজকে আর আয়া‌তের বন্ধু নাঈম, রাজু‌কে ঝাল শরবত খাওয়া‌লো। আয়াজ এম‌নি‌তে প্রচন্ড ভদ্র আর শান্ত কিন্তু কেউ ওর পিছ‌নে লাগ‌লে তা‌কে ছা‌ড়ে না। আয়াজ তনয়ার বোন‌দের উদ্দেশ্য ক‌রে বলল, সাবধা‌নে থাক‌বেন, বলা যায়না কখন কি হ‌য়ে যায়! পৃ‌থিবীটা গোল বেয়ান, আজ আপ‌নি যা কর‌ছেন কাল তা আপনার সাথেও হ‌তে পা‌রে। সেটা ব‌লে শয়তা‌নি একটা হা‌সি দি‌লো।

তনয়া আস‌ছে পর থে‌কে তা‌লিব মাহমু‌দের কোল ঘে‌ষে ব‌সে তার কাঁ‌ধেই মাথা দি‌য়ে ছি‌লো। বাবা মে‌য়ে এত মাস পর গ‌ল্পে মে‌তে‌ছে। সা‌থে আয়া‌তের বাবাও। সবার মনটা আজ বেশ ভা‌লো। র‌শ্মিও এসে‌ছে আজ। ত‌বে কেন জা‌নি তা‌মি‌মের সা‌থে তেমন কথা বল‌ছে না। ত‌বে এত হইহু‌ল্লো‌রের মা‌ঝে বিষয়টা কেউই খেয়াল কর‌লো না।

মাগ‌রি‌বের নামাজ প‌ড়ে আয়াত তনয়ার বাবারা তা‌দের সা‌থে কাজী সা‌হেব‌কে নি‌য়ে আস‌লো। আয়াত তনয়া কিছুই বুঝ‌লো না। তখন তা‌লিব মাহমূদ বল‌ল, 
__আয়াত, তু‌মি আর তনয়া তো ‌নি‌জে নি‌জে রে‌জি‌ট্রেশন বা ধর্মম‌তে ঈমাম সা‌হে‌বের কাছ থে‌কে বি‌য়ে ক‌রে‌ছো। তা‌তে তোমার বাবারও মত ছি‌লো বা আমা‌দের প‌রিবা‌রের সবার মত ছি‌লো কিন্তু আমি তো উপ‌স্থিত ছিলাম না। আর তোমা‌দের আইনি ম‌তে বি‌য়ে হ‌লেও ইসলা‌মে মে‌য়ের প‌রিবা‌রের অনুপ‌স্থি‌তি‌তে বি‌য়ে করা সমার্থন ক‌রেনা। য‌দিও তোমা‌দের তখনকার প‌রি‌স্থি‌তি আলাদা ছি‌লো তবুও আজ এখন সবার উপ‌স্থি‌তি‌তে তোমা‌দের দুজনার কাবিন হ‌বে। ‌তু‌মি য‌দি তোমাদের বি‌য়ের আগে আমা‌কে বুঝা‌তে হয়ত মানতাম বা মান‌তে সময় লাগ‌তো তবুও বি‌য়েটা সুষ্ঠ ভা‌বে হ‌তো। যাক যা হবার তা হ‌য়ে গে‌ছে। তাই এখন সম্পূর্ণ ইসলাম ধর্ম ম‌তে তোমা‌দের বি‌য়ে হ‌বে। য‌দিও তোমরা লিগাল হ্যাজ‌বেন্ড ওয়াইফ। আর আজকালকার ছে‌লে মে‌য়ে তোমরা লিগাল ডকু‌মেন্ট‌কে বে‌শি প্রধান্য দাও। কাজী ডে‌কে বি‌য়ে পরা‌নোটা তোমা‌দের কা‌ছে হয়ত তেমন মুখ্য নয়। ত‌বে আমরা তো সে‌কে‌লে মানুষ। তাই বি‌য়েটা দি‌তে চাই। এতে আমা‌দের গুরুজন‌দের ম‌নে খুত খুত থাক‌বে না। আর রি‌সিপশন তো সাম‌নের মা‌সে ধুমধাম ক‌রে হ‌বে। পু‌রো শহর দেখ‌বে আমার মে‌য়ের বি‌য়ের রি‌সিপশন। তোমার কী কোন আপ‌ত্তি আছে?

আয়াত তনয়া দুজনেই লজ্জায় প‌রে গে‌লো। বি‌শেষ ক‌রে আয়াত। হ্যাঁ আয়াত চাই‌লে বি‌য়ের অাগে তনয়ার বাবা‌কে রা‌জি করা‌নোর চেষ্টা কর‌তে পার‌তো। কিন্তু স‌ত্যি বল‌তে তনয়া‌কে হারা‌নোর ভয়টা আয়াত‌কে গ্রাস ক‌রে ফেল‌ছি‌লো যার কার‌নে তনয়ার সা‌থে নি‌জের বন্ধনটা শক্ত ক‌রে তারপর প‌রিবা‌রের মিল ঘটা‌তে চে‌য়ে‌ছে। যা‌তে প‌রিবা‌রের দ‌্বন্ধে তনয়া‌কে না হা‌রি‌য়ে ফে‌লে। তারপর আয়াত এ আয়াত তনয়া দুজ‌নেই তনয়ার বাবার কথায় সম্ম‌তি জানা‌লো।

‌বি‌য়ের হবে এশার বাদ। বড়‌দের কথা শেষ হ‌তেই লা‌বিবা আর মেঘা ছো মে‌রে তনয়া‌কে লা‌বিবার রু‌মে নি‌য়ে গে‌লো।

লাবিবা তনয়ার হা‌তে একটা হালকা গোলা‌পি র‌ঙের ল্যা‌হেঙ্গা দি‌য়ে বলল,
__এটা প‌রে নে। তারপর তো‌কে সাজা‌বো।

__কী বল‌ছো ভা‌বি এখন এসব কেন পর‌বো? আমি কী নতুন বৌ না‌কি?

__‌তো আজ আবার বি‌য়ে হবে ত‌বে তুই তো নতুন বৌ ই। আজ তোর বিয়ে বাসর সবই প্রথম দি‌নের মত হ‌বে। আর গতকাল তোর বরই তো বললো, হরতাল চল‌ছে। আমা‌কে ঘুষ দি‌বে। তার কী হ‌লো? এখন তো ঘুষ নেয়ার সময় আমার।

__ভা‌বি ও তো তোমার সা‌থে মজা কর‌ছি‌লো। ওমন কিছু না।

__সে যাই হোক যা রে‌ডি হ‌য়ে নে। যখন বি‌য়ে হ‌বে তখন নতুন বৌ এর মত সে‌জেই বি‌য়ের পি‌ঁড়ি‌তে ব‌সে পর।

তনয়া আর কথা বাড়া‌লো না। ল্যা‌হেঙ্গা পর‌তেই মেঘা, লা‌বিবা, র‌শ্মি তনয়া‌কে নতুন বৌ এর মত সা‌জি‌য়ে দি‌লো। 
এশার বাদ সম্পূর্ণ ধর্মম‌তে বি‌য়ে হ‌য়ে গে‌লো। তনয়া এবার ম‌নের খু‌শি‌তে কবুল বলল কারন আজ ওর পু‌রো প‌রিবার ওর সা‌থে। আয়া‌তের নি‌জেরও বেশ ভা‌লো লাগ‌ছে। পু‌রো প‌রিবার‌কে খু‌শি রে‌খে বিবাহ বন্ধ‌নে আবদ্ধ হ‌তে পে‌রে আয়া‌তের মনটা স্নিগ্ধতায় ভ‌রে গে‌লো। আয়াত এখনও তনয়া‌কে দে‌খে‌নি। সেই তখন লা‌বিবা নেয়ার পর বি‌য়ে হ‌লো দুজনার দু রু‌মে ব‌সে। এমনকি খাবার সময়ও তনয়া আস‌লো না। আয়াত সবার সা‌থে ব‌সে গল্প কর‌ছে, ওর সা‌থে তান‌ভির, তা‌মিম আর তানভীও আছে। তা‌মি‌মের সা‌থে আয়াতের বন্ধুত্ব হয়ে গে‌ছে। সবার সা‌থে হে‌সে হে‌সে গল্প কর‌লেও আয়া‌তের ‌চোখ বারবার তনয়া‌কে খুঁজ‌ছে।

রাত সা‌ড়ে এগারোটা
লা‌বিবা তনয়া‌কে নি‌য়ে তনয়ার রু‌মে গে‌লো। আস‌ছে পর তনয়া একবারও নি‌জের রু‌মে আসে‌নি। কেউনা কেউ বাঁধা দি‌য়ে‌ছে। এখন তনয়া রুমে ঢু‌কেই হা হ‌য়ে গে‌লো, পু‌রো রুম ফুলসজ্জার রা‌তের মত ফুল দি‌য়ে সুন্দর ক‌রে সাজা‌নো। তনয়া লা‌বিবার দি‌কে তা‌কি‌য়ে বলল, 
__ভা‌বি এসব কখন করলা? তারমা‌নে তোমরা সবাই জানতা আজ আবার বিয়ে হ‌বে?

__হ্যাঁ। সকা‌লে বাবা আর তোর শ্বশুর মি‌লে ফো‌নে কথা ব‌লে ঠিক কর‌ছে। সে জন্যই তো কাকা আর মামা‌রা আস‌ছে। এমনকি তোর চাচা শ্বশুর, মামা শ্বশুর আরো কজন আত্মীয় আস‌ছে।

__এখন আমি কী কর‌বো?

__তুই মাঝখা‌নে সুন্দর ক‌রে বস বা‌কিটা আয়াত কর‌বে। শয়তা‌নি হা‌সি দি‌য়ে।

__ছি ভা‌বি তু‌মি বড্ড পা‌জি।

__অ‌া‌রে পা‌জি তো তোর বর। আজ ব্যাটার খবর আছে। তুই বস। দেখ একদম নড়‌বি না, যেভা‌বে ব‌সি‌য়ে রাখ‌বো সেভা‌বে ব‌সে থাক‌বি। তনয়া‌কে বিছানার মাঝখা‌নে ব‌সি‌য়ে লা‌বিবা র‌শ্মি আর মেঘা‌কে নি‌য়ে বাই‌রে গি‌য়ে তনয়ার রু‌মের দরজা তালা মে‌রে দরজার সাম‌নে দা‌ড়ি‌য়ে থা‌কে।

‌কিছুক্ষন পর যে যার মত ঘুম‌তে গে‌লো। আয়াত তনয়ার রু‌মের সাম‌নে আস‌তেই দে‌খে লা‌বিবা, র‌শ্মি তনয়ার কা‌জিনরা দরজার বাই‌রে দা‌ড়ি‌য়ে আছে। আয়াত মুচ‌কি হেসে বলল,
__‌ভিত‌রে যাবার অনু‌মো‌তি কী পা‌বো?

__‌জে‌রিন বলল, কেন দুলাভাই এত কেন অস্থির হ‌চ্ছেন?

__কেন শালীকা অস্থির হওয়া যা‌বে না?

__লা‌বিবা বলল, ভিতরে যে‌তে হ‌লে মোটা অং‌কের ঘুষ দি‌তে হ‌বে।

__না দি‌লে?

__সারা রাত বাই‌রে থাকুন। ভিত‌রে তো কি‌শোরী পরী‌কে ব‌সি‌য়ে রে‌খে‌ছি। ঘুষ না দি‌লে বু‌ড়া দাদার কা‌ছে ঘুমা‌তে হ‌বে। সে ভয়ংকর নাক টা‌নে। কী ব‌লেন?

__নাহ থাক। ব‌লেন কত দি‌তে হ‌বে?

__ওয়া‌লেটটা দিন প্র‌য়োজন মত নি‌য়ে নিচ্ছি। মেঘা আয়া‌তের প‌কেট থে‌কে ওয়া‌লেট নি‌য়ে লা‌বিবার কা‌ছে দি‌য়ে দি‌লো। আয়াত বলল, 
__‌মেঘা তুই বোন হ‌য়ে ভাই‌কে লুট কর‌লি?

__স্য‌রি ভাই আমি পা‌র্টি বদ‌লে‌ছি।

__পুরাই রাজ‌নৈ‌তিক নেতা‌দের মত পা‌ল্টিবাজ তুই।

অব‌শেষে লাবিবা আয়াত‌কে ভিত‌রে ঢুক‌তে দি‌লো। আয়াত দরজা লক করে রু‌মের দি‌কে তাকা‌তেই হা হ‌য়ে গে‌লো। অনেক সুন্দর কা‌রে সাজা‌নো গোছা‌নো রুমটা। বিছানায় ফু‌লের সমা‌রোহ আর তার ঠিক মাঝাখা‌নে ঘামটা দি‌য়ে বসা একটা রাজকুমা‌রী। আয়াত গি‌য়ে ঘোমটা তু‌লতেই আৎ‌কে উঠ‌লো। আর অপর পাশ থে‌কে তনয়া হি হি ক‌রে হে‌সে উঠ‌লো। আয়াত দেখ‌লো বিছানায় বড় একটা পান্ডা ডল‌কে লাল শা‌ড়ি প‌রি‌য়ে ব‌সি‌য়ে রে‌খে‌ছে আর তনয়া বিছানায় অপরপা‌শে দা‌ড়ি‌য়ে হাস‌ছে। আয়াত তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে দুষ্ট‌মি হা‌সি দি‌য়ে বলল,
__আজ‌কেও দুষ্ট‌মি?

__‌কেন আজ‌কে দুষ্ট‌মি কর‌তে ট্যাক্স দেয়া লাগ‌বে না‌কি?

__না ত‌বে দুষ্ট‌মির প‌রিব‌র্তে দুষ্ট‌মি পা‌বে। 
তনয়াকে কো‌লে তু‌লে বলল, আপনার রু‌মে আস‌তে মোটা অং‌কের ঘুষ দেয়া লাগ‌ছে। সবটা আপনার কাছ থে‌কে উসুল ক‌রে নি‌বো। 
তনয়া আয়া‌তের গলা জ‌ড়ি‌য়ে লজ্জা মাখা হা‌সি দি‌লো। আয়াত তনয়া‌কে বিছানায় ব‌সি‌য়ে বলল,
__‌তোমার রুমটা খুব সুন্দর। দেখ‌লে ম‌নে হয় কোন রাজকুমারীর রুম।

__হ্যাঁ বাবা সব আমার মন মত সা‌জিয়ে‌ছে।

__সত্যি বলতে তনয়া একা একা বি‌য়ে করা ঠিক না। হ্যাঁ অনেকসময় প‌রি‌স্থিতি আমা‌দের এমন কর‌তে বাধ্য করে। ত‌বে জা‌নো একা একা বি‌য়ে কর‌লে তু‌মি কিন্তু পা‌রিবা‌রিক অনেক আনন্দ মিস কর‌তে হয়। এই যে দে‌খো আস‌ছি পর থে‌কে যে হা‌সি ঠাট্টা চল‌ছে এটা কিন্তু আমরা আমা‌দের প্রথমবার বি‌য়ের দিন কর‌তে পা‌রি‌নি। তখন দুজন দুজনার থাক‌লেও প‌রিবা‌রের শূণ্যতা কিন্তু খুব ভা‌লো ক‌রে আমা‌দের অনুভব ক‌রি‌য়ে‌ছে। প্রথমবার যখন তোমার কা‌ছে এসে‌ছিলাম তখন এইসব পা‌রিবা‌রিক দুষ্ট‌মি খুব মিস করছি। ‌কিন্তু স‌ত্যি বল‌ছি তনয়া আজ‌কের বি‌য়ের প্র‌তিটা মুহূর্ত আমি সুন্দরভা‌বে অনুভব কর‌ছি।

__হ্যাঁ আয়াত ঠিক বল‌ছো। একা একা বি‌য়ে কর‌লে পা‌রিবা‌রিক আনন্দটা অসম্পূর্ণ থে‌কে যায়। হয়ত দুজন মানুষ দুজন‌কে পে‌য়ে খুব সুখী হয় কিন্তু পা‌রিবা‌রিক শূণ্যতা প্র‌তি মুহূ‌র্তে মনটা‌কে কু‌ড়ে কু‌ড়ে খায়। আর জা‌নো আয়াত নি‌জেরা বি‌য়ে কর‌লে হয়ত দুজন মানুষ আনন্দ পায় কিন্তু প‌রিবা‌রের দশজন কষ্টপায় আর দশজন‌কে কষ্ট দি‌য়ে কখ‌নো দুজন সুখী হ‌তে পা‌রে না। দশজ‌নের ক‌ষ্টের নিশ্বাসটা দুজনার সংসা‌রের সুখ‌কে ঢে‌কে দেয়। তাই কষ্ট ক‌রে হ‌লেও নি‌জের প‌রিবার‌কে রা‌জি করা‌নো উচিৎ।

__‌কিন্তু তনয়া অনেক সময় পরিবার‌কে শত বুঝা‌লেও প‌রিবার বুঝ‌তে চায় না। তখন কী করার ব‌লো?

__তনয়া একটা দীর্ঘ‌নিশ্বাস ছে‌ড়ে বলল, হ্যাঁ ঠিক বল‌ছো। আমার ক্ষে‌ত্রেও তেমন। ত‌বে যাই হোক শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সব কিছু ঠিক কর‌ছে তার জন্য তার দরবা‌রে লাখ লাখ শুক‌রিয়া।

আয়াত তনয়ার গা‌লে ভা‌লোবাসার পরশ দি‌য়ে বলল, হুমম।

__আয়াত চ‌লো তোমা‌কে একটা সুন্দর জি‌নিস দেখাই। তনয়া আয়া‌তের হাত ধ‌রে জানালার কা‌ছে নি‌য়ে গি‌য়ে বড় জানালাটা খু‌লে দি‌লো, তারপর রু‌মের লাইট অফ ক‌রে দি‌তেই আয়াত অবাক হয়ে গে‌লো। কারন জানালা দি‌য়ে চাঁ‌দের আলোয় পু‌রো রুমটা জোসনাময় হ‌য়ে গে‌ছে। তনয়ার রু‌মের জানালাটা পূর্ব দি‌কে, যখন চাঁদ ওঠে তখন চাঁ‌দের আলোয় রুমটা ঝলমল ক‌রে। আয়াত তনয়া‌কে পিছন থে‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে গা‌লে, গলায় ভা‌লোবাসার পরশ দি‌চ্ছে আর গল্প কর‌ছে।

মধ্যরাত, 
তনয়া অনুভব কর‌লো কেউ ওর মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে দি‌চ্ছে। তার নিশ্বাস তনয়ার মু‌খে লাগ‌ছে। তনয়া চোখ বন্ধ ক‌রেই ভাব‌ছে আয়াত তো ওকে জ‌ড়ি‌য়ে আছে ত‌বে মাথায় কে হাত বু‌লিয়ে দি‌চ্ছে! তনয়ার পু‌রো শরীর ভ‌য়ে কাটা দি‌য়ে উঠ‌লো। একটু ন‌ড়ে চ‌ড়ে উঠ‌তেই হাতটা মাথা থে‌কে স‌রে গে‌লো, আর জানালা দি‌য়ে দুপ ক‌রে লাফ দি‌য়ে নে‌মে গে‌লো। তনয়া আয়াত আয়াত ব‌লে চিৎকার দি‌য়ে উঠ‌লো। আয়াত হচ‌কি‌য়ে উঠে বলল,
__কী হয়ে‌ছে তনয়া!

__আয়াত রু‌মে কেউ আস‌ছি‌লো। আমি উঠ‌তেই জানালা দি‌য়ে লাফ দি‌য়ে বের হ‌য়ে গে‌লো।

__কী বল‌ছো তনয়া! তু‌মি হয়ত ভুল ভাব‌ছো। তনয়া নি‌জের গা‌য়ে ক‌ম্বোলটা ভা‌লোভা‌বে জ‌ড়ি‌য়ে নি‌লো। কারন তনয়া এতক্ষন ক‌ম্বোল‌ের নি‌চে আয়া‌তের বু‌কের ম‌ধ্যে ছি‌লো, গা‌য়ে পাতলা ফিন‌ফি‌নে একটা নাই‌টি পরা। আয়া‌ত জানালার কা‌ছে গি‌য়ে কাউ‌কে দেখ‌তে পে‌লো না ত‌বে কিছু বুঝ‌তে পার‌লেও তনয়া‌ ভয় পা‌বে দে‌খে ব্যাপারটা এড়ানোর জন্য বলল,

__‌নি‌চে কুকুর তনয়া। তু‌মি ভুল ভাব‌ছো। আয়াত জানালাটা ভা‌লোভা‌বে বন্ধ ক‌রে দিলো। তারপর তনয়া‌কে বু‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ক‌ম্বোল দি‌য়ে ঢে‌কে বলল, হয়ত খারাপ স্বপ্ন দেখ‌ছো। ঘু‌মি‌য়ে প‌রো। তনয়া আয়া‌তের বু‌কে মুখ লু‌কি‌য়ে ভাব‌ছে এতবার ভুল কিভা‌বে হয়? আজ সকাল থে‌কে তনয়ার ম‌নে হ‌চ্ছে এক‌জোড়া চোখ ওর দি‌কে ভংয়কর নজড় দি‌চ্ছে। তনয়া অনুভব কর‌তে পার‌ছে কিন্তু দেখ‌তে পার‌ছে না।

এমনকি ঘুমা‌নোর আগে আয়া‌তের সা‌থে ঘ‌নিষ্ট হবার সময়ও তনয়ার ম‌নে হ‌য়ে‌ছি‌লো কেউ ওদের দি‌কে নজর রাখ‌ছে। কিন্তু রু‌মের জানালা বন্ধ করার পর তনয়ার ভয়টা কে‌টে গে‌লেও কেমন যে‌নো লাগ‌ছি‌লো।

তনয়া আয়া‌তের বু‌কে মুখ লু‌কি‌য়ে আছে। আর আয়াত ভাব‌ছে, তনয়ার ভাবনা ভুল না। কারন রা‌তের বিষয়টা আয়াতও অনুভব কর‌ছে। আমা‌দের চোখ যেটা দে‌খে না আমা‌দের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সেটা বুঝ‌তে পা‌রে। আয়া‌তের নি‌জেরও ম‌নে হ‌চ্ছে কেউ ওদের উপর নজরদা‌রি কর‌ছে।

আয়াত তনয়া‌কে আরো শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে নি‌লো। নি‌জে নি‌জে বল‌ছে, কিছু হ‌তে দে‌বে না তনয়া‌কে। কোন আঁচ লাগ‌তে দে‌বেনা নি‌জের প্রাণ পা‌খি‌কে।

৫৬!!
প‌রের দিন সকা‌লে নামাজ প‌ড়ে তনয়ার আর ঘুম হ‌লো না। আয়াত নামাজ প‌ড়ে ঘুমা‌চ্ছে, তনয়া আয়া‌তের কাছে এসে ব‌সে মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে দি‌তে দি‌তে অনেকক্ষন আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইলো। মনটা বারবার কু ডাক ডাক‌ছে। ম‌নে হ‌চ্ছে আয়াত আর ওর মা‌ঝে কোন সমস্যা হ‌বে। এমন কথা ভাব‌তেই তনয়ার বুকটা কেঁ‌পে উঠ‌লো। আয়াত‌কে ছাড়া তো নি‌জের অস্তিত্ব কল্পনাও কর‌তে পা‌রে না তনয়া। আয়া‌তের মাথায় চু‌মো খে‌লো অনেকগু‌লো।

বাই‌রে ভো‌রের আলো ফুট‌তে শুরু কর‌ছে। এখন তনয়ার মা ছাড়া বা‌কি সবাই হয়ত নামাজ প‌ড়ে ঘুমা‌চ্ছে। তনয়া চু‌পি চু‌পি রুম থে‌কে বের হ‌য়ে বাগা‌নে গে‌লো। কতমাস পর নি‌জের সাজা‌নো বাগা‌নে আস‌ছে। ইশ অনেক ফুল গাছ অয‌ত্নে ম‌রে গে‌ছে। তনয়া গা‌ছে কতক্ষন পা‌নি দি‌লো। তনয়ার বারবার ম‌নে হ‌চ্ছে ওকে কেউ দেখ‌ছে। কিন্তু চারপাশে তাকা‌লে কাউ‌কে দেখ‌তে পায়না। ভ‌য়ে শরীরটা ছমছম কর‌ছে তনয়ার। গাছে পা‌নি দেয়া শেষ। এখনও কেউ ঘুম থে‌কে ওঠে‌নি। তনয়া একটু হাঁটাহা‌ঁটি কর‌লো। তখন ওর ফোনটায় একটা মে‌সেস আস‌লো। মে‌সেসটা দে‌খে তনয়ার শিড়দাড়া বে‌য়ে ঠান্ডা স্রোত ব‌য়ে গেলো। মে‌সেস সাথে একটা ভি‌ডিও। কিন্তু মেসেস বা ভি‌ডিও দু‌টোই আয়া‌তের ফো‌নে আস‌ছে। তনয়া ভুল ক‌রে আয়া‌তের ফোন নি‌য়ে বের হ‌য়েছি‌লো। তনয়া আর এক মুহূর্তও বাইরে দাড়া‌লো না। দৌ‌ড়ে ভিত‌রে চ‌লে গে‌লো। রু‌মে গি‌য়ে দে‌খে আয়াত কেবল ওয়াশরুম থেকে বের হ‌য়ে‌ছে। তনয়া আয়াতের কা‌ছে গি‌য়ে আয়া‌তের হাত ধ‌রে বলল,

__তু‌মি কী আমায় ছে‌ড়ে দি‌বে আয়াত? আমার উপর কী তোমার মন ভ‌রে গে‌ছে তোমার!

__কী বল‌ছো এসব তনয়া! তু‌মি ঠিক আছো তো?

তনয়া আয়াত‌কে ভি‌ডিওটা দেখা‌লো। তনয়া কতক্ষন আগে বাগা‌নে গা‌ছে পা‌নি দি‌চ্ছি‌লো সেই ভি‌ডিও। আর সা‌থে একটা মে‌সেস,

তনয়া‌কে তো পে‌য়ে গে‌ছিস। এখন তনয়ার থে‌কে দূ‌রে চ‌লে যা। নি‌জের ভা‌লো চাই‌লে তনয়া‌কে ছে‌ড়ে দে। তাছাড়া তনয়া‌কে তো ভোগ করা হ‌য়ে গে‌ছে, এখন কী চাস ওর কা‌ছে? ওর সা‌থে তো ফি‌জিক্যাল‌লি ইনভলব হ‌য়ে‌ছিস তারপরও ওকে নিজের কা‌ছে কেন রাখ‌ছিস? ছে‌ড়ে দে ওকে। নয়ত আমি তো‌কে ছাড়‌বো না।

‌মে‌সেসটা দে‌খে আয়াত হতভম্ব হ‌য়ে গে‌লো। এমন নোংড়া ভ‌ঙ্গি‌তে কেউ মে‌সেস কর‌তে কিভা‌বে পা‌রে? আয়াত তনয়া‌র গা‌লে হাত দি‌য়ে বলল,
__‌বিশ্বাস ক‌রো তনয়া, আমি বুঝ‌তে পার‌ছি না মে‌সেসটা কে পা‌ঠি‌য়ে‌ছে। অ‌া‌মি তোমায় ভা‌লোবা‌সি। তু‌মি আমার স্ত্রী। আর যা‌কে ভা‌লোবা‌সে যে, নি‌জের স্ত্রী তার সা‌থে ফি‌জিক্যাশ রি‌লেশ‌নের পর ভা‌লোবাসা, আরো বা‌ড়ে ‌কিন্ত‌ু ক‌মে না। আর তোমা‌কে ছে‌ড়ে দি‌য়ে আমি কী করে বাঁচ‌বো! তু‌মি আমায় আবার ভুল বুঝ‌বে না‌তো?

__‌ছি আয়াত এগু‌লো কী বল‌ছো? তোমা‌কে কেন ভুল বুঝ‌বো? আমি জা‌নি আমার আয়াত‌কে। আয়াত আমার কথা হ‌চ্ছে এগু‌লো কে কর‌ছে? এত সকা‌লে আমা‌দের বা‌ড়ির ভিতর ঢ‌ু‌কে এভা‌বে ভি‌ডিও কে কর‌লো?

__সেটা আমিও ভাব‌ছি। আয়াত ম‌নে ম‌নে ভাব‌ছে, এটা বাই‌রের লো‌কের কাজ হ‌তে পা‌রে না। নি‌শ্চিয়ই সে বা‌ড়ির ভিতরে আছে। নয়ত রা‌তে অতদ্রুত পালা‌তে পার‌তো না। তনয়ার ডা‌কে ধ্যান ভাঙ‌তেই তনয়া‌কে বলল, আচ্ছা তনয়া তুমি ক‌বে থে‌কে বুঝ‌তে পার‌ছো যে তোমা‌কে কেউ ফ‌লো কর‌ছে?

__বি‌য়ের আগে প্রায়ই অনুভব করতাম কিন্তু কখ‌নো কাউ‌কে দে‌খি‌নি। কিন্তু বি‌য়ের পর গত একমাস যাবত এসব ‌তেমন কিছু অনুভব করি‌নি। আবার গতকাল থে‌কে অনুভব কর‌ছি।

__আমাকে কেন ব‌লো নি?

__অতটা খেয়াল দেই‌নি আয়াত তাছাড়া তখন কাউ‌কে স‌ন্দেহ হ‌য়‌নি। বা কেউ কোন ধর‌নের ক্ষ‌তি করে‌নি। তাই—–।

__আচ্ছা ওসব টেনশন বাদ দাও। সব ঠিক হ‌য়ে যা‌বে।

__পু‌লিশ‌কে ইনর্ফম করবা?

__আ‌মি দেখ‌ছি তনয়া। তু‌মি টেনশন ক‌রো না। আর ভয় ক‌রোনা। আমি সবসময় তোমার কা‌ছে আছি।

তনয়া আয়া‌তের বু‌কে মাথা দি‌য়ে বলল, জা‌নিতো! তু‌মি পা‌শে আছো। তাইতো ভয় ক‌রেনা।

__আচ্ছা এখন এক কাপ চা পাওয়া যা‌বে।

__তু‌মি বসো আ‌মি নি‌য়ে আস‌ছি।

তনয়া রুম থে‌কে যে‌তেই আয়াত মে‌সেসটার দি‌কে স্থির চো‌খে তা‌কি‌য়ে রইল। যে আইডি থে‌কে মে‌সেস আস‌ছে, তা‌কে রিপলাই কর‌লো, 
__‌কে আপ‌নি? কী চান?

__আই ওয়ান্ট ইউর তনয়া!

__কী সব বা‌জে বল‌ছেন? ও আমার স্ত্রী!

__সো হোয়াট! আই লাভ হার এন্ড আই ওয়ান্ট হার।

__সাম‌নে পে‌লে খুন ক‌রে ফেল‌বো হারামজাদা।

__‌সেটা পার‌বে না ব্রো। এটা ফেইক আইডি, ফেইক জি‌মেইল থে‌কে খোলা, এটা হ্যাক ক‌রেও কোন লাভ হ‌বে না। আর তু‌মি তো আমা‌কে চি‌নো না। ওসব মারামা‌রি কাটাকা‌টির কথা বাদ দি‌য়ে ব‌লো তনয়া‌কে ক‌বে ছাড়‌ছো?

রা‌গে আয়া‌তের হাত নিস‌পিস কর‌ছে। সাম‌নে পে‌লে হয়ত খুন ক‌রে ফেল‌তো। কিন্তু এসব কাজ রা‌গের মাথায় করা ঠিক না। আয়াত যথাসম্ভব নি‌জে‌কে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা কর‌ছে। তারপর লোকটা‌কে মে‌সেস দি‌তে গি‌য়ে দে‌খে আইডি ডিএক‌টিভ ক‌রে রাখ‌ছে।

আয়াত রা‌গে স‌জো‌ড়ে দেয়া‌লে একটা ঘু‌ষি মার‌লো। কে ওর তনয়ার দি‌কে নোংড়া নজর দি‌চ্ছে? আয়াতের মাথা কাজ কর‌ছে না। ধুপ ক‌রে বিছানার মাঝ বরাবর শু‌য়ে পড়লো।

‌কিছুক্ষন পর তনয়া চা নি‌য়ে এসে দে‌খে আয়াত চিৎ হ‌য়ে বিছানার মাঝ বরাবর শু‌য়ে আছে। তনয়া চায়ের মগটা টে‌বি‌লে রে‌খে আয়া‌তের উপর শু‌য়ে পড়‌লো। আয়াত শক্ত ক‌রে তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে নি‌লো। তনয়া চুপ‌টি ক‌রে আয়া‌তের বু‌কে শু‌য়ে রইল। বেশ কিছুক্ষন পর তনয়া বলল,
__‌টেনশন ক‌রো না। হ‌তে পা‌রে কেউ প্রাংক কর‌ছে।

__এরকম প্রাংক কেউ ক‌রে না তনয়া।

__জা‌নি। তু‌মি টেনশন কর‌লে আমি কী কর‌বো?

__তু‌মি শুধু আমায় ভা‌লোবাস‌বে। আর কিছু লাগ‌বে না। ভা‌লোবা‌সি তনয়া।

__আ‌মিও। এভা‌বে অনেকক্ষন একে অপর‌কে জ‌ড়ি‌য়ে থে‌কে দুজনার হৃদয়ই শান্ত হ‌লো। তনয়া মাথা উঁচু ক‌রে আবার আয়া‌তের গলায় মুখ ডুবা‌লো। অসম্ভব সু‌খের ভা‌লোবাসার অনুভূ‌তি আয়াত‌কে ঘি‌রে ধর‌ছে। তনয়া‌কে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বলল,

__সকাল সকাল পাগল বানা‌বে না‌কি?

__হ্যাঁ। দুষ্ট‌মি হা‌সি দি‌য়ে। ওঠো তোমার চা এতক্ষ‌নে শরবত হ‌য়ে গে‌ছে। সবাই উঠে গে‌ছে। চ‌লো সব‌ার সা‌থে নাস্তা করবা।
তনয়া উঠ‌তে চাই‌লে আরো শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বল‌ল,
__এভা‌বেই থা‌কো কিছুক্ষন, ভিষন সুখ সুখ লাগ‌ছে।

__তাহ‌লে নাস্তা করা লাগ‌বে না?

__হ্যাঁ। ত‌বে আগে নি‌জের মনটা শান্ত ক‌রে‌নি

__এভা‌বে থাক‌লে আমার ঘুম পায়।

__কেন?

__কারন তোমার বু‌কে খুব শা‌ন্তি। অতি‌রিক্ত শা‌ন্তি‌তে ঘুম পে‌য়ে যায়।

__তাহ‌লে ঘুমাও।

__এখন ঘুমা‌লে ভা‌বি বল‌বে, সারা রাত না ঘু‌মি‌য়ে এখন কেন ঘুমা‌চ্ছি? সারা রাত কী কর‌ছি। তখন কী বল‌বো? তু‌মি তো জা‌নো ভা‌বি কেমন দুষ্ট।

__‌তো ব‌লে দিব‌া। তোমার আয়াত তোমায় ভা‌লোবাস‌ছে। (দুষ্ট‌মি হা‌সি দি‌য়ে)

__যাহ্ পা‌জি। চ‌লো উঠো।

৫৭!!
সকা‌লে সবাই মি‌লে একসা‌থে নাস্তা কর‌লো। আজ বা‌ড়িতে অনেক হইহুল্লর। লোকজ‌নে ভরপুর। আসে পা‌শের সবাই আয়াত‌কে দেখ‌তে এসে‌ছে। নতুন জামাই ব‌লে কথ‌া। আয়া‌তের খুব বিরক্ত লাগ‌ছে। একেকজন আন্টি আসে আর কেমন অদ্ভুদ ভ‌ঙ্গি‌তে তা‌কি‌য়ে থা‌কে, উদ্ভট সব প্রশ্ন ক‌রে। আয়া‌তের অবস্থা দে‌খে তনয়ার বেশ মজা লাগ‌ছে। তনয়া আয়া‌তের ফো‌নে মে‌সেস কর‌লো,
__কী জনাব কেমন হালচাল?

__‌প্লিজ জানপা‌খি সেভ মি। আন্টিরা আমার অবস্থা বা‌রোটা বা‌জি‌য়ে ফেল‌ছে।

আয়াত তনয়ার দি‌কে তাকা‌তেই তনয়া চোখ মে‌রে হাস‌ছে। আয়াত সেটা দে‌খে তনয়া‌কে মে‌সেস কর‌লো, খুব মজা নি‌চ্ছো তাই না! একবার রু‌মে আসি তোমায় মজা বুঝা‌বো।
তনয়া দেখ‌লো আন্টিরা আয়াত‌কে একটু বে‌শিই চে‌পে ধর‌ছে তাই তনয়া তা‌দের সাম‌নে গি‌য়ে তা‌দের সা‌থে গল্প কর‌তে লাগ‌লো। আর আয়াত ফা‌ঁকে টুপ ক‌রে উঠে গেলো। আয়াত পা‌শে দা‌ড়ি‌য়ে তা‌মিম আর তানভী এর সা‌থে কথা বল‌ছে। তখন এক আন্টি তনয়া‌কে বলল,

__বাব্বাহ তনয়া তুই তো ভা‌লোই ছক্কা মার‌লি?

__মা‌নে? (তনয়া)

__আয়াতের মত সর্বগুন সম্পন্ন একজন বর পে‌য়ে‌ছিস। আয়াত যেমন দেখ‌তে তেমন ব্যাকগ্রাউন্ট। আর তু‌ই দেখ‌তে শুধু ঠিকঠাক, ছক্কা না মার‌লে, তোর মত আট আঙু‌লী প্র‌তিবন্ধী মে‌য়ে‌কে আয়াতের মত ছে‌লে কেন বি‌য়ে কর‌বে?
তনয়া মাথা নিচু ক‌রে ফেল‌লো। স‌ত্যি মা‌ঝে মা‌ঝে তনয়া ভা‌বে ও কী আয়া‌তের যোগ্য! তনয়া কিছু না ব‌লে চুপ ক‌রে ব‌সে রইল। আয়াত আ‌ন্টির পিছন থে‌কে বলল, 
__কী হ‌লো? তু‌মি চুপ ক‌রে আছো কেন?

__ও আয়াত! আস‌লে?

আয়াত তনয়ার পা‌শে ব‌সে আন্টির সাম‌নে ব‌সে বলল,
__আ‌ন্টি আপনার মে‌য়ে আছে?

__‌কেন?

__আমার ছোট ভাই‌কে দেখ‌ছেন? আমার ফ‌টোক‌পি বল‌তে পা‌রেন। ওর জন্য মে‌য়ে খুঁজ‌ছি। আপনার মে‌য়ে আছে? তনয়া অবাক ভ‌ঙ্গি‌তে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। আয়াত আয়াজ‌কে ডাক দি‌লো। আয়াজ আয়া‌তের পা‌শে এসে বস‌লো। আন্টিও খু‌শি‌তে গদগদ হ‌য়ে তার মে‌য়ে‌কে ডাক দি‌লো। আয়াত মে‌য়েটা‌কে দে‌খে বলল, আপনার নাম?

__নিপূন!

__‌কিসে প‌ড়েন?

__চতুর্থ ব‌র্ষে এবার।

তনয়া বলল, তুই তো আমার সা‌থে ছি‌লি নিপূন!

__আস‌লে HSC তে দুবার ফেল ক‌রে‌ছিলাম।

__আয়াত বলল, জব ক‌রেন?

__না। তার দরকার হয়না। হাত খরচ বাবা দেয়।

__আয়াত বলল, আন্টি কিছু ম‌নে কর‌বেন না তনয়া আর অাপনার মে‌য়ের কিছু পার্থক্য দেখাই।
লেখাপড়ায় আপনার মে‌য়ে দুবার ইন্টার ফেল অথচ তনয়া SSC, HSC দু‌টো‌তে A+। আপনার মে‌য়ে কেবল চতুর্থ ব‌র্ষে তনয়া অল‌রে‌ডি MBA শেষ কর‌ছে। আপনার মে‌য়ে বেকার, তনয়া খুব ভা‌লো প‌জিশ‌নে জব কর‌ছে। তনয়া‌কে নি‌জের প্র‌য়োজ‌নে কা‌রো কা‌ছে হাত পাত‌তে হয়না। বরং অন্য‌কে সাহায্য ক‌রে।

এবার আসি বা‌হি‌য্যিক গু‌নের কথায়!
য‌দিও মানু‌ষের শারী‌রিক সৌন্দর্য্য আমা‌দের কা‌ছে মুখ্য নয়। তবুও রূপ, রং, গুন আর সৌন্দ‌র্য্যে তনয়া আপনার মে‌য়ের থে‌কে বে‌শি ছাড়া কোন অং‌শে কম নয়। আর আপ‌নি আপনার নি‌জের মে‌য়ের দি‌কে না তা‌কি‌য়ে তনয়ার দু‌টো আঙুল নেই ব‌লে তা নি‌য়ে প‌ড়ে আছেন।
আয়াজ তোর কা‌ছে ওনার মে‌য়ে‌কে কেমন লা‌গে?

__ভাইয়া আমরা ছে‌লেরা মে‌য়ে‌দের রূপ দেখার আগে তা‌দের গুন, ব্য‌ক্তিত্ব আর প‌রিবারিক শিক্ষা দে‌খি। সো ওনার মে‌য়ে‌কে পছন্দ করার প্রশ্নই আসে না।

আ‌ন্টি মুখ বা‌কি‌য়ে যে‌তে নি‌লে আয়াজ বলল,
__আ‌ন্টি মানুষের ত্রু‌টি খু‌ঁজে তা‌কে ছোট করা খুব সহজ। কিন্তু তার ত্রু‌টি বাদ দি‌য়ে তা‌র সা‌থে উত্তম ব্যবহার করা ক‌ঠিন।

আয়াত উঠে আন্টির মে‌য়ে‌কে বলল, আপনার মা আমার তনয়া‌কে অপমান ক‌রে‌ছে ব‌লে আমি আপনার উদাহরন ‌দি‌য়ে তা‌কে বু‌ঝি‌য়ে‌ছি। তার জন্য আন্ত‌রিকভা‌বে দুঃ‌খী‌তো বোন। আমা‌কে ক্ষমা কর‌বেন। আপনার মাকে বুঝা‌বেন মানুষ তার ক‌র্মে বড় হয়, শারী‌রিক সৌন্দ‌র্য্যে নয় ।

‌মে‌য়েটা মৃদু হে‌সে ইট’স ওকে ব‌লে চ‌লে গে‌লো।

আয়াত আয়াজ দুজ‌নে হে‌সে তনয়া‌কে বলল,
__কী কেমন দিলাম?

তনয়া বলল, তোমরা দুজন বড্ড খারাপ। আয়াত আর আয়াজ দুজ‌নে হা হা ক‌রে হাস‌ছে।

সারা‌দি‌নের হইহু‌ল্লো‌রে তনয়া সকা‌লের কথা একদম ভু‌লে গে‌লো। কিন্তু আয়াত ভুল‌লো না। ও ফোন ক‌রে থানায় একটা রিপোর্ট ক‌রে রাখ‌ছে। আয়াজ‌কে বিষয়টা খু‌লে বল‌ছে। আয়াজ বিষয়টা খু‌টি‌য়ে দেখ‌বে ব‌লে প্র‌মিজ কর‌ছে।

৫৮!!
রা‌তে তনয়া আয়া‌তের পে‌টে মাথা দি‌য়ে শু‌য়ে শু‌য়ে কথা বল‌ছে। হঠাৎ তনয়ার ম‌নে হ‌লো, দরজার পাশ থে‌কে একটা ছায়া স‌রে গে‌লো। আজ রু‌মের সব জানালা বন্ধ। তনয়া আয়াত‌কে বল‌তেই আয়াত তনয়ার মন ড্রাইভাট করার জন্য বলল, 
‌তোমা‌দের বাসায় এত লোক হয়ত কেউ হাঁটাহা‌ঁটি করছে। তনয়া আয়া‌তের কথাটা মান‌লেও তনয়ার কপা‌লে চিন্তার সূক্ষ্ণ ভাজ পড়‌লো। আয়াত তনয়ার মন ঘুরা‌নোর জন্য ওকে শুরশু‌ড়ি দি‌তে শুরু ক‌রে। তনয়া হা হা ক‌রে হাস‌ছে আর আয়াতকে থাম‌তে বল‌ছে। একটু পর আয়াত তনয়ার সা‌থে দুষ্ট‌মি কর‌তে কর‌তে গলায় মুখ ডুবা‌লো, ওম‌নি মাাাাাাা__________ ব‌লে চিৎকা‌রে পু‌রো বা‌ড়ি জে‌গে উঠ‌লো। তনয়া ভ‌য়ে আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো। আর ভাব‌ছে এত রা‌তে কে চিৎকার দি‌লো?

তনয়া ভ‌য়ে আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বলল,
__আয়াত এত রা‌তে কে চিৎকার কর‌ছে?

__আমরা দুজ‌নেই তো এখা‌নে! কিভা‌বে জান‌বো?এটা তোমার কা‌জিন জে‌রি‌নের গলার মত মনে হ‌লো না?

__আ‌রে ডিসকাশন প‌রে কর‌বো চ‌লো এখন।

তনয়া দরজা খুল‌তে নি‌লে আয়াত বলল,
__আ‌রে এভা‌বে যা‌বে?

__‌কেন কী হয়েছে?

__তু‌মি কী প‌রে আছো খেয়াল ক‌রে‌ছো?

তনয়া একটা পাতলা নাই‌টি পরা ছি‌লো। 
__ওহ হ্যাঁ। আমার গাউনটা কোথায়?

__আ‌মি কিভা‌বে জান‌বো?

__তু‌মিই তো খুল‌ছিলা।

__ও‌কে ব‌লে মুখ ভেং‌চি দি‌লো।

আয়াত গাউনটা খু‌ঁজে দি‌তেই তনয়া গাউনটা প‌রে, বাই‌রে বের হ‌য়ে দুজন দেখ‌লো, বা‌ড়ির সবাই জে‌গে গেছে। আর তনয়ার কা‌জিন জে‌রি‌নের রু‌মের দি‌কে যা‌চ্ছে। জে‌রি‌নের কাছে গি‌য়ে আয়াত জি‌জ্ঞেস কর‌লো __কী হ‌য়ে‌ছে জে‌রিন?

__ভাইয়া আমার রু‌মে ভূত আস‌ছি‌লো!

__কী ভূত! সবাই অবাক হ‌য়ে জে‌রি‌নের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইল। 
‌জে‌রিন বলল, সত্যি বল‌ছি কিছুক্ষন আগে কে যে‌নো আমার রু‌মের দরজা নক কর‌ছে, আমি দরজা খুল‌তেই দেখলাম সাম‌নে ধবধ‌বে সাদা আর বি‌চ্ছি‌রি চেহারার এক ভূত আমাকে ধরার চেষ্টা কর‌ছে। আমি চোখ বন্ধ ক‌রে চিৎকার দেয়ার সা‌থে সা‌থে গা‌য়েব হ‌য়ে গে‌লো। জে‌রি‌নের মা জে‌রি‌নের মাথায় ঠুয়া মে‌রে ধমক দি‌য়ে বলল,
__রাত জে‌গে ভূ‌তের ছ‌বি দে‌খে আয়নায় হয়ত নি‌জের চেহারা দে‌খে নি‌জেই ভয় পে‌য়ে‌ছিস। রাত দেড়টার সময় পু‌রো বা‌ড়ি মাথা তু‌লে ফেল‌ছে। ফা‌জিল মে‌য়ে। যা ঘুমা।

‌__‌বিশ্বাস ক‌রো মা আমি স‌ত্যি ভূত দেখ‌ছি। (জে‌রিন)

__‌বেয়ান আপনার মা ঠিক বল‌ছে। আপ‌নি মেকাপ ছাড়া নি‌জের চেহারা নি‌জে আয়নায় দেখ‌ছেন তাই ভূত ভাব‌ছেন। (আয়াজ দুষ্ট‌মি হা‌সি দিয়ে কথা গু‌লো বলল)

‌জে‌রিন রা‌গি চো‌খে আয়াজের দি‌কে তাকা‌তেই আয়াজ চোখ মার‌লো। সবাই জে‌রিনের কান্ড দে‌খে ওকে পাগল ব‌লে হাস‌তে হাস‌তে যে যার রু‌মে চ‌লে গে‌লো। তনয়া আয়াত আর আয়াজ দা‌ড়ি‌য়ে হাস‌ছে। আয়াত জে‌রিন‌কে বলল,

__তা শালীকা ভূতটা মেইল ছি‌লো না‌কি ফি‌মেইল ছি‌লো?

__জে‌রিন রে‌গে বলল, আ‌মি কি জেন্ডার দেখ‌ছি না‌কি?

__আ‌রে ভাইয়া শাকচু‌ন্নি হ‌বে হয়ত। কারন আমা‌দের বেয়া‌নের কা‌ছে ভূ‌লেও ‌কোন মেইল ভূত আস‌বে না। ভ‌য়ে পালা‌বে। (আয়াজ)

আয়াত হাস‌তে বলল,
__‌জে‌রিন তোমার ভূতের কার‌নে আমার রোমান্সের বা‌রোটা বাজ‌ছে।

__‌তো এখন করুন কে নি‌ষেধ কর‌ছে। (রাগ ক‌রে)

আয়াত হাস‌তে হাস‌তে তনয়া‌কে নি‌য়ে চ‌লে গে‌লো। আয়াজ এখ‌নো জে‌রি‌নের সাম‌নে দা‌ড়ি‌য়ে আছে। জে‌রিন বলল,
__‌কী হ‌লো আপ‌নি কোন দুঃ‌খে এখা‌নে দা‌ড়ি‌য়ে আছেন।

__‌বেয়ান প‌রের বার যখন ভূত সে‌জে আস‌বো তখন দরজা খুল‌লে অবশ্যই গা‌য়ে ওড়না দি‌য়ে খুল‌বেন আপনি লজ্জা না পে‌লেও আমি পাই।

__তারমা‌নে আপ‌নি? ইউ ব‌লে জে‌রিন আয়াজ‌কে মার‌তে গে‌লে।
আয়াজ জে‌রি‌নের হাতটা ধ‌রে ওর পিছ‌নে মু‌রে দেয়া‌লের সা‌থে চে‌পে ধ‌রে বলল, 
__প‌রের বার আমার সা‌থে লাগ‌,‌তে আস‌লে স‌ত্যি স‌ত্যি ভূ‌তের কা‌ছে পাঠা‌বো।

__শালা লুচু হাত ছাড় আমার।

__আচ্ছা লুচ্চা‌মির কী করলাম? লুচু‌গি‌রি কর‌লেআপনার পিছ‌নে ঘা‌রের নি‌চে পিঠে যে, তিলটা দেখা যা‌চ্ছে এখন সেটায় কিস ক‌রে দিতাম। তা তো দেই‌নি।
জে‌রিন বিস্ফ‌রিত চো‌খে আয়া‌জের দি‌কে তাকা‌তে চেষ্টা কর‌ছে। কিন্তু আয়াজ হাত এত শক্ত ক‌রে ক‌রে ওকে দেয়া‌লের সা‌থে ‌চে‌পে ধর‌ছে যে, জে‌রিন চে‌য়েও নড়‌তে পার‌ছে না। আয়াজ বলল, এরপর আমার সা‌থে দুষ্ট‌মি করার পর ফিডব্যাক পাবার জন্য রে‌ডি থাক‌বেন প্যায়া‌রের বেয়ান।

__আপনা‌কে আমি দেখে নি‌বো!

__এখনই দে‌খে নিন। আর হ্যাঁ শরী‌রে ওড়না রাখার চেষ্টা কর‌বেন। মে‌য়ের শরীর ঢে‌কে রাখ‌লেই বে‌শি সুন্দর দেখায়। শুভ রা‌ত্রি।

আয়াজ আর কিছু না ব‌লে চ‌লে গে‌লো। জে‌রিন কিছুক্ষন ওখা‌নেই থম মে‌রে দা‌ড়ি‌য়ে রইল। তনয়া রু‌মে এসে তখনও হাস‌ছে। আয়াত কা‌ছে এসে বলল, 
__ভূতটা কে ব‌লো তো?

__আমার ম‌নে হয় আয়াজ ভাইয়া। কারন ওখা‌নে সবার শে‌ষে সে আস‌ছি‌লো আর তার হা‌তে লাল র‌ঙের মেকাপ দেখ‌ছি। হয়ত জে‌রি‌নের সা‌থে দুষ্ট‌মি করতে কর‌ছে। আয়াজ ভাইয়া‌কে দেখ‌লে বোঝা যায়না সে এত দুষ্ট। সবসময় তো শান্ত‌শিষ্ট থা‌কে।

আয়াত হা হা ক‌রে হে বলল, আয়াজ ছোট বেলা থেকেই এমন। কেউ ওর পিছ‌নে লাগ‌লে তা‌কে ফিডব্যাক দি‌য়েই ছাড়‌বে। চ‌লো ঘুমা‌বে। দু‌টো বা‌জে প্রায়। কাল সকা‌লে বা‌ড়ি যা‌বে না‌কি বিকা‌লে?

__হুমম। বাবা তো ‌বিকা‌লে যে‌তে বলল। সকা‌লে না‌কি কজন রি‌লে‌টিভ আস‌বে। ইশ এত‌দিন পর বা‌ড়ি আসলাম অথচ মাত্র দু‌দিন থাক‌তে পারলাম।

__‌ঠিক আছে তু‌মি ক‌দিন থা‌কো ত‌বে। কিন্তু আমার তো যে‌তে হ‌বে। দু‌দিন যাবত তু‌মি আমি কেউ অফিস যা‌চ্ছি না। বাবার উপর খুব প্রেশার যা‌চ্ছে।

__হুমম তা ঠিক। কিন্তু স্যার আপনা‌কে ছাড়া যে, আমি এক‌দিনও থাক‌তে পার‌বো না।

আয়াত তনয়াকে বু‌কে নি‌য়ে শু‌য়ে প‌ড়ে বলল, এখন তো তু‌মি যখন ইচ্ছা তখন আস‌তে পার‌বে। মা‌ঝে মা‌ঝে অফিস শে‌ষে বৃহস্প‌তিবার চ‌লে আস‌বে আর র‌বিবার যা‌বে কি ব‌লো?

__অনেক ধন্যবাদ মি হাজ‌বেন্ড। ভা‌লোবাসা নি‌বেন।

__নাহ এখন ভা‌লোবাসা দি‌বো। হা হা।

তনয়া আয়া‌তের বু‌কের মা‌ঝে বাচ্চা‌দের মত ঘুমা‌চ্ছে। কিন্তু আয়া‌তের চো‌খে ঘুম আস‌ছে না। তাই ফোনটা হা‌তে নি‌লো। তখন দেখ‌ল সেই লোকটা অনেক্ষন আগে মে‌সেস কর‌ছে।

**বড় ভাই আমার তনয়াকে ক‌বে ছাড়‌ছেন**

আয়া‌তের রা‌গে শরীর কাঁপ‌ছে। উঠ‌তেও পার‌ছে‌ না। তনয়া আষ্টে পি‌ষ্টে জ‌ড়ি‌য়ে আছে ওকে। আয়াত এক হা‌তে কোন ম‌তে টাইপ কর‌লো,

ই‌তো‌রের মত লু‌কি‌য়ে লু‌কি‌য়ে মে‌সেস না করে সাম‌নে আয়। বছ‌রে কয়‌দিন বু‌ঝি‌য়ে দি‌বো। আর যে চো‌খে তনয়া‌কে নোংড়া ভ‌ঙ্গি‌তে দেখ‌ছিস ‌সে চোখ অন্ধ ক‌রে দি‌বো।

‌লোকটা সা‌থে সা‌থে রিপলাই কর‌লো, 
__আরে আস‌বো আস‌বো, এত তারা কি‌সের?

__‌দেখা যা‌বে।

তারপর আর কেউ কাউ‌কে কোন মে‌সেস কর‌লো না।

৫৯!!
প‌রের দিন বিকা‌লে,
আয়াতনয়া নি‌জে‌দের বা‌ড়ি চ‌লে এলো। গত‌ তিন দিন তনয়ার কা‌ছে অনেক সুন্দর সাজা‌নো গোছা‌নো কে‌টে‌ছে। নি‌জের ফ্ল্যা‌টে এসে মনটা খারাপ লাগছে। কিন্তু আয়াত আছে না। তনয়া‌কে মন খারাপ করার সু‌যোগই ও দেয়না।

এভা‌বেই চল‌ছি‌লো ওদের দিনগু‌লো সুন্দর সাজা‌নো গোছা‌নো ভা‌লোবাসাময়। তনয়া এখনও মা‌ঝে মা‌ঝে অনুভব ক‌রে কেউ ওকে ফ‌লো ক‌রে। কিন্তু কাউকেই দে‌খে না। লোকটা এখ‌নো আয়াত‌কে মে‌সেস দেয় কিন্তু পার‌সোনাল‌লি এ্যাটাক ক‌রে না। আয়াত প্রথ‌মে দীপু‌কে স‌ন্দেহ ক‌রে‌ছি‌লো। কারন তনয়া‌দের বা‌ড়ি থে‌কে আসার দিন সে প‌থে দীপু‌কে দেখে‌ছি‌লো। কিন্তু স‌ন্দে‌হের ভি‌ত্তিতে কাউ‌কে দোষী করা যায়না। আয়াত দীপুর সম্প‌র্কে খোঁজ নি‌য়ে তেমন কিছুই জানতে পা‌রে‌নি। আয়াত ইদা‌নিং তনয়া‌কে বে‌শি সময় একা থাক‌তে দেয়না। খ্রব ভয় হয় আয়া‌তের। তাই একসা‌থে অফিস যায় আবার তনয়া‌কে সা‌থে নি‌য়ে ফি‌রে।

তনয়ার প‌রিবারের সবাই আয়া‌তের বা‌ড়ি ‌বেড়া‌তে গি‌য়ে‌ছি‌লো। আয়া‌ত তনয়াও গে‌ছি‌লো। আয়া‌তের মা তনয়া‌কে মে‌নে না নি‌লেও তনয়ার প‌রিবা‌রের সবার সা‌থে সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার কর‌ছে। আয়াত তনয়া তা‌কে মানা‌নোর সর্বোচ্চ চেষ্টা কর‌ছে। ইদা‌নিং তি‌নিও তনয়া‌কে মোটামুটি মান‌তে চেষ্টা কর‌ছে।

এর ম‌ধ্যে তা‌মিম আর র‌শ্মির ব্রেকাপ হয়। কারন তা‌মি‌মের অতি‌রিক্ত প‌রিমান রাগ আর স‌ন্দেহ। র‌শ্মি ভাব‌ছি‌লো তা‌মিম ধী‌রে ধী‌রে ঠিক হ‌বে কিন্তু না তা‌মিম ওর রাগ ছাড়‌তে পা‌রে‌নি। আয়াত তনয়া এটা শোনার পর ওদের দুজনকে মিলা‌নোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দুজনই এক‌রোখা। কেউ নি‌জেদের ইগো ছাড়‌তে চায়না।

‌দেখ‌তে দেখ‌তে আরো একমাস চ‌লে গে‌লো। 
এ মা‌সের আঠে‌রো তা‌রিখ ওদের রি‌সিপস‌নের তা‌রিখ ঠিক করা হ‌য়ে‌ছে। পনে‌রো তা‌রিখ আয়াত তনয়া যে যার বা‌ড়ি যা‌বে। তারপর গা‌য়ে হলুদ, আর তনয়া‌কে আনুষ্ঠা‌নিকভা‌বে আয়াত‌দের বা‌ড়ি নি‌য়ে আস‌বে।

আজ আয়াত তনয়ার উপর খুব রাগ ক‌রে নি‌জের বাসায় চ‌লে গে‌লো। কারন তনয়া তানভী আর মেঘার সম্প‌র্কের কথা আয়াত‌কে ব‌লে‌নি। আয়াত প্রায়ই রাগ ক‌রে কিন্তু রাগ ক‌রে কখ‌নো এভা‌বে তনয়া‌কে একা ফ্ল্যা‌টে ছে‌ড়ে ‌নি‌জের বা‌ড়ি যায়‌নি। ওদের ভিতর ঝগরা হ‌লেও সেটা বে‌শি সময় স্থায়ী হ‌তো না। রাগ হ‌তো আবার দুজন দুজনার ভা‌লোবাসায় হারা‌তো। কিন্তু আজকে আয়াত রাগ ক‌রে চ‌লে যাওয়ায় তনয়া খুব কষ্ট পে‌য়ে‌ছে। আয়াত যে, কষ্ট পায়নি তা কিন্ত না। আয়াতও ভিষন কষ্ট পে‌য়েছে। কারন তনয়া ওর কাছ থে‌কে কিছু লুকায় না। সেই ও মেঘা আর তানভী এর সম্প‌র্কের কথা লুকা‌লো। আয়াত বিষয়টা নি‌তে পা‌রে‌নি।

রাত একটা,
আয়াত নি‌জের রু‌মে রাগ ক‌রে ব‌সে ছি‌লো। তখন মেঘা এসে বলল,
__তুই কাজটা ঠিক ক‌রিস‌নি ভাইয়া! ভা‌বি‌কে এভা‌বে একলা ছে‌ড়ে এসে মো‌টেও ঠিক ক‌রিসনি।

__‌ঠিক বে‌ঠিক আমার তোর কাছ থে‌কে শিখতে হ‌বে না।

__হ্যাঁ শিখ‌তে হ‌বে। কারন আমিই ভাবি‌কে নি‌ষেধ কর‌ছিলাম আমার আর তান‌ভী এর সম্প‌র্কের কথা তো‌কে না বল‌তে। নয়ত ভা‌বি আর তানভী প্রথ‌মেই বলতে চে‌য়ে‌ছি‌লো। আমি চে‌য়ে‌ছিলাম তানভী আর আমি নি‌জে‌দের পা‌য়ে দা‌ড়ি‌য়ে সবাই‌কে সবটা জানা‌বো। তাছাড়া তো‌দের বি‌য়ের সপ্তাহ খা‌নিক পর তানভী বিএস‌সি করার জন্য বাহি‌রে চ‌লে যা‌বে। আমরা দুজন চে‌য়ে‌ছিলাম ও যাবার আগে তো‌কে জানা‌বো। তো‌কে জানাই‌নি কেন জা‌নিস ?
কারন তোরা ছে‌লেরা নি‌জেরা অন্যের বো‌নের সা‌থে প্রেম কর‌বি কিন্তু কেউ তো‌দের বো‌নের সা‌থে প্রেম কর‌লেই দোষ। একটা স‌ত্যি কথা বল ভাইয়া, য‌দি বলতাম আমি তানভী‌কে ভা‌লোবা‌সি ত‌বে কী তুই সহ‌জে মে‌নে নি‌তি?

__আয়াত নিশ্চুপ।

__এই কার‌নেই ব‌লি‌নি। ভাই‌য়েরা বোন‌দের জন্য সবসময় বেস্টটা চায়। তাই আমি চে‌য়ে‌ছিলাম তানভী উপযুক্ত হ‌য়ে তোর কা‌ছে আমার হাত দা‌বি করুক। কিন্তু আমা‌দের দুজনার কার‌নে তুই ভা‌বি‌কে কষ্ট দি‌তে পা‌রিস না। তুই কী ভা‌বিস তোর আর ভা‌বির ম‌ধ্যে সম্পর্ক খারাপ হ‌লে আমার আর তানভী এর সম্পর্কও খারাপ হ‌বে? নো নেভার! আমি বা তানভী কেউই তোর মত না। সামান্য কিছু ঝগরা হ‌লেই নি‌জের কা‌ছের মানুষটা‌কে ফে‌লে দূ‌রে যাই না। একবার ভাব‌তো ভাইয়া তোর এভা‌বে চ‌লে আসায় ভা‌বি কতটা কষ্ট পে‌য়ে‌ছে। হয়ত একা একা ব‌সে কাঁদ‌ছে। একা একা য‌দি কোন বিপদ আপদ হয় তখন কী হ‌বে!

আয়াত কিছু ভাব‌তে পার‌ছে না। মাথা হ্যাং হ‌য়ে গে‌ছে। আয়াত ভাব‌ছে, সত্যি মা‌ঝে মা‌ঝে আয়াত বেয়া‌ক্কে‌লের মত কাজ ক‌রে। আয়াত দা‌ড়ি‌য়ে বলল,
__মা‌কে ব‌লিস আমি চ‌লে গেলাম।

__রাত দু‌টো বা‌জে বের হ‌বি? তার থে‌কে সকা‌লে যাস।

__না‌রে আমি জা‌নি পাগলীটা কান্না ক‌রে নি‌জের অবস্থা বা‌রোটা বা‌জি‌য়ে ফেল‌ছে।

আয়াত এক মুহূর্তও দাড়া‌লো না। বাসায় গি‌য়ে ডোর বেল না বা‌জি‌য়ে নি‌জের কা‌ছে থাকা চা‌বি দি‌য়ে লক খু‌লে ভিত‌রে গিয়ে দে‌খে তনয়া সোফায় ঘু‌মি‌য়ে পড়‌ছে। আয়াত ভাব‌ছে নিশ্চিত মে‌য়েটা কিছু খায়‌নি। নি‌জের উপর রাগ হ‌চ্ছে খুব। কেন যে ওর এত রাগ ওঠে মা‌ঝে মা‌ঝে। তনয়ার পা‌শে ব‌সে ওর মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে দি‌তেই তনয়া জে‌গে উঠ‌লো। আয়াত‌কে দে‌খে অভিমান ক‌রে মুখ ঘু‌রি‌য়ে অপর পাশে ‌নি‌য়ে গে‌লো। আয়াত মৃদু হে‌সে তনয়াকে কা‌ছে টে‌নে বু‌কের মা‌ঝে নি‌য়ে বলল,

__স্য‌রি বল‌বো না। তবুও য‌দি পা‌রো তোমার এই বজ্জাত বরটা‌কে মাফ ক‌রে দাও। প্লিজ। তু‌মি তো জা‌নো আমার কথায় কথায় হুট ক‌রে রাগ ওঠে। এভা‌বে রাগ ক‌রে থে‌কো না অভিলাষী। মাফ ক‌রে দাও না। ভা‌লোবা‌সি তো।

__ভা‌লোবাস‌লে কেউ এভা‌বে রাগ ক‌রে ছে‌ড়ে যায় না। হ্যাজ‌বেন্ড ওয়াই‌ফের ভিতর ঝগরা হ‌বেই তাই ব‌লে এভা‌বে চ‌লে যে‌তে হ‌বে?

__আচ্ছা এই দে‌খো কান ধর‌ছি। আর যা‌বো না। তু‌মি চাই‌লে আমা‌কে শা‌স্তি দাও। যা শা‌স্তি দিবা, মাথা পে‌তে নি‌বো। প্র‌মিজ।

__‌তোমা‌কে শাস্তি দি‌তে চাই না। তোমার রাগ, ঝগরা, বকা দেয়া সব মে‌নে নি‌তে পার‌বো শুধু তোমার দূ‌রে যাওয়াটা মে‌নে নি‌তে পার‌বো না। আর শা‌স্তি কী দি‌বো! তোমায় শা‌স্তি দেয়া তো নি‌জে‌কে শা‌স্তি দেয়া। ত‌বে আমায় আগের থে‌কেও বে‌শি ভা‌লোবাস‌তে হ‌বে। আর কাল‌কে অফিস যেতে পার‌বে না।‌ আমা‌কে সময় দি‌তে হ‌বে।

__ও‌কে মহারানী আপনার শা‌স্তি মাথা পে‌তে নিলাম। এবার চলুন খা‌বেন। আমারও খি‌দে পে‌য়ে‌ছে।

সারা রাত দুজনার খুনসু‌টি আর ভা‌লোবাসায় কাট‌লো। সকা‌লে আয়া‌তের একটা জরু‌রি কা‌জে যে‌তেই হ‌বে। ত‌বে দুপু‌রের আগে চ‌লে আস‌বে। জরু‌রি কাজ দে‌খে তনয়াও নি‌ষেধ কর‌লো না। যাবার সময় তনয়ার মনটা কেমন যে‌নো কর‌ছি‌লো, আয়া‌তেরও যে‌নো পা চল‌ছি‌লো না। তনয়া‌কে ছে‌ড়ে এক মুহূ‌র্তের জন্যও কোথাও যে‌তে মন চাইছে না ওর। আয়াত দরজা খুল‌তে নি‌লে তনয়া ওকে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে ব‌লে,
__‌মিস ইউ।

__‌মি টু মাই লাভ।

তনয়া আয়া‌তের গলা জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে পা‌য়ের উপর পা তু‌লে আয়া‌তের নিশ্বা‌সে নি‌জের নিশ্বাস আবদ্ধ ক‌রে ফে‌লে। বেশ কিছুক্ষন এভা‌বে থে‌কে আবার আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে। আয়াত নি‌জেও বুঝ‌তে পার‌ছে না আজ মনটা এত অশান্ত লাগ‌ছে কেন। ম‌নে হ‌চ্ছে কিছু হা‌রি‌য়ে ফেল‌বে। কোন অশুভ শক্তি তিব্রভা‌বে ওদের পিছু ছুট‌ছে। আয়াত তনয়া‌কে নি‌জের বুক থে‌কে তু‌লে, তনয়ার সারা মু‌খে ভা‌লোবাসার পরশ দিয়ে বে‌ড়িয়ে গে‌লো। দুজনার চোখ থে‌কেই কোন অজানা কার‌নে জল ঝরছে। বুঝ‌তে পার‌ছে না কেন। ম‌নে হয় আর কেউ কাউ‌কে দেখ‌বে না।

আয়াত যে‌তেই তনয়া ঘ‌রের কাজ গু‌ছি‌য়ে ওভে‌নে কেক বসা‌লো। আজ আয়াত‌কে বল‌বে ও কতটা ভা‌লোবা‌সে আয়াত‌কে। হ্যাঁ আজ সেই বি‌শেষ দিন যে দি‌নের জন্য তনয়া এত‌দিন আয়াতকে ভালোবা‌সি কথাটা ব‌লে‌নি। আজ বল‌বে। বল‌বে আজ ওর আর আয়া‌তের ভা‌লোবাসার অংশ ছোট্ট ভ্রুন রূ‌পে ওর গ‌র্ভে বে‌ড়ে উঠ‌ছে। আর কাল রা‌তের জন্য স‌্য‌রিও বল‌বে।

৬০!!
মাত্র দু ঘন্টার ম‌ধ্যে কাজ শেষ ক‌রে আয়াত বা‌ড়ি চ‌লে আস‌লো। তনয়া‌কে ছাড়া নিশ্বাস বন্ধ হ‌য়ে আসছি‌লো। তনয়ার জন্য অনেক গিফ্ট আর কাল রা‌তের জন্য স‌্যরি বল‌বে আর ওকে মি‌ষ্টি কিছু মুহূর্ত উপহার দি‌বে। 
কয়েকবার বেল বাজা‌নোর পরও তনয়া দরজা খুল‌ছে না। আয়াত চা‌বি দি‌য়ে দরজা খুল‌তে গি‌য়ে দে‌খে দরজা খোলা, শুধু ভা‌লো ক‌রে ভেজা‌নো। আয়া‌তের কেমন যে‌নো ভয় কর‌ছে। দরজা খু‌লে ভিত‌রে গি‌য়ে দে‌খে তনয়া রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লো‌রে প‌রে আছে।
কিছু সম‌য়ের জন্য আয়াত স্তব্ধ হ‌য়ে গে‌লো। মাথা কাজ করা বন্ধ ক‌রে দি‌লো আয়া‌তের। ম‌নে হ‌চ্ছে কোন দুঃস্বপ্ন দেখ‌ছে বা স্বপ্ন আর বাস্ত‌বের সং‌মিশ্র‌ণে তৈরী পৃ‌থিবী‌তে চ‌লে আস‌ছে। কিন্তু না তনয়ার গোঙানী‌তে বাস্ত‌বে ফির‌লো।

তনয়ার মাথাটা কো‌লে নি‌তেই তনয়া পিট‌পিট চো‌খে আয়া‌তের দি‌কে তাকা‌লো। আয়া‌তের চোখ স্থির হ‌য়ে তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। তনয়া খুব কষ্ট ক‌রে বলল,
__আয়াত আমাকে বাঁচাও। আমার খুব কষ্ট হ‌চ্ছে।

আয়াত কী কর‌বে ভেবে পা‌চ্ছে না। ওর শরী‌রের পু‌রো শ‌ক্তি যে‌নো নিঃশ্বেষ হ‌য়ে গে‌ছে। তবুও কথা না বা‌ড়ি‌য়ে তনয়ার ওড়না দি‌য়ে তনয়ার মাথা আর পিঠ পেট শক্ত ক‌রে বেঁ‌ধে দি‌য়ে। তনয়া‌কে কো‌লে তু‌লে নি‌লো। তনয়া আয়া‌তের গা‌লে হাত দি‌য়ে বলল,

__আয়াত আমি বাঁচ‌বো তো!

__‌তোমার কিছু হ‌বে না তানুপা‌খি। কিন্তু তোমার এ অবস্থা কে কর‌লো?

কথা বল‌তে বল‌তে আয়াত গা‌ড়ির কা‌ছে চ‌লে এলো। তনয়া‌কে গা‌ড়ি‌য়ে ব‌সি‌য়ে একহা‌তে তনয়া‌কে বু‌কের সা‌থে আঁক‌রে ধ‌রে অপর হা‌তে গা‌ড়ি ড্রাইভ কর‌ছে। তনয়া আয়াতের গা‌লে হাত দি‌য়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
__আমাকে বাঁ‌চি‌য়ে নিও আয়াত। আমার এখ‌নো অনেক স্বপ্ন আছে যা পূরন করবো। তোমার অনেক ভা‌লোবাসা পাওয়ার আছে। আমার ম‌ধ্যে তোমার যে অংশ বে‌ড়ে উঠ‌ছে তার সা‌থে খেলার ইচ্ছা আছে।

__কী?

__হ্যাঁ আয়াত! তু‌মি বাবা হ‌বে, আমি মা। আয়াত আমা‌কে আর আমাদের সন্তান‌কে বা‌ঁচি‌য়ে নিও। আমি মর‌তে চাই না আয়াত। তোমার সাথে শত বছর বাঁচ‌তে চাই। ভা‌লোবাস‌তে চাই। আমার দুই প‌রিবা‌রের সা‌থে থাক‌তে চাই। সংসার কর‌তে চাই। তোমায় আমার অভিলাষগু‌লো পূরণ কর‌তে চাই।

__তোমার কিছু হ‌বে না তনয়া। তু‌মি ঠিক হ‌য়ে যা‌বে। কথা ব‌লো না প্লিজ।

হাসপাতা‌লে এসে। তনয়া‌কে অপা‌রেশন থিওয়টা‌রে ঢুকা‌নোর সময় তনয়া আয়া‌তের গা‌লে হাত দি‌য়ে বলল,
__ভা‌লোবা‌সি আয়াত খুব ভা‌লোবা‌সি তোমায়।

__আ‌মিও খুব ভা‌লোবা‌সি আমার অভিলাষী‌কে।

__আয়াত আমার একটা কথা রাখ‌বে?

__হুমম।

__‌শেষ বা‌রের মত আমার ঠোঁ‌টে একটা চু‌মো খা‌বে। 
আয়াত কান্না কর‌তে কর‌তে নি‌চে ঝু‌কে তনয়ার ঠোঁ‌টে আল‌তো চু‌মো খে‌লো। আয়া‌তের চো‌খের প‌া‌নিটা তনয়ার গা‌লে পড়‌ছে। আর তনয়া নিশ্চুপ হ‌য়ে, চোখ বন্ধ ক‌রে ফেল‌লো। আর এখনও খুল‌লো না।

তনয়া‌কে অপা‌রেশন থি‌য়েটা‌রে নেয়ার পর হাসপাতাল কতৃপক্ষ পু‌লিশ‌কে খবর দেয়। পু‌লিশ এসে আয়াত‌কে ধ‌রে নি‌লো। কারন আয়া‌তের ফ্ল্যা‌টে আয়াত ছাড়া কেউ আসে‌নি। আর পা‌শের বাসার আন্টি না‌কি বল‌ছে সে আয়াত‌কে দেখ‌ছে তনয়ার বাসা থে‌কে বের হ‌তে। পু‌লিশ তাৎক্ষ‌নিক স‌ন্দে‌হের ভি‌ত্তি‌তে আয়াত‌কে ধ‌রে নেয়।

তারপ‌রের ঘটনা‌তো আপনারা জা‌নেনই।
আয়াত পু‌লিশ‌কে মে‌সেসগু‌লো দেখা‌লো। সেই লোকটার কথা বল‌লো। যে তনয়াকে ফ‌লো কর‌তো। আর আয়াতের যা‌দের উপর স‌ন্দেহ হ‌য়ে‌ছি‌লো সবার নাম ব‌ললো। রিসাদ, দীপু, রিয়া এমন‌কি নি‌জের মা‌য়ের নামও। কারন সে‌দিন যখন আয়া‌তের মা বল‌ছি‌লো তনয়া যে‌নো আয়াত‌কে মুক্ত করে দেয়। সে‌দিন থে‌কে আয়া‌তের অব‌চেতন মন কেন জা‌নি তা‌কে স‌ন্দেহ কর‌তে শুরু করে। নি‌জের মা‌য়ের মুখ থে‌কে অমন কথা শুন‌বে তা কল্পনাও ক‌রে‌নি আয়াত। তারপর ভাব‌লো মা তো বরাবরই তনয়া‌কে অপছন্দ কর‌তো। য‌দিও আয়া‌তের মন বল‌ছে সে কিছু ক‌রে‌নি সে নি‌র্দোষ। কিন্তু ম‌স্তিষ্ক অন্য কিছু বল‌ছে। আর আয়া‌তের ম‌তে মন আর ম‌স্তি‌ষ্কের লড়াই‌য়ে সবসময় ম‌স্তি‌ষ্কের কথা শুন‌তে হয়। মন আবেগী হয় কিন্তু ম‌স্তিষ্ক নয়। পু‌লিশ সবাই‌কে জি‌জ্ঞেসাবাদ কর‌ছে কিন্তু তেমন কোন প্রমাণ পা‌চ্ছে না।

৬১!!
তনয়া এখ‌নো নিস্তব্ধ র্নি‌লিপ্ত হ‌য়ে ঘু‌মি‌য়ে আছে। আয়াত হস‌পিটালটা‌কেই নি‌জের ঘর বা‌নি‌য়ে ফেল‌ছে। সারা‌দিন তনয়ার কা‌ছে প‌রে থা‌কে। বা‌কি দু‌নিয়ার কোন খেয়াল নেই। আয়া‌তের এ অবস্থা দে‌খে আয়া‌তের বাবা আমজাদ হোসেন খুব ভে‌ঙে পর‌ছেন। ব্যবসা খারা‌পের দি‌কে যা‌চ্ছে দে‌খে আয়াজ আর মেঘা দুজ‌নেই অফি‌সে যাওয়া শুরু কর‌লো। ওর বাবা‌কে অার আয়াত‌কে পূর্ণ সহ‌যোগীতা কর‌ছে। ইদানিং তনয়ার আয়া‌তের গভীর ভা‌লোবাসা দে‌খে আয়া‌তের মা‌য়ের মনও গল‌তে শুরু কর‌ছে। বি‌শেষ ক‌রে যখন থে‌কে শুন‌ছে তার বংশধর তনয়ার গ‌র্ভে। তানভীও আর বা‌হি‌রে বিএস‌সি কর‌তে গে‌লো না। দে‌শেই ভ‌র্তি হ‌লো।

আর তনয়ার বাচ্চাটা!
হ্যাঁ তনয়ার বাচ্চাটা এখ‌নো বেঁ‌চে আছে। তনয়ার আঘাত লেগে‌ছি‌লো পি‌ঠে আর মাথায়। পি‌ঠের ঘা মোটামু‌টি শু‌কি‌য়ে গে‌ছে আর মাথার ক্ষত শুকা‌লেও নার্ভগু‌লো কাজ কর‌ছে না। তাই তনয়া কোমায় আছে। ডাক্তাররা ভে‌বে‌ছি‌লো তনয়ার অতি‌রিক্ত রক্তক্ষর‌নের ফ‌লে বাচ্চাটা মিসক্যা‌রেজ হ‌য়ে যাবে কিন্তু জাদুরমত ভ্রুনটা এখ‌নো বেঁ‌চে আছে। যার বয়স নয় কি দশ সপ্তাহ। ডাক্তারাও বিষয়টা নি‌য়ে খুব স্ত‌ম্ভিত। কারন যেখা‌নে মিসক্যা‌রেজ হবার সম্ভবনা এত বে‌শি সেখা‌নে বাচ্চাটা দি‌ব্যি সুস্থ আছে। হয়ত বাচ্চাটা‌কে পাবার তনয়ার গভীর ইচ্ছা ম‌নোবল ছোট্ট ভ্রুনটা‌কে এখ‌নো বাঁ‌চি‌য়ে রে‌খে‌ছে।

তনয়া বেঁ‌চে থাকার সম্ভবনা এখন বে‌শি। কিন্তু কোমা থে‌কে ক‌বে বের হ‌বে তা ডাক্তারা বল‌তে পার‌ছে না। হয়ত ক‌য়েক মাস বা বছর নয়ত সারা জীবন। ডাক্তারা তনয়ার খুব কেয়ার দি‌চ্ছে কারন তনয়ার বেবিটা যখন পূর্ণ বয়স্ক হ‌বে তখন সিজার ক‌রে বের ক‌রে তা‌কে পৃ‌থিবীর আলো দেখা‌নো হ‌বে। এছাড়া কোন অপশন নেই। এটা ডাক্তার‌দের জন্য খুব বড় একটা চ্যা‌লেঞ্জ। তা‌দের ধারনা হয়ত বাচ্চাটার টা‌নে তনয়া সুস্থ হ‌বে। আর তাছাড়া বাচ্চাটা এবোশন কর‌তে গে‌লে, তনয়ার প্রা‌ণের ঝু‌ঁকি খুব বে‌শি। তাই আয়াত আর তনয়ার প‌রিবা‌রের সবার সিদ্ধান্ত নি‌য়ে বাচ্চা‌কে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হ‌য়ে‌ছে।

আয়াত তনয়ার পে‌টে হাত বু‌লি‌য়ে দি‌চ্ছে আর ভাব‌ছে, 
__এখা‌নে আমার তনয়ার মত আরেকটা পুতুল আছে। আমার আর তনয়ার ভা‌লোবাসার অংশ। আয়াত তনয়ার গা‌লে চু‌মো খে‌য়ে বলল, এবার তো ওঠো তনয়া। আর কত ঘুমা‌বে! দে‌খো আমা‌দের বাচ্চাটাও বড় হ‌চ্ছে। ও তো এখন তোমার দুরন্তপানা দেখ‌তে চায় কিন্তু তু‌মি তো নীরব হ‌য়ে আছো। আচ্ছা তনু আমা‌দের বাচ্চার নাম কী রাখ‌বো? তু‌মি কী নাম ঠিক ক‌রে রাখছিলা? য‌দি ঠিক ক‌রে রা‌খো ত‌বে সেটাই রাখ‌বো। নয়ত আমা‌দের মে‌য়ে হ‌লে নাম রাখ‌বো, অন‌ন্দিতা। কারন ও তোমার মতই সাহসী আর ভা‌লোবাসার নতুন রূপ হ‌বে। আর যা‌কে আমরা অন‌ন্দিতা ডাক‌বো। তু‌মি চাই‌লে অন্য কিছুও রাখ‌তে পা‌রো। আমার প্রব‌লেম নেই। আচ্ছা ছে‌লের নাম কী রাখ‌বো? এটা তু‌মি ঠিক করবা? আমা‌দের সন্তা‌নের নাম ঠিক করার জন্য হলেও ওঠো না তনয়া। এভা‌বে রোজ ঘন্টার পর ঘন্টা আয়াত তনয়ার পা‌শে ব‌সে ওর সা‌থে কথা ব‌লে। কিন্তু তনয়া জবাব দেয় না।

আয়াত বল‌ছে, বাচ্চা কন‌সিভ করার আগে থে‌কেই বাচ্চার নাম নি‌য়ে আমার সাথে ঝগরা কর‌তে আর আজ কেন কর‌ছো না। আমি তো ব‌লে‌ছিলাম তনয়া বি‌য়ের পর বছর খা‌নিক সময় নি‌য়ে বে‌বি নি‌বো, কিন্তু না, তু‌মি বি‌য়ের প‌রের সপ্তা‌হে বল‌লে, বি‌য়ের পর প্রথম বিবাহ বা‌র্ষি‌কে আমরা তিনজন থাক‌বো। অনেক হইহুল্লর আর মজা কর‌বো। বে‌বি যখন তোমার গ‌র্ভে থাক‌বে তখন তার প্র‌তিটা মুহূর্ত তু‌মি অনুভব কর‌বে। অনুভব কর‌বে বে‌বির অস্তিত্বকে। ত‌বে এখন কেন অনুভব কর‌ছো না? ওঠো না তনয়া! আমি আমার দুরন্ত দুষ্ট অভিলাষী‌কে দেখ‌তে অভ্যস্ত। এরকম নীরব তনয়া‌কে আমার ভা‌লো লা‌গে না।

আয়াত তনয়ার পে‌টে নি‌জের মাথা দি‌য়ে কেঁ‌দেই যা‌চ্ছে। এ কান্নার শেষ ক‌বে কেউ বলতে পা‌রে না। কারন তনয়া আদৌ উঠ‌বে কিনা তারও ‌কোন নিশ্চয়তা নেই।

নি‌জের মাথায় কা‌রো হা‌তের স্পর্শ পে‌য়ে মাথা তু‌লে উপ‌রে তাকা‌লো আয়াত। তা‌কি‌য়ে দে‌খে আয়মন আয়া‌তের মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে দি‌চ্ছে। এ মুহূ‌র্তে আয়াত‌কে কী ব‌লে শ‌ান্তনা দেয়া উচিৎ তা আয়মন জা‌নে না। আয়মন ভাব‌ছে, 
__যখন আমার এত কষ্ট হ‌চ্ছে তখন আয়া‌তের ক‌ষ্টের কথা তো চিন্তা কর‌তেও পা‌রি না।

আয়মনকে দে‌খে আয়াত বলল, 
__‌দে‌খো না আপু তোমার বাচ্চাটা এভা‌বে গত দেড় মাস যাবত ঘু‌মি‌য়ে আছে। দে‌খো তোমার কথা তো ও শো‌নে ওকে ব‌লো না উঠ‌তে। প্লিজ আপু।

আয়মন আয়া‌তের মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে বলল,
__‌চিন্তা ক‌রিস না ভাই। ও ঠিক উঠ‌বে। আল্লাহ আছে তো। তি‌নি ওর মত বাচ্চার সা‌থে কোন অন্যায় কর‌বে না।

তারপর অনেকক্ষন নীরবতা। তনয়ার মা এসে আয়মন‌কে চা দি‌তে চাই‌লে আয়মন বলল, তনয়ার সুস্থতার জন্য রোজা রাখ‌ছে। সবাই যে যার মত তনয়ার জন্য দোয়া কর‌ছে। তনয়ার বাবা রোজ তনয়া‌কে দেখ‌তে আসে, ওর পা‌শে ব‌সে থা‌কে তারপর কান্না ক‌রে। নি‌জের রা‌গের কার‌নে মে‌য়েটা‌কে মা‌সের পর মাস দূ‌রে স‌রি‌য়ে রে‌খে‌ছি‌লো আর এখন কা‌ছে পে‌য়েও মে‌য়েটা‌কে হারা‌তে বস‌ছে। খুব রাগ হয় তার নি‌জের উপর। কেন সে তনয়া‌কে দূ‌রে রে‌খে‌ছি‌লো। এখন সবার শুধু এটাই প্রার্থনা তনয়া যা‌তে খুব দ্রুত সুস্থ হ‌য়ে যায়।

আয়াত আয়মন‌কে বলল,
__আপু তু‌মি ওর কা‌ছে একটু থাকবা? আমার আমা‌দের ফ্ল্যাটে ‌কিছু কাজ ছি‌লো।

__আচ্ছা। তুই যা। আমি আছি তনয়ার কা‌ছে।

আয়মন তনয়ার পা‌শে ব‌সে কোরআন তেলায়ত কর‌ছে। তনয়ার মা তস‌বিহ পড়‌ছে। আয়াত তনয়ার কপা‌লে চু‌মো খে‌য়ে নি‌জের ফ্ল্যা‌টের উদ্দে‌শ্যে রওনা দি‌লো।

৬২!!
আজ কত‌দিন পর আয়াত নি‌জের ফ্ল্যা‌টে আস‌লো। ফ্ল্যা‌টে ভিত‌রে ঢুক‌তেই আয়া‌তের বুকটা মোচর দি‌য়ে উঠ‌লো। সেই সাজা‌নো গোছা‌নো সুন্দর ফ্ল্যাটটা আজ মানুষ‌ বিহীন প‌রিত্যাক্ত বা‌ড়ির মত লাগ‌ছে। ঘ‌রের প্র‌তিটা কোনায় তনয়ার হা‌তের ছোঁয়া ছি‌লো আজ ঘরটা আছে তনয়াও আছে কিন্তু তনয়া আজ জীবন মৃত্যুর মাঝামা‌ঝি অবস্থান কর‌ছে। 
‌মে‌ঝের যে জায়গাটায় তনয়া প‌রে ছি‌লো সেখা‌নে এখ‌ন আর র‌ক্ত নেই কিন্তু ছোপ ছোপ দাগ ঠিকই আছে। পু‌লিশ এত‌দিন ফ্ল্যা‌টে তদন্ত কর‌তো গতকাল ব‌লে দি‌ছে ফ্ল্যাট থে‌কে সব তথ্য সংগ্রহ করা শেষ। ফ্ল্যাটটা সম্পূর্ণ অগোছা‌লো। অথচ তনয়া থাকা‌তে সামান্য প‌রিমানও অগোছা‌লো হ‌তো না। আয়াত অগোছা‌লো ক‌রে রাখ‌লেও তনয়া রাগ কর‌তো। বকা দি‌তো আয়াত‌কে।

সারাঘরময় তনয়ার স্মৃ‌তি যে‌নো আয়াত‌কে চে‌পে ধর‌ছে। দম বন্ধ লাগ‌ছে ওর। ঘ‌রে কেমন আশ‌টে একটা গন্ধ আস‌ছে। আয়াত জানালা দরজা সব খু‌লে দি‌লো। রুমের গুমট ভাবটা দূর হওয়া দরকার। আয়াত ভাব‌ছে তনয়া এই ঘরটাকে কত ভা‌লোবাস‌তো। যে‌দিন শুন‌ছি‌লো আয়াত ফ্ল্যাটটা ওর নামে কিনে‌ছি‌লো আর তনয়া প্র‌তিমা‌সে যে ঘর ভাড়া দি‌তো আয়াত তা তনয়ার না‌মেই ব্যা‌ংকে রে‌খে দি‌তো, সে‌দিন তনয়ার ভিষন রাগ হ‌য়ে‌ছি‌লো। আয়া‌তের সা‌থে কথাই ব‌লে‌নি। শে‌ষে আয়াত তনয়াকে অনেক বুঝা‌নোর আর ভা‌লোবাসার পর রাগটা ক‌মে‌ছি‌লো। কতটা ভা‌লোবাসাময় আর খুনসু‌টির স্মৃ‌তি জ‌ড়ি‌য়ে আছে ঘ‌রের প্র‌তি‌টি কোনায়। আর আজ সেই পাগলীটা দুষ্ট‌মি করার জন্য নেই।

আয়াত বেডরু‌মে ঢু‌কে স্থিরচো‌খে তা‌কি‌য়ে আছে বে‌ডের একটা বা‌লি‌শের দি‌কে। কারন তনয়া তো সবসময় আয়া‌তের বু‌কের মা‌ঝে ঘুমা‌তো তাই দু‌টো বা‌লি‌সের প্র‌য়োজন ওদের হ‌তো না। আয়া‌তের বুক‌চি‌ড়ে একটা দীর্ঘ‌নিশ্বাস বে‌ড়ি‌য়ে আস‌লো।

সারা ঘ‌রে ধূল আর মাকরসা বাসা বেঁ‌ধে‌ছে। আয়াত ধী‌রে ধী‌রে পু‌রো ঘরটা প‌রিষ্কার ক‌রে ফেল‌লো। কিন্তু সাম‌নের রু‌মের যে, জায়গাটায় তনয়া রক্তাক্ত অবস্থায় প‌রে ছি‌লো, সে জায়গাটায় গি‌য়ে আয়া‌তের বুকটা ধক ক‌রে উঠ‌লো। র‌ক্ত গু‌লো নেই ত‌বে ছোপ ছোপ দাগ এখ‌নো আছে। ওর তনয়ার র‌ক্তের দাগ।

পু‌রো ঘরটা তেমন ভা‌বে গোছা‌লো ঠিক যেমন ভা‌বে তনয়া গু‌ছি‌য়ে রাখ‌তো। আয়াত প‌কেট থে‌কে ফোনটা বের ক‌রে আয়মন‌কে ফোন ক‌রে তনয়ার কথা জে‌নে নি‌লো। তারপর ফো‌নের দি‌কে তাকা‌তেই দে‌খে সেই লোকটার মেসেস। এত‌দিন লোকটা আয়াত‌কে কোন মে‌সেস দেয়‌নি। আজ কেন দি‌লো? মেসেটায় লেখা ছি‌লো,

SORRY
আ‌মি তনয়া‌কে মার‌তে চাই‌নি। যা হ‌য়ে‌ছে সেটা একটা এক‌সি‌ডেন্ট মাত্র। Sorry.

আয়া‌তের এত রাগ হ‌চ্ছে যে, ওকে কী রিপলাই কর‌বে ভে‌বে পা‌চ্ছে না। কতক্ষন চুপচাপ বিছানায় ব‌সে ছি‌লো। তারপর ধপ করে শু‌য়ে পড়লো। বিছানার দি‌কে তাকা‌তেই কান্না পায় আয়াতের। যখনই আয়াত এভা‌বে শু‌য়ে পড়‌তো, তনয়া এসে ওর বু‌কে নি‌জের জায়গা করে নি‌তো। আজ তনয়াকে চাই‌লেও নি‌জের বু‌কে নি‌তে পার‌ছে না, তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌তে পার‌ছে না। আর সব এ জা‌নোয়ারটার জন্য। বেশ কিছুক্ষন পর ফ্ল্যাট থে‌কে বের হ‌য়ে লক ক‌রে পা‌শের ফ্ল্যা‌টের আন্টির কা‌ছে গে‌লো কিছু কথা জান‌তে। তারপর সোজা থানায় গে‌লো। সেখা‌নে গি‌য়ে মে‌সেটা দেখা‌লো সা‌থে অনেক প্ল্যান কর‌লো কিভা‌বে খু‌নি‌কে ধরা যায়।

সন্ধ্যার পর আয়াত তনয়ার কা‌ছে আস‌লো। আয়মন কিছুক্ষন পর বিদায় নি‌য়ে চ‌লে গে‌লো। আয়াত তনয়ার পা‌শে ব‌সে ওর হাতটা নি‌জের হা‌তের মু‌ঠোয় নি‌য়ে বলল, 
__তনয়া দোষী যেই হোক না কেন শা‌স্তি সে পা‌বেই। আমার তনয়া‌কে কষ্ট দি‌য়ে মো‌টেও শা‌ন্তি পা‌বে না সে। আয়াত তনয়ার সারা মু‌খে ভা‌লোবাসার পরশ দি‌তেই ম‌নে পড়লো তনয়ার কথা। একবার তনয়া বল‌ছি‌লো,

__আয়াত শোন, আমি যখন কন‌সিভ কর‌বো তখন তু‌মি রোজ আমার পে‌টে অনেকগু‌লো চু‌মো খা‌বে। এ‌তে আমা‌দের বে‌বি খু‌শি হ‌বে। বে‌বি ভাব‌বে তার বাবা তা‌কে আর তার মা‌কে খুব ভা‌লোবা‌সে।
‌মে‌য়েটা মাত্র একবছ‌রে আয়া‌তের জীব‌নের প্র‌তি‌টি কানায় কানায় নি‌জের জায়গা তৈরী ক‌রে নি‌য়ে‌ছে। আয়া‌তের অস্তি‌ত্বে মি‌সে গে‌ছে তনয়া।
আয়াত তনয়ার পে‌টে চু‌মো খে‌য়ে ওর দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইল। সারা জীবন দেখ‌লেও বু‌ঝি তনয়া‌কে দেখার পিপাসা ওর মিটবে না।

৬৩!!
বেশ ক‌য়েক‌দিন পর,
আয়াত মেঘা‌কে ফোন দি‌য়ে বলল,
__‌কোথায় তুই?

__বাসায় ভাই। কেন?

__বাবা মাকে নি‌য়ে জল‌দি হাসপাতা‌লে আয়।

__‌কেন?

__তনয়ার জ্ঞান ফির‌ছে।

_তনয়ার জ্ঞান ফির‌ছে। ও সেই ব্য‌ক্তির নাম বল‌তে চা‌চ্ছে যে ওকে মার‌তে চে‌য়েছি‌লো। আমি থানায় ছিলাম সেখান থে‌কে পু‌লিশ অফিসার সহ বের হ‌য়ে‌ছি। কিন্তু রাস্তায় খুব ঝা‌মেলা হ‌চ্ছে, জ্যা‌মে আট‌কে গে‌ছি। তুই জল‌দি হস‌পিটা‌লে তনয়ার কা‌ছে যা। শোন সবাই‌কে নি‌য়ে আসিস।

__আচ্ছা ভাইয়া যা‌চ্ছি।

‌মেঘা ওর বাবা মা‌কে নি‌য়ে হস‌পিটা‌লে রওনা দি‌লো। আর আয়াজ‌কে আয়াত আগেই ফোন ক‌রে ব‌লে দি‌য়ে‌ছে। তনয়া এখ‌নো অাক্স‌জেন মাস্ক পরে ঘু‌মি‌য়ে আছে। ওর রুমে কেউ নেই।
তখন রু‌মে কে যে‌নো প্র‌বেশ কর‌লো, সে তনয়ার পা‌শে ব‌সে তনয়ার হাতটা নি‌জের হা‌তের মু‌ঠোয় নি‌য়ে বলল,

__তনয়া তোমার যখন জ্ঞান ফির‌ছে তখন তু‌মি নিশ্চয়ই আমার কথা শুন‌তে পার‌ছো। আর এখন সবাই‌কে আমার কথা ব‌লে দি‌বে তাই না? এতে আমার কোন সমস্যা নেই। তু‌মিও জা‌নো আমি তোমায় মার‌তে চাইনি যা হ‌য়ে‌ছে সেটা একটা এক‌সি‌ডেন্ট মাত্র। ‌তোমায় পাগ‌লের মত ভা‌লোবা‌সি সেটা তোমা‌কে বোঝা‌তে চে‌য়ে‌ছিলাম কিন্তু ওরকম দূর্ঘটনা ঘ‌টে যা‌বে কল্পনাও কর‌তে পা‌রিনি। 
তু‌মি আমায় মাফ ক‌রো বা না ক‌রো সেটা তোমার ব্যাপার। কারন মাফ করার মত অন্যায় ক‌রি‌নি আমি। ত‌বে আমার নামটা এখন ব‌লো না প্লিজ, আমা‌কে একটু সময় দাও আমি নি‌জে ভাইয়া‌কে বল‌বো যে তু‌মি আমার কার‌নে মৃত্যুর মু‌খে চ‌লে গে‌ছি‌লে। প্লিজ তনয়া এতটু‌কো দয়া ক‌রো। আমার বাবার অবস্থা ভা‌লো না। ক‌দিন যাবত তার হা‌র্টে প্রব‌লেম হ‌চ্ছে। বাবা য‌দি শো‌নে তার ছোট ছে‌লে অমানু‌ষের মত তার বড় ছে‌লের স্ত্রীর দি‌কে নজড় দি‌য়েছে ত‌বে বাবা নি‌তে পার‌বে না। প্লিজ তনয়া এতটু‌কো দয়া ক‌রো। তারপর তু‌মি আমায় যে, শা‌স্তি দি‌বে মাথা পে‌তে নি‌বো। প্লিজ তনয়া কিছু তো ব‌লো?

অাড়াল থে‌কে বের হ‌য়ে আয়াত বলল,
__তনয়ার জ্ঞান ফে‌রে‌নি আয়াজ। ও এখ‌নো কোমায় আছে। ‌তোর মুখ থে‌কে স‌ত্যিটা বের কর‌তে একটা মিথ্যা ব‌লে‌ছিলাম।

আয়াজ বিস্ফ‌রিত চো‌খে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। আয়াত আয়া‌জের পা‌শে ব‌সে ঠান্ডা গলায় বলল, 
__‌কেন আয়াজ? কে‌নো কর‌লি এমন? কী ক্ষ‌তি ক‌রে‌ছি‌লো তনয়া তোর?

আয়াজ বেশ কিছুক্ষন চুপ থে‌কে বলল,
__আই লাভ হার ভাই।

__তনয়াও কী তো‌কে ভা‌লোবাস‌তো?

__না!

__ত‌বে কেন?

আবারও বেশ কিছুক্ষন নীরবতা। তারপর আয়াজ বল‌তে শুরু কর‌লো।
__আ‌মি ওকে যে‌দিন প্রথম আমা‌দের অফি‌সে দে‌খি সে‌দিন থে‌কে ভা‌লোবাস‌তে শুরু ক‌রি। তোর মত আমারও ওর ত্রু‌টি‌তে কোন সমস্যা ছি‌লো না। আমিও শুধু ওকেই ভা‌লো‌বে‌সে‌ছিলাম। তনয়ার জন্ম‌দি‌নের দিন তনয়া‌কে প্র‌পোজ কর‌বো ভাব‌ছিলাম। অনেকক্ষন তনয়া‌কে না দে‌খে ও‌কে খুঁজ‌তে খুঁজ‌তে গি‌য়ে দেখলাম তুই আর তনয়া একে অপর‌কে জ‌ড়ি‌য়ে আছিস। আমি বুঝ‌তে পার‌ছিলাম তোরা দুজন দুজন‌কে ভা‌লোবা‌সিস। বিশ্বাস কর তারপর তনয়া‌কে ভু‌লে যে‌তে চে‌য়ে‌ছিলাম। কিন্তু যখনই তনয়া‌কে দেখতাম নি‌জে‌কে ধ‌রে রাখ‌তে পারতাম না। তাই তো প্রায় লু‌কিয়ে লু‌কি‌য়ে ওকে ফ‌লো করতাম। ‌কিন্তু কখ‌নো সাম‌নে যাই‌নি। তনয়ার সা‌থে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছি‌লো, তাই জানতাম তনয়া তো‌কে পাগ‌লের মত ভা‌লোবা‌সে। তাই চে‌য়েও ওকে নি‌জের ম‌নের কথা বল‌তে পারতাম না।

__ও তো‌কে নি‌জের ভাই‌য়ের মত দেখ‌তো। তো‌দের দুজনার বয়‌স প্রায় সেম হওয়ায় তো‌কে বন্ধুর মত নি‌জের ম‌নের কথা বল‌তো। আর তুই?

__কী কর‌বো ভাইয়া আমি তো ওকে পাগ‌লের মত ভা‌লোবাসতাম। জানিস যখন দীপু‌কে নি‌য়ে তো‌দের ভিতর ঝা‌মেলা হ‌লো, আমি তখন তনয়া‌কে ইনডায়‌রেক‌লি এটা বুঝাতাম তুই ওকে স‌ন্দেহ ক‌রিস, ও যাতে তো‌কে ছে‌ড়ে দেয়। কিন্তু তনয়া ভাব‌তো দোষ ওর নি‌জের। আর তারপরও তুই কী কর‌লি তো‌দের সম্পর্ক আগের থে‌কেও ভা‌লো হ‌য়ে গে‌লো।

তারপর রিয়া তো‌দের সম্পর্ক ভাঙ‌তে চাই‌ছি‌লো কেন জা‌নি আমি চে‌য়ে‌ছিলাম তো‌দের সম্পর্কটা ভে‌ঙে যাক। কিন্তু তবুও তো‌দের সম্পর্ক ভাঙলো না উল্টো বি‌য়ে ক‌রে সবসম‌য়ের জন্য এক হ‌য়ে গে‌লি। তনয়ার ভা‌লোবাসায় আমি এতটা অন্ধ হ‌য়ে আছি যে, ভা‌লো খারাপ বোঝার হিতা‌হিত জ্ঞান হা‌রি‌য়ে ফেল‌ছি। তবুও তো‌দের সংসার ভাঙতে চাই‌নি। কিন্তু যখনই তনয়া‌কে তোর কা‌ছে দেখতাম, তুই ওকে স্পর্শ কর‌তি আমার ভিষন রাগ হ‌তো। ম‌নে হ‌তো কেন তুই ওকে স্পর্শ কর‌বি!

‌সে‌দিন যখন সবাই তো‌দের সম্পর্ক মে‌নে নি‌লো, আর তুই রু‌মে গি‌য়ে তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে নি‌জের বু‌কের মা‌ঝে রে‌খে চোখ বন্ধ ক‌রে বল‌ছি‌লি, তনয়া বু‌কে আস‌লে না‌কি তোর সব‌থে‌কে বে‌শি শা‌ন্তি লা‌গে। তখন খুব রাগ লে‌গে‌ছি‌লো কারন আমিও তনয়া‌কে বু‌কে নি‌তে চে‌য়ে‌ছিলাম, আমিও তোর মত ওকে বু‌কে নি‌য়ে শা‌ন্তি পে‌তে চে‌য়ে‌ছিলাম। সে‌দিন এত রাগ হ‌লো যে, তারপর তো‌দের মে‌সেস করা শুরু ক‌রি। আর হ্যাঁ আমি সবসময় লু‌কি‌য়ে লু‌কি‌য়ে তনয়া‌কে দেখতাম।

তনয়া‌দের বা‌ড়ি ব‌সে রা‌তে তনয়াকে দেখ‌তে খুব ইচ্ছে কর‌ছি‌লো। কারন তুই একবার ব‌লে‌ছি‌লি তনয়া ঘুমা‌লে সব‌থে‌কে বে‌শি সুন্দর লা‌গে। তাই ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখার লোভ সামলা‌তে পারলাম না। সে‌দিন জানালা দি‌য়ে চুপি চু‌পি ঢু‌কে অনেক্ষন তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে ছিলাম। বিশ্বাস কর খারাপ কিছু ক‌রি‌নি। শুধু ওর মায়াবী মুখটার দি‌কে চে‌য়ে ছিলাম। কিন্তু তখনও ও তোর বু‌কে ছি‌লো। রাগ হ‌তো খুব এগু‌লো দেখ‌লে। তাই তো‌কে বারবার মে‌সেস করতাম। ভি‌ডিওটাও আমি পা‌ঠি‌য়ে‌ছিলাম। তো‌কে ভয় দেখাতাম যা‌তে ত‌ুই ভয় পে‌য়ে তনয়াকে ছেড়ে দিস। কিন্তু যখন তুই মে‌সেস এর ব্যাপারটা পু‌লিশ‌কে জানা‌লি তাই মে‌সেস করা ক‌মি‌য়ে দি‌য়ে‌ছিলাম। আমি যা ক‌রে‌ছি তনয়া‌কে ভা‌লো‌বে‌সে ওকে পে‌তে ক‌রে‌ছি।

__ভা‌লোবাসলে বু‌ঝি তা‌কে এভা‌বে মৃত্যুর দুয়া‌রে ঠে‌লে দেয়?

__‌বিশ্বাস কর ভাইয়া সে‌দিন যা হ‌য়ে‌ছি‌লো সেটা একটা এক‌সি‌ডেন্ট ছি‌লো।
রা‌তে তুই ঝগরা ক‌রে যখন বা‌ড়ি চ‌লে আসলি। তখন তনয়া‌কে ফোন দি‌য়ে‌ছিলাম ও খুব কান্নাকা‌টি কর‌ছি‌লো। আমি তখন তনয়া‌কে ফো‌নে শান্তনা দেই। ভাব‌ছিলাম সকালে গি‌য়ে তনয়া‌কে বোঝা‌বো। আর ও যা‌তে তো‌কে ছে‌ড়ে দেয় এমন ভা‌বে ইনডায়‌রেক‌লি ইঙ্গিত দি‌বো। কিন্তু সে‌দিন রা‌তেই তুই তনয়ার কা‌ছে গি‌য়ে নি‌জের সব মিটমাট ক‌রে ফেল‌ছিস সেটা আমি জানতাম না। 
প‌রের দিন সকা‌লে গি‌য়ে দে‌খি তনয়া কেক বানা‌চ্ছে। আমা‌কে চা দি‌য়ে বলল, তুই কিছুক্ষ‌নের ম‌ধ্যেই চ‌লে আস‌বি, আর তো‌দের ম‌ধ্যে সব ঠিক হ‌য়ে গে‌ছে। আমার ভিষন রাগ হ‌চ্ছি‌লো,
রাগ ক‌রেই বললাম, যে তোমায় রাগ ক‌রে বার বার ছে‌ড়ে চ‌লে যায়, কার‌নে অকার‌নে ব‌কে, সামান্য ছে‌লে‌দের সা‌থে কথা বল‌লে ধমক দেয় বকা দেয় তার প্র‌তি তোমার এত ভা‌লোবাসা কেন?

তনয়া বলল, এসব কী বল‌ছেন ভাইয়া? আয়াত আমার স্বামী। আর প্র‌তিটা স্বামী স্ত্রীর মা‌ঝে রাগ ঝগরা হ‌বেই। যে ভা‌লোবা‌সে সে রাগও ক‌রে।

আমার এত হিংসা রাগ উ‌ঠে গে‌লো যে, আমি মুখ ফস‌কে তনয়াকে ব‌লে ফেললাম, ভা‌লো তো আমিও তোমা‌কে বা‌সি, তোমা‌কে পাবার জন্য কী ক‌রি‌নি? তোমা‌কে ফ‌লো ক‌রে‌ছি, নি‌জের ভাই‌কে হুম‌কি দি‌য়ে মে‌সেস ক‌রে‌ছি, তোমার জন্য নি‌জের ভাই‌কে পর্যন্ত ঘৃনা কর‌ছি। ত‌বে আয়া‌তের থে‌কে আমার ভা‌লোবাসা বে‌শি হ‌লো না? সেই শুরু থে‌কে তোমায় ভা‌লোবা‌সি। ত‌বে তু‌মি কেন আমার ভা‌লোবাসা বুঝ‌তে পা‌রো না।

তনয়া তখন বিস্ম‌য়ের সপ্ত আসমা‌নে ছি‌লো। হয়ত ভাব‌তে পা‌রে‌নি আমার মুখ থে‌কে এমন কিছু শুন‌বে। তাই বিম্ম‌য়ে বলল,
এসব কী বল‌ছেন আয়াজ ভাইয়া? আমি আপনা‌কে আমার একজন ভা‌লো বন্ধুর মত দে‌খি। আর আপ‌নি আয়া‌তের ছোট ভাই তাই আপনা‌কে আমিও ভাই‌য়ের মত দে‌খি। আমি বয়‌সে আপনার থে‌কে ছোট হ‌লেও সম্প‌র্কে আপনার বড় ভা‌বি।

ভাইয়া, বড়ভা‌বি ডাকগু‌লো শু‌নে রা‌গে হিতা‌হিত জ্ঞান ছি‌লো না। তাই তনয়া‌কে দেয়া‌লের সা‌থে চে‌পে ধরে বললাম, কি‌সের ভাই কি‌সের ভা‌বি? আজ পর্যন্ত কখ‌নো তোমা‌কে আমি বড় ভা‌বি ব‌লে ডে‌কে‌ছি কী? তাহ‌লে! আমি তোমায় ভা‌লোবা‌সি আর তোমা‌কেও আমায় ভা‌লোবাস‌তে হ‌বে। দরকার হ‌লে আজ এক‌দি‌নের জন্যও হ‌লেও আমা‌কে তোমার ভা‌লোবাস‌তে হ‌বে।

হয়ত নি‌জের ভিত‌রের অমানুষ পশুটা জে‌গে উঠ‌ছি‌লো। তাই ভু‌লে গে‌ছিলাম কী কর‌তে যা‌চ্ছি। তনয়া আমায় ধাক্কা দি‌য়ে স‌রি‌য়ে চর মে‌রে বস‌লো। তখন পা‌শে থাকা কাঁ‌চের ফুলদা‌নিটা নি‌চে প‌রে ভে‌ঙে যায়। আমি ওকে আবার ধর‌তে গে‌লে ও পালা‌তে চাই‌লো, কিন্তু ফ্লো‌রে হয়ত পা‌নি ছি‌লো, তা‌তে স্লিপ কে‌টে পিছ‌নের দেয়া‌লে ওর মাথায় আঘাত লা‌গে। আর ও কোন ম‌তে মাথা দাড় ক‌রি‌য়ে দাড়া‌তে চাই‌লে হয়ত মাথা ঘু‌রে নি‌চে প‌রে যায়, সেখা‌নে ফুলদা‌নির কাঁচগু‌লো ছি‌লো, যেগু‌লো তনয়ার পি‌ঠে ঢু‌কে যায়। ঘটনা এত দ্রুত ঘটলো যে আমি বুঝ‌তে পার‌ছিলাম না কি কর‌বো। তনয়া ক‌ষ্টে ছটফট কর‌ছি‌লো। ওর কষ্টটা আমি অনুভব কর‌ছি‌লাম কিন্তু কী কর‌বো ভে‌বে প‌া‌চ্ছিলাম না! ভাবলাম হস‌পিটা‌লে নি‌য়ে যা‌বো, কিন্তু তখন জানালার বাই‌রে চোখ যে‌তে দেখলাম তুই বাইক পার্ক কর‌ছিস। তাই তোর বি‌ল্ডিং এ ঢোকার আগেই ভ‌য়ে পা‌লি‌য়ে গে‌ছিলাম। আর তারপর বা‌কিটা তো তুই জা‌নিস!

এতক্ষন আয়া‌জের কথা শু‌নে আয়া‌তের যে‌নো নিশ্বাস নি‌তে কষ্ট হ‌চ্ছি‌লো। ক‌ষ্টে ম‌নে হয় বুকটা ফে‌টে যা‌চ্ছে। নি‌জের ভাই‌য়ের এমন জা‌নোয়া‌রের মত রূপ যা ও কল্পনাও কর‌তে পা‌রে‌নি। অনেক ক‌ষ্টে নি‌জে‌কে সাম‌লে বলল,
__আ‌মি আগেই জানতাম তনয়ার অবস্থার জন্য তুই দায়ী। আয়াজ চোখ বড় বড় ক‌রে আয়া‌তের দি‌কে তাকা‌লো।
আয়াত বলল, হ্যাঁ তনয়া‌কে হাসপাতা‌লে আনার সময় তনয়া ব‌লেছি‌লো এটা একটা এক‌সি‌ডেন্ট কিন্তু আয়াজ ভাইয়ার কার‌নে হ‌য়ে‌ছে। পু‌রোটা বল‌তে পা‌রে‌নি। ওর কষ্ট হ‌চ্ছি‌লো খুব। তারপরও ভাব‌ছিলাম হয়ত তুই ক‌রিস নি তনয়া হয়ত অন্য কিছু বল‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লো। কিন্তু পা‌শের বাসার আন্টির কাছ থে‌কে জান‌তে পারি সে না‌কি আমা‌র মত কাউ‌কে ফ্ল্যা‌টে ঢুক‌তে দেখ‌ছে। কিন্তু সে যে সময় বল‌ছে তখন আমি সেখ‌া‌নে ছিলাম না। আন্টি দূর থে‌কে তো‌কে দেখে আমি ভাব‌ছে কারন আমরা দু ভাই দেখ‌তে অনেকটা এক রকম। তখন আমার স‌ন্দেহটা অনেকটা দূর হ‌লো। তারপর ওখা‌নের একটা বাচ্চাও তো‌কে দেখ‌ছে। তাই কনর্ফম হলাম তনয়ার এমন ঘটনার সা‌থে তুই জ‌ড়িত।

আমি শুধু এত‌দিন এটা ভাব‌ছি‌লাম হয়ত তুই স‌ত্যিটা ‌নি‌জের মু‌খে স্বীকার কর‌বি। কিন্তু কর‌লি না। তাই তনয়ার জ্ঞান ফেরার মিথ্যা কথাটা সবাই‌কে বললাম। 
আমি ভাব‌ছিলাম তুই হয়ত নি‌জের নাম সাম‌নে আসার ভ‌য়ে তনয়ার উপর এ্যাটাক কর‌বি। কিন্তু তুই উল্টো অনুতপ্ত হ‌লি।

আয়াজ কিছু না ভে‌বে আয়া‌তের পা দু‌টো জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে কান্না কর‌তে কর‌তে ব‌লে,
__আমায় মাফ করে ‌দে ভাই। আমি আর এ চাপ নি‌তে পার‌ছি না। কত‌দিন যাবত আমি শা‌ন্তি‌তে নিশ্বাস নি‌তে পার‌ছি না। ভা‌লোবাসার মো‌হে আমি অমানুষ হ‌য়ে গে‌ছিলাম। তুই আমায় শা‌স্তি দে ভাইয়া। আমায় যা খু‌শি শা‌স্তি দে।

আয়াত চোখ মু‌ছে বলল,
__শা‌স্তি! হুমম। তুই তো আমায় বেঁ‌চে থাক‌তেও ম‌রে যাবার শা‌স্তি দি‌চ্ছিস। এক‌দি‌কে নি‌জের আপন ভাই অন্য দি‌কে নি‌জের স্ত্রী আর অনাগত সন্তান। তুই তো ভুল হ‌য়ে‌ছে ব‌লে মাফ চাই‌ছিস আমি কী কর‌বো?
জা‌নিস তনয়া‌কে যখন হস‌পিটা‌লে নি‌য়ে আস‌ছিলাম তখন ও বেঁ‌চে থাকার জন্য কেমন আঁকু‌তি কর‌ছি‌লো। বারবার বল‌ছি‌লো ওর বাঁচ‌তে ইচ্ছে ক‌রে। কখ‌নো নি‌জের হৃদয়টা‌কে নি‌জের চো‌খের সাম‌নে ছটফট কর‌তে দেখ‌ছিস? আমি দেখ‌ছি। কিন্তু কিছু কর‌তে পা‌রি‌নি তখন। আমার সাজা‌নো সংসারটা ভেঙে দি‌য়ে এখন মাফ চাই‌ছিস তুই? তনয়া‌কে ক‌ষ্টে ছটফট কর‌তে আমি দেখ‌ছি। তুই না।

__তুই আমায় মে‌রে ফেল নয়ত পু‌লি‌শে দি‌য়ে দে। তবুও আমায় শা‌স্তি দে।

__না তো‌কে আমি মার‌বো না, পু‌লি‌শেও দি‌বো না। এম‌ন কী কাউকে বল‌বোও না তনয়ার অবস্থার জন্য তুই দায়ী। যখন নি‌জের ভিত‌রে রোজ তুই গুম‌রে গুম‌রে মরবি, অনু‌শোচনার আগু‌নে রোজ দগ্ধ হ‌বি, তোর হৃদয়টা ততটা জ্বল‌বে যতটা আমার হৃদয় জ্বল‌ছে তখন তুই এক মুহূ‌র্তের জন্য শা‌ন্তি পা‌বি না, না মর‌তে পার‌বি না বাঁচ‌তে আর সেটাই হ‌বে তোর শা‌স্তি।
আয়াজ আয়া‌তের পা ধ‌রে কান্না কর‌তে লাগ‌লো। 
আর তোর সা‌থে কোন কথা আমি বল‌তে চাইনা। বেড়ি‌য়ে যা। নি‌জের ভাই ব‌লে ছে‌ড়ে দিলাম, আমি আমার মা‌য়ের বুক খা‌লি কর‌তে চাই না। যেমন ক‌রে তুই আমার স্ত্রী আর সন্তানকে মে‌রে আমার বুক খা‌লি কর‌লি। য‌দি কখ‌নো তনয়া উঠে তো‌কে মাফ ক‌রে ত‌বে তখন আমিও মাফ কর‌বো। একটা কথা শোন আয়াজ,

‌কে‌ড়ে নেয়া‌কে ভা‌লোবাসা ব‌লে না। ভা‌লোবাসা দি‌য়ে ভা‌লোবাসা‌কে অজর্ন করা‌কে ভা‌লোবাসা ব‌লে।

আর একটা কথাও বল‌লো না আয়াত।

‌কিছুক্ষন পর বা‌ড়ির সবাই আস‌তে আয়াত বলল, ডাক্তার ভুল ক‌রে অন্য এক ম‌হিলার জ্ঞান ফেরার কথা ওকে ব‌লে দি‌য়ে‌ছে আর আয়াত ভুল ভাব‌ছে যে তনয়ার জ্ঞান ফির‌ছে। সবাই যতটা আশা, খু‌শি আর আনন্দ নি‌য়ে এসে‌ছি‌লো নি‌মি‌ষেই তা মি‌লি‌য়ে গে‌লো। হতাস হ‌য়ে চো‌খের জল ছে‌ড়ে দি‌লো সবাই। অার আয়াত তনয়া‌র হাত ধ‌রে ওর পা‌শে ব‌সে রইল।

৬৪!!
দু বছর তিন মাস পর।
মেঘা পড়া শুনা কর‌ছে। তানভীর সা‌থে এন‌গেজ‌মেন্ট হয়ছে। দুজনার পড়া শেষ হ‌লে বি‌য়ে হ‌বে। তা‌মিম র‌শ্মির বি‌য়ে হ‌য়ে গে‌ছে। র‌শ্মি বর্তমা‌নে চার মা‌সের প্রেগ‌নেন্ট। আয়াত তা‌মিম র‌শ্মির সম্পর্ক ঠিক ক‌রে দি‌য়ে‌ছে। আর তান‌ভির ,লা‌বিবার সম্পর্ক‌তো আগেই ঠিক হ‌য়ে গে‌ছে।
সবাই নি‌জের জীবন সঙ্গী নি‌য়ে সু‌খে। কিন্তু আয়াত তনয়া?

আয়াত অফিস থে‌কে এসে বলল,
__স্য‌রি তনয়া।
মাফ ক‌রে দাও। আস‌লে আজ অফি‌সে একটা ঝা‌মেলা হ‌য়ে‌ছি‌লো যার কার‌নে দুপু‌রে আস‌তে প‌া‌রি‌নি। আয়াত এসে তনয়ার বিছানার পা‌শে ব‌সে অব‌চেতন তনয়ার কপা‌লে চু‌মো খে‌য়ে বলল, কেমন আছো আমার হৃদয়টা?

কিন্তু তনয়া কোন উত্তর দি‌তে পার‌বে না। সে নিস্তব্ধ, র্নি‌লিপ্ত সেই দু বছর পাঁচ মাস ধ‌রে। এখনও তনয়া কোমায়ই আছে। আয়াত তনয়া‌কে নি‌জের বা‌ড়ি নি‌য়ে এসে‌ছে। যে, বা‌ড়ি‌তে তনয়া নববধূ বে‌শে আয়া‌তের কো‌লে চ‌ড়ে আসার কথা ছি‌লো সে বা‌ড়ি‌তে তনয়া হাসপাতা‌লের স্টেচা‌রে ক‌রে এসে‌ছে। এর থে‌কে দুঃ‌খের হয়ত কিছু নেই।

তনয়ার খেয়াল আয়াতই রা‌খে। একজন পারমা‌নেন্ট নার্স রাখা আছে, সে কেবল দি‌নে তনয়ার খেয়াল রা‌খে। আয়া‌তের মায়ের তনয়ার উপর মা‌ঝে মা‌ঝে বড্ড রাগ হয়। কিন্তু আয়া‌তের জে‌দের কা‌ছে কিছু বল‌তে পা‌রেনা। মা‌ঝে মা‌ঝে তার ইচ্ছা ক‌রে তনয়া‌কে মে‌রে ফেল‌তে কিন্তু এত‌দি‌নে সে এটা বু‌ঝে গে‌ছে তনয়া ম‌রে গে‌লে আয়া‌তের বাঁচা অসম্ভব। নি‌জের ছে‌লের ভা‌লোর জন্যও হ‌লেও তি‌নি চান তনয়া সুস্থ হ‌য়ে উঠুক। মা তো তাই সবসময় নি‌জের সন্তা‌নের সু‌খের কথা ভা‌বে। মা‌য়েরা এমনই হয় সন্তা‌নের সু‌খের কথা ভাব‌তে গি‌য়ে অনেকসময় বি‌বেগশূণ্য হ‌য়ে প‌রে।

সবাই সুখী আর সবার ম‌তে আয়াত তনয়া খুব দুঃখী। কিন্তু আয়া‌তের ম‌তে ওরা পৃ‌থিবীর সব‌চে‌য়ে সুখী মানুষ। নার্স‌কে ডাক দি‌য়ে আয়াত বলল,
__তনয়ার ড্রেস কেন বদলে দেন‌নি?

__‌রোজ তো আপ‌নি বদলান তাই।

__‌কেন আপ‌নি এক‌দিন পা‌রে না বদলা‌তে। দুপুর থে‌কে এক ড্রেস প‌রে আছে। তনয়া নোংড়া ভা‌বে থাক‌তে পা‌রে না। আপনারা কেউ আমার তনয়ার খেয়াল রাখ‌তে পা‌রেন না। জাস্ট গেট লস্ট।

নার্স চ‌লে যে‌তেই আয়াত তনয়া‌কে আল‌তো ক‌রে তু‌লে নি‌জের বু‌কের সা‌থে ঝাপ‌টে ধরলো। তারপর খুব সাবধা‌নে তনয়া‌কে ধ‌রে ওর গা‌য়ের জামাটা খু‌লতেই আয়া‌তের চোখ বে‌য়ে ক‌য়েক ফোঁটা জল তনয়ার কাঁ‌ধে পড়‌লো। তখন কিছু একটা চমৎকার হ‌লো, তনয়া চো‌খের পাতা নাড়ালো, ওর চোখের কোন বে‌ঁয়ে জল পড়‌ছে। তনয়া যতই অব‌চেতন থাকুক না কেন ওর আয়া‌তের হৃদ‌য়ের ডাক ও ঠিক শুন‌তে পা‌রে।

ডাক্তার বলছে তনয়ার শরীরের অবস্থা দিন দিন উন্নত হ‌চ্ছে। এরকম রি‌কোভার করলে খুব শিঘ্রই তনয়া সুন্থ হ‌য়ে উঠ‌বে। আর বা‌কিটা আল্লাহর ইচ্ছা।
আয়াত তনায়ার শরীরটা মু‌ছে দি‌য়ে ড্রেস বদ‌লে বিছানায় শু‌য়ে দি‌লো। তনয়ার হাতদু‌টো ধ‌রে হা‌তের পাতায় হাজা‌রো চু‌মো একে দি‌য়ে বলল,

__আ‌মি জা‌নি তু‌মি খুব শিঘ্রই ঠিক হ‌বে। আমার ম‌নের তীব্র বিশ্বাস এটা।

দরজায় ছোট ছোট হাত দি‌য়ে টোকা দি‌লো। আয়াত দরজা খু‌লে দে‌খে অন‌ন্দিতা মা‌নে আয়াত তনয়ার দেড় বছ‌র (প্লাস) মে‌য়ে। লাইফ সা‌পোর্ট সি‌স্টে‌মে রে‌খে যা‌কে সাত মাস বয়‌সে পৃ‌থিবীর আলো দে‌খি‌য়ে‌ছি‌লো। ডাক্তার‌দের জন্য এটা একটা বড় চ্যা‌লেজ্ঞ ছি‌লো। কিন্তু ডাক্তাররা ত‌া‌তে সফল হ‌য়ে‌ছে।

‌দেড় বছ‌রের অন‌ন্দিতা গু‌টি গু‌টি পা‌য়ে হে‌ঁটে বেড়ায়। আধো আধো ভাষায় কথা ব‌লে। অন্দিতা‌কে কো‌লে নি‌য়ে আয়াত আদর ক‌রে তনয়ার পাশে বস‌লো। অন‌ন্দিতা তনয়ার পা‌শে গি‌য়ে ওর বু‌কে মাথা রে‌খে শু‌য়ে পর‌লো। বাচ্চারা আর কাউ‌কে না চিন‌লেও মা‌য়ের গন্ধ ঠিকভা‌বে চি‌নে। 
আয়াত ভাব‌ছে, তনয়া হয়ত জা‌নেই না ওর আর আমার সন্তান পৃ‌থিবীর আলো দে‌খে‌ছে। আচ্ছা তনয়া কী নি‌জের সন্তা‌নের জন্য একবার উঠ‌তে পা‌রেনা। উঠে একবার‌তো আমায় বল‌তে পা‌রে মিঃ বস তু‌মি বড্ড পা‌জি। বড্ড জালাও আমায়। 
একবারও ব‌লোনা তনয়া।

আয়াতও অন‌ন্দিতার দেখা‌দে‌খি তনয়ার পা‌শে শু‌য়ে পড়‌লো। তনয়ার হাতটা নি‌জের বু‌কের উপর নিয়ে বলল, খুব ইচ্ছা ক‌রে তোমার মাথাটা বু‌কে নি‌য়ে দি‌নের পর দিন রা‌তের পর রাত কা‌টি‌য়ে দি। খুব ইচ্ছা ক‌রে তোমার পছ‌ন্দের জায়গাগু‌লো‌তে তোমা‌কে নি‌য়ে ঘু‌রে ঘু‌রে বেড়াই। খুব ইচ্ছ‌া ক‌রে, ভরা পূ‌র্ণিমার রা‌তে তোমায় কোলে নি‌য়ে পিছ‌নের বাগা‌নে হাঁট‌তে। তু‌মি অপলক চোখে তা‌কি‌য়ে থাক‌বে আমার দি‌কে। আর আমি ঘোর লাগা চো‌খে তোমার নেশায় বুদ হ‌বো। কিন্তু গত দু বছর পাঁচ মাস যাবত ইচ্ছা গু‌লো ইচ্ছাই র‌য়ে যায়। তোমার অভিলাষপানা তু‌মি আমার ভিত‌রেও ছ‌ড়ি‌য়ে দি‌য়ে‌ছো। তু‌মি আজও অভিলাষী কিন্তু তোমার অভিলাষ গু‌লো অবেলার হ‌য়েই র‌য়ে গে‌লো।

রাত এগা‌রোটা,
অন‌ন্দিতা রাতে ওর দা‌দির বুকে ঘুুম‌‌িয়ে পড়‌ছে। আয়া‌তের মা‌য়ের পৃ‌থিবী জু‌রে এখন শুধু অন‌ন্দিতা। অন‌ন্দিতা হবার কথা শোনার পর তি‌নি রোজ নামাজ প‌ড়ে তনয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া চায়। নামাজ প‌ড়ে তনয়ার কপা‌লে দোয়া প‌ড়ে ফু দেয়। তি‌নি এখন ম‌নে প্রা‌ণে তনয়ার সুস্থতা চায়। হ্যাঁ মা‌ঝে মাঝে আয়া‌তের কষ্ট দে‌খে রাগ হয় তনয়ার উপর। কিন্তু অন‌ন্দিতার ফুটফু‌টে চেহারা দেখার পর রাগ নি‌মি‌ষেই ভা‌লোবাসায় প‌রিনত হয়।

আয়াজ নি‌জে‌কে সম্পূর্ণ রুম বন্ধী ক‌রে ফেল‌ছে। অনু‌শোচনায় রোজ দগ্ধ হ‌য়ে জ্বল‌ছে আয়াজ। কেউ তার কারনটা জা‌নে না। আয়াত গত দু বছর পাঁচ মা‌সে এক বারও আয়া‌জের সা‌থে কথা ব‌লে‌নি।

৬৫!!
রাত একটা
আয়াত একটা গ‌ল্পের বই প‌ড়ে তনয়া‌কে শুনা‌চ্ছে। তারপর তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে বলল,
__বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগ‌ছে তনয়া। তোমা‌কে খুব বু‌কে নি‌তে ইচ্ছে কর‌ছে। 
আয়াত তনয়া‌কে আল‌তো ক‌রে তু‌লে নি‌জের বু‌কে তনয়ার মাথা ঠেকা‌লো। তনয়া চো‌খের কোন বে‌য়ে জল পড়‌ছে। তনয়া এখন বুঝ‌তে পা‌রে সব, আয়া‌তের আর অন‌ন্দিতার স্পর্শ পে‌লে হাত পা হালকা নাড়ার চেষ্টা ক‌রে। তনয়ার খুব ইচ্ছা ক‌রে বল‌তে আয়াত খুব ভা‌লোবা‌সি তোমায়। আয়াত তনয়ার কা‌নের কা‌ছে মুখ নি‌য়ে আস্তে ক‌রে বল‌লো,
‌তোমায় বল‌তে হ‌বে না আমি জা‌নি তু‌মি আমায় ভা‌লোবা‌সো। আমিও তোমায় খুব ভা‌লোবা‌সি অভিলাষী।
একটা ক‌বিতা শুন‌বে তনয়া?

 

অ‌বেলায় এসে‌ছি‌লে ব‌লে কি
এভা‌বে চ‌লে যা‌বে?
প্রনয় তো হ‌য়ে‌ছি‌লো,
ত‌বে কেন দি‌লে বি‌চ্ছে‌দের ছোয়া?
ভা‌লো তো তু‌মিও বে‌সে‌ছি‌লে,
ত‌বে কেন আজ নীরব হ‌লে?
বু‌কে তো তু‌মিই ছি‌লে
ত‌বে কেন আজ চ‌লে যে‌তে চাই‌ছো?
ত‌বে কী ভা‌লোবা‌সো‌নি আমায়!
‌মিথ্যা ছি‌লো তোমার প্রনয় কথা!
ত‌বে কেন কা‌ছে টে‌নে‌ছি‌লে,
ভা‌লোবাসার নতুন পৃ‌থিবী দে‌খি‌ছি‌লে
মানলাম তু‌মি অভিলাষী!
তাই ব‌লে কী তোমার অভিলা‌ষে আমায় কাঁদা‌বে।
‌কেন হ‌লে অভিলাষী?
না হয় আমায় সা‌থে নি‌তে,
নাহয় তোমার প্রন‌য়ে আমি গা ভাসাতাম
ত‌বে কেন হ‌লে তু‌মি অবেলার অভিলাষী?
কেন কর‌লে অবেলার অভিলাষ!

#সাথী

 

ভা‌লোবাসার অনুভূ‌তির কোন নাম, ভাষ‌া, গন্ধ হয় না। শুধু একে অপ‌রের অস্তি‌ত্বে বিরা‌জিত থা‌কে। ভা‌লোবাসা অভিলা‌ষে অভিলাষী মানুষগু‌লো কখ‌নো বেলা অবেলার খেয়াল ক‌রে না। ভা‌লোবাসার কোন অভিলাষ অবেলার হ‌তে পা‌রে না। আর হোক না অবেলার অভিলাষ তা‌তে কি? ভা‌লোবাসার অভিলাষ তো অবেলায়ও অনেক মধুর হয়।

সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*