অবহেলিত জীবন [১ম পর্ব]

লেখকঃ মেহেদী হাসান

আজ দীর্ঘ 11 বছর পর আমি নিজের শহরে যাচ্ছি ৷ নিজের মনের ভীতর কেমন একটা আলাদা ফিলিংস কাজ করছে আবার কেমন একটা ভয় কাজ করছে৷ অনেক বছর পর নিজের শহরে যাচ্ছি ৷ যেখানে আমার শৈশব কেটেছে ৷ আমার মা বাবা ভাই বোন সবাই আছে ৷ কিন্তু আজ কোন কারনে সবার থেকে আমি আজ আলাদা ৷

এবার আমার পরিচয় টা দিয়ে নিই ৷ আমি মেহেদী হাসান ৷আমি এখন পুলিশে চাকরি সাবেক ইন্সেপেক্টার পদে চাকরি করি ৷ আমার ট্রনস্ফারের কারনে আজ নিজের শহরে আসা ৷

অবশ্য আমি নিজেই এখানে ট্রন্সফার নিয়েছি ৷ শুধু মাত্ত আমার ছোট বোনের জন্য যাকে আমি নিজের থেকেও বেশি ভালবাসতাম ৷ যাক এবার গল্পে আসা যাক ৷

আমার পরিচয় দিতে দিতে (…………….) মডেল থানায় চলে আসলাম ৷ তারপর সবাই আমাকে স্বাগতম জানালেন ৷ তারপর কিছু কথাবার্তা বলে নিজের কেবিন আর সব কাজ বুঝে নিলাম ৷

এখন আর বাইরে যাবনা জার্নি করে শরীর ক্লান্ত হয়ে আছে তাই এখন ঘুমাব কাল সকালে নিজের এলাকায় যাব ঘুরতে ৷

পরেরদিন সকালে একটা সিভিল ড্রেস পড়ে বাইক নিয়ে রওনা দিলাম ৷ থানা থেকে আমাদের গ্রামে পৌছাতে 20 মিনিট সময় লাগে ৷

আমাদের গ্রামের ভিতর প্রবেশ করলাম ৷ গ্রামটা অনেক চেন্জ হয়ে গেছে এই 11 বছরে ৷ কিছুদূর আসতেই একটা বড় বাড়ি চোখে পড়ল ৷ আর আমার মনের ভীতর যে পুরানো কষ্ট লুকিয়ে আছে সেগুলো আবার মনের অজান্তে বের হয়ে আসল ৷ এভাবে কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে যেই চলে আসতে যাব তখনি আমার চোখ গেল ছাদের উপর ৷

দেখি একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে সাদা একটা ড্রেস পড়ে ৷ চেহারাটা ভালভাবে বুঝা যাচ্ছে না ৷ দেখি মেয়েটাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ আমি আর কিছু না ভেবে বাইক নিয়ে ওখান চলে আসলাম ৷

কিছুদুর আসতেই আমার এক চাচাত ভাইয়ের সাথে দেখা ৷ আমি সাথে সাথে ব্রেক করলাম ৷ সে মনে হয় আমাকে চিনতে পারেনি ৷ আমি তাকে ডাক দিলাম ৷

আমিঃ এই যে ভাইয়া একটু শুনেন ৷

রাজুঃ জ্বী বলেন কি সাহায্য করতে পারি ৷【আমার চাচাত ভাইয়ের নাম】

আমিঃ ভাইয়া কেমন আছো ৷

রাজুঃ জ্বী ভাই ভাল আছি কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না ৷

আমিঃ ভাইয়া আমি মেহেদী ৷

তারপর রাজু ভাই আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ৷ তারপর সোজা আমার কাছে এসে জড়িয়ে ধরল ৷

রাজুঃ কোথাই ছিলি ভাই আমার তোকে আমরা কত খুজেছি ৷ তোর জন্য চাচা চাচি কত কান্না করেছে জানিস ৷ তোর জন্য এখোনো তারা চোখের পানি ফেলে ৷

আমিঃ সে অনেক কথা ভাইয়া পরে একদিন বলব ৷ আগে বল আমার মা বাবা কেমন আছে ৷ আর ভাইয়া কেমন আছে ৷

রাজুঃ হুমমম সবাই ভাল আছে কিন্তু তারা তোর জন্য এখনো কষ্ট পাই ৷

আমিঃ ভাইয়া আমার কলিজার টুকরা টা কেমন আছে ৷ 【আমার পিচ্চি বোনের কথা বলছি】

রাজুঃ হুমমম তোর পিচ্চিটা এখন আর আগের মত নেই ৷ সবসময় চুপ করে রুমে থাকে ৷ আর তোর পিচ্চি বোন টা অভীমান করে তোর মা বাবা আর ভাইয়ার সাথে কথা বলেনা ৷ তুই চলে যাওয়ার পর কারো সাথে কথা বলেনা ৷ সবসময় মন মরা হয়ে থাকে ৷

ভাইয়ার কথা শুনে খুব খারাফ লাগলো যে পাগলি টা কত ভালবাসে আমাকে ৷

ওহহহহ আমার পিচ্চিটার নাম টাই তো বলা হয়নি ৷ আমার পিচ্চি বোন টার নাম রিয়া ৷

রাজুঃ চল মেহেদী বাসাই চল তোকে দেখে চাচা চাচি অনেক খুশি হবে ৷

আমিঃ না ভাইয়া আমি যাব না যেখানে আমাকে বিনা দোষে আমাকে তাড়িয়ো দিয়েছে সেখানে আমি যাব না ৷ আমাকে ভুল বুঝে আমাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে সেখানে গিয়ে আমি কি করব ৷ আর এমনি তে মা বাবা আমাকে ভালবাসেনা সবসময় অবহেলা করত ৷

তুমি তো সব জানতে ভাইয়া যে আমার মা বাবা ভাইয়া আমার সাথে কেমন ব্যবহার করত ৷ কিন্তু এখন আমি নিজের পায়ো দাড়িয়েছি ভাইয়া ৷

রাজুঃ হুমমম ভাই সব জানি তুই কত কস্ট করেছিস ৷ তা তুই এখন কি করিস কোন চাকরি করিস নাকি ৷

আমিঃ হুম ভাইয়া আমি পুলিশে চাকরি করি ৷ তোমাদের এই থানায় ট্রান্সফার হয়ে এসেছি ৷

রাজুঃ কি বলিস ভাই তুই চাকরি কীভাবে পেলি আর কিভাবে সম্ভব ৷

আমিঃ হুমমম ভাই পরে বলব সব কাহিনি ৷ এখন একটু আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি ৷ আর ভাইয়া আমি যে এসেছি আপনি কাউকে বলবেন না ৷ আমি এসেছি তা কাউকে বলবেন না ৷ আমি আস্তে সবাই কে জানিয়ে দেব ৷প্লিজ আপনি কাউকে বলবেন না ৷

আর ভাইয়া যদি কোন সমস্যা হয় তাহলে আমাকে বলবেন আর আমার নাম্বার টা রাখেন যখন কোন দরকার হয় আমাকে বলবেন ৷

তারপর আমার নাম্বার দিয়ে তলে আসলাম আমাদের বাসার দিকে ৷ দূড় থেকে দেখছি আমাদের বাসাটা অনেক চেন্জ হয়েছে বাসাটা ৷

বাসাটা ছাদ করেছে রং করেছে অনেক উন্নতি হয়েছে বাড়িটার ৷

তারপর চলে আসতে তখন দেখি আমার ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড শাকিল দাড়িয়ে আছে ৷ আমি তার পাশে গিয়ে বললাম ৷

আমিঃ আপনার নাম শারিল তাই তো ৷

শাকিলঃ জ্বী কিন্তু আপনি কে ৷

আমিঃ পুলিস চল আমার সাথে তোর নামে এরেস্ট ওয়ারেন্ট রয়েছে ৷

শাকিল আমার দিকে তাকিয়ে দেখে আমার কোমরে একটা বন্ধুক দেখে ভয় পেয়ে কোন কথা না বলে সোজা বাইকে উঠে বসল ৷

আমি শাকিল কে নিয়ে সোজা একটা চায়ের দোকানে দাড়ালাম ৷

শাকিলঃ কি ব্যাপার আপনি এখানে কেন দাড়ালেন ৷

আমি কোন কথা না বলে শাকিল কে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম ৷

কি রে ভাই আমাকে চিনতে পারলিনা ৷ আমি মেহেদী তোর বন্ধু ৷

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিল ৷ তারপর তাকে সবকিছু খুলে বললাম ৷

আমিঃ আচ্ছা একটা কাজ করে দিতে পারবি ৷

শাকিলঃহুমমম বল এতে অনুমতি নিচ্ছিস কেন ৷

আমিঃ ভাইয়া কি করে আমার পাগলি বোন টা কোথায় পড়ে কি করে সবকিছু আমাকে বলবি ৷ আর আমি এসেছি তা কেউ যেন না যানে ৷

তারপরে তার সাথে আরো কিছু কথা বলে আমি তাকে বাসাই নামিয়ে দিয়ে আবার অফিসে চলে আসলাম ৷ এভাবে চলে গেল দুইদিন ৷

তারপর শাকিল আমার মা বাবা ভাইয়া পিচ্চি বোন টার সব খোজ দিল কোন কলেজে পড়ে সব খোজ খবর দিল ৷

পরের দিন আমি কলেজ ছুটির টাইমে কলেজের সামনে চলে গেলাম আমার পিচ্চি বোন টারে দেখব বলে ৷ কিছুক্ষন পরে কলেজ ছুটি হল আমি আর শাকিল দাড়িয়ে আছি কলেজের সামনে ৷

তারপর শাকিল রিয়া বলে ডাক দিল একটা মেয়ে আমাদের দিকে আসল ৷ আমি একভাবে তাকিয়ে আছি ৷ আমার পিচ্চি বোন টা অনেক বড় হয়ে গেছে ৷ আর অনেক সুন্দর হয়েছে ৷

রিয়া আমার দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে মনে হয় আমাকে অল্প অল্প চিনতে পারছে ৷

রিয়াঃ হ্যা শাকিল ভাই কি করতে ডাকছো ৷ আর ইনি কে ৷

শাকিলঃ দেখোতো চিনতে পারিস কিনা ৷

রিয়াঃ চেহারাটা কেমন পরিচিত লাগছে কিন্তু মনে করতে পারছিনা ৷

আমিঃ ওই পিচ্চি তোর ভাইয়া কে চিনতে পারছিস না ৷ এতটা পরিবর্তন হয়ে গেছি আমি যে তোর পাগল ভাইটাকে চিনতে পারছিস না ৷ 【কান্না করে】

রিয়া আমার কথা শুনে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখল ৷

তারপর রিয়া ভাইয়া বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিল ৷

রিয়াঃ ভাইয়া তুমি এতোদিন কোথায় ছিলা ৷ তোমার এই পিচ্চি বোনটার কথা একবারো মনে পড়েনি ৷ তুমি আমাকে না বলে কেন চলে গিয়েছিলা ৷ তুমি যান তুমি চলে যাওয়ার পর আমি খুব একা হয়ে গিয়েছিলাম ৷

তুমি যান তোমার জন্য আমি মা বাবা আর ভাইয়ার সাথে ঠিকমত কথা বলিনা ৷

আমিঃ আপুরে তোর ভাইকে তুই মাপ করে দে তোকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ৷ তোকে ছেড়ে আর কোন জাইগায় যাবনা ৷

রিয়াঃ হুমমম তুমি আমাকে ছেড়ে আর যাবেনা আর চলে গেলে আমাকে সাথে করে নিয়ে যাবে ৷ আমি থাকতে চাইনা মা বাবার সাথে ৷ যারা বিনা দোষে আমার ভাইয়াকে আঘাত করে ৷ বিনা অপরাধে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তাদের সাথে আমি থাকবনা ৷ আমি তোমার সাথে চলে যাব ভাইয়া ৷

আমিঃ ধুর পাগলি আমার কোন কষ্ট হয়নি তারা তো আমাদের মা বাবা যতই অন্যয় করুক সেটা তো আর জেনেশুনে করিনি ৷

রিয়াঃ ভাইয়া চল বাড়ি চল ৷

আমিঃ না পাগলি ওখন যাবনা আর কি করতে যাব বল ৷ আমার চেহারা দেখলে তো মা বাবা মরা মুখ দেখতে হবে ৷ আমার চেহারা তাদের দেখাবনা ৷ আর তুইও তাদের বলবিনা যে আমি এসেছি ৷

শাকিল তুই রিয়া কে বাড়ি পৌছায়ে দিয়ে আয় ৷ আমি পরে তোর সাথে দেখা করব ৷

রিয়াঃ ভাইয়া তুমি কোথায় থাক আর কি কর তুমি ৷

আমিঃ সেইটা যাওয়ার সময় শাকিলের কাছ থেকে শুনে নিস ৷

তারপর যেই চলে আসতে যাব তখন শাকিল বলল মেহেদী ওই দেখ রিমি চিনতে পারছিস ৷

আমি এবার রিমির কথা শুনে আমার বুকের মধ্যে একরকম ব্যাথা টের পেলাম ৷

এই সেই মেয়ো যার জন্য আমার জীবন থেকে 11 টা বছর জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ৷

এবার আমি রিমির দিকে তাকিয়ে দেখি রিমি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে ৷ আগের থোকে সুন্দর হয়েছে আর কিছুটা চিকন হয়ে গেছে ৷

তারপর রিমির সাথে আমার চোখাচোখি হল আর আমি চোখ নামিয়ে নিলাম ৷ রিমি আমার দিকে তাকিয়ে আছে হয়ত কিছুটা চেনার চেষ্টা করছে ৷

রিমিকে দেখে আমার ভীষন রাগ হতে লাগল ৷ আমি ওখান থেকে চলে আসলাম ৷

আর আমার পুরানো কথা মনে পড়ে গেল ৷ আর চোখ দিয়ে অঝর ধারাই পানি পড়তে লাগল ৷

কি দোষ করেছিলাম আমি যে আমাকে এত বড় শাস্তি দিল ৷ মা বাবার কাছে আমি একজন অভীশপ্ত ছেলে ছিলাম ৷

যাকোনদিন মা বাবার ভালবাসা পায়নি ৷ শুধু অবহেলা পেয়েছি ৷ শুধু ছোট পিচ্চি বোন টা আমাকে পাগলের মত ভালবাসত ৷ ছোট থেকে মা বাবার অবহেলা নিয়ে বড় হয়েছি ৷ এসব কথা ভাবছি আর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে ৷

নিজের থেকেও যাকে ভালবাসতাম সেও আমাকে অবহেলা করে কষ্ট দিত ৷ খুব খারাফ লাগত সেই সময় ৷

খুব কষ্ট হয় এসব কথা মনে পড়লে ৷ এই 11 বছর যে পরিমান কষ্ট হয়েছে তা শুধু আমি যানি ৷ প্রতি রাতে মা বাবার কথা মনে পড়লে খুব কান্না আসতো ৷

এভাবে পুরানো কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি নিজেই জানিনা ৷

…………………..চলবে ……………………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*