অঙ্ক টিচার [Full]

লেখিকাঃ শারিমিন আক্তার সাথী

প্রায় দু বছর পর হঠাৎ ক‌রে তনয়া তার অঙ্ক টিচার ম‌া‌নে আয়াত‌কে দেখ‌লো।

‌দে‌খে পু‌রো হা হ‌য়ে গে‌লো। কখনো ভা‌বে‌নি ক‌লে‌জে উঠে প্রথম দিন প্রথম ক্লা‌সে এভা‌বে আয়াত স্যার‌কে দেখ‌তে পা‌বে। তনয়া এবার ইন্টার প্রথম ব‌র্ষে।

আয়াত‌কে দেখার সা‌থে সা‌থে তনয়ার হাতটা নিজের বাম গা‌লে চ‌লে গে‌লো। দু বছর আগে চ‌ড়ের দাগ বা ব্যাথা কোনটাই এখন নেই কিন্তু ম‌নের ম‌ধ্যে চ‌ড়ের দাগ বা ব্যাথা ঠিকই র‌য়ে গে‌ছে কিছুটা লজ্জার কিছুটা ভ‌য়ের ব্যাথা। তাই নিজের অজা‌ন্তেই হাতটা গা‌লে চ‌লে গে‌লো।

আয়াতও যে তনয়া‌কে দে‌খে কম অবাক হ‌য়ে‌ছে তা কিন্তু না! তনয়ার মত আয়া‌তের চো‌খে মু‌খেও বিস্ময়! আয়াতের দুবছর আগের ঘটনা ম‌নে প‌রে গে‌লো। আয়াত কখ‌নো ভা‌বে‌নি তনয়া‌কে আবার দেখ‌তে পা‌বে।

ক‌য়েক মাস আগেই আয়াত এ ক‌লে‌জে জ‌য়েন ক‌রে‌ছে অংক টিচার হিসা‌বে।

আয়াত তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে দে‌খে পাগ‌লি মে‌য়েটা নি‌জের গা‌লে হাত দি‌য়ে রে‌খে‌ছে। সেটা দে‌খে আয়াত নি‌জের অজা‌ন্তেই হে‌সে ফেল‌লো। তনয়া আয়া‌তের হা‌সিটা দে‌খে বুঝ‌তে বা‌কি রই‌লো না আয়াত কেন হাস‌তে‌ছে? তবুও তনয়া এক ধ্যা‌নে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রই‌লো।

আয়াত সবার সা‌থে কথা বল‌তে বল‌তে তনয়ার কা‌ছে এসে বল‌লো—–

আয়াতঃ কি ব্যাপার তু‌মি গা‌লে হাত দি‌য়ে আছো কেন?

আয়া‌তের কথায় তনয়ার ধ্যান ভাঙ‌লো।

তনয়াঃ মা‌মামম মা‌নে?

আয়াতঃ কি বললা? ঠিক শু‌নি নাই জো‌ড়ে ব‌লো?

তনয়াঃ গ‌াল থে‌কে হাতটা স‌রি‌য়ে কিছুনা স্যার।

আয়াতঃ তাহ‌লে গা‌লে হাত দি‌য়ে আছো কেন? দা‌ঁতে ব্যাথা কর‌ছে না‌কি? মুচ‌কি হা‌সি দি‌য়ে।

তনয়াঃ (বেটা বজ্জাত খোচা দি‌য়ে কথা ব‌লে আমার দাঁ‌তে না আমার ম‌নে ব্যাথা ক‌রে) (ম‌নে ম‌নে) না স্যার এম‌নি‌তেই গালে চ‌ুলকা‌চ্ছিল।

আয়াতঃ ওহ। তো এবার পড়ায় ম‌নো‌নি‌বেশ করি?

‌সো স্টু‌ডেন্ট আজ আপনা‌দের ক‌লে‌জে প্রথম ক্লাস। ক‌লে‌জের প্রথম দিন খুব সুন্দর হওয়া চাই। কারন এই দিনটা সারা জীবন ম‌নের পাতায় স্মৃ‌তি হ‌য়ে রে‌খে যায়।

অবশ্য অনে‌কের শকিং ‌বিষয় হ‌য়েও ম‌নে পাতায় স্মৃ‌তি হ‌য়ে র‌য়ে যায়।

তনয়া বুঝ‌তে পার‌ছে কথাটা আয়াত ওকে খোচা দি‌য়ে ব‌লে‌ছে। তাই ম‌নে ম‌নে বল‌ছে বেটা বজ্জা‌তের হা‌ড্ডি। কাটা ঘায়ে লব‌নের ছিটা দি‌চ্ছি। কই বাত নে‌হি। আমিও সু‌যোগ পা‌বো। তখন কড়ায় গন্ডায় বু‌ঝি‌য়ে দি‌বো তনয়া কি জি‌নিস? এখন আছি‌তো দুজন একই ক‌লে‌জে। হি হি হা হা।

আয়াতঃ ক‌লেজ লাইফ মা‌নেই মজা হই হুল্লর। কিন্তু সা‌থে সা‌থে পড়াশুনাও কর‌তে হ‌বে কিন্তু!

আর আমার প‌রিচয়টাতো পে‌য়েই গে‌ছেন? আমি আয়াত। আপনা‌দের ম্যাথ টিচার। আজ‌তো প্রথম ক্লাস তাই বে‌শি বক বক কর‌বো না। কারন আমি জা‌নি এটা আপনা‌দের অহস্য লাগ‌বে।

আ‌রে আমার নিজেরই‌তো টিচার‌দের বক বক শুন‌তে ইচ্ছা ক‌রে না তো আপনা‌দের কি বল‌বো?

আয়া‌তের কথায় ক্লা‌সের সবাই হে‌সে দি‌লো। এর ম‌ধ্যে একজন ছাত্র বল‌লো

——–স্যার কিছু ম‌নে না কর‌লে একটা কথা ব‌লি?

আয়াতঃ হ্যা ব‌লো। কিন্তু তার আগে তোমার নাম ব‌লো?

——–ফাহাদ!

আয়াতঃ ওকে ফাহাদ ব‌লো? কি বল‌বে?

ফাহাদঃ স্যার আপনা‌কে দে‌খে টিচার ম‌নে হয় না?

আয়াতঃ (হ‌ালকা হা‌সি দি‌য়ে) আচ্ছা! তো কি ম‌নে হয়?

ফাহাদঃ স্টু‌ডেন্ট এর মত লা‌গে!

আয়াতঃ আস‌লে আমি প্র‌ফেসনাল টিচার না। আমি এবার মার্স্টাস কর‌তে‌ছি।

ফাহাদঃ তাহ‌লে শিক্ষকতা কেন?

আয়াতঃ আস‌লে আমার এটা ভা‌লো লা‌গে। এটা‌তো একটা প্রাই‌ভেট ক‌লেজ আর ক‌লে‌জের প্রি‌ন্সিপাল আমার আঙ্কেল। তি‌নিই বল‌লেন যে যাতে ক‌লে‌জে এসে প্রাক‌টিস ক‌রি এতে আমার পিছ‌নের পড়াটা চর্চা থাক‌বে। ‌নিজের সময়ও কাট‌বে।

ফাহাদঃ কুল স্যার। তা কত দিন প্রাক‌টিস কর‌বেন স্যার।

আয়াতঃ এই বছর দুই। গল্প আর ইন‌ট্রোডাকসন‌তো অনেক হ‌লো এখন একটু পড়াশুনা ক‌রি!

তারপর আয়াত সামান্য কিছু পড়া‌লো। পু‌রো ক্লাসে তনয়া বার বার আয়া‌তের দি‌কে তাকা‌লো। যখন আয়া‌তের চো‌খে চোথ পড়‌তো চোখ না‌মি‌য়ে নি‌তো।

ক‌লেজ ছু‌টি আজ তাড়াতা‌ড়ি হ‌লো তাই তনয়া তাড়াতা‌ড়ি বা‌ড়ি চ‌লে যায়। বা‌ড়ি গি‌য়ে তনয়া সোজা নি‌জের রু‌মে গি‌য়ে শু‌য়ে পর‌লো।

তনয়া মাঃ তনয়া ফ্রেস হ‌য়ে খে‌তে আয়।

তনয়াঃ ভা‌লো লাগ‌ছে না‌তো প‌ড়ে খা‌বে‌া।

তনয়ার মাঃ আজব মে‌য়ে। ঠিক আছে।

তনয়া শু‌য়ে শু‌য়ে ভাব‌ছে ঠিক কিভা‌বে কি? পৃ‌থিবীটা স‌ত্যিই গোল। এখা‌নে হা‌রি‌য়ে যে‌তে চাই‌লে ঘু‌রে ফি‌রে ঠিক একই জায়গায় চ‌লে আস‌তে হয়।

কখ‌নো ভা‌বি‌নি আয়াত স্যা‌রের সা‌থে আবার দেখা হ‌বে। য‌দিও চাই‌লে দেখা কর‌তে পারা যে‌তো কিন্তু আমি নি‌জে থে‌কেই তা চাই‌নি। তা‌কে দেখ‌লে ভ‌য়ের থে‌কে বে‌শি লজ্জা লা‌গে। ‌যে আজব কান্ড ক‌রে‌ছিলাম তা‌তে লজ্জা হবারই‌তো কথা।

চলুন ঘু‌রে আসি দুবছর আগে—-

তখন তনয়া কেবল নবম শ্রেনীতে উঠে‌ছে। বিজ্ঞান বিভা‌গের ছাত্রী তনয়া। সে কার‌নে দু‌টো ম্যাথ। সাধারন গ‌নিত আর উচ্চতর গ‌নিত।

প্রথম প্রথম তনয়া বা‌কি বন্ধু‌দের সা‌থে স্কু‌লের কো‌চিং এ পড়‌তো কিন্তু বা‌ড়ি থে‌কে স্কুল বেশ দূ‌রে হওয়ায় স্কুল কো‌চিং একসা‌থে সামলা‌তে খুব কষ্ট হ‌তো। তনয়ার বাবা সেটা খেয়াল কর‌লেন। একমাত্র মে‌য়ে ব‌লে কথা! তি‌নি বল‌লেন তোর জন্য ঘ‌রে টিচার রে‌খে দি‌বো।

তারপর তনয়ার স্কু‌লের টিচা‌রের কা‌ছে গে‌লো কিন্তু তি‌নি বল‌লেন তার সময় হ‌বে না।

অব‌শে‌ষে তনয়ার বাবা তার বন্ধুর ছে‌লে‌ মা‌নে আয়াত‌কে বল‌লো যা‌তে তনয়াকে পড়ায়। আয়াত তখন অনার্স দ্বিতীয় ব‌র্ষে প‌ড়ে অঙ্ক নি‌য়ে। আয়াত অং‌কে ভিষন ভা‌লো। 
প্রথ‌মে আয়াত পড়া‌তে রা‌জি হয়‌নি। কারন আয়াদের অবস্থা খুব ভা‌লো। প্রাই‌ভেট পড়া‌নোর কান দরকার নাই। কিন্তু তারপর যখন আয়া‌তের বাবা পড়া‌তে বল‌লেন তখন আর না কর‌তে পার‌লো না।

প্রথম যে‌দিন আয়াত তনয়া‌কে পড়া‌তে গে‌লো। তনয়া‌তো আয়াত‌কে দে‌খে পুরো ক্রাস। কারন আয়াত দেখ‌তে একেবা‌রে চক‌লেট বয়।

তনয়া হা হ‌য়ে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রই‌লো।

আয়াতঃ হালকা কা‌শি দি‌য়ে তু‌মিই কি তনয়া?

তনয়াঃ জ্বি। আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন স্যার?

আয়াতঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভা‌লো তু‌মি?

তনয়াঃ খুব ভা‌লো। স্যার আপনা‌কে দে‌খে স্যার স্যার লা‌গে না!

আয়াতঃ আচ্ছা তাহ‌লে কেমন কেমন লা‌গে?

তনয়াঃ থাক বল‌লে মাইন্ড কর‌বেন বলার দরকার নাই।

আয়াতঃ ব‌লো মাইন্ড কর‌বো ন‌া!

তনয়াঃ আপনা‌কে একদম চক‌লেট বয় লা‌গে!

আয়াতঃ কিছুটা হা‌সি দি‌য়ে। আচ্ছা তাহ‌লে তোমা‌কেও তো চক‌লেট গার্ল লা‌গে। কারন তু‌মিও খুব কিউট।

আয়াত কথাটা এম‌নি বল‌লো কিন্তু তনয়ার ম‌নের ম‌ধ্যে তো এক কে‌জি লাড্ডু ফুট‌লো।

আয়াতঃ আচ্ছা তাহ‌লে পড়া শুরু ক‌রি?

তনয়াঃ ওকে!

আয়াত সপ্তা‌হে তিন‌দিন তনয়া‌কে পড়া‌তো। আয়াত যখন তনয়া‌কে পড়া‌তো তখন তনয়া প্রায়ই আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে থাক‌তো। আয়া‌তের চো‌খে চোখ পড়‌লেই না‌মি‌য়ে নি‌তো। ব্যাপারটা আয়াত খেয়াল কর‌লেও তনয়ার ছে‌লেমানু‌ষি ভে‌বে ইগ‌নোর কর‌তো। কিন্তু তারপরও আয়াতের খুব অস‌স্তি লাগ‌তো।

তনয়া অনেক ছে‌লে মানু‌ষি কর‌তো। আয়াত মা‌ঝে মা‌ঝে বকা দি‌লেও তনয়ার ছে‌লে ম‌নুষিটা ওর খুব ভা‌লো লাগতো। কিন্তু আয়াত কখ‌নো তনয়া‌কে সে নজ‌রে দে‌খে‌নি।

ধী‌রে তনয়ার কি‌শোরী মনটায় ভা‌লোবাসার একটা ছোট্ট ফুল ফো‌টে আর সে ফুলটার নাম দেয় #আয়াত

আয়াত তনয়ার হাবভাব দে‌খে কিছুটা আঁচ কর‌তে পার‌তো। তাই ভাব‌লো তনয়া‌কে ইনডায়রেক‌লি বুঝা‌তে হবে। কারন এ বয়‌সে এ ধ‌রেন কিছু হওয়াটা নরলাম। কারন বয়সটাই খারাপ। বে‌শি কিছু বল‌লে ব্যাপারটা উল্টা হ‌য়ে যে‌তে পারে। তাই অনেক ভে‌বে চি‌ন্তে তনয়া‌কে বল‌লো——

আয়াতঃ তনয়া তোম‌া‌কে কিছু কথা ব‌লি?

তনয়াঃ হ্যা স্যার ব‌লেন?

আয়াতঃ জা‌নো তনয়া মানু‌ষের জীব‌নে সব থে‌কে খারাপ বয়স কোনটা?

তনয়াঃ না‌তো? কোনটা স্যার?

আয়াতঃ তে‌রো থেকে আঠা‌রো বছর বয়সটা।

তনয়াঃ কেন স্যার?

আয়াতঃ তনয়া‌কে ঠিক কিভা‌বে বুঝা‌বে তাই ভাব‌তে‌ছে? তারপর বল‌লো।

এই সময় মানুষ ছে‌লে‌বেলা আর ম্যা‌চিও‌র বয়‌সের মাঝামা‌ঝি থা‌কে। এ বয়‌সে খারাপ জি‌নিসটা ভা‌লো আর ভা‌লো জি‌নিসটা‌কে খারাপ ম‌নে হয়। এ বয়‌সের কি‌শোর কি‌শোরী‌দের শিক্ষানীয় কথা আসহ্য লা‌গে।

এ বয়‌সে খারাপ জি‌নিসটা উপ‌রের চাক‌চিক্য দে‌খে তার প্র‌তি আর্কিষ্ট হয়ে ভুল ক‌রে কিন্তু যখন বুঝ‌তে পা‌রে ভুল কর‌ছে তখন করার মত আর কিছু থা‌কে না।

‌যে এ বয়‌সের ভ্রম থে‌কে নি‌জে‌কে বাঁচা‌তে পার‌বে তার জীবনটা অনেক সুন্দর হ‌বে।

‌দে‌খো এ বয়‌সে ভা‌লোলাগা জি‌নিসটা ম‌নের সা‌থে আষ্টে পি‌ষ্টে জ‌ড়ি‌য়ে যায়। তখন বোঝা যায় না কোনটা ভা‌লোলাগা আর কোনটা ভা‌লোবাসা। ভা‌লোলাগা আর ভা‌লোবাসার ম‌ধ্যে আলাদা একটা পৃ‌থিবী তৈরী হ‌য়ে যায়। যে পৃ‌থিবী‌তে প্রথম প্রথম ফু‌লের সমা‌রোহ থাক‌লেও কিছুদূর যে‌তেই দেখ‌বে ফুল গ‌ু‌লো ঝ‌রে গি‌য়ে সেখা‌নে কাটার উৎপত্তি হ‌য়ে‌ছে!

আ‌মি কি বল‌তে চা‌চ্ছি তু‌মি বুজেছো?

তনয়াঃ জ্বি স্যার।

আয়াতঃ কি বুঝলা?

তনয়াঃ আই লাভ ইউ।

আয়াতঃ (চোখ বড় বড় ক‌রে) হোয়াট?

তনয়াঃ হোয়াট না স্যার! উত্তরটা আই লাভ ইউ টু হ‌বে!

আয়াতঃ জাস্ট সেটাপ। আমি তোমা‌কে এতক্ষন কি বুঝালাম? সব কি তোমার মাথার উপর দিয়া গে‌ছে?

তনয়াঃ না স্যার। এক কান দিয়ো ডুক‌ছে অপর কান দিয়া বের ক‌রে গি‌য়ে‌ছি।

আয়াতঃ চুপ একদম চুপ। (ধমক দি‌য়ে) তোমাকে বললাম না এ বয়‌সে কখ‌নো ভা‌লোবাসা হয়না। এটা হয় ভ্রম নয় ভা‌লোলাগা।

তনয়াঃ নো স্যার আই রিয়া‌লি লাভ ইউ।

আয়াতঃ তোমার মত ইডি‌য়েট মে‌য়ে‌কে পড়া‌নো আমার পক্ষে সম্ভব না! গুড বাই। এই ব‌লে রাগ ক‌রে হন হনি‌য়ে চ‌লে গে‌লো আয়াত।

আর তনয়া হা হয়ে আয়া‌তের যাবার পা‌নে তাক‌িয়ে রই‌লো। আর ভাব‌তে‌ছে। কি এমন বললাম?

‌মে‌য়েরা প্র‌পোজ কর‌লে ছে‌লেরা আরো খু‌শি হ‌য়ে এক‌সেপ্ট ক‌রে আর এতো উল্টা।

প‌রোক্ষ‌নেই তনয়ার ম‌নে পড়‌লো আয়াত য‌দি বাবা‌কে ব‌লে দেয়? তাহ‌লে তো সর্বনাশ। তাছাড়া সাম‌নের মা‌সে প্রথম সাম‌য়িক পরীক্ষা। এখন নতুন টিচার কোথায় পা‌বো?

যাক নি‌জের ইগো বর্তমা‌নে ব্যা‌গে রে‌খে স্যার‌কে ফোন দি‌য়ে স‌্য‌রি ব‌লি। দে‌খি বেটা ঘ্যার‌তেরা মা‌নে কিনা?

এই ভে‌বে তনয়া আয়া‌কে ফোন দি‌লো। প্রথম ক‌য়েকবার রিং হ‌য়ে কলটা কে‌টে গে‌লো।

তারপর আয়াত ধর‌লো—

তনয়াঃ হ্যা‌লো———

-তনয়াঃ হ্যা‌লো স্যার!

আয়াতঃ হ্যা ব‌লো? (খুব রে‌গে)

তনয়াঃ (বেটা হট টেম্পা‌রেচার) ম‌নে ম‌নে। স্য‌রি স্যার।

আয়াতঃ স্য‌রি বল‌লে কাজ হ‌বে না। আমি তোমা‌কে আর পড়া‌বো না!

তনয়াঃ স্যার আমি আর কখ‌নো এমন কথা বল‌বো না। প্লিজ বাবা‌কে কিছু বল‌বেন না।

আয়াতঃ কিছুটা ভে‌বে ঠিক আছে।

তনয়াঃ তাহ‌লে কাল থে‌কে পড়া‌তে আসছেন?

আয়াতঃ নাহ। তোমার বাবা‌কে বল‌বো না, তাই ব‌লে যে তোমা‌কে পড়া‌বো তা কিন্তু না?

তনয়াঃ প্লিজ স্যার সাম‌নের মা‌সে আমার পরীক্ষা।‌ এখন নতুন টিচার কোথায় পা‌বো? আর বাবা‌কেই বা কি বল‌বো?

আয়াতঃ সেটা মাথার ম‌ধ্যে প্রেম পোকা ডোকার আগে ম‌নে ছি‌লো না?

তনয়াঃ স্য‌রি বললাম‌ তো! আর আপ‌নিই‌ তো বল‌লেন যে এ বয়‌সে ভুল হয়। তাহ‌লে আপনার কি উচিৎ না আমা‌র ভুলটা শুধ‌রে দেয়া?

আয়াতঃ এই মে‌য়ে তু‌মি‌তো দেখ‌ছি আমার কথায় আমা‌কেই ফা‌সি‌য়ে দিলা। ঠিক আছে কাল থে‌কে পড়া‌তে আস‌বো। ত‌বে একটা শ‌র্তে?

তনয়াঃ কি শর্ত স্যার?

আয়াতঃ এ ধর‌নের কোন দুষ্ট‌মি বা ফাইজলা‌মি আর কখ‌নো কর‌বে না! ঠিক আছে?

তনয়াঃ ঠিক আছে স্যার।
‌বেটা তো‌রে একবার বা‌গে পাই। তখন দেখ‌বি। (ম‌নে ম‌নে)

প‌রের দিন থে‌কে আয়াত আবার নিয়‌মিত পড়া‌তে আস‌তো। তনয়া এখন অনেক শ‌ান্ত হ‌য়ে গে‌ছে। সেই আগের মত দুষ্ট‌মি ক‌রে না। আয়াত প্রথম প্রথম তা‌তে খুব খু‌শি হ‌য়ে‌ছি‌লো। কিন্তু ধী‌রে ধী‌রে আয়াতও তনয়ার সেই দুষ্ট‌মি গু‌লো‌কে খুব মিস কর‌তো।

‌কিন্তু সব বুঝ‌তে পে‌রেও আয়াত তনয়া‌কে কিছু বল‌তো না। ভাব‌তো সাম‌নে ওর পরীক্ষা। এই মূহু‌র্তে কিছু বলা মা‌নে ওর ঘাঁ টা‌কে উস‌কে দেয়া।‌ তাই চুপচাপ রই‌লো। তারপর তনয়ার পরীক্ষা শেষ হ‌লো। খুব ভা‌লোভা‌বেই পরীক্ষা গুলো হ‌য়ে গে‌লো।

পরীক্ষার পর তনয়া আবার আ‌গের মত দুষ্ট‌মি করা শুরু কর‌লো। কিন্তু আয়াত‌কে এখন খুব কম জ্বালায়।

এক‌দিন তনয়া ওর কিছু বান্ধ‌বি‌দের সা‌থে ঘুর‌তে পা‌র্কে গে‌লো। সেখা‌নে গি‌য়ে দে‌খে আয়াত এক‌টি মে‌য়ের সা‌থে ব‌সে ব‌সে কথা বল‌ছে, খুব হাসাহা‌সি কর‌ছে। তনয়া সেটা দে‌খে রা‌গে ফুল‌ছিল। ওর বান্ধ‌বীদের‌কে বল‌লো তোরা সাম‌নে যা আমি আস‌তে‌ছি।

তারপর সোজা গি‌য়ে আয়া‌তের সাম‌নে দাড়া‌লো। রা‌গি চো‌খে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। আয়াত তনয়া‌কে দে‌খে বল‌লো—-

আয়াতঃ আরে তনয়া তু‌মি এখা‌নে?

তনয়াঃ উনি কে?

আয়াতঃ আমার বন্ধু লিমা।

তনয়াঃ বন্ধু না‌কি অন্য কিছু?

আয়াতঃ তা দিয়ে তোমার কি দরকার?

তনয়া কোন কথা না ব‌লেই আয়া‌তের গা‌লে একটা কিস ক‌রে বল‌লো কারন আই স্টিল লাভ উই।

উপ‌স্তিত ঘটনায় আয়াত আর লিমা হতভম্ব হ‌য়ে গে‌লো। আয়া‌তেরও ভিষন রাগ উঠে গে‌লো। তারপর একটা শব্দ হ‌লো

ঠাস____

আর তনয়া নি‌জের গা‌লে হাত দি‌য়ে আছে।

আয়াতঃ এই মে‌য়ে তোমা‌কে কথা বল‌লে বোঝ না না‌কি? তোমা‌কে এত বুঝা‌নোর পরও বু‌ঝো না। আর শোন তোমা‌কে আমি ভা‌লোবা‌সি না। কারন আমি লিমা‌কে ভা‌লোবা‌সি। আর হ্যা ও আমার বন্ধু না গার্ল ফ্রেন্ড। আর কখ‌নো তোমা‌কে পড়া‌বো না। যাও বা‌ড়ি যাও। ধমক দিয়ে পা‌ঠি‌য়ে দি‌লো।

তনয়া আয়া‌তের কথা গু‌লো শু‌নে কান্না ক‌রে দি‌লো। টপ টপ ক‌রে ওর চোখ থে‌কে জল ঝড়‌ছে। তারপর গাল চে‌পে ফু‌পিয়ে ফু‌পি‌য়ে বল‌লো,——-

তনয়াঃ ভা‌লোবা‌সেন না ঠিক আছে তাই ব‌লে চড় মার‌লেন কেন? আমার গালটা যে লাল হ‌য়ে গে‌লো। খুব ব্যাথাও কর‌ছে।

তনয়ার কথা শু‌নে আয়া‌তের খুব হা‌সি পা‌চ্ছে। কিন্তু এখন হে‌সে দি‌লে সব উল্টা হ‌য়ে যা‌বে। তাই অনেক ক‌ষ্টে আয়াত হা‌সিটা আটকা‌লো।।

তনয়া কাঁদ‌তে কাঁদ‌তে চ‌লে গে‌লো। আর আয়াত ওর যাবার পা‌নে কতক্ষন তা‌কি‌য়ে থে‌কে বা‌ড়ি চ‌লে গে‌লো।

তনয়ার ফর্সা গা‌ল চ‌ড়ের দরু‌নে লাল হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছে।

তনয়ার মাঃ কি‌রে তোর গাল এত লাল কেন?

তনয়াঃ আর ব‌লো না মা রিপা আছে না আমার বন্ধবী ও দুষ্ট‌মি ক‌রে মশা মার‌তে গি‌য়ে গা‌লে চড় মে‌রে দি‌লো তাই। তনয়া যে‌নো শাক দি‌য়ে কই মাছ ঢাকছে।

তনয়ার মাঃ তাই ব‌লে এত জো‌ড়ে যে গা‌লে দাগ প‌রে যায়।

তনয়াঃ ওকে আমি ব‌কে দি‌য়ে‌ছি মা।

রা‌তের বেলা তনয়া ওর বাবার সা‌থে ব‌সে টি‌ভি দেখ‌ছি‌লো তখনই ওর বাবার ফো‌নে ফোন আস‌লো।
ওর বাবা যখন বল‌লো আয়াত ফোন ক‌রে‌ছে ভ‌য়ে তনয়া হাত পা ঠান্ডা হ‌য়ে যাবার উপক্রম। না জা‌নি কি না কি ব‌লে বাবা‌কে?

তনয়ার বাবা ফোনে কথা শেষ হ‌লে বল‌লেন—-

তনয়ার বাবাঃ আয়াত না‌কি আর তনয়া‌কে পড়া‌তে পার‌বে না!

তনয়ার মাঃ কেন?

তনয়ার বাবাঃ আয়া‌তের না‌কি কিছু দিন পর পরীক্ষা। প্রাই‌ভেট পড়া‌লে না‌কি ওর নি‌জের পড়ায় অসু‌বিধা হয় তাই।

তনয়ার মাঃ তাহ‌লে তনয়া‌কে কে পড়া‌বে?

আয়া‌তের বাবাঃ আয়াত নতুন টিচার ঠিক ক‌রে দি‌য়ে‌ছে। ক‌লে‌জের টিচার। বয়স্ক একজন টিচার।

তনয়া ম‌নে ম‌নে ভাব‌ছে বেটা বজ্জাত আমা‌কে এখন বয়স্ক টিচা‌রের হা‌তে দেয়া হ‌চ্ছে। তো‌কে আমি দে‌খে নি‌বো। ক‌বে তা নি‌শ্চিত বল‌তে পা‌রি না! হ‌তে পা‌রে পাঁচ দশ বছর পর! কিন্তু দে‌খে অবশ্যই নি‌বো!

তারপর আর আয়া‌তের সা‌থে তনয়ার দেখা হয়‌নি। তারপর তনয়া আর কা‌রো সা‌থে রি‌লেশন‌তো দূ‌রে থাক কেউ প্র‌পোজ কর‌লেও তা‌কে ধ‌রে পিটা‌তো। তনয়া এস এস‌ সি পরীক্ষায় জি‌পিএ ফাইব পে‌লো। তারপর কিছু‌দিন আগে এই ক‌লে‌জে ভ‌র্তি হ‌লে‌া। কিন্তু কপাল দুঃ‌খে ব‌লেন আর সু‌খে ব‌লেন প্রায় দু বছর পর তনয়া আর আয়া‌তের আবার দেখা হ‌লো।

ও হ্যা‌লো বন্ধুগন কল্পনা শেষ। এবার বর্তমা‌নে ফি‌রে আসেন।

প‌রের দিন তনয়া আবার ক‌লে‌জে গে‌লো। আজ‌কে আয়াতের ক্লাস টাই‌মে তনয়া গি‌য়ে ক্লা‌সের পিছ‌নের দিকটায় বস‌লো। আর এমন ভা‌বে বস‌লো যা‌তে আয়াতকে বার বার দেখ‌তে না হয়। মা‌নে ওর সাম‌নের বেঞ্চ‌ে লম্বা একটা ছে‌লে ছি‌লো।

আয়াত এসে বার বার ক্লা‌সের এদিক ওদিক চোখ বুলা‌চ্ছিল। তারপর দেখ‌লো তনয়া ক্লা‌সের পিছ‌নের দিকে নি‌চের দি‌কে তা‌কি‌য়ে চুপচাপ ব‌সে খাতায় আঁকিবু‌কি কর‌ছে।

আয়াত তনয়ার বে‌ঞ্চের পা‌শে গি‌য়ে একটা কা‌শি দি‌লো।

আয়াত থে‌কে তনয়া তাড়াহু‌রো ক‌রে দাড়া‌লো আর হাতটা সোজা বাম গা‌লে রাখ‌লো।

তনয়ার এ অবস্থা দে‌খে আয়া‌তের খুব হা‌সি পেলো কিন্তু হা‌সিটা চে‌পে রে‌খে বল‌লো——

আয়াতঃ কি ব্যাপার তনয়া আমি ওখা‌নে পড়া‌চ্ছি আর তু‌মি এখা‌নে খাতায় কি আঁক‌ছো।

খাতাট‌া হা‌তে নি‌য়ে দে‌খে তনয়া পেট‌ মোটা একটা কার্টুন এঁকে‌ছে।

আয়াতঃ ‌হোয়াট ইস দিস তনয়া?

তনয়াঃ ছ‌বি স্যার।

আয়াতঃ সেটাপ। আমি বল‌ছি ক্লাস টাই‌মে পড়ায় ম‌নো‌যোগ না দি‌য়ে তু‌মি এসব কি আঁক‌ছো?

তনয়াঃ মাথা নিচু ক‌রে স্য‌রি স্যার।

আয়াতঃ ইট’স ওকে । বাট নট এগেইন।

তনয়াঃ আই রি‌মেম্বার স্যার।

আয়াতঃ হুমম দ্যাট’স গুড।

তারপর আয়াত আবার পড়া‌নো শুরু কর‌লো। আর তনয়া ম‌নে ম‌নে আয়াত‌কে এক গাদা গা‌লি বর্ষন কর‌লো!

প‌রের দিন ক‌লে‌জের ব্রেক টাই‌মে ক‌য়েকজন স্টু‌ডেন্ট মি‌লে ঠিক কর‌লো অঙ্ক প্রাইভেট পড়‌বে। আর সবাই আয়াত স্যা‌রের কা‌ছে পড়‌বে ব‌লে ঠিক করে‌ছে। কিন্তু তনয়া বল‌লো তার কা‌ছে না প‌ড়ে অন্য কোন টিচার দেখ না?

‌কিন্তু সবাই মন‌স্থির ক‌রে‌ছে আয়াত স্যা‌রের কা‌ছেই পড়‌বে। তাই সবাই মি‌লে আয়া‌তের কা‌ছে গে‌লো কথা বল‌তে। কিন্তু তনয়া গে‌লো না। সবাই আয়াত‌কে পড়া‌নোর জন্য অনেক অনু‌রোধ করার পর আয়াত রা‌জি হ‌লো। কিন্তু আয়া‌তের বাসায় গি‌য়ে পড়া‌তে হ‌বে। সবাই তা‌তে রা‌জি হ‌য়ে গে‌লো। আয়াত তখন তনয়া‌কে খুজ‌তে ছি‌লো। তারপর ভাব‌লো হয়‌তো তনয়া ওর কা‌ছে পড়‌বে না?

তনয়া ভাব‌ছে পড়‌তে যা‌বে কি যা‌বেনা? তারপর ভাব‌লো সব বন্ধুরা পড়‌তে পার‌লে আমি কেন পার‌বো না? আর আয়াত স্যা‌রের প্র‌তি এখন আমার কোন ফি‌লিংস নাই। আবার নি‌জেই নি‌জে‌কে প্রশ্ন কর‌লো স‌ত্যিই কি তার প্র‌তি কোন ফি‌লিংস নেই?

আচ্ছা একটা পরীক্ষা ক‌রে দে‌খি আয়াত স্যার‌কে আমি আজও ——–বা‌সি কিনা?

‌চোখ বন্ধ ক‌রে কতক্ষন থাক‌বো য‌দি আয়াত স্যা‌রের চেহারা দে‌খি তাহ‌লে—–বা‌সি। আর না আস‌লে তো নাই।

আ‌মি চোখ বন্ধ করলাম কিন্তু।

কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করার পর তনয়া কেঁপে উঠ‌লো। আরে আমি‌তো আয়াত স্যার‌কে ভু‌লে গে‌ছিলাম! তাহ‌লে চোখ বন্ধ কর‌লেই শুধু তা‌কে কেন দেখ‌তে‌ছি? আজব‌ তো!

ক‌য়েক দিন পর থে‌কে সবাই আয়া‌তের বাসায় পড়‌তে গে‌লো। সবাই আয়া‌তের বাসায় ডু‌কে পর‌লো কিন্তু তনয়া ভিত‌রে যা‌বে কি যা‌বে না না তা নি‌য়ে চিন্তা কর‌ছে। এর ম‌ধ্যে আয়াত দড়জার সাম‌নে এসে বল‌লো ভিত‌রে এলে তোমা‌কে খে‌য়ে ফেলবে‌া না! আয়াত‌কে দেখ‌লেই বাম গা‌লে হাত দেয়া তনয়া অভ্যা‌সে প‌রিনত হ‌য়ে‌ছে।

‌ভিত‌রে ডুকে তনয়া দেখ‌লো আয়া‌ত দের বা‌ড়িটা বেশ সুন্দর ক‌রে সাজা‌নো।

একজন বল‌লো স্যার আপ‌নি কি এখা‌নে একা থ‌াকেন?

আয়াতঃ আরে নাহ! বাবা মা মাস খা‌নের জন্য গ্রা‌মে গে‌ছে। কিছু‌দিন পরই চ‌লে আস‌বে?

———ওহ।

আয়াতঃ তোমরা পা‌শের রু‌মে যাও সেখা‌নেই সবাই‌কে পড়াই।

সবাই আয়া‌তের বাসায় আসে তারপর ব‌সে পড়ে যে যার মত গল্প করে। কিন্তু তনয়া চুপচাপ ব‌সে বই‌য়ের দি‌কে তা‌কি‌য়ে থা‌কে।

ইদা‌নিং আয়াত খেয়াল কর‌ছে তনয়া সেই আগের তনয়া নাই। আগের সেই দুষ্ট‌মি চাঞ্চল্য তার মা‌ঝে আর নেই। একদম শান্ত প্রকৃ‌তির। আয়াত তনয়ার এ রুপটা একদমই পছন্দ ক‌রে না।

প্রায় চার মাস হ‌য়ে গে‌ছে আয়াত এখ‌নো তনয়া‌কে দুষ্ট‌মি কর‌তে দে‌খে না। কেমন যে‌নো হ‌য়ে গে‌ছে। ঠিক যেমন পা‌নির অভা‌বে এক‌টি ফুল নে‌তি‌য়ে যায় তনয়াও ঠিক তেম‌নি নে‌তি‌য়ে গে‌ছে। আয়া‌তের ম‌নে হ‌চ্ছে কোথাও না কোথাও এর জন্য ওই দায়ী।

তাই আয়াত ঠিক কর‌লো তনয়ার সা‌থে সরাস‌রি কথা বল‌বে।

আয়াতঃ তনয়া শোন?———

আয়াতঃ তনয়া শোন?

তনয়া তখন কলেজ ‌শেষ ক‌রে বা‌ড়ি যা‌চ্ছি‌লো। আয়া‌তের ডা‌কে পিছ‌নে ফির‌লো।

তনয়াঃ আমা‌কে ডাকে‌ছেন স্যার ?

আয়াতঃ হ্যা! তোমার সা‌থে আমার কিছু কথা আছে?

তনয়াঃ হ্যা বলুন স্যার?

আয়াতঃ এখা‌নে না। তু‌মি আজ‌কে আমা‌দের বাসায় সবার যাবার আধা ঘন্টা আগে যা‌বে য‌দি তু‌মি ফ্রি থা‌কো?

তনয়াঃ কিন্তু স্যার?

আয়াতঃ ভয় নেই। বাসায় বাবা মা সবাই আছে। বিশ্বাস না হ‌লে আমাদের বাসার টে‌লি‌ফো‌নে বা তোমার বাবা‌কে দি‌য়ে ফোন ক‌রি‌য়ে কনফ্রম হ‌তে পা‌রো?

তনয়াঃ হালকা হা‌সি দি‌য়ে কি যে ব‌লেন স্যার? আমি আপনা‌কে অনেক বিশ্বাস ক‌রি।

আয়াতঃ ধন্যবাদ।

‌বিকা‌লে কথামত তনয়া অনেক আগে পড়‌তে গে‌লো। দড়জায় ডোর‌বেল বাজা‌লো। দড়জা আয়া‌তের মা খুল‌লো । তা‌কে দে‌খেই তনয়া সালাম দি‌লেন।

তনয়াঃ আসসালামু আলাইকুম আন্টি।

আয়া‌তের মাঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম। আরে তনয়া তু‌মি? কেমন আছো?

তনয়াঃ জ্বি আন্টি ভা‌লো। আপ‌নি?

আয়া‌তের মাঃ খুব ভা‌লো ভিত‌রে আসো।

তনয়াঃ আন্টি স্যার কোথায়?

আয়া‌তের মাঃ ও ওর রু‌মে। তু‌মি ব‌সো আমি ওকে নি‌চে পা‌ঠি‌য়ে দি‌তে‌ছি।

আয়াত নিচে এসে তু‌লির পা‌শে বস‌লো।

তনয়াঃ স্যার কি যে‌নো বল‌তে চাই‌ছি‌লেন?

আয়াতঃ তনয়া তোমার কি কিছু হ‌য়ে‌ছে?

তনয়াঃ না‌তো স্যার। কিন্তু কেন?

আয়াতঃ না তু‌মি সেই আগের তনয়া আর নাই!

তনয়াঃ কেন স্যার আপনার এমন কেন ম‌নে হ‌লো?

আয়াতঃ দু বছর আগে যখন তোমা‌কে পড়াতাম তখন তোমার মা‌ঝে অন্যরকম একটা চাঞ্চল্য, দূরন্তপনা আর দুষ্ট‌মি ছি‌লো। কিন্তু এখন সেটা তোমার মা‌ঝে নেই। ম‌নে হ‌চ্ছে তু‌মি সেই তনয়া‌কে নি‌জের ভিতর ব‌ন্দি ক‌রে উপ‌রে একটা মু‌খোশ প‌রে আছো! ম‌নে হ‌চ্ছে নি‌জে‌কে লুকা‌তে চাই‌ছো? কোথাও এটার জন্য আমি দায়ী নই‌তো?

তনয়াঃ না স্যার সেরকম কিছু না। আপ‌নি প্লি নি‌জে‌কে দায়ী কর‌বে না? আর স্যার আপ‌নি‌তো আমা‌কে ব‌লে‌ছি‌লেন ছে‌লেমানু‌ষি সবসময় চ‌লে না। আমি তাই ফ‌লো কর‌ছি। নি‌জের ছে‌লেমানু‌ষিটা‌কে ছে‌ড়ে বুঝদার হবার চেষ্টা কর‌ছি।

আয়াতঃ বুঝলাম তুমি ম্যা‌চিওর হবার চেষ্টা কর‌তে‌ছো। কিন্তু তু‌মি কি খেয়াল ক‌রে‌ছো বে‌শি বড়মানু‌ষি দেখা‌তে গি‌য়ে তু‌মি নিজে‌কেই হা‌রি‌য়ে ফে‌লে‌ছো!

তনয়াঃ ঠিক জা‌নি না।

আয়াতঃ তাহ‌লে জানার চেষ্টা ক‌রো। এভা‌বে নি‌জের থে‌কে য‌দি দূ‌রে চ‌লে যাও ত‌বে খু‌শি থাকতে পার‌বে না। 
দে‌খো তনয়া সবার একটা অতীত থাক‌বেই। সে তুলনায় তোম‌ার অতীতটা নেহাৎ ছে‌লেমানু‌ষি কিন্তু তবুও সেটা ম‌নের মাঝে দাগ কে‌টে যায়। তারপরও অতীতটা‌কে ভু‌লে থাকাই ভা‌লো নয়‌কি? কি বললাম বুঝলা কিছু?

তনয়াঃ হুমমম স্যার।

আয়াতঃ তাহ‌লে আবার আগের তনয়া হ‌য়ে যাও! কেমন? ত‌বে হ্যা দুষ্ট‌মির প‌রিমান কিন্তু আগের মত রে‌খো না কারন আমি জা‌নি তনয়ার দুষ্ট‌মি অন্য‌দের উপর কতটা ভা‌রী প‌রে!

আয়া‌তের কথা শু‌নে দুজ‌নেই হে‌সে দি‌লো।

তনয়াঃ কিন্তু স্যার আমি আবার আগের তনয়া কিভা‌বে হ‌বো?

আয়াতঃ সেটাও কি আমি ব‌লে দি‌বো?

তনয়াঃ প্রশ্ন যখন আপ‌নি তু‌লে‌ছে উত্তর ও আপনা‌কেই দি‌তে হ‌বে? বুঝ‌লেন?

আয়াতঃ ওকে ওকে। প্রথ‌মে নি‌জের মাথার ম‌ধ্যে বড় হবার যে চিন্তা গু‌লো আছে না সেগুলো ‌ঝে‌ড়ে ফে‌লে দাও। তারপর আয়নার সাম‌নে দা‌ড়ি‌য়ে নি‌জে‌কে দে‌খো নি‌জের দুষ্ট‌মিগু‌লো নি‌য়ে ভা‌বো আর দুষ্ট‌মি ক‌রো।

তনয়াঃ অনেক অনেক ধন্যবাদ স্যার আর এই ম্যা‌চিওর হওয়ার চক্ক‌রে আমিও হা‌ঁপি‌য়ে উঠে‌ছিলাম। যাক বাবা হাঁপ ছে‌ড়ে বাঁচলাম।

এর ম‌ধ্যে আয়া‌তের মা নাস্তা নি‌য়ে আস‌লেন।

তনয়াঃ আন্টি এগু‌লোর কি দরকার ছি‌লো?

আয়া‌তের মাঃ চুপ একদম চুপ। এত‌দিন ধ‌রে আমা‌দের বাসায় পড়‌তে আসিস অথ‌চো তোর একটু যত্ন করতে পা‌রি না। আস‌লে এতগু‌লো ছে‌লে মে‌য়ের ম‌ধ্যে তো‌কে আলাদা ক‌রে দেখ‌লে ওদের খারাপ লাগ‌তে পা‌রে? তাই?

‌কিন্তু শত হ‌লেও তুই‌তো নিজে‌দের মে‌য়ে!

তনয়াঃ মা‌নে?

আয়া‌তের মাঃ মা‌নে তুই আয়া‌তের বাবার বন্ধুর মে‌য়ে। তোর বাবার সা‌থে কত বছ‌রের প‌রিচয়। আর তোর বাবা মা তো প্রায় আমা‌দের বাসায় আসে কিন্তু তো‌কে কখ‌নো নি‌য়ে আসেনি। সবসময় কোন না কোন বাহানা বা‌নি‌য়ে দিতো

নে এবার চুপচাপ খা‌তো!

তনয়া দেখ‌লো দু বা‌টি আইসক্রিম। বা‌কিগুলো রে‌খে সেটাই নি‌লো। আয়াত আইস‌ক্রিম এর অন্য বা‌টিটা নি‌তে যা‌বে এর ম‌ধ্যে তনয়া বল‌লো——

তনয়াঃ একদম হাত দি‌বেন না!

আয়াতঃ কেন?

তনয়াঃ ওখা‌নে বা‌কি যে খাবার রাখা আছে সেটা খান। আমার আইস‌ক্রিম এর দি‌কে একদম নজড় দি‌বে না। আ‌ন্টি ওটা আমা‌কে দি‌য়ে‌ছে।

আয়াতঃ দু বা‌টি সব একা খা‌বে?

তনয়াঃ হ্যা তো! দশ বা‌টি আইস‌ক্রিমেও আমার কিছু হ‌বে না। যান আন্টির কা‌ছে গি‌য়ে চে‌য়ে খান।

আয়াত মুচ‌কি হে‌সে দেখ‌লো পাগ‌লি মে‌য়েটা বাচ্চা‌দের মত আইস‌ক্রিম খা‌চ্ছে কিন্তু চোখ বন্ধ ক‌রে।

আয়াতঃ তারমা‌নে দুষ্ট‌মির শুরুটা আমা‌কে দি‌য়েই কর‌লে?

তনয়াঃ হি হি!

তারপর পড়াশুনা শে‌ষে তনয়া বা‌ড়ি গি‌য়ে আয়নার সাম‌নে দা‌ড়ি‌য়ে বল‌লো——

তনয়াঃ ‌কোন অতীতটা ভুল‌বো? পা‌শের বাসার টিয়া‌কে যে চুলকা‌নির ঔষধ লা‌গি‌য়ে না‌চি‌য়ে‌ছিলাম না‌কি ক্লা‌সে স্যা‌রের বে‌ঞ্চের নি‌চে চুইমগাম রে‌খে দি‌য়ে‌ছিলাম না‌কি পাশের বাসার আন্টির গা‌ছের ফুল চু‌রির বিষয়টা?

আরো অনেক আছে? ধ্যাত ভাল্লা‌গে না। কাল আবার স্যার‌কে জি‌গেস কর‌তে হবে?

প‌রের‌ দিন আবার আয়াত‌দের বাসায় গে‌লো। কিন্তু আজ এখ‌নো কেউ পড়তে আসে‌নি কেন?
‌ডোর বেল বাজা‌লে আয়াত দড়জা খুল‌লো।

আয়াতঃ তু‌মি আজ পড়‌তে আসলা কেন?

তনয়াঃ ‌কেন স্যার?

আয়াতঃ আরে আমি‌তো তি‌ন্নি‌কে (তনয়ার ক্লাস‌মেট) ‌ফোন ক‌রে ব‌লে‌ছি আজ‌কে পড়া‌বো না। সবাই‌কে জা‌নি‌য়ে দিতে।

তনয়াঃ ওহ তাহ‌লে ম‌নে হয় আমা‌কে জানা‌তে ভু‌লে গে‌ছে। কেন পড়া‌বেন না?

আয়াতঃ আস‌লে মা‌য়ের শরীরটা একটু খারাপ। তাই।

তনয়াঃ ওহ! তা আমি কি আন্টি‌কে দেখ‌তে পা‌রি?

আয়াতঃ হ্যা অবশ্যই ভিত‌রে আসো।

তনয়া ভিত‌রে গি‌য়ে আয়া‌তের মা‌য়ের সা‌থে দেখা ক‌রে। তার অবস্থার কথা জান‌তে চাই‌লো। তারপর আয়াত‌কে বল‌লো—-

তনয়াঃ স্যার একটু কন‌ফিউসন ছি‌লো।

আয়াতঃ হ্যা ব‌লো?

তনয়াঃ শো‌নেন আন্টি স্যার আমা‌কে কিছু অতীত ভু‌লে যে‌তে ব‌লে‌ছে। কিন্তু আমি ঠিক ভে‌বে পা‌চ্ছি না কোনটা ভুল‌বো আর কোনটা ম‌নে রাখ‌বো?

আয়া‌তের মাঃ তা অতীত গু‌লো কি আমা‌দের বলা যা‌বে?

তনয়াঃ কেন বলা যা‌বে না। অবশ্যই!

‌তারপর তনয়া শুরু কর‌লো তার সকল দুষ্ট‌মির কাহী‌নি। শুরু ক‌রে‌ছে তো ক‌রে‌ছে শেষতো হচ্ছেই না। আর এদি‌কে আয়াত আর ওর মা তনয়ার দুষ্ট‌মির কথা শু‌নে হাস‌তে হাস‌তে অবস্থা বা‌রোটা।

আয়া‌তের মাঃ তনয়া এসব কাজ তু‌মি ক‌রে‌ছো?

তনয়াঃ হ্যা আন্টি। আরো আছে কিন্তু ঠিক মনে পড়‌ছে না। কিন্তু এর ম‌ধ্যে থে‌কে কোনটা ভুল‌বো আর কোনটা ম‌নে রাখ‌বো? তাই নি‌য়ে কন‌ফিউজড আছি।

আয়াতঃ একটাও ভুল‌তে হ‌বে না।

তনয়াঃ আরে আপ‌নিই‌তো অতীত ভুল‌তে বল‌লেন?

আয়াতঃ ভুল হ‌য়ে‌ছে আমার ! আমি ভু‌লে গে‌ছিলাম যে তুমি তনয়া! তু‌মি সবসময় আমার অস্র আমার উপরই প্র‌য়োগ ক‌রো।

তনয়া ঠোট ফু‌লি‌য়ে আয়া‌তের মা‌য়ের দি‌কে তাকা‌লো। তি‌নি তখ‌নো হাস‌ছেন।

আয়া‌তের মাঃ তোর মত মে‌য়ে থাক‌লে তা‌দের ঘর সবসময় খু‌শিময় থাকবে!

তনয়াঃ রি‌য়ে‌লি আন্টি! এখন কেমন লাগ‌ছে আপনার?

আয়া‌তের মাঃ হ্যা স‌ত্যি। যা অসুস্থ ছিলাম তোর কথায় ঠিক হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছে। আর আমার এখন খুব ভা‌লো লাগ‌ছে।

তনয়াঃ আন্টি আমি এখন উঠি তাহ‌লে। নিজের খেয়াল রাখবেন। বাই আন্টি।

আয়াত তনয়া‌কে দড়জা পর্যন্ত এগি‌য়ে দি‌য়ে আবার ডাক‌ দি‌লো

আয়াতঃ তনয়া শোন!

তনয়াঃ জ্বি স্যার!

আয়াতঃ তু‌মি কাল‌কে ব‌লে‌ছি‌লে তু‌মি আমা‌কে বিশ্বাস ক‌রো! কিন্তু সে বিশ্বা‌সের ভিত্তি বা কারনটা জান‌তে পা‌রি?

তনয়াঃ একটা চৌদ্দ প‌নের বছ‌রের মে‌য়ে আপনা‌কে প্র‌পোজ ক‌রে‌ছে চাই‌লেই আপ‌নি তার দুর্বলতার সু‌যোগ নি‌তে পার‌তেন? কিন্তু আপ‌নি তা না ক‌রে মে‌য়েটা‌কে ভুল পথ থে‌কে ফি‌রি‌য়ে এনে‌ছেন। বিশ্বাস করার জন্য এটাই য‌থেষ্ট নয়‌কি? স্যার আমি আপনা‌কে খুব শ্রদ্ধা ক‌রি। আর—–

আয়াত মুচ‌কি হে‌সে বল‌লো সাবধা‌নে যেও।

তনয়াঃ বাই স্যার।

আয়াত তারপর দড়জা আট‌কে ভিত‌রে যে‌তেই শো‌নে তনয়ার চিৎকার

আয়াত দ্রুত দড়জা খু‌লে হতভম্ব হ‌য়ে গে‌লো———

আয়াত দড়জা খু‌লে দে‌খে তনয়া সি‌ড়ি‌তে উপর আধা শোয়া আর আধা বসা অবস্থায় প‌ড়ে আছে। আয়াত প্রথ‌মে ভাব‌লো তনয়া হয়‌তো দুষ্ট‌মি কর‌তে‌ছে। কারন এ ধর‌নের দুষ্ট‌মি তনয়া এর আগেও ক‌য়েবার ক‌রে‌ছি‌লো। তাই বল‌লো——

আয়াতঃ তনয়া এবার আর আমা‌কে বোকা বানা‌তে পার‌বে না! ওঠো বল‌ছি। তনয়া তনয়া ! তনয়া!

ক‌য়েক বার ডাক‌দি‌লো কিন্তু তনয়ার কোন সাড়াশব্দ পে‌লো না। তাই গি‌য়ে তনয়ার কাঁ‌ধে রাখ‌লো আর সা‌থে সা‌থে তনয়া মা‌টি‌তে গ‌ড়ি‌য়ে পর‌লো।

আয়াত হতভম্ব হ‌য়ে গে‌লো। কারন তনয়ার কপা‌লে রক্ত। দেয়া‌লের দি‌কে তা‌কি‌য়ে দেখ‌া দেয়া‌লেও খা‌নিকটা রক্ত লে‌গে আছে। সি‌ড়ি‌তে অনেক পা‌নি প‌রে আছে। ম‌নে হয় তনয়া পা‌নি‌তে স্লিপ ক‌রে প‌ড়ে গে‌ছে। মে‌য়েটা মাথা ফে‌টে গে‌ছে। কি যে ক‌রি? আয়াত ভাব‌ছে।

আয়াত তনয়া‌কে কো‌লে তুল‌বে কি তুল‌বে ন‌া তা নিয়ে অনেকটা অস‌স্তি বোধ কর‌ছে। তারপর ভাব‌লো ও সব প‌রে ভাব‌বো আগে মে‌য়েটা‌কে ভিত‌রে নি‌য়ে যাই।

আয়াত তনয়া‌কে কো‌লে তু‌লে বল‌লো আরে মে‌য়েটা‌কে দেখ‌তে তো অনেক শুকনা কিন্তু ওজন কম ক‌রে হ‌লেও ৪২ হ‌বে।

আয়াত তনয়া‌কে নি‌য়ে ওর মা‌য়ের রু‌মে শোয়া‌লো।

আয়া‌তের মাঃ আরে কি হ‌য়ে‌ছে ওর?

আয়াতঃ মা ম‌নে হয় সি‌ড়ি দি‌য়ে স্লিপ ক‌রে প‌ড়ে গে‌ছে। দে‌খোনা মে‌য়েটার মাথা ফে‌টে গে‌ছে।

আয়া‌তের মাঃ তাড়াতা‌ড়ি ডাক্তার‌কে ফোন কর?

আয়াতঃ হ্যা মা কর‌ছি। কিন্তু তু‌মি ব্যাস্ত হ‌য়ে নি‌জের শরীর খারাপ ক‌রো না।

আয়াত ডাক্তারকে ফোন ক‌রে তনয়ার মাথার রক্তটা মু‌ছে কিছুটা এন্টিবা‌য়ো‌টিক ক্রিম লা‌গি‌য়ে দি‌লো যা‌তে তাৎক্ষ‌নিক ভা‌বে রক্তটা থে‌মে যায়। তারপরে তনয়ার বাবা মা‌কে ফোন করে আস‌তে বল‌লো।

তনয়া তখ‌নো অজ্ঞান। তাদের ‌ফোন করার পর। আয়াত তনয়ার চো‌খে মু‌খে পা‌নির ঝাপসা দি‌লো।

তনয়া চোখ খু‌লে দে‌খে আয়াত আর আয়া‌তের মা ওর সাম‌নে ব‌সে আছে।

আয়াতঃ এই মে‌য়ে প‌ড়ে গেলা কিভা‌বে?

তনয়াঃ রা‌গি চো‌খে তা‌কি‌য়ে কোন বেয়া‌ক্কেল যে‌নো সি‌ড়ি‌তে পা‌নি ফে‌লে‌ছে?

আয়াতঃ হুম দে‌খে‌ছি। কিন্তু কে সেটা জা‌নি না?

তনয়াঃ তাহ‌লে তাড়াতা‌ড়ি জা‌নেন! তার অবস্থা আমি বা‌রোটা বাজা‌বো। মাথাটা পচন্ড ব্যাথা কর‌তে‌ছে।

আয়াতঃ আর কোথাও ব্যাথা পাই‌ছো?

তনয়াঃ হ্যা। পা‌য়ে খুব ব্যাথা কর‌ছে ম‌নে হয় মচ‌কে গে‌ছে?

আয়াত তনয়ার পা‌য়ে হাত দি‌য়ে পা টা দেখ‌ছে।

তনয়াঃ স্যার কি কর‌ছেন? প্লিজ পা‌য়ে হাত দি‌বেন না। আপ‌নি আমার শিক্ষক।

আয়াতঃ চুপ একদম চুপ। আয়াত তারপর দেখ‌লো আস‌লেই তনয়ার ডান পা‌য়ের উপ‌রের পাতা অনেকটা ফু‌লে গে‌ছে। আয়াত ভা‌লো মত দেখ‌ছে আর (ম‌নে ম‌নে ভাব‌ছে কোন মানু‌ষের পা এত সুন্দর হ‌তে প‌া‌রে!)। তারপর বল‌লো কপাল ভা‌লো ভা‌ঙে‌নি। ত‌বে মচ‌কে গে‌ছে। ডাক্তার এখনি চ‌লে আস‌বে।

‌কিছুক্ষন পর ডাক্তার আর তনয়ার বাবা মা একসা‌থে এলো।

ডাক্তার তনয়া‌র মাথায় ভা‌লো ক‌রে ব্যা‌ন্ডেজ ক‌রে দি‌লো। পা‌য়ে লি‌কোপ্লাসটার পে‌চি‌য়ে দি‌য়ে বল‌লো সপ্তাহ খা‌নিক বেড রেস্ট নি‌লেই ঠিক হ‌য়ে যা‌বে। তারপর একটা ইন‌জেকসন বের কর‌লো।

তনয়াঃ ডাক্তার ইন‌জেকসন কার জন্য?

ডাক্তারঃ কেন তোমার জন্য। পেইন কিলা‌রের কাজ কর‌বে আর সেফ‌টিক হ‌বে না।

তনয়াঃ নাাাাাাাাাাাআাাাাাাাাাাাা ব‌লে একটা চিৎকার দি‌লো।

ওর চিৎকার শু‌নে সবাই কানে হাত দি‌লো। আর আয়াত তাড়াতা‌ড়ি তনয়ার মুখটা চে‌পে ধর‌লো।

আয়াতঃ চ‌ুপ চুপ। কা‌নের পোকা বের ক‌রে দি‌লো।

তনয়াঃ আমি একদম ইন‌জেকসর দি‌বো না। অতবড় সুচ আমার গা‌য়ে ফোটা‌বে! নো চান্স।

আয়াতঃ ঠিক আছে দেয়ার দরকার নাই। আচ্ছা তনয়া একটা কথা ব‌লো তো? তোমার তো অনেক রক‌মের ফুল গাছ ছি‌লো। এখন কি আছে না‌কি?

তনয়াঃ স্যার আপনার ম‌নে আছে?

আয়াতঃ কেন ম‌নে থাক‌বে না? অনেক সুন্দর তোমার বাগানটা।

তনয়াঃ এখন‌তো আগের থে‌কেও বেশি ফুল আছে! জা‌নেন স্যার বা‌রো র‌কমের ক্যাকটাস গাছ আছে আমার!

আয়াতঃ আচ্ছা! তা আমা‌কে কিছু ফুল গাছ দিবা?

তনয়াঃ হ্যা অবশ্যই স্যার।

আয়াতঃ ডাক্তার হ‌য়ে‌ছে ?

ডাক্তারঃ হাস‌তে হাস‌তে হ্যা।

তনয়া তা‌কি‌য়ে দে‌খে ডাক্তা‌রের ইন‌জেকসন দেয়া শেষ। তনয়া বুঝ‌লো আয়াত কেন ফুল গা‌ছের প্রসঙ্গ তু‌লেছে?

তনয়াঃ ঠোট বা‌কি‌য়ে স্যার আপ‌নি খু্ব বা‌জে।

আয়াতঃ মুচ‌কি হে‌সে আমি জা‌নি!

ডাক্তারঃ ক‌য়েক দি‌নে ঠিক হ‌য়ে যা‌বে। ঔষধ দি‌য়ে গেলাম। আর হ্যা দু তিন জ্বর থাক‌তে পা‌রে।

তারপর তনয়ার বাবা মা আয়া‌তের বাবা মা‌য়ের সা‌থে কথা বল‌তে থা‌কে । আর আয়াত আর তনয়া অনেক কথা বল‌লো। তনয়ার দুষ্ট‌মি ভরা কথাগু‌লো শু‌নে আয়াত মুগ্ধ নয়‌নে তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে থা‌কে। তনয়ার চো‌খে চোখ পড়‌লেই আবার চোখ স‌রি‌য়ে নি‌তো। এদি‌কে সন্ধ্যা পে‌রি‌য়ে গে‌লো।

তনয়ার বাবাঃ আমা‌দের যে এখন উঠ‌তে হ‌বে?

আয়া‌তের বাবাঃ আরে থাক না আজ‌কে।

তনয়া বাবাঃ না‌রে প‌ড়ে এক‌দিন। আজ‌কে তনয়ার এ অবস্থা। তাই বা‌ড়ি যাওয়াটাই বেটার। তাহ‌লে আজ‌কে উঠি।

তনয়ার মাঃ কিন্তু তনয়া‌তো হাট‌তে পা‌রে না। ও তিনতলা থেকে কিভা‌বে নাম‌বে?

আয়াত‌দের বা‌ড়িটা তিনতালা। নি‌চের দুই তলা ভাড়া দেয়া। তিনতলায় ওরা থা‌কে। তাই তিনতালা ডু‌প্লেক্স করা।

আয়া‌তের মাঃ সমস্যা নাই আয়াত না‌মি‌য়ে দি‌বে।

তনয়ার বাবা মা সবাই নি‌চের দি‌কে নাম‌ছে 
সা‌থে আয়া‌তের বাবা মাও।

আয়াতঃ কি ম্যাডাম রে‌ডি?

তনয়াঃ কি‌সের জন্য?

আয়াত কোন কথা না ব‌লেই তনয়া‌কে কো‌লে তু‌লে নি‌লো। তনয়া হতভম্ব হ‌য়ে গে‌লো। আর প্রথম বার আয়া‌তের স্পর্শ পে‌য়ে শিহ‌রি‌তো হ‌য়ে উঠ‌লো। ওর শরী‌রের প্র‌ত্যেক‌টি পশম দা‌ড়ি‌য়ে গে‌লো। কোন কথা যে‌নো মুখ থে‌কে বের হ‌চ্ছে না। চুপচাপ চোখ বন্ধ ক‌রে আছে।

আর আয়াত ওকে নি‌য়ে নি‌চে নাম‌ছে কিন্তু এক ধ্যা‌নে তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে দেখ‌ছে আর ভাব‌ছে কি নিস্পাপ মুখ! আল্লাহ ঠিক কতটা যত্ন ক‌রে বানলে মানুষ এতটা সুন্দর আর মায়াবী হয়। তনয়া দি‌কে তা‌কি‌য়ে নি‌জের অজা‌ন্তেই মুচ‌কি হে‌সে ফেল‌লো।

আয়াতঃ তনয়া শোন।

তনয়া চোখ মে‌লে জ্বি

আয়াতঃ তোমার হাতটা আমার কা‌ঁধে রাখ‌লে ভা‌লো হ‌তো। তোমার যা ওজন! দুষ্ট‌মি ক‌রে।

তনয়া রাগা‌ন্তিত চো‌খে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে হাতটা আয়া‌তের কাঁ‌ধে রাখ‌লো। আর আয়া‌তের চো‌খের দি‌কে তাকা‌তেই অজানা এক আবে‌শে হা‌রি‌য়ে গে‌লো ।

তনয়া ম‌নে ম‌নে বল‌লো আরেকটা চান্স নে‌বো না‌কি স্যার‌কে ভা‌লোবাসার? সা‌থে চড়টার কথা ম‌নে পড়‌লো। আর তনয়া হাতটা ওর বা গা‌লে চ‌লে গে‌লো।

আয়াত সেটা খেয়াল ক‌রে বল‌লো—–

আয়াতঃ এই মে‌য়ে তুমি আমা‌কে দেখ‌লে সবসময় গা‌লে হাত দেও কেন?

তনয়াঃ এমন ভাব কর‌ছেন যে‌নো কিছু জানেন না? মুখে ভেং‌চি কে‌টে।

আয়াত তা দে‌খে হে‌সে দি‌লো।

তনয়া দেখ‌লো ওরা নি‌চে নে‌মে প্রায় গা‌ড়ির কা‌ছে পৌ‌ছে গে‌লো। তনয়া বল‌লো ইস তিনতালা না হ‌য়ে দশ তালা হ‌লে ভা‌লো হ‌তো।

তনয়া‌কে গা‌ড়ি‌তে পৌ‌ছে দি‌য়ে আয়াত ম‌নে ম‌নে কি যে‌নো ভে‌বে মুচ‌কি হা‌সি দি‌লো।

তনয়ারা চ‌লে গে‌লো। সে‌দিন রা‌তে তনয়া ভিষন জ্বর আস‌লো।

প‌রের দু‌দিন তনয়া‌কে ক্লা‌সে না দে‌খে আয়াত একে বা‌রে অস্থির হ‌য়ে গে‌ছে। ফো‌নে অবশ্য খবর নি‌য়ে‌ছি‌লো। তাই ভাব‌লো আজ তনয়া‌কে দেখ‌তে যা‌বে।

‌সে‌দিন বিকা‌লে আয়াত আর আয়া‌তের মা তনয়া‌দের বা‌ড়ি গে‌লো। প্রায় দুবছর পর আয়াত তনয়া‌দের বা‌ড়ি আস‌লো। বা‌ড়ির চারপা‌শে তা‌কি‌য়ে ম‌নে ম‌নে বল‌ছে,— মে‌য়েটা স‌ত্যি ব‌লে‌ছে। ওর ফু‌লের বাগানটা আগের থে‌কে অনেক বড় ক‌রে‌ছে।

‌নি‌জে যেরকম ফু‌লের মত দেখ‌তে তেম‌নি তার ফু‌লের শখ।

আয়াত‌কে দে‌খে তো তনয়ার মা খুব খু‌শি।

আয়াত তা‌কে সালাম দি‌য়ে কুশলা‌দি বি‌নিময় ক‌রে বল‌লো

আয়াতঃ আন্টি তনয়া কেমন আছে?

তনয়ার মাঃ আর ব‌লো না দু‌দিন জ্ব‌রের কারনে ছোট বাচ্চা‌দের মত জ্বা‌লি‌য়ে‌ছে। আজ সারা‌দি‌নে কিছু খাওয়া‌তে পা‌রি‌নি। দে‌খো এখ‌নো ঘাপ‌টি মে‌রে শু‌য়ে আছে।

আয়াতঃ আন্টি কিছু ম‌নে না কর‌লে আমি একবার চেষ্টা ক‌রে দেখ‌তে পা‌রি?

তনয়ার মাঃ আরে এতে ম‌নে করার কি আছে? এই নাও খাবার। তনয়া রু‌মেই আছে।

আয়াত আস্তে ক‌রে রু‌মে ডু‌কে দে‌খে তনয়া বাচ্চা মে‌য়ে‌দের মত গু‌টিসু‌টি মে‌রে শু‌য়ে আছে। আয়াত তনয়ার রু‌মের দি‌কে তা‌কি‌য়ে হে‌সে দি‌লো। বাচ্চা‌দের মত সারা রু‌মে কার্টুন পিক টানা‌নো। টম এন্ড জে‌রি থে‌কে শুরু ক‌রে রূপা‌ঞ্জেল সবার পিক আছে।

আয়াত তনয়া দি‌কে তা‌কি‌য়ে ভাব‌ছে। আস‌লেই দু‌দিনের জ্ব‌রে মেয়েটা অনেকটা শু‌কি‌য়ে গে‌ছে। চোখ দু‌টো ব‌সে গে‌ছে মুখটা শুষ্ক হ‌য়ে গে‌ছে। আর চুল গু‌লো এলো‌মে‌লো।

আয়াতঃ তনয়া! তনয়া!

তনয়া আয়া‌তের ডাক শু‌নে চোখ মে‌লে তাকা‌লো। আয়াত‌কে দে‌খে যে‌নো তনয়ার চো‌খে মু‌খে খু‌শি ফু‌টে উঠ‌লো।

তনয়াঃ স্যার আপ‌নি? কেমন আছেন?

আয়াত তনয়া‌কে উঠে বস‌তে সাহায্য ক‌রে। তারপর ব‌লে——

আয়াতঃ আমি‌তো ভা‌লো বাট তু‌মি নি‌জের কি অবস্থা ক‌রেছো?

তনয়াঃ স্যার আমি‌তো ঠিক আছি।

আয়াতঃ হ্যা দে‌খেই বোঝা যা‌চ্ছে? কতটা ঠিক আছো! এবার খাবারটা খে‌য়ে নাও।

তনয়াঃ না। খাবার খে‌লেই আমার ব‌মি পায়। আর খাবার গু‌লো খুব তে‌তো।

আয়াতঃ খাবার না খে‌লে আরো বে‌শি দিন অসুস্থ থাক‌বে!

তনয়াঃ থাক তবুও খা‌বো না।

আয়াতঃ হুম। তু‌মি কি দু‌দিন তোমার বাগা‌নে গে‌ছিলা?

তনয়াঃ নাতো? কেন?

আয়াতঃ আন্টি বল‌লো তোমার অনেক গু‌লো গাছ চু‌রি হ‌য়ে গে‌ছে।

তনয়াঃ;‌কি?

আয়াতঃ তাই‌তো ব‌লি? খে‌য়ে তাড়াতা‌ড়ি সুস্থ হয়ে গা‌ছের খেয়াল রা‌খো।

তনয়াঃ দিন তাড়াতা‌ড়ি খাই। আমার গাছ। ব‌লে মুখ ভার ক‌রে খা‌চ্ছে।

আয়াত সেটা দে‌খে মুখ টি‌পে টি‌পে হাস‌ছে।

তারপর তনয়া আয়া‌তের মা‌য়েন সা‌থে অনেকক্ষন গল্প কর‌লো। কিছুক্ষন পর তারা চ‌লে গে‌লেন।

তনয়ার সুস্থ হ‌তে প্রায় দশ‌দিন সময় লাগলো। এই দশ‌দিন আয়াত ক্লা‌সে তেমন কোন ম‌নো‌যোগ দি‌তে পার‌লো না। তনয়া‌কে খুব মিস কর‌তো। কিন্তু কেন? সেটা সে নি‌জেও ভে‌বে পা‌চ্ছি‌লো না!

তনয়া এখন নি‌য়ো‌মিত ক‌লে‌জে আসে। দিন চ‌লে যা‌চ্ছে। আর তনয়া আর আয়া‌তের সম্পর্কটা আগের থে‌কে অনেকটা কা‌ছে এসে‌ছে। খুব ভা‌লো বন্ধুতাব হ‌য়ে গে‌ছে দুজনার। তারপর তনয়ার তনয়ার ১ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হ‌লো। আর পরীক্ষা খুব ভা‌লোভা‌বে হ‌য়ে গে‌লো ।

এক‌দিন তনয়া বন্ধু‌দের সা‌থে এক‌টি রেস্টু‌রে‌ন্টে গে‌লো। সেখা‌নে আয়া‌তের জিএফ লিমা‌কে দেখ‌লো কার সা‌থে যে‌নো কথা বল‌ছে——-?

তনয়া লিমা‌কে প্রথম দে‌খেই চি‌নে ফেল‌লো।

তারপর ম‌নে ম‌নে বল‌ছে কি ক‌রে ভুল‌বো? এই শয়তা‌নি‌কে? আমার অঙ্ক স্যারটাকে আমার কাছে থে‌কে চু‌রি ক‌রে নি‌য়ে গে‌লো। চু‌ন্নি কোথাকার! কিন্তু চু‌ন্নিটার সা‌থে কে? আয়াত স্যার এর মত‌ তো লাগ‌ছে না?

যাই একটু দে‌খে আসি আর জ্বালা‌ইয়েও আসি।

তনয়া ওর বান্ধু‌দের বল‌লো তোরা খাবার অর্ডার দে আমি এখ‌নি আস‌তে‌ছি।

তনয়া লিমার সাম‌নে গি‌য়ে দা‌ড়ি‌য়ে বল‌লো—-

তনয়াঃ হাই লিমা আপু!

‌লিমাঃ হাই। (একটু অচেনা ভ‌ঙি‌তে)

তনয়াঃ আমা‌কে চিন‌তে পে‌রে‌ছেন?

‌লিমাঃ কিছুক্ষন তা‌কি‌য়ে থে‌কে বল‌লো তু‌মি তনয়া না?

তনয়াঃ জ্বি আপু কেমন আছেন?

‌লিমাঃ ভা‌লো তু‌মি?

তনয়াঃ জ্বি ভা‌লো। 
তারপর তনয়া লিমার পা‌শে বসা লোক দি‌কে তাকা‌লো। নাহ এতো আয়াত স্যার নয়! তাহ‌লে কে? একবার জান‌তে চাই‌বো? নাহ থাক য‌দি কিছু ম‌নে করে? আবার জি‌গেস না কর‌লে যে কন‌ফিসন থে‌কে যা‌বে? কি ক‌রি?

‌লিমাঃ তা এখা‌নে কি কর‌তে?

তনয়াঃ বন্ধু‌দের সা‌থে । আচ্ছা আপু আপনার সা‌থে ইনি কে?

‌লিমাঃ ইনি আমার ———-

কথাটা বল‌তে যা‌বে এর ম‌ধ্যে লিমা‌কে কে যে‌নো ফোন কর‌লো। লিমা ফোনটা রি‌সিভ ক‌রেই বল‌লো হ্যা আয়াত বল? আর কথা বল‌তে বল‌তে একটু দূ‌রে চ‌লে গে‌লো।

তনয়া বুঝ‌লো ফোনটা আয়াত ক‌রে‌ছে। তাই কিছু না ব‌লে মন খারাপ ক‌রে বন্ধু‌দের কা‌ছে এসে বল‌লো

তনয়াঃ মা ফোন ক‌রে‌ছি‌লো। এখ‌নি বাসায় যে‌তে বল‌লো। তোরা আড্ডা দে আমি প‌রে এক‌দিন তো‌দের সা‌থে আড্ডা দি‌বো।

‌নেহাঃ এ কেমন কথা তনয়া?

তনয়াঃ না‌রে ম‌নে হয় খুব জরু‌রি নয়‌তো মা এভা‌বে কখ‌নো ডা‌কে না। যাই । বাই।

‌রেস্টু‌রেন্ট থে‌কে বের হ‌য়ে রিক্সা না নি‌য়ে সোজা হাটা ধর‌লো। আজ কেন যে‌নো তনুর খুব কষ্ট হ‌চ্ছে। ম‌নে হচ্ছে বুকটা ফে‌টে যা‌বে। ভিষন কান্না পা‌চ্ছে।

‌কেন আমি আমি আয়াত স্যার‌কে ভা‌লোবাসলাম? আর কেনইবা এতটা কষ্ট হ‌চ্ছে?

এ‌দি‌কে লিমার ফো‌নে কথা বলা শেষ হ‌লে তনয়া‌কে খুজ‌তে খুজ‌তে ওর বন্ধু‌দের কাছে গি‌য়ে তনয়ার কথা জান‌তে চাই‌লো। তারপর ওকে না পে‌য়ে নেহার কাছ থে‌কে তনয়ার ফোন নাম্বার নেয়। এবং লিমারটা নেহার কা‌ছে দি‌য়ে আসে। আর ব‌লে অবশ্যই যে‌নো ফোন ক‌রে।

এ‌দি‌কে তনয়া হাট‌তে হাট‌তে প্রায় বা‌ড়ির কা‌ছে চলে আসে। ওদের বা‌ড়ি থে‌কে কিছু দূ‌রে ছোট একটা পার্ক। এই সেই পার্ক যেখা‌নে দা‌ড়ি‌য়ে আয়াত ওকে চড় মে‌রে‌ছি‌লো।
এখা‌নে বিকা‌লে অনে‌কে ব্যায়াম ক‌রে। কেউ গল্প গুজব ক‌রে। তনয়া পা‌র্কে ডু‌কে নদীর ধা‌রে একটা বে‌ঞ্চে বস‌লো।

‌কেন যে‌নো খ‌ুব কান্না পা‌চ্ছে। আর ম‌নে ম‌নে নি‌জে নিজে বল‌ছে। স্যা‌রের কা‌ছে আমার ভা‌লোবাসাটা নেহাৎ ছে‌লেমানু‌ষি ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু আমার ক‌া‌ছে কেন সেটা ম‌নে হয়‌না। আমার ছে‌লে মানু‌ষি ম‌নের ম‌ধ্যে যে ছোট্ট একটা ভা‌লোবাসার মত হৃদয় আছে সেটা‌কি স্যার দেখ‌তে পায় না? না‌কি বুঝ‌তে পা‌রে না?

হুম পার‌বেই বা কি ক‌রে স্যার তো আমায় না লিমা‌কে ভা‌লোবা‌সে। এদি‌কে তনয়ার ফোনটা বে‌জেই চ‌লে‌ছে। ফো‌নে অচেনা নাম্বার দে‌খে রি‌সিভ কর‌লো না। কিন্তু বার বার রিং হ‌চ্ছে ব‌লে তাই এবার রি‌সিভ কর‌লো।

এপাশ থে‌কে বল‌লো হ্যা‌লো তনয়া আমি লিমা।

তনয়া চম‌কে উঠ‌লো। আর ভাব‌ছে এই চু‌ন্নি কেন আমা‌কে ফোন কর‌লো? তারপর বল‌লো___

তনয়াঃ হ্যা বলুন আপু?

‌লিমাঃ তনয়া তু‌মি কোথায়?

তনয়াঃ পা‌র্কে ব‌সে আছি।

‌লিমাঃ কোন পা‌র্কে?

তনয়াঃ যে পা‌র্কে ব‌সে আপনার বয়‌ফ্রেন্ড আমা‌কে চড় মে‌রে‌ছি‌লো।

‌লিমাঃ ওখা‌নেই বসো। আমি দশ মি‌নি‌টের ম‌ধ্যে আস‌ছি।

তনয়া কিছু বলার আগেই ফোনটা কে‌টে গে‌লো। । 
তনয়া ভাব‌ছে ওনি কেন এখা‌নে আস‌বে?

‌কিছুক্ষ‌নের ম‌ধ্যেই লিমা চ‌লে আস‌লো?

তনয়াঃ হ্যা আপু ব‌লেন? কি বল‌বেন?

‌লিমাঃ তু‌মি কিছু না ব‌লে চ‌লে আসলা কেন?

তনয়াঃ এম‌নিতেই ভা‌লো লাগ‌তে ছি‌লো না আপু!

‌লিমাঃ ভা‌লো লাগতে ছি‌লো না না‌কি আয়াত আমা‌কে ফোন ক‌রে ছি‌লো তাই?

তনয়া অবাক চো‌খে লিমার তি‌কে তাকা‌লো।

তনয়াঃ আমতা আমতা ক‌রে তেমন কিছু না।

‌লিমাঃ সুইট হার্ট তোমার বয়সটা আমিও পে‌রি‌য়ে এসে‌ছি। সো আমার কা‌ছে লু‌কি‌য়ে লাভ নাই ডিয়ার। আচ্ছা তু‌মি তখন জান‌তে চাই‌লে না আমার পা‌শের লোক‌টি কে?

তনয়াঃ হুমমম

‌লিমাঃ হি ইজ মাই হ্যাজ‌বেন্ড।

তনয়াঃ অব‌াক চো‌খে লিমার দিকে তা‌কি‌য়ে বল‌লো কি? তাহ‌লে আয়াত স্যার যে সে‌দিন বল‌লো?

‌লিমাঃ ওটা আয়াত সে‌দিন তোমা‌কে শুনা‌নোর জন্য ব‌লে‌ছি‌লো যা‌তে তু‌মি পাগলা‌মি না ক‌রো!

তনয়াঃ তাহলে তার সা‌থে আপনার কি সম্পর্ক?

‌লিমাঃ (কিছুটা হে‌সে) আয়াত আমার খালা‌তো ভাই। আমরা দুজন একই বয়‌সি। এক ক্লা‌সে প‌ড়ি যার কার‌নে আমরা খুব ভা‌লো বন্ধু। শুধু বন্ধু অন্য কিছু না বুঝলা পাগ‌লি মে‌য়ে।

তনয়াঃ তাহ‌লে আয়াত স্যার সে‌দিন মিথ্যা কথা কেন বল‌লো?

‌লিমাঃ হুম সেটা ঠিক। সে‌দিন তু‌মি যাবার পর আমি আয়াত‌কে একই প্রশ্ন করে‌ছিলাম। আর ও ব‌লে‌ছি‌লো ওর একটা অনেক বড় সমস্যা আছে যার কারনে চাই‌লেও ও তোমার সা‌থে রি‌লেশ‌নে জড়া‌তে পার‌বে না।

‌কিন্তু একটা বিষয় কি জা‌নো ? যখনই আয়া‌তের সা‌থে কথা ব‌লি আয়াত য‌দি দশটা কথা ব‌লে তার নয়টা কথাই তোম‌া‌কে নি‌য়ে ব‌লে। তনয়া এরকম ওরকম সেরকম আরো কত কত কথা ! ম‌নে হয় যে‌নো তু‌মি ওর নিঃশ্বা‌সের সা‌থে মি‌শে গে‌ছো।

তনয়াঃ ঠোট বা‌কি‌য়ে তাহ‌লে আমা‌কে ব‌লে না কেন?

‌লিমাঃ সে‌দিন আমি আয়াত‌কে বললাম যে আয়াত তোর প্র‌ত্যেকটা কথায়‌ আ‌মি তনয়ার জন্য গভীর ভা‌লোবাসা অনুভব ক‌রি। আর যতদূর জা‌নি তনয়াও তো‌কে পাগ‌লের মত ভা‌লোবা‌সে তাহ‌লে তুই মে‌য়েটাকে ব‌লে দে? মে‌য়েটা‌কে আর কষ্ট দিসনা।

আয়াত তখন কি বল‌লো জানো?

তনয়াঃ তখন কাঁদ‌ছে কান্নার স্ব‌রেই ফু‌ঁপি‌য়ে ফু‌ঁপি‌য়ে বল‌লো কি বল‌ছে?

‌লিমাঃ আয়াত বল‌লো সেটা সম্ভব না‌রে লিমু! তাহ‌লে সব সম্পর্কগু‌লো অগোছা‌লো হ‌য়ে যা‌বে! আমি একটা সম্পর্ক‌ের জন্য অন্য গু‌লো ভাঙতে পার‌বো না! হ্যা আমি তনয়া‌কে———- তারপর আর কিছু ব‌লে‌নি।

তনয়াঃ আমার জন্য কেন অন্য সম্পর্ক ভে‌ঙে যা‌বে? আমি কি এতটা খারাপ? আর তার কি এমন সমস্যা যার কার‌নে আমার সা‌থে এমন কর‌ছে?

‌লিমাঃ সেটা আমি জা‌নি না‌রে? অনেক জানার চেষ্টা ক‌রে‌ছি কিন্তু সব বারই ব্যার্থ হ‌য়ে‌ছি। এখন ত‌ুমি চেষ্টা ক‌রে দেখ‌তে পা‌রো?

তনয়া অঝো‌ড়ে কাঁদ‌ছে।

‌লিমাঃ এই পাগ‌লি মে‌য়ে ‌প্লিজ কেঁ‌দো না। দে‌খো আমি তোমা‌কে এ কথা গু‌লো আগে বল‌তে পারতাম কিন্তু তু‌মি তখন খুব ছোট ছিলা। আর তারপর আমার বি‌য়ে হ‌য়ে যায়। বি‌য়ের পর আমি চট্রগ্রাম ছিলাম। তখন চে‌য়েও তোমার সা‌থে যোগা‌যোগ কর‌তে পা‌রি নি।

তনয়াঃ স্য‌রি আপু!

‌লিমাঃ কেন?

তনয়াঃ আয়াত স্যা‌রের গার্লফ্রেন্ড ভে‌বে তোমা‌কে ম‌নে ম‌নে অনেক বকা দি‌য়ে‌ছিলাম।

‌লিমা তনয়ার কথা শু‌নে হে‌সে ফেল‌লো। আর বল‌লো

‌লিমাঃ পাগ‌লি মে‌য়ে। ইট’স ওকে। আচ্ছা শোন তু‌মি এসব নি‌য়ে চিন্তা ক‌রো না। দেখ‌বে আল্লাহ চাই‌লে তু‌মি তোমার অঙ্ক টিচার‌কে পে‌য়ে যা‌বে!

তনয়াঃ য‌দি আল্লাহ না চায়?

‌লিমাঃ তাহ‌লে পা‌বে না!

‌লিমার কথা শু‌নে তনয়া ভ্যা ভ্যা ক‌রে বাচ্চা‌দের মত কেঁ‌দে ফেল‌লো।

‌লিমাঃ প্লিজ এভা‌বে কেঁ‌দো না। আয়াত কিন্তু ছিছকাঁদু‌নে মে‌য়ে‌দের একদম পছন্দ ক‌রে না।

তনয়া সা‌থে কাঁন্না থা‌মি‌য়ে ফেল‌লো। আর ফোপা‌চ্ছে।

‌সেটা দে‌খে লিমা হেসে বল‌লো এই পি‌চ্চি মি‌য়েটার ম‌নে তার অঙ্ক টিচার মা‌নে আয়া‌তের জন্য এত ভা‌লোবাসা লুকি‌য়ে আছে?

আচ্ছা শোন আয়াত দশ মি‌নি‌টের ম‌ধ্যে এখা‌নে আস‌বে।

তনয়াঃ কেন?

‌লিমাঃ আমি আস‌তে ব‌লে‌ছি!

তনয়াঃ কেন?

‌লিমাঃ তুই স‌ত্যিই মাথা‌মোটা! আমি এখন চ‌লে যা‌বো তারপর আয়াত‌কে ফোন ক‌রে ব‌লে দেবো জরু‌রি কা‌জে চ‌লে গে‌ছি। তখন তোরা গল্প ক‌রিস।

তনয়া লজ্জা পে‌য়ে মাথা নিচু ক‌রে ফেল‌লো।

‌লিমাঃ ও বাবা এ মে‌য়ে‌তো লজ্জাও পায়!

তনয়াঃ ধন্যবাদ আপু ব‌লে লিমা‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো।

‌লিমাঃ শোন রোজ ফোন কর‌বি আমা‌কে ওকে! আর শোন আমি তো‌কে যা বললাম আয়াত‌কে বল‌বি না। ভা‌লো থা‌কিস বাই।

তনয়াঃ তু‌মিও ভা‌লো থে‌কো বাই।

‌লিমা চ‌লে গে‌লো তার কিছুক্ষন পর আয়াত আস‌লো। আয়াত এসে লিমা‌কে না পে‌য়ে চ‌লে যা‌বে এমন সময় দেখ‌লো তনয়া চুপচাপ ব‌সে কাঁদ‌ছে।

আয়াতঃ তনয়া তু‌মি এখা‌নে?

আয়াত‌কে দে‌খে তনয়ার আরো বে‌শি কান্না এসে গে‌লো। তাই কোন কিছু না ভেবেই আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে কান্না কর‌তে থা‌কে।

আয়াত কিছুটা অপ্রস্তুত হ‌য়ে গে‌লো ঘটনা‌টি‌তে। ‌কিন্তু তনয়ার কান্না দে‌খে ওর বু‌কের ভিতর মোচর দি‌য়ে উঠ‌লো। তারপরও বল‌লো

আয়াতঃ কি হ‌য়ে‌ছে তনয়া? কেউ কিছু ব‌লে‌ছে? প্লিজ কিছু ব‌লো। এভা‌বে কেঁ‌দো না প্লিজ। কিছু ব‌লো?

তনয়া কিছু বল‌ছে না শুধু আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে কান্না কর‌ছে।

আয়াত এর মাথায় হাত বু‌লি‌য়ে দি‌চ্ছে আর বল‌ছে প্লিজ কিছু‌তো ব‌লো তনয়া?

তনয়া নি‌জেকে আয়া‌তের থে‌কে ছা‌ড়ি‌য়ে কিছু না ব‌লে কাঁদ‌তে কাঁদ‌তে চ‌লে গেলো।

আয়াত বোকার মত ওর যাওয়ার পা‌নে তা‌কি‌য়ে রই‌লো।

প‌রে ক‌য়েক বার তনয়ার কা‌ছে এ বিষ‌য়ে আয়াত জান‌তে চে‌য়ে‌ছে? কিন্তু সবসময়ই তনয়া ব্যাপারটা এড়ি‌য়ে গে‌ছে।

তিন মাস পর———

ঠাসসসস——
আজ আয়াত তনয়া‌কে সর্বসম্মু‌খে আবার একটা চড় মার‌লো।

‌কিন্তু কেন? —-

আয়াত পা‌র্কে ব‌সে আবার তনয়া‌কে একটা চড় মার‌লো। পা‌র্কের অনেক লোক তা‌কি‌য়ে আছে এ অবস্থা দে‌খে।

তনয়া গা‌লে হাত দি‌য়ে দা‌ড়ি‌য়ে আছে। আজ ওর চোখ থে‌কে অশ্রু নদী বই‌ছে না কিন্তু খু‌শি‌তে চোখ দু‌টো ছলছল করছে।

আয়াত ওকে চড় মে‌রে কিছুদূর গি‌য়ে নি‌জের হাতে স‌জো‌ড়ে একটা আঘাত কর‌লো তনয়া দৌ‌ড়ে গি‌য়ে ওর হাতটা ধ‌রে বল‌লো।

তনয়াঃ মাথা ঠিক আছে আপনার?

আয়াত কোন কথা না ব‌লে তনয়া‌কে নি‌জের বু‌কের সা‌থে শক্ত ক‌রে চে‌পে ধ‌রেলো। তনয়া হতভাগ হয়ে গে‌লো। তনয়া নি‌জে‌কে ছাড়া‌নোর চেষ্টা কর‌ছে কিন্তু পার‌ছে না। কারন আয়াত ওকে এতোটা শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে আছে তনয়া চেষ্টা ক‌রে নি‌জে‌কে ছাড়া‌তে পার‌ছে না।

নেহা আর নয়ন( তনয়ার ক্লাসমেট) ওদের দি‌কে তা‌কি‌য়ে মুচ‌কি মুচ‌কি হাস‌ছে। কারন ওদের প্ল্যান কাজে দি‌য়ে‌ছে।

প্ল্যানটা কি? চলুন তিনমাস আগে—–

‌লিমার সা‌থে কথা বলার পর তনয়া অনেক বার বি‌ভিন্নভা‌বে আয়া‌তের সমস্যাটা জান‌তে চেষ্টা ক‌রে‌ছে কিন্তু সব বারই ব্যার্থ হ‌য়ে‌ছে। তাই ভাব‌লো আয়াত স্যার যেমন লিমার নাম ক‌রে আমা‌কে ক্ষে‌পি‌য়ে‌ছে তেমন কিছু কর‌লে কেমন হয়?

তাই নেহার সা‌থে কথ‌া বল‌লো। কারন নেহা তনয়া বিষ‌য়ে প্রায় সব কথাই জা‌নে। তাই‌ নেহা বল‌লো সেটাই ঠিক হ‌বে। তুই অন্য কারো সা‌থে রি‌লেশন ক‌রো শুন‌লে আয়াত স্যা‌রের ভিষন হিংসা হ‌বে।

তনয়াঃ কিন্তু নকল বয়ফ্রেন্ড কোথায় পা‌বো?

‌নেহাঃ এককাজ কর আমার বয়‌ফ্রেন্ড মা‌নে নয়ন‌কে ক‌য়েক‌দি‌নের জন্য ধার‌ নে! আর আমার আর নয়ন এর সম্প‌র্কের কথা‌তো তেমন কেউ জা‌নে না । তাই স‌ন্দেহ হ‌বে না। নয়ন‌কে আমি বু‌ঝি‌য়ে বল‌বো।

শুধু দুজন আয়াত স্যা‌রের সাম‌নে হে‌সে হে‌সে কথা বল‌বি। আর কিছু কর‌বি না কিন্তু! নয়ন কিন্তু আমার ম‌নে রা‌খিস!

তনয়াঃ চুপ! আমার টেস্ট অত খারাপ না যে অন্যের ইউস করা জি‌নিস নিজে ব্যবহার কর‌বো। আমার জন্য‌ তো আমার অঙ্ক টিচারই ঠিক আছে!

‌নেহাঃ মুখ ভেং‌চি কে‌টে হুমমমম।

প‌রের দিন থে‌কে প্ল্যান মত কাজ করা শুরু কর‌লো। আয়াত ক্লা‌সে আস‌লে তনয়া নয়ন এর সা‌থে কথা বল‌তো হাসাহা‌সি করতো। ক‌লেজ থেকে প্রায়ই একসা‌থে যে‌তো।

এমন‌কি আয়া‌তের বাসায় গি‌য়েও দুজন একসা‌থে বস‌তো কথ‌া বল‌তো।

আয়াত সেগু‌লো নো‌টিশ কর‌তো। আর ভিষন রা‌গি চো‌খে তনয়ার দি‌কে তাকা‌তো।

তনয়া সেগু‌লো দে‌খে মনে ম‌নে হাসতো। আর বল‌তো আমা‌কে কষ্ট দেয়া না। এবার দেখ‌বে আর জ্বল‌বে আর লু‌চির মত ফুল‌বে। হি হি হা হা।

‌তো সে‌দিন আয়াত পা‌র্কে আস‌বে সেটা তনয়া জান‌তে‌া তাই আগে থে‌কেই নয়‌নের সা‌থে পা‌র্কে গি‌য়ে ব‌সে বসে কথা বল‌ছে আর জো‌ড়ে হাস‌ছে। সেটা দে‌খে আয়া‌তের পা থে‌কে মাথা পর্যন্ত গরম হ‌য়ে গে‌লো।

সা‌থে সা‌থে গি‌য়ে তনয়ার সাম‌নে দাড়া‌লো। তনয়া হাতটা টান দি‌য়ে দাড় ক‌রি‌য়ে।

ঠাসসসসসস

আয়াত এখ‌নো তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে আছে। তনয়াও এখন নি‌জে‌কে ছাড়া‌নোর বৃথা চেষ্টা কর‌ছে না। আয়া‌তের বু‌কে কান পে‌তে ওর হৃদ‌য়ের আওয়াজটা শোনার চেষ্টা কর‌ছে। চোখ বন্ধ ক‌রে অনুভব কর‌ছে ওর হৃদ‌য়ের আওয়াজটা।

হঠাৎ কি একটা ম‌নে ক‌রে আয়াত তনয়া‌কে ছে‌ড়ে দি‌য়ে চ‌লে যে‌তে চাই‌লো। এবার তনয়া আয়া‌তের হাতটা টে‌নে ধর‌লো।

তনয়াঃ দাড়ান!

আয়াত মাথা নিচু ক‌রে দা‌ড়ি‌য়ে আছে।

তনয়াঃ যখন তখন আমা‌কে চড় মার‌বেন আবার জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌বেন! আমার গাল‌টাকি বাংলা‌লিং দা‌মে পাই‌ছেন। চড় মার‌লেন তো মার‌লেন তারপর টানা দশ মি‌নিট জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে রাখ‌লেন। দে‌খেন লোকজন কেমন ক‌রে তা‌কি‌য়ে আছে। আপনার সমস্যাটা কি? বল‌বেন?

আয়াতঃ কোন সমস্যা নাই। আমার কাজ আছে!

তনয়াঃ যতই কাজ থাকুক আমার প্র‌শ্নের উত্তর না দি‌য়ে যে‌তে পার‌বেন না?

আয়াতঃ আমি তোমার প্র‌শ্নের উত্তর দি‌তে বাধ্য নই!

তনয়াঃ বাধ্য একশ বার বাধ্য।

তনয়া আয়া‌তের হাতটা ধ‌রে টে‌নে নি‌য়ে নদীর পা‌রে নি‌রি‌বি‌লি একটা জায়গায় নি‌য়ে বল‌লো——-

তনয়াঃ স্যার আমি জা‌নি আপ‌নি আমা‌কে____ কিন্তু আপ‌নি কেন আমায় ইগ‌নোর কর‌ছেন সেটা বল‌বেন প্লিজ? আর হ্যা নয়‌নের সা‌থে আমার কোন সম্পর্ক নাই। এত‌দিন যা দেখ‌ছেন সবটাই আপনা‌কে রাগা‌নোর জন্য।

আয়াত অবাক চো‌খে তনয়া দি‌কে তা‌কি‌য়ে বললো——

আয়াতঃ তনয়া তোমার বয়স কত?

তনয়াঃ কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খে‌য়ে এ্যা! আপনার তো অন্যকিছু বলার কথা?

আয়াতঃ আগে ব‌লো তারপর বল‌ছি।

তনয়াঃ স‌তে‌রো বছর

আয়াতঃ আঠে‌রো বছর হ‌তে কত‌দিন বা‌কি ?

তনয়াঃ এইচ এস সি পরীক্ষার বা‌কি‌তো প্রায় ৫ মাস আর পরীক্ষার ম‌ধ্যেই আঠে‌রোতে পা দি‌বো।

আয়াতঃ তোমার প্র‌শ্নের জবাব গু‌লো আমি তোমার এইচ এস সি পরীক্ষার পর দি‌বো। কিন্তু তার আগে তোমা‌কে আমা‌কে একটা ওয়াদা কর‌তে হ‌বে?

তনয়াঃ কি ওয়াদা?

আয়াতঃ তোমা‌কে পরীক্ষায় ভা‌লো রেজাল্ট কর‌তে হ‌বে। য‌দি তা না ক‌রো তাহ‌লে আর আমার সা‌থে কথা বলার চেষ্টাও করবে না।

তনয়াঃ ওকে ডান।

তনয়া প‌রের দিন থেকে তনয়া ক‌লে‌জে যে‌তো। আয়াত ক্লাস করা‌তো কিন্তু তনয়ার দি‌কে তাকা‌তো না পর্যন্ত। তনয়ার ম‌নে ম‌নে খুব অভিমান হ‌তো আয়া‌তের উপর। এমন‌কি আয়াত‌দের বাসায় পড়‌তে গে‌লেও আয়াত চুপচাপ পড়া‌তো কিন্তু সহ‌জে তনয়ার দিকে তাকা‌তো না। আয়া‌তের এমন আচার‌নে তনয়া খুব কষ্ট লাগ‌তো। আয়া‌তের এভা‌বে ইগ‌নোর করাটা তনয়া মে‌নে নিতে পার‌ছি‌লো না।

ক‌য়েক মাস মাত্র বা‌কি পরীক্ষার। তাই ক‌লেজ ক‌মি‌টি আর স্যাররা মি‌লে সিদ্ধান্ত নি‌লো সব পরীক্ষার্থীদের নি‌য়ে কক্সবাজার ঘুর‌তে যা‌বে। যে‌হেতু সব টিচারা যা‌বে তাই আয়াতও তা‌দের সা‌থে যা‌বে। তনয়া সেটা শু‌নে ভাব‌লো আমি গে‌লে হয়‌তো স্যার ঠিকমত এনজয় কর‌তে পার‌বে না। ত‌ার থে‌কে আম‌র না যাওয়াই বেটার। তাই ওর বন্ধুদের বল‌লো ও যা‌বেনা। নেহা সেটা আয়াত‌কে ব‌লে দেয়।

প‌রের দিন আয়াত ক্লা‌সে এসে ব‌লে

আয়াতঃ স্টু‌ডেন্ট এটা একটা শিক্ষা সফর আমার ম‌তে এখা‌নে সবার যাওয়া উচিৎ। কেউ নি‌জের ব্য‌ক্তিগত সমস্যা এটার ম‌ধ্যে টে‌নে না আন‌লেই বোধয় ভা‌লো হ‌বে।

তনয়া বুঝ‌লো আয়াত কথাগু‌লো ইনডায়‌রেক‌লি তনয়া‌কে ব‌লে‌ছে। তনয়া তারপর কি ভেবে যে‌নো যাওয়ার জন্য রা‌জি হ‌য়ে গে‌লো। আগে আয়াত যতটা তনয়া‌কে ইগ‌নোর করতো তনয়া এখন তার থেকে তিনগুন বে‌শি আয়াত‌কে ইগ‌নোর ক‌রে। এসব কর‌তে তনয়ার কষ্ট হয় খুব কষ্ট লা‌গে। কিন্তু তবুও আয়া‌তের উপর রাগ দে‌খি‌য়ে কাজগু‌লো ক‌রে।

আজ ওরা সবাই শিক্ষাসফ‌রে যা‌চ্ছে। তিনটা বাস।। প্র‌ত্যেক বা‌সেই টিচার আছে। কপাল গু‌নে আয়াত তনয়ার বা‌সেই উঠ‌লো। এবং নেহা বু‌দ্ধি খা‌টি‌য়ে আয়াত‌কে তনয়ার পা‌শে ব‌সি‌য়ে দি‌লো। তনয়া সেটা দে‌খে জানালা দি‌য়ে বাই‌রের দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। বাসটা সাই সাই‌ চল‌ছে। প্রায় চৌদ্দ থে‌কে ষোল ঘন্টা বা‌সে থাকা লাগ‌বে। য‌দিও বাস মা‌ঝে মা‌ঝে প‌থে থাম‌বে। কিন্তু তবুও তনয়ার বা‌সে চড়ার তেমন অভ্যাস নাই।

আর তাছাড়া তনয়ার বে‌শিক্ষন জা‌র্নি কর‌লে ব‌মি পায়। তাই তনয়া ব্যাগে ব‌মির, মাথা ব্যাথার ঔষধ নি‌য়ে‌ছি‌লো। কিন্তু বোকার মত সেগু‌লো হ্যান্ড ব্যা‌গে না নি‌য়ে জ‌ামাকাপ‌ড়ের ব্যা‌গে রে‌খে দি‌য়ে‌ছে। যেটা বা‌সের ব‌ক্সে রাখা হ‌য়ে‌ছে। বাস চলার ঘন্টা তিন‌য়ের ম‌ধ্যেই তনয়ার মাথা ব্যাথা শুরু হ‌লো। সা‌থে মাথাও ঘুরা‌চ্ছে ব‌মি পা‌চ্ছে। কিন্তু খুব ক‌ষ্টে তনয়া সেটা আটকা‌নোর বৃথা চেষ্টা কর‌ছে।

আয়াত তনয়ার দিকে তা‌কি‌য়েই বুঝ‌লো ওর খুব কষ্ট হ‌চ্ছে। কারন ইতিম‌ধ্যে তনয়ার চোখ মুখ শু‌কি‌য়ে গে‌ছে। আজ প্রায় দু মাস পর আয়াত তনয়ার সা‌থে ঠিকমত কথা বল‌ছে—-

আয়াতঃ তনয়া তোমার কি খুব কষ্ট হ‌চ্ছে?

তনয়াঃ মাথা না‌ড়ি‌য়ে বল‌লো না।

আয়াতঃ দে‌খে‌া তনয়া কোন সমস্যা হ‌লে না বল‌লে কিভা‌বে বুঝ‌বো?

তনয়াঃ মাথা——
এটুকু বলার সা‌থে সা‌থে ব‌মি করে দি‌লো। আর কোন কথা বলতে পার‌ছে না। শুধু ব‌মি করা‌টা‌কে থামা‌নোর বৃথা চেষ্টা কর‌ছে।

আয়াত সা‌থে সা‌থে ড্রাইভার‌কে বাস থামা‌তে বল‌লে‌া। ড্রাইভার বাস থা‌মানোর পর আয়াত তনয়া‌কে রাস্তার ধা‌রে ব‌সি‌য়ে পা‌নি দি‌লো। তনয়ার ব‌মি করা দে‌খে কোন বন্ধুই ওর কা‌ছে আস‌লো না। কারন ব্যাপারটা স্বাভা‌বিক মানুষ ব‌মি জি‌নিসটা‌কে বড্ড অস‌স্তিকর বিষয় ভা‌বে।

‌কিন্তু আয়াত তনয়ার কা‌ছে গি‌য়ে ওর পি‌ঠে হালকা ভা‌বে হ‌াত বু‌লি‌য়ে দি‌চ্ছি‌লো। ওকে পা‌নি খাই‌য়ে দি‌লো ওর মুখটা ভা‌লোভা‌বে প‌রিষ্কার ক‌রে দি‌চ্ছি‌লো। তনয়া অপলক দৃ‌ষ্টি‌তে আয়া‌তের দি‌কে তা‌কি‌য়ে ভাব‌ছে লোকটার প্র‌ত্যেকটা কা‌জে আমার প্র‌তি ভা‌লোবাসার অনুভু‌তি পাই। কিন্তু কেন আমা‌কে নিজের থেকে এত দূ‌রে রা‌খে? কি তার সেই সমস্যা?

তারপর তনয়া‌কে ঔষধ খাই‌য়ে সবাই আবার বা‌সে উঠে। ব‌মি করার পর তনয়া অনেকট‌া ক্লান্ত হ‌য়ে পরে। যার কার‌নে তনয়া কিছুদূরে যে‌তেই ঘু‌মি‌য়ে প‌রে। বা‌সের প্রায় সবাই অনেক হইহুল্লর করার কার‌নে ক্লান্ত হ‌য়ে ঘুমা‌চ্ছে। আয়াত দেখ‌লো তনয়ার মাথাটা বার বার নি‌চের দি‌কে প‌রে যা‌চ্ছি‌েলো। যেমন ঘু‌মের মা‌ঝে মানু‌ষের হয়। তাই আয়াত নি‌জের হাতটা তনয়ার কা‌ঁধে রে‌খে তনয়ার মাথাটা‌কে নিজের কাঁ‌ধে রাখ‌লো।

আয়াত অপলক দৃ‌ষ্টি‌তে তনয়ার দি‌কে তা‌কি‌য়ে আছে। আর ভাব‌ছে ইস য‌দি সারা জীব‌নের মত তোমাকে এভা‌বে রাখ‌তে পারতাম। কিন্তু হয়‌তো আমার ভা‌গ্যে তোমা‌কে পাওয়াটা নাই! তোমা‌কে পে‌লে হয়‌তো জীব‌নে কোন চাওয়া থাক‌তো না। কিন্তু বি‌বে‌কের কা‌ছে আবেগ আর সমস্ত চাওয়া সবসময় পরা‌জিত। আমি জা‌নি তোমা‌কে ভালোবাসাটা আমার তুচ্ছ আবেগ না। কিন্তু স‌ত্যিকা‌রের ভা‌লোবাসাটাও একধ‌রনের তীব্র আবেগ।

খুব ইচ্ছা ক‌রে এই পি‌চ্চি তনয়াটা‌কে আমার হৃদয় খাচায় সারাজীবনের জন্য ব‌ন্দি ক‌রে রা‌খি। কিন্তু আমি জা‌নি হয়‌তো তা সম্ভব না। আমি তোমা‌কে আমার সমস্যার কথাগু‌লো বল‌লে হয়‌তো তোমার জীবটা তছনছ হ‌য়ে যা‌বে। তোমার ভ‌বিষ্যৎটা নষ্ট হ‌য়ে যা‌বে। কারন কষ্ট সহ্য করার বয়সটা যে তোমার এখ‌নো হয়‌নি।

আয়াত তনয়ার দিকে তা‌কি‌য়ে থাকতে থাক‌তে ঘু‌মিয়ে প‌রে। কিছুক্ষন পর তনয়ার ঘুম ভা‌ঙে। কিন্তু তনয়ার ম‌নে হ‌চ্ছে কা‌রো হৃদ‌য়ের মা‌ঝে আছে ও। মাথাটা হালকা উঠা‌তেই দেখে আয়াতের কাঁ‌ধে ওর মাথাটা রাখা। নি‌জের অজা‌ন্তেই তনয়ার মু‌খে হা‌সি ফু‌টে উঠ‌লো।

তনয়া ভাব‌ছে ভ‌বিষ্য‌তে আমি আয়াত স্যার‌কে পা‌বো কিনা জা‌নি না? তার সা‌থে সারা জীবন কাটা‌তে পার‌বো কিনা জা‌নি ন‌া! কিন্তু এই যে মূহুর্ত গু‌লো তার সা‌থে কাটা‌চ্ছি। এর থে‌কে সুন্দর মূহুর্ত আর আমার জীব‌নে আস‌বে কি না আমি তাও জা‌নি না! কিন্তু এই মূহুর্তগু‌লো‌কে আমি আমার সবটা দি‌য়ে উপো‌ভোগ কর‌তে চাই!

হঠাৎ রাস্তার উচু‌নিচু ঢা‌লে বাস লা‌ফি‌য়ে ওঠায় আয়া‌তের ঘুমটা ভে‌ঙে গে‌লো। তনয়াও অনেকটা হ‌চকি‌য়ে উঠ‌লে‌া। তনয়া আয়া‌তের দিকে তা‌কি‌য়ে লজ্জা পে‌য়ে বা‌হি‌রের দি‌কে তাকা‌লো।

আয়াতঃ তনয়া তোমার এখন কেমন লাগ‌ছে?

তনয়াঃ আগের থে‌কে অনেকটা বেটার স্যার।

আয়াতঃ কিছু খা‌বে?

তনয়াঃ নাহ স্যার।

এর ম‌ধ্যেই ব‌াস ঢাকা পৌ‌ছে গে‌লো। ঢাকায় প্রায় ঘন্টা খা‌নেক বাস থাম‌লো। সবাই খাবার জন্য হো‌টে‌লে ডুক‌লো। সবাই যে যার মত খা‌চ্ছে কিন্তু আয়াত তনয়া‌কে শুধু ভাত, ক‌রোলা ভা‌জি আর ডাল দি‌লো।

তনয়াঃ আমি এগুলো খা‌বো না! মুখ বা‌কি‌য়ে

আয়াতঃ সেটা বল‌লে তে‌া হ‌বে না। এখে‌া‌নো অনেকটা পথ জা‌র্নি কর‌তে হ‌বে। অন্য কিছু খে‌লে তু‌মি আবার ব‌মি কর‌বে! দে‌খে‌া তোমা‌কে সা‌পোর্ট কর‌তে আমিও একই খাবার খা‌চ্ছি। প্লিজ খাও তনয়া। নয়‌তো তোমার শরীর আরো খারাপ লাগ‌বে।

তনয়া আয়া‌তের কথা আর ফেলতে পার‌লো না। তাই কষ্ট হ‌লেও খাবারটা খে‌য়ে নি‌লো। তারপর আয়াত ওকে ব‌মির আর মাথা ব্যাথার ঔষধ খাওয়া‌লো

ঢাকা থে‌কে কক্সবাজার পৌছ‌া‌তে অনেক রাত হ‌য়ে গে‌লো। তনয় আর ব‌মি ক‌রে‌নি। হো‌টেল আগে থে‌কেই বু‌কিং করা ছি‌লো তাই কোন সমস্যা হ‌লো না। যে‌হেতু রাত অনেক সবাই খুব ক্লান্তও ছি‌লো তাই খে‌য়েই সবাই ঘু‌মি‌য়ে পর‌লো।

প‌রের‌দিন সকা‌লে সবাই যে যার মত বি‌চে ঘুর‌তে গে‌লো। আয়া‌ত আর তনয়ার আসার কথা শু‌নে লিমাও সেখা‌নে আস‌লো। কারন লিমাতো চট্টগ্রা‌মেই থা‌কে।

‌লিমা‌কে আয়াত তনয়ার সা‌থে হওয়া কথ‌া সবটা খু‌লে বল‌লো।

‌লিমাঃ কিন্তু আয়াত তুই‌কি স‌ত্যিই ওকে ভা‌লোবা‌সিস না?

আয়াতঃ মাথ‌া নিচু ক‌রে নাহ।

‌লিমাঃ এই মিথ্যাটানা তুই অন্য কা‌রো কা‌ছে বলিস। একে বা‌রে ফ্লপ মার্কা এ্যাক‌টিং।

আয়াতঃ ওকে সারা জীব‌নের জন্য আমা‌র ক‌রে পাওয়া মনে হয় আমার কপা‌লে নেই রে?

‌লিমাঃ কি সমস্যা আয়াত? বলনা প্লিজ? ———

লিমাঃ আয়াত তোর আবার কোন বড় ধর‌নের অসুখ ক‌রে‌নি তো?

আয়াতঃ আরে না।
(এ গ‌ল্পে আমার কোন বড় ধর‌নের রোগ শোক হ‌বে না লে‌খিকা বল‌ছে 😀😀😀)
সমস্যাটা তুই জা‌নিস হয়‌তো খেয়াল নেই?

‌লিমাঃ কি সেট‌া আয়াত!

আয়াতঃ তুই‌তে‌া আমার বড় ভাইয়া আয়ান এর কথা জা‌নিস?

‌লিমাঃ হ্যা সে একটা মে‌য়ে‌কে ভা‌লো‌বে‌সে পা‌লি‌য়ে বি‌য়ে করে‌ছি‌লো ব‌লে তোর বাবা তার সা‌থে কোন সম্পর্ক রা‌খে নি।

আয়াতঃ হ্যা। কিন্তু ভ‌াইয়া ভা‌লোবে‌সে বি‌য়ে ক‌রে‌ছে ব‌লে বাবা ততটা রাগ ক‌রে‌নি। আস‌লে বাব‌া তার বন্ধুর এক মে‌য়ের সা‌থে ভাইয়ার বি‌য়ে ঠিক ক‌রে‌ছি‌লো। কিন্তু ভ‌াইয়া বাব‌া‌কে কিছু না ব‌লে বি‌য়ে করায় বাবার বন্ধুর তা‌কে অনেক অপমান ক‌রে‌ছি‌লো। কিন্তু বাবা তার অপমা‌নে অতটা কষ্ট পায় নাই যতটা ভাইয়া তার কা‌ছে স‌ত্যি লু‌কি‌য়ে‌ছে ব‌লে পে‌য়ে‌ছে। বাবা আগেই ব‌লে‌ছে তি‌নি মিথ্যা‌কে ঘৃনা ক‌রেন। আর তাছাড়া বাবা সবসময় আমা‌দের সা‌থে বন্ধু সুলভ ছি‌লো। কিন্তু তবুও ভাইয়া ব‌লে‌নি।

তারপর থেকে বাবা ভাইয়ার সা‌থে কোন সস্পর্ক রা‌খে‌নি। আমি অনেকবার চেষ্ট ক‌রে‌ছি বাবা‌কে বুঝানোর কিন্তু তি‌নি আমার কোন কথাই শো‌নেন‌নি। আস‌লে মানুষ একবার তীব্র কষ্ট পে‌লে তার মনটা পাথ‌রের মত হ‌য়ে যায়। তখন শত অা‌বেগ অনুভু‌তি তার মন‌কে ছু‌তে পা‌রে না। বাবার ক্ষে‌ত্রেও তাই হ‌য়ে‌ছে।

‌লিমাঃ কিন্তু আয়াত তোর ভাইয়ার ভা‌লোবাসার সা‌থে তোর ভা‌লোবাসার কি সম্পর্ক?

আয়াতঃ হ্যা। সেটাই বল‌ছি? আচ্ছা লিমা তুই কি জা‌নিস তনয়া আমা‌কে ঠিক কত দিন ধ‌রে ভা‌লোবাসে?

‌লিমাঃ হ্যা প্রায় চার বছর।

আয়াতঃ নাহ। তিন বছর আট মাস ধ‌রে আমি তনয়ার চো‌খে আমার জন্য ভা‌লোবাসা দে‌খে‌ছি। কিন্তু জা‌নিস আমি তনয়া‌কে ঠিক কত দিন ধ‌রে ভা‌লোবা‌সি?

‌লিমাঃ ঠিক কত দিন বলে‌তে পার‌বো না? ত‌বে তনয়ার থে‌কে কম দিন।

আয়াতঃ (কিছুটা হে‌সে) চার বছর তের দিন ।

‌লিমাঃ অবাক হ‌য়ে কি? তুই তনয়া‌কে আগে থে‌কে চিন‌তিস?

আয়াতঃ হ্যা। তনয়া‌কে আমি প্রথম দে‌খি আমার এক বন্ধু র‌বির বাসায়। আর প্রথম দেখায় তনয়ার উপর কেমন যে‌নো একটা অনুভু‌তি কাজ করা শুরু ক‌রে দি‌য়ে‌ছি‌লো। র‌বির ছোট বোনের জন্ম‌দি‌নে এসে‌ছি‌লো তনয়া। কারন তনয়া র‌বির বো‌নের বান্ধ‌বি। জা‌নিস র‌বির ছোট বোন কে?

‌লিমাঃ কে?

আয়াতঃ তনয়ার সব চে‌য়ে কা‌ছের বান্ধ‌বি নেহা! তারপর নেহার থে‌কেই তনয়ার সমন্ধে সব কিছু জা‌নি। সব জে‌নে দেখলাম তনয়া আমার থে‌কে প্রায় ছয় বছ‌রের ছোট। আর এত ছোট বয়‌সি মে‌য়ের সা‌থে রি‌লেশন করাটা নেহাৎ বোকা‌মি। আর তাছাড়া তনয়া তখন রি‌লেশ‌নে জড়া‌লে ওর পড়া‌লেখায় ক্ষ‌তি হ‌তো। ওর ভ‌বিষ্যৎ অন্ধকা‌রের দিকে যে‌তো। যা‌কে এতটা ভা‌লো‌বে‌সে ফে‌লে‌ছি তার ভ‌বিষ্যৎ কিভা‌বে নষ্ট ক‌রি বল?

আর তাছাড়া দু‌টো মানুষ যখন রি‌লেশ‌নে থা‌কে তখন একে অপ‌রের মা‌ঝে কিছু দিন পর শয়তা‌নের তারনায় একটা আলাদা অনুভু‌তি তৈরী হয়। চুম্ব‌কের বিপরীত মেরু যেমন এ‌কে অপর‌কে আকর্ষন ক‌রে ঠিক তেম‌নি প্রে‌মিক প্রে‌মিকার ম‌ধ্যেও এ আর্কষন কাজ ক‌রে। আর তখন তারা না চাই‌তেও নোংড়া‌মি‌তে জড়ি‌য়ে প‌রে। আমি‌তো ছে‌লে নোংড়া‌মি ক‌রে পার পে‌য়ে যেতাম কিন্তু আমার তনয়া‌তো ছোট ও হয়‌তো সমা‌জের পেচ বুঝ‌তে না পে‌রে নি‌জের ক্ষ‌তি ক‌রে বস‌তো। তাই সবসময় তনয়ার থে‌কে দূ‌রে দূ‌রে থে‌কে ওকে ভা‌লো‌বে‌সে‌ছি।

‌কিন্তু উপরওয়ালা বোধয় আমা‌দের নি‌য়ে খেল‌তে ভা‌লোবা‌সে আমি তনয়া‌কে পড়া‌নোর কথা শু‌নেই না করে দিলাম কিন্তু বাবার কথা ফেল‌তে পারলাম না। কিন্তু তারপর তনয়া‌কে প্রথম বার পা‌র্কে এই কার‌নে চড় মেরে‌ছিলাম যে তনয়া যে‌নো ভুল প‌থে পা না বাড়ায়! আমি হয়‌তো তনয়া‌কে পড়াতাম না তাই অন্য কোন ছে‌লে যা‌তে না পড়ায় তাই তনয়ার জন্য আমিই টিচার ঠিক ক‌রে দিলাম। তনয়া‌কে স্কু‌লে কেউ প্র‌পোজ করার আগেই তা‌কে যেভা‌বেই হোক তনয়ার থে‌কে দূ‌রে স‌রি‌য়ে দিতাম। তনয়া হয়‌তো দু বছ‌রে আমা‌কে একবার‌ও দে‌খে‌নি কিন্তু দুবছ‌রের এক‌টি দিনও আমি তনয়া‌কে না দে‌খে থা‌কি‌নি।

তারপর হয়‌তো আমার ভা‌গ্যের জো‌ড়ে তনয়া আমার ক‌লে‌জেই ভ‌র্তি হ‌লো। জা‌নিস তখন আমি কতটা খু‌শি ছিলাম। যে রোজ তনয়া‌কে দেখ‌তে পা‌বো। রোজ রোজ ক্লা‌সের সবাই‌কে পড়া‌নোর বাহানায় বার বার তনয়া‌কে চো‌রের মত দেখতাম। কিন্তু তার কিছু‌দিন পরই ভাইয়া ঐ ঘটনাটা ঘটা‌লো।

তারপর তনয়া যখন সি‌ড়ি দি‌য়ে প‌ড়ে গি‌য়ে ব্যাথা পে‌য়ে‌ছি‌লো তখন ওর অবস্থা দে‌খে আমার প্রচন্ড কষ্ট হ‌তো। তনয়া সুস্থ হওয়ার পর ক‌য়েক মাস খুব সুন্দর ছি‌লো জা‌নিস । তনয়ার সা‌থে খুব ভা‌লো বন্ধুত্বও হ‌য়ে গে‌ছি‌লো। কিন্তু সমস্যাট‌া হ‌লো ক‌য়েক মাস আগে। তারপর থে‌কেই আমি তনয়া‌কে এভো‌য়েট ক‌রে চল‌তে থা‌কি।

‌লিমাঃ কি হ‌য়ে‌ছে কয়েক মাস আগে?

আয়াতঃ ক‌য়েকমাস আগে এক‌দিন রা‌তে বাবা আমায় বল‌লো আয়াত তো‌কে কিছু কথা বল‌বো রাখ‌বি? আমি বাবা‌কে বললাম কেন রাখবোনা বাবা ব‌লো কি বলবা?

বাবাঃ তোর ভাইয়া‌তো আমার কোন কথা শু‌নে‌নি! আমার সম্মা‌নের কথাও ভা‌বে‌নি! কিন্তু আমি তোকে সব থে‌কে বে‌শি ভরশা ক‌রি। তুই কি আমার বিশ্বাস রাখ‌বি?

আয়াতঃ হ্যা বাবা ব‌লো। অবশ্যই রাখ‌বো!

বাব‌াঃ আমা‌কে ছু‌য়ে ওয়াদা কর?

আয়াতঃ হ্যা বাবা এই তোমাকে ছু‌য়ে ওয়াদা করলাম তু‌মি যা বল‌বে তাই শুন‌বো। এবার তো ব‌লো?

বাবাঃ আমি আমার বন্ধুর মেয়ের সা‌থে তোর বি‌য়ে ঠিক ক‌রে এসে‌ছি। 
(কথাটা শু‌নে আয়া‌তের পুরো পৃ‌থিবীটা যে‌নো উল্টে গে‌লো।) মে‌য়েটা বর্তমা‌নে বাই‌রে আছে। ক‌য়েক মাস পর দে‌শে আস‌বে তার কিছু দিন পর তোর সা‌থে তার বি‌য়ে হ‌বে। কি‌রে তুই রা‌জি‌তো? না‌কি তুইও আয়া‌নের মত কাউ‌কে ——–?

আয়াত ওর বাবা কথা ভে‌বে নি‌জের ভা‌লোবাসার কথাটা লু‌কি‌য়ে বল‌লো না বাবা তেমন কিছু না! তু‌মি যা ভা‌লো বোঝ তাই ক‌রো। আমি তোমার বিশ্বাস কখ‌নো ভাঙ‌বো না।

বাবাঃ আমি জানতাম তুই এই কথাই বল‌বি। এই নে মে‌য়েটার ছ‌বি। ফোন নাম্বার নি‌বি?

আয়াতঃ তার দরকার নাই বাবা! তু‌মি যখন পছন্দ ক‌রে‌ছো তখন ভা‌লোই হ‌বে।

বাবার এই কথা শোনার পর থে‌কেই আমি তনয়ার থে‌কে দূ‌রে দূ‌রে থাকতাম। কারন যতই ওর কা‌ছে যা‌বো ততই ওর মায়ায় জ‌ড়ি‌য়ে পড়‌বো। কিন্তু পা‌জি মে‌য়েটা আমা‌কে ক্ষেপা‌নোর জন্য নয়ন এর সা‌থে কথা বলার নাটক কর‌লো। সেটা দে‌খে মাথা গরম হ‌য়ে যায় তার পর ওকে চড় মে‌রে‌ছিলাম। কিন্তু ওকে চড় মারায় ও যতটানা ব্যাথা পে‌য়ে‌ছে তার থে‌কে শতগুন বে‌শি ব্যাথ‌া আমার হৃদ‌য়ে লে‌গে‌ছে। তাই‌তো নি‌জের ভা‌লোবাসাটা‌কে আড়াল কর‌তে না পে‌রে ওকে পাগ‌লের মত জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে রে‌খে ছিলাম।

আমি য‌দি তনয়া‌কে এসব কথা ব‌লি মে‌য়েটা পাগ‌লের মত হ‌য়ে যা‌বে লেখা পড়ার অবস্থা খুব খারাপ হ‌য়ে যা‌বে। তাই‌তো ওকে ব‌লে‌ছি ওর পরীক্ষার পর ওকে সব স‌ত্যিটা ব‌লে দে‌বো। ‌কিন্তু আমি ভাব‌ছি আমি য‌দি ওকে স‌ত্যিটা ব‌লি তাহ‌লে তখন ওর অবস্থা কি হ‌বে?
এবার বুঝ‌ছো কি সমস্যা?

‌লিমাঃ গাধা, গদ্রভ , উল্লুক, বলদ তোর মাথায় কমন‌সেন্স ব‌লে কিছু আছে? তুই তোর বাবার কোন কথা না শু‌নেই বোকার মত ওয়াদা জ‌রে বস‌লি? আরে আগে আঙ্কেল এর কথাটা শু‌নেতো নি‌তি?

আয়াতঃ এখন কিছু করার নেই রে?

‌লিমাঃ হ্যা তা থাক‌বে কেমনে? করার পথ তো তুই বন্ধ ক‌রে দি‌ছোস? আচ্ছা মে‌য়েটার ছ‌বি আছে এখন তোর কা‌ছে?

আয়াতঃ হ্যা আমার মোবাই‌লে ম‌নে হয় আছে?

‌লিমাঃ দে‌খি!

আয়াত মোবাইলটা বের ক‌রে অনেক্ষন খ‌ু‌জে ছ‌বিটা লিমা‌কে দেখা‌লো।

‌লিমাঃ ছ‌বিটা হা‌তে নি‌য়ে বল‌লো। এই চুন্নি। আরে তনয়া‌তো এর থে‌কে হাজার গুন বে‌শি সুন্দর। তনয়ার সাম‌নে তো এটা চা কম পা‌নি লাগ‌বে। আচ্ছা মে‌য়েটার সা‌থে কথা বল‌ছিস?

আয়াতঃ তোর মাথা ঠিক আছে নাহ?

‌লিমাঃ তোর ওপর যা রাগ হ‌চ্ছে না। আমি য‌দি তনয়ার জায়গায় থাকতাম ত‌বে তো‌কে মে‌রে এই সমু‌দ্রেই ফে‌লে দিতাম। জা‌নিস যখন বল‌লি তোর বাবার বন্ধ‌ুর মে‌য়ে এক মূহু‌র্তেই ম‌নে হ‌য়ে‌ছি‌লো হয়‌তো মে‌য়েটা তনয়া। কিন্তু সব ধারনা সবটা স‌ঠিক হয় না‌রে।

আয়াতঃ জ‌া‌নি। কিন্তু এখন আমার আর কিছু করার নাই।

‌লিমাঃ তা কিভা‌বে পার‌বি? এবনরমাল আবাল ছে‌লে কোথাকার!

এই ব‌লে রাগ ক‌রে লিমা চ‌লে গে‌লো। লিমার রাগ হওয়াটা অস্বাভা‌বিক কিছুনা।

আয়াত চুপচাপ ওখা‌নে বা‌লির ওপর ব‌সে সাগ‌রের পা‌নে অপলক দৃ‌ষ্টি‌তে তা‌কি‌য়ে আছে। আর চোখ থে‌কে টপ টপ ক‌রে নোনা তরল গু‌লো ঝ‌ড়ে পড়‌ছে, যেগু‌লো আবার নোনা বা‌লিগু‌লো নি‌জের বু‌কে ধারন ক‌রে নি‌চ্ছে।

তনয়া আয়া‌তের সামনে এসে কিছুক্ষন দা‌ড়িয়ে দেখ‌ছে কিভা‌বে আয়া‌তে‌র চোখ থে‌কে জল ঝড়‌ছে? হঠাৎ তনয়া আয়া‌তের চো‌খের পা‌নিটা ধ‌রে ফেল‌লো। আয়াত তনয়ার দি‌কে তাকা‌লো। তনয়া বল‌লো

তনয়াঃ জা‌নেন স্যার আমার মা ব‌লে‌ছি‌লো ছে‌লেরা না‌কি খুব বে‌শি কষ্ট না পে‌লে কাঁ‌দেনা? আর য‌দি কাঁ‌দে তাহ‌লে ছে‌লে‌দের চো‌খের জলগু‌লো না‌কি মু‌ক্তোর চে‌য়েও দা‌মি হয়। আর আপ‌নি এত দা‌মি জি‌নিস গু‌লো‌কে এভা‌বে অপচয় কর‌ছেন।

আয়াত তারপরও অপলক দৃ‌ষ্টিতে তা‌কি‌য়ে আছে। তনয়া আবার বল‌লো****

তনয়াঃ মা আরো ব‌লে‌ছেন য‌দি আমা‌দের ম‌নে খুব বে‌শি কষ্ট লা‌গে তাহ‌লে নি‌জের কা‌ছের মানু‌ষের কাউ‌কে জড়ি‌য়ে ধ‌রে কাঁদ‌লে না‌কি কষ্টা ক‌মে যায়।
আপ‌নিও আপনার কা‌ছের কাউ‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধরে কাঁদুন দেখবেন মন হালকা লাগ‌বে। দাড়ান আমি লিমা আপু‌কে ডে‌কে দি‌চ্ছি।

এই ব‌লে তনয়া সাম‌নে পা বাড়া‌নোর আগেই আয়াত তনয়ার হতটা টে‌নে ধর‌লো। তনয়া পিছ‌নে ফি‌রে তাকা‌নোর সা‌থে সা‌থে আয়াত তনয়া‌কে টান দ‌য়ে নি‌জের বু‌কের মা‌ঝে চে‌পে ধ‌রে। শক্ত ক‌রে তনয়া‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে আয়াত কান্না কর‌ছে। তনয়া কিছু হতভম্ব হ‌য়ে গে‌লো। কিন্তু আয়া‌তের এ অবস্থা দে‌খে কিছু বল‌লো না। শুধু বল‌লো কি হ‌য়ে‌ছে স্যার ? আমা‌কে কি বলা যায়?

আয়াত তনয়া‌কে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে আছে আর ভাব‌ছে আমি তোমা‌কে সারা জীব‌নের জন্য আমার বু‌কে রাখ‌তে চাই। কিন্তু আমি জা‌নি আমি হয়‌তো তোমা‌কে পা‌বো না। কিন্তু তবুও বেহায়া মনটা সবসময় তোমা‌কে আমার ক‌রে পে‌তে চায়।

তনয়া আয়া‌তের থে‌কে নিজেকে ছা‌ড়ি‌য়ে বল‌লো_____

তনয়াঃ চলুন স্যার কিছুক্ষন সাগ‌রের পা‌নি‌তে পা ডু‌বি‌য়ে হা‌টি। সমু‌দ্রের বিশালতায় তা‌কি‌য়ে নিজের কষ্ট গু‌লো‌কে সমুদ্রের ঢেউ এর সা‌থে মি‌শি‌য়ে দেই। যা‌তে ঢেউ পা‌রে এসে আমা‌দের সকল কষ্ট গু‌লো‌কে নি‌জের সা‌থে ভা‌সি‌য়ে নি‌য়ে গি‌য়ে সমু‌দ্রের বু‌কে মি‌লি‌য়ে দেয়। তারপর তনয়া আয়া‌তের হাত ধ‌রে সমু‌দ্রের পা‌রে হাট‌তে লাগ‌লো।

আয়াত তা‌কি‌য়ে দেখ‌ছে তনয়া‌কে। তনয়ার চুল গু‌লো প্রবল বাতা‌সে বার বার ওর মু‌খে পর‌ছে। আর তনয়া সেগু‌লো বার বার সরা‌নোর বৃথা চেষ্টা কর‌ছে। আয়া‌তের মন চা‌চ্ছে তনয়ার অবাধ্য চুল গু‌লো নিজ হা‌তে ওর কা‌নের পিছ‌নে গু‌জে দিতে। আল‌তো ক‌রে তনয়ার গালটা‌কে ছু‌য়ে দি‌তে। ওর চো‌খে দি‌কে তাকি‌য়ে ‌চো‌খের গভীরতায় হা‌রি‌য়ে যুগ যুগ কা‌টি‌য়ে দি‌তে। আর বার বার বল‌তে ইচ্ছে ক‌রে। আই লাভ ইউ তনয়া , আই লাভ ইউ এ লট।

হঠাৎ ফো‌নের রিং এর শ‌ব্দে আয়া‌তের ভাবনায় ছেদ পর‌লো।

আয়াতঃ হ্যা লিমা বল?

‌লিমাঃ স্য‌রি। তখন তোর উপর রাগ উঠে গে‌ছি‌লো। তাই তো‌কে যাতা ব‌লে ফে‌লে‌ছি।

আয়াতঃ ইট’স ওকে।

‌লিমাঃ শোন আয়াত ভ‌বিষ্য‌তে কি হ‌বে তা হয়‌তো আমরা জা‌নি না? কিন্তু বর্তমানটা‌কে‌তো আমারা নি‌জে‌দের মত সাজা‌তে পা‌রি? তোর জীব‌নে পরবর্তীতে কি হবে ত‌া আল্লাহর উপর ছে‌ড়ে দে। কিন্তু যে দু‌দিন তুই এখানে আছিস তনয়ার সা‌থে ভা‌লো ভা‌বে কথা বল। ওর সা‌থে ভা‌লো সময় কাটা। হতে পা‌রে এই দু‌দিন তোর জীব‌নের সব‌চে‌য়ে সু‌খের মূহুর্ত হ‌য়ে স্মৃ‌তির পাতায় র‌য়ে যা‌বে। পার‌লে আমার কথাটা রা‌খিস। বাই ।

‌লিমা ফোনটা কাটলে আয়াত ফোনটা প‌কে‌টে রে‌খে তনয়া‌কে বল‌লো—-

আয়াতঃ তনয়া!

তনয়াঃ হ্যা বলুন স্যার?

আয়াতঃ আচ্ছা তনয়া যে দু‌দিন আমর‌া এখা‌নে থাক‌বো সে দু‌দিন কি আমরা বন্ধু হ‌তে পা‌রি?

তনয়াঃ মি‌ষ্টি একটা হা‌সি দি‌য়ে কেন নয়?

আয়াতঃ থেংক্স।

তনয়া আয়াত‌কে ধাক্কা মে‌রে পা‌নিতে ফে‌লে দি‌য়ে হাস‌ছে।

আয়াতঃ এটা কি কর‌লে?

তনয়াঃ কেন আমরা না এখন বন্ধু!

আয়াতঃ আচ্ছা দাড়াও তোম‌া‌কেও চোবা‌বো এখন।

তনয়াঃ নো ব‌লে দি‌লো দৌড়।

সারা‌দিন দুজ‌নে অনেক মজা কর‌লো। তারপর সন্ধ্যা‌বেলা যখন দুজন হে‌টে হে‌টে হো‌টে‌লে ফির‌ছি‌লো তখন আয়াত হাট‌ছে আর ভাব‌ছে যে‌দিন তনয়া স‌ত্যিটা জান‌বে ও ঠিক কি রকম রিয়াক্ট কর‌বে তা ভে‌বেই মনটা সমু‌দ্রে ওঠা অশান্ত ঝ‌ড়ের মত উথাল পাথাল কর‌ছে—–

কক্সবাজা‌রে যে দু‌দিন ছি‌লো সে দু‌দিন আয়াত আর তনয়া খুব সুন্দর সময় কা‌টি‌য়ে‌ছে। লিমার সা‌থেও ওরা দুজন অনেক জায়গায় ঘু‌রে‌ছে। তনয়া আয়াত‌কে সুন্দর একটা শামু‌কের তাজমহ‌লের শো‌পিচ গিফ্ট কর‌লো। আয়াত প্রথ‌মে নিতে চাই‌নি কিন্তু তনয়ার ছে‌লে মানু‌ষির কা‌ছে হার মান‌তে হ‌লো।

তনয়াঃ স্যার জা‌নেন তাজমহল হ‌চ্ছে ভা‌লোবাসার প্র‌তিক।

আয়াত তনয়ার কথার কোন উত্তর দি‌লো না। শুধু তনয়া‌কে সুন্দর একটা ওড়না গিফ্ট ক‌রে‌লো। তনয়া ওড়নাটা পে‌য়ে ভিষন খু‌শি।তনয়া ম‌নে ম‌নে ভাব‌ছে হয়‌তো পরীক্ষার পর স্যার ওকে প্র‌পোজ কর‌বে। হুম কিন্তু তনয়া স‌ত্যিটা জান‌লে হয়‌তো নিজের হুশ হা‌রি‌য়ে ফেল‌বে?

তরপর ওরা বা‌ড়ি ফেরার দিনও তনয়া তিন বার বমি ক‌রে। আর তখন আয়াত ওকে ভিষন কেয়ার ক‌রে‌ছি‌লো। ব‌মি করার পর ক্লান্ত হ‌য়ে তনয়া আয়া‌তের কা‌ঁধেই ঘু‌মি‌য়ে ছি‌লো। তনয়া যখন আয়া‌তের কাঁ‌দে মাথা দি‌য়ে ঘুমা‌চ্ছিল তখন গা‌ড়ি চলা‌র গতি‌তে তনয়ার মাথাটা বার বার নি‌চের দি‌কে প‌ড়ে য‌া‌চ্ছি‌লো ব‌লে আয়াত তার একটা হাত দি‌য়ে তনয়া মাথাটা ধ‌রে রে‌খে‌ছি‌লো।

আয়াত যখনই তনয়ার মু‌খের দিকে তাকায় তখনই অজানা এক প্রশা‌ন্তি‌তে আয়া‌তের বুকটা ভ‌রে যায়। কেন যে‌নো তনয়ার থেকে নি‌জের চোখ সরা‌তে পা‌রে না। তারপর নি‌জেই নি‌জে‌কে ব‌লে মিথ্যা স্বপ্ন দে‌খে কোন লাভ নাই। কারন মিথ্যা সব মানুষ‌কে শুধু মিথ্যা আশা দেয় আর কষ্ট দেয়। এর বাই‌রে কিছুই দেয় না।

তনয়া কিছুটা পথ ঘু‌মি‌য়ে ছি‌লো আর কিছুটা পথ ঘু‌মের অভিনয় ক‌রে ছি‌লো। কারন ঘুম ভাঙ‌লে যে আয়াত তার কাঁধটা স‌রি‌য়ে নি‌বে। তনয়া আয়া‌তের কা‌ঁধে মাথ‌া রে‌খে ভাব‌ছি‌লো ইশ এভা‌বে য‌দি সারা জীবন ওর কাঁ‌ধে মাথা রে‌খে থাক‌তে পারতাম! জা‌নিনা কি লেখা আছে আমা‌দের ভা‌গ্যে? কিন্তু ভা‌গ্যে যাই লেখা থাকুক না‌ কেন সারা জীবন আমি আমার অঙ্ক টিচার‌কেই ভা‌লোবাস‌বো।

ব‌রিশাল পৌছা‌তে পৌছা‌তে অনেক রাত হ‌য়ে গে‌লো। প্রায় সব মে‌য়ে‌দেরই বা‌ড়ির লোক এসে তা‌দের নি‌য়ে গে‌লো। কিন্তু তনয়ার বাবা সে‌দিন শহ‌রে ছি‌লো না তাই তনয়ার মা আয়াত‌কে ফোন ক‌রে ব‌লে‌ছে ও যে‌নো তনয়া‌কে বা‌ড়ি পৌ‌ছে দেয়। তাই আয়াত তনয়া‌কে নি‌জের গা‌ড়ি‌তে ক‌রে তনয়া‌দের বা‌ড়ির দি‌কে যা‌চ্ছে।

আয়াতঃ এখন কেমন লাগ‌ছে তনয়া?

তনয়াঃ জ্বি মোটামু‌টি ভা‌লো।

আয়াতঃ তোমার কি জা‌র্নি এলা‌র্জি আছে?

তনয়াঃ জ্বি স্যার। আস‌লে আমি এতদূর বা‌সে কখ‌নো ট্রা‌ভেল ক‌রিনি।

আয়াতঃ ওহ! তোমার বা‌ড়ি এসে গে‌ছে।

তনয়াঃ ওহ! ভিত‌রে আসুন স্যার।

আয়াতঃ নাহ । অনেক রাত হ‌য়ে গে‌ছে। এখন আর ভিত‌রে যা‌বো না। বা‌ড়ি যা‌বো!

তনয়াঃ ওকে! কিন্তু একবার গা‌ড়ি থে‌কে বাই‌রে বের হন?

আয়াতঃ কেন?

তনয়াঃ আরে আগে বের হন তারপর বল‌ছি?

আয়াত গা‌ড়ি থে‌কে বের হ‌য়ে দাড়া‌তেই তনয়া হুট ক‌রে আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো। আয়াত কিছুটা হতবাগ হ‌য়ে‌ গে‌লো। তনয়া অনেক্ষন আয়াত‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে বল‌লো——

তনয়াঃ আমি জা‌নিনা পরীক্ষার পর আপনার সিদ্ধান্ত ঠিক কি হ‌বে? কিন্তু এই যে দু‌টো দিন আপনার সা‌থে কাটালাম। এটা আমার জীব‌নের সব‌চে‌য়ে স্মরনীয় দিন হ‌য়ে আমার ম‌নের ম‌নি‌কোঠায় সারা জীবন গে‌ঁথে থাকবে। আপ‌নি যেমন আমার ম‌নে গেঁ‌থে আছেন ঠিক তেম‌নি এই স্মৃ‌তিগু‌লো গেঁ‌থে থাক‌বে! ধন্যবাদ স্যার। আমার সা‌থে এত সুন্দর দু‌টো দিন কাটা‌নোর জন্য।

আয়াত আর কিছু বল‌লো না। নি‌জে‌কে তনয়ার থে‌কে ছা‌ড়ি‌য়ে চুপচাপ চ‌লে গে‌লো।

প‌রে দিন থে‌কে সবাই লেখা পড়া নি‌য়ে অনেক ব্যাস্ত হ‌য়ে প‌রে। কারন সাম‌নে পরীক্ষা। আয়াত তনয়ার সা‌থে কথা ব‌লে কিন্তু খুব কম। তনয়াও পড়ার প্রেসা‌রে আপাতত ভা‌লোবাসার পোকাগু‌লো‌কে বা‌ক্সে বন্ধ ক‌রে রে‌খে‌ছে।

ও‌দের পরীক্ষা শুরু হ‌লো। পরীক্ষার ম‌ধ্যেই তনয়া আঠা‌রো‌তে পা দি‌লো। কিন্তু পরীক্ষার কর‌নে কোন সে‌লি‌ব্রেশন হয়‌নি। আজ ওদের পরীক্ষা‌ শেষ হ‌লো। তনয়ার পরীক্ষা খ‌ুব ভা‌লো হ‌লো। কারন ও আয়াত‌কে প্র‌মিস ক‌রে‌ছি‌লো। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তনয়া অধির আগ্র‌হে আয়া‌তের ফো‌নের অপেক্ষা কর‌তে লাগলো। কিন্তু প্রায় একমাস হ‌য়ে গে‌ছে কিন্তু আয়াত ওকে দেখা কর‌তে বল‌ছে না! ফো‌নে তনয়ার সা‌থে কথা হ‌লেও এ বিষয়টা আয়াত সবসময় এড়ি‌য়ে যায়।

এ‌ড়ি‌য়ে যা‌বে না‌তো কি কর‌বে? আয়া‌তের তো তনয়ার মু‌খোমু‌খি হ‌তেই ভয় ক‌রে। ঠিক কি বল‌বে ওকে? কিন্তু তনয়া আর অপেক্ষা কর‌তে পার‌ছে না। তাই সরাস‌রি আয়াত‌কে ফোন দি‌য়ে বললো আপ‌নি দেখা কর‌বেন না‌কি আমি আপনার বাসায় আস‌বো?

আয়াতঃ না না তার দরকার নাই। আস‌লে আমি‌তো এখন কিছু কা‌জে ঢাকা এসে‌ছি দু সপ্তাহ পর আস‌তে‌ছি। যে‌দিন আস‌বো তার প‌রের দিনই তোমার সা‌থে দেখা কর‌বো।

দু সপ্তাহ পর
তনয়া একটা রেস্টু‌রে‌ন্টে ব‌সে আয়া‌তের জন্য অপেক্ষা কর‌ছে। এই দু সপ্তাহ যে তনয়া ঠিক কি ভা‌বে কা‌টি‌য়ে‌ছে তা শুধ‌ু তনয়াই জা‌নে? কিছুক্ষন পর আয়াত আস‌লো। তনয়ার বুকটা দুরু দুরু কর‌ছে আয়াত ‌ঠিক কি বল‌বে এটা ভে‌বে?

আয়াতঃ কেমন আছো?

তনয়াঃ হুমম ভা‌লো। আপ‌নি?

আয়াতঃ ভা‌লো। কিছু খা‌বে?

তনয়াঃ না না স্যার। স্যার———

তারপর দুজন অনেক্ষন নীরবতা পালন কর‌লো। । 
‌কিন্তু তনয়া আর অপেক্ষা কর‌তে পার‌ছে না। গত চার বছ‌রের বে‌শি সময় ধ‌রে অপেক্ষা কর‌ছে। তাই মুখ ফস‌কে ব‌লে ফেল‌লো—-

তনয়াঃ স্যার আপ‌নি যে‌নো কি বল‌তে চাই‌ছি‌লেন?

আয়াতঃ হ্যা। কিন্তু ঠিক কিভা‌বে বল‌বো সেটা ভাব‌ছি?

তনয়াঃ এত ভাবাভা‌বির দরকার নাই। সরাস‌রি ব‌লে দেন। আমি শোনার জন্য রে‌ডি। (তনয়া ম‌নে ম‌নে বল‌ছে প্লিজ আল্লাহ ভা‌লো কিছু যে‌নো ব‌লে!)

আয়াত কিছুক্ষন ভে‌বে বল‌লো
আয়াতঃ তনয়া আমার বি‌য়ে ঠিক হ‌য়ে গে‌ছে।

তনয়া অবাক চো‌খে আয়া‌তের দি‌কে তাকা‌লো।

তারপর আয়াত ওর বাবার ওর ভাইয়ার সব কথা বল‌লো। এও বল‌লো সাম‌নের মা‌সের শে‌ষের দি‌কে আমার বি‌য়ে। আর সেই মেয়ে‌টি কিছুক্ষন পর এখা‌নে আমার সা‌থে দেখা কর‌তে আসবে।

আয়া‌তের কথা গু‌লো শোনার পর তনয়ার পু‌রো পৃ‌থিবীটা যে‌নো গোলক ধাঁধাঁর মত ঘুর‌ছে। চোখ দু‌টো ঝাপসা হ‌য়ে যা‌চ্ছে। নি‌জের ওপর যে‌নো কোন নিয়ন্ত্রন রাখ‌তে পার‌ছে না। চিৎক‌ার ক‌রে কাঁদ‌তে ইচ্ছা কর‌ছে। ‌কিন্তু শত ক‌ষ্টে তনয়া নি‌জে‌কে আটকা‌চ্ছে।

আয়াতঃ প্লিজ তনয়া আমা‌কে মাফ ক‌রে দেও। আর প্লিজ নি‌জের ওর নিয়ন্ত্রন রা‌খার চেষ্টা ক‌রো। আস‌লে আমি——

তনয়াঃ থাক স্যার। আপনার আমা‌কে কোন এক্স‌প্লে‌নেসন দেয়ার দরকার নাই। আ‌মি আপনা‌কে জা‌নি!

‌আর আয়াত‌কে অবাক ক‌রে দি‌য়ে তনয়া বল‌লো মে‌য়ে‌টির নাম কি স্যার?

আয়াতঃ আমি জা‌নি না?

তনয়াঃ কি ব‌লেন? যার সা‌থে বি‌য়ে হ‌বে তার নাম জা‌নেন না? দিস ইজ নট ফেয়ার স্যার? আচ্ছা ভা‌বি কি এখন আস‌বে?

আয়াতঃ তনয়ার কথায় হতবাগ হ‌য়ে গে‌লো তারপর বল‌লো হুমম।

তনয়াঃ আমি কি তাকে একবার দেখ‌তে পা‌রি? ভয় নাই আমি আমার বিষ‌য়ে কিছু বল‌বো না।

আয়াতঃ তনয়া! আর ইউ ওকে?

তনয়াঃ কেন? ইয়েস স্যার আই অ্যাম এব‌সো‌লেট‌লি ওকে। আরে আপ‌নি আবার এটা ভাব‌ছেন না‌তো যে আমি উল্টা পাল্টা কিছু ক‌রে ফেলবো? পাগল নাকি! স্যার আমি তনয়া! আর আমি এতটা সাহ‌সি নই যে নিজের জাহান্না‌মের টি‌কিট নি‌জে কাট‌বো।

তনয়ার এমন কথা শু‌নে আয়াতের মু‌খের ভাষা যে‌নো হা‌রি‌য়ে গে‌ছে। কিছু বল‌তে পার‌ছে না। 
‌কিছুক্ষনের ম‌ধ্যে সেই মে‌য়েটা আস‌লো। এসে আয়াত‌কে বল‌লো—–

——আর ইউ আয়াত? আই অ্যাম অবনী।

আয়াতঃ খুব শুষ্ক ভা‌বে ইয়েস! বসুন।

অবনীঃ ওনি? তনয়াকে উদ্দেশ্য ক‌রে?

তনয়াঃ বেশ হা‌সি মু‌খে বল‌লো হাই আই অ্যাম তনয়া? আয়াত স্যা‌রের—— স্টু‌ডেন্ট।

অবনীঃ ওহ! হাই।

তনয়াঃ তো আপ‌নি আমা‌দের ভা‌বি হ‌বেন?

অবনীঃ লজ্জা পে‌য়ে হুমমম।

তনয়াঃ আপ‌নি জা‌নেন আপ‌নি অনেক লা‌কি! কারন আপ‌নি আয়াত স্যার‌কে নি‌জের জীবন স‌ঙ্গী হিসা‌বে পা‌চ্ছেন! স্যার অনেক ভা‌লো মানুষ। এখা‌নে এসে‌ছিলাম কিছু কা‌জে‌র জন্য কিন্তু স্যার‌কে দে‌খে তার সা‌থে একটু কথা বললাম। আই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।

অবনীঃ নো নো।

তনয়াঃ আচ্ছা আমি তাহ‌লে আসি। কিছু কাজ আছে। বাই ভা——বি। বাই স্যার।

তনয়া এক‌টিবারও আয়া‌তের দি‌কে তাকা‌লো না। শুধু সাম‌নের দি‌কে তা‌কি‌য়ে হাট‌ছে। আজ তনয়া পা দু‌টো যে‌নো চল‌ছে না। ম‌নে হ‌চ্ছে পিছন থে‌কে কোন অদৃশ্য শ‌ক্তি ওর পা দু‌টো‌কে আট‌কে রে‌খে‌ছে।।

কিন্তু তনয়ার এমন আচার‌নে আয়াত অনেক অবাক হ‌লো। তনয়া চ‌লে যা‌চ্ছে। আয়াত হা হ‌য়ে ওর যাবার পা‌নে তা‌কি‌য়ে আছে। তনয়া নি‌জের অবাধ্য চো‌খের জলগু‌লো‌কে মোছার বৃথা চেষ্টা কর‌ছে। আয়াত বুঝ‌তে পার‌ছে তনয়ার ম‌নের অবস্থা। কারন আয়া‌তের ম‌নের অবস্থাও‌তো একই রকম।

তনয়া চ‌লে যাবার পর আয়াত নি‌জে‌কে আর ঠিক রাখ‌তে পার‌ছে না। তাই অবনী‌কে বল‌লো আমার খুব মাথা ব্যাথা কর‌ছে। আমরা কি প‌রে এক‌দিন কথা বল‌তে পা‌রি?

অবনী বল‌লো ঠিক আছে।

আয়াত বা‌ড়ি এসে বার বার তনয়া‌কে ফোন কর‌ছে। কিন্তু কেউ ফোন ধর‌ছে না। তারপর বাধ্য হ‌য়ে তনয়ার বাবার ফো‌নে ফোন ক‌রে বল‌লো আঙ্কেল তনয়া কি কর‌ছে?
তনয়ার বাবা বল‌লো তনয়া না‌কি টি‌ভি দেখ‌ছে। কাটুর্ন দেখ‌ছে আর পাগ‌লের মত হাস‌ছে। এই মে‌য়েটানা পু‌রো পাগল। আয়াত বল‌লো আঙ্কেল ফোনটা একটু তনয়া‌কে দি‌বেন? তনয়ার বাবা ফোনটা তনয়া‌কে দি‌য়ে বল‌লো আয়াত ফোন ক‌রে‌ছে।

তনয়াঃ হ্যা‌লো স্যার কেমন আছেন? ভা‌বি কেমন আছে? স্যার শো‌নেন বি‌য়ে কর‌ছেন আমা‌দের কিন্তু বড় ক‌রে একটা ট্রিট দি‌তে হ‌বে! ঠিক আছে?

আয়াত তনয়ার এরূপ কথা শু‌নে পু‌রো থ হ‌য়ে গে‌লো।

তারপর প্রায় রোজ আয়াত তনয়া‌কে ফোন করতো কারন আয়াত তনয়া‌কে নি‌য়ে খুব ভ‌য়ে থাক‌তো। কিন্তু রোজ তনয়া এমন ভা‌বে কথা বল‌তো যে‌নো কিছুই হয়‌নি। যে‌নো তনয়ার স্মৃ‌তি থে‌কে আয়াত নামটা সম্পূর্ন মু‌ছে গে‌ছে। আয়াত তনয়ার এমন আচর‌নে দ্বিধার ম‌ধ্যে প‌ড়ে যে‌তো। খুব ভয় হ‌তো আয়া‌তের কর‌তো তনয়া‌কে নি‌য়ে।

‌আয়া‌তের যে‌দিন বি‌য়ে হবার কথা তার কিছু‌দিন আগে তনয়ার রেজাল্ট দেয়। তনয়া এবারও A+ পায়। সবাই খুব খু‌শি হয় আয়াতও। কিন্তু এত খু‌শির মা‌ঝেও আয়াত আর তনয়ার বু‌কের ভিতরটা জ্ব‌লে পু‌ড়ে ছারখার হ‌য়ে যা‌চ্ছে।

আর আজ আয়া‌তের গা‌য়ে হলুদ।
আর মজার ব্যাপার কি জা‌নেন আয়া‌তের গা‌য়ে প্রথম হলুদটা তনয়াই ছু‌য়ে‌ছে। আর গিফ্ট হি‌সে‌বে আয়া‌তের দেয়া ওরনাটা আয়াত‌কে দি‌য়ে ব‌লে‌ছে—-

তনয়াঃ এটা অবনী ভা‌বির জন্য। কা‌রো শ‌খের জি‌নিস নি‌জের কা‌ছে রাখ‌তে নেই।

আয়াত কোন কথা না ব‌লে চুপচাপ ওড়নাটা হা‌তে নি‌লো।

সবার সা‌থে খুব হা‌সি হা‌সি মুখ ক‌রে কথা বল‌ছে তনয়া। কিন্তু ওর ম‌নের ভিতরটা হয়‌তো আয়াত ছাড়া আর কেউ বুঝ‌তে পার‌ছে না। গা‌য়ে হলুদ পর্ব শে‌ষে আয়াত তনয়া‌কে বল‌লো তোমার সা‌থে আমার কিছু কথা আছে? আমার সা‌থে এসো। তনয়া আয়া‌তের সা‌থে সা‌থে গে‌লো।

তনয়াঃ হ্যা বলুন স্যার?

আয়াতঃ তনয়া তু‌মি কি ক‌রে এতটা স্বাভা‌বিক আছো? ব‌লো?

তনয়াঃ কেন স্যার অস্বাভা‌বিক হওয়ার মত কিছু হ‌য়ে‌ছে কি?

আয়াত এবার নি‌জের রাগ ক‌ন্ট্রোল কর‌তে পার‌লো না। ঠ‌াস ক‌রে তনয়ার গা‌লে ক‌ষি‌য়ে একটা চড় মে‌রে দি‌য়ে বল‌লো——-

আয়াতঃ এই মে‌য়ে তু‌মি কি কিছু বো‌ঝো না না‌কি? না‌কি তোমার বোধগাম্য শ‌ক্তি সব শেষ হ‌য়ে গে‌ছে?

তনয়াঃ (তনয়া নি‌জের গা‌লে হাত দি‌য়ে) আবার মার‌লেন? এবার কোন অধিকা‌রে মার‌লেন? 
আর হ্যা ইউ আর টুু লেট স্যার! 
আর ————-

তনয়াঃ (গা‌লে হাত দি‌য়ে) আবার চড় মার‌লেন? কোন অধিকা‌রে বার বার আপ‌নি আমায় চড় মা‌রেন? আর তাছাড়‌া ইউ আর টু লেট।
আর——

কথাটা বলার আগেই আয়াত তনয়াকে দেয়া‌লের সা‌থে চে‌পে ধ‌রে ব‌লে—–

আয়াতঃ অধিকার কি অধিকার তাই না? তোমার উপর য‌দি আমার অধিকার না থা‌কে তাহ‌লে কা‌রো নাই,

তনয়াঃ এত রাগ দেখা‌নোর কোন প্র‌য়োজন নাই। কি‌সের জো‌ড়ে আপ‌নি আমার উপর অধিকার খাটা‌চ্ছেন? এই ব‌লে তনয়া চ‌লে যে‌তে চাই‌লে

আয়াত তনয়া‌কে আরো শক্ত ক‌রে দেয়া‌লের সা‌থে চে‌পে ধ‌রে আয়াত তনয়ার একদম কা‌ছে চ‌লে যায়। এতটা যে‌ একে অপ‌রের নিঃশ্বা‌সের অনুভু‌তি পা‌চ্ছি‌লো। আয়াত তনয়ার কা‌ছে গি‌য়ে বল‌লো আমার ভা‌লোবাসার জো‌ড়ে আমি তোমার উপর অধিকার খাটা‌চ্ছি।

তনয়াঃ ধাক্কা দি‌য়ে আয়াত‌কে দূ‌রে স‌রি‌য়ে দি‌য়ে ব‌লে এক‌দিন পর যে অন্য একজন‌কে নি‌জের স্ত্রী হিসা‌বে স্বীকার কর‌বে তার মু‌খে ভালোবাসা, অ‌ধিকার নামক কথা শোভনীয় লা‌গে না?

আয়াত তনয়ার হাতটা শক্ত ক‌রে ধ‌রে ব‌লে চ‌লো আজ এখন সবার সাম‌নে আমি তোমা‌কে বি‌য়ে কর‌বো। দে‌খি কে কি ক‌রে? আমি কা‌রো প‌রোয়া ক‌রি না।

তনয়াঃ( অবাক হ‌য়ে) প্লিজ স্যার রা‌গের মাথায় কোন কাজ কর‌বেন না। রাগ মানু‌ষের গুছা‌নো কাজ‌কেও নষ্ট ক‌রে দেয়। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন স্যার!

আয়াতঃ জাস্ট সেটাপ।

আয়াত তনয়া‌কে ওর বাবার কা‌ছে নিয়ে যা‌বে এর ম‌ধ্যে লিমা এসে বল‌লে‌া আয়ান ভাইয়া এসে‌ছে তার বৌ নি‌য়ে।

আয়াতঃ কি? আর বাবা?

আয়াত, তনয়া, লিমা তাড়াতা‌ড়ি আয়া‌তের বাবার কা‌ছে যায়। গি‌য়ে দে‌খে আয়া‌তের বাবা আয়ান ভাইয়ার সা‌থে কথা বল‌ছেন

আয়া‌তের বাব‌াঃ আজ আয়া‌তের জন্য তোমা‌কে মাফ ক‌রে দিলাম। দে‌খো আজ আয়াত আমা‌কে কত বড় খু‌শি দি‌চ্ছে। দে‌খো আয়াত আমা‌কে দেয়া কথা রে‌খে‌ছে। তাই এই খু‌শির কার‌নে আমি তোমা‌কেও মাফ ক‌রে দিলাম।

আয়া‌তের বাবার এই খু‌শি দে‌খে আয়াত আর কিছু বল‌তে পার‌লো না। তনয়া আয়াতে‌কে সাই‌ডে এনে ব‌লে****

তনয়াঃ দেখুন স্যার আজ আপনার বাবা কত খু‌শি। আপ‌নি কি চান তার এই খু‌শিটা নষ্ট হ‌য়ে যাক? দেখুন স্যার আমার আপনার উপর কোন রাগ বা ক্ষোপ নেই কেন জা‌নেন? কারন আপ‌নি নি‌জের খু‌শির কথা না ভে‌বে আপনার বাবার খু‌শির কথা ভে‌বে‌ছেন। আর এই জন্যই আমি আপনা‌কে না পাওয়ায় জন্য ম‌নে কোন রাগ রা‌খি নাই। হ্যা আপনা‌কে না পাওয়ার দুঃখ কষ্ট আফসুস তো আছে আর সারা জীবন থাক‌বে। কিন্তু আমি এটা ভে‌বে নিজে‌কে সাম‌লে নিবো যে আপনার বাবা মা আর আপ‌নি সু‌খে আছেন। স্যার বাবা মা‌য়ের মত কেউ হয়না।

স্যার আপ‌নি তা‌দের কথা মে‌নে নিন। বাবা মা‌কে কষ্ট দি‌য়ে কেউ জীব‌নেও খু‌শি হ‌তে পা‌রেনা। আর বাবা মা‌কে সু‌খি করার জন্য য‌দি নি‌জে কষ্ট পায় তাহ‌লে আল্লাহ সে ক‌ষ্টের প্র‌তিদান এক‌দিন না এক‌দিন ঠিকই দি‌বে। চ‌লি স্যার ভা‌লো থাক‌বেন। আমি আজ‌কেও আসতাম না কিন্তু আজ শেষ বা‌রের মত আপনা‌কে একবার দে‌খার লোভ সামলা‌তে পারলাম না। ভা‌লো থাক‌বেন।

এটা ব‌লে তনয়া ওখান থে‌কে চ‌লে গে‌লো। আর আয়াত হা হ‌য়ে ওর যাবার পা‌নে তা‌কি‌য়ে আছে। তনয়া একবা‌রের জন্যও পিছু তাকায়‌নি হয়‌তো নি‌জের চো‌খের জলটা আয়াতকে দেখা‌তে চায়‌নি তাই।

আজ আয়া‌তের বি‌য়ে। কিছুক্ষ‌নের ম‌ধ্যে বি‌য়ে হ‌য়ে গে‌লো। আয়া‌তের ঘো‌রের মত লাগ‌ছে। একটা ঘো‌রের ম‌ধ্যেই বি‌য়েটা হ‌য়ে গে‌লো। আয়াত মুখ থে‌কে যখন কবুল বল‌ছি‌লো তখন ওর ক‌লিজাটা যে‌নো ছি‌ড়ে যা‌চ্ছি‌লো। বি‌য়ে হবার কিছুক্ষন পর আয়াত তনয়ার কা‌ছে ফোন কর‌লো। ফোনটা নেহা ধর‌লো।

‌নেহাঃ হ্যা স্যার ব‌লেন?

‌নেহার গলা শু‌নে আয়া‌তের বুকটা অজানা ভ‌য়ে ধক ক‌রে উঠ‌লো।

আয়াতঃ তনয়া কোথায়?

‌নেহাঃ বেঁ‌চে আছে ভয় নাই আপনার! আমার পা‌শেই আছে। কিন্তু আমি আপনা‌কে ওর সা‌থে কথা বল‌তে দি‌বো না। আপ‌নি আপনার নতুন বৌ এর কা‌ছে যান।
এই ব‌লে নেহা ফোনটা কে‌টে দি‌লো।

আয়াতও আর কথা বাড়া‌লো না। রাত অনেক হ‌লো কিন্তু আয়াত নি‌জের রু‌মের দি‌কে যাবার নামও কর‌ছে না। ওর ভা‌বি ওকে জোড় ক‌রে রু‌মের ভিতর ডু‌কি‌য়ে দি‌লো। আয়াত রু‌মে ডু‌কে কিছুক্ষন নীরব থাক‌লো। তারপর ধী‌রে ধী‌রে বিছ‌নার কা‌ছে গি‌য়ে বল‌ে‌লো—–

আয়াতঃ স্য‌রি অবনী আমি আস‌লে তোমা‌কে বি‌য়ে কর‌তে চাই‌নি। আমি অন্য একজনকে ভা‌লোবা‌সি। তোমা‌কে স্ত্রী হিসা‌বে মে‌নে নেয়া আমার প‌ক্ষে সম্ভব না। পার‌লে আমা‌কে মাফ ক‌রে দিও।

এই ব‌লে আয়াত যাওয়া ধর‌লেই মে‌য়েটা আয়া‌তের হাতটা টান দি‌য়ে বিছানায় ফে‌লে দি‌য়ে আয়া‌তের পাঞ্জা‌বির কলার ধ‌রে বল‌লো ঐ আমা‌কে কি র‌বি সি‌মের মত ফ্রি পাই‌ছেন?

যে যখন খু‌শি চড় মার‌বেন? যখন খু‌শি ভা‌লো‌বে‌সে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌বেন? যখন খু‌শি বল‌বেন বি‌য়ে কর‌বেন না? আবার বি‌য়ে করে বল‌বেন স্ত্রী হি‌সে‌বে মে‌নে নি‌বেন না? কি সমস্যা কি আপনার?

আয়াত কথা গু‌লো শু‌নে অবাক হ‌য়ে মে‌য়ে‌টির দি‌কে তা‌কি‌য়ে তার থে‌কে একশগুন বে‌শি শক খে‌লো!

কারন মে‌য়ে‌টি আর কেউ নয় তনয়া। আয়াত যে‌নো কিছুক্ষ‌নের জন্য নি‌জের চোখকে বিশ্বাস কর‌তে পার‌ছে না। মনে হ‌চ্ছে স্বপ্ন আর বাস্তব দু‌নিয়ার মা‌ঝে একটা আলাদা দু‌নিয়া তৈরী হ‌য়ে গে‌ছে আর আয়াত সে দু‌নিয়ায় হা‌রি‌য়ে গে‌ছে।

তনয়া জো‌ড়ে আয়া‌তের হা‌তে একটা চিম‌টি কাট‌লো। আয়াত নি‌জের চেতনা ফি‌রে পে‌লো। হচ‌কি‌য়ে বল‌লো

আয়াতঃ তনয়া তু‌মি?

তনয়াঃ কি স্যার সারপ্রাইজটা কেমন লাগ‌লো?

আয়াত যে‌নো এখ‌নো নি‌জের ঘোর কা‌টি‌য়ে উঠ‌তে পার‌ছে না। তারপরও বল‌লো

আয়াতঃ অবনী কোথায়?

তনয়াঃ ইসসস অবনীর খুব চিন্তা হ‌চ্ছে না? আমি অবনী‌কে মে‌রে ফে‌লে‌ছি। ব‌লে জো‌ড়ে হাস‌েছে তনয়া!

আয়াত যে‌নো কিছুই বুঝ‌তে পার‌ছে না। এর ম‌ধ্যে কে যে‌নো দড়জায় টোকা দি‌লো?

আয়াত দড়জা খু‌লে দে‌খে অবনী দা‌ড়ি‌য়ে হাস‌ছে—

অবনীঃ হাই দুলাভাই! হোয়াট’স আপ? এখ‌নো বাসর শুরু ক‌রেন নি? কেন আমার জন্য ওয়েট কর‌ছি‌লেন বু‌ঝি?

আয়াত আবার একটা ধাক্কা খে‌লো।

এ‌দি‌কে তনয়া আর অবনী মি‌লে হাস‌তে‌ছে। এর ম‌ধ্যে বা‌ড়ির সব লোক যেমন আয়া‌তের বাবা মা, ভাইয়া ভা‌বি, লিমা আর নেহা সেখা‌নে উপ‌স্থিত হ‌লো। এবং সবাই হাস‌ছে। আয়াত যে‌নো বোকা হ‌য়ে গে‌ছে। কোনটা স‌ত্যি কোনটা মিথ্যা তা যে‌নো একটা ভ্র‌মের মত লাগ‌ছে ওর কা‌ছে!

আয়াতঃ বাবা এসব কি হ‌চ্ছে?

আয়া‌তের বাব‌াঃ আমি জানতাম না যে আমার ছে‌লে তার বাবা মা‌য়ের জন্য নি‌জের ভা‌লোবাসার মানুষ‌কেও ছাড়‌তে পা‌রে!

আয়াতঃ মা‌নে?

আয়া‌তের বাবাঃ তোমার বি‌য়ে কখ‌নোই অবনীর সা‌থে ঠিক হয়‌নি। তোমার বি‌য়ে অনেক আগে থে‌কেই তনয়ার সা‌থে ঠিক হ‌য়ে‌ আছে।

আয়াত চোখ বড় বড় ক‌রে কি? তাহ‌লে অব‌নী?

আয়া‌তের বাবাঃ অবনী তনয়ার কা‌জিন। তনয়া যখন আমা‌দের বাসায় পড়‌তে আস‌তো তখন থে‌কেই আমি বু‌ঝে‌ছিলাম যে তু‌মি তনয়া‌কে ভা‌লোবা‌সো। কিন্তু আমি দেখ‌তে চে‌য়ে‌ছিলাম তু‌মি তোমার বাবা‌কে কতটা ভা‌লোবা‌সো? তাই তোমার বি‌য়ে তনয়ার সা‌থেই ঠিক ক‌রে‌ছিলাম কিন্তু ছ‌বি দেখালাম অবনীর মা‌নে তনয়ার কা‌জিন‌ের। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত দেখ‌তে চাই‌ছিলাম যে তু‌মি তনয়ার ভা‌লোবাসায় মোহীত হ‌য়ে নি‌জের বাবা মা‌কে ছে‌ড়ে যাও কিনা?

‌কিন্তু তু‌মি তা ক‌রো‌নি। তু‌মি তোমার বাবা মা‌য়ের চাওয়াটা‌কেই প্রধান্য দি‌য়ে‌ছো। তোমা‌কে নি‌য়ে আজ আমার স‌ত্যিই গর্ব হ‌চ্ছে।

আয়াতঃ তারমা‌নে তনয়া সব জান‌তো?

আয়া‌তের বাবাঃ নাহ। তনয়া জা‌নে মাত্র তিন মাস ধ‌রে। কারন তনয়ার জন্ম দি‌নে তনয়া‌কে আমি উপহার স্বরূপ তার অঙ্ক টিচার‌কে গিফ্ট ক‌রে‌ছি। কারন তনয়াই আমা‌কে ভা‌লোবাসার আসল মা‌নে শি‌খি‌য়ে‌ছে! তোমার ভাইয়া আর ভা‌বি‌কেও সে ফি‌রি‌য়ে এনে‌ছে।

তনয়াঃ স্য‌রি স্যার। আমার জন্ম‌দি‌নের দিন যখন বাবা সব খু‌লে বল‌লো তখন আমি খু‌শি‌তে ঠিক কি কর‌বো ভেবে পা‌চ্ছিলাম না। আপনার সাম‌নে দুঃ‌খি হবার এ্যা‌টিং করতে আমার ভিষন খারাপ লে‌গে‌ছে। কিন্তু আমি আপনার বাবা‌কে ওয়াদা ক‌রে‌ছিলাম আপনা‌কে কিছু বলবো না। তাই।

তারপর লিমা আর নেহা একসা‌থে ব‌লে উঠ‌লো আমরাও স্য‌রি! আস‌লে কিছু দিন আগে থে‌কে আমরাও সবটা জা‌নি!

আয়াত রা‌গে দুঃ‌খে কোন কথা বল‌তে পার‌ছে না। রা‌গের চো‌টে ওখান থে‌কে সোজা ছা‌দে চ‌লে গে‌লো।

তনয়াঃ বাবা ওনি তো রাগ কর‌লেন এখন আমি কি কর‌বো?

আয়া‌তের বাবা মাঃ আমা‌দের মত বু‌ড়োবু‌ড়ি‌দের এর ম‌ধ্যে না টানাই ভা‌লো! আয়া‌নের মা চ‌লো অনেক রাত হ‌য়ে‌ছে। এই ব‌লে তারা চ‌লে গে‌লেন।

লিমাঃ আমি এর ম‌ধ্যে নাই আমার বাচ্চা কাঁদ‌ছে যাই।

ভাইয়া ভা‌বিঃ আমা‌দের অনেক কাজ আছে। চ‌লো চ‌লো

‌নেহাঃ দেখ তনয়া স্বামীটা‌তো তোর তাই রাগটাও তুই ভাঙা। আমি যাই নয়‌নের সা‌থে একটু ফো‌নে প্রেম টেম ক‌রি। বাই ডিয়ার।

তনয়া বোকার মত সবার যাওয়ার পা‌নে তা‌কি‌য়ে রই‌লো। তারপর ম‌নে ম‌নে বল‌লো সব গু‌লো এক একটা বজ্জা‌তের হা‌ড্ডি। প‌রে আমিও দে‌খে নি‌বো?

তনয়া ধি‌মি পা‌য়ে ছা‌দে উঠে দে‌খে ছ‌াদের এক কোনায় আয়াত দা‌ড়ি‌য়ে আছে।

তনয়া কি কর‌বে ঠিক ভে‌বে পা‌চ্ছে না। তাই আস্তে আস্তে গি‌য়ে আয়াত‌কে পিছন থে‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধর‌লো।

তারপর আয়াত‌কে নি‌জের দি‌কে ফি‌রি‌য়ে বল‌লো স্য‌রি স্যার।

আয়াত কোন কথা না ব‌লে তনয়া‌কে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে হু হু ক‌রে কেঁ‌দে ওঠে। আয়া‌তের কান্না দে‌খে তনয়াও কেঁ‌দে ফে‌লে। তারপর ব‌লে—-

তনয়াঃ বললাম‌তো স্য‌রি!

আয়াতঃ স্য‌রি বল‌লেই সব ঠিক হ‌য়ে গে‌লো বু‌ঝি? জা‌নো এই কয় মাস কি রকম মানু‌ষিক চা‌পের ম‌ধ্যে দি‌য়ে গে‌ছি?

তনয়াঃ ইসসসসস! ম‌াত্র কয় মাস আর আমা‌কে যে সা‌রে চার বছর ধ‌রে রে‌খে‌ছেন? তার বেলায়? ইট’স রিভেন্স! এখন শোধ বোধ!

তনয়ার কথা শু‌নে আয়াত মুচ‌কি হে‌সে বল‌লো তাহ‌লেও তো তু‌মি কম, কারন আমি তোমা‌কে কবে থে‌কে ভা‌লোবা‌সি জা‌নো?

তনয়াঃ জা‌নি! লিমাআপু ব‌লে‌ছে! স্যার যা হ‌য়ে‌ছে সব ভু‌লে যাননা প্লিজ! চলুননা নতুন ক‌রে শুরু ক‌রি!

আয়াতঃ কি ক‌রে শুরু ক‌রি ব‌লো‌ তো?

তনয়াঃ কেন আবার কি হ‌য়ে‌ছে?

আয়াতঃ তু‌মি‌তো এখ‌নো সেই স্যা‌রের আট‌কে র‌য়েছো? আমি এখন তোমার বর! বুঝলা?

তনয়াঃ লজ্জা পে‌য়ে হুমম।

আয়াত তনয়া‌কে শক্ত ক‌রে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে কপা‌লে একটা ভা‌লোবাসার পরশ একে দেয়।

তনয়াঃ দ্যাট’স নট ফেয়ার স্যার?

আয়াতঃ হোয়াই?

তনয়াঃ চড় মার‌লেন গা‌লে আর ভা‌লোবাসা কপা‌লে ?

আয়া‌তঃ শুধু গা‌লে কেন সব জায়গায় ভা‌লোবাসা দি‌য়ে দেই! দুষ্ট‌মি ক‌রে

তনয়াঃ এই একদম না!

আয়াতঃ তা বল‌লে তো হ‌বে না ম্যাডাম পাঁচ বছর ধ‌রে ওয়েট কর‌ছি আর পার‌বো না।

অতপরঃ———-

তনয়া এখন অঙ্কের উপর অনার্স কর‌ছে আর মজার বিষয় কি জা‌নেন? আয়াতও সেই ক‌লেজেই প্র‌ফেসর গি‌রি শুরু ক‌রে‌ছে। তনয়াকে দু‌বেলা অঙ্কে সা‌থে সা‌থে ভা‌লোবাসার পাঠটাও শিখায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*